আগ্নেয়গিরির ঘুম ভাঙলো

তপোব্রত ভাদুড়ি

“তস্যা নাদেন ঘোরেণ কৃৎস্নমাপূরিতং নভঃ৷
অমায়তাতিমহতা প্রতিশব্দো মহানভূৎ৷৷
চুক্ষুভুঃ সকলা লোকাঃ সমুদ্রাশ্চ চকম্পিরে৷
চচাল বসুধা চেলুঃ সকলাশ্চ মহীধরাঃ৷৷”
--- “ তাঁর অপরিমিত অতি মহান ঘোর গর্জনে সমগ্র আকাশ পরিপূর্ণ হল এবং ভীষণ প্রতিধ্বনি উঠল৷ সেই সিংহনাদে চতুর্দশ ভুবন সংক্ষুব্ধ, সপ্ত সমুদ্র কম্পিত এবং পৃথিবী ও পর্বতসকল বিচলিত হল৷” শ্রীশ্রীচণ্ডী,২৷ ৩২-৩৪

এবছর দেবীপক্ষ শুরু হওয়ার আগেই দেবীর অকালবোধন হয়ে গেল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে৷ ‘অকালবোধন’ কথাটা বললাম বটে, কিন্তু আমার নিজেরই ঘোর সন্দেহ আছে-যে কথাটা ঠিক বললাম কি না৷ অসুরদের উৎপাতে পৃথিবী যখন বিপন্ন হয়ে পড়ে, তখন দেবতাদের তেজ পুঞ্জীভূত হয়ে দেবীর আবির্ভাব হয়৷ দানবের সঙ্গে সংগ্রামের কোনো তিথি-নক্ষত্র-দিন-ক্ষণ হয় না৷ ‘অকালবোধন’ কথাটা তাই একদিক থেকে অর্থহীন৷ বরং ঠিক ভাবে বলতে হলে বলা উচিত ছিল, অশিববিনাশী দেবীর এই বোধন নিতান্ত সময়োচিত৷ বহমান সময়ের ভিতর থেকেই উৎসারিত হচ্ছিল প্রবল এক চাপ, যার অশান্ত ঢেউ এসে প্রথম আছড়ে পড়লো যাদবপুরে৷ সঙ্গে সঙ্গে একটা আগ্নেয়গিরির ঘুম ভাঙলো৷
ঠিক কী থেকে শুরু হয়েছিল যাদবপুরের বর্তমান ছাত্র-আন্দোলন, প্রচারমাধ্যমের সূত্রে সে-বিষয়ে বিগত এক-দেড় সপ্তাহ ধরে এত বিস্তারিত ভাবে আমি-আপনি সকলে জেনেছি-যে নতুন করে সাতকাণ্ড রামায়ণ বর্ণনার প্রয়োজন দেখি না৷ শুধু এইটুকু খেয়াল রাখছি, গণ্ডগোলের সূত্রপাত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে এক ছাত্রীর যৌন নিগ্রহ অর্থাৎ লিঙ্গ হিংসার ঘটনা থেকে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সাংবিধানিক নির্দেশ অনুযায়ী আজ পর্যন্ত যার তদন্ত ও প্রতিবিধানের চেষ্টা করেন নি৷ ‘সাংবিধানিক নির্দেশ’ বলতে এখানে সুপ্রিম কোর্টের বিশাখা নির্দেশিকা র কথা বোঝাতে চেয়েছি, যা বর্তমানে ভারতের যে-কোনো প্রান্তে যে-কোনো প্রতিষ্ঠানে যে-কোনো নারী নিগ্রহ বা লিঙ্গ হিংসার ঘটনার তদন্তের ক্ষেত্রে কঠোর ভাবে পালনীয়৷ একটা উদাহরণ দিচ্ছি৷ কয়েকদিন আগে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট এক অধ্যাপককে একটি ছাত্রীর যৌন নিগ্রহের অপরাধে বরখাস্ত করেছে৷ ছাত্রীটির অভিযোগের ভিত্তিতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সুপ্রিম কোর্টের বিশাখা নির্দেশিকা মেনেই তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল৷ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় যদি তাদের নির্যাতিতা ছাত্রীকে ন্যায়বিচার দেওয়ার জন্য সংবিধান-সম্মত তদন্ত কমিটি গড়তে পারে, তাহলে যাদবপুরের মতো পাঁচ তারা বিশ্ববিদ্যালয় কেন তাদের নির্যাতিতা ছাত্রীকে ন্যায়বিচার দেওয়ার জন্য বিশাখা নির্দেশিকা মেনে তদন্ত কমিটি গড়তে পারে না বা গড়তে চায় না, তাই নিয়ে খুব স্বাভাবিক ভাবেই মানুষ জোর গলায় প্রশ্ন তুলবে৷ এমন কি কাল যদি আমি-আপনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে দেশের সর্বোচ্চ ন্যায়ালয়ের নির্দেশ অমান্য করে লিঙ্গ হিংসায় প্রচ্ছন্ন মদত দেওয়ার অভিযোগে জনস্বার্থ মামলা করি, তাহলে নিশ্চিত ভাবেই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ঘুম ছুটে যাবে৷ সুতরাং যৌন নিগ্রহের তদন্তে কর্তৃপক্ষের ইচ্ছাকৃত গাফিলতির প্রতিবাদে এবং স্বচ্ছ সুষ্ঠু সাংবিধানিক তদন্ত প্রক্রিয়ার দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি ফ্যাকাল্টির পড়ুয়ারা একজোট হয়ে যে-বিক্ষোভ আন্দোলন আরম্ভ করেছিল, তা ছিল শতকরা একশ ভাগ ন্যায্য ও জরুরি৷
প্রতিবাদের অধিকার একটি মৌল মানবাধিকার৷ মানুষ কীভাবে প্রতিবাদ করবে, সেটা নির্ধারণ করার স্বাধীনতাও ওই মানবাধিকারের অন্তর্ভুক্ত৷ যাদবপুরের পড়ুয়ারা অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তথা উপাচার্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-জ্ঞাপনের জন্য অহিংস নিরস্ত্র ভাবে অবস্থান বিক্ষোভের পন্থা অবলম্বন করেছিল৷ তাদের দুটিমাত্র দাবি ছিল৷ এক, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের নির্যাতিতা সহপাঠিনীর অপমানের প্রতিকারের জন্য কেন সংবিধান-সম্মত তদন্ত কমিটি গঠন করেন নি, উপাচার্যকে তার জবাব দিতে হবে৷ আর দুই, উপাচার্যকে সাংবিধানিক নির্দেশ মেনে তদন্ত প্রক্রিয়া আরম্ভ করার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে৷ উপাচার্য দুটি দাবিকেই অস্বীকার করেন৷ দাবি না মানা পর্যন্ত ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের অবস্থান বিক্ষোভ প্রত্যাহার করতে রাজি না হওয়ায় উপাচার্য একমাত্র বিকল্প সমাধান হিসাবে রাজ্য প্রশাসন ও শাসক দলের নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা করে তাঁদেরই সাহায্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে কম্যান্ডো - প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সশস্ত্র পুলিশবাহিনীকে ডেকে আনেন৷ পুলিশ বিক্ষোভরত ছাত্রছাত্রীদের চরম শারীরিক নিগ্রহ করে৷ বহু ছাত্র মারাত্মক ভাবে আহত হয়৷ সবচেয়ে ভয়াবহ, নিন্দনীয় ও বিচার্য ঘটনা হল, এই পুলিশবাহিনীতে কোনো মহিলা পুলিশকর্মী ছিলেন না কিন্তু আন্দোলনকারীদের মধ্যে বহু ছাত্রী ছিলেন৷ পুং পুলিশ এই ছাত্রীদের শরীরে যথেচ্ছ ভাবে স্পর্শ ও আঘাত করে৷ ঘটনার সবকটি ভিডিও রেকর্ডে তার ঢালাও চাক্ষুষ প্রমাণ আছে৷ যদি সেই প্রমাণ নাও থাকত, সেক্ষেত্রেও ছাত্রীদের অবস্থান-বিক্ষোভে মহিলা পুলিশকর্মী ছাড়া পুং বাহিনীকে পাঠানোর জন্য রাজ্য প্রশাসন সংবিধানের নির্দেশ ভঙ্গ করার অপরাধে সমান ভাবে দায়ী হত৷ বলার অপেক্ষা রাখে না, এই ক্ষেত্রে রাজ্য প্রশাসনের বিরুদ্ধেও পৃথক জনস্বার্থ মামলা দায়ের করার অবকাশ আছে৷
এইখানেই শেষ নয়৷ বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার থানায় গিয়ে নিজেদের ৩৭ জন ছাত্রছাত্রীর নামে ভারতীয় দণ্ডবিধির অপরাধমূলক ক্রিয়াকলাপের ধারায় মিথ্যা অভিযোগ লিপিবদ্ধ করেন৷ এর পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি ফ্যাকাল্টির সমস্ত ছাত্রছাত্রী পুলিশি হামলার নিন্দা করে ক্লাস বয়কট করে এবং উপাচার্য, সহ উপাচার্য ও রেজিস্ট্রারের পদত্যাগের দাবি জানায়৷ লিঙ্গ হিংসার যে-ঘটনাটি থেকে ছাত্র বিক্ষোভের সূচনা হয়েছিল, তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের সমস্যাটি৷ যাদবপুরের ছাত্রছাত্রীদের পাশে এসে দাঁড়ান কলকাতা সহ গোটা রাজ্যের, দেশের, এমন কি সারা পৃথিবীর অগণিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রযুবসমাজ৷ ছাত্রদের আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ধিক্কার জানান যাদবপুরের শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীরাও৷ শিক্ষক সংগঠন জুটা উপাচার্যের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব নিয়ে আসেন৷ আন্দোলনে শামিল হন প্রাক্তনীরা৷ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তাঁরা বিভিন্ন ভাবে প্রতিবাদ জানান৷ এর বাইরে সমাজের অন্যান্য অংশের অসংখ্য মানুষ দলমতনির্বিশেষে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে যাদবপুরের ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলনকে সমর্থন করেন৷ তার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল ২০ সেপ্টেম্বর কলকাতার রাজপথে একলক্ষাধিক মানুষের বৃষ্টিভাঙা মহামিছিলে৷ সেদিনের মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন যাদবপুরের পড়ুয়ারা৷ গোটা মিছিলে কোথাও একটাও দলীয় পতাকা ছিল না৷ থাকার কথাও ছিল না৷ ছাত্রদের আন্দোলনটি শুরু থেকেই অরাজনৈতিক ও নির্দলীয়৷ তবে সেদিন মিছিলে যাঁরা হেঁটেছিলেন, তাঁরা শুধু যাদবপুরের উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে শ্লোগান দিচ্ছিলেন না, তাঁদের সম্মিলিত কন্ঠে মুহূর্মুহূ ধ্বনিত হচ্ছিল শাসক-বিরোধী হুঙ্কার৷ ঘটনাটা ভাবার মতো৷
যাদবপুরে এই-যে কলরবের সূত্রপাত হল আর তার প্রতিধ্বনিতে চতুর্দশ ভুবন সংক্ষুব্ধ, সপ্ত সমুদ্র কম্পিত এবং পৃথিবী ও পর্বতসকল বিচলিত হল, তার মূলে আছে দুটো মিসটেক৷ প্রথম ভুলটা উপাচার্যের৷ নিরস্ত্র ও অহিংস ভাবে যে-ছাত্রছাত্রীরা যাদবপুরে গণতান্ত্রিক আন্দোলন করছিলেন, তাঁরা কর্তৃপক্ষকে আলোচনা ও তর্কের প্রস্তাব দিয়েছিলেন৷ কথোপকথনের সেই প্রস্তাবকে অগ্রাহ্য করে উপাচার্য হিংসার হঠকারী পন্থা বেছে নিলেন, যা গোড়ার সমস্যাটিকে আরও জটিল ও ব্যাপ্ত করে তুললো৷ উপাচার্যের এই সিদ্ধান্ত ভারতীয় সংস্কৃতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অতীত ঐতিহ্যের বিরোধী৷ শুনেছিলাম, ত্রিগুণা সেন যখন উপাচার্য ছিলেন, তখন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায় তাঁকে একবার ফোন করে বলেছিলেন, “আমাদের কাছে খবর আছে, আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ে দুজন কমিউনিস্ট লুকিয়ে আছে৷ তাদের গ্রেপ্তার করে আনতে আমি আমার পুলিশ পাঠাবো৷” কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রীর এই কথা শুনে কংগ্রেসি উপাচার্য সপাটে জবাব দিয়েছিলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে যদি পুলিশ ঢোকে, তাহলে পুলিশকে সবার আগে আমার বুকের উপর দিয়ে হেঁটে ঢুকতে হবে৷ ” ত্রিগুণা সেনের এই উত্তর শুনে বিধান রায় আর পুলিশ পাঠাবার সাহস করেন নি৷ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছিল যে - শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ভিত্তি করে, সেই জাতীয় শিক্ষা পরিষৎ-এর সূচনা হয়েছিল বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে৷ অরবিন্দ ঘোষ বরোদা-রাজের মহার্ঘ চাকরি ছেড়ে চলে এসেছিলেন সেই প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষপদ গ্রহণ করার জন্য৷ কোথায় হারিয়ে গেল ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদকে সম্মান জানাবার সেই সংস্কৃতি? কোথায় হারিয়ে গেলেন অরবিন্দ বা ত্রিগুণা সেনের মতো মেরুদণ্ডী মানুষরা? আজকের উপাচার্য কি শাসকদলের সঙ্গে মন্ত্রণা করে পুলিশ ডাকার আগে এসব কথা ভেবে দেখেছিলেন? ঐতিহ্যের কথা যদি ছেড়েই দিই, তবুও প্রশ্ন উঠবে, উপাচার্যের পুলিশ ডাকার সিদ্ধান্ত কতটা শিক্ষকসুলভ ছিল৷ শিক্ষকতার পেশা আর-পাঁচটা পেশার মতো নয়৷ অপরিণত-মনস্ক আবেগতাড়িত নবীন শিক্ষার্থীদের নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করার জন্য বিদ্যাবুদ্ধির চেয়েও বেশি জরুরি স্নেহ সহানুভূতি সহিষ্ণুতা ধৈর্য ও সংবেদনশীলতা৷ উপাচার্য তাঁর হিংস্র হঠকারী সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করলেন, শিক্ষকতার পেশা সকলের জন্য নয়৷
দ্বিতীয় ভুলটা রাষ্ট্র তথা রাজ্য প্রশাসনের৷ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে যে-সংঘর্ষের সূচনা হয়েছিল, তা ছিল উপাচার্য বা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ছাত্রছাত্রীদের৷ প্রতিষ্ঠানের ভিতরের সমস্যাকে ভিতরেই মিটিয়ে ফেলার সুযোগ না দিয়ে রাজ্য প্রশাসন অযথা জবরদখল করে নিজেকে একটি পক্ষ করে তুললেন৷ সংঘাতটা হয়ে দাঁড়াল স্বাধিকার-সচেতন গণতন্ত্রের সঙ্গে বলদর্পী রাষ্ট্রের সম্মুখসমর৷ রাষ্ট্রের এই ভূমিকাকে পৃথিবীতে কোনো দেশে কোনো কালে মানুষ সমর্থন করেন নি৷ মানুষের জন্যই রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের জন্য মানুষ নয়৷ মানুষ এখানেও বিষয়টাকে খুশি মনে মেনে নিলেন না৷ কোনো সন্দেহ নেই, ২০ তারিখের মহামিছিলে যে-বিপুল সংখ্যক মানুষ প্রবল বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে প্রবলতর কন্ঠে রাষ্ট্রক্ষমতা-বিরোধী শাসকদল-বিরোধী শ্লোগান দিচ্ছিলেন, তাঁদের অনেকেই বর্তমান শাসকদলকে ক্ষমতায় নিয়ে এসেছিলেন৷ শাসকদলের সীমাহীন ঔদ্ধত্য, লাগামছাড়া লুঠ আর হিংস্র তাণ্ডবে ভিতরে ভিতরে এঁরা অনেক দিন ধরেই ক্ষিপ্ত ও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন৷ আগ্নেয়গিরির উদ্গীরণের জন্য শুধু একটা জ্বালামুখ প্রয়োজন ছিল৷ ছাত্রদের আন্দোলন এঁদের সামনে ক্রোধ প্রকাশের ক্ষেত্র উন্মুক্ত করে দিল৷
খুব স্বাভাবিক ভাবেই রাজ্যের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি ছাত্রদের পক্ষ অবলম্বন করে এই চাপান-উতোরে অংশ নিতে উৎসুক হয়ে পড়েছে৷ কারণ এঁদের ধারণা, ছাত্র-অসন্তোষের বিষয়টিকে পালের হাওয়া করে তুলতে পারলে রাজ্য-রাজনীতিতে পালাবদলের দৌড়ে নিজেদের এগিয়ে যেতে সুবিধা হবে৷ বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমও যাদবপুরের ছাত্র-আন্দোলন ও তার সংশ্লিষ্ট প্রতিবাদ-কর্মকাণ্ডকে তাদের গূঢ় স্বার্থে কখনও মহিমান্বিত কখনও-বা বিকৃত করে দেখানোর চেষ্টা করে চলেছে৷ আন্দোলনটি কতদূর স্থায়ী ও ফলপ্রসূ হবে, এই নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের একটি অংশের মধ্যে যে-সংশয় রয়েছে, তাকে সুকৌশলে আরও উস্কে দিয়ে প্রতিপক্ষ প্রতিনিয়ত এই আন্দোলনকে ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করছে৷ সবচেয়ে দুঃখ ও লজ্জার বিষয় হল, নির্যাতিতা যে-ছাত্রীটিকে সুবিচার দেওয়ার জন্য এতগুলি ছেলেমেয়ে নিঃস্বার্থ প্রতিবাদ করতে গিয়ে নিগৃহীত হল, কোনো এক অজ্ঞাত কারণে শিক্ষামন্ত্রী আর তাঁর এক দলীয় অনুচর তার বাড়িতে গিয়ে ঘুরে আসার পরেই মেয়েটির বাবা রাতারাতি বয়ান বদলে ফেলে প্রকাশ্যে সরকারের আনুগত্য স্বীকার করেছেন৷ যে-রাজ্যে শাসকদলের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি অবাধ্য নাগরিকের বাড়িতে পার্টির ছেলে পাঠিয়ে বাড়ির মেয়েদের ধর্ষণ করিয়ে দেবেন বলে খোলাখুলি হুমকি দেন, সেখানে শাসকদলের মন্ত্রী পার্টির ডাকসাইটে ছেলেকে নিয়ে সশরীরে কোনো বাড়িতে হাজির হলে-যে গৃহকর্তাকে সেই একই হুমকি নিঃশব্দে বুঝিয়ে আসা হয়, তা আমি-আপনি সবাই অনুধাবন করতে পারি৷ এই সব নানা কারণে অনেকেই এই মুহূর্তে ভাবতে শুরু করেছেন, এই ছাত্র-আন্দোলনের আদৌ কোনো ভবিষ্যৎ আছে কি না৷
এই জাতীয় লোকের ধারণা, পৃথিবীতে প্রতিটা আন্দোলনে হাতেনাতে সমাজবিপ্লব ঘটে৷ আর যদি তেমন বড়সড় কিছু মোক্ষলাভ না হয়, তাহলে সেরকম আন্দোলন আন্দোলনই নয়৷ বলা বাহুল্য, ধারণাটা ভুল৷ পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তের প্রতিটি আন্দোলন সমগ্র মানবজাতির সার্বিক মুক্তির লম্বা রাস্তায় এক-একটা মাইলফলক৷ শোষণ-পীড়ন আর অন্যায়-অবিচারের জড় আসলে বাইরের সমাজব্যবস্থার মধ্যে নেই৷ রাক্ষসের প্রাণভোমরা রয়েছে নিখিল বিশ্বের মানবচৈতন্যের গভীরে৷ সেই স্পার্টাকাসের দাসবিপ্লবের সময় থেকে সোভিয়েত ভিয়েতনাম তিয়েনআনমেন স্কোয়্যার পেরিয়ে প্রতিটি আন্দোলনের মধ্য দিয়ে প্রতিবাদী মানুষের বিদ্রোহী বিবেক আমাদের চৈতন্যকে বার বার ধাক্কা দিয়ে যাচ্ছে৷ ভিত নড়ে আলগা হয়ে আসছে অসাম্য-অবিচারের সেই জড়টা৷ খুব শিগগিরি না হলেও একদিন সেটা হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়বে৷ মার-খাওয়া মানুষ, হার-মানা মানুষ, ভয়ে-চুপসে-যাওয়া মানুষ, খেটে-খাওয়া মানুষ তার অপেক্ষায় মুহূর্ত গুনছে৷ ততদিন পর্যন্ত পৃথিবীর সব আন্দোলন আপাত দৃষ্টিতে ব্যর্থ বলে মনে হবে৷ হয়ত বা ব্যর্থই হবে৷ কিন্তু সেসব ঘাম-রক্তের ইতিহাস মানুষ মনে রাখবে৷ তার থেকে রুখে দাঁড়াবার প্রেরণা পাবে৷ সেসব গল্প বার বার অত্যাচারী আর স্বৈরাচারীর হাড় হিম করে দেবে৷ উপকথার অগ্নিবিহঙ্গ ফিনিক্সের মতো একটা আন্দোলনের ছাইভস্ম থেকে নতুন আর-একটা আন্দোলনের জন্ম হবে৷
ততদিন হোক কলরব, হক কলরব৷