হেমন্তের ৯নেটোরিয়ামে একা এবং কয়েকজন

তমাল রায়


ন্যাসপাতি এসেছিলো আমার সাথে দেখা করতে । তারপর থেকে আমার সকালটাও কেমন যেন গাঢ় হলুদ হয়ে গেলো । ওইদিকে যে তিরিক্ষি গাছটা কেমন একটা বিরক্তি নিয়ে যেন ওপরে উঠে গেছে সোজা , ওখানে একটা পাখী ডাকছে – ‘খবর পড়ছি দেবদুলাল বন্দোপাধ্যায়’ । ধুর এ আবার কেমন পাখীর ডাক । পাশ থেকে কে যেন বললো – হয় , কেন হবেনা । ওর নাম রেডিও । আমি কিছু বলিনি । হাঁটতে শুরু করেছি , ওমা দেখি কালো কোলো একটা কুকুর আমার পাশে পাশে হাঁটছে । আমি থামলাম । সে ও থামলো । কি যেন বলতে চাইছে । আমি মাথা নামাতেই দেখি ভেতর থেকে গান ভেসে আসছে - গওহর জানের । এ আবার কি ? পাশ থেকে সেই বোকা অথচ ভ্যানিশ লোকটা বলে উঠলো - ওর নাম এল.পি । ওর মালিকের নাম ছিলো কলম্বিয়া রেকর্ডস । কি যে হচ্ছে , কে জানে ! সেই সকালে মা’র হাত ছাড়িয়ে যেই’না বেরিয়েছি এই সব কান্ডকারখানা । সামনের লাল রঙের রোয়াক দেখে বসতে গেছি দেখি সে বাজছে । ক্রিং ক্রিং ।এ আবার কি রে বাবা । বোকাটা যেন প্রম্পটার , বলে উঠলো - ল্যান্ড ফোন গো । - সে আবার রোয়াক হোলো কবে ? আমি হ্যালো বললাম । ওপার থেকে ফোন ধরলো-‘হ্যাঁ ,বলো বাবু আমি অ্যালবাম বলছি’ ।যা বাব্বা সেও আবার কথা বলে কবে থেকে ? - পাতা ওল্টাও । পাতা সে আবার কি করে ওল্টাবো ? ওই দ্যাখো – তোমাদের উঠোন , পরের পাতায় যাও – ছাদ , ওই যে চিলে কোঠা । ধুর ! কি যে বলো । রোয়াকে তো বসাই হোলোনা । পেছন ফিরেছি দেখি – দুজন দাঁড়িয়ে । কি চাই? প্রম্পটার লোকটা ফিসফিস করে বললো – বাঁ দিকের জন কবি । কিন্তু ওর একটাও কবিতা কোথাও ছাপা হয়নি । ও নিজে আর ওর কবিতা প্রতিদিন জ্বলেছে,আগুনে । - প্রতিদিন জ্বলা ব্যাপারটা ঠিক কি’গো ? আর পাশের জন ? ও উত্তর দিলো -ক্যান বন্দী ঋত্বিক। - মানে ? ‘তুমি জানো না ঋত্বিকের যত ছবি দিনের আলোয় তার থেকে অনেক বেশী তো অন্ধকারে । - তো’কি? তা নিয়ে আমি কি করবো ? পায়ের তলায় হঠাৎ দেখি জল । গভীর অথচ পরিষ্কার । ভয়ে লাফ মারতে যাওয়ার আগেই বোকা প্রম্পটার বলে উঠলো – ‘কুয়ো দেখে ভয় পাচ্ছো ? তোমার বাড়ীতে ছিলো না ?’ - ধুর ভয় পাবো কেনো ? পাশে যে জায়গায় পা রাখলাম সেটিও একটা জলের মত কি যেন । - ‘নদী গো’ । - তো নদী এইটুকু ? বোকা লোকটা বলছে – ‘যে নদী হারায়ে পথ চলিতে না পারে... তারপর কি ?’ আমি বললাম - ওসব ভেবে আমার কি হবে ? পাশে তাকাতেই দেখি ফ্যানটম এর মত কে যেন এসে আমার হাতটা ধরলো । আর ধাঁই করে আকাশে উঠে গেলাম । - এটা কি আকাশ ? বোকাটাও দেখি আমার সাথে উড়ছে । বলে – ‘এটা চিঠি বাবু তুমি কিছুই বোঝো না’ । - এই তুমি আমার ডাকনাম জানলে কি করে ? আর আকাশইবা চিঠি হবে কেন ? আর উত্তর নেই । বলে – ‘ নীচে তাকিয়ে দ্যাখো’ আমি বললাম –‘ কি?’ - ‘ওই দ্যাখো তোমাদের পাড়া । ওইখানে চন্ডীমন্ডপ । আড্ডা মারছে লোকজন’ - কই ? কই ? – ‘নীচে দ্যাখো , তোমরা সব খুড়তুতো ,জ্যাঠতুতোরা হাত ধরে ধরে বলছে
- এলাডিং বেলাডিং সইলো , কিসের খবর আইলো’। - কিসের খবর গো প্রম্পটার ? কিসের আবার –‘হেমন্ত জাগ্রত দ্বারে’ ।
- তাতে আমার কি ? – ‘এ আবার কেমন কথা গো । দ্যাখো না-কেমন পাতা ঝড়তে শুরু করেছে,ভিস্তিওয়ালা জল নিয়ে যাচ্ছে , কলের গান বাজছে , বায়োস্কোপ কাঁধে নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে বোকা লোকটা’ । - ওমা তুমি তো নিজেই বোকা । আবার অন্যকেও বোকা বলছো ? যাক বুঝলাম । এখন কতক্ষণ এভাবে উড়তে হবে গো ? সেটা ঝেড়ে কাশ তো , ওমা দেখি ছাদে বসে মা , জেঠিমা , আর পাশের বাড়ির পুচুদির মা গল্প করছে । আর একটু দূরে কে যেন টাইপরাইটারে খট খট করছে । গল্প টাইপ করছে । আমাদের পাশে কারা যেন উড়ছিলো খেয়াল করিনি আগে । বললাম - এরা কে গো ? বোকাটা বলে– ‘ভাষা’ । - ভাষা এভাবে ওড়ে ?
- কই তো শুনিনি আগে । আরে ওরা এখন আর নেই’ । তো’কি ? তা বলে উড়বে ? আর ওই লোকগুলো ? রেড ইন্ডিয়ানের মত মাথায় পালক গোঁজা , আরো কারা কারা যেন... তা ওরা উড়ছে কেন ?’ ও উত্তর করলো না ।আমি তো প্রশ্ন করেই যাচ্ছি । - ওই ধূসর কালো মেঘ টা ? – ‘ প্রেম’ । - বাচ্চা পেয়ে আমাকে জ্ঞান দিচ্ছো , তাই না ? ক্যানো গো ? – ‘ ওই দ্যাখো তোমার দাদু সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে’ । - ধুর ! ওটা তো মিল্কি ওয়ে ।ছোটো বেলায় পড়েছিলাম । - ‘ চল এবার ওইদিকে । একটা জরুরী টেলিগ্রাম নেওয়ার আছে’ । আমি বললাম – সে তো কবেই মরে গ্যাছে । ও উত্তর করলো না । বললো – ‘ওই জ্যোৎস্নার মইটা ধরো’ । আমি ধরলাম – কি মিষ্টি একটা গন্ধ । মার আঁচলে এমন একটা গন্ধ পেতাম । বোকাটার হাসির শব্দ শুনলাম । ‘বাবু-উ-উ-উ-উ’ কে যেন আমার ডাকনামে ডাকছে । সামনের মেঘগুলো পাহাড়ের মত দাঁড়িয়ে । এবার ? কি করবো ? - ‘ঢুকে পড়ো’। - গা ভিজে যাচ্ছে । কুহুর হাত ধরলেও এমন একটা ভিজে যাওয়া স্পর্শ থাকতো । ‘চলো তোমাকে আলাপ করিয়ে দিই – ওই নক্ষত্রটার সাথে’।
- বাপরে । পুড়ে যাবো না তো । - ‘না না ও মারা গেছে । চলোই না’ । ছুঁয়ে যেই না দেখতে গেছি হাত পুড়লো । আর যেই না হাত পোড়া , দেখি নেমে আসছি দ্রুত । নীচে ততক্ষণে কারা যেন হাজির হয়েছে । - হরিণঘাটার সেই দিদিগুলোর এখনো বিয়ে হয়নি । ওরা এগিয়ে এসে স্বাগত জানালো। নীচে দাঁড়িয়ে যারা ,তারা কেউ কালী সেজেছে , কেউ বা কৃষ্ণ । - তোমরা কি কৃষ্ণ গহ্বর থেকে এলে ? কি করবে তোমরা ? –‘আমরা বহুরূপী । আর ওরা নাটুয়া । আমরা ফাংশন করবো । তুমি দেখবে’। - কেন গো ?
-‘হেমন্ত কে আমরা সেলিব্রেট করবো ’। সকাল থেকে একে একে যা ঘটছে কিছুই বুঝছি না । অগত্যা মাথা নেড়ে সায় দিলাম । সন্ধ্যে হয়ে আসছে ।একে একে পাশে ভীড় করছে ভূতের দল। সেলাই মেশিনে কে একজন কি সব সেলাই করছে । শঙ্কু কাকা হজমী বিক্রি করছে । আমার পোড়া হাতে কে যেন এসে গাঁদা পাতা থেঁতো করে লাগিয়ে দিয়ে গেলো । দুটো মাতাল দেখি আল্পনা দিচ্ছে । যা বাব্বা,এ আবার কি। দূর থেকে ভেসে আসছে –‘ দই নেবে নাকি গো দই ?’ অমলের সাথে আলাপ হোলো । - সেই পাঁচমূড়া গ্রাম থেকে হেঁটে হেঁটে তুমি এতো দূর এসেছো কি করতে ? অমল তো স্বভাব লাজুক । উত্তর করলো না । বললো- ‘চলো’ । - আমি বললাম কোথায় ? – ‘এসো না,গেলেই দেখতে পাবে’ । - কোথায় ? আমার হাত ধরে টানতে শুরু করেছে তখন একে একে সবাই । আমি ও বাধ্য হয়ে উঠে পড়লাম । -‘ওয়ান্ডার ল্যান্ডে যাবো’ ।- সেখানে কি আছে ? ‘চল না গেলেই দেখতে পাবে’। অগত্যা উঠে পড়লাম ট্রেনে।
কু - ঝিক ঝিক করে ট্রেন চলতে শুরু করলো , সময়ের কাঁটা উল্টো দিকে ঘুরছে ।একটা লোক দেখি বেলচা করে কয়লা নিয়ে ফেলছে ইঞ্জিনে । পাশ দিয়ে হুস হুস করে একের পর এক দৃশ্য আসছে , আমাকে জাপটে ধরছে , আর তাকে পেরিয়ে আমি চলছি ৯র রাজ্যে । - ওমা এতোক্ষণ তো আমি এখানেই ছিলাম গো । তাহলে ? হায়ারোগ্লিফিক্সের মত ধূসর এ কক্ষপথে ঘুরেই চলেছি , অনন্ত – জলময় , পাপবিদ্ধ আহ্নিক গতিময়তায় ।
সাদা কালো এই রাজ্যে আপাততঃ আমি চৌকিদারের ভূমিকায় । যারা আসবেন পরে , তাদের স্বাগত জানাবো । আর যারা রয়েছে তাদের পালাতে দেবো না । লোকজন এর নাম দিয়েছে ‘৯নেটোরিয়াম’। আপাততঃ আমি দেখছি হিজল গাছ , উড়ে যাওয়া মেঘ।আর মাস্তুলের ছায়া । অমল , আমি আর ওয়ান্ডারল্যান্ডের অ্যালিস সন্ধ্যের অন্ধকার গায়ে মেখে হেমন্তের অরণ্যে অপেক্ষায় বাকী বন্ধুদের । এসো ঐহিকে । ৯ এর রাজ্যে স্বাগতম । শিমুলতুলোর মত বাতাসে উড়ছে অস্থি , জীবাশ্ম । বোকা ইতিহাস মেঘ হয়ে ছায়া ফেলছে । মা’র হাত আমাকে ছুঁতে চাইছে । আর আমি একা এবং কয়েকজন ব্যস্ত লুকোচুরী খেলায় । কেবল এ আকাশগঙ্গায় ভাঙা জাহাজের জল ছবি বেয়ে কেন যে নোনা জল ঢুকে পড়ে...!