হারানো স্বাদ

সুপ্রিয় মিত্র


শুরু করতে পারছিনা...
যে ক্লান্তির রেশ আর এক শুরুয়াত রচনা করে,
সে আজ জেনেবুঝে আচ্ছন্ন করে রেখেছে... শুধু জেনে রেখো, এই লেখা তোমাদেরপরিচিত কলম লেখেনি... সারাদিন সারারাত কোনঠাসা ক'রে এক আড়ষ্ট জিভ লিখতেবসেছে...
তুমি যদি প্রশ্ন করো - আড়ষ্ট কেন?
আমি বলব - এক ছায়া তারে রেখেছে বাঁধিয়া... 'হারানো' শব্দের আশেপাশে যে ছায়া কে দেখতে পাওয়া যায়...
জিভ, লেখা শুরু করতেই পারছেনা, কারন, এই ঘুরিয়েপেঁচিয়ে অক্ষর লেখায় তারযেসব কারুকাজ দরকার, সে সমস্ত একলব্য দিন তার মনে পড়ে যাচ্ছে... কাচ ঘষা সেসবের দিন... মায়ের বুক শুষে বেঁচে থাকার তিন - চারটে বছর... শুধু মনে নেই, খিদে তাকে কিভাবে শেখালো... কেমন ছিল সেই হলুদ দুধের স্বাদ...
সেই খোঁজে, একজোড়া পায়রার সদাগর পথ বিছিয়ে দিল যেখানে শস্য ও দানার পসার...
গালিচা শেষ হওয়ার মুখে সদাগর বললেন - হল না... হল না... এ অদৃশ্যকৃষ্ণগহ্বর, প্রলয়-পরবর্তী মুগ্ধতা... তুমি যাও... ফিরে যাও , এখানেপদ্মকাঁটা শুধু...
জিভ অনুনয় করে বলেছিল - সকাল আসুক... পদ্ম ফুটতে দেরী হয়... ক্ষতি নেই...
-তুমি ফিরে যাও... অন্ধকারের জল গড়িয়ে গিয়েছে অনেকটা দূর... ওখানেই রাখা আছে
হয়তো বা মাড়িয়ে আসা শিশির...
আহা, মুক্তো, কেঁদো না...
সে প্রথম কারুকাজ - চূড়ান্ত সফল ছিল কিনা ,তা আমায় খেয়াল রাখতে হচ্ছে... বরং,
ঐ শামুকের ভেতর পেলব বৃন্ত হয়েই থাকো ।
সমস্ত ডুবুরির জিভ এই স্বাদ সন্ধানে এসে , যেন সশরীরে ফেরেনাকো আর...
'সশরীরে' শব্দের অভিশাপ দিয়ে এতক্ষণে জিভ আড়ষ্টতা কাটিয়ে উঠেছে অনেকখানি।অথচ বৃন্তের অনতিদূরে যার নিঃসঙ্গ হাভেলী তাকে সে কিভাবে বা আনবে ছিনিয়ে...কত প্রজাতির চুম্বন তাতে বাঁধা... কী বিশাল তার প্রসার ! কোন ঋণ আগে মিটিয়ে নেবার দাবী রাখে... জন্মের প্রথম চুম্বন নাকি প্রথম চুম্বনের জন্ম ? সে বিরোধ যেন সুদীর্ঘ এক ছায়াবৃত্ত... এক মুখ আলো করে ঠোঁট বাড়িয়ে দেওয়াআর সেইবহু অপেক্ষার অন্ধকারে যে ঠোঁট ভিজিয়ে গেছিল বিপুল রুদ্ধ চৌকাঠ...কাকে তুমি হারালে প্রথমে ?
প্রশ্ন চলতে থাকে... উত্তর এক পা দু'পা এগোয় আবার নতুন প্রশ্নে পিছিয়ে যায় দশ পনেরো হাত...
হে পীড়ন , তুমি যাকে সহজে ধরা দাও, তার কথা বলবে না...?
জিভ আলতো স্বরে বলে- সে নোনা স্বাদ আমি গিলতে পারিনি... কত কান্না যায় আসে...
অথচ -
বাবার তর্জনী লক্ষ্য করে একঝাঁক অবিমিশ্র জোনাকির মাঝে সপ্তর্ষীমণ্ডল এরসাথে প্রথম আলাপ... সেই মুলাকাতে ছলছলে চোখ ,তার আর পাত্তা নেই…
এক আকাশ ছাদে দাঁড়িয়ে সদ্য পিতৃবিয়োগে নিস্তব্ধ এক বাবা তার ছেলে কে বলছে -আমাদের সমস্ত দুঃখ ওর প্রশ্নের কাছে ফিকে হয়ে যায়... তারপর ঐ ছোট্ট দুটিহাতে এতখানি মুখ ঢেকে বাবা কে আমি প্রথম কাঁদতে দেখলাম... সেই নোনাজল, আজও , সেবা করে আসে... জড়তার হাত মুছে দেয়...
খুব কষ্ট লিখতে বসে, যখন ঘামে জড়িয়ে যায় আঙুল , তুমি তাদের ফাঁক করে আকাশের দিকে ছুঁড়তে দেখেছ প্রায়ই... অথচ , যার জন্যে এত কিছু, সেই মণ্ডল বাবু আর সাড়া দেয়না সেদিনের মতো... বাবাও যেমন চুপচাপ হয়ে গেছে... আমি সেই অভিসন্ধি বুঝি... বলতেপারিনা।
কতবার সেসব লিখব বলে বসেছিলাম... হাতের উল্টিয়ে ভাগ্যরেখা দেখবার ছলনে, মহাকাল চেটোয়গেঁথে দিয়ে চলে গেছে কলম... আমার একমাত্র বান্ধবী ছুটিনেবার আগে বলে যেত- এরা বদ...
ভয়ে ডেটল দিয়ে ধুয়ে নিতাম ক্ষতের রক্ত... একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি বছর ধরে চলতে থাকল...
তারপর সেদিন... আমি আর ধুলাম না হাত... সমস্ত পুঁজ বইতে বইতে কাগজের পাতায় যে ছবি তৈরি হল শেষে,- সে ই আমার কাছে প্রথম কবিতা...
"যা কিছু লিখছ, সকলেই ছেড়ে যাবে...
যে এসে লিখিয়ে নেয়,
সেও কবে ছিল বা তোমার...বরং, এসো সওদা করি
পরজন্মের প্রশ্ন গোলা জল ,
মৃত্যু নিকটে এলে,
কার মুখে ছিটিয়ে বলবে- ওঠো !
আমাদের নিকটতম
সপ্তর্ষী মণ্ডল। "
সেই কান্না - সেই মুক্তি - সেই তিস্তার মতো খরস্রোতা অনুভূতির স্বাদ আর কখনোআসেনি আমার কাছে। তার আগের যা কিছু আমি ভুলে গেছি বেমালুম... পরের কেউ কেউ
ধরা দিয়েও বলেছে- ছাড়ো ! লাগছে ...
এই শোক আমি ভুলতে না পেরে সিগারেট সহযোগে মুখাগ্নির নেট প্র্যাকটিস করা শিখেছি... গৌতম দার ঘরে গিয়ে উঁকিঝুঁকি, কখনো বা ঝুঁকিপূর্ণ উঁকি মেরে কোনে কানেখুঁজতে গেছি ঝাড়ু দিয়ে সরিয়ে রাখা এক - দুটো শোক পড়ে আছে কিনা... আমিতো পাইনি খুঁজে... সুসজ্জিত মিষ্টি মুখে ফিরেই এসেছি বারবার... লোকের বানানো চাবি চুষে, আকাঙ্খিত দরজার তালা খোলাবার স্বাদ মেপে নিয়েছি...ঝেঁপে নিয়েছি কখনো বা প্রতিবেশী কাকিমার লাগানো গাছের পেয়ারা... ঈশ্বর মাঝেসাঝেই মাথা ঝুঁকে কাঁচকলা দেখিয়ে চলেছেন...এই সমস্ত টেস্ট করে নেওয়ায় নাকি কিছু শতাংশ আয়রন আছে... অথচ তারা কেউই সেদিনের রক্তঝরার মতো নয়...
ক্রমশ সময়ের জিভ বেরিয়ে আসছে... এ কথা লিখছি কারন - জন্ম কে দায়ী না করে, মৃত্যুকে দোষ না দিয়েও, আমি, এইভাবে অমরত্বের স্বাদ মেপে নিতে শিখে গেছি...
সেসব উপোষের অপেক্ষায় থাকি, যেখানে মা তরকারির কড়া থেকে খুন্তি তুলে একফোঁটা ঝোল আমার মুখে ঠেকিয়ে বলছে-
"দেখ তো, ঠিক আছে কিনা! "
বইমেলায় পাঁচ মিনিটের লোডশেডিং এ স্টারমার্কের বুকস্টলে কয়েক হাজার বইয়েরমাঝে প্রেমিকার ঠোঁটের ভেতর অটোগ্রাফ দিচ্ছি... আমার কবিতার ডাই হার্ডফ্যান... আমায় চাক্ষুস দেখে কাঁপছে...
প্রিয়জন কে শশ্মানমোড়ে টাটা করে মুখ ফিরিয়ে দেখে নিচ্ছিবাড়িয়ে দেওয়া হাতে কোনো মায়া লেগে আছে কিনা!
জিভ এতদূর লিখে সময়ের কাছে মুখ থুবড়ে পড়ল... আমি কলম তুললাম -
জবানী লিখছি... সে আমায় আস্তে আস্তে বলছে... -
আমি কোনো ঈশ্বর নই... নকুলদানা আমার অতিরিক্ত মিষ্টি লাগে খেতে... এটুকু সমতল মগজে স্মৃতিশক্তি বড়ই কম... আরও কমে গেছে- সমস্ত কোরকে কয়েক লক্ষস্বাদের প্রলেপ... কেউ যদি পুরনো স্মৃতি উস্কে দেওয়ার চেষ্টা করে, মনরাখতে বলি - আহা... সে স্বাদ এখনো লেগে আছে...
তারপরও যদি চেপে ধরেকেউ, আমি সেই কারুকাজ মনে ক'রে শোক - সন্তাপ করব... তোমাদের ভুলিয়ে-ভালিয়ে, যে ছায়া পিষেচেপ্টে দিচ্ছে আমায়, তার বাসে উঠিয়ে দেব মধ্যরাতের শহরতলি বুকে... সে তোমাদের প্রতিশ্রুতি দেবে কোনো দূর্ঘটনা না ঘটিয়ে পুরানো বাসায় নিয়ে যাবার...
সময় পেরিয়ে যাবে , বারবার ঘুরে ঘুরে আসবে স্টপেজ... মাতৃ সংঘ, শশ্মান মোড়, লাল পাড়া, জোড়া দীঘি... তোমরা তবু নামতে পারছ না...
তোমরা একে অপরের কাছে শান্ত হয়ে বসে আছ।
হাত ঘষছ... অতীত জ্বরে কাঁপছে হুহু করে...
লুকিং গ্লাসে ঝুলন্ত মা কালীর জিভ। তোমাদের অজান্তেই তোমরা নিপুণভাবে সম্মোহিত... তোমাদের সবার মুখে আমার বাবার প্রতিকৃতি...
ছায়াবাসের ভেতর 'মালের দায়িত্ব আরোহীর' স্থানে লেখা - 'সে স্বাদ এখনো লেগেআছে' , দেখে, তোমরা অন্য কিছু বুঝে অজান্তেই আরো গভীর হারানো স্বাদের ডেরায়পৌঁছে যাওয়ার লক্ষ্যে মনে করার
চেষ্টা করছ – গতজন্মের অন্তিমসজ্জায় ঠোঁটের কোনায় লেগে থাকা ঘি এর স্বাদ ...
সে কেমন ছিল !
সে এখন কেমন হয়েছে খেতে...