‘ নয়া ’ দেশের পট ( প্রথম পর্ব )

প্রসেনজিৎ দত্ত

মুদ্রাদোষটা রক্তেই ছিল । কিছু হলেই ছড়া কাটা । যেমন ধরুন , ‘ হাবিল পড়িল শাস্ত্র কাবিল কোরান / তাহা হতে সৃষ্টি হল হিন্দু মুসলমান ... ’। ছড়াটি সমাজ - বিস্তারের আদি কথা । দুই ভাই হাবিল আর কাবিল আকালিমা ও গাছবিবি নামে নিজের দুই বোনকে বিয়ে করেছিলেন । আকালিমা সুন্দরী এবং গাছবিবি দেখতে খারাপ । দুই ভাইয়ের মধ্যে তাই শুরু হল হিংসাহিংসি । হিংসার জেরে মারা পড়ল কাবিল । শোকে পাগল হল হাবিল । তাহলে কি থমকে গেল সব ? কোনও এক কল্পনাবিলাসী পটুয়া সহজেই
বললেন , ‘ না ’ । আরও বললেন , ‘ মা হব গর্ভ হল , হাবিল কাবিল জন্ম
নিল / তাদের দুইটি ভাই দুই ধর্ম নিল , শাস্ত্রেতে আছে প্রমাণ । ’ আর বিশ শতকের এক মরমিয়া বললেন , ‘ এক সে আকাশ মায়ের কোলে , যেন রবি - শশী দোলে ’। তফাতটা এইটুকুই ...। কেবল মুদ্রাদোষটা রক্তেই ছিল ।

হাবিল আর কাবিলের এই কাহিনিটির সূত্র মেদিনীপুর জেলার ঠেকুয়াচকের অজিত
চিত্রকর । এর আগে হাবিল ও কাবিল নিয়ে যা পড়েছিলাম , তা সলিমুল্লাহ খান কৃত শার্ল বোদলেয়ারের কবিতার অনুবাদ । কবিতাটির নামও ছিল ‘ হাবিল ও কাবিল ’ —

‘১
হাবিলের জাত , ঘুমাও , পিয়ে যাও আর খাও
দিলখোশ মাবুদের মুখে মিঠা হাসি
কাবিলের জাত , দাও গড়াগড়ি দাও
পচা কাদায় , আর দাও নিজের গলায় ফাঁসি ।
হাবিলের জাত , তোর লোবান আতরদান
নজরান সুড়সুড়ি দেয় ফেরেশতার নাকে !
কাবিলের জাত , তোর যাতনার অবসান
কখনো হবে না হাজার কাতর ডাকে ?
হাবিলের জাত , তোর মাঠের ধান বাড়ে
মোটা তাজা হয় তোর গরু যত ,
কাবিলের জাত , তোর পেটের ভোক ঘাড়ে
খালি কঁকায় নেড়ি কুত্তার মত ।
হাবিলের জাত , চোদ্দপুরুষের চুলা জ্বেলে
পোহা রে আগুন , গতর তাতা
কাবিলের জাত , মাটির তলায় গর্ত মেলে
কাঁপ তোরা , গায় দে খেকশিয়ালের কাঁথা !
হাবিলের জাত , প্রেমে মশগুল হ , বাড়া !
ঝাড়বংশ , বাড়া রে সোনাদানা ।
কাবিলের জাত , হে প্রাণ পোড়া
প্রেম করতে তোর মানা ।
হাবিলের জাত গাল ফোলা পেট খোলা
খেয়ে খেয়ে যেমন ফোলে ঘূণপোকা !
কাবিলের জাত , পথে পথে বস পথভোলা
সংসার তোর পথে বসা হে বোকা ।


আহা , হাবিলের জাত , একদা তোর লাশ
করবে সবুজ পোড়া ছারখার জমিন !
কাবিলের জাত কাজ তোর নাগপাশ
আজও হয় নাই ছেঁড়া , জীবন কি সঙ্গীন
হাবিলের জাত , তোর লাজ ঢাকবে কে আজ
লোহা খান খান হবে যে চেলাকাঠে !
কাবিলের জাত , উঠ আসমানে আসমানবাজ
যা মাবুদরে ঠেলে ফেল এই দুনিয়ার মাঠে ! ’

তবে দূরে বসে গূঢ় কথা কতটাই বা অনুভব করা যায় ! তাই বেরিয়ে পড়েছিলাম । গন্তব্য অবশ্য ঠেকুয়াচক নয় । পশ্চিম মেদিনীপুরের নয়া । হাওড়া থেকে সকালের ট্রেন । বালিচক স্টেশন ঘণ্টা দুই - আড়াই পথ। তারও পরে বাসে পুরো একটি ঘণ্টা । অনাথের দৈব সখার দেখা পাবার আশায় অবশেষে পৌঁছলাম পিংলা থানার অন্তর্ভুক্ত ছোট্ট গ্রাম
নয়া 'য় । সরু রাস্তার সাঁকো পেরতেই পটুয়াদের ঘর । বাকচিতের আশায় চলতে চলতে মনে পড়ছিল একটি কিংবদন্তি । দেশে তখন রাক্ষসরাজ বকরাক্ষসের দাপট । প্রতিদিন খাদ্য হিসেবে একজন করে মানুষ যেত তার কাছে । এটিই ছিল চুক্তি । পালা পড়ল যুদ্ধাপতি গুণিনের । তিনি জাদুকরও । কিন্তু প্রাণের ভয়ে জাদুটোনা যদি বৃথা যায় ? ঈশ্বরই সহায় তখন । ঈশ্বর এলেন ফকিরের বেশে । অভয় দিলেন , ‘ ভয় নেই ’। শুধু বকরাক্ষসকে বলতে হবে , তার মতো দেখতে একটা রাক্ষস জাদুকরকে খেতে চায় । আগে বিচার হোক তার । যথাসময়ে জাদুকরের কাছে এ কথা শুনল রাক্ষস । রেগে জানতে চাইল , ওই রাক্ষসের ঠিকানা । ভগবানের কথা মতো জাদুকরের জবান উচ্চারণ করল , ‘ আয়নাপাহাড় ’। তারপর ওই আয়নাপাহাড়ে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে নিজেকেই ক্ষতবিক্ষত করে মারা গেল বকরাক্ষস । জাদুকর গামছায় বকরাক্ষসের রক্ত মাখিয়ে
বলল , সে হত্যা করেছে রাক্ষসকে । নবাব খবর পেতেই নির্দেশ এল , এই কাহিনি সমাজে প্রচার করে মানুষের ভয় ভাঙানো হোক । জাদুকরও গল্পটি নিজের সুরে লিখে এবং এঁকে শুরু করল প্রচার । আর এতে তার রোজগারও বাড়ল । বর্তমান পটুয়ারা তারই উত্তরপুরুষ । পুলিন চিত্রকর মারা গিয়েছেন বছর পাঁচ হল । তাঁর তিন ছেলে ননীগোপাল চিত্রকর , আনন্দ চিত্রকর এবং এবাদৎ চিত্রকর । বাবার কাছ থেকে শোনা এই কাহিনিটির ভরণপোষণ করে চলেছেন তাঁরা । জানা গেল , এমন কিংবদন্তি সৃষ্টি হয়েছিল মুসলমান আমলে । বৌদ্ধধর্মের কাহিনি , জাতকের নানা কাহিনিও পেশ করা হত পটের মাধ্যমে । আবার সপ্তম শতকের প্রথম দিকে রচিত বাণভট্টের ‘ হর্ষচরিত ’ - এ ‘ যমপট ’ ব্যবসায়ীদের কথা উল্লেখ আছে । সেখানে রাজা হর্ষবর্ধন নিজে একজন পটুয়াকে কয়েকজন ছেলের মাঝে বসে পট বোঝাতে দেখেছিলেন । আগ্রহ বাড়ছিল । তাই কৌতূহলে খোঁজ লাগালাম দুখুশ্যাম চিত্রকরের । বাড়িতে অনুপস্থিত । তখন চায়ের দোকানে উনি । চায়ের ধোঁয়া উড়ল । এক কাপ চায়ের মৌতাতে শুরু হল কথা বলা । দুখুদার বয়স সত্তর ছাড়িয়েছে । জন্ম কবে জিজ্ঞেস করতেই বললেন ,
‘ বাংলায় ১৩৫১ । ’
— তারিখটা মনে আছে ?
— বিহসপতিবার ।
আত্মভাবে মশগুল । তাই ওই দিকে কথা না বাড়ানোই ভালো । অবাক ব্যাপার কি
জানেন ? দুখুদার জন্ম কলকাতার শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে । নিবাস ছিল কালীঘাট । পট আঁকার হাতেখড়ি কালীঘাটেই । প্রতিমাও গড়তেন । রক্তে যাযাবরের নেশা । বাবা মারা যাবার পর পূর্ব মেদিনীপুরের ঠেকুয়াচকে মামাবাড়িতে ঠাঁই নিলেও বড়মামার সঙ্গে নয়ায় এলেন । ষাটবছর ধরে নয়ায় তাঁর ওই ছোট্ট বাসা যেন শিল্পীঘর । স্থানভেদে কি পটের তফাত ? বিশ্বাস করেন । কিন্তু স্থানীয় বিশ্বাসে পটের তফাত , বিশ্বাস করেন না । পট শাস্ত্র - বিশ্বাসে বিবর্তিত ।
— হিঁদু , মুসলিম , সাঁওতাল — সবাই নিজেদের শাস্ত্র অনুযায়ী পট আঁকে ।
শাস্ত্র - বিশ্বাসে পট । পট পুরাণের কথা গায় । গাজির গান গায় ।
— এ সব জানলেন কী করে ?
— শুনে শুনে ।
ভাবছিলাম । বেদ যদি শ্রুতি হয় , তবে এও যে তাই ! ধর্মকথা মুখে শুনে , মনে রেখে , গানবেঁধে , ছবি এঁকে আজও মাধুকরী খোঁজেন চিত্রকরেরা ।
— গাজির পটের একটা গান গাইবেন ?
— নাহ , বারণ আছে ।
হাতে পট ছাড়া নাকি পটের গান গাওয়া বারণ । কার বারণ , এই উত্তর থাকুক না অজানা । “ জগতে কেন জানতে হবে সবকিছু ? মানুষের ভাবনাচিন্তার চিরকালীন বিষয় বা বিষয়াতীত বলে থাকে কিছু — বহুকিছু — অনন্ত , যার ‘ কিছু ’ নেই ; সমগ্রও নেই । এটুকু না - থাকলে , মানুষ কি সবই বুঝে ফেলবে ! — বুঝে ফেলার পর করবে কী সে ! এক অতি - শূন্যতার মধ্যে পড়ে যাবে না ! ”

( ক্রমশ )