গল্প হলেও সত্য

সুস্মিতা মৈত্র

থ্রিলার মুভি দেখতে আমার বরাবরই খুব ভালো লাগে । কিন্তু এই মুভিটা দেখতে গিয়ে কেমন যেন দমবন্ধ হয়ে আসছিল । অবাক লাগছিল , বিরক্ত লাগছিল , নিজেকে খুব অসহায় লাগছিল । এতগুলো মানুষ , কি করে এমন পাগলের মতো ব্যবহার করতে পারে সেটা ভেবেই পাচ্ছিলাম না । শেষ পর্যন্ত যখন জেলখানার বাইরে বেরিয়ে এলো সবাই , আমিও যেন অনেকক্ষণ থেকে আটকে রাখা নিঃশ্বাসটা ছাড়লাম ।
ছবিটার নাম ‘ দ্য এক্সপেরিমেন্ট ’। মুক্তি পেয়েছিল ২০১০ সালে । যখন জানতে পারলাম ছবিটা একটা সত্যি ঘটনা অবলম্বনে তৈরি , কৌতূহলটা জাগল তখনই । হাতের কাছে ছিল ইন্টারনেট । খুঁজলাম , পেয়েও গেলাম । জানতে পারলাম গল্পের পিছনে সত্যি ঘটনাটা ।
ঘটনাটা একটি বিখ্যাত ঘটনা । বিখ্যাত না বলে কুখ্যাত বলাটাই বোধ হয় ঠিক হবে ।
সালটা ১৯৭১ । আমেরিকার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকোলজি বিভাগের প্রোফেসর ডঃ ফিলিপ জিমবারডো দুই সপ্তাহব্যাপী একটি গবেষণামূলক পরীক্ষা করবেন ঠিক
করলেন । জেলখানা মানুষের ব্যবহারকে নিয়ন্ত্রন করে কিনা , সেটা যাচাই করাই ছিল ওনার মূল উদ্দেশ্য । জেলে কয়েদীদের সঙ্গে যেরকম কদর্য ব্যবহার করা হয় বা জেলের পাহারাদাররা পদাধিকারবলে যে ক্ষমতার অধিকারী হয় তা এই মানুষগুলির মানসিকতায় কোনও প্রভাব ফেলে কিনা - সেটাই দেখতে চান উনি । এই পরীক্ষায় স্বেচ্ছায় যোগদানকারী ( volunteer ) চেয়ে স্থানীয় সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দেওয়া হল । দিনে পনেরো ডলার করে দেওয়া হবে । ১৯৭১ সালের পনেরো ডলার আজকের হিসেবে প্রায় ৮৮ ডলার । ভারতীয় টাকায় প্রায় ৫৩৩৫ টাকা । অঙ্কটা নেহাত কম নয় ! একটু বাড়তি আয় হলে কার না ভালো লাগে ? ৭০জনেরও বেশি পুরুষ এই বিজ্ঞাপনের ডাকে সারা দিল । এদের মধ্যে থেকে বাদ গেল তারা , যারা অপরাধী বা মাদকাসক্ত । যাদের শারীরিক বা মানসিক সমস্যা আছে এমন সকলেও বাদ গেল । শেষ পর্যন্ত ঝাড়াই বাছাই করে পরীক্ষার অংশগ্রহণকারী হিসেবে নেওয়া হল মাত্র চব্বিশজন কলেজ ছাত্রকে । এরা সবাই আমেরিকা বা কানাডার নাগরিক । সুস্থ , স্বাভাবিক , শক্তসমর্থ , বুদ্ধিমান ও মধ্যবিত্ত যুবক ।
ইউনিভার্সিটির সাইকোলজি বিভাগের বেসমেন্টে জেলখানা সাজানো হল বেশ নিপুণভাবেই । কয়েদীদের সেল , তার দরজা , খোলা জায়গা , লাউড স্পিকার , এমন কি একদম সত্যিকারের জেলখানার মতই এই সাজানো জেলখানায় একটা অন্ধকূপও রাখা হল । আরও কঠিন শাস্তি দেওয়ার জন্যে সেই অন্ধকূপে অবাধ্য কয়েদীকে একদম একা আটকে রাখা যাবে । সারা জেলখানায় কোন ঘড়ি বা জানলা নেই , তাই সময় বোঝারও কোনও উপায় নেই । সমস্ত ঘটনা রেকর্ড করে রাখার ব্যবস্থা করা হল । মানে , নাটকের মঞ্চ প্রস্তুত , শুধু নাটকটা শুরু হলেই হয় । কয়েদী আর রক্ষী , মূল কুশীলবদের ভাগ করা হল এই দুই ভাগে । এখন কোন বারো জন হবে কয়েদী আর কোন বারো জন হবে রক্ষী , সেটা ঠিক করা হল কয়েন টস করে । মজার ব্যাপার হল এই যে পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগে পর্যন্ত এরা সবাই কিন্তু পরস্পরের অচেনা ছিল । ডঃ জিমবারডো নিজেও মঞ্চে নামলেন , নিলেন জেলসুপারের ভূমিকা ।
এক্সপেরিমেন্ট শুরুর দিন বেশ ঘটা করে লোকাল পুলিশের সাহায্যে সর্বসমক্ষে হাতে হাতকড়া পরিয়ে বাড়ি থেকে তুলে আনা হল বন্দীদের । অভিযোগ - দলবদ্ধ সশস্ত্র ডাকাতির । তারপর চোখ বেঁধে ওদের নিয়ে আসা হল সাজানো জেলখানায় । সাজানো এই গ্রেপ্তারের ঘটনায় কিন্তু কোনও ফাঁক ছিল না । বন্দীদের অপরাধের গুরুত্ব বুঝিয়ে
বলা , তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে তাদের হাতের আঙ্গুলের ছাপ নেওয়া , নগ্ন করে সার্চ করা , ওদের শরীরে কোন উকুন থাকতে পারে এই সন্দেহে ওষুধ স্প্রে করা কোনও কিছুই বাদ রইল না । বরং বাড়তি যোগ হল অন্তর্বাসহীন ঢলঢলে মেয়েদের পোশাকের মতন ইউনিফর্ম আর পায়ে শিকল । এই মেয়েদের পোশাকের মতন ইউনিফর্মের ব্যাপারটা কিন্তু আসল জেলখানার থেকে আলাদা । এখানে ইচ্ছাকৃত এই বিশেষ ধরনের ইউনিফর্মের উদ্দেশ্য একটাই । কয়েদীদের ম্যাসকুলিনিটিকে প্রশ্নের মুখে রাখা । জেলখানায় কয়েদীর কোনও নাম নেই । সবাই জেলকয়েদী । আর জেলে ঢোকার পর থেকে সবাই এক একটি নম্বর মাত্র । এই নম্বরের বাইরে কোনও অস্তিত্ব নেই ওদের । এক কথায় , পুরুষ তো নয়ই , এমনকি আর মানুষও নয় । জেলকয়েদী হিসেবে ওরা অসহায় এবং ওদের যে কোনও ক্ষমতা নেই সেটাও নাটকের একদম শুরুতেই বুঝিয়ে দেওয়া হল ।
অপরপক্ষে এক্সপেরিমেন্ট শুরু হওয়ার আগের দিন কোন বিশেষ ট্রেনিং না দিলেও রক্ষীদের এটা বুঝিয়ে দেওয়া হল যে এই জেলখানায় ওরাই সর্বেসর্বা । ওরাই কয়েদীদের নিয়ন্ত্রক । শারীরিক কোনও ক্ষতি না করে কয়েদীদের ভয় দেখানো বা বিভিন্নভাবে উত্যক্ত করা জেলরক্ষীদের অধিকারের মধ্যেই পড়ে । রক্ষীদের হাতে থাকবে একটা করে লাঠি আর পরনে থাকবে খাকি পোশাক । চোখে থাকবে আয়নার মত রোদচশমা । কয়েদীরা সারাদিনই জেলখানায় বন্দী । অপর পক্ষে রক্ষীরা শুধু যে স্বাধীন তাই নয় , ওরা সারাদিন কাজও করবে না । একসঙ্গে তিনজন করে রক্ষী দিনের আংশিক সময়ের জন্য কাজ করবে ( শিফট ডিউটি ) । মানে বারো জন কয়েদীকে তিনজন রক্ষী নিয়ন্ত্রন করবে । শুধু তো কয়েদীদের নয় , রক্ষীদেরও ডঃ জিমবারডো লক্ষ করবেন । তাই ঠিক যেমন নম্বরের বাইরে কয়েদীদের কোন পরিচয় ছিল না , তেমনই ইউনিফর্ম ছাড়া জেলরক্ষীদেরও কোনও আলাদা পরিচয় ছিল না । একদল হঠাৎ করে সব ক্ষমতা হারিয়েছে , আর একদল হঠাৎ করেই অনেক ক্ষমতা পেয়ে গিয়েছে । কেমন করে এই নতুন পাওয়া পরিচয় জেলকয়েদী আর জেলরক্ষী দুজনেরই ব্যবহারকে প্রভাবান্বিত করে ডঃ জিমবারডো সেটাই তো দেখতে চান ।
শুরু হল এক্সপেরিমেন্ট। প্রথমদিন সারাদিন ধরে বারেবারে নম্বরগুলো বলে বলে কয়েদীদের মাথায় নতুন পরিচয়টা গেঁথে দেওয়া হল । আর এই কাজটা করল জেলরক্ষীরা । একই সঙ্গে দুটো কাজ হল এই বারেবারে নম্বর কাউন্টিং এর ফলে । এক , কয়েদীরা নিজেদের নতুন পরিচয় মেনে নিল । আর দুই , এই রক্ষীরাই যে কয়েদীদের নিয়ন্ত্রণ করবে সেটাও কয়েদীদের বুঝিয়ে দেওয়া হল ।
প্রথমদিনটা বেশ নির্বিঘ্নে কাটলেও ঝামেলা শুরু হল পরের দিন । ডঃ জিমবারডো এটা ঠিক আশা করেন নি । কয়েদীরা আর রক্ষীদের সব কথা শুনে চলতে রাজি নয় । ওরা প্রতিরোধ গড়ে তুলল । বিছানার সাহায্যে সেলগুলোর দরজা বন্ধ করে রাখল কয়েদীরা । সেই পরিস্থিতিতে কি করে জোর করে প্রতিরোধ ভাঙ্গা হবে রক্ষীরাও সেই পরিকল্পনা শুরু করল । কয়েদীদের দেখিয়ে দিতে হবে জেলখানার ভিতরে কে বস আর কে প্রায় দাসের মতো সব আদেশ মেনে চলতে বাধ্য । ক্ষমতার কি অপার মহিমা ! সাজানো রক্ষীরা গায়ের জোরে সাজানো কয়েদীদের বিছানা কেড়ে নিল , ওদের নগ্ন করে রেখে দিল । শুরু করল আরও নানান উপায়ে উত্যক্ত করা । কয়েদীদের কারনে অকারনে পুশ - আপ করানো বা সেলে আটকে রাখা কিম্বা শৌচাগার ব্যবহার করতে না দেওয়া ইত্যাদি নানান উপায়ে অত্যাচার করা শুরু হল । শৌচাগার ব্যবহার করতে না দিয়ে কয়েদীদের একটা করে বালতি দেওয়া হল মলমূত্র ত্যাগ করার জন্য । শাস্তিস্বরূপ সেই বালতিও পরিষ্কার করা হল না । সমস্ত জেলখানা হয়ে উঠল নোংরা আর দুর্গন্ধময় । এদিকে অন্ধকূপটাও তো রয়েছে। সেটাই বা বাদ যায় কেন ! রক্ষীরা প্রতিরোধের দলনেতা কয়েদীকে রেখে দিল অন্ধকূপে ।
কিন্তু এক এক শিফটে রক্ষীর তুলনায় কয়েদীরা সংখ্যায় বেশি । সেক্ষেত্রে কয়েদীদের কি করে একটানা চাপে রাখা যাবে , তাই নিয়ে বেশ চিন্তায় পড়ল রক্ষীরা । এবার রক্ষীরা বুঝতে পারল যে শারীরিক নয় , মানসিক চাপ তৈরি করা দরকার । মানসিক চাপই বরং অনেক বেশি কার্যকরী হবে । সুতরাং রক্ষীরা একটা বিশেষ প্রিভেলেজ সেল বানিয়ে ফেলল চটপট । প্রতিরোধের পিছনের সারিতে ছিল এমন তিনজন কয়েদী সেই বিশেষ প্রিভেলেজ সেলে থাকার অধিকার পেল । বাকি কয়েদীরা দেখল যে ওই তিনজন কয়েদী ইউনিফর্ম , বিছানা আর দরকারে শৌচাগারে যাওয়ার মত সামান্য কিছু সুবিধা ফেরত পেল । বাকি কয়েদীদের দেখিয়ে দেখিয়ে ওদের ভালো খাবারও দিল রক্ষীরা । উদ্দেশ্য একটাই , কয়েদীদের মনোবল ও একতাকে ভেঙ্গে দেওয়া । আশ্চর্য ব্যাপার এটাই যে রক্ষীরা কেউই কিন্তু পেশাদার রক্ষী নয় । সবাই সাধারণ মধ্যবিত্ত কলেজগামী যুবক । কিন্তু আরও কয়েকটি একই রকম কলেজে যাওয়া সাধারণ মধ্যবিত্ত যুবককে দমন করার জন্য ক্ষমতার ব্যবহারটা একদম পেশাদার রক্ষীদের মতই করা শুরু করল ওরা । নকল ক্ষমতার অপপ্রয়োগটা রক্তে ঢুকে গেল । কারারক্ষীর পরিচয়টাই যেন ওদের আচরণকে দিল আমূল বদলে ।
এই মানসিক চাপ সৃষ্টির খেলাটা আরও জমে উঠল যখন রক্ষীরা এই বিশেষ সুবিধা পাওয়া তিনজন কয়েদীকে আবার ফিরিয়ে দিল তাদের পুরনো জায়গায় । আর তার বদলে অন্য তিনজন কয়েদীকে প্রিভিলেজ সেলে রাখল । যারা তাদের পুরনো জায়গায় ফিরে গেল, তারা কিন্তু আর বাকি কয়েদীদের বিশ্বাস ফিরে পেল না । সত্যিকারের জেলখানায় যেমন হয় ঠিক তেমনই বাকি কয়েদীরা সন্দিহান হয়ে উঠল যে এরা নিশ্চয় জেলরক্ষীদের ইনফর্মার । ঠিক যেমনটা রক্ষীরা চেয়েছিল তেমনটাই । দ্বিধা বিভক্ত হয়ে গেল কয়েদীদের একতা । এই বিভেদনীতি প্রয়োগের ফলে একদিকে যেমন কয়েদীরা সবাই সবাইকে অবিশ্বাস করতে শুরু করল , তেমন অন্যদিকে কয়েদীদের একতা ভেঙ্গে যাওয়ায় রক্ষীদের নিজেদের মধ্যে একতা গেল বেড়ে ।
মাত্র দেড় দিন । তার মধ্যেই ঘটে গেল এত কিছু । এক্সপেরিমেন্ট আর নিছক এক্সপেরিমেন্ট রইল না । নাটকের প্রতিটি চরিত্র যেন রক্ত মাংসের হয়ে উঠল । এ যেন সত্যিকারের জেলে সত্যি কয়েদী আর সত্যি রক্ষীদের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই । পরিস্থিতি এমন দাঁড়ালো যে কয়েদীরা সত্যিই রক্ষীদের কোনও ক্ষতি করতে পারে এই ভেবে রক্ষীরাও হয়ে উঠল আরও আক্রমনাত্মক । বেড়ে গেল কয়েদীদের নিগ্রহ করার মাত্রা। এই শারীরিক ও মানসিক নিগ্রহের ফলে দেখা গেল একটি কয়েদী অদ্ভুত অসংলগ্ন ব্যবহার শুরু করেছে । কিন্তু ততক্ষনে রক্ষীরা আর কর্তাব্যক্তিরাও কর্তৃত্বের মোহে পড়ে গিয়েছে। ওরা সেই কয়েদীর কান্না , রাগ, বা মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়া দেখেও ভাবছে যে ঐ কয়েদী নিশ্চয় অভিনয় করছে ওদের বোকা বানানোর জন্য । শেষ পর্যন্ত অবশ্য কর্তৃপক্ষ মেনে নিল যে ঐ কয়েদী সত্যিই অসুস্থ । তাকে এক্সপেরিমেন্ট থেকে বাদ দিয়ে দেওয়া হল ।
এরপর এল পরিবারের লোকজনের সঙ্গে দেখা করার দিনটা । ইতিমধ্যে জেলের যা চেহারা হয়েছিল তাতে ডঃ জিমবারডো ভয় পেলেন যে বাবা মায়েরা যদি তাদের ছেলেদের ফেরত নিয়ে চলে যান ! তড়িঘড়ি জেলখানা আর কয়েদীদের সাফ সুতরো করে ফেলা হল । অদ্ভুত ব্যাপার , বাবা মায়েরাও কিন্তু তাদের ছেলেদের সঙ্গে দেখা করার জন্য নানান অদ্ভুত সব নিয়ম মেনে নিলেন । তারাও যেন এই সাজানো জেলখানার নাটকে অংশ নিলেন সত্যিকারের মধ্যবিত্ত কয়েদীর বাবা মা হিসেবে ।
নাটকের পরবর্তী অংশে একটা গুজব ছড়িয়ে পড়ল । এক্সপেরিমেন্ট থেকে বেড়িয়ে যাওয়া কয়েদী নাকি বেশকিছু লোকজন নিয়ে ফিরে এসে বাকি কয়েদীদের মুক্ত করবে । এবার গবেষকের মতো ঘটনাকে শুধু লক্ষ করে যাওয়ার বদলে একদম সত্যিকারের জেলখানার কর্তৃপক্ষের মতই ডঃ জিমবারডো সেটা আটকানোর চেষ্টা করলেন । এমন কি সত্যিকারের একজন ইনফর্মার রাখার কথাও ভেবে ফেললেন তিনি । এই সময় সাজানো জেলখানার কয়েদী, রক্ষী , কর্তৃপক্ষ সবাই তাদের নিজ নিজ ভুমিকায় এমন ভাবে ঢুকে গিয়েছে যে পরিস্থিতি হয়ে উঠল অগ্নিগর্ভ । যে কোন মুল্যে কয়েদীদের বাগে রাখতে হবে , তাদের পালানো আটকাতে হবে । এমন কি যে ছেলেটি এক্সপেরিমেন্ট ছেড়ে চলে গিয়েছে তাকে ফিরিয়ে এনে আরও বেশি করে শাস্তি দেওয়ার কথাও ভেবে ফেললেন ডঃ জিমবারডো । নিয়ম অনুযায়ী এই এক্সপেরিমেন্ট থেকে যেকোন যোগদানকারী যেকোন সময় ছেড়ে চলে যেতে পারে । কিন্তু ডঃ জিমবারডো তখন আর স্বাভাবিকভাবে ভাবতেই পারছেন না । উনি তখন একজন জেলসুপারের মতই ভাবছেন ঐ কয়েদী নিশ্চয় ওনাকে বোকা বানিয়ে চলে গিয়েছে ।
একটা সম্পূর্ণ দিন কেটে গেল কয়েদীদের পালানো আটকানোর পরিকল্পনায় । যখন দেখা গেল গুজব শুধু গুজবই ছিল তখন রক্ষীরা যেন আরও ক্ষেপে উঠল । কয়েদীদের প্রতি অত্যাচারের পরিমাণ গেল মারাত্মক বেড়ে । এরপর সমস্ত ব্যাপারটা আরও জটিল হয়ে গেল যখন একজন পাদ্রিকে ডেকে আনা হল সব কয়েদীদের সঙ্গে কথা বলার জন্যে । দেখা গেল কয়েদীরা আর নিজেদের নাম নয় , নিজেদের নম্বর বলেই নিজেদের পরিচয় দিল । এমন কি জেল থেকে বেরোনোর জন্য আইনের সাহায্য নেওয়ার কথাও তারা বলল। ওরা ভুলেই গিয়েছে যে ওরা একটা এক্সপেরিমেন্টে কয়েদীর ভূমিকা পালন করছে। এই এক্সপেরিমেন্ট মাত্র দুই সপ্তাহের । তারপর বেশ কিছু টাকা পকেটে নিয়ে ওরা যে যার বাড়ি চলে যাবে । স্বাভাবিক জীবনযাপন করবে । কিম্বা এক্সপেরিমেন্ট থেকে যে কোন সময় বেড়িয়ে গেলেও যে ওরা এই জেলখানা থেকে মুক্তি পাবে সেটাও যেন ওরা ভুলে গিয়েছিল । জেলখানার পরিবেশ আর পরিস্থিতি ওদের এমনভাবে প্রভাবান্বিত করেছিল যে ওরা নিজেদের সম্পূর্ণ অসহায় বলে মনে করছিল ।
অন্য আরেকজন কয়েদী ( ৮১৯ নম্বর ) এবার পাগলের মত ব্যবহার শুরু করল । পাদ্রি না , ও একজন ডাক্তারের সঙ্গে দেখা করতে চায় । ওর শরীর খারাপ লাগছে । ওকে আলাদা একটা ঘরে রাখা হল একজন ডাক্তার দেখানো হবে বলে । ঠিক এই সময় কিছু রক্ষী বাকি কয়েদীদের দিয়ে একসঙ্গে বলাতে শুরু করল যে ৮১৯ নম্বর কয়েদী একজন
‘ খারাপ কয়েদী ’। এই শুনে ঐ অসুস্থ কয়েদী সত্যিই আবার তার পুরনো সেলে ফিরে যেতে চাইল । বাকি কয়েদীদের কাছে ওকে প্রমান করতেই হবে যে সে ‘ খারাপ
কয়েদী ’ নয় । ছেলেটি সত্যিই অসুস্থ , তাই এবার ডঃ জিমবারডো ওকে মনে করিয়ে দিলেন যে ওর একটা নাম আছে । ও একটা সাজানো জেলখানায় সাজানো কয়েদীর অভিনয় করছে । এবং বাকি কয়েদী বা রক্ষীরাও তাই । শুনে যেন একটা দুঃস্বপ্ন থেকে জেগে উঠল ছেলেটি ।
জেলরক্ষী আর কয়েদীদের উভয়ের আচরনেই বিভিন্ন পরিবর্তন দেখা গেল । দেখা গেল অসহায় , ভগ্ন মনোবল কয়েদীরা নানান উপায়ে এই সাজানো জেলখানায় টিকে থাকার চেষ্টা করছে । কেউ কেউ মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পড়লেও কেউ কেউ আবার মারামারি শুরু করে দিল । আবার , একজন কয়েদী অসুস্থ হয়ে পড়ল যখন জানতে পারল যে তার শর্ত সাপেক্ষে মুক্তির আবেদন গ্রাহ্য হয় নি । কেউ কেউ আবার প্রাণপণ চেষ্টা করল ভালো কয়েদী হয়ে থাকার । কিন্তু কয়েদীদের মধ্যে একটা বিশেষ পরিবর্তন কর্তৃপক্ষের নজর এড়াল না । দেখা গেল ওদের মধ্যে আর কোনও একতা নেই । সবাই যেন এক একটা বিছিন্ন দ্বীপের মতন । সবাই স্বার্থপরের মত শুধু নিজেকে টিকিয়ে রাখতেই মরিয়া । নিজের ছোট ছোট সুবিধা পাওয়ার জন্য অন্য কয়েদীর নিগ্রহ যেন ওদের গায়েই লাগছিল না । এরকমটাই তো দেখা যায় সত্যিকারের জেলখানাগুলোতে । তাহলে প্রশ্ন উঠে , সত্যিকারের জেলখানার কয়েদীদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি যে বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব দেখা যায় তা কি আসলে জেলব্যবস্থা বা জেলকর্তৃপক্ষেরই তৈরি করা ? অপরপক্ষে রক্ষীরা যেন আনন্দ পাচ্ছে তাদের এই ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করে । রক্ষীরা কেউ দেরি করে কাজে আসতো না । কিম্বা কেউ তাড়াতাড়ি কাজ থেকে চলেও যেত না । এমনকি একজন রক্ষীও বেশিক্ষণ কাজ করার জন্য অতিরিক্ত পারিশ্রমিক চায় নি ।
‘ স্বভাবগত চরিত্র নাকি পরিবেশ ও পরিস্থিতি মানুষের চরিত্র ঠিক করে দেয় ? ’ এটা একটা বড় জিজ্ঞাসা ছিল ডঃ জিমবারডোর । এখন আরও অনেক অনেক প্রশ্ন ভিড় করে এল । কি করে সুস্থ , বুদ্ধিমান , সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষগুলো এত তাড়াতাড়ি এমন পাল্টে গেল ? কেন সাজানো জেলখানায় সাজানো জেলরক্ষী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে সেই সাধারণ মানুষগুলো এমন অকারণ নিষ্ঠুর হয়ে উঠল ? কেন তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করতে শুরু করল ? কেন সাজানো কয়েদীরা সব অত্যাচার মেনে নিল ? কেন ওরা ভুলে গেল যে যেকোন সময় ওরা এক্সপেরিমেন্ট ছেড়ে বেড়িয়ে যেতে পারে ? এমনকি বাবা মায়েরা যারা সরাসরি এই নাটকের কুশীলব নন , তারাই বা কেন মেনে নিলেন তাদের সন্তানের নিগ্রহ ? এই সব প্রশ্নের হয়তো একটাই উত্তর হয় । আর সেই উত্তরটা হল ‘ ক্ষমতা ’।
বিভিন্ন কারনে ও বিভিন্ন সময়ে প্রায় পঞ্চাশজন লোক বাইরে থেকে এসেছিল এই সাজানো জেলখানায় । একমাত্র ক্রিস্টিনা ম্যাসলাক ( ডঃ জিমবারডোর ভবিষ্যৎ স্ত্রী ) নামক পিএইচডির ছাত্রীটি এর প্রতিবাদে সরব হয়েছিল । তার মতে এটা মনুষ্যত্বের অপমান । যেভাবে গবেষণা করার জন্য এতগুলো মানুষকে এত অত্যাচার সহ্য করতে হচ্ছে বা কিছু মানুষ অত্যচার করছে তা মেনে নেওয়া মানবিক নয় । মাত্র ছদিন । কয়েদী আর রক্ষীদের ক্ষমতার টানাপোড়েনে পরিস্থিতি এমন উত্তপ্ত হয়ে উঠল যে বাধ্য হয়ে ডঃ জিমবারডো এক্সপেরিমেন্ট বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিলেন ।
এক্সপেরিমেন্ট শেষে ছদিনের দিন একটা মুখোমুখি কথা বলার ব্যবস্থা করা হল । সব কয়েদী , রক্ষী এবং অন্যান্য কর্মীদের মধ্যে । গবেষণার কারনে কেউ যেন সত্যিকারের অপরাধী বা অপরাধের শিকার না হয়ে পড়ে , এটাই ছিল এই মুখোমুখি কথা বলার উদ্দেশ্য । আশ্চর্য ব্যপার এটাই যে কয়েদীরা খুশি হলেও এক্সপেরিমেন্ট হঠাৎ শেষ হয়ে যাওয়ায় রক্ষীরা কিন্তু মোটেই খুশি হতে পারল না ।
১৯৭১ সালের আগস্টের ১৪ থেকে ২০ এই ছ’টা দিন ঠিক ছিল না ভুল ছিল সেই নিয়ে বিতর্ক শেষ হবার নয় । ডঃ জিমবারডো যখন বুঝতে পারছেন যে কয়েদীরা আর রক্ষীরা তাদের নাটকের ভুমিকার সঙ্গে নিজেদের অস্তিত্বকে গুলিয়ে ফেলছে উনি তখনও এক্সপেরিমেন্ট চালিয়ে গিয়েছেন । এমন কি উনি নিজেও জেলসুপারের ভূমিকায় এমন ভাবে নিজেকে মিশিয়ে ফেলেছিলেন যে তার নিজের গবেষক পরিচয়টাও যেন ভুলতে বসেছিলেন। এক্সপেরিমেন্টে যোগদানকারীদের কোন মানসিক বা শারীরিক ক্ষতি হওয়া উচিৎ নয় । ডঃ জিমবারডো তার সাজানো জেলখানায় সেই পরিবেশ বজায় রাখতে সক্ষম হন নি , তা সত্ত্বেও তিনি তাঁর গবেষণা চালিয়ে গিয়েছেন । একদিক থেকে যেমন এটা একটা বড়
ভুল , তেমন সেই ভুলের অপর পিঠে কি এই সত্যটাও উঠে আসে না যে আসলে জেলখানায় মানুষকে মানুষ বলে গণ্যই করা হয় না ? যে বিভেদনীতির প্রয়োগ রক্ষীদের দলবদ্ধ করে তোলে , সেই একই বিভেদনীতির প্রয়োগ কয়েদীদের পরস্পরের শত্রু করে তোলে । ডঃ জিমবারডোর এক্সপেরিমেন্ট দেখিয়ে দিল ক্ষমতার অভাব কয়েদীদের মধ্যে হতাশা , অবিশ্বাস , স্বার্থপরতা বা আরও বড় অপরাধী হবার সম্ভাবনা বাড়িয়ে তোলে । আবার এটাও দেখা গেল ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষমতা কখন যেন অতি সাধারণ মানুষকেও নিষ্ঠুর করে তোলে ।
জেলখানা অপরাধীদের ভিতরে রেখে সমাজকে আরও নিরাপদ করে রাখার প্রতিশ্রুতি
দেয় । কিন্তু আজ এটাই কি বারে বারে দেখা যায় না যে সমাজে অপরাধ কমার বদলে বেড়েই চলেছে ? মানুষকে সবসময় মানুষের মর্যাদা দেওয়া উচিৎ , এমনকি জেলেও এই কথাটা হয়ত ভুলে যাওয়া উচিৎ নয় । ডঃ জিমবারডোর গবেষণা এটাই দাবী করে , জেলখানা এমন হওয়া দরকার যেখানে কোন মানুষের মানবিকতা ধ্বংস হয়ে যাবে না । বরং এমন হওয়া উচিৎ যেন অপরাধী তার ভুলটাকে সংশোধন করার সুযোগ পায় । কিন্তু সেই রকম জেলখানা সত্যিই কি আজও তৈরি হয়েছে ? তাই ডঃ জিমবারডোর ছ’দিনের সাজানো জেলখানার গবেষণা চালিয়ে যাওয়া ভুল , নাকি সেই গবেষণালব্ধ তথ্য ব্যবহার করে মানবিক সংশোধনাগার বানানোর প্রচেষ্টা না করাটা ভুল , এই প্রশ্নের কোন সহজ উত্তর নেই ।
জেলখানা কি অপরাধীকে আরও বড় অপরাধী করে তোলে ? এই জেলখানার উৎপত্তি কি ভুল ? একজন অপরাধীকে দেশের অন্য নাগরিকদের করের টাকায় ভালভাবে বেঁচে থাকার সুযোগ দেওয়া কি ঠিক ? নাকি তাদের জীবন কেড়ে নেওয়াটাই ঠিক ? সব রকম চিন্তাই উঠে আসে । জীবনদায়ী ওষুধের গবেষণায় কত প্রাণী প্রতিদিন জীবন হারাচ্ছে , সেটা কি ঠিক ? বিজ্ঞানের অগ্রগতির কথা মাথায় রাখলেও এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সহজ নয় । ঠিক তেমনই রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থরক্ষার খাতিরে প্রতিদিন এত মানুষের ব্যক্তিগত সুখ , সুবিধা এমনকি প্রাণের জলাঞ্জলি দেওয়া ঠিক না ভুল তার উত্তর দেওয়াও সহজ নয় ।
মানব সভ্যতার ইতিহাস দেখলে এইরকম ‘ ভুল না ঠিক ’ ঘটনার অজস্র উদাহরণ পাওয়া যায় । সেটা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় ভাষার প্রয়োগ হোক, অন্য দেশের সঙ্গে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত হোক বা চাকরিক্ষেত্রে সংরক্ষণের ব্যবস্থাই হোক । একমাত্র সময়ই হয়তো সেই সব প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারবে । অথবা হয়ত মানব সভ্যতার অন্তিম কাল পর্যন্ত চলতেই থাকবে ভুল ঠিকের এই দ্বন্দ্ব ।
রেফারেন্স
http://en.wikipedia.org/wiki/Stanford_prison_experiment ৩০/৮/১৪ তে দেখা হয়েছে।
http://www.prisonexp.org/ ৩০/৮/১৪ তে দেখা হয়েছে।