চাঁদে জল

অলক্তা মাইতি

খবরের কাগজে দেখলাম “চাঁদে জল পাওয়া গেছে”। আমি তো বহুদিন আগেই জানতাম চাঁদে জল আছে, লবণ ও জল। আরেকটু খুঁজলে হয়তো বা দু-একটা ঝিনুক মুক্তোও পাওয়া যাবে। কে জানে হয়তো কোন মাঘী-পুর্ণিমার রাতে ভালবেসে দিয়েছিল ছোঁড়াটা। তখন তো এতো ভ্যালেন্টাইনস ডের চল ছিলো না। ওরা দুটিতে তখন প্রেম করতো শঙ্করপুর ঝাউবনে।
নাহ, সমুদ্র আর চাঁদ এক কলেজে পড়েনি কখনো। সমুদ্দুর উচ্ছল উদ্দ্যম, তরঙ্গে তরঙ্গে তার বাণিজ্য সুখ। অনিয়ন্ত্রিত আনন্দবাজার তাকে ঘিরে থাকে সব সময়। এই হয়তো পাড় ভাংছে ওমনি আবার পায়ের পাতা ছুঁয়ে আহ্লাদে বলে উঠবে “সরি”। ওর খামখেয়ালী মনটাকে খামে ভরবে সাধ্যি কার?
চাঁদ স্বভাবতই ঠিক এর উল্টো। আজ যেমন দেখছো ছোটবেলা থেকেই তেমন-ই, লক্ষ্মী মেয়ে। পেয়ারাগাছের ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরে যাবে চুপিচুপি, চোখাচুখি হলে ঘাবড়ে গিয়ে বলবে “ডিস্টার্ব করলাম”। সক্কলে ঘুমিয়ে পড়লে একা একা ছাদে হাঁটবে, গান গাইবে। একলা রাতের আলগোছে এলোমেলো ঝরা পাতার গায়ে কার যেন নাম লিখে রাখে। আঁকিবুঁকি কাটে কবিতার খাতায়। সমুদ্রের মতো কারুর সাথে কখনো তার দেখা হবার কথাই নয়। চাঁদের হাতে গ্রহ নক্ষত্রের এমন ছায়া আছে কেই বা জানবে বলো। গ্রহের ফের না হলে কি আর ওদের দেখা হয় তালসারিতে।
ভালবাসলে ছেলেদের যেমন পক্ষীরাজের সঙ্গ লাগে মেয়েদের তেমনি লাগে একফালি নীল সার্টিনের ওড়না। সেবছর সমুদ্রতটে সবচেয়ে বেশী বৃষ্টি হলো। জলের গায়ে ডানা লেগেছে যে। ওদিকে লজ্জানত চাঁদের গায়ে আসমানি মেঘ উড়তে উড়তে ওড়না হলো – কাব্যি করলে বলতে হবে “অবগুন্ঠন”। চাঁদের আবার জিভ জড়িয়ে আসে; “ভালবাসি”-র চারটে বর্ণ জ্যোৎস্না হয়ে ঝরতে থাকে নদী নালায়, খরস্রোতায়। মাথামোটা সমুদ্দুরের সাধ্যি কোথায় বুঝতে পারে অমন মেয়ের চোখের ভাষা। বাবুর তাই গোঁসা হল। নোনা জলে লেখা হল প্রথম প্রেমের চিঠি – “সমস্ত রাত তোমায় আমি বুকের মাঝে ধরে রাখি, তোমার বুকে খন্দ কত, হৃদ এবং উপহৃদের গর্তে গর্তে নকশা করা। তবু তুমি একবারও কি জায়গা দিলে তোমার বুকে?”
জবাব এলো কদিন পরে। “তোমার বুকে আমার প্রতিচ্ছবি দেখবো বলে রোজ আমি-ই তো ছুটে যাই তোমার কাছে। কই নিজের বুকে সমস্ত রাত আমায় নিয়ে জাগবে বলে তুমিতো আসো না কোন অমাবস্যার রাতে”।
অকারণ খুনুসুটিতে প্রেম বাড়ে, কান্না বাড়ে। জোয়ার ভাঁটা শরীর মাতায়। সমুদ্র তার সর্বশক্তি দিয়েও চাঁদের বাড়ি পৌঁছতে পারে নি কখনো। চাঁদ ছোঁয়া কি মুখের কথা। দশটা পাঁচটা লোকাল ট্রেনে সমুদ্রের তেজ আজকাল বেশ কম। নোনা জলে কি আর কর্পোরেশান অফিসের ফাইল লেখা যায়। চাঁদের সাথে শেষবার দেখা হয়েছিল গড়িয়াহাটায়। কথা হয়নি বিশেষ। রেস্তোরায় চাঁদ লিখে গিয়েছিল শুধু – “চিত্ত ভরিয়া রবে ক্ষণিক মিলন চির বিচ্ছেদেরে করি জয়”।
আজ সকালে কাগজে বেরিয়েছে – “চাঁদে জল পাওয়া গেছে”। আমি জানি গোটা একটা সমুদ্র আছে চাঁদের বুকে। আষাঢ়ে শ্রাবণে আজও কত লবণ জলে ওর গাল ভিজে যায়, সে খবর কি আমি রাখি না।