যে শালিখ মরে যায়

সৌর শাইন




দুধেল কুয়াশায় যে শালিখ মরে যায়, সে কখনোই ফিরে আসে না। বহমান দিন স্রোতের মঞ্জরি গায়ে মেখে পূর্বাকাশে সিঁদুর জড়িয়ে সকাল নিয়ে এলেও মৃত শালিখ আর ফেরে না ঘরে। ঘর শূন্যতার জহরতে চকচক করে, পিতৃগৃহের অভাববোধে নববধূর মতো আনচান করে, হঠাৎ হঠাৎ চমকে জাগে ট্রামের সেই হুইশেলের শব্দে। যে শহরটা মৃতদের গন্ধ বড়ো ভালোবাসে। এ যেনো এক অপূর্ব নেশার মহ্বত! তাই কি তুমি যতটা সম্ভব এই শহর থেকে দূরে থাকতে চাইতে? অথচ একটা সময় তুমি উন্মাদ হয়ে এই শহরেই ছুটে এলে, শ্মশানে শ্মশানে ছুটলে..। কার সন্ধানে সৌরানন্দ?

এখানে কাঞ্চলমালা ঝরে যায়, মরে যায় থামে না কারোর অপেক্ষায়, অথচ তোমার শৈশব জুড়ে এই ফল অমৃতের মগ্নতা দিতো। দিতো সোহাগের প্লাবন ও দুরন্ত সাহস। শালবনের ভেতর পথ হারিয়ে যখন অস্তিত্বহীনতা বিন্দু বিন্দু ভয়ের রোশনাই ছড়াতো, তখন তোমার হাতে শশীর হাত। মনে পড়ে কি সেইসব মিষ্টি স্মৃতির রাশি রাশি সোনালি আঁটি? রহস্যে মন উত্তপ্ত, অথচ আজ টান টান ছোঁয়া এসে মিশে যায় মলিনতার গহ্বরে। সেই সব দৃশ্যগুলো মেঘের মাতাল হাওয়ার মতো এসে কি টোকা দেয় না? শৈশবের খেলাঘর পেরিয়ে কৈশোরের খোলসে জেগে উঠা তারুণ্য। দেহ-মনের রঙধনু অপেক্ষার দুয়ারে দাঁড়ানো, শৈশবের খেলাঘর তখনো হাতছানি দেয় এক অজানা আকর্ষণে! কি এক লুকানো মায়া বার বার টানে!

সেই কালবৈশাখী দুপুর। গভীর শালবনের ভেতর পথ হারিয়ে আনন্দ উল্লাসে টগবগে তারুণ্যে নৃত্যরত তুমি সৌরানন্দ। পথ পেরোতে পেরোতে অজানার পত্র-পল্লবে তোমার অভিলাষ। সঙ্গী শশীর মনে ভয় ও আনন্দের রঙমহল। শশী কাঁটাঝোপের ছোবল থেকে অতিসাবধানে উড়নাটা বাঁচিয়ে বার বার হাসে। মুক্তার মতো দাঁতগুলো ছড়ায় মোহময়তা। তোমার থমকে তাকানো দেখে শশী ভেংচি কাটে। খুনসুঁটি চলে পৌষের ফড়িঙের মতো হুটহাট। কেনো হারাতে চেয়েছিলে শালবনের গভীরে?

‘এই যে হেঁটে চললে, থামার উপায় কি মাথায় আছে? অন্ধকার নেমেছে বনের ভেতর।’
শশীর মুখে এইসব ছোটো ছোটো মিঠে কথা হয়তো তোমার মনে পড়ে। আর মনে পড়বে জীবনানন্দ দাশের বিক্ষিপ্ত সব পঙক্তি। তোমার কণ্ঠ তো জীবনবাবুর কবিতার জন্যেই।
শশীর স্মৃতি তুমি ভুলতে পারো না, বুকের পাঁজরে যে নাম খোদাই করেছো, তা কি আর ভুলবে? এতো আবেগ এতো উচ্ছ্বাস তোমার পৃথিবীর অন্য কোথাও ছিলো না। ছিলো না বলেই এতোটা জোর দিয়ে বলা যায়।

সেই দুপুরে যখন চারদিক অন্ধকার হলো, আকাশে মেঘ কালো মহিষের মতো তেড়ে এলো তখনো তুমি অবুঝের মতো হারানো পথে আবারো হারাচ্ছিলে। মাতাল হয়েছিলে লুকোচুড়ি নেশায়। শশী তখন চুপটি করে দাঁড়িয়েছিল বটবৃক্ষের পাশে। লাল বটফল ঝড়ো বাতাসের আঘাত সইতে না পেরে মাটিতে লুটিয়ে কেঁদেছিল, আর শশী কেঁদেছিল তোমাকে ডেকে।
‘সৌরানন্দ.. কোথায় তুমি? আমার ভয় হচ্ছে যে.. বাড়ি ফিরবো..।’
তুমি শশীর চিৎকার শুনেও সাড়া দাওনি। লুকিয়ে থেকে ভীষণ মজা পাচ্ছিলে। কিন্তু যখন শশীর কণ্ঠে তীব্র আর্তনাদ ভেসে এলো। ও বলছিলো,‘বাঁচাও আমাকে... বাঘ এসেছে আমাকে খেয়ে ফেলবে..’
তখন তো তুমি ঠিকই ঝড়ো বেগে ঝড়ের আগে ছুটে এলে। শাল বৃক্ষের ডাল ভেঙে মেছো বাঘটিকে তাড়া করলে। আর শশী নোনা জলে চিবুক ভিজিয়ে তোমাকে জড়িয়ে ধরলো তীব্র ভয়ে। এই ঝাপটে ধরা মোহনায় এসে পৃথিবী স্থির অস্থিরের মধ্যে স্থির। মেঘের গর্জন বাঘের গর্জন সবকিছু ভুলে গেলে তোমরা। যখন বৃষ্টিরা তুমুল মিছিল নিয়ে নেমে এলো তখন শশী আঁতকে উঠলো। বলল, বৃষ্টি এলো বাড়ি চলো.. আবার বাঘ চলে আসবে।
তুমি শুনলে না, নড়লে না, বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করে নিশ্চল হয়ে রইলে। চোখে চোখ রেখে যখন অনেকটা মুহূর্ত কেটে গেলো, হঠাৎ চুমুর নেশা তোমায় পেয়ে বসলো। ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁয়ে শুরু করলে ধ্যানের ধকল। কাকভেজা সাধ ও কম্পনের গতি ছুটে চললো হাতে হাত ধরে। অনেক বিজলি এসে লুটিয়ে পড়লো পায়ের কাছে। হঠাৎ বজ্রপাতের শব্দ তোমাদের মনে ভীতি ধরিয়ে দিলো।
ছুটতে ছুটতে তোমরা ঠাঁই নিলে শুকনো খালে পড়ে থাকা ছোট্ট নৌকায়। শালপাতায় গড়া ভাঙা ছইয়ের তলে সামান্য আশ্রয়। এখানেও সেই ঠোঁট কাব্যের আবৃত্তি!

ফেরার পথে শ্মশান পেরিয়ে কলমি বন ডিঙিয়ে এলে। শশীর সেই পাটরানিদের মতো এলোচুলগুলো ভিজে জবুথবু। যেনো সে প্রাচীন গৌড় বাংলার সুন্দরী, তোমার প্রেয়সী। কবিতার ফুলবাগানে তোমার ও শশীর বিচরণ জীবনানন্দ দাশকে দিতো প্রচণ্ড প্রশান্তির গড়িমা। জীবনবাবু দূর আকাশ থেকে তোমাদের দেখে সত্যিই আনন্দ পেতেন।

ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে বর্ষা আসে। বাইদ জমিতে জলের তুলমাতাল খেলা। শাপলাফুলে ভরে যায় শালবনের ভেতর আঁকাবাঁকা জলাভূমি। তুমি তখন কবিত্বের পরম পূজারী, তারুণ্যে কাব্য ধরা দিতেই তুমি মগ্ন হলে বন্য অভিসারে, তরু-লতার প্রেম বন্ধনে, জীবনানন্দ দাশের হাত ধরে রূপসী বাংলাকে চিনে নিলে। কি দুর্দান্ত রাশভারী গলা, চোখে আগুনের ঝলকানি, অপরিমেয় প্রেম ও বুকের পাঁজরে ধূসর পাণ্ডুলিপি। তারুণ্যের জ্বলন্ত শিখা হয়ে গেলে সময়ের তেষ্টা নিয়ে। শশীর উপহার দেয়া সেই ‘সাতটি তারার তিমির’ তুমি বুকে নিয়ে ঘুমাতে। গোধূলি সন্ধ্যার নৃত্যে তুমি উন্মাদ হলে, তীব্র কণ্ঠে জাগিয়ে তুললে রিস্টওয়াচ। আর আশপাশে থাকা নিরঙ্কুশ ঘোড়া তোমাকে নিয়ে গেলো সপ্তকে সেই আকাশলীনার বাড়ি। আকাশলীনা ভাবতেই তুমি মনের গভীরে আঁকতে শশীর মুখ।

শরতের কাশফুল ভরা একদিন শশী তোমাকে ডেকে পাঠালো গড়ের মাঠে বিশুষ্ক পদ্মদিঘির পাড়ে যেখানে বিচূর্ণ দেউল স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়ানো। কাঞ্চনমালা রঙ রেখা সেখানেও বিস্তৃত ছিলো। একটা দুঃসংবাদ এসে তোমার মগজে যন্ত্রণার আলপিন ঢুকিয়ে দিলো। তুমি শশীকে বুকে জড়িয়ে সান্তনার স্পর্শে কাছে টানলে। অবুঝ ও নিরুপায় চোখদুটো বেয়ে জল গড়ালো। তোমার কপালে আঁকা সাহসের সেই অরুণ রেখা, হঠাৎ কুঁকড়ে গেলো। ভীতু চিন্তা তোমাকে দলিত করলো মাটির গহ্বরে। তুমি হেরে গেলে কবি, হেরে গেলে। কেবল কাব্যই জীবন নয়, জীবনকেও কাব্য হতে হয়। পরাজিত সৈনিক হয়ে তুমি গোটা জীবনটাই কাব্যময় করে তুলতে মরিয়া হয়ে গেলে নাকি তুমি কাব্যের নিয়তি বরণ করলে?
ভুল।

ভেরেণ্ডার ফুলে মউ বসেছিল বলেই এতো দুঃখ জাগলো। হাজার মহাল রূপসীরা বিদগ্ধ হয়ে করুণ গানে পৃথিবী নাচিয়ে তুললো। অপরিণত তুমি পাথুরে নিষ্কাম হয়ে জগত পুড়ালে শশী হারা সংগীতে।
প্রতিটি ভ্রুণ পৃথিবীতে বাঁচার স্বপ্ন দেখে, তাকে জোর করে হত্যা করার অধিকার কে রাখে? শশী হত্যাকারি হয়ে বাঁচতে চায়নি। পিতা-মাতার রুদ্রমূর্তি সে সহ্য করতে পারেনি। দুধেল কুয়াশায় যখন গলা জ্বলে যাচ্ছিল তখন অ্যাম্বুলেন্সে চড়ে পাড়ি দিলো দূরের সেই পাষাণ শহরে।
আর ফিরে এলো না।
সৌরানন্দ তুমি কেবল এই শহরের শ্মশান খুঁজে ফিরেছো। শশীকে পাওনি। শশী মিলিয়ে গেছে চির অমাবস্যার ঘোরে।

তোমার জন্য তখন জীবনানন্দ দাশ খুব কেঁদেছিল। কান্নায় আকুল হয়ে এক পৃথিবী বর্ষা নামিয়েছিল। ডুকরে কেঁদেছিল শঙ্খচিল- মর্মরিয়া মরে!

তারপর কত দিন চলে গেল। বনে আজো কলমির ফুল ফোটে, কাঞ্চনমালার রেণু দিগন্ত রাঙায়। ট্রামের হুইশেল তোমার কানে পৌঁছায় না। উষ্কো চুলের কবি তুমিও ট্রাম লাইনে ছুটির ঘণ্টা বাজাতে শিখেছো। দরাজ কণ্ঠে পাঠ করে গেলে কেবল,
‘যে শালিখ মরে যায় কুয়াশায়- সে তো আর ফিরে নাহি আসে!’