কী হৃদয় বন্ধু আমার

সঙ্ঘমিত্রা হালদার


ডাকহরকরার ডাক তো কবেই হারিয়ে গেছে। আর একদা উৎকন্ঠার ডাকবাক্সেও এখন ধুলোর স্তর। তার একাকিত্বের দূরত্বে বড়জোর বসে আছে একটা তালা। জোড়াসাঁকোর পাড়ার ‘চুড়ি চাই, খেলোনা চাই’-এর সঙ্গে আমাদের পাড়ার ‘আইসক্রিম চাই’ও ফিকে হতে শুরু করেছে। গোনাগুনতির মাঠ সাদা হল বলে। তবু ক্যানভাসের রঙটা যতই মুছে মুছে ‘নেই’ করা হোক, তার সমানুপাতিক ‘আছে”টা কোথাও না কোথাও, কোন না কোন কুঠুরিতে কন্ঠলগ্না হয়ে থেকেই যায়। তবে কি প্লেটো কথিত এই সেই শাশ্বতের ধারণা? ‘নেই’-এর শাশ্বত ধারণা ‘আছে’? কেননা ‘আছে’ না থাকলে এই ‘নেই’টার তো কোন অস্তিত্বই নেই! আমরাই সেই ক্যানভাস। আমাদের স্মৃতি, ইন্দ্রিয় সেই – কোথাও না কোথাও, কোন না কোন কুঠুরি। ‘একদা ছিল’ বা ‘আছে’র সব সংবেদনগুলোই আসলে জমা থাকে কোন না কোন ‘আমি’ নামক ক্যানভাসে। মরচে আর ধুলোর আস্তরনে ‘নেই’ হয়ে থাকে। বাইরে থেকে সাড়া পাওয়া যায় না। কিন্তু তেমন ‘ডাক’ এসে পৌঁছলে সম্বিতটুকু ঠিকই টের পাওয়া যায়।

আমার এ ঘরখানায় কে বিরাজ করে

কিছু কিছু ডাক আছে জীবনে, যা ঠিক স্পষ্ট করে ধ্বনি সাম্যের, ধ্বনি-শব্দের জোড় বা ‘ডাক’ নয়। তবু পাতার খসখস উঠলেই তার ডাক ফিরে ফিরে আসে। ইকো হয়—আমাকে পড়ো, মনে নাও তোমার, মনে করে শরীর দাও, আমিও প্রকাশিত হতে চাই তোমাতে। তারকোভস্কির ‘নস্টালজিয়া’র সেই দৃশ্যটা থেকে থেকে ধরে আসে। আর তার ডাক। কাচের খালি বোতলে এক ফোঁটা দু’ফোঁটা করে জল পড়েই যাচ্ছে। কেবল এই দৃশ্যটায় তারকোভস্কি একেবারে সাঁড়াশি আক্রমণ করেন। সেই একুশ বছর থেকে ট্যাপের ফোঁটা ফোঁটা জল পড়া কানে বাজলেই, সন্ত্রস্ত প্রায় পতিত একটা বাড়ির চৌহদ্দিতে ঘুলিয়ে যাই। বা বৃষ্টির দিনে রাস্তায় কোথাও এক-আধখানা ভাঙা শিশি। পরে খেয়াল করে দেখেছি, রাস্তায় এসময় কোনো হর্ণের আওয়াজও আর কান ভেদ করতে পারে না। তবে কে বিরাজ করে এ ঘরখানায়? আমার হয়ে আর কেউ? কিংবা আমিই কি আর কারো হয়ে?

আসলে আমার কেন জানিনা মনে হয় কেবল অর্থবোধক ধ্বনি বা অক্ষর সমষ্টির কেবল নিজস্ব কতকগুলো ডাক আছে শুধু তাই নয়। ‘আমি’ নামক ক্যানভাসটি যদি যথার্থ চঞ্চল, ক্ষুধার্ত, আর আকুতির মাঠ হয়, তবে তার জন্য বাদী-বিবাদী আর পোড়ো জমির সতর্কবার্তা নিতান্তই অকেজো। অর্থহীন। এই বিশ্বপ্রপঞ্চের সবটাই তখন তার আকাশভরা সূর্যতারা। চোখ রেখে একটা তাকানোয় সে শোনে—মরে যাব। সমুদ্রের পাড়ভাঙা আওয়াজে জ্যোৎস্না গলে পড়লে—যার শোনার সে ঠিকই শোনে সেই ডাক। চৈতন্য যতই কৃষ্ণ আর কালোর প্রতি আসক্ত থাকুন না কেন, তাকে ছাপিয়েই শুনেছিলেন সেই ডাক। সমুদ্রের ডাক। পাহাড়ুও চেনে খাদের ডাক। নাহলে কেনই বা প্রাণ হাতে করে তুলে দিয়ে আসা! সম্ভবত শক্তি চট্টোপাধ্যায়ও টের পেয়েছিলেন, খাদের একধরনের ডাক আছে। এবং দোটানায় পড়ে গেছিলেন। আমাদের প্রত্যেকেরই স্টিল ফ্রেমের জীবনে কোনো না কোনো নস্টালজিক ডাক ঘুরে ফিরে আসে। আসতেই থাকে। তাই এক ফাঁকে বেড়িয়ে পড়া, ডাকটির সন্ধানে। ডাকটির সামনে আরও একবার নতুন করে চিনে নেওয়া। আমার আমিটিকে। অন্যের আমিটিকে।

এ আমি কতটা আমার, কতটা অন্যের কেবলই গুলিয়ে যায়। একা অন্ধকারে ব্যালকনিটায় এসে দাঁড়ালে। সন্ধ্যের মুখে একটা রেওয়াজের ডাক কেবলই উঠে আসে। পড়শীর জানালার পর্দা ঘেরা আবছা আলো থেকে। দূরের স্ট্রিট লাইট থেকে। যুবকের সেই আলাপ, রাগ বিস্তার—আমার কিশোর বয়স ঘিরে ফেলে আমাকে। হালকা একটা ঝোপের গন্ধ, আদরে মাখামাখি ঘিরে ফেলে আমাকে। কখনও মুখোমুখি দাঁড়াতে না-পারার সাহস ঘিরে ফেলে আমাকে। একটা লালন আর বুনো ঝোপ আমার পুরোটা মনে না-করতে পারার কাঁটা বিঁধিয়েই চলে। সুইচটার কাছে না আসা অব্দি জিভ আড়ষ্ট থাকে। কয়েকদিন তাকে সামলে রাখি। গুছিয়ে রাখি। হঠাৎ শুনে ফেলা কোন রেওয়াজে, একা কোনো গানে আবার সংক্রমণ ফিরে ফিরে আসে। কিংবা সন্ধের মুখে কোনো মা ডাকছে তার ডাকনামকে। আমাকে একটা রেলিং-এ ঝুঁকে দাঁড়ানো পায়। একটা থামের আড়াল পায়। কিংবা কোন ডাকনাম ডাকছে তার ‘মা’কে। আমাকে আমার মা’র পায়ের সাদা পাতাটা পায়। মনে হয়—এই তো দেখে ফেলব! একটা কাবুলিওয়ালা আর ‘কাবুলিওয়ালা’—গল্পের ঝুলিটা হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে আমার ভেতর। বুঝি, ডাকটা ফুরিয়েছে। আমাকে তার ডাক দেওয়া ফুরোয়নি। আমি হাত রাখি কাঁধে। আমার।

কোথায় যায় এমন ডাক? এমন খিদে?

এই বিশ্বপ্রপঞ্চের প্রত্যেকটা বস্তুই একে অপরকে আকর্ষণ করছে। নাহলে সব কিছুর আগে, কবেই ছিটকে যেতাম। কিছু - না — এর গায়েও একটা ‘কিছু’ সেঁটে আছে! তবে কোথায় যায় সেইসব ডাক? কোথায় থাকে? যা মনে পড়ে, অথচ সাড়া দেয় না। সম্বিতটুকু দেয় — অথচ পালিয়ে থাকে। কেবল বেদনাটুকু দেয়, আর নিরাময় তালুতে পুষে রাখে! রাইনের মারিয়া রিলকে এমনই একটা খোঁজ জারি রেখেছিলেন নিজের কাছে। এই বিশ্বচরাচরের কাছে। খানিকটা এইরকম — এই যে আমরা যে পথ দিয়ে হেঁটে গেছি, স্পর্শ লেগে আছে যে ধুলোয় আমার, আমাদের এত এত চিন্তা, শব্দ ব্যবহার সব আমার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে মুছে যাবে! তাই হয় কখনও! সে কোথাও না কোথাও থাকেই! আমারও বিশ্বাস, যা ছিল কখনও, ক্যানভাসের লুপ্ততম রঙটিও কোন না কোন আকারে-প্রকারে মিশে আছে এই জল-হাওয়া-নিশ্বাসে। টের পাই। পাশের বাড়ির মা’টি যখন তার ডাকনামকে আদর করে পড়তে বসায়, খেতে দেয়, রেগে বকাবকি করে — আমি টের পাই আমার ‘মা’ ডাকটি, মায়ের ডাকটি ফুরোয় নি তখনও। কিংবা, টেবিলের খালি প্লেটটার দিকে তাকিয়ে, ভাতটা বেড়ে খেতে হবে ভেবে, নিজেই একটু মা হয়ে যাই। খেতে গিয়ে আবার আমি হয়ে বসি। আচানক কোনো বৃষ্টিতে লোভ হয় জ্বরটা ফিরে আসুক। মায়ের থুতনিটা আবারও ঝুঁকে পড়ুক আমার কপালে।

লোভ হয় খুব। কিশোর দিনের দুপুরের ডাকগুলো আবার ফিরে আসুক। রোঁয়াসমেত। প্রথমবারের মতো আবার হাতে-নাতে আবিষ্কার করি আমাকে। বালিশে কান চেপে তার শিহরণ আর উৎকন্ঠার ভাগ নিই আবার। আস্ত এক এক কোড় পাখির ডাক, ডেকে ডেকে বড় হোক আমাতে। আমি ভোগ করি তাকে। আর সেও। আমি ছলনায় থাকি। আশ্বাসে থাকি। তার ছায়া — ডাক প্রাণপণ আঁকড়ে থাকি। তবু জীবনের সব ছায়াই বাড়াবাড়িরকমে ফুরিয়ে আসে। মা ছায়া। বাবা ছায়া। প্রিয় ছায়া। আর আমরা বড় হতে থাকি। তবু ডাকগুলোর ছায়া নাছোড়বান্দা, সে স্মৃতি তুলবেই। প্রেমে – অপ্রেমে – আদরে – কান্না - ঘেন্নায় এক ডাক পিছলে গিয়ে তোলে অন্যের ডাক। ফেলে আসা ডাক। প্রেমিকের ডাকনামে চমকে উঠে শুনে ফেলি মায়ের ডাক। ঝগড়া-আদরে পড়শির দেওয়াল টপকে শুনে ফেলি অন্য অন্য জীবনের দিকে হেলে থাকা ডাক। কবেকার ফেলে আসা ‘সোনামন’ শুনতে রিং করি আরেকজনায়। সপ্তপদীর দাড়িওলা ধর্মান্তরিত উত্তমকুমার সেই যে হ্যামলিনের বাঁশির যাদুতে ভুলিয়ে নিয়ে গিয়েছিল, কোনঠাসা করেছিল বসন্ত চৌধুরির গলা, সেই যে প্রথম বয়সে — ফেরা হয়নি আজও। হঠাৎ বাঁক ঘুরতে গিয়ে মুখোমুখি পড়ে যাই বাঁশিটির। এ এক মিথের অনুবর্তন/ আবর্তন। আমরা মরেপচেগলে নিঃশেষ হয়ে যাব। আর ডাকটি কোনদিন পড়া হবে ভেবে ফিরে আসবে। ভর করবে আরেকজনায়। কেউ কেউ সে ডাকে ঘরবাহির করবে। আর আপনাকে পর। রাধা-কৃষ্ণের মিথ যতই রাষ্ট্র থাকুক আনাচে কানাচে। বাঁশি সত্যি সত্যিই অত সুরেলা - পিপাসার্ত হয়ে বাজত কিনা আমরা কেউই হলফ করে বলতে পারি না। আসলে বিদ্যাপতি- চন্ডীদাস শুনে ফেলেছিলেন অন্তঃকরণের সেই চিরপিপাসার্ত বাঁশিটি। নাহলে কে আর ওভাবে পথে কাঙাল হয় — ‘আমার বধূয়া আন বাড়ি যায়/ আমারও আঙিনা দিয়া’, যদি না সে বাঁশির — ডাকটি ধরা দেয়!

এমনকি রাস্তায়, কোলাহলে, ভিড়ে কোন এক ছায়া অবয়ব ডেকে ওঠে আমার স্পষ্ট নামে। মুখ ফিরিয়ে দেখি ছায়া সরে গেছে। ও কার ছায়া। কতটা আমার, বুঝিনি আজো। শুধু জানি ও আছে। মনে করিয়ে দেওয়াতে আছে। ডেকে ওঠাটুকুতে আছে। তন্দ্রায় আছে। আছে একাকি। জাগরণে। ওর ডেকে ওঠাটুকুর ঝলকে মনে পড়ে যাই। আমাদের দেখা হয় না কোনদিন। হয়ত হবে সামনের কোনো দিনে। ও আমার নামটুকু জানে। হয়ত আরও কিছু। আমি ওর জানিনা কিছু। টের পাই। ও আছে। পাশ ফিরে দেখি আমার ছায়া। ছায়া কেটে যায়।