বিশ্বাসে মিলায় রক্ত

অর্ক চট্টোপাধ্যায়



লোকটা ছোটবেলা থেকে সন্দীপন পড়েছিল। তাই জানতো পেচ্ছাপের সঙ্গে রক্তের সম্ভাবনা কখনো উড়িয়ে দেওয়া যায়না। ওর নাম বিজন নয়। তাও সকালে উঠে পেচ্ছাপের রং খেয়াল করে দেখতো। সাদা থেকে হলুদ, হলুদ থেকে সাদা। সকাল থেকে বিকেল। সাদা-হলুদ। বিকেল থেকে সন্ধ্যা। হলুদ-সাদা। সন্ধ্যা থেকে রাত। কিন্তু লাল নয়তো? এমন করেই দিন কাটছিলো। তারপর একদিন হঠাৎ লাল উঁকি দিলো। লোকটা কি বিশ্বাস করতো শরীর তার একদিন রক্ত উগরে দেবে? কিন্তু কেন এই বিশ্বাস? বলা মুশকিল। শরীরের ভিতরে রক্ত থাকে মানেই বাইরে বেরিয়ে আসতে হবে এমন নয়!

যাক যা বলছিলাম, একদিন হঠাৎ লাল রং উঁকি দিলো। তবে গর্তের হিসেবে কিছু গোলমাল ছিল। বিশ্বাসে কিন্তু গোলমাল হয়নি। পেচ্ছাপ ঠিকই রইলো। লিঙ্গের নয়, মুখের গর্ত দিয়ে রক্ত দেখা দিল। না না, রক্তবমি নয়! ওর নাম তো আর বিজন নয়! এতটা নাটকীয় কোন ঘটনা ঘটেনি। লোকটার মাড়ি থেকে রক্ত বেরোচ্ছিল। ব্রাশ করে মুখের পেস্ট সাদা বেসিনে উগরে দিলে বেসিন লাল হয়ে যাচ্ছিল। একদিন নয়, বারবার, প্রতিদিন। প্রায় একমাস এমন চলল।একটা দাঁতের কোনায় লাল রং উঁকি মারছে। ব্রাশ লাগলে ওখান থেকে রোজ রক্তপাত। জেনারাল গাম ব্লিডিং নয়। দাঁতের ফাঁকে কোনভাবে চোট লেগেছে। ওখান থেকেই লাল রঙের প্রাত্যহিক উৎপত্তি।

প্রতিদিন মুখ থেকে পেস্টের সাদা ফেনার মধ্যে লাল রঙের আল্পনা দেখে লোকটা মনমরা হয়ে উঠছিল। সকাল সকাল একটা ব্যস্তসমস্ত দিনের শুরুতেই অবসাদমুখর লাল রং। তারপর কি আর কাজে মন বসে? আসলে রক্তবমি ব্যাপারটা লোকটার চেনা। লিভার সিরোসিসে মারা যাবার আগে মায়ের প্রায়শই রক্তবমি হত। সে রক্ত বেসিনে-বাথরুমে দাঁড়িয়ে বসে পরিষ্কার করেছে লোকটা। লালে উপচে পড়া বেসিনের গভীরে হাত ঢুকিয়ে তুলে এনেছে রক্তের তাল যাতে বেসিনের গর্ত দিয়ে বেরিয়ে যায় বেসামাল তরল রক্ত। ঐ লাল বেসিনটার কথা মনে করতে না চাইলেও মনে পড়ে যায় লোকটার। রোজ সকালে লোকটার মাড়ি তাকে ঐ অযাচিত স্মৃতির দিকে ঠেলে দেয়।

সারারাত দাঁতে দাঁতে ঠোক্কর লাগত। দাঁতকপাটি লেগে যাওয়া যাকে বলে আরকি। রক্তের স্বাদ পাচ্ছে কি মুখের ভেতর? সকালে উঠে লোকটা মুখে রক্তের গন্ধ খুঁজে বেড়াত। মনে হত সারারাত দাঁতেরা ঠোকাঠুকি করে আগুনসম রক্ত তৈয়ারি করেছে। এবার উগরে দেবে। মায়ের রক্ত মানে তো তার নিজের রক্ত, নিজের শরীর।বেসিন আনব্লক করার জন্য যখন মায়ের রক্তের ভিতর হাত ঢোকাত, মনে হত নিজের মুখ দিয়ে গলা বেয়ে শরীরের ভিতর হাত ঢোকাচ্ছে। হাতের স্পর্শে রক্ত দেখতে পেত শরীরের ভেতর সর্বত্র। তখন থেকেই ওর মনে এই বিশ্বাস বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিল যে একদিন ওর নিজের শরীরও রক্ত উথলে দেবে। লোকটা ছোটবেলা থেকেই সন্দীপন পড়তো। মাতৃমুখের রক্তপাত গল্পের দৃশ্যকে জীবনের আখড়ায় নিয়ে এসেছিল।

এখন দাঁতের ফাঁকে উঁকি মারছে রক্তিম মাতৃশরীর। লোকটার মনে হল মা ফিরে আসছে। এভাবেই তো ফেরার কথা। শরীরপথে ফেরা। অনেক বছর হল মা নেই। প্রথম বছরগুলোর ঐ সজাগ স্মৃতি রোমন্থনও আর নেই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবই কেমন বয়ে গেছে। লোকটা কি আর মাকে মিস করেনা? কোন একটা বইয়ে পড়েছিল: "You may stop mourning but your words continue to mourn". পড়েছিল নাকি নিজেই নিজেকে বলেছিল কোন একদিন, নিরালা নিভৃত উচ্চারণে? ঐ যে শব্দের সন্তাপ, ওটাও তো একটা বিশ্বাস। নিজেরই হোক বা অন্যের। অন্যের থেকে নিজের মধ্যে ঢালাই করে নেওয়া বিশ্বাস।

কদিন হল রক্তপাত কমছে। আসলে ওই একটা দাঁতের কোনা বাঁচিয়ে ব্রাশ করার কৌশল রপ্ত করেছে লোকটা। যে অংশটা মাজতে পারছে না, মাউথ ওয়াশ করে চালাচ্ছে। যতদিন না ঘা শুকোচ্ছে। লোকটার বিশ্বাস এভাবেই ওর মা এসে ওকে বলে গেল, "কি রে ব্যাটা, আমায় দেখি আর মনেই পড়ে না তোর? দাঁড়া, দেখাচ্ছি মজা!"

এই বিশ্বাসের উদয় কোথায়, আর কোথায়ই বা নাশ, কেউ জানে না। এই যে ধরুন না, মানুষ বিশ্বাস করে ভোট দেয় আর যে দলই আসুক না কেন, এসে একে একে বিশ্বাসভঙ্গ করে। মানুষ তাও আবার সেই দলকেই পরের বার ভোট দেয়, অথবা প্রতিপক্ষকে। ডান, বাঁ, অতি ডান, অতি বাঁ। সাদা-হলুদ, হলুদ-সাদা। সাদা-সাদা। হলুদ-হলুদ। লাল নয়তো?

লোকটা সকাল সকাল টিভি চালিয়ে ব্রাশ করতে গেছে বাথরুমে। পশ্চিমবঙ্গে ভোটপুজো আসন্ন। দলবদল, এপক্ষ-ওপক্ষ, খেলা জমে গেছে। আবাপ আনন্দে কোন এক রাজনৈতিক নেতা বলছে, "আমরা মানুষকে বিশ্বাস করি। মানুষও আমাদের বিশ্বাস করে। আর সেটাই শেষ কথা।"

লোকটা ছোটবেলা থেকে সন্দীপন পড়েছে। তাই জানে, বিশ্বাসের সম্ভাবনাকে কখনোই উড়িয়ে দেওয়া যায়না। বিশ্বাসের ভোট আসন্ন। রক্তপাতের সম্ভাবনাকে কখনোই উড়িয়ে দেওয়া যায়না।