আমার ক্যাম্পাস শুধু যাদবপুর নয়। স-ব শিক্ষায়তন

প্রবুদ্ধ ঘোষ

“আমার খুব ভালো লাগছিল সেই সহপাঠীর ক্ষোভ-উচ্ছাস দেখে যে মাঝেমাঝেই 'ধুস্‌ এসব বিপ্লব-টিপ্লব করে কি হবে?' বলত। খুব খুশি হচ্ছিলুম সেই আমাদেরকে দেখে যারা প্রায় অসূর্যস্পর্শ থাকতাম, তারাও সান্সক্রিন-রোদচশমা - গাড়ির নিরাপদ আড়াল ছেড়ে কয়েক কিলোমিটার রোদে পুড়ে জলে ভিজে মিছিলে হাঁটছে। আমি এবং আমরা একলা-সেল্‌ফি পোস্ট না করে যূথবদ্ধ গর্জনের ছবি দিচ্ছি। আমি এবং আমরা 'হট ডগ খাচ্ছি বা আমার পিস্‌শ্বাশুরির জন্মদিন' স্টেটাস ছেড়ে হোককলরব বলে সঘোষ প্রতিবাদ সকলকে জানাচ্ছি। আমরা পাশে থাকছি আমাদের। প্রতিবাদী শিক্ষক-ছাত্র জোট। আমরা একা করে দিচ্ছি প্রশাসনকে। একলা ভিছিঃ। ভীষণ একলা মন্ত্রী। রাষ্ট্র যে দানবিক, তা তত্ত্বে নয় অনুশীলিত বাস্তবে বুঝে নিচ্ছি। রাষ্ট্রের বগল চুলকানো নগরপাল-কে খিস্তি করতে আর ভয় লাগছে না আমাদের। আমাদের মিছিলেই 'রাজনীতি বুঝি না' মুখচোরা ছেলেটি বলছে- আলিমুদ্দিন শুকিয়ে কাঠ/ শত্রু এবার কালীঘাট”
প্রতিটি যুগেই আমরা মার খেয়েছি। ক্ষমতা হস্তান্তরের পরে কংগ্রেস আমল বামফ্রণ্ট আমল টিএমসি আমল। আমরা মার খেয়েছি অন্যায়ের প্রতিবাদ করে। শিরদাঁড়া সোজা রেখে। আর, হয়তো এর পরে যে শাসক হবে, সেও মারবে। কারণ, শাসককে শাসন টিঁকিয়ে রাখতে গেলে মারতে হবেই ছাত্রদের। তারাই যে বরাবরের ‘রাখাল’। পরিবার, কর্তৃপক্ষ রাষ্ট্র সেই ছোট্ট থেকেই ‘গোপাল’ হবার সুবোধনীতি পাখিপড়া করে বোঝালেও রাখাল-ঝোঁকেই আমরা নিয়ম ভাঙ্গি। হ্যাঁ, ভাঙ্গবোও। এই মিছিলগুলো অরাজনীতিক বন্ধুকেও অজান্তেই রাজনৈতিক করে তোলে। আসলে, মিছিল দাবি-আদায়ের লড়াইকে যতদিন আমরা নিরাপত্তার ঘেরাটোপ থেকে দেখি হয়তো একটু নাক-সিঁটকোই। কিন্তু, সেই নিরাপত্তার ঘেরাটোপ কেড়ে কর্তৃপক্ষ উলঙ্গ শ্বাপদ হলেই আমরাই পথে নামি। তখন মিছিলের স্লোগান ‘হাল্লা বোল্‌’ থেকে ‘হামলা বোল্‌’ হয়ে ওঠে। তখন আজাদ কাশ্মীরের দাবির স্লোগান হয়ে ওঠে আমার কলরব- ‘ছিন্‌কে লেঙ্গে আজাদী... মেহ্‌কি মেহ্‌কি আজাদী... জান্‌সে প্যারি আজাদী’! এক শহর থেকে আরেক বন্দরে এক পোস্টার থেকে অন্য ব্যারিকেডে জেগে থাকে প্রতিরোধের আলো... আমাদের উৎসব

“না! এই 'বাবা-মা' কে আমি নিন্দা করিনা। নিজের ছেলে-মেয়ে ক্ষুদিরাম হোক, কেউ চায় কি? নিজের প্রত্যাশা, প্রত্যাশিত 'নিরাপত্তা' পেলে কেন কেউ সেই নিরাপত্তা বিঘ্নিত করবে? প্রতিষ্ঠানের দশচক্র ভগবানকে ধমকায়, বোঝায়- তুমি ভূত হও! সুরক্ষা না-পাক, অন্ততঃ প্রতিশ্রুতিটুকুই পরিবারকে রাষ্ট্রের আরো কাছাকাছি এনে দেয়। প্রতিশ্রুতিগুলিই পরিবারকে, পরিবারের এককদের 'ভোট' দেওয়ায়। দিইয়ে যায়। 'গণতন্ত্রের' মরাবাচ্চা বিইয়ে যায়...
আর, প্রতিষ্ঠান আমাদেরও 'কিছু' দেবার কথা বলছে! ৩৭জনের এফ.আই.আর প্রত্যাহার, ৩জনের চিকিৎসাখরচ বহন। কিন্তু, তাতে কি আমাদের ওপর পড়া লাঠি-বুটের আঘাতগুলো স্বস্তি পাচ্ছে? আমরা ভয় পাবনা ঠিকই, নিশ্চই কোনো 'প্রতিশ্রুতি'তেও ভুলবো না। আমাদের দাবি, মানে নির্যাতিতা মেয়েটির ন্যায্য দাবি আদায়ে শেষাবধি লড়ে যাওয়া। ভিছিঃ অর্থাৎ রাষ্ট্রের গ্যাঁদাবাচ্চা-র পদত্যাগ দাবি, মানে সে তো সরকারকেই হুলিয়ে থাপ্পড়। সে লড়াইয়ে আমরা অনড়। কলরব আরো ছড়াবে। আমাদের পাশে পরশু দাঁড়িয়েছিল রাজ্যের স্কুল-কলেজ কাল দাঁড়িয়েছিল দেশের স্কুল-কলেজ আজক দাঁড়াচ্ছে দুনিয়ার কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়। আর, আমাদেরও দায় থেকে যাচ্ছে তাদের পাশে থাকার। আমার ক্যাম্পাস মানে শুধু যাদবপুর নয়, ওই সব, স-ব শিক্ষায়তন। আমাদের কর্তব্য বাড়ছে গণ-আন্দোলনের প্রতি। আমরা কি দায়বদ্ধ হচ্ছি না সেই চিরন্তন শাশ্বত 'সমাজ বদল'-এর বিদ্রোহ-র কাছে?”
সেদিন প্রায় ৫০হাজার ছাত্রের স্বতঃস্ফূর্ত মিছিল হয়েছিল। মিছিলের সামনে কোনো রাজনৈতিক দলের নেতারা নয়, কোনো গিরগিটি বুদ্ধিজীবি নয়, কোনো ভোটবাক্সের দাবি নয়, কোনো আমরা-ওরা বিভাজন নয়। এ মিছিল আমাদের। এ মিছিল যাদবপুরে পুলিশের অত্যাচারের বিরুদ্ধে, কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে, উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে, নগরপাল-শিক্ষামন্ত্রী' প্রভৃতিদের অনৃতভাষণের বিরুদ্ধে। এ মিছিল সেইসব ছাত্রদের যারা দিনের পর দিন নিজেদের শিক্ষানিকেতনে আক্রান্ত কর্তৃপক্ষ দ্বারা। সেইসব ছাত্রদের যাদের ওপর টিএমসিপি নেতা অথবা পুলিশেরা প্রতিদিন দমন চালায়। এই মিছিল রাষ্ট্রের ভয়ানক রাক্ষসেপনার প্রতিরোধ। আর, যাদবপুর পশ্চিমবঙ্গের সেইসব স-ব ছাত্রদের মনের কথা বলেছিল। সেই সাহসটুকু দেখেই তারাও নিজেদের এতদিনের ব্যথাকে কলরবে পরিণত করেছিল। প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার কবিতা-গান স্বপ্নগুলো স্লোগানে পোস্টারে পায়েপায়ে মূর্ত হল। প্রচুর সম্ভাবনা। এলিট-নন্‌এলিট বাধা মুছে গেছে। (এই আরেক অনিবার্য প্রশ্ন- ‘এলিট বনাম নন্‌এলিট’! যাদবপুর একটু ‘অন্যরকম’ একটু ‘ট্যাঁশ’! মফস্বলের বা কলকাতারই ওই কলেজের মত নয়! তাই, যাদবপুরের আন্দোলন ‘এলিট’-দের আন্দোলন। প্রেসিডেন্সি যাদবপুরের পাশে দাঁড়াবে কিন্তু সেণ্ট অ্যাণ্ড্র্যুস্‌ কেন তাদের সাথে হাঁটবে? আর, নন্‌এলিট সুরেন্দ্রনাথ, অ্যাণ্ড্র্যুস্‌ রা সেই মিছিলে কেন? কে ঠিক করে দেবে কারা এলিট, কারা নয়? না হে, বিজ্ঞজনেরা! এই অভিজাত-অনভিজাত বাইনারি অপোজিট ছাত্রসমাজ জন্ম দেয়নি, এর জন্ম আপনাদের সমাজলালনের বিকৃতিতে। আপনাদের তৈরি শ্রেণি ও সামাজিক বৈষম্যের ফসল এই ধারণারা! আর, শুনুন মশাই রাষ্ট্রের লাঠি অভিজাত-অনভিজাত ভেদ করেনা, ধর্ষণ পোশাক দেখে হয়না। যে ছাত্রসমাজ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সমস্বর তারা এই বিভেদকে পাত্তাও দেয়না। আর হ্যাঁ, আমাদেরই দায়িত্ব এই শূন্যগর্ভ, ক্ষতিকর বিভেদগুলোকে ছুঁড়ে ফেলার। আর, তা হতে পারে একমাত্র সঙ্ঘবদ্ধ ছাত্রআন্দোলনের মধ্যে দিয়েই। আপনারা এটা বোঝেন বলেই ভয় পান! হয়তো, খুঁতাতিখুঁত বিচারে আমাদের মধ্যেও খুঁজে পেতে পারেন এই বিরোধজাত ‘ভুল’ কখনো-সখনো। আমরা এই সমাজজাত, তাই সামাজিক ব্যাধির কোনো শিকড় থেকে যেতেও পারে আমাদের ভিতর। কিন্তু, আমরাই দায়বদ্ধ রায়গঞ্জ কলেজের সাথে প্রেসি-যাদবপুরকে মিলিয়ে নিতে।) স্কুলছাত্র আর রিসার্চস্কলার একসাথে স্লোগান তুলছে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। হোককলরব। এমনকি, যাঁরা অনেক দূরের অন্য ক্যাম্পাসের তাঁরাও মিছিল করলেন নিজেদের ম্যাম্পাসে। সেইদিন মনে হল, আমার ক্যাম্পাস-তোমার ক্যাম্পাস বলে সত্যিই কিছু হয়না! আমার ক্যাম্পাস শুধু যাদবপুর নয়। বর্ধমান কলেজের ছেলেটিও আমারই ক্যাম্পাসের। তাই আন্দোলন নির্যাতিতা ছাত্রীটির বিচারের দাবিকে সাথে রেখেই আরো অনেকদূর এগিয়ে গেছে। আর, তাই মেয়েটির বাবা যদি শাসকের প্রতি আস্থা রাখেও তা’লেও এই হাজার হাজার ছাত্রের দাবি স্তিমিত হবে না! গণ-কনভেনশনে, ওপেন জিবিতে হাজারো কণ্ঠস্বর আন্দোলনকে সক্রিয় রাখার প্রতিশ্রুতি নিই। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিবাদ সংগঠিত হচ্ছে। যাদবপুরের প্রাক্তনীরা তাঁদের বর্তমান কর্মক্ষেত্রে মিছিল করছেন। কেন্দ্রে যাদবপুর আর তা ছড়িয়ে পড়ুক, তা পরিধি বাড়াক, উতল হাওয়া বয়ে যাক সবখানে। কিন্তু, আন্দোলনের সেই কেন্দ্রের দায়বদ্ধতাই সবথেকে বেশি পরিধির দিকে নজর দেবার। রাষ্ট্র সেই পরিধিগুলোকে দমন করে। বর্ধমানে ছাত্রদের রক্তাক্ত করে মিছিল করার জন্যে। স্কটিশ কলেজের ছেলের পায়ে বাইক তুলে দেয়। চোরাগোপ্তা হুমকি চলতে থাকে। আর, আন্দোলনের কেন্দ্রকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে চায়। সেইমুহূর্তেই কি বড়ো প্রয়োজন হয়ে পড়েনা একটি সঙ্ঘবদ্ধ ছাত্রমঞ্চের? যে ছাত্রমঞ্চ কোনো রাজনৈতিক রঙের দলদাস হবেনা, ভোটবাক্সের খেলায় দাবার বোড়ে হবেনা। যে সঙ্ঘবদ্ধতা প্রতিটা ক্যাম্পাসকে নিজের করে নেবে। হিমাচল প্রদেশ ইউনিভার্সিটির ফি-বৃদ্ধি বিরোধী আন্দোলনও তার, বিশ্বভারতীতে স্বৈরাচারী কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আন্দোলনও তার। গুরুদাস কলেজের আক্রান্ত মেয়েটির প্রতিবাদও সব্বার। ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ক্যাম্পাসিং্যের আন্দোলনও সবার। আমাদের। আমাদের এই সঙ্ঘবদ্ধতাই কি রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে ঝড় থেকে টর্ণেডো হয়ে উঠবে না? সেই ভিত প্রস্তুত। অত্যাচারী কর্তৃপক্ষ শুধু নয়, অত্যাচারী এই ব্যাবস্থাটাই। ‘ঊই ওয়াণ্ট জাস্টিস’ স্লোগানের মধ্যেই কি নিহিত নেই সমাজ বদলানোর ইঙ্গিত?

“আনাতোলি কারপভ অত্যন্ত 'খুনে' মাথার দাবা-খেলোয়াড় ছিলেন। উনি বিশেষ মুহূর্তে এমন একটি চাল দিতেন যাতে পজিশন হোল্ড করে রাখা যায়। উনি পজিশন হোল্ড করে রাখতেন, আর পরবর্তী পদক্ষেপ কি হবে তা ঠিক করতে করতে ঘেঁটে যেত বিপক্ষ! ঘেঁটে যেত আর, অনিবার্য ভুল চাল দিত। ভুল চাল দিত আর, পজিশনের নিয়ন্ত্রণ হারাত। নিয়ন্ত্রণ হারাত আর, প্ল্যানিং-এ ভুল করত। আর, প্ল্যানিং-এ ভুল হলে কী হয়, তা তো সক্কলেই জানে! কারপভের পজিশনে যে দুর্বলতা থাকত, কিছুতেই আর সেইদিকে আক্রমণ করা হতনা। খেলাটাকে ছড়িয়ে দিতে পারত না! কারপভ সামান্য কিছু টোপ দিতেন, আস্তে আস্তে বুঝে নিতেন বিপক্ষকে! তারপরই, একটা একটা করে নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দিতেন বিপক্ষের পজিশনে! কিছুটা পজিশন হোল্ড করা, কিছুটা দমন... বিপক্ষ একটা পর্যায়ের পরে রিজাইন করতে বাধ্য হত... আর, তারপর আবার একটা নতুন গেম্‌, হয়তো অন্য বিপক্ষ কিন্তু, কারপভের সেই একই রণনীতি। আবার কারপভের জয়... আবার... বিশ্বাস হচ্ছে না তো? আচ্ছা, উইকিপিডিয়া থেকে ওঁর নিজের কথা দিই?- Let us say the game may be continued in two ways: one of them is a beautiful tactical blow that gives rise to variations that don't yield to precise calculation; the other is clear positional pressure that leads to an endgame with microscopic chances of victory.... I would choose the latter without thinking twice. If the opponent offers keen play I don't object; but in such cases I get less satisfaction, even if I win, than from a game conducted according to all the rules of strategy with its ruthless logic.
আর, রাষ্ট্র কি আসলে কারপভের মতই খেলে না?”
আস্তে আস্তে ডিপি বা, প্রো-পিক্‌গুলো বদলাচ্ছে। ১৬ই সেপ্টেম্বর রাতের নৃশংস নিপীড়ন ও ছাত্রীদের শ্লীলতাহানির প্রতিবাদে করা নিকষ কালো ডিপি-র বদলে ফিরে আসছে আমাদের মুখ। ১৭ই থেকে অন্ততঃ ২২শে সেপ্টেম্বর অবধি যতবার ফেসবুক খুলেছি শুধু প্রতিবাদী গান, কবিতা, স্টেটাস ভর্তি দেখেছি ফেসবুক, অন্ততঃ ৯৫%-র পোস্টে। তারপর, একটু একটু করে মহালয়া, প্রাক্‌-পুজোর পায়ে পায়ে আনন্দে শপিং, চিকেন-বার্গারের স্টেটাস ভরিয়ে ফেলছে আবার। শিক্ষামন্ত্রী নিগৃহীতা মেয়েটির বাড়ি যাওয়া আর পরদিনই মেয়েটির বাবার শাসক-মিছিলে হাঁটা, তাঁর প্রো-আন্দোলন থেকে অ্যাণ্টি-আন্দোলন অবস্থানে তৈরি হয় ‘অবিশ্বাস’। অনেকটা “যার জন্যে চুরি করা সেইই বলে চোর!” (মাফ করবেন, এই উপমার জন্যে)। নিগৃহীতা মেয়েটি যাতে নিরপেক্ষ তদন্তে ন্যায্য বিচার পায়, তাই অবস্থান-বিক্ষোভে বসেছিল ছাত্র-ছাত্রীরা। যাদবপুর কর্তৃপক্ষের তৈরি তদন্ত কমিটিতে অনাচার চলছিল। তাই, সঠিক তদন্ত দাবি। তারপরে, দীর্ঘ ১০দিনেও কর্তৃপক্ষ কর্ণপাত না করায়, ঘেরাও সন্ধে থেকে। রাতে উপাচার্যের পুলিশ ডাকা, ছাত্রছাত্রীদের নির্মম মার, শ্লীলতাহানি ও গ্রেপ্তার করা। এইটুকু সকলের জানা। কিন্তু, সেই ছাত্রীটি, যার ন্যায়বিচারের দাবিতে বিক্ষোভের শুরু, তার বাবা ‘আমি সরকারের ওপর আস্থা রাখছি। যাদবপুরের ছাত্রদের আন্দোলন করার দরকার নেই আর’ বলার পরে প্রথম বোধহয় ‘ধাক্কা’ আসে। রাষ্ট্র তার কৌশলগত প্রথম চাল দেয়। এই কৌশলগত অবস্থান দীর্ঘদিনের। কখনো শ্রমিক-আন্দোলনের নেতাকে কিনে নেয় কর্তৃপক্ষ, কখনো কামদুনির পরিবারকে অথবা মধ্যমগ্রামের সেই মেয়েটির বাবাকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে প্রশাসন। আন্দোলনকে ‘কিনে’ নেওয়া। কিন্তু, তা খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারেনি এই ক্ষেত্রে ছাত্র-সংহতিতে। কারণ, ততদিনে আন্দোলন শুধু ওই ‘একটি মেয়ে’তে আটকে নেই। যাদবপুরের ক্যাম্পাসে আটকে নেই। আরো আরো ছড়াতে চাইছে। হ্যাঁ, হয়তো ডিপি কালো থেকে রঙিন হয়েছিল কয়েকজনের। ক্লাস-বয়কট চলতেই থাকে, শিক্ষক-ছাত্র সংহতি জোরদার হয়। কিন্তু, কয়েকটি আশু লক্ষ্যের দিকে রাষ্ট্র ঠেলে দিতে থাকে আমাদের। আমরাও কি সরে আসিনা আমাদের ‘দায়বদ্ধতা’ থেকে? উপাচার্য কর্তৃপক্ষ, উপাচার্য ছাত্রছাত্রীদের গণতান্ত্রিকতার শত্রু। কিন্তু, এক ও একমাত্র শত্রু কি? যে নগরপাল ছাত্রমারা পুলিশদের পাশে দাঁড়ান, যে শিক্ষামন্ত্রী শ্লীলতাহানি-হওয়া ছাত্রীদেরই দোষী করেন, যে উপাচার্য-সহউপাচার্য- রেজিস্ট্রার নেক্সাস পুলিশ ডেকে আনে তারা কি সবাই গণতন্ত্রের শত্রু নন? তাঁরা কি সকলেই রাষ্ট্রের দানবিক মুখের অংশ নন? কাঠগড়ায় তুলে এদের সকলেরই পদত্যাগ দাবি করাই যেত। প্রথম কয়েকদিনের কলরব যখন সেই গর্জনের দিকে অনিবার্যভাবে ধাবিত হচ্ছে, তখন আমরাই আমাদের বেঁধে রাখলাম শুধু উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে।
প্রশাসন গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে লাগল, ‘ছাত্ররা নৈরাজ্য তৈরি করছে। ওরা ভিসি-কে খুন করতে চেয়েছে’! আরেঃ, সেই এক সুর! ১৯৭৮ বা ২০০৫-এর ছাত্র-আন্দোলনকে বলা হয়েছিল ‘ফেল করা ছাত্রদের আন্দোলন’ এবং পুলিশি লাঠিচার্জকে জাস্টিফাই করতে সেইই অলীক উপপাদ্য- ‘পুলিশকে মেরেছে ছাত্ররা, পুলিশ মারেনি। ছাত্ররা নৈরাজ্যবাদী’! ২০১০ সালে যাদবপুরে বুদ্ধদেবকে কালোপতাকা দেখিয়ে প্রশাসন ও শাসকগুণ্ডাদের সন্ত্রাসে আক্রান্ত হয়েছিল ছাত্ররা। আর, অনিবার্যভাবে আমরাই কেস্‌ খেয়েছিলাম বুদ্ধ-র কন্‌ভয়ে হামলা চালানোর মিথ্যে মামলায়! ছাত্রদের আন্দোলনকে নৈরাজ্য, বিপথগামী বলে চালিয়ে দেওয়া দীর্ঘদিনের শাসকঐতিহ্য। হ্যাঁ, যদি নৈরাজ্য তক্‌মায় আপনাদের জড়বোধ সান্ত্বনা পায়, তা’লে বেশ ‘নৈরাজ্য’ করেছি কলরব করেছি! আপনাদের বন্ধ কানে আওয়াজ পৌঁছাতে। কিন্তু, কোনটা নৈরাজ্য নয়? টিএমসিপি নেতার কয়েকঘণ্টা যাবৎ লুম্পেনবাহিনী নিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ঘেরাও নৈরাজ্য নয়? পূর্বআমলের উত্তরাধিকার বহন করে সিণ্ডিকেট দাপট নৈরাজ্য নয়? কলকাতায় খোলা-তরবারি হাতে আর.এস.এস-র মিছিল নৈরাজ্যের সূচনাবাহী নয়? অধ্যক্ষাকে জগ ছুঁড়ে মারা নৈরাজ্য না? দেশজুড়ে ‘নির্ভয়া’দের লাশ নৈরাজ্য নয়? কিন্তু, যখনই বিচারের আশায় আমরা অবস্থান করি তখনই নৈরাজ্য? যতক্ষণ আমরা স্থিতাবস্থায়, যতক্ষণ আমরা বিনাপ্রশ্নে আনুগত্যে চুপ ততক্ষণই সব ঠিক আছে! আর, প্রশ্ন করলেই ‘আমরা-ওরা’ বা শিলাদিত্য? শ্মশানের শান্তি না-মানলেই পুলিশের লাঠি? পুলিশ শ্লীলতাহানি করলে তিল-তত্ত্ব? হে প্রশাসন, আপনাদের রাজ্যশাসনের বিরোধিতা করলেই ‘নৈরাজ্য’ যদি হয়, তা’লে বেশ করেছি! ছাত্রদ্রোহ সময়ের দাবি। অগ্নিযুগ, ষাটের দশক, ১৯৬৮-প্যারিস, ভিয়েতনাম-যুদ্ধবিরোধী ষাটের আমেরিকার ছাত্রদের উত্তরাধিকার বহন করছি আমরা। আমরা গর্বিত। আর, জো-হুজুর বুদ্ধিভিখারী হওয়ার যে আফিম নিয়ত খাইয়ে চলেছেন, তার কাছে তো ‘মদ-গাঁজা-চরস’ কোন ছার!!
রাজনৈতিক ভোটবাক্সের ফায়দা তুলতে এলেন সংসদীয় ডান-বাম-গেরুয়া নেতারা। আর, কী আশ্চর্য, আমাদের হয়ে তাঁরাই হাইকোর্টে জনস্বার্থ মামলায় আমাদের হয়ে সওয়াল করলেন। আচ্ছা, অরুণাভবাবু বা বিকাশবাবুরা নাহয় ‘সরকার’ নন, কিন্তু, তাঁরা কি রাষ্ট্রযন্ত্রেরই পৃষ্ঠপোষক নন? সেই কারপভের খেলার কথা বলছিলাম না? পজিশন হোল্ড করে রাখা। বিপক্ষকে ‘অবজ্ঞা’ করা, তাকে অধৈর্য করে বিভ্রান্ত করা আর, খুব হাল্কাচালে গভীর দমন নামানো! সেই জনস্বার্থ মামলা থেকেই হাইকোর্ট স্বীকৃত হল ক্যাম্পাসে বাধ্যতামূলক আইডি, পুলিশ পিকেট ইত্যাদি। দু’দিন রাষ্ট্র অপেক্ষা করল, পুলিশ বাড়াবাড়ি করল না, খুব একটা আইডি দেখতে চাইল না (আমার ও আরো কয়েকজন বন্ধুর আইডি দেখতে চায়নি)। আমাদের কর্মসূচী লালবাজার অভিযান থেকে বদলে হল ক্যাম্পাস রক্ষা, প্রায় তিনদিন অন্য কর্মসূচী স্থগিত রেখে নিজেদের ক্যাম্পাসেই পুলিশ-পিকেট, আইডি বিরোধিতা চলছে। আচ্ছা, এর ফলে আমরা ক্রমশঃ বন্দী হয়ে যাচ্ছি না তো? যে আন্দোলন দেশের ১০০টিরও বেশি স্কুল,কলেজ,বিশ্ববিদ্য লয় এর সক্রিয় সমর্থন পেয়েছিল সে কলরব কি তবে আবারো শুধু আমাদেরই হয়ে পড়ল? আমরা, যাদবপুরের ছাত্রছাত্রীরা অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বন্ধুদের সমর্থন, যোগদান সব ‘নিলাম’। কিন্তু, ততটাই বা আরো বেশি ‘ফিরিয়ে’ দিতে পারলাম তো? আর, শাসক কি এটাই চায়নি? হ্যাঁ, আমি ক্লাস-বয়কটের সমর্থক হয়েও বলছি, শুধু ক্লাস-বয়কট কর্মসূচী কি ‘আমার’ও সূক্ষ্ণ ‘সুবিধাবাদী’ অবস্থান নয়? রাষ্ট্রও ক্লাস-বয়কট নিয়ে বিভাজন তৈরি করে গোপনে আর প্রকাশ্যে অবজ্ঞা করে চলে ঠাণ্ডা মাথায়। আন্দোলনের বিরোধিতায় ‘বহিরাগত’ তত্ত্ব ছিলই। ছিল ‘মদ-গাঁজা-প্রেম’ তত্ত্ব! রাজ্যপাল সিলমোহর লাগালেন বহিরাগত তত্ত্বে। শিক্ষামন্ত্রী দশচক্রে বোঝাতে লাগলেন ‘মদ-গাঁজা’ তত্ত্ব! আর, কিমাশ্চর্যম্‌! সেই সম্মিলিত রাষ্ট্রযন্ত্র তদন্ত কমিটি বসালো ‘বিশাখা কমিশন’ না মেনে! তার আমরা বিরোধিতা করলাম সমস্বরে। কিন্তু, সেই কমিটির রিপোর্টে ‘অতএব, ভিসি ভুল!’ বলে কি আমরা সাময়িক ‘জয়লাভ’ও করলাম? না কি আমাদের দায় আরো বাড়লো ঠিকঠাক তদন্ত কমিটি গঠনে সরকারের ওপর চাপ বাড়ানোয়? প্রো-ভিসি পদত্যাগ করা আমাদের আন্দোলনের জয় ঠিকই কিন্তু, সমগ্র কর্তৃপক্ষের প্রতিই আমাদের তর্জনী তুলে রাখা উচিত নয়? স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্রআন্দোলন বহুদিন দেখেনি এই শহর, এই রাজ্য। হয়তো এই দেশও। যেখানে, আমরাই আমাদের কথা সোচ্চারে বলি। তবু, সেই স্বতঃস্ফূর্ত গণয়ান্দোলনেরও একটা কেন্দ্রিকতা দরকার। রাষ্ট্র যেখানে মহাশক্তিধর, তার মেশিনারি প্রচুর। রাষ্ট্র অপেক্ষা করে স্বতঃস্ফূর্ততা থিতিয়ে আসার। রাষ্ট্র অপেক্ষা করে আমাদের একে-অপেরের থেকে বিচ্ছিন্ন করার, সব সঙ্ঘবদ্ধতাকে ভেঙ্গে দেওয়ার। রাষ্ট্র কি আসলে কারপভের মতই খেলে না? কিন্তু, কলরব চলে। আমাদের এক অধ্যাপক পরিচয়পত্র দেখিয়ে মাথা নত করতে চাননা বলেই প্রয়োজনে ফুটপাথে ক্লাস নেবেন বলেছেন। উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে অনড় আমরা। আর, আমি বিশ্বাস করি, ছাত্র-আন্দোলন ধীরে ধীরে গণ-আন্দোলন হয়ে ওঠে। নিজেকে মিলিয়ে নেয় বৃহত্তর আন্দোলনে। ক্রমে আরো চাপ বাড়াবে রাষ্ট্রের ওপর। নিজেকে মিলিয়ে নেবে প্রতিষ্ঠান-বিরোধী লড়াই থেকে সমাজ-বদলের লড়াইতে। হাইকোর্টদ্বারা নির্ধারিত চত্বরে নয়, আমাদের আন্দোলন সব সংকীর্ণতা মুক্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়বেই। কুর্ণিশ বিদ্যাসাগর কলেজের সেই উন্নতশির ছাত্রদের, যারা যাদবপুর উপাচার্যের হাত থেকে পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছে। আলিঙ্গন উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়, দিল্লির সেই সব মিছিলকে। চলতে চলতেই আমরা জেনে নেব পদক্ষেপগুলো। সাময়িক লক্ষ্য আর দীর্ঘস্থায়ী লক্ষ্যের ফারাক। কলরব আরো জোরদার হবে। ক্যাম্পাসের গণতন্ত্র রক্ষার দাবির সাথে সম্পৃক্ত হয়ে যাবে সমাজের গণতন্ত্র রক্ষার লড়াই। আর, আমাদের উড়ানপথ দিশা পাবেই, থেমে যাবেনা। শুধু, কারপভের খেলাগুলো দেখে বুঝে নিতে হবে রণনীতি আর, কৌশল। শুধু বুঝে নিতে হবে কোনটা ওদের বোড়ে, অথবা বিশপ্‌ অথবা নাঈট আর, তাদের প্রকৃত অবস্থান। বুঝে আমরা নেবই। আজ অথবা, আগামীকাল...