কল্পনা সত্যের সন্তান

হামিম কামাল



বাবা আর ছেলের সম্পর্কের বাইরে, দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে ধীরে ধীরে আমি হয়ে উঠে ছিলাম তাঁর বিপরীত মেরুর মানুষ, এবং নিজ ভাবনাচিন্তা গড়ে ওঠার পর গত পনেরটা বছর আমরা ধর্ম, রাজনীতি সমাজনীতি সাহিত্য সংস্কৃতি এসমস্ত নিয়ে পরস্পরের সঙ্গে কটু তর্ক করে গেছি।
কথা-পাল্টাকথা দিয়ে মতবিরোধের শুরুটা হতো, এরপর প্রতিরোধ-পাল্টা প্রতিরোধ দিয়ে ক্রমশ তুরীয় হয়ে উঠতে উঠতে একটা পর্যায়ে তর্কটা ব্যক্তিগত আক্রমণ আর ভাঙচুরে দুর্বোধ্য, একটা বর্ণনাতীত স্তরে চলে যেত। দুজনই কঠোর মানুষে বদলে যেতাম। অথচ বাইরের মানুষেরা আমাদের দুজনকেই কোমল মানুষ হিসেবে জানত।
কেন এমন হতো?
পরে মনে হয়েছে, দুজনেরই পরস্পরের ওপর ছিল আশা ভরসা ছিল অনেক, বুদ্ধিমত্তার ওপর আস্থা ছিল অগাধ, ফলে সমস্ত স্বপ্নকল্পনা গিয়ে ঠেকেছিল অসীমে। যে কারণে অপ্রাপ্তিটার ভারসাম্যটা গড়তে অকল্পনীয় মূল্য গুনতে হতো।
দুজনই একসঙ্গে একই পূর্বপুরুষের মালিকানা দাবি করতাম গোপনে, এবং এই এক কারণে একটাসময় আমাদের লড়াই থামত। এরপর অনেকগুলো দিনের জন্যে দুজন বিধ্বস্ত, বিকর্ষিত স্বেচ্ছানির্বাসিত, হত, মৃত, সমাধিস্থ হয়ে পড়ে থাকতাম। দুটো আলাদা ঘরে দুজন আছি, কেউ কারো অস্তিত্ব এক মুহূর্তের জন্যে ভুলতে পারতাম না।
একজন কারো মৃত্যু ছাড়া বোধয় এই দুঃসহ বন্ধুতা ছিন্ন হওয়ার কোনো পথ ছিল না। এবং বাবাই আগে তা বেছে নিলেন।
তখনই একমাত্র সমস্ত ভুলে আমি কেবল বাঁশের কঞ্চি দিয়ে তীর ধনুক বানিয়ে দেওয়া আমার বাবার, দাবার ছকে ইচ্ছে করে ভুল চাল চেলে হেরে যাওয়া আমার বাবার স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকতে শিখলাম। বিশেষ কিছু অনুভূতি, আছে মৃত্যুর অনতিক্রম্য বাধার সামনে না দাঁড়ালে যা অনুভব অসম্ভব।
বাবার পুরনো দিনলিপির পাতায় পাতায় যা লেখা, তা যেন আমার মনের আয়না। আজ আমার আয়নার দিকে তাকালে যাদের আমার জীবনের ভাবনার চরিত্র হিসেবে দেখি, সেখানে তাদেরকে পাই। আজ আমি দেশ, সমাজ, রাজনীতি, মানুষে মানুষে সম্পর্ককে যে চোখে দেখি, বাবার সেই দিনলিপিটিতেও পাই সেই একই আলোছায়া। আমার ভেতর একটা বোধ তখন কাজ করে, মোহগ্রস্ত হয়ে যা ভুলে ছিলাম।
প্রতিটি মানুষ জীবনে অসংখ্য ধাপ অতিক্রম করে। হয়ত আজ আমি যা ভাবছি, তার পুরো বিপরীত মেরুতে চলে যেতে পারি কুড়ি বছর পর। কিছুই স্থির নয়। আমার বাবা স্থির থাকেননি। তবে যেখান থেকে তিনি সরেছেন সেখানটা আমার অজানা ছিল। তারপরও যখন আমি সেদিকেই ধাবিত হয়েছি, এরও নিশ্চিত একটা প্রাকৃতিক মানে আছে। হয়ত আমার যারা সন্তান, তারা আমি যেদিকে ধাবিত হলাম না- সেদিকে এগিয়ে ভবিষ্যতে আজকের ভারসাম্যবিধান করবে।
সেইসব দিনে বাবা ছিলেন স্বাধীন স্বদেশের পক্ষে, যে দেশ বাস্তবিকই সবার। বিশ্বাস করতেন, ধর্মবোধ মানুষের চিরায়ত। ধর্মাচরণ সূক্ষ্ম। তা এমন স্থূল নয় তাকে অপরিবর্তনীয় হতে হবে। তা করে রাখতে চাওয়া অপরাধ। তাকে প্রত্যেকের ওপর চাপিয়ে দিতে চাওয়া অপরাধ। তাকে রাজনীতির অস্ত্র করে তোলা অনুচিত; একসময় যা হয়েছে, তা হয়েছে, সে যুগ চলে গেছে। যুগ পরিবর্তনশীল। এবং পরিবর্তনই প্রকৃতি। শামসুর রাহমানের কবিতার বই কে যেন উপহার দিয়েছিল তাকে, কী খুশি হয়ে গিয়েছিলেন। হঠাৎ কী এক উত্তেজনায় আমাকে ল্যাটিন শেখাতে উদগ্রীব হয়ে উঠেছিলেন।
হঠাৎ সব কিছু বদলে যেতে শুরু করল। নব্বইয়ের মাঝামাঝিতে তার বন্ধুর বলয় হঠাৎ বদলে গেল। নতুন বলয়টি তাঁর ব্যক্তিগত ধর্মভূমির স্বপ্নে বিভোর। সাহিত্য হয়ে উঠল তার কাছে মিথ্যে সান্ত্বনা-কথা। অপ্রয়োজনীয়। এমন বিবর্তনও মানুষের ঘটে? অতঃপর তিনি গোঁড়া মুসলমানিত্বের এক ঘোরলাগা গোলকধাঁধাঁয় আটক হলেন। সেখানে কেবলই আবর্তন, গন্তব্যহীন। তার সন্তান হিসেবে আমাকেও সে একই গোলকধাঁধাঁয় মধ্যকৈশোর পর্যন্ত দেয়াল হাতড়ে অন্ধের মতো ঘুরতে হয়েছে।
মানুষ আসলে একটা বহুগামী আলোচনা। একগামিতা তার নয়। যেমন আমার বাবা ধর্মভূমির স্বপ্ন দেখতেন, নিজ সম্প্রদায়কে পৃথিবীতে বড় আর্ত, অসহায়, আর বাকি সমস্তকে তার দিকে ছুরি উঁচিয়ে রাখা বলে ভাবতেন; কিন্তু আমি, আমার বোনেরা, তাঁরই ছায়ার নিচে বিরুদ্ধ হয়ে বাড়তে পেরেছি। সেটুকু বাড়তে দিতেও তাঁর আটকায়নি। নিজের বলয়ের মানুষদের কাছ থেকে তিনি সেজন্যে লাঞ্ছনা সয়েছেন, যে লাঞ্ছনার জের আমাদের ওপর কমই পড়তে দিয়েছেন।
বাবার সঙ্গে আমার চোখ, হাসি, কথা, ভক্তি- সবকিছুতে ভীষণ মিল, তাই বোধয় সমমেরু পরস্পরকে বিকর্ষণ করল।
যে গোলকধাঁধাঁর কথা বলছিলাম, সবসময়ই ক্ষীণ একটা সন্দেহ ছিল আমার পূর্বপুরুষেরাই সেই অদ্ভুত মানসিক গোলকধাঁধাঁর ডিডেলাস। ওই ধাঁধাঁয় যাতে প্রবেশের পর এখনো খুব কম মানুষ বেরোতে পেরেছে। আমার চোখে আমার বাবা পারেননি, হয়ত আমিও পারিনি; এবং দুজন আলাদা পথের আলাদা মানুষ। বোঝাপড়ায়, গন্তব্যে গোলকধাঁধাঁর ব্যাপ্তি তো আর কম নয়। দুই প্রান্তের দুই জনকে ওটা তার পরিধির ভেতর কখনো দেখা না করিয়েও ঘুরিয়ে মারতে পারে।
তবে ধাঁধাঁর ভেতর যার যার পথে চলতে চলতেই কিন্তু আমাদের বেশ ক’বার দেখা হয়েছিল। মানে নানান বিষয়ে আমাদের ভাবধারা খুব কাছ ঘেঁশে গেছে। কিন্তু আমরা দুজনেই হয়ত পরস্পরের দিকে অসন্তোষ নিয়ে চেয়ে ছিলাম।
গোলকধাঁধাঁর ব্যাপারে যারা জানে তারা জানে সেখানে কেবল পথের ঘোরপ্যাঁচটাই সব নয়। সেখানে বাতাসে নেশাল সুগদ্ধ। সেই ঘ্রাণ বুকে না টেনেও উপায় থাকে না, আবার টানলেই যে নেশা হয় তাতে দৃষ্টিভ্রম ঘটে, ঠেকানো যায় না।
অতঃপর হয় ক্লান্তিতে একসময় গুহার দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে মৃত্যুকে নিতে হয়, অথবা আধা মানুষ আর আধা ষাঁড় মিনটরের সঙ্গে দেখা হয়। তারপর সেই ভয়ানক মল্লযুদ্ধ। তাতে যে কোনো একজনের মৃত্যু অনিবার্য।
হয়ত আমার বাবার চোখে আমিই ছিলাম মিনেটর। এবং আমার চোখে তিনি। ডিডেলাসের গোলকধাঁধাঁর এটাই হয়ত করুণতম দিক।

আর্থিক নয়, পূর্বপুরুষের অথৈ আত্মিক-সম্পদের কথা ছোটবেলা থেকে শুনছি। গ্রামে গেলে আশপাশের কয়েক গাঁয়ে তার চৌম্বক প্রভাব দেখে মনে হতো পুঞ্জীভূত সেই বিপুল সম্পদের খোঁজ বুঝি পেয়েছি। মানুষ আমার পূর্বপুরুষদের নামে শ্রদ্ধায় অবনত হয়ে যান, প্রায় আড়াইশ বছরেও তাঁদের প্রভাব, আবহ টিকিয়ে রাখতে চান। এখনো গল্পে গল্পে তাদের কথাই উচ্চারিত হয়। বড়দের আলাপ থেকে তাদের স্মৃতি মেজোদের কথায় চলে এসেছে, এবং মেজোদের মুখ থেকে ছোটরা বিস্ময় নিয়ে শুনছে।
আমার পূর্বপুরুষদের আধ্যাত্মিকতার গল্পগুলো আমি চায়ের দোকানে বসে শুনতাম। কিন্তু আমি যেন ওগুলো শুনতে চাইতাম না। আমার মন আরো গভীর কিছু খুঁজত। জানালাহীন ভাঁড়ার ঘর, অসংখ্য দরজা, কিন্তু প্রত্যেকটির কড়ায় বিরাট সব তালা ঝুলছে, আর চাবির খোঁজ নেই। গ্রামবাসী যেন সেই বদ্ধ ঘরটিকে ঘুরে ঘুরে দেখছে। যা বলছে, কেবল সেটুকুর ওপর।
সেই তালাগুলো চাবির ছড়াটা কোথায়?
আমি অনেকের সাথে কথা বলেছি, বহু মানুষের কাছে খোঁজ করেছি। তাদের কেউ আমার বাবার বন্ধু, কেউ গাঁয়ের জ্যেষ্ঠ, কেউ কাছের কিংবা জ্ঞাত আত্মীয়, কেউ তাঁদের উত্তরসুরী হিসেবে অধিষ্ঠিত, সম্মানিত। কারো কাছে ছিল না।
কিন্তু কদিন আগে হঠাৎ, অপ্রত্যাশিতভাবে যেন চাবির ছড়া আমার টেবিলের ওপর কেউ রেখে গেল। দৈব ব্যাপার। আমি মরচে পড়া তালাগুলো খুলে একের পর এক ঘরে প্রবেশ করতে থাকলাম। আর দেখতে পেলাম, কী আশ্চর্য, দেখি আমাকে ঘিরে বাবার অসংখ্য নিরুত্তর প্রশ্নের উত্তর এখানে হাসছে! আমার বাবাকে ঘিরে আমার অসংখ্য নিরুত্তর প্রশ্নের উত্তর এখানে উচ্চারিত হচ্ছে!
ঈশ্বরভক্তির কোমল সমভূমি পার করিয়ে নিরীশ্বরবাদের কঠিন পর্বতে চড়িয়ে, অবশেষে আমার মন যে আমাকে মহানিয়ম নামে এক সমুদ্রের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে, যেখান থেকে এমনকি ঈশ্বরেরও জন্ম।
দেখলাম, মনের সেই গমন পথ আমার পূর্বপুরুষদেরই কেটে রাখা। কী বৈচিত্র্য তাদের ধ্যান, কী বিস্ময়কর তার পরিধি! একশ বছর অপেক্ষার পর সুফিবাদের দুটি প্রশস্ত ধারা সেখানে মিলেছে। এরপর প্রায় সোয়া শ বছরের এগিয়ে চলা। কিন্তু, তাদের অবিকৃত রাখতে বিরাট পাচিল তুলে দেওয়া—
এই তো আমার বাবার আটকে পড়ার রহস্য!
পাচিলের ইটগুলো আচারনিষ্ঠায় তৈরি। সাধনার আগুনে পোড়ানো প্রস্তরকঠিন আচারনিষ্ঠার ইট। আরাধনার নমনীয়তা সেখানে অনুপস্থিত। তাকে বাঁকানো যায় না। খাঁজে খাঁজে পেলাম কিছু পরজীবী গাছ, তার পাতার কাছে নাকটা যেতেই, কী অদ্ভুত, সেই নেশা নেশা ঘ্রাণ!
স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। মহাসাগরে কোনো দ্বীপ খুঁজতে নেমে, গভীর রাতে ঝড়ে পথ হারিয়ে, ভোরে সেই দ্বীপেই নিজেকে আবিষ্কার করলে বোধয় অমন স্তব্ধতা কাজ করে।