বিশ্বাসের পেটের ভিতর

নির্ঝর নৈঃশব্দ্য



বিশ্বাসের ভিতর পুড়ে খাক হয়ে যায় অবশেষে জরাসন্ধের বিশ্বাস। সে জানতো যে জরা-মা তাকে জুড়ে দিয়েছে পৃথিবীর দুই পার থেকে দুই খণ্ড শরীর এনে, সেই জরা-মা তাকে রক্ষা করবে পুনর্বার বিভেদ হলে। কিন্তু জরাসন্ধ ছিন্ন হয়ে পৃথিবীর দুই প্রান্তে ছড়িয়ে পড়লো, মা তাকে আর জুড়ে দিতে পারলো না একসঙ্গে। কেননা মায়ের হাত অতো দীর্ঘ নয়। জরা-মা জানতো এমনই হবে তাই আর দীর্ঘ করে বাড়ায়নি তার দুই হাত।
আমরাও প্রত্যেকেই জরাসন্ধের নিয়তি নিয়েই জন্মগ্রহণ করি। আমাদের নিয়তি আর কিছু নয়, আমাদের বর্তমান। বর্তমানের কর্মের উপর ভবিষ্যত নির্মিত। এই কথা শ্রীকৃষ্ণের। এবং সকলের জন্যে প্রযোজ্য। আমাদের ছোটবেলায় পড়া ভাবসম্প্রসারণের সেই একলাইনের ভাব—ম্যান ইজ আর্কিটেক্ট অব হিজ ওন ফরচুন। ব্যাপারটা এমনই। তাই আপাতত সুমনের গানের মতো বিশ্বাস করি চুমুতে, বিশ্বাস আশ্লেষে... এই সূত্র মাথায় রেখে ভাবি আর কিছুই বিশ্বাস করি না। কিন্তু বিশ্বাস আমাদের ছাড়ে না। আমি আমার কাছের মানুষদের বলি কাউকে বিশ্বাস করবে না, এমন কি ডান হাত বাম হাতকে, বাম চোখ ডান চোখকে, ডান পা বাম পা-কেও বিশ্বাস না করে, এমন অবস্থা যদি হয় তবে উৎরে যাবে সমাজ আর রঙিন আকাশ, ধূসর বায়ুমণ্ডল, উর্বশীর শাড়ি ও পায়ের আলতা, পাতালের নখ, আকাশের তারা ও তার ঘ্রাণ ইত্যাদি। পাখির ডাকে ভরে গেলে পৃথিবীর সকল নদী, স্রোতও হয়ে উঠে অত্যাশ্চার্য সন্তুর।
বিশ্বাসেরও অনেক ধরন আছে, নিরাকারে বিশ্বাস, আকারে বিশ্বাস, আত্মবিশ্বাস, অন্যের প্রতি বিশ্বাস। আরেক প্রকার বিশ্বাস মানুষকে মাইল মাইল শূন্য করে দেয়, অনির্দিষ্ট করে দেয়। যেমন সেইরূপ বিশ্বাস বিশেষ কোনো গানেও ঘনীভূত হতে পারে কখনো। কিছু গান আছে একবার শুনলেই ভিতরে টান মারে এমন নয়। এই টান মারার জন্যে বিশেষ মুহূর্ত, পরিবেশ বা বিশেষ কণ্ঠস্বরও লাগে—আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণধুলার তলে, সকল অহংকার হে আমার ডুবাও চোখের জলে ছোটবেলা থেকেই রবিনাথের গান আমাদের বাড়িতে বাজে। তো এই গানটাও ছোটবেলা থেকে শুনেছি অজস্রবার। প্রিয় গান তবু প্রাণের মধ্যে বাজেনি তেমন করে। এই গান যখন একদিন সন্ধ্যায় একজন গাইলো বনের মাঝে বসে খালি গলায়, তাও হবে সতেরো বছর আগে। সে এই গানটার ভিতর ডুবে যাচ্ছিলো সমস্ত। তার ডুবে যাওয়ার ভিতর এই গান শুনতে শুনতে আমি ডুবে গিয়ে তলিয়ে গেলাম। হয়ত খালি গলায় গাওয়া, হয়ত সে ছিলো আমার বিস্মৃতির নদী এইসবও কারণ হতে পারে। সেদিন থেকে এই গান, এই প্রার্থনার ভাষা শুনলেই আমার পার্থিব-অপার্থিব সবকিছু বিশ্বাস করতে মন চায়। নিজেকে মহান প্রকৃতি, প্রেম ও সুন্দরের চরণতলে তুচ্ছ, ধূলিকণা মনে হয়। সে নেই, তার কণ্ঠস্বরও হারিয়ে গেছে কোথাও। এই গান শুনে শুনে সেইসব সন্ধ্যার কথা মনে পড়ে যায়। হয়ত বিস্মৃতির নদী ফুরিয়ে গেছে তাই স্মৃতিরা অমর হয়ে গেছে। যেমন আরো গান আছে অদৃশ্যে সমর্পন দাবী করে—যে তৃষা জাগিলে তোমারে হারাবো—সে তৃষা আমার জাগায়ো না... ইত্যাদি। এও একধরনের বিশ্বাসের বাহিরের বিশ্বাস। আমরা কিছুই বিশ্বাস করতে চাই না, কিন্তু বিশ্বাস আমাদের হাত ধরে থাকে। কেননা মানুষ জন্মগতভাবেই প্রকৃতি ও তার কারণের কাছে অসহায়, শেষপর্যন্ত বিশ্বাসই অসহায়ের সহায় হয়ে যায়।
আধুনিক মানুষ পরস্পরকে বিশ্বাস করে না, মেনে নেয়। এই কথা আমি নিয়তই বলি। তারপরও একধরনের বিশ্বাস পরস্পরের মধ্যে থাকে। এইটা একটা সুতা। এই সুতা ছিঁড়ে গেলে মানুষও ছিঁড়ে যায়। প্রজাপতির ডানার মতো, জরাসন্ধের শরীরের মতো, নদীর দুইকূলের মতো, পূর্ব আর পশ্চিমের মতো ছিন্ন হয়ে যায়। ছায়া ছায়া চোখে ছুঁই, ছোঁয়াগুলি আছড়ে পড়ে মায়াপ্রাচীরের গায়।
তাহলে কী? তাহলে যারা বিশ্বাস করে না কিছুতেই, তারাও মূলত বিশ্বাসের পেটের ভিতরেই চিরদিন অবিশ্বাসী—গানের তৃষ্ণার ভিতর যেমন বেজে যায় অবিরল গানেরই বাঁশি।