শীতে এবং তাপে

অদ্বয় চৌধুরী

শীত

মাটিটা ওঠানামা করছে। মৃদু, কিন্তু নাগাড়ে। মনে হচ্ছে হাত দিয়ে ধরে কেউ উপর-নীচে আলতো করে নাড়িয়ে চলেছে। অবিরাম। মাটির উথালপাতালের সাথে সাথে হাওয়া কেটে তলোয়ার চালালে যেমন শব্দ হয় তেমনই এক শব্দ উঠে আসছে। একটানা। ছোটবেলায় সেও এমন তলোয়ার চালাত হাওয়ায়। লড়াই-লড়াই খেলত। এই শব্দটা কেমন যেন এক শিরশিরানি জাগায় শরীরে। সহ্য করা যায় না শব্দটাকে। রাস্তার ধারের ফুটপাথের উপরে নামিয়ে রাখা মাথাটা তুলে একবার দেখে সে। ঐ দূরে দুটো ছোট্ট হলুদ বেলুন লাফাতে লাফাতে আসছে। তারই দিকে। তারই কাছে হয়তো। এবার ফুটপাথে নামিয়ে রাখা শরীরের বাকি অংশগুলোকেও তোলে সে। ও মা! বেলুন দুটো আরও বড় হয়ে গেছে! ও দুটোর দিকে আর তাকানোও যাচ্ছে না! চোখ ঝলসে যাচ্ছে। হাওয়ার মধ্যে আরও জোরে, লাগাতার, তলোয়ার চালাচ্ছে কেউ। একটু আগে উপর থেকে কারা যেন সমানে জল ঢালছিল তার গায়ে। রাস্তার উপরেও ঢালছিল। গোটা চত্বরটাতেই ঢালছিল। এরকম প্রায়ই ঢালে। বিশেষত বছরের এই সময়টায়। তার গোটা শরীরটা ভিজে গেছে। চুল, গা। তার শীতশীত করে। পাশে যে কাচের ঘরটা আছে, সাদা আলো বেরনো ঘর, সেটার দরজার তলা দিয়ে ঠাণ্ডাও বেরিয়ে আসে বাইরে। সে বসে থাকে গুটিয়ে, চুপ করে।
সশব্দে হ্যাঁচকা মেরে গাড়িটা এসে থামে। বৃষ্টির জলে চকচকে কালো রাস্তা বেয়ে ছুটে আসা হলুদ আলো দুটো নিভে যায়। রাস্তাটা আগে-পিছে হাত বাড়িয়ে একরাশ নিস্তব্ধতা আর নির্জনতাকে পেঁচিয়ে ধরে। মাঝরাত গড়িয়ে চলেছে ভোরের দিকে, ক্রমশ। একজোড়া চকচকে কালো বুট নেমে আসে খোলস ছাড়ানো সাপের মতো পরে থাকা নিস্তেজ রাস্তার উপরে। রাস্তার উলটো দিকে, ফুটপাথ টপকে, এ.টি.এম। রাত্রির অন্ধকারের সাথে চু-কিৎকিৎ খেলতে খেলতে, হাওয়াকে ড্রিবল করতে করতে এগিয়ে আসে বুটজোড়া। রাস্তার শেষ প্রান্তে এসে এক-ফুটপাথ ব্যবধানের এ.টি.এম থেকে ঠিকরে বেরনো সাদাটে আলোটা সারা গায়ে মেখে দাঁড়ায় বুট দুটো। লোকটা তাকায় এ.টি.এম-এর ঠিক পাশে, ফুটপাথের উপরে, কুঁকড়ে বসে থাকা মাঝ-বয়সী পাগলিটার দিকে। ভিজে শরীর। প্রায় আলগা গা। নীচে শুয়ে থাকা হিলহিলে সাপটা নড়ে ওঠে, আচমকা।
পাগলিটা কোনদিন এই ঠাণ্ডা ঘরটায় ঢোকেনি আগে। সে শুয়ে ছিল ঘরটাতে ঢুকেই দরজার ঠিক সামনেটাতে। ঘরের সাদা আলোটায়, বারেবারে, ধুয়ে যাচ্ছিল সে। আর শীতে কেঁপে যাচ্ছিল, সমানে। ভাগ্যিস সেই লোকটা ছিল সেখানে। যার সাথে সে ছোটো বেলায় যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলত। তবুও একটু তাপের ব্যবস্থা করেছিল সে। লোকটা চলে যাবার আগে মাথার কাছটায় টি.ভি বসানো যন্ত্রটাতে একটানা খানিকক্ষণ ঘরঘর করে আওয়াজ করেছিল। তারপর, কি মনে করে, লোকটা বেরিয়ে গেছিল একটা হাসিমুখ বুড়োর ছবি আঁকা দুটো কাগজ ফেলে দিয়ে। তার বুকের উপরে। এই হাসিমুখের ছবি সে ছোটবেলায় আঁকত। সে অনেকক্ষণ, আরও অনেকক্ষণ— কতক্ষণ, বা কতযুগ, সে নিজেও ঠিক জানে না— হাসিমুখের ছবিআঁকা কাগজ দুটো বুকের উপরে নিয়ে ঐ বরফ-শীতল ঘরে জমে যেতে লেগেছিল। প্রস্তরীভূত হয়ে যেতে লেগেছিল।

তাপ

প্রায় কুড়ি লক্ষ বছর আগের, প্রস্তরীভূত, একটি ভয়ঙ্কর প্রজাতির মাংসাশী, হিংস্র ডাইনোসরের ডিম প্রস্ফুটিত হয়ে একটি ডাইনোসর শাবকের জন্ম দিয়েছে। এই আজব, এবং বিস্ময়কর ঘটনাটি ঘটেছে বার্লিনের ‘মিউজিয়াম অফ ন্যাচারাল হিস্ট্রি’র গবেষণাগারে। খবরে প্রকাশ, গবেষণাগারের শীততাপযন্ত্রটি ঠিক মতো কাজ করছিল না কিছু দিন যাবত। গ্রীষ্মের প্রখর তাপের প্রভাবে কিছু বিশেষ রাসায়নিক বিক্রিয়া স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটার ফলেই গবেষণাগারে রাখা ঐ ডিম প্রস্ফুটিত হয়ে এই শাবকের জন্ম বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই ঘটনার সম্ভাব্য প্রভাব এবং পরিণাম সম্বন্ধে তাঁরা কোনও মন্তব্য করতে চাননি।