ভালো আছি । আর তুই ?

অনির্বাণ বটব্যাল


-- “ পা-পা-ন ... বড্ড পা হয়েছে তোর। খাট থেকে এক পা নেমে দ্যাখ, ঠ্যাং খোঁড়া করে রেখে দেব”
ব্যাস্‌ ! স্পর্ধারা খান খান । । অগত্যা চোখ বুজে মটকা মেরে পড়ে থাকি । পুনরায় কুড়তে থাকি স্পর্ধার টুকরোগুলি। মা মানে অদৃশ্য লক্ষণ রেখা যাকে ভাঙ্গাটাই মস্ত চ্যালেঞ্জ। বুকের মহা ধুকপুক ঢেকে রাখছি ঘুমের অভিনয়ে। শান্ত রাখছি বন্ধ চোখের পাতা তবুও দিব্যি দেখছি মা গুছিয়ে নিল সমস্ত এঁটো বাসন, রেখে এল কলতলায়, নিকিয়ে নিল মেঝে এইবার পাশে এসে শোবে। আমিও ঘুমিয়ে কাদা। মায়ের টুংটাং শাঁখা পলা হাত ঘুরে বেড়াচ্ছে আমার পেট বুক আর ভীষণ চেনা চেনা একটা গন্ধ, তেলের না মায়ের বুঝিনি আজও তবু নেশা রয়ে গ্যাছে সে দৃশ্যের । সে মঞ্চে আমিই অভিনেতা আমিই দর্শক। চোখ বুজে মেপে নিচ্ছি মা নামক এক গভীরতর আলো। স্নেহের আবহে বাজছে আদরের সুর। চূড়ান্ত মুহূর্তে আড়ষ্ট হয়ে আসি। ক্রমশ থেমে যায় মায়ের হাত। চুপিচুপি দেখি ঘুমিয়ে পড়েছে মা। আরো ভালো করে দেখি মায়ের মুখ জুড়ে কি অদ্ভুত আলো। সমস্ত ক্লান্তি উপশম শিখছে মায়ের ঘুমন্ত মুখে। একটা বড় লাল টিপ তখনো তাকিয়ে শাসনের চেষ্টায়। এক চিলতে তৃপ্তি লেগে আছে ঠোঁটের কোনে। শান্তির কি নিরাপদ আশ্রয় মায়ের অলৌকিক রূপে। রূপকথা হয়ে যাচ্ছে সব , এ মুহূর্তে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুন্দরী মা আমার ... আলতো করে ডাকি – মা ... মা ... কোনো সাড়া নেই , অতএব – এস হে পালানো দুপুর, পা টিপে টিপে সন্তর্পণে নেমে এস বাড়ির উঠোনে। বাইরেও ঝিম ধরছে রোদের মেজাজে । গাছেদের গায়ে ডালে লতায় পাতায় বিরতির আলসেমি। আকাশের অনেক অ-নে-ক উঁচুতে পাক খাচ্ছে চিল । অথচ ঝটপটানি নেই , স্থির হয়ে থাকা ডানায় আটকে আছে অবাক বিস্ময়ে ক্লাস টু কি থ্রি-এর চোখ । তারও উপর দিয়ে সোনালী দাগ রেখে উড়ে যাচ্ছে জেট প্লেন । সরু দুটো দাগ ছড়িয়ে পড়ছে ক্রমশ মেঘের মত । যে ভাবে মেঘের বিস্তারে লাফিয়ে ওঠে ভল্লুক , কখনো বাঘের হাঁ , আড়ালে আবডালে দেবতাদের যুদ্ধ বেঁধে গেলে ঝড় হয় , কান ফাটিয়ে বাজ পড়ে কড়-কড়-কড়াৎ । রাত্রে শুয়ে সেদিন আর রং চটা ড্যাম্প ধরা দেওয়ালে খুঁজি না মানুষের মুখ বা হাতির শুঁড় । আলো নিভে গেলে বিড়বিড় করি “ ভুত আমার পুত, পেত্নী আমার ঝি / রাম লক্ষণ বুকে আছে ভয়টা আমার কি” । অন্ধকার বেশী গাঢ় হয় ভয়ের বিছানায় । মাথার নিচে বালিশ দিই না বরং মাথার উপরে চেপে ধরি – যেন আরো অন্ধকারে ঘুম রাখা আছে ... অথবা ঘুমই নিশ্চিন্ত অন্ধকার যেখানে ভয় নেই , মিথ্যা নেই , নিজেকে লোকানোর একান্ত আশ্রয় ... বা ইচ্ছে করে নিজেকে হারিয়ে ফ্যালা সবার থেকে , সব কিছু থেকে এবং নিজের থেকেও ......
অতঃপর হঠাৎ চোখের অস্বস্তি খুব – কচিকচি রোদের হাততালি, । কিচির মিচির করছে সকাল , লাফিয়ে বেড়াচ্ছে এদিক ওদিক...গত রাতে ভিজে যাওয়া গাছের পাতায় পাতায় আলো উৎসব , এত আলো ... এত আলো ... চোখ বুজে রাখা দায় , তড়াক করে লাফিয়ে উঠি বীরপুঙ্গব ।
এভাবেই আলোয় হারাতে হারাতে হারিয়ে যায় চোখের বয়স । টের পাই আলো নয় প্রকৃত অন্ধকার চোখের অভাব। আলোও বেওয়ারিশ তখন। খুঁজে মরে চশমা বিষাদ । খুঁড়ে তোলে দূরবীনে প্রত্ন দৃশ্যাবলী । দেখারা দল বেঁধে ঘুরতে বেরোয় ফেলে আসা পাড়া। এখনো আছে নাকি ঠিক ঠিক ... এ্যাজ ইট ওয়াজ ... নস্টালজিক ।
অলি গলির কত কত চোখ ধুলোর নিচে
কাতর প্রার্থনা রাখছে ফসিলের শোক
ফিরে এস আলো ... আরো একবার দেখাদেখি হোক ...

দেখাদেখি-১ ঃ কেউ ছেলেবেলা ভাবে
কেউ কেউ ছেলেখেলা .........

রাস্তা ছেড়ে চটি হাতে খালি পায়ে আল পথে স্কুল। যেতে যেতে চোখে চোখে মেপে নেওয়া আর কটা আঁশফল আছে গাছে, ফলসাগুলো আরো একটু বড় হোক , নোনাগুলোয় সবে রং ধরেছে , করমচা, পেয়ারা প্রত্যেকের চলে রুটিন চেক আপ কেননা চোখের এটাইতো শেখার বয়স। নাকি চোখই শেখার বস্তু বুঝতে বুঝতেই নিশানা শিখে ফেলি । জেনে ফেলি নিশানার সাথে দ্যাখার সরল রৈখিক সম্পর্ক । নিশানা বিহীন দ্যাখার কোনো দাম নেই। স্বচ্ছ স্থির সাবলীল হতে গেলে দ্যাখারও অনুশীলন চাই। মুঠোয় উঠে আসে পেয়ারা কাঠের ওয়াই । তার দু বাহুতে জুড়ে দেওয়া রাবারের বেল্ট। ইচ্ছাকে টেনে ছেড়ে দিতেই দুষ্টুমি ছুটে যাচ্ছে লক্ষ্য বরাবর। খিলখিল ঝরে পড়ে গুলতির গায়ে । স্কুলের টিফিন বেলায় বনেবাদারে কুল তলায় তেঁতুল তলায় ঘুরঘুর করে যাচ্ছে টইটই দিন । কিছু হুল্লোড় পড়ে আছে ইতস্তত। স্কুলের গেটে টাকায় দুটো কালোকালো কারেন্ট নুন । জিভের ডগায় কি অদ্ভুত জ্বলন চেখে দ্যাখা। এছাড়াও এক টাকায় পাঁচটা নুনে জড়ানো কুল, দুটো হজমী , একটা দাঁতের লড়াই ...... দ্যাখারা নিশানা বদলায় চোখ থেকে জিভে। মা পইপই করে কান কামড়ে বলে যায় ইশটিশ খাস না পাপান, জিভের স্বভাব খারাপ। বেয়াড়া হয়ে উঠতে চায় ভীষণ। ওতে আগল দে নইলে লকলক শিখে যাবে। আগল মানে কি আর পাগলের দল। ছুটির দিনে রাস্তার মোড়ে বাড়ির উঠোনে একদল কাঁচা , দুপুর গড়িয়ে দিচ্ছে কাঁচের মার্বেলে । কার কটা আছে লাল, কমলা, হলুদ,সবুজ, নীল? কটা চুন্নি গুলি ? কটা ঘাই ? কত রং, আর কত তার জুলুম, দরকষাকষি। বেশি যার জোর তার মগের মুলুক। কথায় কথায় বাজী রেখে পাখি চোখ নেমে আসে ভরসা আঙুলে। অব্যর্থ টিপের অছিলায় হট্টগোলের মধ্যে মনঃসংযোগ পাঠ। আহা ! কত তার নামের বাহার পিলমার , ঘাইমার, টোক্কামার । আসলে সব ধুন্ধুমার। রংবাজী খলবল করছে বয়স জুড়ে। সব রঙকেই নিজের করে নেওয়ার রেষারেষি। অথচ বড় হওয়া মানেই সব রং নিজস্ব নয়, বেছে নাও নিজস্ব রং - লাল , সবুজ নাকি গেরুয়া কিংবা রঙিন ছাতা মানেই তোমার নয় , তুমি ছেলে । হায় রং ! বয়স পেরিয়ে গেলে বদলে যায় রঙের মানে । বদলে যায় জেদ, জেদের জেহাদ । তখন লেত্তি দিয়েই পেঁচিয়ে দিচ্ছি জেদ ডানপিটে লাট্টুর গায়ে। কামারশাল থেকে স্পেশাল ভাবে তৈরী করা বড় পেরেক ছিটকে দেবে অন্য লাট্টুদের। ভেঙে দেবে অন্যের গুমোর। কখনো হাতের তালুতে কখনো লেত্তির ব্রীজে কত কেরামতি। কত আস্ফালন। কত দেয়ানেয়া খেলনা ইতিহাসে । ক্রমশ ভারী হয়ে যাচ্ছে সিলেবাস আর স্কুল ব্যাগ। হাফ প্যাটেলে রাস্তায় গড়াচ্ছে না বিকেল। হাডুডু, দাড়িয়াবান্দা , বুড়িবাসন্তির মাঠ জিমের ঠিকানায় টিউশানি পড়তে যায়। পড়তে পড়তে দাঁত ভেঙে গেলে ইঁদুরের গর্ত খোঁজা শুরু । ভাঙা দাঁত ইঁদুরের গর্তেই ফেলতে হয় কে যে কি ভাবে শিখিয়ে দেয় । অগত্যা ইঁদুরের রাস্তায় ঘোড়দৌড়। শিশিরে পা ভিজিয়ে ফুল চুরির চুপিচুপি সকাল টা টা করতে করতে চলে যাচ্ছে স্কুল বাসে । গ্রামার পরিয়ে দিচ্ছে মফস্বলের খামারের গায়ে। বাঁধনহীন শৈশবের গলায় বকলসের মত টাই। কিছু রেশ ধরে রাখছে খিচুরি পাঠশালাগুলি । শোনা যাচ্ছে নামতার সুর ... এক এক্কে এক , দুই এক্কে দুই ......... সে-ইই পুরোনো কৌশলে... দুলে দুলে সেকালের আফসোসে সকালের নয়া বর্ণপরিচয় -
অ-য় অজগর ঘরে পোষো
আ-য় আমটি দেখে আঙুল চোষো
ই-তে ইঁদুর দৌড়ে আগে হাঁটো
ঈ-তে ঈগল পাখির ডানা ছাঁটো
উ-তে উটের এখন মুখটি নিচু
ঊ-তে ঊনকোটি কাজের পিছু
ঋ-তে ঋষি মশাই ব্যাবসা ফাঁদে
৯-তে ৯-কার ফসিল খাতায় কাঁদে
এ-তে এক্কা গাড়ি হেরিটেজে
ঐ-তে ঐ দ্যাখো চাঁদ একলা ভেজে
ও-তে ওলের বাজার ফাটাফাটি
ঔ-তে ঔষধ এখন জীয়ন কাঠি ।।
অগত্যা- দ্যাখো আমি বাড়ছি মামির কেতাবী কিশোর , কোথায় রেখেছিস তোর
বৃষ্টিকাদায় ফুটবল শেষে পুকুর ঝাঁপিয়ে স্নান । ঘুরে ঘুরে সারামাস ফুর্তি জমিয়ে রাখা। শুকনো বাঁশ পাতা কলা পাতার বাসনায় আনচান উফফ্‌ ... কবে আসবে বুড়ী সাজানোর পালা। সারাদিন বুড়ীর প্রসাধনে ব্যস্ততা চলে। ফেলে দেওয়া হাঁড়ির পিছনে চোখ ফোটে মুখ ফোটে যত্নের চারকোলে। হাসির বেলা পড়ে এলে অন্ধকারের মত হানাদার ভয় ঘিরে ধরে। পালা করে পাহারাগিরি । হিংসেকে বিশ্বাস নেই , আগুন ছুঁড়ে দিতে পারে চোখের আড়ালে । সেবারের মতোই পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে স্বপ্নের শ্রম। ফ্যাল ফ্যাল তাকিয়ে থাকবে ব্যর্থ আলুর মালাটি।বুক জ্বলে নেমে আসা কান্নায় ডুকরে উঠবে না-পুড়তে পেরে বোবা কষ্টের অভিমান , সাধের আগুনে না পোড়ার আফসোস । কিংবা সেইই প্রথম বুঝতে পারা - পুড়ে যাওয়াও ভীষণ প্রিয় , আদরের আগুনে। তালি দিয়ে নেচে ওঠে ফুর্তিরা ... আগুনকে ঘিরেই গোল করে ঘোরা -
“ আজ আমাদের ন্যাড়া পোড়া ......” চিৎকার করে গান
ইচ্ছে খুশির ঝুলনে
রাস্তা পুকুর বন গজিয়ে উঠবে বাড়ির উঠোনে
গোপাল ভাঁড় , সুতো বাঁধা ঘাড় নড়া দাদু
ঝিম দুপুরের আচার চুরি থেকে পালিয়ে
দুষ্টু শালিকের গায়ে বিকেলের কড়া নাড়া
বাবার সাইকেলে এপাড়া ওপাড়া টইটই নেশা নিয়ে
চিনে ফ্যালা বুক চিনচিনের প্রথম বাড়ি

কিতকিত ফুরিয়ে গেলে , ক্লাস নাইন থেকে শাড়ী
বিনুনিতে ফিতে দিয়ে ফুল
বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে বিনোদীনি গার্লস হাইস্কুল .........

ভিজে যাচ্ছে সদ্য পাওয়া ফুল প্যান্ট , ব্যাগে বন্ধ ছাতা , ভিজে যাচ্ছে বাবার সাইকেল , কবিতার খাতা । গলে যাচ্ছে সব রং , জেদের শক্ত মাটি । এঁকে বেঁকে বয়ে যাচ্ছে হারিয়ে যাওয়াগুলি । কোনো না পাওয়া নয় বরং অন্য আর এক পাওয়া ... একে একে দৃশ্যান্তরগুলি জুড়ে কত রাস্তা আঁকা থাকে, কত পায়ের ছাপ হয়ত ঠিকানা বিহীন , কোনো পিন কোড নেই , কেউ কড়া নাড়েনি কখনো , কিংবা কোনো দরজাই নেই সে পথের ধারে তবুও মৌন মুখর আপ্যায়নগুলি । তুলে-রাখা-যাতায়াত এঁকে রাখে সকলেই। প্রত্যেকের নিজের নিজের অদৃশ্য রঙের তুলি ......

দেখাদেখি-২ ঃ চলায় বলায়
কাঁচকলায়
থোড়াই কেয়ার
রেয়ারেস্ট অফ দ্য রেয়ার

হতে হবে।ইচ্ছায় টগবগ ফুটছে ভিতরে। টুয়েলভের পরেই গায়ে দাদা দাদা গন্ধ মাখার ধুম। কলেজ স্ট্রাইকেও ক্লাস করছি ফিজিক্সের ল্যাবে। ম্যাক্সিমাম পাঁচ-ছ জন । হটাত বু-উ-উ-ম। থর থর করে কেঁপে উঠল জানলা দরজাগুলি। ঝনঝন করে কাঁচ ভেঙে পরল কোথাও । তখন রক্তের প্রবল গতি মাথার ভিতর , মাথা থেকে গড়িয়ে নামছে পায়ে নিশপিশ। যাই গিয়ে দেখি। রোম কুপে জমা হয়েছে শিহরণ বিন্দুগুলি। ভাবতে ভাবতেই পরপর আরো দুটো । বোমাবাজি চিনল কান আর চোখে তা উসুলের উৎসুক । কিন্তু অন্তরায় স্যার । “একজনও বাইরে যাবে না”- কড়া হুকুম। অথচ নিজে বেরোলেন আগে। টগবগ উঠে এল মাথায় – “ইশ কোথা থেকে হিটলার এলেন আমাদের...” কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে বললেন চলো আমার সাথে । চললাম আর স্যার মাঝে মাঝেই চোখ বুলিয়ে নিচ্ছেন সবাই আছি কিনা। যেন স্যার নয় বাবা , সযত্নে বাঁচিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তার সন্তানদের । কলেজের গেটে সাদা পোশাকের পুলিশে ছয়লাপ । ভ্রু কুঁচকে এগিয়ে আসতেই স্যার এগিয়ে গেলেন – “ ওরা আমার সাথে ল্যাবে কাজ করছিল” সরে দাঁড়াল পুলিশ । রাস্তায় বেরিয়ে স্যার বললেন-“ আর এখানে নয় যে যার বাড়ি চলে যাও ...” আমাদের চমক ভাঙল , ঘোরের মধ্যে ছিলাম মনে হল ... সারা রাস্তা শুধু অবাক হয়ে স্যারকে ভাবলাম... ছোট থেকেই আর্থিক অনটনে বিভিন্ন শিক্ষকের দাক্ষিণ্যে এই কলেজে ... এত মহানব্রতী শিক্ষক পেয়েছি জীবনে কখনো দুস্থ হওয়াকেও আশীর্বাদ মনে হয় আমার। কিন্তু ভুলে গেছি সে স্যারের নাম , গায়ে লেগে আছে সেদিনের চমক আর নিরাপত্তার ওম । চমকের ভিতরে লুকিয়ে থাকা অন্য চমক আর তারপরেই নতুনের স্বাদ । একটা নিটোল অবাক নেবে আসে। অবাকের গায়ে বিন্দু বিন্দু অনুভূতি ঘাম। একসময় মিলিয়ে যায় ... গ্যাছেও তাই। শুধু সে ঘটনার ছায়াছবি ভেসে থাকে চোখের পরম্পরায়। অনুভূতির উষ্ণতায় চমক খুঁজি। কোথায় চমক ? বিজ্ঞপ্তি দিই - সন্ধান চাই, গায়ের রং রোদ বর্ণ , মুখে আগুনের চিহ্ন আছে , উচ্চতা স্ফুলিঙ্গের মত, হারানোর সময় পরনে ছিল ডোরাকাটা সাহসে উঠতি হাওয়ার পোশাক । তবু চমকে ওঠে না কেউ আগের মত। আশ্চর্য বলে কিছু নেই, হয়ও না কেউ। অবাক নিজেই অবাক। ক্রমশ একাই ফসিল যুক্তির ভীড়ে। বয়সের পরোয়া না করে পরোয়ানা রাখছে আচার ব্যবহারে। না কোনো এক্সকিউজ নেই। সব বেপরোয়া ভীষণ ঘরোয়া নিজস্ব যাপনে। এই বেশ ভালো আছি হাঁটতে হাঁটতে আমাকে আমার মত থাকতে দাও। আমরা এমনই , এমন ভাবেই আমাদের নিতে হবে, নাও অথবা না নাও , তোমাদের মত হতে বোলো না প্লিজ। সমস্ত বিনয় পুরাতত্ত্বের কাঁচের স্পেসিস । সরিয়ে রাখছে আলগোছে। অজুহাতে ভেঙে যেতে পারে যখন তখন। যেভাবে বিলুপ্ত প্রজাতি সংরক্ষণ প্রয়োজন। যে ভাবে অভাব শিখিয়ে দেয় পরিমিত ব্যবহার। অসময়ে ব্যস্ততার সময় সংক্ষেপ। ব্যর্থ আক্ষেপ পড়ে আছে বিনম্র শ্রদ্ধায় । লুকিয়ে ফেলছে না কেউ সিগারেট। আড়াল করছে না বিশেষণের ধারাভাষ্যগুলি। ব্যাকডেটেড ন্যাকামো মাখে না ওরা চোখ মুখে। বরং অদ্ভুত স্মার্টনেসে সেকালের ধর্মলজ্জা একালের বর্ম সজ্জা । কিশোরী ফ্যাশনের ক্লিভেজ। সম্মান ব্যক্তিগত সম্পত্তি , পাঁচিল দেবে না কাঁটা তার তোমার ব্যপার বাপু । প্রেস্টিজের র্যা কে ঠুনকো সাজিয়ে রেখেছো সব। প্রচণ্ড নাজুক তাপমাত্রায়। মোম না বরফ ? কখন গলে যাবে সে চিন্তা তোমার, তোমাদের। আমরা পাশ দিয়ে চলে যাব। কোনো স্পিড ব্রেকার রেখো না রাস্তায়। যদিও কোনো জরুরী নেই অথবা সবটাই জরুরী – ট্রেনের হর্নের থেকে হেডফোন, পাশের সঙ্গীর থেকে এফ বি ফ্রেন্ড... চ্যাট, ট্রেনে বাসে বই পড়ার থেকে উপাদেয় মোবাইল চিপস্‌। পা লেগে গেলে নাক ছুঁয়ে তর্জনীর সট সার্কিট “সরি”। “আন্তরিক দুঃখিত” ছোটো হওয়া দুর্বল আমি । কাকাবাবু, মেসোমশাই, মাসিমা সাদা কেরোসিনের মত উবে গিয়ে সব নীল। রাস্তাঘাটে শুধু দাদা, দিদি আর বৌদিতেই স্বচ্ছল চলাফেরা। ওরা ছুটছে, দৌড়চ্ছে ...
অস্থিরতার টি-শার্টে সুযোগের সন্ধানী রঙ এঁকে দিচ্ছে সদ্ব্যব্যবহার
মুখোমুখি আগুন ও সাপ , মুখে তার মোহিনী মেক আপ,
চশমার কালো যখন তাকালো – এস হে যুবক যুবতী
কি এমন ক্ষতি ? পঁচিশে বৈশাখে ব্যস্ততা রাখোনি তুলে
খুলে রাখছো পাঞ্জাবীর সম্ভ্রম লো ওয়েস্ট জিন্সের গায়ে
হাত পেতে বিজয়ায় এখনো কি নাড়ু চাও ?
কিংবা রাস্তায় থমকে প্রণাম - ছোটোবেলার স্যার
ক্যামন আছেন , শরীর ক্যামন...... ইত্যাদি ইত্যাদিতেই
বেশী কথা মানে চেঁটে দেওয়ার ভয়
সকলই সরীসৃপ যেন , কথা নয়
অজানা নীলাভ ছোবলে ... ফাস্ট ... ভেরী ফাস্ট যন্ত্রের কবলে
আশ্চর্য নেই , অবাক নেই , ডুব নেই ,খুব নেই ... শুধু লজিকাল ইউনিটে ঘোরাফেরা
ফিজিক্যাল ইউনিটে ওঠাবসা বিজ্ঞাপনী হেসে
গুজু গুজু ফুসু ফুসু এস. এম. এস- এ
গল্পেরা গুজব হয়ে যাচ্ছে তাসের দেশে । বারমুডায় বাতিল পাজামার আড্ডাবাজি। তুলকালাম জুড়ে মিশে যাচ্ছে গদির রদবদল , হরতাল ,গৃহযুদ্ধ , মুমুর্ষুর খোঁজ , পাড়ার দুস্থ মেয়ের বিয়ে অথবা দুষ্টুমির কারসাজি। । মিশে যাচ্ছে বড়তে ছোটো , ছোটতে বড়। আমিরা আমরা শিখছে , ব্যক্তিগত শিখছে সার্বজনীনের সুখ। যে ভাবে কাঁধের পাশে কাঁধ রাখলে দুর্বল স্পর্ধা পায় , চাপা দুঃখ পায় উন্মুক্ত চারণ ভূমি... জীবন পায় যাপনের আরাম... জানা অজানার কত দেওয়া নেওয়া পড়ে থাকে। ছড়িয়ে দেওয়া হাসি ঠাট্টার মজাদার বাঁকে , মস্করায় লাফিয়ে উঠে হাহা হিহি , গোঁজাখুরি গপ্পোর ঠেকে বারবার স্যালুট জানায় আর মিস করে দ্য গ্রেট ঘনা দাকে ......



দেখাদেখি-৩ ঃ আদৌ দেখাদেখি নয়
চোখ বুঁজে চোখাচোখি
আরাম কি মামলা
অন্দর কি বাত
পড়ে আছে খাঁজে খন্দরে ...

বন্দরে সুগন্ধি রুমাল নাড়াগুলি । এত আড়িভাব , মাপতে মাপতে স্বভাব ভরা জাহাজ ডুবি । অগত্যা শুধুই অভাব । ঝাপসা দরজায় আরো ফিকে ভ্রমণ অমনিবাস। অসময়ে ভীষণ বেয়াড়া । পালকি থেকে নিরুদ্দেশ নামে। যৌতুকে গ্রাম দিও , গ্রামাফোন দিও আর একটা ঝরনা কলম। এইসব প্রজাপতি বাঁকে আমার একলা পায়। ছুটে যাই টের পাই নড়ে উঠছে কমলা লেবুর ঠোঁট অন্ধকারে। চিলেকোঠার ঘরে কার জন্যে “একি লাবণ্যে ...” ভেসে যাচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ... দরজায় নতজানু সম্মতি চায় একবার ছুঁয়ে দিবি হাত... একবার ...
বাংলা থেকে রূপসী খসে পড়ে। রাস্তা ঘাটে রোদের ঘুঙুর, চাঁদ থেকে জ্যোৎস্না ও কলঙ্কের ভয়। চুপিচুপি রেখে দেওয়া জোনাকী প্রস্তাব , দিন দিন জমে ওঠা ঋণ । সত্যি কি বুঝবে না মায়া বনের হরিণ ?নকশী কাঁথার লুপ্ত ডিজাইন খামে ভরে পাঠিয়ে দিচ্ছে নদী, সমান্তরাল বয়ে যাওয়া আড়াল আবডাল , কিন্তু , এবং , যদি। তলেতলে ছলাৎছল প্রশ্ন সকল- মাঝে মাঝে চোখ বুজে ছুঁই
আমি ভালো আছি। আর তুই?
আছিসতো ভালো?
সত্যিইই ?
এভাবেই চিঠিতে এলার্জি ওঠে। অক্ষরে ফোটে ঘুম প্রবণতা। ঘুণ শীতলতা তোষকের নিচে। চোখের সে শোকের হারানো নালিশে, বিছানা বালিশে ভিজে যাচ্ছে নদী ... মজে যাচ্ছে কুলকুল ... উড়ুউড়ু ... দৃশ্যাবলী তার
- “আকেবাঁকে পলিপাঁকে মরণ ডাকে স্থবিরতা
কষ্টগুলো স্পষ্ট হলে নষ্ট হবে গভীরতা”

অতএব অস্পষ্টই ভালো আর পিছোনে এগোতে চায় না দ্যাখারা । প্রত্ন দূরবীন থেকে খুলে রাখে নজর সমূহ। মুছতে শুরু করে সব ঝাপসা হয়ে আসা কুয়াশা মাখা কাঁচে – থাক , পড়ে থাক সব যে যেমন আছে ......
পড়ে থাক - সরস্বতী পুজো তক না খাওয়া কুল ,
পড়ে থাক -লাল পাড় শাড়ী নিয়ে সাইকেলে স্কুল ,
রবীন্দ্র জয়ন্তী নিয়ে টানা রিহার্সাল ,
চুপচাপ জড়িয়ে নদী সকাল বিকাল।

পড়ে থাক তন্নতন্ন- নিখোঁজ ডায়েরীর পাতায়
যেভাবে সব আছে প্রথমে নেই হয় ,
একদিন ছিল হয়ে যায় ... শূন্যতার জানলায় নিশিডাকের মত দাঁড় করিয়ে দেয় মাঝ রাতে ... অন্ধকারেরও ছায়া থাকে , ছায়ার নিজস্ব আলো, আলোর লুকোনো ঘ্রাণ । যতটা অভিমান তফাৎ করেছে দৃশ্য ও দ্যাখার । একার সাথে একার বাক বিনিময়। প্রলাপ লেগে আছে ঠোঁটে। ছুঁই নি কোনোদিন , তবু একাকার দ্যাখা না-দ্যাখার .উত্তর এখনো ঐখানে থ, আজও বুঝিনি সে ডাক চলার না থামার
শুধু বলেছিলাম –“কি হয়েছে তোর ?”
-“কিছু না , “অনির্বাণ হয়েছে খুব
অনির্বাণ, একটা গভীর অসুখ আমার ......”







. .