কথা কিছু কিছু

প্রকল্প ভট্টাচার্য

এম এন সি তে জীবনের প্রথম ইন্টারভ্যু । রিটন টেস্টে সিলেক্টেড হয়ে ডাক পেয়েছি । ইম্প্রেস করবার খুব চেষ্টা । এইচ আর রাউন্ডেও উতরে গেলাম । প্রায় মেরে এনেছি মনে হচ্ছে , তখন সুন্দরী মুচকি হেসে বললেন , ‘ ফাইন। নাউ সীমা উইল বি মিটিং ইউ ফর দ্য ফাইনাল রাউন্ড । প্লিজ বি সিটেড । ’
যাক বাবা , সব কটাকে সামলেছি, আর এই সীমা ম্যাডামকে সামলাতে পারব না ! চাকরিটা তাহলে হয়েই যাবে । আহ , নিশ্চিন্ত । আচ্ছা , সীমাদেবী কি খুব বয়স্কা
হবেন ? মনে হয় না । আজকাল মাল্টিন্যাশনালে প্রচুর কমবয়সী ডাইরেক্টর থাকেন ।
বিনা আয়নাতেই চুলটা একটু জুত করে নিলাম , জামাটা হাত দিয়ে সমান করে
বসলাম , রুমাল বার করে মুখটা একবার মুছেও নিলাম ।
কনাফারেন্স রুমের দরজাটা স্লো মোশনে খুলতে দেখে আমিই আগে ‘ হাই ’ বলে উঠলাম । আর তখন ঢুকল একটা মাকুন্দের মতো মুখ । ক্যাবলা হাসি হেসে সেই ছাগলটা বলল , ‘ হাই, আয়্যাম সীমা , সীমাচলম । হাউ আর ইউ ? ’
চাকরিটা শেষপর্যন্ত হয়নি , এবং তা নিয়ে আজ আমার কোনও আক্ষেপও নেই । কিন্তু মজা লেগেছিল যে নাম , বা ডাকনাম শুনে ভুল ভেবে ফেলেছিলাম ।
কত্ত রকমের ভুলই যে হয় ! বিশেষ করে কথা বার্তায় ।
প্রবাসী বাঙালিদের একটা অনুষ্ঠান হচ্ছিল । তাতে একজন বিশিষ্ট ভদ্রলোককে সংবর্দ্ধনা দেওয়া হোল । সেই ভদ্রলোক তাঁর আবেগদীপ্ত বক্তৃতা শেষ করতেই অনুষ্ঠানের সঞ্চালক বললেন , ‘ এতক্ষণ শ্রী ... আমাদের অনেক কথা শুনিয়ে দিলেন ... ’ শুনে ভদ্রলোক তো থ ! শেষে আলাদা করে বোঝানো হল যে ওনাকে অপমান করা হয়নি । সে যাত্রা অনেক কষ্টে বিড়ম্বনা সামলানো গেছিল ।
বাঙালিদের আবার আর এক অভ্যাস , বাংলা কথার সাথে মাঝেমধ্যেই হিন্দী মিশিয়ে ফেলা । এমনই এক মিশ্রভাষী সঞ্চালক স্টেজে ঘোষণা করেছিলেন , “ শ্রী ... বাবুকে ধন্যবাদ , তিনি আমাদের সকলের জন্যে লুচি ভেজেছেন ! ” হ্যাঁ , লুচি তরকারির প্যাকেটের ব্যবস্থা করে সকলের নামে পাঠিয়েছিলেন তিনিই, হিন্দীতে ‘ ভেজে হ্যাঁয় ’ বলা যেতেই পারত । কিন্তু ‘ লুচি ভেজেছেন ’ বললে কি তাঁর খুশী হওয়ার কথা ?
হন ও নি ।
শব্দ প্রয়োগের ভুল , অনিচ্ছাকৃত হলেও , তার ফল মারাত্মক হতে পারে । বিশেষ করে , কথা একবার বলা হয়ে গেলে তো ডিলিট / আনডু করাও যায় না ! তাই কথা বলবার সময় , বিশেষ করে জনসমক্ষে , একটু সাবধানতা অবলম্বন করাই উচিত ।
অনেক সময় ভুলটাকে সংশোধন করতে গিয়ে আমরা আরো ভুল করে ফেলি । আমার এক সহকর্মিনী অফিস থেকে তার স্বামীকে ফোন করেছি্লেন , তারপর অফিসের কাজ সংক্রান্ত কারণে বস কে । আবার স্বামীর সঙ্গে কথা বলবার জন্যে ভুলে রিডায়াল টিপে বস কে কী বকুনি , ‘ এখনো অফিস থেকে বেরোওনি ! একটা কাজ বললে করতে পারো না ! ’
বস বেচারা ঘাবড়ে বললেন , ‘ হ্যালো, আপনি কি আমায় বলছেন ? ’
তখন ভুল বুঝতে পেরে ভদ্রমহিলা বললেন , ‘ ওহো আয়্যাম সো সরি ! আমি ভাবছিলাম আপনি আমার স্বামী ! ’
কী কাণ্ড !
অফিসে ই - মেল পাঠাতে ভুল হলে তাও রি - কল অপশন আছে । ভাগ্যিস ! অটো স্পেল চেক অন থাকলে অনেক সময় শ্রীনাথকে মেল পাঠাতে গেলে সেটা ‘ হাই
স্পিন্যাচ ’ হয়ে যায় । কিন্তু চ্যাট করতে গেলে খুব সাবধানে টাইপ করতে হয় । কতো সময় কতো অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছে আমাকেই !
ছোটরা যারা বাংলার বাইরে মানুষ হয় , তাদের অবস্থা তো আরোই শোচনীয় । বেশীরভাগ ক্ষেত্রে তারা ইংরাজী বা হিন্দী থেকে সরাসরি অনুবাদ করে বাংলা বলে । সেদিন একজনকে জিগ্যেস করলাম , “ কি রে , তুই কার সঙ্গে এলি ? ” সে সপ্রতিভ জবাব দিল , “ মুখার্জী আন্টি আমাকে ফেলে দিয়ে গেলেন । ” কী সর্বনাশ ! পরিচিত ছেলেটিকে গাড়িতে ড্রপ করে দিয়ে মুখার্জী আন্টি যে কত বড় ভুল করেছেন সেটা যদি জানতেন !
একবার এক মহিলা নিজের বাড়িতে কিছু বন্ধুবান্ধবদের উপস্থিতিতে তাঁর ছেলেকে বললেন , ‘ যা তো , ভিতরের ঘর থেকে আমার চটিটা নিয়ে আয় ’ । ছেলেটা নিমেষের মধ্যে দেওয়ালে টাঙ্গানো ভদ্রমহিলার বিনুনী সমেত পরচুলটা নিয়ে এল । হিন্দীতে চোটি তো তাকেই বলে , তার কী দোষ ! অথচ তার মা অপ্রস্তুতের একশেষ !
এমনই একজন সহজ পাঠের ‘ কাল ছিল ডাল খালি ’ কবিতার সহজতর অর্থ খুঁজে বার করেছিল - কাল মেনুতে শুধু ডাল ছিল , সেটা খাওয়ার পর আজ সেটা ফুলে উঠে পেট ভরে গিয়েছে ।
ছোটদের দোষ দিই না । বিশেষ করে যখন তাদের বাবা মায়েরা যখন নিজেরাই হুঁশ রাখতে পারেন না যে কী বলছেন , এবং কেন বলছেন । ক্লাবে দুর্গাপুজো । মহাষ্টমীর দিন পুষ্পাঞ্জলি দিয়ে প্রসাদ খাওয়ার ভীড় সামলাতে সচিব স্বয়ং চেঁচিয়ে জানাতে লাগলেন , ‘ মহিলাদের উপরে বসবার আলাদা ব্যবস্থা আছে , আপনারা সেই সুযোগ নিতে
পারেন ! ’ ছি ছি , কী কাণ্ড বলুন তো ! শেষে তাঁকে চুপ করানো হল ।
আজকাল তো অনেকে নিজেরাই ভুলটা ধরতে পারেন না ! এই তো সেদিন , অনেকদিন পরে ভাস্করদাকে দেখে রঘুদা আনন্দের চোটে ঘরভর্তি লোকেদের মধ্যেই চিৎকার করে বললেন , “ আরে ভাস্কর ! কতোদিন পর দেখা ! কেমন আছো ? তোমার মেয়েছেলেরা কেমন আছে ? ” ভাস্করদা অনেক কষ্টে হাসি আর কাশি সামলে বললেন , “ হ্যাঁ ছেলে মেয়ে দুজনেই ভাল আছে । ”
এমন ভুলভ্রান্তি শুধু যে বহির্বঙ্গের বাঙালিদেরই হয় , তেমন ভাববার কোনও কারণ নেই কিন্তু ! খাস কলকাত্তাইয়া বাঙ্গালিদের মুখে আমি এমন কথা শুনেছি , তর্কের খাতিরে ভুল না হলেও যাদের ব্যবহৃত অর্থ হয় একেবারেই আলাদা ।
পাশের বাড়ি নতুন ভাড়াটে এসেছেন এক সদ্য বিবাহিত দম্পতি । দুজনেই খুব মিশুকে , সহজেই এবাড়ি ওবাড়ি দাদা বৌদি পাতিয়ে ফেললেন । একদিন ভদ্রলোক আমাদের বাড়ি এসে মা কে জিগ্যেস করলেন উল বোনার কাঁটা আছে কি না । মা তাঁকে দুটো কাঁটা দিয়ে জানতে চাইল , ‘ আপনার বৌ কি বোনে ? ’ ভদ্রলোক হাঁ করে তাকিয়ে বললেন , ‘ বনে ! কেন , বনে যাবে কেন ! বাড়িতেই আছে , আমার
সঙ্গেই থাকে ! ’ মায়ের লজ্জাজনক অবস্থা আর ওনার মুখের ভাব দেখে আমরা হেসে লুটোপুটি !
তবে সব পরিস্থিতি আনন্দদায়কও হয় না । যেমন হয়েছিল বিমানদার মেয়ের বেলায় ।
আমাদের পাড়ার বিমানদার ছিল যাত্রা করবার শখ । বয়স হওয়ার পর অনেকদিন আর স্টেজে অভিনয় করতে পারতেন না । তবে নাটকের কথা শুনলেই চোখমুখ জ্বলজ্বল করে উঠত । একবার তিনি খুব অসুস্থ , তাঁকে দেখতে এসেছে তাঁর প্রবাসী মেয়ে জামাই । আমরা মানে ওনার চ্যালা চামুণ্ডারাও আছি ধারে কাছে , কখন কী হয়ে যায় । প্রিয় বিষয় নিয়ে আলোচনা করে বাবাকে আগের মতো চাঙ্গা দেখবার জন্য মেয়ে একগাল হেসে জিগ্যেস করল , ‘ বাবা তুমি কবে যাত্রা করবে গো ? ’ অমনি অসুস্থ বিমানদা খেঁকিয়ে উঠলেন , ‘ হ্যাঁ , আমি যাত্রা করলেই তো তোরা সবাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচিস , তাই না ? যত্তসব ! ’ ওনার মেয়ে তখন কেঁদে কুল পায় না ।
সবথেকে মজা হয়েছিল আমার এক জাঠতুতো দিদির বিয়েতে । বিয়ের পর মেয়েকে বিদায় দেওয়া হচ্ছে , ঠাকুমা খুব দরদ ভরে নতুন জামাইকে বলছেন , “ আমাদের মেয়ে খুব অবুঝ , তুমি একটু দেখো ”, জবাবে জামাই বললেন , “ চিন্তা করবেন না, আমি ওকে দেখে নেব ! ” কে জানে , ফাজলামো কি না , কিন্তু ওই কান্না কান্না ভাবের মধ্যেও অনেকেই , ঠাকুমাও , ফিক করে হেসে ফেলেছিলেন !
তাই তো বলি , কথা কিছু কিছু বুঝে নেওয়াই ভাল । মুখে বলতে গেলে যদি ভুলে ভুলে...