রোদ নেই

দিলশাদ চৌধুরী



একটা পুরনো খবরের কাগজের ওপর কয়েক টুকরো বাকরখানি টেবিলের ওপর রাখা। দুটো পা বাকরখানির নিচ থেকে বেরিয়ে আছে, মনে হচ্ছে যেন বাকরখানির পা গজিয়েছে। ডানপাশ থেকে একটা ফাইল দিয়ে তার উপর বাকরখানির টুকরোগুলো রেখে কাগজটা হাতে নিলাম । পা দুটো জনৈক রূপসী নায়িকার, বাকরখানির ওপরের অংশটা পোড়া না হলে চমৎকার মানিয়ে যেত। অবশ্য এই দৃশ্যটাও খারাপ লাগছেনা। পূর্বানি বস্তিতে কয়েকমাস আগে আগুন লাগলো। আমরা গেলাম, ফায়ার সার্ভিস এলো। তখন এমন একটা দৃশ্য দেখেছিলাম, তবে পা টা এত সুন্দর, ফর্সা, মোলায়েম দেখতে ছিলোনা। শুকনো খড়খড়ে ময়লা একটা পা। বাকরখানির একটা টুকরো তুলে মুখে নিয়ে জিভ দিয়ে টিপে ধরলাম, হালকা মিষ্টি একটা স্বাদ। বারেক সাহেবের মেয়ে জামাই এসেছে। জামাইয়ের বাড়ি পুরান ঢাকা, তো শখ করে বাকরখানি নিয়ে এসেছে অনেক অনেক। বারেক সাহেব আবার সেখান থেকে কিছু নিয়ে এসে সবাইকে দিয়েছেন। থানার সবার মুখে এখন বাকরখানি। আজকাল মশার দৌরাত্ম্যও বেড়েছে খুব। দিনের বেলায় কয়েল জ্বালিয়ে বসে থাকতে অপচয় বোধ হয়। কয়েল জ্বালাতে হবে রাতে, দিনের বেলায় কয়েল জ্বালানো আর বাতি জ্বালানোয় আমার খুব আপত্তি। তাও জ্বালিয়ে বসে আছি, কারণ সরকারি কয়েল। আর দশটা বাংলাদেশি মানুষের মত, আমারও সরকারি জিনিসে কোনো মায়াদয়া নেই। এইযে সামনে এক গ্লাস পানি, সেদিন বড় স্যার বউয়ের ওপর রাগ করে তার টেবিলের পানির গ্লাসটা ছুড়ে মারলেন। গ্লাস ভাঙল, একটা ফুলদানি ভাঙল, সেন্টার টেবিলের কাচটাও ভাঙল। আমি দুঃখ পেলাম না, বড় স্যারকেও দুঃখিত মনে হলোনা। কেবল বারেক সাহেব দুঃখ পেলেন। তার মুখ দেখে মনে হচ্ছিলো শুধুমাত্র পদ- পদবীর নিম্নতায় তিনি চুপ করে আছেন। নইলে এক জোর ধমকে বড় স্যারের দাঁত কপাটি লাগিয়ে দিতেন।
সাধারণত দুপুরের আগেই বড় স্যার চলে যান। দুপুরের খাবার খেয়ে শেষ বিকেলের দিকে আবার একবার আসেন। বড় স্যারের মেজাজ সবসময়ই তুঙ্গে থাকে। যখন যাকে সুযোগ পান ইচ্ছেমতো গালাগালি করেন। একদিন দুপুরে ভাত খেতে খেতে নতুন কনস্টেবল ছেলেটা তো বলেই ফেলল, "স্যারে মনে হয় ঠিকমতো সেক্স পায়না।"
আমি একটু নড়েচড়ে বসে এদিকওদিক তাকালাম। বারেক সাহেব নেই, নামাজ পড়তে গেছেন হয়ত। উনি এসব শুনলে এই ছেলের কপালে দুঃখ ছিলো আজ। শিং মাছের সম্পূর্ণ ঝোলটা ভাতে ঢেলে দিয়ে মাখতে মাখতে বললাম, " তা কেন মনে হইল তোমার?"

একটা ডাঁটা তুলে দাঁত দিয়ে চেপে চেপে ভেতরের শাঁসটুকু খেয়ে ঠোঁটটা জিভ দিয়ে চেটে নিলো ছেলেটা, তারপর আস্তে আস্তে বলল, " এই বয়সে তো সেক্স এমনিতেই কইমা যায়, তার উপর স্যারের প্যাটটা দেখছেন?!"
বলতে বলতে উপর নিচে দুলতে দুলতে হাসতে থাকে। আমার একটু শঙ্কা বোধ হয়। এই ছেলে কি সবার দিকে তাকিয়েই এরকম উদ্ভট সব বিচার আচার করে নাকি! তাহলে তো সমস্যা! আচ্ছা, আমাকে দেখে কি কিছু বোঝা যায়? এগুলো অবশ্য একে জিজ্ঞেস করা যাবেনা। তাহলে এই ছেলে আস্কারা পেয়ে যাবে।
রাতে পলিকে অবশ্য জিজ্ঞেস করেছিলাম, আমাকে দেখে কিছু বোঝা যায় কিনা! পলি হাসতে হাসতে অস্থির হয়ে বলল, "বোঝা যায়, জিনিস ছোট।"
আমি শুধু ওর হাসি দেখছিলাম। মুখে হাত চাপা দিয়ে গড়িয়ে পড়ে হাসছিলো। এত সুন্দর করে রেজিনা হাসেনা। রেজিনা সর্বক্ষণ গম্ভীর হয়ে থাকে। দরজা খোলার সময়, ভাত খাওয়ার সময়, শোবার সময়। রেজিনার কালো হয়ে থাকা মুখ, শুকনো ময়লা পা দেখে কিছু বলার সাহসই হয়না। একদিন অনেক ইতস্তত করে ঘামে ভেজা জামাটা খুলে নিয়ে ফ্যানের নিচে নিজেকে দাঁড় করিয়েছিলাম। নিজের শরীরের পাশে ওকে বেমানান লাগে। ওর ঝুলে যাওয়া বুক, পাটখড়ি চুল, পোড়া পোড়া চামড়া নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই, আমার মাথাব্যথা নিয়ে অবশ্য ওরও কোনো মাথাব্যথা নেই। ভাগ্যিস পলি ছিলো, নইলে কনস্টেবল ছেলেটা হয়ত আমার মুখের দিকে তাকিয়েও বুঝে যেত "স্যারে সেক্স পায়না।"

" স্যার, ফোন ধরেন।"
" হ্যা?"
" ফোন বাজে, ধরেন।"
টেবিলের ওপর ফোনটা কিরিকিরি করে বাজছে। এক হাতে ফোনটা তুলে আরেক হাতে পানির গ্লাসটা নিলাম। এক চুমুকে পানিটা শেষ করে নিয়ে ওপাশের কথাগুলো শুনে নিয়ে ফোন রাখলাম।
" বারেক সাহেব, যাইতে হবে। চলেন।"
বারেক সাহেব উঠে দাঁড়ান। সাথে আরও ৩/৪ জন নেন, ওই নতুন কনস্টেবল ছেলেটাকেও। ছেলেটা ফটফট করে বেশি, কিন্তু খুব কাজের। এরইমধ্যে সবার সব খুঁটিনাটি তার জানা। তিন নাম্বার রাস্তার হলুদ রঙের বাড়ির সামনে গিয়ে গাড়ি দাঁড়িয়ে গেলো। মানুষের ভিড় দেখেই বোঝা যাচ্ছিলো এই বাড়িতে কিছু হয়েছে। পুলিশের গাড়ি দেখে সবাই একটু সন্ত্রস্ত হলো, কিন্তু নড়লোনা। একপ্রকার ভিড় ঠেলেই আমাদের ভিতরে ঢুকতে হলো। জোড়া লাশ ভিতরে, স্ত্রী স্বামীকে খুন করে নিজে আত্মহত্যা করেছে। লাশ পোস্টমর্টেমের জন্য পাঠিয়ে ক্রাইম সিনে একজন এসআই আর দুজন কনস্টেবল রেখে ফিরে এলাম। মৃতের দুজন আত্মীয়কে বললাম থানায় এসে একবার দেখা করে যেতে।
গাড়িতে ফিরতে ফিরতে রাস্তার দিকে চোখ রাখলাম। সব বদলে যাচ্ছে। জিলিপি খেতে ইচ্ছে করছে। একজন কন্সটেবল পাঠানো হলো জিলিপি আনতে। গাড়ি ঢুকতে ঢুকতে দেখলাম থানার গেটের সামনে এক লুলা ভিখারি। চেনা লাগল, পাঁচটা টাকা দিলাম, হাসি পেয়ে গেলো। বড় স্যারকেও মাঝেমধ্যে এমন লাগে। প্রায়ই এদিকে ওদিকে ঘটনা ঘটে। আমাদের ডাক পড়ে। বড় স্যার লুলা ভিখারি হয়ে যান। আমরা তবারক পাই, জিলিপি খাই। জিলিপি পাওয়া গেলোনা, সিঙারা আনানো হলো। গরম গরম চা দিয়ে সিঙারা খেতে খেতে নতুন কনস্টেবল ছেলেটা এসে বসলো।
" কান্ডকারখানা দেখে তো ভয়ই লাগতেছে স্যার। বিয়াই করব না। কবে দেখব বউ খুন টুন করে দিছে। আপনার মত হব, আপনি কত ভালো আছেন! বিয়াশাদী না করাই উচিত। "

আমি সিঙারা থেকে বাদাম বের করে আলাদা করে চিবুতে থাকি। গোলাপি ফুলের কারুকাজ করা সাদা চায়ের কাপটা হাতে তুলে নেই। কাপটার এক কোণা ভাঙা, ভাঙা কাপে চা খাওয়া ভালো না, তবুও খেলাম।
রাতে পলির কাছে যাই। দরজা বন্ধ, পলি অন্য কাস্টমার বসিয়েছে। ঘরে ফিরে আসি। রেজিনা কোথায় যেন চলে গিয়েছে। ও এমন মাঝেমধ্যে মিলিয়ে যায়, আবার ফিরে আসে। অপেক্ষা করতে ভালো লাগেনা। শুন্য শোবার ঘরে বসে থাকি কিছুক্ষণ, ঘুমিয়ে পড়ি। স্থির ভোরে হাঁটতে থাকি পরদিন। জিরিয়ে জিরিয়ে থানার ছাদে উঠে যাই। সামনের রাস্তায় দূরে বারেক সাহেবকে দেখি। আসতে আসতে ছাদের ওপর আমায় দেখে থমকে দাঁড়ান। চোখে চোখ রেখে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে ট্রিগারটা টেনে দেই।