ছ ' ইয়ারি গল্প - তৃতীয় পর্ব

অর্ঘ্য বন্দোপাধ্যায়

পশ্চিমের আকাশ লাল হয়ে আছে । নাদু ভাবতে ভাবতে যাচ্ছিল এখন রবি মাস্টারের বাড়ি যাওয়া ঠিক হয় কিনা । হাতে কোন কাজ ছিল না , তাই দুপুর থেকে পরানের ঠেকে বসে অকারণে অনেকটা নেশা করে ফেলেছে । বাইরে এসে দেখে আলোতে হাত পা লাল হয়ে গেছে । খুব মজা লাগলো তার । সন্ধ্যেটাও কাটাবে ভেবেছিল এখানেই। আর যাওয়ার জায়গায়ই বা আছে কোথায় । আগে কয়েকদিন সন্ধ্যে হলেই শ্যামলীদের বাড়ি যেত গপ্পো করতে । আর মাসিমার হাতের চা । মাসিমা শ্যামলীকে নিয়ে একাই থাকে , ঠোঙ্গা বানিয়ে ওরা সাপ্লাই দেয় সাজিদপুরের সাপ্তাহিক হাটে । তাতে যা দু পয়সা ...। নাদু যেত , কিছু সুখ দুখখের কথাও হত , তারপর ঠিক আটটায় এক কাপ গরম গরম চা খেয়ে সোজা বাড়ির পথ ধরত । কদিন হল বন্ধ করেছে । আসলে সে নিজে ভেবে দেখেছে । দুজন একলা মেয়ে মানুষের বাড়ি , সেখানে রোজ যাওয়া কি ভাল দেখায় ? বিশেষ করে শ্যামলী এখন সোমথ্থ হয়েছে , গতরও বেশ আঁটসাঁট ...দুদিন পরে লোকে বলাবলি করবে , নাদুরও বাড়িতে বউ রয়েছে ... কথা এক কান থেকে পাঁচকানে যাবে ... একি শহর বাজার নাকি ? যে অন্য মেয়েমানুষের গায়ে হাত দিতে লোকে দুবার ভাবে না ? এখানে সমাজের ভয় আছে । তার ওপর আছে পার্টি ...তিল থেকে তাল হবে । নাদু নিজেকে বোঝায় , কিন্তু সন্ধ্যেবেলা বাড়ির দিকে মন টানে না তার ...পাও চলে না ।
কিছুদিন স্টেশনে গিয়ে বসে থাকত । একা । নির্জন স্টেশনে এক আধটা ট্রেন এসে
থামে , কিছু লোক নামানামি করে ... ট্রেন চলে গেলে আবার অনেক্ষণের জন্য ফাঁকা স্টেশন । অন্ধকার , জোনাকি জ্বলত , ঝিঁঝিঁ , কাদের গোয়াল থেকে একটা বাছুর ডাকল , দখিণের ধানক্ষেত দিয়ে হাওয়াও দিত খুব কিন্তু কুলি লাইনের আলোগুলোর সেটা সহ্য হল না । মিটমিটে শয়তানের মত নাদুর সঙ্গে মশকরা করতে উঠে পড়ে লাগল । ছোট হলুদ আলোগুলো একবার জোরে জ্বলে ওঠে আবার পরক্ষণেই প্রায় নিভু নিভু । নাদু বুঝতোও যে ওটা ভোল্টেজ আপ ডাউন । কিন্তু অনেক্ষণ একলা চুপ করে বসে থাকলে যা হয় , অলস একঘেয়েমিটাকে ভাল লাগতে আরম্ভ করে ...বিকেলটা সন্ধ্যেয় আর সন্ধ্যেটা রাতে গড়ানোর ছন্দ , সময়ের গায়ে দৃশ্য আর শব্দকে আটকে আটকে যে আল্পনা তৈরি করে সেটা নাদুর ভেতর একটা শান্তির জাল বুনে দেয় ... সেই আলসেমিটাকে কিছুতেই কাটাতে পারে না সে । উঠতে উঠতে সাড়ে নটার আপ লোকালটা হয়েই যায় । তাতেও খারাপ লাগত না নাদুর , যদিনা কুলিলাইনের আলোগুলো এতবার আপ ডাউন করত । তাল তাতে কাটে ... ঝিঁঝিঁ গুলোকে বেসুরো মনে হয় , হাওয়া না দিলে মনে হয় মশা কামড়াচ্ছে ... বিরক্তি বাড়ে ... আর তখনই মনে হয় মানুষের সঙ্গে কথা বলা দরকার । তাই কদিন হল পরানের ঠেকে যাতায়াত শুরু করছে ।
আজও কেমন কথা বলতে বলতে নেশাটা বেশি করা হয়ে গেছে । একটা অম্বলের ঢেঁকুর ওঠে ‘ শুয়োরের বাচ্ছা ! ’ বলেই পরানের মুখটা মনে পড়ে তার । আবার এগোতে থাকে । বউ মোবাইলে কল দিয়েছিল , ছোট মেয়েটার শরীরটা ভালো যাচ্ছে না কয়েকদিন হল ... আজ খুব বাড়াবাড়ি । রবি মাস্টারের কাছে বলে কয়ে ওষুধ আনতে যাচ্ছে সে । চারিদিকে এখনো সন্ধ্যে নামেনি তবে আলো ফিকে হয়ে আসতে আরম্ভ করেছে এবার ঝিঁঝিঁ ডাকতে আরম্ভ করবে । মেঝো পুকুরের দিক থেকে হাওয়া দিচ্ছে নেশাটা জমে উঠেছে । টলতে টলতে রবিকান্ত রায়ের বাড়ির দিকে হোমিওপ্যাথি ওষুধ নিতে চলেছে নাদু । দিনমজুর নাদু মণ্ডল ।
রবিকান্ত রায় লোক ভাল । কিন্তু বিদঘুটে । কি সব আজব ব্যাপারস্যাপার আছে তার । সবকিছু নাদু নিজে বুঝতেও পারে না । কি দরকার ? মাঝে সাঝে বিপদে আপদে কাজে লাগছে এই ভাল । এমনিতে নবমোহন ইস্কুলের মাষ্টার আর হোমিওপ্যাথিতে অল্প বিস্তর হাতযশ । কিন্তু লোকে বলে মাথাটা খারাপ আছে । সারাক্ষণ কি যেন ভাবে আর হঠাৎ হঠাৎ বিড়বিড় করতে থাকে মনে হয় সামনে কয়েকজন দাঁড়ানো , তাদের সঙ্গে কথা চলছে । আর যত্রতত্র ঘুরে বেড়ায় লোকটা । বনে বাদাড়েও যায় । একদিন ভোর রাতে দুলেদের বাঁশবাগানে পাতকেত্যর সময় রবি মাষ্টার হাজির । নাদু তো ভিরমি খাওয়ার জোগাড় ! পেট খারাপ সারতে তো দুদিন সময় দিতে হবে ? সকাল সকাল রবি মাষ্টার কি নিজের ওষুধের গুনাগুন যাচাই করতে হাজির এই বাঁশবাগানে ? নাদু তখনো উঠেও দাঁড়াতে পারেনি , ধাঁ করে ওর ডান পাশ ঘেঁষে বিড় বিড় করতে করতে রবি মাষ্টার মাঠপুকুরের দিকে চলে গেল । তার পর থেকেই লোকটাকে একটু সমীহ করে চলে
নাদু । কে জানে যদি গুনিন ফুনিন বেরোয় ? বলা তো যায়না কিছুই ... কিন্তু ওষুধ দেয় এক নম্বর ।
এইসব ভাবতে ভাবতে প্রায় মাস্টারের গেটের কাছেই পৌঁছে গেছে নাদু । কিন্তু হাত চোদ্দ দূরে এসেই থমকে দাঁড়ালো । গেটের কাছে দাঁড়িয়ে বিকট শব্দে হাসছে রবিমাস্টার ! সামনে দাড়ি গোঁফ ওয়ালা সাদা কাপড় পড়া একটা লোক দাঁড়িয়ে দেখছে । রবিমাস্টার তাহলে কি পাগলই হয়ে গেলো ? এবার কি গেট খুলে বেরিয়ে দৌড়বে ? বাঁদিকে গেলে কোন সমস্যা নেই কিন্তু ডানদিকে এলেই তো চিত্তির ! একেবারে নাদুর সামনে পড়ে যাবে । তখন কি করবে নাদু ? এই আশঙ্কায় নাদু দু পা পিছিয়ে আসে ।