বোকাদের পোর্টম্যান্টো

পৌলমী গুহ



সাম্প্রতিক অতিমারীর পরবর্তী হুজুগ হল গিয়ে ভোট। যদিও আমার-আপনার রাজনৈতিক বোধোদয় আপাতদৃষ্টিতে কোনোও প্রভাব ফেলে না, তবু গা-গরম করা রাজনৈতিক তরজা আর সান্ধ্যকালীন তেলেভাজার খুশবু একইরকমের আনন্দ দেয়। তা এই বঙ্গভূমে নিন্দুকের মুখে ছাই দিয়ে, করোনাকে কাঁচকলা দেখিয়ে রথী-মহারথীরা নেমে পড়েছেন ভোট-যুদ্ধে। এ এক এমন সময় যেখানে দাঁড়িয়ে চট করে বক্তব্য বোঝাতে পারাই আসল ব্যাপার। এবং তাইই হয়ত এবারের রাজনৈতিক দড়ি-টানাটানির সবচাইতে জনমুগ্ধকর বাক্য হয়েছে, "খেলা হবে!"
আট থেকে আশি সকলেই এই 'খেলা'-র রকমসকম জানে না তা নয়। কিন্তু তাতে 'খেলা'-র আনন্দ মাটি হবে তাই বা কে বলেছে? অগত্যা খেলা হচ্ছে। করোনাও এতোদিন খেলেছে। সে খেলার চোটে নাভিশ্বাস উঠে গেছিল প্রায়, কিন্তু রাজনীতিবিদরা খেলতে পিছ-পা তখনও হননি, এখন তো প্রশ্নই ওঠে না!

আমজনতা একখানা ফোনের দৌলতে নিজেরাও খেলে ও খেলিয়ে চলেছে। করোনার আগে যাঁদের ভিটেমাটি চাঁটি হতে বসেছিল, আর যাঁরা তার প্রতিবাদে নেমেছিলেন মাঠে, উভয়পক্ষই খেলার দাপটে বাউন্ডারির বাইরে চলে গেছেন। কারণ কে না জানে, ভোটের খেলার সময় আগেকার সব খেলার নিয়ম পাল্টে যায়। বেশ ভালো করে ভাবলে দেখা যাবে রাজনীতিবিদরা সকলেই কথার খেলায় সিদ্ধহস্ত। মোদ্দা, কথা বেচেই তাঁদের 'পেট' চলে। তাঁদের ক্রেতা আপামর জনসাধারণ। আর ক্রেতাদের বেশিরভাগই কী কিনছে, কেন কিনছে বা আদৌ প্রয়োজন আছে কিনা এসব ভেবে খরিদ তো করেন না। যে কারবার আসলেই বিশ্বাসের ওপর চলেফিরে বেড়ায়, তাতে এসব ভাবনা এমনিই আসার কথা। কিন্তু যে কোনোও কারণেই হোক, এই কারবারেই সে কথা উহ্য থেকে গেছে! এমনকি পাঁচবছর ধরে বিশ্বাসের পরীক্ষায় ডাহা ফেল করলেও, পরবর্তী পাঁচ বছর একই ভুল করতে দেখা গেছে। বিশ্বাসবনে মত্ত হস্তী নয়, মত্ত হস্তীর হোল ফ্যামিলির দাপাদাপিও সহ্য করতে পারেন, জনতা এমনই সহনশীল!
বেশ ছোটোতে কাঠি-আইসক্রিমের লোভ ছাড়াতে মা বলে দিয়েছিল ওগুলো ড্রেনের জলে তৈরি। কোনোও প্রশ্ন ওঠেনি। আরেকটু বড়োতে জানা গেল, বিয়ে মানেই খুব সম্মানীয় প্রতিষ্ঠান। প্রশ্ন উঠলেও করাটা অসম্মানজনক বলে ঠিক বিশ্বাস না হলেও, কাছাকাছি কিছু একটা ধরে নেওয়া গেল। এরকম নানা বিশ্বাস নিয়েই একটি মানুষ বড়ো হয়ে ওঠেন। সাইকোলজিস্ট বলেন, প্রতিটি সামাজিক বিশ্বাস আসলে অর্জিত বিশ্বাস।
অর্থাৎ, যাহাই উচিত বা অনুচিত বলিয়া ভাবিতে বাধ্য হইয়াছি, তাহাদের কোনোওটিই 'স্থির বিশ্বাস' নহে! তাহলে দাঁড়াচ্ছে উচিত বলে কিছু নেই। সুতরাং সন্তান লায়েক হয়ে বাপ-মা'কে বৃদ্ধাশ্রমে ঠেলতেই পারে, বাবা-মা'র দায়িত্ব নেওয়াই 'উচিত', এটা বলা যায় না। আবার অপোগন্ড সন্তান হলে তাকে ত্যাগ দেওয়াই ভালো, জন্ম দিলেই কর্ম করতেই হবে এই ঔচিত্যবোধ আদতে চাপিয়ে দেওয়া।
অথচ এই ঘটনাগুলো ঘটলেই আমাদের প্রত্যেকের সুপ্ত ঔচিত্যবোধে 'টঙ' করে লাগে। কারণ? কারণ আমরা ছোটো থেকে এগুলো বিশ্বাস করেছি। আমাদের বিশ্বাস করানো হয়েছে, গুরুজন মানেই প্রণম্য। বাবা-মা আসলে ঈশ্বরের সমতুল্য। সংসার ও সন্তানেই চিত্তের পূর্ণতা ইত্যাদি।

এবার যাঁরা ধরুন এসব বিশ্বাস করেন না, বা এই বিশ্বাসগুলোর পেছনে আদত যুক্তি ঠিক কী এটা ভাবতে বসেন, তাঁরা মোটামুটি দাগী আসামি। কেন? এও মানবমনের এক জটিল অথচ মজাদার বিষয়। আমাদের মস্তিষ্ক একটি নিয়মে আবদ্ধ হলে পরে সে তাতেই আরাম পায়। অর্থাৎ যে বাচ্চাটি ছোটো থেকে মায়ের ওপর নির্যাতন দেখে অভ্যস্ত, সে সেটিকে স্বাভাবিক বলেই জানে। এই নিয়মের ব্যত্যয় হলে পরে সে মানতে পারবে না। কেন? কারণ তার মস্তিষ্ক তাকে 'বিশ্বাস' করিয়েছে এটিই ঘটে এবং এরকম ঘটলে তার চিন্তিত, ভয়ার্ত হবার যথেষ্ট কারণ থাকলেও একইসঙ্গে একটি নিয়মে চলতে থাকার আরাম রয়েছে। সুতরাং, নতুন কোনোও চিন্তা, কোনোও বক্তব্য আমাদের পছন্দ নয়। তাই সেধরনের ঘটনা ঘটলেই ওই 'টঙ'! ওই 'টঙ'-টা ভালো না খারাপ সে যুক্তি খুঁজতে যাবার প্রয়োজন আর পড়েই না।
আর এর হাত ধরেই আমরা বলে ফেলি, "যে যায় লঙ্কায়…"। রাজনীতিবিদ হলেই টাকা চোর, স্ক্যামবাজ, ইদানীং ধর্ষক অথবা ধর্ষককে আড়াল করা। বি গ্রেড সিনেমায় লোভী, স্বার্থান্ধ, নোংরা রাজনীতিকদের যে চিত্র মনে অঙ্কিত আছে তারই নব নব রূপ। সকলেই জানে নিজের আখের গোছাতে রাজনীতিতে আসা, নিজেরটা বুঝতে নিজের নিয়মে 'খেলা'। এক দলে যথেষ্ট লাইমলাইট না পেলেই দিক বদলে অন্য দলে চলে যাওয়া ইত্যাদি!
এই পৃথিবীর বোধকরি কম-বেশি সব মানুষই এরকমটাই জানেন। এবং ঘেন্নায় মুখ কোঁচকালেও ভোট এদেরকেই দেন। কারণ আমাদের মাথায় গেঁথে নিয়েছি যে, এটাই হয়ে এসেছে বা এটাই হয়।
কেউ নতুন কথা বললেও তাই হাসিটা বাঁকা, "হুঁ! দেখা যাবে…" আসলে আমরা নিজেদের অসহায়, অপারগ, বড়ো ক্ষুদ্র বলেই বিশ্বাস করি। যে দেশটা নিজেদের স্বোপার্জিত অর্থেই চলে বলে জানি, সেই দেশটার ভবিষ্যত আমরা বদলাবার কেউ নই এই বিশ্বাসে আমাদের পিতৃপুরুষ থেকে আমরা, এবং সম্ভবত আমাদের আগামী প্রজন্মও বেঁচে থাকবে। এই অদ্ভুত আরামদায়ক বোকাটে বিশ্বাসপন্থী আমরা 'খেলা'-র মাঠের বাইরে উৎসাহে চিৎকার করবো কিন্তু 'খেলা'-র নিয়মগুলো যতোই অপছন্দ হোক জোর করে মাঠে ঢুকে পড়তে পারবো না।
আমাদের রোজ অতিমারী, বাজেট, অর্থনীতি, শিক্ষানীতি, ভোট, দাঙ্গা দিয়ে 'এপ্রিল ফুল' করা হলেও আমরা পয়লা এপ্রিল দাঁত কেলিয়ে মেসেজ ফরোয়ার্ড করে কচি পাঁঠার ঝোলের স্বপ্ন দেখবো।
সে পাঁঠা স্বপ্নে গুঁতোলেও 'খেলা হবে!'