কান্ড –যাদবপুর ও কিছু খোলামনের কথা

ইন্দ্রনীল বক্সী

কি অদ্ভুত একটা উন্মাদনা ! কি আশ্চর্য্য একাত্মবোধের সংক্রমন ঘটে গেলো শহরে-রাজ্যে-দেশে-ভূবনগ ্রামে ! ঘটনা কি ? ঘটনার নেপথ্যে কি ঘটনা ? – এসব অজস্রবার আপনার আমার মগজের খোদাই হয়ে গেছে বৈদুতিন মাধ্যম , খবরের কাগজ , অন্তর্জালের নিরন্তর দিয়ে চলা হালনাগাদে । তাই সে নিয়ে কথা খরচের প্রয়োজন নেই । যাঁরা এর পিছনে ‘চক্রান্তত্বত্ত’ খুঁজছেন বা একে নিতান্ত ‘ছোট’ ঘটনা মনে করছেন ,আসুন তাদের করুনা করি । কারন তারা নিজেরাও জানেন তাদের যুক্তির অসাড়তা ।
এখন আমার কাছে প্রশ্ন হচ্ছে আমার মতো একজন এককব্যাক্তি , যার কিনা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে বহুদূর পর্যন্ত কোনো সম্পর্ক নেই, সরাসরি প্রাক্তনীসুলভ নস্টালজিক আবেগ নেই, এবং ভৌগলিকভাবেও বেশ দূরে অবস্থান করছি , মানসিকভাবেও ছাত্রগত আবেগের অবস্থান অনেকদিন পেরিয়ে এসেছি – এই তুমুল আলোড়নের উত্তাপ-তার ঢেউ সরাসরি যাকে ছোঁয়েনি , সে কিভাবে নেবে গোটা ব্যাপারটা ? – কি প্রতিক্রিয়া হওয়া উচিত ?
প্রাথমিক বিহ্বলতা বেশ জোড়ালোভাবেই আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরেছিলো , যেমন এই রাজ্যের –দেশের যেকোনো সচেতন মানুষকেই ধরেছে । ধীরে ধীরে যাদবপুর তথা অন্যান্য শিক্ষায়তনের ছাত্র ও নাগরিকদের একজোট হয়ে রাস্তায় নামা , নাগরিক চেতনার গোড়া ধরে নাড়া দেওয়া – এসব দেখতে দেখতে মুগ্ধ হতে হতে ধাতস্ত হলাম ক্রমশ আমার কাছে এটি আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা রইল না , ঘটনাক্রম সাজালে গত কয়েক বছরে ঘটেচলা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন অরাজকতা , কামদুনি, বারাসাত , পাড়ুই , ধূপগুড়ির ঘটনার সঙ্গে একইভাবে একই সারিতে বসালাম । তফাত এখানে ঘটনাস্থল দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষায়তন ও আক্রান্ত দেশের অন্যতম মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীরা এবং তা ঘটেছে কলকাতার মতো মহানগরের বুকে - এটুকুই । এখানে আক্রান্তরা সমষ্টিগত – প্রতিবাদও হচ্ছে সমষ্টিগতভাবে । প্রতিবাদের ভাষায়-আঙ্গিকে , তার প্রচারের স্মার্টনেশে যাদবপুরসুলভ মেধা স্পষ্ট । যেখানে অন্যান্য প্রতিবাদ্গুলি বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই একক , সংগ্রামও একক । সামান্য কিছু মানুষ হয়তো সঙ্গ দিয়েছেন সেইসব আক্রান্ত প্রান্তিক মানুষদের , প্রচার-প্রতিবাদ তেমন আন্তর্জাতিক হয়ে উঠতে পারেনি যাদবপুর কাণ্ডের মতো উপস্থাপনার অভাবে বা কোনো সহমর্মী প্রাক্তনী না থাকায় । তাদের লড়াই বরং বেশী কঠিন হয়ে ঊঠেছে নাগরিক আলোর বাইরে থাকায় ।
লুম্পেনরাজের এটাই বৈশিষ্ট , তারা সরাসরি আক্রমন নামিয়ে আনতেতো পারে ,কিন্তু সংগবদ্ধ প্রতিরোধের সামনে পড়লে দিশেহারা হয়ে যায় । তা না হলে এরকম উজবুকসুলভ পালটা উদ্ভট মিছিল – প্রতিবাদ কর্মসূচী নেয় ! যা শুধু লোক হাসিয়েছে । যা ঘটছে , যা ঘটেছে এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই – এরকমই হওয়ার ছিলো । যারা অবাক হচ্ছেন – আশাহত হচ্ছেন তাদের প্রতি সহানুভূতি রইল , কিন্তু এমনটারই কি কথা ছিলোনা ? বর্তমান শাসকদলের মধ্যে অতীতে যাঁরা প্রগতিশীলতা খুঁজেছিলেন , পেয়েওছিলেন হয়তো আশ্চর্য্যভাবে তাদের কেউ কেউ হয়তো সততার সঙ্গে আবার পথে নেমেছেন বা নামবেন, কিছু দায় যে তাদেরও নিতে হবে ! নাগরিক সমাজের পক্ষপাতদুষ্ট অবস্থান যে তারপর থেকেই বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে ! ভুল শুধরে নেওয়ার সময় এসেছে, আসুন বরং একটু বেশী সতর্ক হই ।
ছাত্র –ছাত্রীদের আন্দোলন চলছে । মনে করি শুধুমাত্র যাদবপুরে ঘটা ঘটনার পরিনাম নয় এই তুমুল ক্ষোভের বিস্ফোরন , তাহলে এই আন্দোলনকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা হবে । এই জন আবেগ নানান ঘটনা থেকে তিলে তিলে জমে ওঠা ক্ষোভের বিস্ফোরণ ! এবং এই বিস্ফোরনে আগুন লেগেছে সব থেকে দাহ্য ও সংগবদ্ধ ডালগুলোয়ে – যারা শুধু দাউ দাউ জ্বলবেইনা , ছড়িয়ে দেবে দাবানলের মতোই ! কি জানি ! আমি অন্তত সেভাবেই দেখছি । আর একটা জিনিস লক্ষ্য করার , বিভিন্ন পোস্টার , শ্লোগান , ফেসবুক স্টেটাসে একটা মরিয়া প্রয়াস – যাতে এই আন্দোলনে কোনো নির্দিষ্ট দলের রঙ না লেগে যায় । এই প্রয়াসে তারা এমন কথাও বলছে নাকি “ শতাব্দীর দুই সেরা ভুল –সি পি এম ও তৃণমূল !” বেশ , এখানে মূল প্রয়াস অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে যে- এই আন্দোলন যাতে হাইজ্যাক না হয়ে যায় , ভাবের ঘরে যেন চুরি না হয়ে যায় – খুব সঙ্গত প্রয়াস । কিন্তু তার জন্য এর থেকে বহুগুন বেশী ও ব্যাপক ঐতিহাসিক গন-আন্দোলনকে এভাবে নসাৎ করার বা অস্বীকার করার দরকার ছিলোকি ? এবং এই শ্লোগানেও কি রাজনীতির সঙ্গে থেকে যাচ্ছে না অর্বাচীন স্পর্ধা ? ভবিষ্যতে একইভাবে এই আন্দোলনকেও অস্বীকার করা বা হেয় করার রাস্তা খোলা রাখা হলো না কি ? ...প্রশ্ন জাগে ।
ছাত্ররা বলছে , আদালতের রায় প্রহসন- মানবোনা , আচার্য্যর পরামর্শ – মানবোনা , আলোচনা নাকি শুধুমাত্র বশ্যতা স্বীকার করানোরই প্রক্রীয়া ! যেমন সালিশি সভাগুলোয় ডেকে করা হয়ে থাকে আরকি ! - এখানে আমার যাকিছু ধারনা নিজেরকাছে রেখে মনে হয় ছাত্ররাই ঠিক করুক আন্দোলন কোন পথে যাবে , পরবর্তী পদক্ষেপ কি হবে, তাদের গড়ে তোলা আন্দোলনে নজর থাক কিন্তু অভিমুখ ঠিক করুক এক ও একমাত্র ছাত্ররাই , অন্তত এই পর্যায় । শুধু প্রয়োজন কিছু খোলামন ,পরমতসহিষ্ণুতা , প্রতিষ্ঠান লব্ধ উন্নাসিকতার কূয়াশার বাইরে দাঁড়িয়ে চিন্তার । মনে পড়ে কিছুদিন আগে কোনো এক এরকম ইস্যুতেই এক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীর বিরোধীতা করেছিলাম , নাঃ তার মতের নয় , তার অন্য এক ব্যক্তির মতামতকে অস্বীকার করার পদ্ধতির , সেই ব্যক্তিকে হেয় করার , যেহেতু সেই ব্যক্তি ‘যাদবপুরিয়ান’ বা ‘প্রেসিডেন্সিয়ান’ নন ! নিশ্চয়ই এটাই সমগ্র যাদবপুর বা প্রেসিডেন্সির ছাত্র –ছাত্রীদের ছবি তুলে ধরে না , কিন্তু এই প্রবনতা কিছু ক্ষেত্রে রয়েছে বৈকি । একথা আমরাও কি জানিনা এই সব বিশ্ববিদ্যালয়ের একসময়ের তরুন তুর্কীরা , যারা বিভিন্ন যুগে বিপ্লবের আগুন উগলেছেন অনর্গল ,তাদের বেশীরভাগই ক্যাম্পাস ছাড়ার পর ‘বিপ্লব’এর সুইচ অফ করে দিয়ে আপন প্রতিষ্ঠায় মনোনিবেশ করেছেন প্রথম বিশ্বের সৌখিন আবহাওয়ায় ! মধ্যে মধ্যে এদেশে বেড়াতে এসে স্কচ সহযোগে বিগত ‘বিপ্লব’এর নস্টালজিক স্মৃতিচারনের আগুন পোহান- ইতিহাস সাক্ষী । না , কাউকে আঘাত করার উদ্দেশ্যে নয় ,বরং বাস্তবতা তুলে ধরতেই এই প্রসঙ্গ উত্থাপন করলাম । এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে ক্যাম্পাসের বাইরে , জনমানসে । এর নেতৃত্ব ছাত্ররাই আছে , থাকবে । এর এই বিপুল সার্বজনীন আবেদন ধরে রাখতে কি কর্মসূচী নেবে তাও ঠিক করবে ছাত্ররাই , কে না জানে এমন অকূতোভয় –নিঃস্বার্থ সমর্পন একমাত্র ছাত্ররাই পেরেছে দেশে দেশে কালে কালে । কিন্তু যাদবপুর কি তখনই পথে নামবে যখন একমাত্র সে আক্রান্ত হবে ? একই আক্রমনকারী যখন একজন শিক্ষিকাকে আক্রমন করে কলকাতার বুকেই তখন তাকে সেভাবে পাওয়া যায়না কেন ? কারন তার নাম রোশোনারা মিশ্র ! সে বর্তমান বিরোধী দলনেতার কন্যা বলে ? তার সমর্থনে দাঁড়ালে ‘অরাজনৈতিক’ তকমা খোয়াবার ভয় আছে বলে ? বা এই রাজ্যের বিগতদিনে ঘটে চলা শাসকশক্তি দ্বারা অত্যাচার –অবিচারের ঘটনায় যাদবপুর এত নির্লিপ্ত কেন ? অন্যদিকে সমাজের ছাত্রনয় এমন একটা বিরাট অংশও কিন্তু একলহমায় পাশে দাঁড়িয়েছে যাদবপুরের , হাতেকলমে ,নৈতিক সমর্থনে ! একজন লিখলেন ‘প্রতিবাদ-বিপ্লব’ নাকি যাদবপুরের মজ্জাগত ! এবং তার বীজ প্রথিত আছে তার জন্মলগ্ন থেকেই । কিন্তু এই ‘বিচ্ছিন্নতা’র ভার কে নেবে ? প্রকৃত বিপ্লব বিচ্ছিন্নতা বহন করে আনে না – তাই দায়ীত্ব কি বেড়ে যাচ্ছেনা ?
যাইহোক, আশাবাদীরা সেখানেই বেশী আশা রাখে যার মধ্যে সম্ভাবনা দেখতে পাওয়া যায় । যাদবপুরের তথা অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলির সমৃদ্ধ ইতিহাস , তাদের অতীতে সামাজিক সম্পৃক্ততার ইতিহাস মানুষকে আগামীতেও পথ দেখাবে এই আকাঙ্খা রাখি । আমার মতোরা সেইদিকে আশাভরে তাকিয়ে আছি যেদিন এক নতুন ‘রাজনীতি’র সংজ্ঞা তৈরী করবে ছাত্ররা – কারন রাজনীতিহীন আন্দোলন যে সোনার পাথরবাটি ।
আমার ব্যক্তিগত মতামত লিখলাম খোলামনে । বিপুল এই জনমনজাগরনের আঙিনায় হতেই পারে তা খুব সামান্য ও অপ্রাসঙ্গিক , কিন্তু আমার দিক দিয়ে ষোলো আনা সৎ ।