গন্ধ এবং হারিয়ে যাওয়া আমি

অত্রি ভট্টাচার্য্য


“সে কেঁদে কয় নীচে থেকে/ হারিয়ে গেছি আমি।” – এই হারিয়ে যাওয়ার মধ্যে যে গল্প, তাও তো প্রায় কবে হারিয়ে গিয়েছে। আমেচার আবৃত্তি, খুচখাচ পাড়াপুরষ্কার, একটা বাক্‌সার্থক ছেলেবেলা জলফোঁটায় চুরমার ! প্রথম প্রেমে পড়ার দিন থেকে বহু কবিতা বহু রঙ লিখে আজটি পাওয়া গিয়েছে। প্রতিটি আজ মহাজনীপ্রথায় দ্যুতক্রীড়ারত, তাদের বেশীরভাগ একইরকম ; কিছু কিছু তো এতই অভুক্ত, যে তাদের প্রাতঃরাশ থেকে সুদূর ক্যাণ্ডেললাইট পর্যন্ত উচ্ছিষ্টের চিহ্নমাত্র নেই। যেসব গন্ধ খায়, যে ক’য়টি বিভিন্ন জল, তাদের বাদ দিলে বাকিরা কেবল কাঁথানকশী পারফিউম। যেমন এই বৃষ্টিতুতো মাটির গন্ধ, খুঁজতে হয়। এর মধ্যেই অজস্র শেলফে জ্বর রাখা। সে জ্বর বড় বেশী আসে না। ছোদ্দার খাতায় বড় করে আজকাল-এর ক্যালিগ্রাফী, তার পাশেই পুমা – একটি কালোচিতা লাফ দিচ্ছে সাদা খাতায়। ওই দুই-চারটি আডভেঞ্চারে-ই বারবার যাওয়া যায় দেখা যায় খুলে তাতে কেমন লালচে-খয়েরী গান সার বেঁধে চলেছে জাফরী-জাফরী ছোটবেলায়। আমার প্রথম দেখা পাগল ফুলন, এমনকি ফুলনের-ও একটা গন্ধ ছিল। তার পিঁড়ি-পাতা রাজাভাতখাওয়ায় সে একাই থাকত। মাঝে মাঝে এসে বসত বাইরে, ওই রাজা
উজির - ই মারত ডানহাতে, আবার বাঁ - হাত গুটিয়ে নিত কল্পনা। পাগলামী সিঁড়িতে শুইয়ে সেও দীর্ঘকাল ছাতে উঠে গিয়েছে। তার ফেলে যাওয়া গন্ধসম্পত্তি – সেইসব আমাদের-ই সন্ধ্যা, ইঁটবারান্দা, সুলভপঙ্কিল স্মৃতিচারণ।
গন্ধের দোহাই দিয়ে একটি প্রায়ান্ধকার খুলে বসা, সে-ও তো ইচ্ছের আকছার। আমার মত দশ বছুরের কাছে আনন্দবাজারের গন্ধ মানে একের পর এক রবিবাসরীয় প্রচ্ছদকাহিনী। মাই ফিউডাল লর্ড, অনুপ রায়ের আঁকা নীরদ সি-র প্রতিকৃতি, একটা বিরাট পাতাজোড়া ধেনো, গাঁজা - প্রসূত জোক্‌স আর লেডিকেনী-র ল। এও ৯-এর, খালি এতদিন বাদে তার প্রেস বদলে গিয়েছে।
গন্ধের সম্বল মানে প্রথম ড্রয়িং বুক, অয়েল প্যাস্টেল - সহ নটরাজ রাবার আর পেন্সিলের – যেন ঘষে ঘষে স্লেটে নির্বাসিত মেঝেগুলি একসঙ্গে হাঁস, তারপরে উড়তে উড়তে নেমে এল গ্রাফাইটের মুখে। প্রসঙ্গতঃ এই গুড় জন্মাবধি গরুর দুধে বালি তাই তার জন্য মুখ-নীচু কৌটোয় এসে গিয়েছিল গুড়ো সোয়াবিন। একটা পোড়া গন্ধ কাঁচের - অভাবে -স্টেনলেস স্টিলের গ্লাসেও স্পাইরালি পাক খেয়ে উঠত। ওই গন্ধের আকার ধোঁয়ার মত, এই সদ্য জেনে ফেললাম ও ক্যারামেলাইজড পটাশিয়াম ল্যাকটেট – আমার শেষ খাওয়া দুধ। সবচেয়ে দূরের গন্ধ সে-ই, একেবারে কাছের থেকে চোখ পিট পিট করছে স্বপ্নে।
স্বপ্নের গন্ধের খুব কাছাকাছি থাকত লাল ইণ্ডিকেটরের ঝুলকালি, হঠাৎ স্বপ্ন আইলিড টেনে ধরলে সে-ই দিয়ে যেত এককালীন মহাভয়। আর সকালের গন্ধ পামোলিভ সাবান, লম্বা সরু ট্যালকমের চোঙা। তখনও তার তলায় ঘামের গন্ধ কিশোর নয়, সদ্য শৈশবের। এক শৈশব কাদামাখা তো রইল-ই, পূজোর আগে ভেজা মাঠে পেকে ওঠা বাদামী সুবাস, হাঁটুর ছাল কোন গোপন স্ফটিকের টুকরো দাঁতে কাটলে লাল ওষুধের। নখ বাড়তে বাড়তে নখকুনি যেন কল্যানী থেকে হেঁটে আসা বাবার পা – তাতে কালেভদ্রে সোপ্রামায়োসিন, ট্রেন থেকে আরোও কালেভদ্রে বিষহরির গন্ধ।
বিষহরি একটি নস্টালজিয়ার নাম। সে নস্টালজিয়ার গন্ধ ট্রেন, মুখ নীচু করে হাঁটছে অজস্র হরিন। কয়েকটি এগিয়ে গিয়ে চাকা হয়ে গিয়েছে, কিছু ধীর তাই কামরা, কামরায় বসাদাড়ানো মানুষ। মানুষের হাতে কাঁচাপেঁয়াজের গন্ধচর্চিত ঘুগনী। এইভাবে শুঁকতে শুঁকতে স্টেশন। স্টেশনে এলেই বড় যৌবন ঝাঁপিয়ে পড়ে ছলাৎ করে। ঘাম বড় হয়ে যায়, কলারে নোংরা জমে। রাতবিরেতে প্যান্টে জমে ওঠে আঠালো ভূত ও ভূতের রক্ত। সে রক্ত গন্ধহীন বর্ণহীন নানান স্বপ্ন, চেনা অচেনা নারীমুখ মুখ গুঁজে পড়ে রয়েছে বুকে। বুক শক্ত হয়, রোম হয়, মেজাজ অপার্থিব ফর্মে দলা পাকিয়ে সাইরেন বাজায় প্রতিটি কথায়। বড় হওয়ার মানে – কবিতা !
প্রথম কেনা কবিতার বইএর গন্ধ সবার হারিয়ে যায়। প্রথম কেনা কবিতার বই হামেশাই পুরনো, কোণ দোমড়ানো, এক বা একাধিক লাইব্রেরী-সুহৃদের হাতফেরতা। পাতার গায়ে বেরনো ক্যাকটাস, কবিতার নীচে নীচে পেন্সিলের দাগ, রাতভোর ইলাস্ট্রেশন। কবিতারা নিজেদের রাত্রে লেখে, সকালে কবির রক্ষিতা হয়ে যায়। কবিতাদের থেকে দূরে থাকে কিশোর কবি। হঠাৎ হঠাৎ খইএর মত উড়ে এসে পড়ে তাদের দরজায়। কবিতা দরজা খুলছে তার দৃষ্টি যেন মা, পায়ে আলতা, আলতারও তো ব্যাজস্তুতি গন্ধ ! গোটা গোটা শব্দ লেখাই আসন্ন কবিতাদের শ্রেষ্ঠ ওয়রশিপ। যেসব ফুল মনে আছে, তাদের গন্ধ - ও আসলে গন্ধ নয়। হয়তো রঙ, ক্কচিৎ সন্ধ্যা, মোটা দাগের গদ্য ইঞ্জীনয়ারিং ম্যাথসের পাতা উলটে আটকানো।
দেওয়াল আমাদের দেওয়াল নয়, রেজ ও আলকোহলিজমের সম্পত্তি। সে মদ যে মদ খাওয়া হবে না কোনোদিন। খেলেও তার তৃষ্ণা অস্পৃশ্য থেকে যাবে। জানি প্রকট টালটামাল হয়ে লেখা হবে না কখনো, মার্কেজ বলছেন লেখার জন্য তোমাকে খুব ভালো মানসিক এবং শারীরিক অবস্থায় থাকতে হবে। এ শরীর সে নেশামানসকে ছুঁলো তাও তো কতবচ্ছর পরে। সেই প্রথম গোল্ড ফ্লেক আর ভদকা – গন্ধদু’টি চেনা সতীন আস্তিন থেকে উঁকি দেবে না আর। লেখা এলে রাম খাব, রাম খেলে লেখা চলে যাবে। পাকস্থলী বাজি রেখে ট্যুইস্টার খেলতে খেলতে এ ওর দিকে তাকাব আর হাতে হাতে ঘুরবে ইঞ্চিটাক ছাই। বিশ্বাস করুন, গাঁজার গন্ধ শুকনো পাতার থেকে বেশী পুরনো বা নতুন। এমনিতে রাত-হয়ে-যাওয়া শীতকালের-ও যেমন ডিমফোটা গন্ধ থাকে।
তারপরের গন্ধগুলি নির্বাসনের, অনির্বচনীয়ের, নির্বংশ নির্বাচনের। বিছানার আত্মায় আত্মায় কুণ্ডলী পাকিয়ে পড়ে থাকা একমানুষ ক্রমঃমৃত্যু ! সে প্রায়ই গলায় দড়ি পড়িয়ে নিজেকে আয়নায় দ্যাখে ! কখনো ঠোটের দু’পাশ দিয়ে ফেণা আঁকতে থাকে সে ফেণা কতদূর নাকি কতদূর। এসব নানান সিনেমা সে খুলে বসে । আবার ছোটবেলার চেনা ভয় এসে তার এই কবজি ওই কবজি হয়ে ইভেঞ্চুয়ালি পা - থেকে - মাথা দোকানে খুলে বসে ! মোট কথা সে পারে না, তার চিমনী মনে পড়ে যায়। ছোট্ট দু’টি ছেলেমেয়ে মশার উৎপাত সরিয়ে বসেছে তাদের চারপাশে অনেক পড়া কিছু হয়েছে কিছু হওয়া ঢের বাকি। ছেলেটি চিমনীর কাঁচে কালি পড়া দেখছে আর ভাবছে ফর্সা আর সাদার একটাই বিপরীতার্থক কেন ! ফরসা তার প্রলাপ পাত্তাও দিচ্ছে না। সাদা খুঁজছে একটা পোড়া চামড়া যেখানে সে জাঁকিয়ে বসতে পারে। প্রচুর কৌতুহলে পুড়ে ছেলেটির আর ফর্সা হওয়া হল না, তার খাতাও সাদা রইল না কখনোও।