দাঁড় কাক

রিমি দে

আর কিছুটা গেলেই কুসুমকুঞ্জ। সেটা বাম হাতে রেখে একটু এগোলেই সুজাতাবিভ্রাট মোড়। চলন্তিকার অর্থাৎ মৌবনীর মন মাথা দুটোই ছিল বিগড়ে। গতকালের শো এর পর বাপ্পাদা মানে বাপ্পা সিংহ নটবরের পরিচালক আচ্ছা ঝেড়েছে। এতো সিনিয়র অ্যাক্টর নাকি খুঁটিনাটির পার্ফেকশন চাই। মৌবনী বুঝেও না বোঝার ভান করে জেদ দেখাচ্ছিল। গ্রুপের ও পুরনো পাপী। বাপ্পা মৌবনীকে হাড়ে হাড়ে চেনে।
আরো রাগের কারণ, সজীব মণ্ডলের সামনেই ঘটনাটি ঘটে। ও বিষয়টা এঞ্জয় করছিল। ঠোঁট আর চোখের কোণে ছিল বাঁকা হাসির জমে থাকা। মৌবনী সজীবকে জানে। উল্টে পালটে দেখা আছে যথেষ্ট।
বুকের ওড়না স্কুটি স্টার্ট করার আগেই গলায় বেঁধে নিয়েছে। দাঁড়কাক দাঁড়িয়ে ছিল ওই কুঞ্জবনের আশপাশেই। দাঁড়কাক মানে মনের ভিতরকার কালোর কুচকুচ কিংবা কাকস্য পরিবেদনা। হিল্লোল তোলা কল্লোল। যার জন্য মৌবনীর কোলেও না পিঠেও না, একেবারে পেটের ভেতর পাতলুন। ওই মদাসক্ত কল্লোলের প্রচুর লাথির দাগ রয়েছে মৌবনীর ভরন্ত ভরপেটে। সেইজন্যই পাতলুন স্পেশ্যাল চাইল্ড জন্ম থেকেই। ছয়মাস ও থাকতে পারেনি ঐ মদখোর মাতাল কল্লোলের সঙ্গে। বাক্যবানের সোমরস আর মোমরস প্রিয়। ও নাকি শাফ্‌ল করা স্বামী স্ত্রীর বিবাহপরবর্তী ঘটক। এরকমই ঘটকালী করতে করতে কুড়ি বছরের এক তরুণীকে পটিয়ে ফেলে মৌবনীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ির আগেই। এনজিও থেকে পাওয়া থোকে বেশ কিছু টাকা ঐ কচি ললনার পেছনে ওড়ায় কল্লোল। পাতলুনকে পেটে নিয়েই ভিন্ন হয় মৌবনী। সে সময় সজীব মেণ্টাল সাপোর্ট দিয়েছিল।
আজ এত বছর পর বহু জল গড়িয়েছে। সে এখন দ্বিতীয় দাঁড়কাক। সজীব মিডিয়ার লোক। মৌবনীর রোদ ছাড়া ধরবেওনা, ছাড়বেওনা। দুনিয়াদারিতে ওস্তাদ, একটু কম পুরুষ। বেশি পুরুষে মৌবনীর আসক্তি নেই। আলপিন টু এলিফ্যাণ্ট প্রত্যেকের দাদা হবার সুবাদে এক মাসতুতো ভাই বৌ মিতার সঙ্গে তলে তলে। একদিন ছেলে রেখে ঐ তুতো ভাইয়ের সঙ্গে উধাও। সজীব বুদ্ধিহীন হৃদয়। মিতা গল্পটা এমনভাবে সাজায় যে ওর চলে যাবার কারণ মৌবনী। আইনের জল বহুদূর গড়ায়। সেই জল এখনও বহমান। পরে সত্যি মৌবনী আর সজীব সবুজ হয়েছিল। ঠিক এই মুহূরত্তে সজীব যা অস্বীকার করে। ওর মন বলে মিতা একদিন আসবেই। মৌবনী রক্তবর্ণে সজীবকে আরো কয়েক পোঁচ কালো মাখিয়ে গাঢ়কালো দাঁড়কাক বানায়। নদী সমুদ্র বন্যার পর ওরা এখন মাছ আর বঁটি।

বটের ছায়া মৌবনীর কোনদিন ছিলনা। নারীবিরোধী ওর মা মুনমুন নিজের নাড়িকাটা সন্তানকে কোনদিন ভালোবাসেনি। বাবার মৃত্যুর পর তাই আর বোলপুরে থাকতে পারেনি মৌবনী।
২/রিস্টওয়াচের ডায়মন্ড ম্যাক্সিমা তখনও অক্ষত। নির্বিঘ্নে প্রাণটাও ছিল। সুজাতা বিভ্রাট মোড়। গলায় বাঁধা ওড়নাটা শেষ পর্যন্ত কাল হয়েছিল। সিটি অটোর নিচে থেকে ছ্যাঁচড়াতে ছ্যাঁচড়াতে এসেও যা হবার তা হল স্কুটিটার। অফিসটাইমের ভিড়। আরো ভিড় জমে গেল অটোর নিচের ঐ ঘটনার পর। সামনে রেডক্রস সোসাইটি। দাদারাও দালালি শুরু করল। স্কুটি চলে গেল হসপিটাল, বিল মেটাভে অটো ড্রাইভার। ডাঁটো কিছু মস্তান শার্টের হাতা গুটিয়ে। থানা পুলিসের ভয়ের কুচো ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। লোকাল মিডিয়াও, এমনকি সজীব পর্যন্ত হাজির। মোটকথা থানা পুলিস হবে।
নটবরের শো এর জন্য পাতলুন হোমে ছিল কয়েকদিন। নাইট স্টে মানেই ছেলেকে হোমে রাখা। হোমই গন্তব্য ছিল মৌবনীর। এবার অটো ড্রাইভার। পৌঁছে দেওয়া, নিয়ে আসা, গায়ে পড়ে থাকা। দু'হাত ভর্তি টাকা। ঘটনা ঘটাচ্ছে তৃতীয় দাঁড়কাক, কুসুমকুঞ্জের মালিক। অঞ্চলের নামকরা নেতা মুন্ডা দাস। ওই নাকি এই খেলাটা হাতে নিয়েছে। মৌবনীকে আবিষ্কার করেছে দিনকয়েক। একা থাকে। পুরুষহীন বাড়ি। ব্যাঁকাত্যারা ছেলে। অউর কেয়া চাহিয়ে! তৃতীয় দাঁড়কাক মুন্ডা। থানা পুলিশ থেকে দূরে থাকুন, ড্রাইভারের কাঁচুমাচু মুখ - মুন্ডাদা পাঠালো ম্যাডাম...
রাজনীতির দোলার বল হতে লাগল মৌবনী ধীরে ধীরে। একটু একটু করে মাঠের দিকে আসতে থাকে বল।
নেপালী খবর পেয়েই ছুটে আসে। মৌবনীর খুব কাছের। বাপ্পাদার বৌ। দু'জনের প্রচুর প্রেম। কী হল মৌ -
এতক্ষণে মৌ থিতু হয়। ভালো লাগে। নেপালী পাতলুন কে খাইয়ে দেয়। মাথায় হাত বোলায়। নেপালী বলে পরের জন্মে যদি আমি ছেলে হই তোকে বিয়ে করব মৌ। মাথা রাখে নেপালীর বুকে মৌ।
- "মৌ তুই বোলপুর থেকে কেন এলি রে?ওখান থেকে কেউ আসে?"
- "মা আমাকে কোনওদিন স্বীকার করেনি, তোকে বলব কতবার! "
নেপালী মৌন থাকে কিছুক্ষণ। বাইরে চৈত্রের হাওয়া। উষ্কখুষ্ক গোটা দুনিয়া। নেপালী বলল, "আমার চোখের দিকে তাকা, সাগরকে দেখতে পাবি।"
বাঁকুড়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলের ক্রেশটায় বাচ্চাদের দ্যাখে, মায়েরা কাজে যায় বাচ্চাদের রেখে। বাচ্চা কাঁদে। মাকে ভুলিয়ে দেবার জন লাল ললিপপ দেয়। অন্য বাচ্চা ওটা কেরে নিলে কমলা চকলেট দেয়, ওটা শেষ হলে ছোটাভীম দেখায়। সন্ধে চলে আসে।
"দ্যাখ না, আমরাও আপেল পেলে পটলের কথা ভুলে যাই।"
মৌবনী বলে, "আমরা হয়ত ভুল করেই এই ভুলটা করি। সাগর কেমন আছে রে? চল একবার ওর ওখানে যাব। ছেলেটাকেও নেব। বাপ্পাদাকেও বলিস।"
থানা থেকে দু'বার ফোন এসে গেছে। পাতলুনের ন্যাপি পালটে মুখ তুলতেই দ্যাখে ড্রাইভার। "ম্যাডাম, মুন্ডাদা... বাইরে"
মৌবনী কেঁপে ওঠে। মাথা ঘোরে খুব জোরে। বাইরের দিকে যায়। আগে ড্রাইভার বেরোয়ে, পেছনে নেপালী।
মাঠের বল গড়াতে গড়াতে ভুল করে কোন দিকে যে যায়, সেটাই দেখবার।
লাল গলির ভিতর দাঁড়কাকগুলি কা কা করে।