রাতের সাথে আছি আমি ভোরের অপেক্ষায়

আশান উজ জামান




আকাশে গোল একটা রাঙা কুসুম। রঙের ভেতর কমলার ধাচ বেশি। নানামুখী আঁধার তাকে খামছে ধরেছে। আর জ্বলতে দেবে না, টেনে নামাচ্ছে নিচে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেটা তাই ডুবে যাবে টুপ করে। চোখে আমার খেলে যাবে বাহারি আঁধার। আলোর কোনো ব্যবস্থাও দেখছি না। অথচ আঁধার আমি সহ্য করতে পারি না মোটেই। চোখ জ্বলে, বুকের ভেতর জেগে ওঠে লোভের ভালুক।
ভালুকের একটা প্রোটোটাইপ মূর্তি আমার টেবিলে। তার মাথা বরাবর, সামনের দেয়ালে, গাঢ় এক শোকের মাসে আটকে আছে ক্যালেন্ডার। কেন যেন বদলানো হয়নি পাতাটা। অথবা, এমনও হতে পারে, ইচ্ছে করেই সেটা বদলাইনি আমি। ওই পাতায় ঝুলতে থাকা সমুদ্রটাই হয়তো কারণ। সৈকতে তার নৌকা বাঁধা একসারি। ঠিক নৌকা না, ধরন ধারণে পানসির মতো। বেশ খানিকটা আপন আপন লাগে তাদের আমার। আপন আপন বলতে, মনে হয়, নিজেই আমি এক পানসি অমন। ডিজাইনে আধুনিক হলেও কাজে প্রাগৈতিহাসিক। সুধীর স্থিরতায় বাঁধা আছি সৈকতে। জলরাশি বেশ খানিকটা দূরে। তাতে চিকচিক করে গলে পড়ছে কুসুমরঙের আলো। কুসুমটা সাগরজলে ডুবছে, না সেখান থেকে স্নান সেরে উঠছে বোঝা মুশকিল।
তবে সহজেই বুঝি, ডাঙায় বাঁধা পানসির মতো আমিও আছি স্রোতের অপেক্ষায়।
তা, আমি তো আর সত্যি সত্যিই পানসি না! চলতে পারি, ছুটতে পারি, ইচ্ছে হলেই ঝাঁপিয়ে পড়তে পারি। ভেবে তাই উল্টে দিই মাসটাকে। দিতেই এসে দাঁড়ায় মস্ত মৌচাক এক। তেঁতুল ডালে আটকে আছে। স্থিরচিত্রেও কেমন ধরা পড়ছে মৌমাছিদের ব্যস্ততা- কেউ মধু নিয়ে আসছে, বয়ে আনা মধু জমিয়ে রেখে বেরোচ্ছে কেউ। অভাবে স্বভাবে আমি কি ওই মৌচাকেরই মতো, মধুর ভারে ঝুলে পড়া টইটম্বুর অংশটা যার কেটে নিয়ে গেছে মৌয়ালেরা? এমনও হতে পারে, মধু জমিয়ে রাখার সময় শেষ হয়ে যাওয়ায় মৌমাছিরাই খেয়ে তা সাবাড় করে ফেলেছে এমন কোনো খালি মৌচাক আমি। অপেক্ষায় আছি, খসে কখন পড়ে যাব নীচে।
না, আমি তো মানুষ। পাখির দেখাদেখি যে-মানুষ উড়তে চায়, ঘোড়ার দৌড় দেখে চায় দৌড়াতে, আবার সাজানো গাছের দাঁড়ানো দেখে দাঁড়িয়ে থাকাকেই মনে করে কর্তব্য, ঠিক তেমন। উড়বার প্রস্তুতি হিসেবে ওজন কমাই, পিছুটানের শিকড় ফেলি ছিঁড়ে, ছেঁটে দিই আত্মীয়তার বাঁধন, জেটিসনের নিয়ম মেনে কেটে দিই স্মৃতিবাহী ভারসব। তারপর, যখন উড়তে যাব, দেখি, একার ওড়ার জন্য আকাশ একটু বেশিই বড়, একটু বেশিই সমস্যাসঙ্কুল। পেছন ফিরে তখনই খোঁজ করি তাদের, যারা সঙ্গী হতে পারত, যারা তখনও ধরতে পারত হাত। কিন্তু হায়, সুতো কাটা পড়তেই তারা ছুটে গেছে ঘোড়ার গতিতে, যে-গতিতে ছুটতে চেয়ে নিজে আমি দাঁড়িয়ে গেছি, নকশা আঁকা নিখুঁত গাছের ভাস্কর্য এক!
পাথরপ্রাণ কাতর দেহে নানারঙের ভয়ের ধুলো ভীতির কালি আমার। চোখের কোণে কোমল করুণ কান্নাকেলী, ঠোঁটের পাতায় মুচকি হাসির টান। শরীরজুড়ে ঝুল জমেছে সমূহ মিথ্যা ও মিথের। পরতে পরতে তার অস্তিত্ব হারানোর শঙ্কা ও সংকট: এভাবে তাকিয়ে আছি কেন, লোকে যদি বাম বলে? যদি ভাবে ডান? অথবা, চোখের কোণে কান্না মেখে কোন সাহসে হেসে আছি? চোখের উচ্চতায় উঠতে না পেরে ছোটরা যদি হাসিটাকেই সত্য ধরে নেয়! কিংবা ঠোঁট বরাবর চোখ না নামিয়ে অশ্রুটুকুর আর্দ্রতাকেই পরশ্রীকাতরতা ভেবে বসে বড়রা? গান বা স্লোগান- জোরে গাওয়ার মুরোদ নেই, মাঝেমাঝে গুনগুনাতে চাই যদি, দেখি উড়তি হাওয়ায় ভেসে আসে নতুন সতর্কতা: এ-সুরে গাইছো কেন, লোকে যদি ভাবে তুমি শত্রু তাদের? যদি তারা ভাবে তুমি নাবিশ্বাসী? ভাবতে ভাবতে নাভিশ্বাস উঠে যায়। শ্বাস নিতেও ভয় পাই তখন, নিলেই যদি মানুষ জেনে ফেলে, মড়ার ভেতর চোখ বুজে আছি জীবিত মানুষ!
কেন এত অস্থির উতলা আমি? ঘনায়মান আঁধার দেখে কেন আমার ঘুম আসে না? কেন আমি চোখ খুললেই অন্ধ মানুষ দেখি, অন্ধতা ছড়িয়ে যারা ভাবে চোখ থেকে চোখে তারা ছড়িয়ে দিচ্ছে আলো!
মিথ্যেকারের সে আলো কি অন্ধকারের চেয়েও বেশি অন্ধকার না? নইলে যেদিকে তাকাই, ঝা চকচকে আলো আলো অন্ধকার দেখি কেন? মিথ্যা আর ঘৃণার, অবিচার আর নাবিচারের, অন্ধকার। তার ভেতরে যত দাঁড়িয়ে আছে বাতিঘরের মুখোশ, বুকের ভেতর অধিকাংশেরই তাদের জেগে আছে নিশুতি রাত। বোকা পোকা কীট আমরা, চাতকচোখে আলোর খোঁজ করতে করতে সেই গাঢ় কালিতে ভরে নিচ্ছি চোখমুখ। আর এক থেকে দুই, দুই থেকে চার- আমাদের দৃষ্টিজুড়ে জমে-থাকা সে-কালি ছড়িয়ে পড়ছে মানুষ থেকে মানুষে।
অনিঃশেষ এই অন্ধকারই কি তবে ভবিতব্য?
ভাবতেই আশাহীন দিশাহীন ভাষাহীন বুকে তখন আদিভাষায় টুংটাং করে ইতিহাস: বেদনা যখন প্রকট, উপশম তো তখনই নিকট! শুনেই আবার ফিরে আসে পানসিটা সেই।
বাঁধা আছি সৈকতে, খটখটে ঝরঝরে বালুচরে। তবে বসে নেই, সাধ্যমতো চেষ্টা করছি এগিয়ে যেতে। দৃষ্টি রাখা দূরে, যেখানে মিহিদানা ঢেউ, কুচিপানা স্রোত। জোয়ারে ফুলে উঠবে সে-জল, এগিয়ে আসবে, ভাসিয়ে আমাকে নিয়ে যাবে নতুন দিগন্তে, যেখানে সূর্যোদয়।
এই এখনকার মতোই, দিনগাছের হেলে পড়া ডগায় তখনও যখন হাস্যোজ্জ্বল ঝুলে থাকবে রাঙা একটা হলুদ বরণ কুসুম, উৎকণ্ঠায় কণ্ঠা বাজিয়ে ঘনানো-আঁধারের পরিণতি ভাবতে হবে না আর। শিয়রে সে-আঁধারের আগমনীতে শিউরেও উঠতে হবে না। কারণ, মানুষ তখন সত্যিই হয়তো মানুষ; সহানুভূতি আছে তার, সহনশীল সে, আর বিবেচক; নিজের কল্পনায় বুনে নেওয়া সুতোয় নিজেই বাঁধাপড়া পুতুলনাচের পুতুল না কোনো। আঁধারের সুযোগ কিংবা দুর্যোগে চেহারা তার বদলে যায় না আর; গজিয়ে ওঠে না নতুন লোভের দাঁত কিংবা নখ।