‘কুয়াশা যখন…’

মিলন চট্টোপাধ্যায়



'মুখের মিছিল মুখোশ হয়ে যায়
ঘিরে ধরে কুয়াশা যখন
কতশত অনুভূতি বিবর্ণ রঙ নেয়
তুলি ধরে কুয়াশা যখন...

পুতুল নাচের পটভূমি এই পৃথিবী
রঙ মাখা পুতুলের ভিড়
কেউ এরা বিশ্বাসী কেউ বা অবিশ্বাসী
কেউ ধীর কেউ অস্থির
তবু সে নাটক স্তব্ধ হয়ে যায়
ঘিরে ধরে কুয়াশা যখন...' ( নচিকেতা চক্রবর্তী )


গানটি প্রথম শুনি নবম শ্রেণিতে পড়ার সময়। 'কুয়াশা যখন' শব্দদুটি শুনলেই এক অদ্ভুত অনুভূতি হত। যেন পাহাড়ি পথ দিয়ে হাঁটছি আর হঠাৎ এক কুয়াশার স্তূপ ঘিরে ফেলছে আমায়। একটা মনকেমন করা সুর। ততদিনে এই কুয়াশার সঙ্গে পরিচয় হয়ে গেছে। তাকে প্রবল সন্দেহ না বলে সংশয় বলাই শ্রেয়।

কতরকমের সংশয় আমাদের যে ঘিরে রাখে। জন্ম থেকে মৃত্যু ইস্তক এর আনাগোনা। সদ্যোজাত শিশু যেমন মা ছাড়া অন্য কাউকেই চেনে না, দু'একজন বাদে অন্য কোলে প্রথমে গেলেই কাঁদে সেও এই সংশয় থেকেই। যা একটি জন্মগত প্রবণতা। শুধু মানুষই নয়, যে কোনও প্রাণীই জন্মসূত্রে সংশয় নিয়েই আসে। সরমা যেমন বাচ্চা দেওয়ার পর বাচ্চাদের দিকে কাউকে যেতে দেখলে সন্দেহ থেকেই তেড়ে আসে এমনকি কামড়েও দেয়। এই সংশয় আসে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দ্বন্দ্ব থেকে তারপর বাসা বাঁধে মাথার ভেতর।

ছোটবেলায় আইসক্রিম খেতে খুবই ভালবাসতাম। নেহাতই সস্তার কাঠি আইসক্রিম অথবা প্লাস্টিক পাউচে রঙ-বেরঙের পেপসি। সে সময় গরমের ছুটির দুপুরগুলো অন্যরকম ছিল। আমের বোলের গন্ধমাখা নিঝুম দুপুরে পাক খেয়ে ঝরে পড়ত শুকনো পাতা। জায়গায় জায়গায় ছোট ছোট ঘূর্ণির মত ধুলো পাক খেত। মাদুর বিছিয়ে অঙ্ক করতে করতেই হঠাৎ কানে আসত টুং টুং আওয়াজ। তিনচাকা ভ্যানে অথবা সাইকেলে একটা বাক্স বেঁধে 'আ~~য়ে~~স~~কি~~রি~~ম ~~ মা--লা--ই -- মা--লা--ই' হাঁকতে হাঁকতে গলিতে ঢুকতেন আইসক্রিমকাকু। পঞ্চাশ পয়সায় পাওয়া যেত অরেঞ্জ অথবা নারকেল দেওয়া শাদা আইসক্রিম, নানা রঙের পেপসি। সেই সামান্য পয়সাও হাতে থাকত না। মায়ের কাছে চাইলে প্রথমেই বলত -'এসব খেতে নেই বাবু। ড্রেনের জল দিয়ে বানায়!' খুব খারাপ লাগত। ভাবতাম -এমন হলে সকলে খায়ই বা কেন! ওই ভাবনাই মায়ের প্রতি পয়সা না দেওয়ার অজুহাত জনিত সন্দেহ। মাঝে মাঝে খুব ঘ্যানঘ্যান করলে দশটা অঙ্ক বা দুপাতা হাতের লেখা বেশি করার কড়ারে পেতাম মহার্ঘ পঞ্চাশ পয়সা। পরে, বড় হয়ে বুঝেছি মায়ের কাছে ওই সামান্য পয়সাটুকুও অনেকটাই ছিল। সব সামলে এই পঞ্চাশ পয়সার দামও তাঁর হিসেব থেকে কমে যেত। তাই মায়ের বারণে পুত্রের শরীরখারাপ হতে পারে এই ভাবনা ছাড়াও সংসার চালানোর সংশয়টুকুও ছিল।

আর একটু বড় হয়ে টিউশন নিতে প্রথম গেলাম ব্যাচে। ক্লাস নাইনে। পড়ার ব্যাচে দিব্যি হাসিঠাট্টা, মজার মাঝে খেয়াল করলাম কামাই হলে দুএকটি তথাকথিত ভাল ছাত্র-ছাত্রী খাতাটুকুও দেখায় না! তখনও পর্যন্ত এই ব্যাপারটি বুঝতেই পারিনি যে খাতা দেখালে বা পড়া বলে দিলে নম্বর কম পাওয়া যেতে পারে! সেই প্রথম আমার মাথাতেও প্রত্যক্ষ থাবা বসাতে শুরু করল সন্দেহ। আচমকা কোনও একদিন পড়াশোনায় মধ্যম মানের ছাত্রটি ব্যাচটেস্টে সর্বোচ্চ নাম্বার পেলেই সন্দেহ হতে শুরু করল।


“সুরঞ্জনা, অইখানে যেওনাকো তুমি,
বোলোনাকো কথা ওই যুবকের সাথে;...

কী কথা তাহার সাথে? তার সাথে!...” ( জীবনানন্দ দাশ )


মাধ্যমিকের পরে নতুন পড়ার ব্যাচে ভর্তি হলাম। প্রায় সকলের প্রেমের পালেই হাওয়া লাগল। সেই হাওয়াটুকু অবশ্য মালিন্যহীন। আমারই প্রিয় বান্ধবীর প্রেমে কিছুটা একতরফাই পড়ল এক বন্ধু। সেই মেয়েটি ছিল আমার অত্যন্ত ভাল বন্ধু। আমার সঙ্গেই সে বাড়ি ফিরত। এমনকি একেকদিন তার ভাই সাইকেল করে নিতে এলেও সে ভাইকে বাড়ি পাঠিয়ে আমার সঙ্গে ঘুরে ঘুরে বাড়ি যেত। তখনকার সেই ক্যাবলা, হাঁদামার্কা, সারাদিন ক্রিকেট খেলা, গোল চশমা পরা রোগা ছেলেটিকে সেই মেয়েটি কীভাবে এত ভরসা করেছিল তা বুঝতে পারিনি! সে যাই হোক, একদিন নদীর ধারের একটি আধা পার্কে সেই বান্ধবী আমাকে জড়িয়ে খুব কাঁদে। বাড়ির সমস্যা ছিল কিছু। সেই মুহূর্তে আমাদের দেখে ফেলে প্রেমিক বন্ধুটি। যে সারাদিন আমার বাড়িতে থাকত সেই আমাকে পেটাতে আরও অনেক বন্ধুকে পাঠায়। অবশ্য মার আমি খাইনি। তখনই প্রথম বুঝি প্রেমজ সন্দেহ কী মারাত্মক! এতদিন বাদে সেই বন্ধুর জায়গায় নিজেকে বসিয়ে বুঝি হয়ত বন্ধুর পক্ষে এই প্রতিক্রিয়াই স্বাভাবিক ছিল।

সেই অতি সুন্দরী বান্ধবীর সঙ্গে বহুদিন যোগাযোগ নেই। থাকলে হয়ত আজ আমার সন্দেহটুকুও মেটানো যেত। সে কী আমাকে...

'...উড়ছ, হারামজাদি, উড়ছিস তু্‌ই, হাড়ে
হাওয়া লাগছে, ঘরে-ঘরে আমিই, হ্যাঁ, ছুরি হাতে
কখন ঘুমোতে আসবি অপেক্ষা করে আছি তার' - ( তন্ময় ভট্টাচার্য )


সে সময় আমি পড়তে যাই এক বিখ্যাত মাস্টারমশাইয়ের কাছে। স্বাধীনতাপূর্ব সময়ে তিনি ছিলেন ফিজিক্সে গোল্ড মেডালিস্ট। মেঘনাদ সাহার প্রিয় ছাত্র। একটি হাইস্কুলে তিনি পড়াতেন। এই ছোট্ট মফস্বলে তাঁর খ্যাতির সঙ্গে জুড়ে ছিল কুখ্যাতিও! প্রেমজ ঘটনায় তিনি তাঁর স্ত্রীকে ঘুমন্ত অবস্থায় যৌবনে খুন করেছিলেন। তারপর টুকরো টুকরো করে কেটে, স্টিলের ট্রাঙ্কে ভরে ডুবিয়ে দিয়েছিলেন চূর্ণির জলে। কয়েকমাস পরে ব্রিটিশ পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। ফাঁসির আদেশ হলেও তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা পান। যাবজ্জীবন সাজা খেটে বেরনোর বহুদিন বাদে তিনি আবার পড়াতে শুরু করেন। তাঁর খুনের বিষয়ে কারণ আলোচনা না করে বরং বলতে পারি তাঁর কাছে পড়তে অনেক মেয়েই ভয় পেত। এমনকি আমিও সন্দেহ করেছিলাম তিনি পিশাচ প্রকৃতির মানুষ। পরে এক অশীতিপর বৃদ্ধ'কে দেখি যাঁর অবিশ্বাস্য মেধা এবং স্মৃতির অপার্থিব প্রখরতা আমাকে আবিষ্ট করে। সন্দেহকে ভুল প্রমাণ হতে দেখে এক ছাত্র ক্রমশ ব্লটিং পেপার হয়ে ওঠে এক প্রকৃত শিক্ষকের প্রেরণায়। আমার জীবনে তাঁর অবদান কোনোদিনও ভোলার নয়।

‘সে আমাকে কুরেকুরে খায়
সাধুর মুখোশ পরে আমি এক ক্রুদ্ধ চণ্ডাল
ফেরবার নেই পথ -

ওথেলোর হাতে শুধু থেকে যায় ডেসডিমোনার সেই সুগন্ধি রুমাল’ ( মিলন চট্টোপাধ্যায় )

সন্দেহকে সন্দেহ দিয়ে গুণ করলে শূন্য পড়ে থাকে। এই পড়ে থাকাটির সেজন্য দায় নেই। ক কখন খ'কে অবিশ্বাস করতে শুরু করল তা ভাবতে বসলে একদম প্রথম আলাপের পরবর্তী মুহূর্তকেই দায়ী করতে হয়। জীবনের পতন ছাড়া উত্থানেও এই শূন্যের অনেক অবদান। সম্পর্কে বিশ্বাস, প্রেম, ভরসা বাড়তে থাকলেই আসে অধিকারবোধ আর তারপরই জন্ম নেয় সন্দেহ। বাড়তে থাকলে ক্রমশ আত্মবিশ্বাসে ফাটল ধরে। নষ্ট হয় সম্পর্ক। কারও কারও ক্ষেত্রে সন্দেহের বাড়াবাড়ি রোগ হয়ে দাঁড়ায়। শেকস্‌পিয়রের বিখ্যাত নাটক ওথেলো’তে এমনই ঘটনা পড়ি আমরা। সন্দেহ থেকেই প্রিয় ডেসডিমোনাকে খুন করে পরে ভুল বুঝতে পেরে ওথেলো নিজেও আত্মঘাতী হন। এই চরিত্রটি থেকেই নামকরণ হয়েছে ওথেলো সিনড্রোম নামক এক মারাত্মক মনরোগের। এটি এমন একটি রোগ যা মনোবিদ্যায় প্যাথলজিক্যাল জেলাসি অথবা মরবিড জেলাসি নামে পরিচিত। এই রোগে রোগীর মনে ধারণা হয় যে তার সঙ্গী অন্য কারও সঙ্গে সম্পর্কে যুক্ত। এই ধারণা প্যারানইয়ার কাছাকাছি যা কোনও প্রমাণের অপেক্ষা রাখে না। রোগী অস্বাভাবিক আচরণ করতে থাকে। শেকস্‌পিয়রের নাটকের চরিত্র ওথেলো থেকেই এই রোগের নামকরণ করা হলেও আসলে এ রোগের যা লক্ষ্মণ তা ওথেলোর ছিল না। ওথেলোকে মিথ্যে তথ্য সুনিপুণভাবে বুঝিয়ে অপরাধে লিপ্ত করানো হয়েছিল।
শুধু সম্পর্ক নয় অনেকক্ষেত্রে দেখতে পাই আমাদের মধ্যেই কেউ কেউ বাড়িতে তালা দিয়েও বারবার এসে দেখেন দেওয়া হয়েছে কিনা, ফর্ম ফিলাপের সময় কতবার যে বানান মেলান তার ইয়ত্তা নেই! একে অবসেশন বলা যায়। এক্ষেত্রে আমরা জানি যে আমাদের এই সংশয় আসলে মানসিক সমস্যা তবু এর হাত থেকে নিস্তার নেই। কিন্তু যখনই সন্দেহকে সত্যি মনে হতে শুরু করবে তখনই জন্ম নেবে এক বিষম অসুখ - প্যারানইয়া।

কলেজজীবনে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে ভোটযুদ্ধে নামা, নির্বাচিত হওয়া এসব নিয়েই কেটে গেছিল অনেকটা জীবন। নিরঙ্কুশ ক্ষমতা নিয়ে আসার পরে যখন হতদরিদ্র ছাত্রের বদলে বড়লোক বাবার মেয়েটি দুঃস্থভাতা পায় তখনই রাজনীতির প্রতি সংশয় দেখা দিল আমার মনে! সে ব্যাপারটি আটকাতে পারলেও দলের মধ্যেই উপদল তৈরি হয়ে গেল। একে অপরকে তীব্র সন্দেহ আর পরস্পরকে নজররাখার মধ্যে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মাঝের ফাটলটি ক্রমশ চওড়া হয়ে উঠল। পরে অন্য একটি দলে যোগ দিয়ে কিছুদিন বাদেই লক্ষ্য করলাম সদ্য তরুণদের প্রতি পিতৃতুল্য মানুষদের অবিশ্বাস আর সন্দেহ! যে সুনিপুণ দক্ষতায় এই সন্দেহ তারা ছড়িয়ে দিচ্ছিলেন তা আমাকে পাকাপাকিভাবে রাজনীতিবিমুখ করে তোলে।

“কত বড়ো আমি, কহে নকল হীরাটি-
তাই তো সন্দেহ করি নহ ঠিক খাঁটি” ( রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর )


চাকরিজীবনেও সন্দেহের শিকার হয়েছি। সন্দেহ করেওছি। তবে লিখতে এসে যা দেখেছি তা একেও হার মানিয়ে দেয়। প্রথম দশকের একদম প্রথমে যেটুকু বিশ্বাস ছিল তা বছর দুয়েকের মধ্যেই সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়। সবকথা লেখার সময় এখন নয়, বেঁচে থাকলে একদিন সবটুকু লিখে যাব। কিন্তু ভাইয়ে ভাইয়ে এত সন্দেহ, বন্ধুর প্রতি বন্ধুর তীব্র অবিশ্বাস আর কোথাও নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিজের ঢাক নিজে পেটানো দেখতে পাচ্ছি। নিজের দল তৈরি করে নিজেদেরকেই শ্রেষ্ঠ ঘোষণা করাই দস্তুর হয়ে উঠেছে যেন! আমি / আমরা কত্ত বড় -- এ দেখেলেই অত্যন্ত সন্দেহ হওয়া তাই পাঠকের পক্ষে অস্বাভাবিক নয়। প্রায় সকলেই যেন লিখতে বসেছে সন্দেহের আলোয়ান গায়ে জড়িয়ে! মুখে মিছরির মত বোল আর অন্তরে সন্দেহের কুটিল ঘাতক মন নিয়ে আমাদের অনেকেই লিখে যাচ্ছি সংশয়ের কথামালা!



"তুমি দেশ? তুমিই অপাপবিদ্ধ স্বর্গদপি বড়ো?
জন্মদিন মৃত্যুদিন জীবনের প্রতিদিন বুকে
বরাভয় হাত তলে দীর্ঘকায় শ্যাম ছায়াতরু
সেই তুমি? সেই তুমি বিষাদের স্মৃতি নিয়ে সুখী
মানচিত্ররেখা, তুমি দেশ নও মাটি নও তুমি!" - ( শঙ্খ ঘোষ )




এই কবিতায় ফুটে ওঠা সংশয় আসলে আমাদেরই সংশয়। দেশভাগের যন্ত্রণা নিয়ে ভিটেছাড়া মানুষ প্রতি মুহূর্তে শাসককে সন্দেহ করে। দেশ মানে র‍্যাডক্লিফের লাইন নয় যাকে কলমের খোঁচায় পাল্টে ফেলা যায়। সন্দেহকে দানা খাইয়ে পুষ্ট করে দুটি সম্প্রদায়ের মধ্যে যে বিভেদ ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল তা ক্রমশ ভয়াবহ হয়ে উঠছে। ১৯৪৭ সালে মানবজাতির ইতিহাসে সবথেকে বড় যে দেশান্তরের ঘটনা ঘটেছিল তা ছিল সন্দেহের প্রত্যক্ষ ফসল। সেই যে বিষ ঢুকে গেল হিন্দু-মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের অধিকাংশের মনে তা বেড়েই চলেছে। দোষ কার? আমাদের না আমাদের ব্যবহার যারা করেন, তাদের?


দেশভাগের পরে বাংলাদেশ যখন অশান্ত হয়ে উঠছে তখন আমার মায়ের পরিবার যথেষ্ট প্রভাবশালী হওয়ায় সাহস করেছিলেন থেকে যাওয়ার। আমার শিক্ষক দাদুর বিশ্বাস ছিল তাঁর কোনও ক্ষতি হবে না। সেই বিশ্বাসে গভীর চিড় ধরে এক অনভিপ্রেত ঘটনায়। বাড়ির দীর্ঘদিনের কাজের মানুষ জাফর একদিন আমার দাদুর বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করা ছাত্ররাই তাকে ধরে, আগুন নেভায়। জাফর জানায় গোঁসাই বাড়িতে আগুন দিলে তার বেহেস্ত যাওয়া পাকা! দাদু বুঝতে পারেন, অশিক্ষিত, বিশ্বাসী জাফরের নিজের কথা এ নয়। তখনই তিনি সিদ্ধান্ত নেন দেশত্যাগ করার। তাঁর ছাত্ররা, বন্ধুরা সকলেই মুসলমান। তাঁরা দাদুকে বলেন -জান থাকতে মাস্টারমশাইয়ের ক্ষতি তাঁরা হতে দেবেন না। নিয়মিত পাহারাও দিতে শুরু করেন। কিন্তু দাদুর মনেও বাসা বাঁধে সংশয়। এতগুলি কন্যাসন্তান নিয়ে তিনি আর সাহস দেখানোর জায়গায় ছিলেন না। একদিন সব ছেড়ে প্রায় একবস্ত্রে তাঁরা দেশত্যাগ করেন। আমার মা তখন শিশু। যখন তাঁরা চলে আসেন তখন তিতাস নদীতে লঞ্চে ওঠার সময় দেখেন তাঁর প্রিয় কুকুরটি লঞ্চের সঙ্গে সাঁতার কাটার অসম লড়াই করছে! এতদিন ধরে যা নিজের ছিল - প্রিয় সেই বাড়ি, গাছতলা, পোষ্যরা, ছোট্টবেলার খেলার সঙ্গী, হাঁসের দল, হারমোনিয়াম ফেলে রেখে একটি শিশু যখন কাঁদতে কাঁদতে চলে আসে তার অভিঘাত ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ কল্পনাও করতে পারবে না। সন্দেহ থেকে তৈরি হওয়া এই অবিশ্বাস্য বৈরিতা আমাদের গোটা জাতিকে ধ্বংস করে দিয়েছে। এপারে এসেও 'বাঙাল' শব্দে যে বিদ্রূপ, উপহাস তা সহ্য করে তাঁরা এই দেশকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চেয়েছেন। এই চাওয়া কী কোনও অন্যায়! 'সন্দেহ' এই একটি শব্দ কোটি-কোটি মানুষকে কীভাবে নিরাশ্রয় করে দিল তা ভাবতে বসলে যন্ত্রণা হয়।

‘সংশয়ের ফিতে নিয়ে বসে থাকি। একা।
এখনও শিখিনি আমি প্রকৃত জরিপ।’ ( মিলন চট্টোপাধ্যায় )


একটি লেখা কীভাবে শুরু হবে, অন্তত গদ্যের ক্ষেত্রে-- তা আমার কাছে স্পষ্টতর হয়নি এখনও! লেখাকে যদি ধরে নিই জীবন্ত তাহলেও এর শৈশব, কৈশোর, যৌবন নিয়ম মেনে আসে না। এই যে প্রবল দ্বিধা, তা নিজের ওপর অবিশ্বাস তৈরি করে। প্রতিবার যাকে পথ বলে ভেবে নিই তা পরেরবার আমাকে দেখে হাসে, জিভ ভ্যাংচায়। আমি আবারও ছুঁড়ে ফেলি কাগজ। বারবার। বারবার। একসময় পরাজিত হয়ে খুঁজে নিই এসকেপ রুট। ঘুম। ঘুম ভেঙে ভুলে যাই সব। হয়ত রাস্তায় উদ্দেশ্যহীন আমাকে ক্লু ছুঁড়ে দেয় অজানা কেউ! বলে -'ওহে, এই নাও সূত্রটুকু। দম থাকলে লেখ।' ভাবনা ঘুরপাক খায়। ফিরে আসি। তক্ষুনি সংসার বলে -'কাজ আছে বিস্তর।' এসবের মধ্যে থেকে যদি কোনোদিন সময় আমাকে সময় দেয় তখনই লেখা হয়। ভাল না মন্দ তা বুঝিনে। এই সন্দেহ নিয়েই আমার বেঁচে থাকা। এই সংশয় নিয়েই যাবতীয় লেখালিখি।