হারানো স্পর্শের ডায়েরী ...

মিলন চট্টোপাধ্যায়


অনেকক্ষণ ডেকে যাচ্ছে নীলু । এই আলতো শীতের সকালে যখন নরম রোদ এসে পড়েছে পায়ের ওপর, রেডিওতে বাজছে প্রাত্যহিকী তখন এই চেল্লানি সহ্য হয় না । তবু উঠতেই হল । কেউ না এলে এই সাত সকালে নীলু বাড়ি মাথায় তুলত না । আড়মোড়া ভেঙে উঠতে উঠতে বে-রসিক অতিথিকে শাপ-শাপান্ত করতে লাগলুম । তারপর নীলুকে বললুম- এবার তোকে ছেড়েই দেব ব্যাটা । জবাবে পাহাড়ি টিয়া মাথাটা অদ্ভুতভাবে নাড়িয়ে বলল -'পড়তে বোসো খোকন !' জিভ ভেংচে দৌড়ে দরজা খুলেই দেখি ছোটমামা । মনটা ভালো হয়ে গেল । আমার সব কথার সঙ্গী, আমার প্রতিটা কথাই মন দিয়ে শোনে এমন শ্রোতা এসে গেছে। মামা আমার চুলটা ঘেঁটে দিয়ে বলল- আজ তো ছুটি। আজ তোকে বাঁশ দিয়ে ফুলদানী বানানো শেখাবো ।
মা ততক্ষণে এসে গেছে, মা বলে উঠলো- আজ লুচি, বেগুনভাজা করবো। খেয়ে যাস।
কিছুক্ষণ বাদে আলতো হাতে বাঁশের গোড়ায় নকশা আঁকতে আঁকতে বললুম - এটা কি হবে ? মামা বলল - 'এবার বার্ণিশ লাগিয়ে শুকিয়ে গেলেই চমৎকার ফুলদানী হয়ে যাবে । বাগান থেকে যখন বাহারি গাছের ডাল ছাঁটা হবে তখন এনে রাখবি এতে । আসলে এটা শাখাদান বলা যায় । শাখা মানে তো জানিসই ।'
এরপর মামা আরেকদিন এল । সেও এক শীতের দুপুর । আমাকে সব ক্যাসেট, রঙ, তুলি দিয়ে বলল - 'নে ।' বললাম- 'আমাকে কেন দিচ্ছ ? তুমি আঁকবে না ? গান শুনবে না ?' মামা বলল - 'আমি তোর ভেতরেই থাকি !' নীলু ঠিক তক্ষুনি বলে উঠল-'ও ও । খেতে বোসো ।'

কাট্‌ -

বাবার কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছি । ছুটির দিন হলেই বাবা শোনাতেন মঙ্গলকাব্য , জসিমুদ্দিন, জীবনানন্দ, সুকুমার । বুঝতে পারতাম - আমাকে শোনাবার নাম করে আসলে বাবা নিজেই পড়ছেন, ডুবে যাচ্ছেন আখর সমুদ্রে । আমি এদিকে বলছি - মাথায় পোকা হয়েছে বাবা ! আসলে চাইছি - বাবা যেন মাথা চুলকে দেয় । একটু হেসে বাবা চুলে বিলি কেটে দিচ্ছে । সর্ষের ঝাঁঝালো তেল মাখিয়ে চান করিয়ে দিয়েছে কতদিন ।

কাট্‌ -

একটি সর্বভারতীয় পরীক্ষায় পুরস্কার পেয়েছি । বিচারকরা বলেছেন - আমার জলরং নাকি খুবই সম্ভবনাময় ! বাড়িতে মায়ের মুখ গর্জন তেল মাখানো ঠাকুরের মত উজ্জ্বল । বাবা মাংস এনেছে । আমাদের নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে তো খুশীর দিন খুব বেশী আসে না । বাবার খুব ইচ্ছে বাড়িতে লোকজন গমগম করুক । যদিও এককালের বিখ্যাত চ্যাটুজ্জ্যে পরিবারের সে ক্ষমতাও আর নেই । আমি বাড়িময় ঘুরে বেড়াচ্ছি । নাকে আসছে মাংস কষানোর দুর্দান্ত গন্ধ । অনন্যা এসেছে । আমার একহাতে সদ্য কেনা দয়ালের আট নম্বর তুলি অন্যহাতে সদ্য কিশোরীর ঘেমে যাওয়া হাত ।

কাট্‌ -

মাথায় অসহ্য যন্ত্রণা । প্রচণ্ড জ্বর । ঠাণ্ডা জলের পটি দিচ্ছে মা । মাঝে মাঝে হাত বোলাচ্ছে মাথায় । জ্বরের ঘোরেই আবছা দেখতে পাচ্ছি দিগন্ত বিস্তৃত সর্ষের খেত । সেখানে দৌড়াচ্ছি মায়ের হাত ছাড়িয়ে । মা বলছে - 'আস্তে ছোট্‌ । পড়ে যাবি যে ।'

কাট্‌ -

বাঘাকে এনেছিল বাবা । এক বিরাট জার্মান শেপার্ড । গা ভর্তি লোম । বাঘের মত প্রায়, তাই বাঘা । বাড়িতে বিদেশী নাম রাখায় আপত্তি ছিল বলেই আমার দেওয়া টাইগার হেরে গিয়ে বাঘা প্রতিষ্ঠিত হল । যত রাতই হোক, বাড়ি ফিরলেই বাঘা এসে পা তুলে দিত মাজায় । হাত চেটে দিত । মাথায় হাত বুলিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত সঙ্গ ছাড়তো না । কৈশোরে আমার প্রিয়তম সঙ্গী ছিল বাঘা । আমার কান্না, হাসি, ভয়, রাগ সবকিছুর একমাত্র সাক্ষী । নেহাত কুকুর নয়, ভাইয়ের মতো ছিল বাঘা ।


কাট্‌ -

যৌবনে একটা লাল টকটকে চামড়ার বল হাতে নিলেই ভেতরে জেগে উঠত না পাওয়ার জ্বালা । সব অপমানের জবাব দেওয়ার জন্যই যেন হাতে নিতাম তাকে । ট্রাউজারে সামান্য ঘষে নিয়ে সোজা সিমের বাঁদিকে আড়াআড়ি আঙুল রেখে দৌড় শুরু করতাম । রিলিজ করার আগে সামান্য ঝুঁকে মসৃণভাবে ছেড়ে দিতাম । লেগকাটারে ব্যাট ছুঁয়ে গেলেই সে দ্বিতীয় স্লিপের তালুবন্দী হোতো ।

কাট্‌-

উচ্চমাধ্যমিক সবে শেষ হয়েছে । রেজাল্ট বেরোতে ঢের দেরী । তখন বেশ দেরী করেই রেজাল্ট বেরত আর আমাদের এখনকার মতো পরীক্ষা শেষ হলেই আবার পড়া শুরু করার এতো লাফালাফি ছিলোনা । পরীক্ষা শেষ আর রেজাল্ট বেরোনোর মাঝখানের সময়টাই ছিল আমাদের বড় হবার সময় । তখন না ছিল মোবাইল , না ছিল ইন্টারনেট । মেয়েদের দেখতাম আর মনে মনে হাস্যকর সব কল্পনা করতাম । কোনও বন্ধু যদি কোনও বান্ধবীর হাত ধরত তাহলে সেই অনারে আমাদের খাওয়াতে হত ।সেটাই ছিল রাজ্যজয় !
আমাদের এক বন্ধু ছিল তার নাম সুপ্রতীপ । এতো বড় মনের ছেলে কমই দেখেছি । সারাদিন আমাদের বাড়িতে প্রায় তিরিশ - চল্লিশ জন বন্ধু থাকতো । কিন্তু বড় হতে গেলে যে রকম জায়গা দরকার সেটা একটু চাপের ছিল । সুপ্র'র বাবা,মা দুজনেই চাকরি করতেন । ফলে বেলা এগারোটা থেকে চারটে পর্যন্ত আমরা বড় হওয়ার সুযোগ পেতাম ( ছুটির দিন বাদে ) । এইরকমই এক সোমবার ওর বাড়িতে গেছি । সবাই যে যার মত টাকা জমিয়েছে স্যারের পয়সা মেরে বা টিউশনি করে, বড় হবে বলে ! তো গিয়ে শুরু হল টোয়েন্তি নাইন খেলা। আমি প্রায় কুড়ি - বাইশ রকম তাসের খেলা জানতাম । কিন্তু বাকিরা সব খেলা জানত না ফলে ' যস্মিন দেশে যদাচার' । খেলতে খেলতে বললাম যা বিয়ার নিয়ে আয় । ছয়- সাত জন ছিলাম । তিনজন বিয়ার আনতে গেল একটা বাজারের ব্যাগ নিয়ে । বাকি দু জনকে সুপ্র বলল ' বিয়ার খাবো কি দিয়ে ? যা কিছু নিয়ে আয় । তো ওরা বলল যে টাকা আছে তাতে কেজি খানেক শশা আর দু’প্যাকেট বাদাম হবে। বললাম ' তাই আনা মারাও, প্যাঁদাতে তো হবে।' ওরা যাওয়ার পর আমি সুপ্রকে বললাম 'ভাই তোদের গাছে বেশ ডাব হয়েছে তো ।'ও বলল 'শালা শকুন, ঠিক দেখা হয়ে গেছে !' আমি বললাম-‘ভাই এটা ঠিক না, শকুন বলিস নে, আমার বাড়ির অর্ধেক খাবার শালা তুই খাস , আমি কি তোকে রাক্ষস বলি ?' সুপ্র বলল -'তবে আর কি, পেড়ে ফেল।'
পাড়লুম গোটা চারেক । তারপর দুইভাই মিলে টেনে দিলাম । এতই বোকা ছিলাম তখন যে ভাবলাম, আমাদের বেশী নেশা হবে । যাইহোক, ডাব খাওয়ার পর মনে হল বাকিগুলোকে একটু মাছি করতে হবে । তখন সুপ্র বলল,--'মিলন আয় আমরা দুজনে ডাবের ভিতর মুতে, খোলা দিয়ে ঢাকা দিয়ে রেখে দি খাটের নীচে ।' তাই করলুম ।
কিছুক্ষণ পড়ে সবাই এলো , লোধ আর সৌরভ ( জয় গোস্বামীর তুতো ভাইপো ) এসেই দেখেছে ডাবের কাটা খোলা । বলল - শালা, হারামিরা, এতো কষ্ট করে মাল নিয়ে এলাম ! আর ডাব খেয়েছিস ? দে শালা, ডাব দে । নাহলে আজ কুরুক্ষেত্র হবে বলে দিচ্ছি । আমরা গোবেচারা মুখে বললাম-'মাইরি বলছি ,খাইনি ' । শুনে ওরা খুঁজতে আরম্ভ করলো । তারপর যথারীতি খুঁজে পেয়ে বলল- 'এটা কি রে ? তোদের বাবার ...... ?' আমরা চুপ করে থাকলাম । আর ওরা সেই অমৃত সোনামুখ করে খেল । খাওয়ার পর সৌরভ বলল-'মালটা একদম কচি , ঝাঁজ আছে' । তারপর বিয়ার খেয়ে গিয়ারে গিয়ারে সুপ্র আসল কথাটা ফাঁস করে দিল ।ওরা আমাদের সেদিন এতো খিস্তি দিয়েছিলো যে আজও ঘুমের ঘোরে দাঁত ক্যালাই । আমাকে এমন তাড়া করেছিল যে আজও হাঁফাই ।

কাট্‌ -

কোলকাতার দক্ষিণ অংশে এক অভিজাত পরিবারের বধূ প্রথম চেনালো শরীর । সেই প্রথম বুঝলাম - শরীরের ভেতরেও আছে অন্য শরীর । প্রথম চুম্বন, প্রথম যৌনতা, প্রথম পাপ ! স্পর্শ দিয়েই আজও নির্ভুল চিনে নিতে পারবো সে শরীর ।

কাট্‌ -

প্রেমিকার সাথে প্রবল বৃষ্টিতে ভিজে যখন কাছে এসেছিলাম, সে বলেছিল - 'আমাকে আদর করো না কেন ?' বলেছিলাম - 'সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায় ঘরপোড়া গরু ।' সাড়ে তিনবছরে বহুবার ছুঁয়েছি তাকে । চুমু খেয়েছি অনন্তকাল । শরীরে যে কতটা পবিত্রতা থাকে বুঝেছিলাম তখনই ।

কাট্‌ -

মাস খানেক আগে বাইক নিয়ে যাওয়ার সময় এক ছাত্রী ডেকে দাঁড় করালো । তারপর কাছে এসে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলো । বললাম - 'কেমন আছিস ?' সে বলল - ' খুব ভালো আছি স্যার । ভাবছি কবিতা লিখবো । একটু দেখিয়ে দেবেন তো স্যার ?' হেসে মাথায় হাত রেখে বললাম -' কেন যেচে কষ্ট পাবি বাবু ?' সে একগাল হেসে বললো - 'ওটাই তো থেকে যায় স্যার!' বাড়ি ফিরে এলাম ।

■ যেদিন মামা ক্যাসেট দিয়েছিল সে দিন দুপুরেই খবর এসেছিল - মামা গলায় দড়ি দিয়ে মারা গেছে । খবরটা শুনে বোকার মত বসে ছিলাম ছাদের ওপর, ঠিক যেখানে কুলগাছটা একটা ছাতার মত ছায়া দেয় । গাছে সে সময় প্রচুর টিয়াপাখি, ক্যাঁচর-ম্যাচর । কিন্তু আমার কাছে চারপাশ কেমন স্তব্ধ হয়ে গেছিল ! কিছুদিন পরেই এক সকালে নীলু আর ডাকলো না । বলল না - 'পড়তে বোসো খোকন ।' খাঁচার সামনে গিয়ে দেখি - দুটো পা আকাশের দিকে তুলে চিৎ হয়ে মরে আছে নীলু । শক্ত । কটা পিঁপড়ে ঠোঁটের পাশ দিয়ে উঠে যাচ্ছে নির্বিকার । নীলুকে কুলগাছটার তলায় পুঁতেছিলাম । পুরনো গাছটা মরে গিয়ে সেখানে একটা নতুন কুলগাছ উঠেছে । সেই প্রথম জেনেছিলাম - এ জগতে থাকে না কিছুই ।
বহুদিন হয়ে গেছে । এখন মাঝে মাঝে চিলেকোঠায় গেলে দেখতে পাই জং ধরা শূন্য খাঁচা, ঘুণ ধরা শাখাদান এখনও রয়েছে পড়ে ! টেপরেকর্ডার নেই বলে ক্যাসেট বাজেনা, অবহেলায় পড়ে থাকেন - বড়ে গুলাম !

■ বাবার এখন অখণ্ড অবসর । চোখে ছানি পড়েছে । পড়া তো দূরের কথা, দুবার ব্রেইন স্ট্রোক হওয়ায় কথাও বলে না ভালো করে । তবু মা বলে - বাবা নাকি কবিতার বই নিয়ে মাঝে মাঝে হাত বোলায় ! খুব ইচ্ছে হয় বলি -' চুলের মধ্যে পোকা হয়েছে বাবা ।' অথবা - 'তেল মাখিয়ে চান করিয়ে দাও ।' বলা হয় না আর ।

■ ছবিও আকিনা । রং শুকিয়ে কাঠ । ক্ষয়ে গেছে তুলির মাথা । তবু হাতে নিই মাঝে মাঝে । ওরা যেন বলে - 'ভুলে গেলে !' অনন্যার বিয়ে হয়ে গেছে । তবু এখনও সরস্বতী পূজার দিন আনমনে হাতের ভেতর একটা ভেজা হাত টের পাই !

■ এখনও জ্বর হয় । মাথার যন্ত্রণায় প্যারাসিটামল খেয়ে শুয়ে পড়ি । মা'কে কিচ্ছু বলিনা । দশভুজার মত আমার মা এখন ভালোভাবে দাঁড়াতেও পারে না । অতিকষ্টে রান্না করে । চেষ্টা করে কি করে ভালো রাখবে পরিবার । বললে আজও জলপটি দেবে, রাত জেগে হাত বুলিয়ে দেবে মাথায় । কিন্তু মায়ের শরীর আরও খারাপ হোক তা চাইনা বলেই সেই স্পর্শ থেকে ইচ্ছাকৃত দূরত্ব বজায় রাখি ।

■ বাঘা মারা গেছে অনেকদিন আগে । এখন মনে পড়ে খুব । সেই চেনা স্পর্শের জন্য বারবার জার্মান শেপার্ড দেখলেই এগিয়ে যাই । কামড়ও খেয়েছি । রাত হলে বাড়ি ফেরার সময় মুচড়ে ওঠে বুক । বাঘা আর কোনোদিন আমার কোমরে পা তুলে দেবে না, চেটে দেবেনা হাত ।

■ বল করার সময় কবজিতে চোট লাগার পর আজকাল লিখতে বসলেও টানা লিখতে পারিনা । ফুলে যায় হাত । তবু কোনো কোনো শীতের দুপুরে চূর্ণীর পাশে বড়বাজার মাঠে গেলে খুব ইচ্ছে হয় হাতে নিই বল । আগের মতই না পাওয়ার জ্বালা ঢেলে দিই বিষাক্ত লেগকাটারে ! একদিন চেষ্টাও করেছিলাম । ব্যাটস্‌ম্যান অনায়াসে একস্টেপ এগিয়ে কভারের বুক চিরে সাবলীল ড্রাইভ করায় বুঝলাম - বেঁচে নেই আর ! এখন চুপ করে বসে খেলা দেখি । যদি পরিচিত কেউ এসে আলোচনা করে - কতটা ওপেন চেস্টেড হলে নিখুঁত হবে আউটসুইং; থামিয়ে দিই । যা গেছে তাকে আর না ডাকাই ভালো । এখন লাল বল দেখলেই, আমার এক পরাজিত যুবককে মনে পড়ে ।


■ সুপ্র পরের বছর ১৪ ই ফেব্রুয়ারী, কটক থেকে ফেরার পথে ট্রেন অ্যাকসিডেন্টে মারা যায়। আমরা সবাই ওকে পুড়িয়েছি। ওর শেষ চিঠিটা যেটা ও মারা যাওয়ার আগের দিন পেয়েছিলাম, ওর বাড়িতে ফেলে পালিয়ে এসেছিলাম । সব বন্ধুরা আজ বাইরে থাকে । একা আমি আজও ওর বাড়ির সামনের রাস্তাটায় যেতে গেলে কেঁদে ফেলি ।
একা কুম্ভ হয়ে আমি তোদের গড় আগলাচ্ছি । সুপ্র'র কথা মনে পড়ছে খুব । অনেক দিন পর আজ কাঁদছি ।
দেখা হবে আবার সুপ্র । একটা ঝাক্কাশ জায়গা দেখে রাখ । টোয়েণ্টি নাইন খেলবো বসে ।


■ প্রথম শরীর চেনানো নারী এখন সুখী গৃহকোণে টবের তুলসী গাছে জল দেয় স্বামী-সন্তানের মঙ্গলকামনায় । আরও নতুন কিছুর আশা তার কমেনি এখনও । দর্পিত সিঁথিতে সৌভাগ্যের সিঁদুর জ্বলজ্বল করে । তবু রাগ নেই, অভিমানও না । জীবনের ধর্মই ভুলে যাওয়া । যার হাত ধরে মানুষ দাঁড়াতে শেখে, উঠে যায় সিঁড়ি বেয়ে; তাকে শেষ মুহূর্তে লাথি মেরে ফেলে দেওয়াই সমাজের দস্তুর । ভালো হোক তার । পরিবার সুখে থাক এটাই মনে হয় মাঝে সাঝে মনে এলে ।

■ প্রেমিকা যখন বুঝে যায় সামাজিক মশারী ঠিক তখনই সরে যায় । দিয়ে ফেলা কথা মনে রাখার কোনও বাধ্যবাধকতা সংহিতায় নেই ! অনাগত সন্তানের নাম পর্যন্ত ঠিক করে ফেলেছিল যে মেয়ে, যে সব ভুলে চেয়েছিল আমায় সেই সমাজকে মান্যতা দিয়ে প্রতারণার আশ্রয় নেয় । গভীর রাতে সে শোনাত সদ্য লেখা গল্প, কবিতা । তার ডায়েরীর প্রথম পাঠক, প্রথম সম্পাদক ছিলাম আমিই । এখনও রাত গভীর থেকে গভীরতর হলে তার গলা শোনার অপেক্ষায় থাকে নির্বোধ কান ! না, কোনো ইথার তরঙ্গে তার গলা আর শুনবো না । হয়তো দেখা হয়ে যাবে কোনোদিন শহরের ব্যস্ত রাস্তায় অথবা কোনো কবিতা সম্মেলনে । ঠোঁটে প্রতারিত চুমুর স্বাদ কাটাতে ধরিয়ে নেব গাঁজাভর্তি সিগারেট । হয়তো বা কবিতা না পড়েই চলে যাব কোনও মদের ঠেকে । নিশ্চিত জানি - সে সময় ঝিঁঝিঁ লাগবে শরীরে আমার !


■ কদিন আগে শুনলাম - ছাত্রীটি নাইট্রিক অ্যাসিড খেয়েছে । বাড়িতে জামা কাপড় রং হতো । সেখান থেকে একগ্লাস খেয়ে নিয়েছে । উঠোন পর্যন্ত দৌড়ে যেতে পেরেছিল সেই কবিতা লিখতে চাওয়া মেয়েটি ! তারপরই ...
আমার পায়ে আজও তার স্পর্শ লেগে আছে । আমার হাত এখনও যেন একমাথা রেশমি চুল ছুঁয়ে রেখেছে ! সেও তো আমারই সন্তান । সন্তান হারানো পিতার মতই আমার অনুভবে তার স্পর্শ রয়ে যাবে আজীবন ।

এই লেখা লেখার ক্ষমতা আমার আর নেই । দুটো দিন যে অসহ্য যন্ত্রণায় ডুবে আছি জানিনা কবে মুক্তি পাবো তার থেকে । নাকি আদৌ মুক্তিই চাই না ! যে সব স্পর্শ চিরকালের মত হারিয়ে গেছে তাকে ভাষা দেওয়ার শক্তি আমার কলমের নেই । প্রচণ্ড দুপুর, হিমেল বিকেল, বিষণ্ণ সন্ধ্যা আর গহীন রাতে এইসব হারানো স্পর্শ এসে হানা দেয় । হাজার লোকের মাঝে থাকলেও ক্রমশ একলা হই আমি । বুক থেকে মাথা পর্যন্ত একটা নাম না জানা মন কেমন ঢুকে পড়ে ! আমি শেষ বিকেলে লেবু পাতায় পড়া রোদ্দুরের মত ক্রমশ মরচে ধরে, স্তব্ধ হয়ে যাই । কানে ভেসে আসে -"খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কম্‌নে আসে যায়..."