আচ্ছা, তাই সই

কৌশিক দত্ত



ফুরসৎ পেলে আমি পদাতিক পেরোই পথটুকু… লেকের ধার বরাবর দেশপ্রিয় পার্ক, প্রতাপাদিত্য রোড হয়ে একাগ্র গিয়ে বসি কেওড়াতলা মহাশ্মশানে। প্রিয় রাঁদেভু নিজের সঙ্গে একার। ইলেক্ট্রিক চুল্লির কারখানার পাশে যেখানে খোলা উঠোনে কাঠের চিতায় দাহ করার ব্যবস্থা, সেদিকটায়। সেখানে গিয়ে দু'দণ্ড বসলে মন স্থির হয়। এখন পরিবেশের জীবন বাঁচাতে সেই চিতার স্থানাঙ্ক ঘিরে খাঁচা বানিয়ে দিয়েছে ধুমঘ্ন চিমনি সমেত, যেন মানুষ রান্নার ঘর। তবু অসুবিধে হয় না। ওদিকে তাকাই না আজকাল। আগে যখন মানুষের আজীবন ধোঁয়া নিজের বিষটুকু বাতাসকে দিয়ে মহাশূন্যে মিশে যেত অন্তিমে, সেই সময়ের দৃশ্যটা মনে করি চোখ বুজে। নিজেকে শোয়াই চিতায়। কাঠকুটো জ্বালি। নিজেকে পুড়তে দেখি। মন শান্ত হয়ে আসে। ধ্যান করার কথা ভাবি, কিন্তু সেসব শেখা হয়নি। আসলে স্বপ্ন পোড়াতে যাই… আর বিশ্বাস।

ছোটবড় সাফল্য এসে যখন বিব্রত করে, স্বপ্ন, ইচ্ছা ইত্যাদি উপদ্রব করে আর বাঁচার লোভ বেড়ে যায়, তখনই ওদিকে ছুটি। ঘণ্টা দুয়েক ধরে নিজেকে পুড়িয়ে আসি। দেহটা উঠে বসতে চাইলে বাঁশ দিয়ে পিটিয়ে শুইয়ে দিই আগুন তোষকে। অর্জুনকে খবর দিই। সে ধনুর্বাণ হাতে জীবনকে ঘিরে ফেলে খাণ্ডব বনের মতো, একটা ইচ্ছেও যেন পালাতে না পারে। অথবা কোনো ভরসা, প্রত্যাশা বা বিশ্বাস। স্বপ্নে লোভ, লোভে পাপ, পাপে আমৃত্যু কারাবাস। আশা আনে অনিশ্চয়তা, অনিশ্চয়তা আনে চেষ্টা, চেষ্টা আনে ক্লান্তি। বিশ্বাস ডেকে আনে মাজা-ভাঙা বিশ্বাসের অকালমৃত্যু। এসব ভাঙন নিয়ে বাঁচা যায় না, তা সেই বাঁচার প্রক্রিয়ায় সুখের ঝালমশলা যতই গুরুপাক হোক না কেন? বাঁচার চেষ্টা বিসর্জন দেওয়াই বেঁচে থেকে জীবনসময়টুকু পার করার সেরা উপায়। বিশ্বাসভঙ্গ এড়ানোর সেরা অথবা একমাত্র উয়ায় মাঝেমাঝে বিশ্বাসের মুখাগ্নি করা।

আমার এই গোপন অভিসারের কথা আমার পরিবার, পরিজন, প্রিয়সখী, বন্ধুবান্ধব, মালিকপক্ষ বা পরিষেবা-ক্রেতা, পণ্ডিত, সমালোচক, বিদগ্ধ ফেসবুকার… কেউ জানে না। তাই তারা ভাবে আমাকে ভয় দেখানো সম্ভব, আঘাতে চূর্ণ করা সম্ভব। বিশ্বাসঘাতকতার ব্রহ্মাস্ত্রে বুঝি আমার স্থিতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে পারবে তারা সহজেই, ভালোবাসার ট্রোজান ঘোড়ার পেটে একবার যদি দেওয়াল পেরিয়ে আসতে পারে এদিকে। জীবনের শ্বাসরোধ করলেই বুঝি পালস অক্সিমিটারে আমার রক্তের অক্সিজেনের মাত্রা কমে আসবে এমন যে আমার সত্তাটিকে তখন ভেণ্টিলেটরে তুলে দয়ালু তর্জনী তুলে অনায়াস শাসাতে পারবে তারা। অপেক্ষায় থাকে তারা। সুযোগ খোঁজে। একসময় অস্থির হয়ে সুযোগের মুহূর্তে পৌঁছনোর আগেই আক্রমণ করে বসে। ফালাফালা করে দেয় আমার সর্বাঙ্গ। রক্তপাত খোঁজে, রক্তপান খোঁজে… বা পানীয় রক্তের তেষ্টায় গ্লাস বাড়ায়। রক্ত, স্বেদ বা অশ্রু কিছুই জমে ওঠে না পানপাত্রে। বারবার চুমুক দিয়ে বাতাস খায় আর তেষ্টা বেড়ে যায় তাদের। নিদারুণ তেষ্টায় ক্রমশ ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে পরিচিত, বিশ্বস্ত, প্রিয়তম মানুষেরা। বারবার কেটে ফেলার পরেও একটা জ্যান্ত মানুষের গরম রক্ত, সুসিদ্ধ পাঁজরার হাড় আর মাংসের আস্বাদ থেকে বঞ্চিত হতে থাকলে এরকম ক্রোধের জন্ম জায়েজ। প্রিয়জনেদের দোষ দেওয়া যায় না। যে আমাকে তারা রোজ দেখে হাসিখুশি, তার জামাকাপড়ের মোড়কে ছাইয়ের অস্তিত্ব তারা দেখতে পায় না।

অতএব কমরেড, তুমি মিছিলে হাঁটতে হাঁটতে নিশ্চিন্তে আমার পিঠে গেঁথে দিতে পারো নিগূঢ় ভোজালি… নরহত্যার পাপ হবে না। হে মহান নেতা, আপনার অনুপ্রেরণায় ঘরদোর প্রতিষ্ঠা ছেড়ে এতদূর এসেছি বালি ভেঙে… এখন আপনি জাঠা, মোর্চা ও সনদ সমেত সমগ্র ভাবনা আর নীতিটিকে বঙ্গোপসাগরে ডুবিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে পোশাক বদলে সিংহাসনে বসতে পারেন, বিশ্বাস পুড়িয়ে এসেছি সদ্য সন্ধ্যায়। সবটুকু হৃদপিণ্ড ভ্যানিটি ব্যাগে ভরে নিয়ে স্ব-পথে এগিয়ে যাবার আগে আমার ঠোঁটের ফাঁকে অধরের বদলে সায়ানাইডের অ্যাম্পুল রেখে যেতে পারো তুমিও। আমি চোখ বুজে আছি, তেমনি অন্ধভাবে বিষ চুষে নেবো। সৎকার তো হয়েই গেছে, জৈবিক মৃত্যুটুকু বাকি।

এখন মাঝরাত। বন্ধু আমার, জোনাকির ছদ্মবেশে আরও কিছু অন্ধকার দাও। চিতা বহ্নিমান। সেই লাল আলোটুকু জ্বেলে শ্বাদন্ত দেখি সকলের।