বিশ্বাস সম্পর্কে কিছু অবিশ্বাসী হাওয়া

প্রবুদ্ধ ঘোষ



বিশ্বাস এমন এক আটপৌরে শব্দ, যা আমাদের ঘরদোরে মনের আনাচ-কানাচে ঝুলের মতো লেগে থাকে। পরিচ্ছন্নতা ভালবেসেও দু-একটা ঝুল যেমন লাইটের পাশে, সিলিং-র কোণায় লেগে থাকেই, বিশ্বাসও তেমন টিঁকে থাকে। সযত্ন অবহেলায় বিশ্বাস দানাপানি পেয়ে যায় ঠিকই। অতি আধুনিক অতি-বৈজ্ঞানিক মনও অনেক রীতি-সংস্কার-বিশ্বাস ত্যাগ করতে পারে না। ফুরনো ঐতিহ্যের দায়ে, ঝ্যালঝ্যালে নস্ট্যালজিয়ার টানে, বাসি ঘিয়ে ভাজা খাবারের মোহে বিশ্বাস আঙ্গুলে পাথর পরে, গলায় মাদুলি। যোগ দেয় সনাতনের ধুয়ো তোলা উন্মাদ ভক্তমিছিলে, মিশে যায় হননোল্লাসের যজ্ঞে জ্বলে ওঠা সমিধের জোগানে। বিশ্বাস, অন্ততঃ ধর্মের তাপে ও চাপে কয়লা হয়ে যাওয়া উপমহাদেশে নির্লিপ্ত উদাসীন রাখে আমাদের, সায় নিয়ে নেয় জনতোষী ধর্মাচরণে। এই বিশ্বাসের গায়ে পবিত্রতার ধুনোগন্ধ, এই বিশ্বাসের মুখে চেরাগের ফলিত আলো; একে প্রশ্ন করা চলে না!
আমরা বিশ্বাস করতে ভালবাসি। বিশ্বাস এমনই এক ক্রিয়া, যাতে আমাদের মানসিক তৃপ্তি হয়, শরীর সুস্থ থাকে। বহুদিনের কোনও বিশ্বাসের ভিতে যদি সামান্য নড়াচড়া হয়, আমরাও কেঁপে উঠি। আমরা বিশ্বাস করি আমাদের অতীত ছিল সোনায় মোড়া। আমরা বিশ্বাস করি বর্তমান শুধুই অবক্ষয়ের। আমাদের বিশ্বাস করানো হয় নৈতিকতা আর মূল্যবোধে। ছোটবেলা থেকেই আমাদের ‘ভাল হও’ বলে মন্ত্র শেখাতে শেখাতে বিশ্বাস করানো হয় যে, এই দু’টি ধ্রুবক। অথচ, নৈতিকতা আর মূল্যবোধের মতো পরিবর্তনশীল আর কিছুই বোধহয় নেই। এরা বিমূর্ত। বিশ্বাস, নীতি, মূল্যবোধ খুব সরু সুতোর ওপর দিয়ে হাঁটে একসাথে। ক্রমশঃ যাপনযুদ্ধে ক্লান্ত হতে হতে বোঝা যায় এই তিনটেকেই আপসের অঙ্ক দিয়ে মাপা যায়। যোগ-বিয়োগ ক’রে নেওয়া যায়। নিয়ত প্রবহমান জীবনে এরা জগদ্দল নয়। যতটুকু মূল্যবোধে বিশ্বাস রাখলে লোকদেখানো যায়, যতটুকু নীতিতে বিশ্বাস রাখলে অন্নবস্ত্রের অভাব হয়না, ততটুকু বিলাসিতা করাই যায়। ততটুকু সাজিয়েগুছিয়ে নিজের মাপমতো আদর্শ বানিয়ে নেওয়া যায় এবং সেই আদর্শ অন্যকে বিশ্বাস করানো যায় জ্ঞানগর্ভ কথায়-বাণীতে। কিন্তু, স্থিতি তো বিপন্ন হয়। ব্যাঙ্কে রাখা টাকার সুদের হারের মতো, গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ার মতো, আনাজপাতির মূল্যবৃদ্ধির মতো কিংবা সঞ্চয়ভাগ কমে যাওয়ার মতো- স্থিতি আর নিশ্চয়তা বিপন্ন হয়। বিশ্বাসও। বিশ্বাস দিয়ে যখন প্রয়োজনমতো চাল সেদ্ধ হয় না, বিশ্বাস দিয়ে যখন বাড়ির সামান্য স্যাঁতস্যাঁতে স্কোয়ারফিটের হাঁসফাঁস এড়ানো যায় না, বিশ্বাস যখন প্রতিবেশী-আত্মীয়দের হরেক প্রশ্নবাণ ঠেকাতে পারে না কিংবা বিশ্বাস দিয়ে যখন উচ্ছেদ-অনিশ্চয়-ক্ষয় ঠেকানো যায় না তখন সেই বিশ্বাস এবং বিশ্বাসের গায়ে এঁটুলির মতো মূল্যবোধ-নীতি সব খসে খসে পড়তে থাকে।
আমরা তাইই বিশ্বাস করি, যা আমরা বিশ্বাস করতে চাই। আর, আমরা সেটুকুই বিশ্বাস করি, যেটুকু বিশ্বাস করলে আমাদের মতাদর্শের প্রতি বিশ্বাস অটুট থাকে। যারা শাসকের পক্ষে, যারা বিশ্বাস করে শাসক ভগবানের মতো মঙ্গলের জন্যেই সব করে, তাদের কাছে গণহত্যাও ন্যায্যতা পেয়ে যায়। গণহত্যার পেছনে হাজারো যুক্তি খাড়া ক’রে ফেলে তারা কিংবা শাসক শুভ্র-শুদ্ধ-অপাপবিদ্ধ এমনটাই মনে করে। যারা শাসিতের পক্ষে, যাদের বিশ্বাসে শাসকের কোনও বিশ্বাসযোগ্যতা নেই, তাদের কাছে শাসক বরাবরই খারাপ। শাসককৃত গণহত্যাকে, শাসকপ্রণীত জনবিরোধী আইনকে শরবিদ্ধ করে তারা। আর, রাজনীতি এমন এক অমোঘ সমাজক্ষেত্র যেখানে বিশ্বাস জন্মানো আর উবে যাওয়ার খেলা চলতেই থাকে। তৃণমূলের প্রধাননেত্রী ভোটের প্রবল-প্রতিপক্ষ বিজেপির ভোট কমানোর তাগিদে যদি সিপিএমকে ‘পবিত্র’ বলে দেয়, তা’লে বহু বিশ্বাসক্ষেত্রে আলোড়ন ওঠে। সিপিএম শেষ পাঁচ বছরে একাধিক গণহত্যায় অভিযুক্ত, তারই একটিতে তৃণমূলের প্রধাননেত্রী সিপিএমের গণহত্যাকে লঘু ক’রে দিলে সিপিএমের সমর্থকরা হারানো বিশ্বাস ফিরে আয়! নির্বাচনের সাপ-মইতে যে সিপিএম তৃণনেত্রীকে ‘মিথাবাদী’ বলতে অভ্যস্ত, তাদের কাছে তৃণনেত্রী পরম বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। গণহত্যার বিরুদ্ধে, গণহত্যাকারী সিপিএমের বিরুদ্ধে যাঁরা গর্জে উঠেছিলেন, তাঁদের এতদিনের বিশ্বাস চিড় খায় শাসকের বয়ানে। দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েন তাঁরা। কিন্তু, শাসিত কি কোনও শাসককেই বিশ্বাস করতে পারে? একদা গণহত্যাকারী শাসককে যখন পরবর্তী স্বৈরাচারী শাসকের শংসাপত্র নিয়ে বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরানুসন্ধান করতে হয়, তখন ধীরে ধীরে চাপা পড়ে যায় অত্যাচারিত শাসিতের বয়ান। শাসকশ্রেণির নিজেদের বোঝাপড়া থাকে, ক্ষমতালাভের অঙ্ক থাকে, নির্বাচনের ফায়দা থাকে- কিন্তু, বিজিত শাসিতের কী থাকে? যে বিশ্বাস, যে আস্থা হাজার বয়ান পাল্টেও শাসকেরা দিতে পারে না, নিপীড়িত শ্রেণি তা দিতে পারে। যে আন্দোলন ছিল কৃষকদের গণপ্রতিরোধ, সেজ-সালেম-জিন্দাল-ডাও কেমিক্যালের বিরুদ্ধে সোচ্চার গণপ্রতিরোধ, তাকে কি অবিশ্বাস করা যায়? শাসকনির্দেশে ছিটকে বেরনো বুলেট আর শহীদদের কি অবিশ্বাস করা যায়? কিন্তু, আমরা সেটুকুই বিশ্বাস করি, যেটুকু বিশ্বাস করলে সাজানো মতাদর্শ অটুট থাকে। যেটুকু বিশ্বাস করলে নিজ নিজ শিবিরের লোক খুশি হয়, সেটুকু বিশ্বাস করি। সিপিএম হোক বা তৃণমূল বা বিজেপি- শাসকের গণহত্যা ন্যায্যতা পেয়ে যায়। শাসনে বিশ্বাস ফিরে আসে শাসিতের, ওটুকুই তো নিশ্চয়তা! সরকারি তথ্যনথিতে ফকির-সন্ন্যাসীরা ছিল দুর্ধর্ষ ডাকাত, অপরাধী। সরকারি চিঠিপত্রে ফকির-সন্ন্যাসীদের সঙ্গে বিদ্রোহে অংশ নেওয়া বহু গ্রামের অসংখ্য গ্রামবাসী ছিল দুশমন, লুঠেরা ও শান্তিবিঘ্নিতকারী। এই বয়ানকেই তবে বিশ্বাস ক’রে নেব? নাকি, ফকির-সন্ন্যাসীদের সঙ্গে মিলে নিপীড়িত চাষীপ্রজারা জোতদার-জমিদার-ব্রিটিশ ের বিরুদ্ধে যে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল, তাতে বিশ্বাস রাখব? সরকারি বয়ানে তেভাগা আন্দোলনের কৃষকেরা অপরাধী; প্রথম সারির সংবাদপত্রগুলির বয়ানে মধ্যবিত্ত শ্রেণি বিশ্বাস করেছিল যে, কৃষকেরা বড্ড উৎপাত করছে- সেইসব নির্মিত বিশ্বাস ভেঙ্গেচুরে কৃষক-শ্রমিকদের বয়ান কি আমরা মান্যতা দেব না? নয়া-নাজিরা বলে যে, হিটলার ও নাজিরা নির্দোষ; তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে সোভিয়েত-আমেরিকা জুটি। নাজিদের সাদা জামায় রক্তের ছিটে দিয়েছে জোর ক’রে। কিছু সংলাপ, কিছু নথির প্রমাণও দিয়েছে তারা। আর, অনেকের বিশ্বাস তৈরি হয়েছে নাজিদের প্রতি! কিন্তু, সেটাই কি একমাত্র ভিত্তি? যারা নিপীড়িত হল, যারা শহীদ হল, যারা ‘অপর’ জাতি-ধর্ম-বর্ণ হওয়ার জন্যে বেঘোরে প্রাণ দিল, তাদের বয়ান বিশ্বাস করব না আমরা? তাতে শাসকের দ্বারা নির্মিত বিশ্বাস খানখান হতে পারে, বহুদিনের বিশ্বাস করতে চাওয়া বিশ্বাস চুরমার হয়ে যেতে পারে, শাসকের শুভ্র-পবিত্র-সংস্কৃতি ান মুখোশ খসে যেতে পারে।
উত্তর-সত্য যুগে ‘কী বিশ্বাস করব’-র থেকেও বড় প্রশ্ন ‘কীভাবে বিশ্বাস করব?’ এবং বিশ্বাসের যাবতীয় মাপকাঠিগুলিই ওলোটপালট হয়ে যায় উত্তর-সত্য বয়ানের ঝড়ে। সমস্ত বিশ শতক জুড়ে আমাদের বিশ্বাসের ভিত্তি হল ছবি, চলমান ছবি ও সংবাদপত্রের বয়ান। এদের মধ্যে দিয়ে প্রতিফলিত চিত্রকেই সত্যি বলে বিশ্বাস গেলুম আমরা। আর, একুশ শতকে পৌঁছে জানা গেল এই সবক’টি মাধ্যমের সোর্সের মধ্যেই ভূত বসে থাকতে পারে। ছবি সম্পাদনার নতুন নতুন ‘অ্যাপ’ যেকোনও ছবিকে বিশ্বাসযোগ্য ক’রে তুলতে পারে, বানিয়ে নিতে পারে। সংবাদমাধ্যম কালের অমোঘ নিয়মে হলুদ হয়ে যেতে লাগল আরও। ‘নিরপেক্ষতা’য় বিশ্বাস রাখা ছিল, নিরপেক্ষতাকে বিশ্বাস করতে ভালবাসি আমরা। কিন্তু, নিরপেক্ষতা তো শালগ্রাম শিলা নয়, তাই জন্যেই বিশ্বাস টলে গেল বোধহয়! বিশ্বাস এমনই টলে যায়। টলে যাওয়া বিশ্বাস আবার ফেরে কি কখনও? হলুদ সাংবাদিকতার ছবিতে-গল্পে তা আরও ভাসমান। ‘সত্য’ খুঁজতে ভালবাসি আমরা, সত্যি বারবার পাঁকাল মাছের মতো পিছলে যায়, সত্যি বারবার তার বিশ্বাসভূমি বদলে নেয়। আর, সত্যই এমন এক অবয়ব যাকে প্রশ্নে প্রশ্নে ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলার খেলা চলতেই থাকে। মাঝে মাঝে তবু ডুবন্ত বিশ্বাস জেগে ওঠে। খড়কুটোর মতো আদর্শ বা মতাদর্শ বা শোনা-গল্পগুলো আঁকড়ে ধরতে চায়। উত্তর-সত্য যুগে খড়কুটোর নির্মাণও প্লাস্টিকসম। তাকে বড্ড যত্ন নিয়ে, বড্ড স্ব-ধারণায় বানিয়ে তোলা হয়। ‘এখানেই একদিন খুলে দেব দু’হাতের মুঠো/ যদি তুমি বলে দিতে পারো, কোন হাতে আছে খড়কুটো’- কিন্তু, বলে দেওয়া কি এতই সোজা? বিশ্বাসটুকুই যে নড়ে গেছে, বলে দেওয়ার আগে সংশয় কুয়াশাময়। ঠিক এই সব মুহূর্তে কাউকে বিশ্বাস করা অপরাধ। ঠিক এইসব মুহূর্তে ক্ষমতাবানের ‘দশচক্রে ভগবান ভূত’ মেনে নেওয়া অপূরণীয় পাপ। কিছু অলীক মুহূর্তে শাসকের মহাফেজখানা আর ক্ষমতাবানের তথ্যভাণ্ডার ফুঁড়ে অবিশ্বাসী দ্বন্দ্বমূলক ভূত জেগে উঠতেই পারে। ছ্যাৎলা-পরা বিশ্বাস আর পলেস্তারা-খসা অন্ধবিশ্বাসকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতে... তারপর?