ডানাওয়ালার গল্প

আহমেদ খান হীরক



একটা চৌকো ঘর। সাদা।
ঘরের ভেতর লোকটা বসে আছে। পিঠের ওপর অবহেলায় পড়ে আছে একটা ডানা। নীল।
ডানায় ক্লান্তি আছে। অথচ মুখে নিদারুণ শান্তি। নাম... যা-কিছু।
চোখটা তখনও বন্ধ। কুঁচকে আসা ভ্রু। লোকে বলে এই পৃথিবীর সমান বয়েস। আমি বিশ্বাস করি না। চোখ না খুলেই লোকটা বলে, বসেন!

বসার কিছু নাই আশে-পাশে। লোকটা আবার বলে, মেঝেতেই বসেন।

মেঝে ঠাণ্ডা। শীতলপাটির মতো। নাকি পাথরের মতো। লোকটা চোখ খোলে। সবুজ।

: দেখতে আসছেন?
: বলা যায়।
: দেখেন।

লোকটা আবার চোখ বন্ধ করে। ঘরের সাদায় চোখ ধাঁধিয়ে যায়। এছাড়া দেখার কিছু নাই। লোকটা চোখ খোলে না। বলে, ডানাটা হাত দিয়া দেখবেন?
: না না ঠিক আছে।
: অনেকেই দেখবার চায়...
: আমি চাচ্ছি না। বুঝতেই পারছি এইসব বুজরুকি।
: ঘরে নতুন চুনকাম করাইছি... এই জন্য চোখ ধাঁধাইতে পারে। বেয়াদবি নিবেন না! ডানা ছুঁইতে চাইলে ছুঁইতে পারেন। অনেকেই ছোঁয়!
: ডানা বানাইছেন কী দিয়ে?
: এইটা ছিল আমার। দুইটা। মানে জন্মের পর থেইকাই ছিল। একটা ছোটকালেই নষ্ট হইয়া গেছে.. এই একটাই আছে। কামের না কিছু। ঠিকমতো ওড়া যাই না! ব্যালান্স রাখা মুশকিল!

হাসি আসল আমার--তাইলে আপনি ওড়েন?
: মাঝে-মইধ্যে। সব দিন না। দরকার পড়লে উড়তে হয়।
: কী দরকার?

লোকটা চোখ খোলে। বেগুনি।

: চোখের রঙও পাল্টাতে পারেন দেখছি!
: আরেহ না। এইটা বয়সের জন্য হইছে। ছানি আসছে। ছানির এই বেহুদা রঙ! বেশিক্ষণ চোখ বন্ধ রাখলে ছানি চইলা আসে সাননে!

লোকটা তার আঙুল দিয়ে চোখ থেকে ছানি ওঠানোর চেষ্টা করতে থাকে। এ মুহূর্তে তাকে খুব বিপন্ন লাগে। আমি বলি, আসি তাহলে!
: দেখার মতো কিছু নাই আসলে!
: ডানাটা দেখতে পারেন। ম্যালাজন দেখে।

আমি উঠে বেরিয়ে যেতে ধরি। কিন্তু মনে হয় সত্যিই একবার ডানাটা দেখা দরকার। অন্তত কী দিয়ে বানিয়েছে সেটা জানা উচিত। লোকটা সাথে সাথে তার ডানাটা মেলে দেয়। যা ভেবেছিলাম তারচেয়ে বড়। অমসৃণ। ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে ধুলো।

: আপনি যে আসলে উড়তে পারেন না তা এই ডানার দুর্গতি দেখেউ বোঝা যাচ্ছে। এই করে করে দশগ্রামের মানুষকে তাহলে লুটছেন?
: ডানায় কিছু ধুলা হইছে। বেয়াদবি মাফ করবেন! ছুঁইবেন আপনি? অনেকে ছুঁইয়াও দেখে তো...

আমি ডানার ওপরে হাত দিই। একটা স্পন্দন। অনবরত স্পন্দন৷ একটা জ্যান্ত কিছু যেন ডানার ভেতরে বয়ে চলেছে। আমি লোকটার দিকে তাকায়। লোকটার চোখ এখন নীল। খুব নীল। শরতের আকাশের মতো ঝা নীল।

: ডানা থাকলেই উড়তে নাই। ওড়া তো গতি। গতি মানুষরে কিছু দেয় নাই। আপনারা যে দুনিয়ার... দুনিয়াটা তৈরি হইছে গতি দিয়া৷ আগুনের পরপর যে আপনারা চাকা আবিষ্কার কইরা ফেললেন সেইটারেই ভাবলেন সব... তারপর খালি গতি বাড়াইলেন গতি বাড়াইলেন গতি বাড়াইলেন... ডানা ক্যামনে গুটায়া রাখতে হয় শিখলেন না...

আমি আবার লোকটার দিকে তাকাই। না, লোকটা কিছু বলছে না। আমি হাত টেনে নিই ডানা থেকে। লোকটা হাসে। বলে, আবার যদি মানুষ কোনো নতুন দুনিয়া বানায় সেই দুনিয়াটা গতির না, হইতে হবে স্থিতির.. ধীয়ের... দৌড়ের না, হইতে হবে চিন্তার... গাছের কাছ থেইকা শিখতে হবে মানুষদের... গাছদেরও যে ডানা আছে, দেখছেন কখনো?
: না।
: দেখবেনও না... ডানার ধুলার জন্য মাফ করবেন!