গোলাপ কেন ফুটলো ?

অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়

নান্দীকারের ‘ নগরকীর্তন ’ নাটক হচ্ছে । মঞ্চে যে জায়গাটা পর্দার বাইরে থাকে, সেখানে মঞ্চের সব আলো এসে পৌঁছয় না অনেক সময় । ঐখানে এসে দাঁড়ালে অভিনেতাকে স্পটও কভার করতে পারে না । নগরকীর্তন নাটকে , রুদ্রপ্রসাদ একবার এসে দাঁড়ালেন সেখানেই । সংলাপ বলতে বলতে । আলো তাকে নিতে পারছে না । তবু তিনি দাঁড়ালেন । কিছুক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে সংলাপ বললেন । আবার ফিরে গেলেন ডীপ স্টেজে । নাটক শেষে গ্রিন - রুমে গেছেন এক অনুসন্ধিৎসু সাংবাদিক । স্যর তখন মুখের মেকাপ তুলছেন আয়নার সামনে ব’সে । সাংবাদিক ঘরে এসে নিজের পরিচয় দিলেন । এবং অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে জানালেন তিনি একটি জিনিস জানতে চান । স্যরের সম্মতিতে সাংবাদিকটি শুধোলেন তাঁর জিজ্ঞাস্য প্রশ্নটি । নাটকে একসময় রুদ্রপ্রসাদ স্টেজের যে - জায়গায় এসে সংলাপ বলছিলেন , সেটা তো থিয়েটারের ব্যাকরণ সম্মত নয় । তিনি এরকমটা কেন করলেন ? প্রশ্ন শুনে , আয়নার সামনে ব’সে মেকাপ তুলতে তুলতে রুদ্রপ্রসাদ সাংবাদিকটিকে বললেন , গোলাপ কেন ফুটলো ?
ছেলেবেলায় বাবার মুখে একটা গল্প শুনেছিলাম । সত্যাসত্য জানি না । একবার এক ফরাসি শিল্পী অনেক রাত জেগে খুব খেটে একটা ছবি এঁকেছেন । কোনো এক মেয়ের মুখ । তো , এঁকে ওঁর মনে হয়েছে , এই ছবিটা নিখুঁত । তিনি করলেন কি , প্যারিসের রাস্তায় টাঙিয়ে দিয়ে এলেন ছবিটা । আর নিচে লিখে দিলেন , ‘ যদি কেউ থাকেন যিনি এই ছবির ভুল ধরতে পারবেন , দয়া ক'রে তিনি সেই ভুল জায়গায় একটা মার্ক ক'রে দেবেন । ’ রাস্তা দিয়ে নানান লোক যাচ্ছে । সবাই দেখছে ছবিটা । কিন্তু কেউ কোনো খুঁত বের করতেই পারছে না । কোনো কিছু করতে বলার পর , সেটা করতে না - পারলে , যাঁকে বলা হয়েছে কাজটি করতে তিনি অনেক সময়েই বিরক্ত
হন । রেগে যান । এ’ জন্যেই মানুষ ‘ মানুষ ’ । তাঁর কিছু একটা করা চাই । সেইসব পথচারীও তাই - ই করছিলেন । রাগ করছিলেন । ফলে , তাঁরা করলেন কি, ছবিটায় কোনো ভুল না পেয়ে রেগে গিয়ে সারা ছবি জুড়ে হিজিবিজি কাটাকুটি দাগ কেটে দিলেন । এতো কষ্ট ক'রে রাতের পর রাত জেগে আঁকা শিল্পীর সেই ছবিটা এক নিমেষে নষ্ট হয়ে গেল । সন্ধ্যায় , শিল্পী এসে ছবিটার এই দশা দেখে খুব দুঃখ পেলেন । তিনি ছবিটা ওখান থেকে খুলে নিয়ে ফিরে গেলেন নিজের ঘরে । তারপরে আবার রাত জেগে আঁকলেন সেই একই ছবি । শুধু এবারে একটা জায়গায় ইচ্ছে ক'রে একটা ভুল রেখে দিলেন । এবং আবার পরদিন সকালে রাস্তায় টাঙিয়ে দিয়ে এলেন সেই ছবি । নিচে লিখে এলেন ঐ একই কথা । ' যদি কেউ থাকেন যিনি এই ছবির ভুল ধরতে পারবেন , দয়া ক'রে তিনি... ' ইত্যাদি ইত্যাদি । এবারে পথচারীরা আবার দেখলেন ছবিটা । দেখে সবাই - ই বের করে ফেললেন কোথায় এর ভুল । আর সেই ভুল জায়গাটায় পেন্সিলে একটা ছোট্ট মার্ক ক'রে দিলেন । ছবিটা বেঁচে গেল । এই যে ভুল ধরা শ্রেণি , এঁদের নিয়ে মনোজ মিত্র লিখেছিলেন এক বড়ো মজার [ ? ] নাটক । ' চোখে আঙ্গুল
দাদা '। এঁরা সবসময় সবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেবেন কে কোথায় কোন্‌ ভুল করেছে । কোথায় ব্যাকরণ মেনে চলা হয়নি । কোথায় বচনজ্ঞান ভুল আছে । উঁহুহুহুহুউউউউ নুনটা না আর আধচামচ কম দরকার ছিল বুঝলে হে । এঁরাও ইণ্টেলেকচুয়াল । নাট্যগুরু মনোজ মিত্র বলেছিলেন , ‘ অহো , বুদ্ধি কিনা চোয়ালে ’ ।
আমার বাবাকে দেখেছি বাঙলায় বড্ড ভয়ঙ্কর রকমের কাঁচা । অথচ এই মানুষটি কি অসাধারণই না জানতেন ইংরেজি ভাষাটা । আমি আজ যদি কিঞ্চিৎ এই ভাষাটা শিখে থাকি , বুঝে থাকি , তবে তা ' দুজন লোকের জন্যেই । একজন তো এই পিতৃদেব । আর দ্বিতীয়জন স্টেটসম্যান পত্রিকা । তো যাই হোক , সে অন্য গল্প । বাবার বাঙলা কাঁচাত্বর একটা ঘটনা খুব মনে আছে । তখন আমরা মামাবাড়িতে । নদীয়া জেলায় , পায়রাডাঙ্গায় । ঘর ভর্তি লোক । অতিথিরা এসেছেন । বাবা , সে বাড়ির জামাই , তাঁর হঠাৎ সাধ হয়েছে তিনি একটু শুদ্ধ বাঙলা বলবেন এইসব অভ্যাগতদের সামনে । সেদিন বাবার খুব পেটে ব্যথা হচ্ছিল কোনো কারণে । মিষ্টি খেতে দিয়েছে বাবাকে , বাবা খাবেন না । তিনি বলছেন , বেশ জোরেই বলছেন , 'আসলে আজ আমার নিতম্বে বেশ ব্যথা , আজ এসব খাব না । ' মা তো বুঝে ফেলেছেন ব্যাপারটা । কটমট ক'রে তাকাচ্ছেন বাবার দিকে । বাবা বুঝতে পারছেন না মা এইভাবে তাকাচ্ছেন কেন তাঁর দিকে । পরে সবাই চলে যাওয়ার পর মা যখন বাবাকে বললেন ব্যাপারটা , শুনে বাবার কথা , 'আরে কথা তো হল মানুষকে ব্যাপারটা বোঝাবার জন্য । আমি তো নিতম্ব দিয়েই ওনাদেরকে বোঝাতে পেরেছি আমার পেটে ব্যথা , তাই মিষ্টি খেতে পারব না । সমস্যা তো হয়নি কিছুই ।' কিন্তু জগতে সব মানুষ হন না এর'ম।
তরুণ ফারসি সমালোচক পারহাম শাহরজের্দির একটি প্রবন্ধ , ‘ Risquer la Poésie ’ [ রিস্ক অফ পোয়েট্রি / কবিতার বিপদভূমি ] বাঙলায় অনুবাদ করেছিলাম কিছু মাস আগে । সেখান একটা অংশ তুলে দিচ্ছি এখানে — ‘‘...ভাষা এই পৃথিবীর ভিতটাকে নির্মাণ করেছে এবং করছে । এই ভিতটাকে এক হাত নিতে , সমস্ত পরিস্থিতি ও কার্যক্রমের সাজানো বিন্যাসটাকে হারাতে , এই সাজানো বিন্যাসের ধারাটাকে ভাঙতে , আমরা দুনিয়ার ভিত্তিপ্রস্তরেই হাত দেব । বিপদ শুরু হয় তখনই যখন কবি উঠে
দাঁড়ায় , দৈনন্দিন ভাষার বিরুদ্ধে , যোগাযোগের ভাষা ও কথোপকথনের ভাষার
বিরুদ্ধে , ভাষার সাধারণ ব্যবহারের বিরুদ্ধে , যখন সে অবিচলিত দৃঢ় উঠে দাঁড়ায় চলতি দুনিয়ার বিরুদ্ধে । [...]... ব্যাকরণ , ফারসিতে একে বলা হয় ‘ Dasture zabaan ’, যার আক্ষরিক অর্থ ‘ the order of tongue ’. অর্ডার ? এমন একটা জিভ যে হাতকে আদেশ করছে ? কে দিচ্ছে আদেশ ? কিসের আদেশ ? ব্যাকরণ তো একটা মরাল কনস্ট্রাক্ট একটা নৈতিক কাঠামো , কি করা যাবে আর কি করা যাবে না — আগে থেকে ঠিক ক’রে দেওয়া এরকম একটা তালিকা থেকে যা ভবিষ্যতের ভাষাকে নির্ধারণ করে । কিন্তু কবিতা আর কবি থাকেন সেই আদেশ ও আদেশের ভাষাকে বিচ্ছিন্ন করতে , তাকে দুনিয়া থেকেই সরাতে , ভাষার একটা নতুন বাঁক সৃষ্টির জন্য। তবুও , বিপজ্জনক কবির জন্য ভাষা শুধু একটা উপায় বা কোনো মাধ্যমমাত্র
নয় , ভাষা তার কাছে পুরোটা , এবং তার কাজের মূল লক্ষ্যবস্তু । ...’’
‘ ব্যাকরণ তো একটা মরাল কনস্ট্রাক্ট একটা নৈতিক কাঠামো , কি করা যাবে আর কি করা যাবে না — আগে থেকে ঠিক ক’রে দেওয়া এরকম একটা তালিকা থেকে যা ভবিষ্যতের ভাষাকে নির্ধারণ করে ’। পৃথিবীর তাবড় বৈয়াকরণদের এটা কে বোঝাবে
বলুন ? আমি বলছি না ব্যাকরণের প্রয়োজন নেই । অবশ্যই আছে । আর ব্যাকরণের প্রয়োজন - অপ্রয়োজন নিয়ে আমিই বা বলার কে ? আমি একটা ইশকুল পালানো ছেলে । সে অধিকারই নেই আমার । ব্যাকরণ না থাকলে ইশকুল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসে পড়ানোটা কি হবে ? আর পাওয়ার প্লে - টাই বা কে খেলবে বলুন ? মুরুব্বিগিরি করার জন্যে হাতে তো একটা ছড়ি চাই নাকি ? ব্যাকরণের প্রয়োজন আমার কাছে , ঐটুকুই । ঠিক যের’ম, আমার কান্না পেলে আমি এস.ডি.ও. অফিসে যাই না অনুমতি নিতে । কিম্বা কান্নাটা কেঁদে ফেলার পরে মনোবিজ্ঞানের বই খুলে দেখি না , আমি ঠিক পদ্ধতিতে কেঁদেছি কিনা । রেগে গেলে ডি.এম.-এর কাছে রাগ প্রকাশের কানুন - বিধি জানতে ছুটি না । বরং কেঁদে ফেলি । রেগে যাই । সবাই - ই তাই - ই করেন । তেমনিই , সাহিত্যেও , বলা ভালো , যেকোনো ক্রিয়েটিভ কাজেই ।
‘ এদিকে বাঙালি বড়ো অসহায় রবীন্দ্রনাথ বিনে ’ । সেই রবি ঠাকুর , ‘ চুম্বন ’ কবিতায় , গোটা কবিতাতেই কোত্থাও ‘ ওষ্ঠ ’ কথাটা বললেনই না । ইশশশ । বলুন তো , কি যাচ্ছেতাই ভুল করে গেলেন ভদ্রলোক । বারবার ক’রে সারা কবিতায় খালি বলে গেলেন , ‘ ভাঙিয়া মিলিয়া যায় দুইটি অধরে ’, ‘ দুখানি অধর হতে
কুসুমচয়ন ’, ‘দুটি অধরের এই মধুর মিলন ’। এ কি কেলেঙ্কারি । একজন মানুষের দুখানিই ঠোঁট হয় জানি । কিন্তু , দুটো ঠোঁটই নিচের ঠোঁট ? কল্পনাও করা যাচ্ছে না দৃশ্যটা । চুমু খাওয়া তো দূরের কথা । নিচের ঠোঁটে ডেঁয়ো পিঁপড়ে কামড়ালে যখন ফুলে যায় , একমাত্র তখনই দুখানা নিচের ঠোঁট গজাতে পারে মানুষের ।
মাসখানেক আগে ফুটবলের একটা বিশ্বকাপ হয়ে গেল । ভাগ্যিস হ’ল খেলাটা । হ’ল বলেই তো আমি জানতে পারলাম , এই যে আমি আর্জেন্টিনা বলি , আমার মতো আরো অর্বাচীন সেটাই বলে আসছেন বহু যুগ ধ’রে , এটা নাকি ভুল । কথাটা হচ্ছে, ‘ আর্খেন্তিনা ’। আমার স্প্যানিশ জানা বিদ্বজন বন্ধুরা এমনটাই বলছেন । ঐ ভাষায়
জ - এর উচ্চারণটা খ - এর মতো । ব্যাপারটা অস্বীকার করছি না । কিন্তু তাই ব’লে আমাকেও বা একজন বাঙালিকেও কেন আর্খেন্তিনা বলতে হবে এইটে মাথায় ঢুকছেই না কিছুতে । এই যে আমার নাম অর্জুন , সমস্ত অবাঙালি বন্ধুরা যে আমার ‘ আর্জুন ’ বলেন , তাঁরা কি তাহলে ভুল বলেন ? মাসখানেক হ’ল একটি গ্রিক ক্লাসে ভর্তি
হয়েছি । ভাষাটি শিখব ব’লে। গিয়ে জানতে পারলাম আরো ভুলের গল্প । আদতে ঐ দেশটার নাম নাকি গ্রিসই নয় । তার নাম ‘ এল্লাদা ’। অন্তত গ্রিকরা সেটাই বলেন । প্লেটো আসলে প্লেটো নন , তিনি প্লাতন । আলেকজাণ্ডারও আসলে আলেকজাণ্ডার নন । তিনি আলেক্স আন্দ্রুস । কথা হল , আমার জিভের উচ্চারণের সাথে তো আমার সভ্যতার জল - মাটি - হাওয়া ও মানুষ — এঁরা মিশে আছেন । একজন গ্রিক আলেকজাণ্ডারকে আলেক্স আন্দ্রুস বলছেন , সেটাই - ই বলবেন তিনি । কিন্তু আমার আলেকজাণ্ডারে ভুল কোথায় ? আমি তো আলেকজাণ্ডারকেই চিনি ।
শুনেছি , শিল্পী কিশোরকুমার একবার কোনো একটি গানে , যে গানটি দরবারী রাগের ওপর ছিল , সেখানে একজায়গায় কোমল 'নি' ঠিকমতো লাগাতে পারছিলেন না । কেউ তখন তাঁর ভুল ধরিয়ে দিচ্ছিলেন বারবার । একসময় কিশোর বললেন , যদি ওখানে শুদ্ধ নি - তেই ইমোশনটা প্রকাশ পায় তাহলে আমি শুদ্ধ নি - টাই লাগাবো , কোমল নি দেবো না । দরবারীর জাত রাখার কোনো দায় আমার নেই ।
ক্রিয়েটিভিটির কোনো দায় নেই ব্যাকরণের মরাল কনস্ট্রাক্ট - এর জাত রাখার । আমার মাঝে মাঝেই মনে হয় , ব্যাকরণ অনেকটা সেন্সর বোর্ডের মতো । লাল কালির
রাইট - কাটা দেবার জন্য ব’সে আছে । কিন্তু ব্যাকরণ তো নিজে নিজে এ’ কাজ করতে পারে না । লাল পেনটা তো ধরতে হয় কাউকে । তাঁরাই রায় দেবেন, দেড় মাত্রা কম হল এখানে । ঐখানে কোমল নি - টা লাগলো না হে । এইখানে বচনজ্ঞান ঠিক নেই তোমার । আমি কিন্তু শুনতে পাই এসব রায় ছাপিয়ে আরেকজন রায় দিচ্ছেন।
‘ ব্যাকরণ মানি না ’।