‘লং টাইম, নো সি...’ – হারিয়ে যাওয়া অপেক্ষার প্রতি

অর্পিতা দাস


এখন বারান্দার রেলিঙে ঝুঁকে বসে থাকলে সকালের রোদটা গায়ে লেগে বুদবুদের মত ওপরের দিকে উঠে যায়। ভীষণ শান্ত এই পাড়ায় সারাদিন কত লোক আসা যাওয়া করে। ঠাকুমা ঝুঁকে পড়ে সারাদিন কাউকে খোঁজে। রোদের মধ্যে সারাক্ষণ সাদা শাড়ি পরা এক নরম গোলাকার জড়বস্তু জ্বলজ্বল করে, টুকটাক নড়াচড়া করে। ওঠে, ধরে ধরে জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় স্থানগুলিতে হাজির হয় সময়মত। আবার চলে আসে নিজের অভ্যস্ত কোনায়। আমি নিচ দিয়ে অনেকবার যেতে যেতে দেখেছি, ঠাকুমা বোধহয় ওপর থেকে স্পষ্টভাবে কাউকে দেখতে পায় না। আমি ওপরদিকে তাকিয়ে দেখেছি অনেকবার। আমার দিকেও চোখ কুঁচকে ছোট ছোট করে তাকিয়ে কিছু খোঁজার চেষ্টা করে। নিচ দিয়ে হেঁটে চলে যাওয়া মানুষগুলোর সাথে ঠাকুমার বোধহয় কোন সম্পর্ক আছে। আমাকেও দূর থেকে অন্য কেউ ভাবে হয়তো, যার জন্য উনি অপেক্ষা করে বসে থাকেন।
একদিন দুপুরবেলা আমার ঠাকুমা যেখানে বসে, গাছের টবের পাশে দাঁড়িয়ে আমি সমানে মোবাইলে কথা বলে যাচ্ছি। অনেকক্ষণ কথা বলার পর দেখলাম ঠাকুমা খুব একটা নড়াচড়া করছে না তো? আমি আজ খুব ব্যস্ত। ক্রমাগত ফোন এসেই যাচ্ছে। আমি রেলিঙে ঝুঁকে কথা বলেই যাচ্ছি। এখন প্রচুর বন্ধু চারিদিক থেকে ফোন করছে। সামনে নিউ ইয়ার পার্টিতে কারা কারা আসবে। কখন সবাই মীট করবে, কোথায় কোথায় যাওয়া হবে। সারা বছর প্রায় দেখাই হয় না সবার সাথে। কত দূরে দূরে থাকে সবাই। আমার এক বন্ধু সাউথ আফ্রিকায় থাকে। কিন্তু যোগাযোগ থাকে সারাক্ষণ। এটা সেটা ফোনে পাঠায়, এদেশের ছবি ওদেশে পাঠানো হয়, ওদেশের আপডেট এখানে চলে আসে সেকেন্ডে সেকেন্ডে। আরও কিছুক্ষণ পর খেয়াল হল ঠাকুমা এখনও নড়ছে না তো! আমি কাছে গিয়ে দেখলাম। ঠিক লাগল না। দৌড়ে গিয়ে মাকে ডাকলাম। মা কিছু একটা আঁচ করে সব ফেলে তাড়াহুড়ো করে এল। ঠাকুমাকে হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হল না। ডাক্তারবাবু বললেন বাড়িতেই চিকিৎসা করা যাবে। আস্তে গলায় বললেন আসলে বিশেষ কিছু চিকিৎসা করার নেই। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। অনেকদিন এইভাবেই গেল। ঠাকুমা আর বারান্দায় বসল না কদিন। আমার পার্টির প্ল্যান চলছে জোর কদমে। আমাদের হোয়াটস্‌অ্যাপ-এ একটা বন্ধুদের সার্কেল আছে। সেখানে প্রতি মিনিটে প্ল্যানের আপডেট আসছে। আমি সেদিন ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ ঠাকুমার কাছে গিয়ে বসলাম। ঠাকুমা এমনিতে আমার সাথে অনেক কথা বলত একসময়। ঠাকুমা এখন আবার নড়া চড়া করতে পারছে, কথা বলছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম ‘কি গো কেমন আছো?’ ঠাকুমা বিড় বিড় করে কি যেন উত্তর দিল। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম। ‘তুমি কারোর সাথে কথা বলবে?’ ঠাকুমা মাথা নেড়ে কিছু একটা বলল। ‘তুমি কার জন্য এত বারান্দায় বসে থাকো গো? বলো না...আমি ফোন করে দিচ্ছি’। ঠাকুমা কিছু বলল না। ‘বলো না...কার জন্য বসে থাকো?অপেক্ষা কর?’ ‘ওই...সময়ের অপেক্ষা করি’।
আমি আজব বনে গেলাম। এত অপেক্ষা কেউ করে নাকি কারোর জন্য? ফোন আছে, চ্যাট আছে, ইন্টারনেট আছে ... এখনো এত অপেক্ষা কেন?
কিছুদিন পর আমি বাইরে পড়তে চলে গেলাম। সেদিনও ঠাকুমা বারান্দায় বসে ছিল। আমি যাবার আগে বলে গেলাম ‘ফোন কোরো ... ঠিক আছে আমি ফোন করব ...’। ঠাকুমা কিন্তু আমায় কোনদিন ফোন করেনি।
বাইরে গিয়েও বাড়ির সাথে যোগাযোগ রাখলাম খুব ঘনঘন। কোনদিন কি স্পেশাল রান্না হল, আমি কি নতুন খেলাম নতুন জায়গায়। রোজ নিয়ম করে বাবা আর মা আমাকে ফোন করত। ঠাকুমা কিন্তু কোনদিন ফোনে আমার সাথে কথা বলেনি। কিছুদিন পর শুনলাম তিনি আবার জানলার পাশে বসা বন্ধ করেছেন। আমি একদিন ভিডিও চ্যাট করে ঠাকুমার সাথে কথা বলতে চাইলাম ... কিছুতেই বলতে পারলাম না। ঠাকুমা ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে থাকল...কোন কথাই বলল না। মা বলল ‘ছাড় না ... জানিস তো ... ঠাকুমা কিছু বলতে চায় না ... । কথা বললে নাকি অপেক্ষা ফুরিয়ে যাবে ...’।
ঠাকুমা আবার উঠে বসল। ডাক্তার আবার বলল, সময়ের অপেক্ষা। এবার বালিশে হেলান দিয়ে জানলার পাশে বসে থাকত। একদিন ঠাকুমার সাথে জোর করে কথা বললাম। ঠাকুমা অল্প হাসল। কিছুদিনের মধ্যে খবর এল ঠাকুমা চলে গেছে। সবাই বলল, সময়ের অপেক্ষায় ছিল।
ঠাকুমা যখন চলে গেল কেউ আর বারান্দায় বসে থাকত না। আমার মনে মনে খুব রাগ হত। কেন যে এত অপেক্ষার প্রয়োজন ছিল? ধুলো জমা বারান্দায় চুপচাপ বসে থাকতে কি খুব আনন্দ পেত? কোন কথা না, যোগাযোগ না, ফোন না... । ছোটাছুটি, এক্ষুনি, এইখানে, দেখাদেখির এই দিনে ভাবনাচিন্তা নিয়ে বসে থাকাটা যন্ত্রনার না? কখন আসবে, কি রকম আছো – এগুলো জিজ্ঞেস করো কেন? দেখতেই তো পাচ্ছো...শুনে নিচ্ছো... । এত কল্পনা লাগে নাকি কাউকে দেখতে বা কিরকম আছে জানতে? ঠাকুমা বুঝল না। এইভাবেই কি অপেক্ষা করার সময় শেষ হয়ে গেল?