সন্দেহ, বাতিক ও অন্যান্য

তন্ময় ভট্টাচার্য



সারা জীবনের লেখা, অশান্তিপ্রতিমা,
ভেঙে-ভেঙে আজ এই সাহায্য কুড়নো
এসব কথার কথা, তুমিও তা জানো
নইলে বাহুল্য এত বিলাসী হত না

তবু যা লিখতে পারি - ইঙ্গিতের পাশে
শুয়ে থাকা বেদনার্ত বাঁশিটি বোঝেনি
কার প্রেমে এতখানি উগ্রতা এসেছে
কেনই বা গড়েপিটে হারাচ্ছি সমীহ

তবু যে করত, করে, স্বভাববশত
যে তার মৌজা থেকে দাগ মুছে দিল
অথবা আমিই জীর্ণ নথির ভণিতা
পোকা হয়ে কেটে দিচ্ছি সম্ভাবনা, স্মৃতি

গুঁড়ো গুঁড়ো ঝরে যাচ্ছে স্মরণের দিন
গুঁড়ো গুঁড়ো ঘরভর্তি রেণুর আবির
আনাচে-কানাচে জমে, বিপদের মতো,
তোমাকে হাজির করল শরীর সমীপে

সামনে দাঁড়িয়ে আছ, মেনে কিন্তু নিচ্ছি না কিছুই
হায় রে প্রসাদভিক্ষা, রেগে গিয়ে চণ্ডাল প্রহার
এসবই কল্পনামাত্র, আসলে অন্য কোনো ঘরে
সন্দেহ জমাট বেঁধে দিন গুনছে জাহাজডুবির

কে যেন ভীষণ জল, ঢেলে দিল, মুখ তুললে দুঃখ মনে পড়ে
তার চে' এমত ভালো, শ্বাস বন্ধ, হাবুডুবু চেনাচ্ছি প্লবতা
বিজ্ঞান চরম সত্য, আরও সত্য যাত্রীবাহী ডিঙির মহিমা
সমাপ্তি এগিয়ে এল, শেষ বাক্য যথারীতি ভুলেও গিয়েছি

দৃশ্য ভণ্ডুল করে বসে আছি সম্মুখে তোমার
ঈশ্বর খুঁজিনি আমি, ভাগ্যিস, ভরসা হত না

কে কাকে বিশ্বাস করে লিখে রাখছে অভিযোগমালা
শতাব্দী পরের কোনো বিশেষজ্ঞ পাঠোদ্ধার করে
তোমাকে শোনাতে যাবে কঙ্কাল, হাড়ের কাঠামো
অশান্তি তখনও যদি ভেসে আসে সমুদ্রকিনারে

বোতলে আবার তোকে ধরেবেঁধে ঢোকাব, প্রেতিনী
এসব কীর্তির কোনো অপরাধ লেখেনি পুরাণে

এভাবেই, বারবার, ইতর প্রলাপ
আমাকে আছন্ন করে, সন্দেহের দেশে
সুকুমারবৃত্তি কোনো ভালো থাকা নয়
বরং কুপিয়ে মারো, রক্তের শিখরে
নিজেকে উৎসর্গ করি, ওহ্‌ মা জননী
এবার ডাকাতি হবে, চিঠি দিয়ে জানাচ্ছি আগাম

প্রত্যেক মুহূর্তে তাকে ছিঁড়েখুঁড়ে দেখে
প্রত্যেক মুহূর্তে প্রিয় চারাটি বসিয়ে
বোঝাব নিছক বৃক্ষ, রোপণের দোষে
আজিকার মতো যাত্রা সমাপ্ত হইল

যে-কোনো উৎসবেই তবু ধন্দে পড়েছি কাতর
কীভাবে এড়াচ্ছে নেশা, যুগধর্ম, অন্ধকার ভাষা
আদৌ নিরস্ত, নাকি অন্য কারো বচসা ছিনিয়ে
অভিযুক্ত করে গেল, আমি একা, ভব্যতার স্বরে
বুঝিয়ে চলেছি এরা পঞ্জিকার নিয়মে তুরীয়
বরং সমর্থ হোয়ো, আমিও তো মাখাতে পারিনি

না-হওয়া ঘটনা অবসাদ নিয়ে এল
খতিয়ান ঘেঁটে ঠিকানা জানাতে পারে
কে আছ এমন, কবিতার ভাঁজে-ভাঁজে
শুধু ছেড়ে যাওয়া, হাহাকার, ফিরে এসো

পাখির স্বভাবে এসবই গোধূলিবেলা
স্নান-টান সেরে, পরিপাটি হয়ে ওঠা
কিছুই ছিল না হয়নি কখনও কিছু
ডানায় কী স্বাদু শরাফত লেগে আছে

তবে কি সকলই গরল, মথনে ওঠেনি অমৃত কারো
অথবা লুকিয়ে রেখেছি যাতনা দংশেছে আশীবিষে
পুরাতনী থেকে একুশ শতকে কী এমন বদলাল
সন্দেহ, শুধু সন্দেহ ঘোরে আমাদের ফিসফিসে

সেসবও জমিয়ে রাখি ভাঁড়ের ভিতর
লক্ষ্মী এসে ছুঁয়ে দেন, শঙ্কা বেড়ে যায়
কখনও চৌচির হবে সন্দেহসকল
যদি না সামলাতে পারি, দুঃখ দিয়ে ফেলি -

আবার সাবধানতা, আবারও পেলব
নিজেকে উদার করে সামাজিক মুখ
প্রতিটি বাক্যের শেষে জিজ্ঞাসার সুর
তোমাকে বিব্রত করে, আমাকে চতুর

তাহলে কি এভাবেই দ্বন্দ্বরূপ আসে-যায়? পাক ধরে দুঃখের শিরায়?
তোমার অনিষ্ট জানি, আরও জানি সত্যিকার শাপ দিলে বরেণ্য হতাম
শুধুই আশ্চর্য ছুরি, আশ্চর্য ধারালো তেষ্টা আমাকে যুবক করে খুব
মহানন্দা নদীটির জলে যে উপুড় হব, যদিবা স্খলন জেনে যাও
সে-এক বিপত্তি বটে, সামাল দেওয়ার শক্তি আমাদের ইন্দ্রজালে নেই
অতএব মেনে নিচ্ছি, তোমার চরিত্র ঘিরে তুলে দিচ্ছি ক্রোধের দেওয়াল

ক্ষমা হও জলাকীর্ণ দেশের মানুষ
ক্ষমা হও কুমিরের হাঁ-মুখে হরিণ
আমাদের দেখা হবে অন্য কোনো দিন
লোকালয় ঘিরে নামছে রঙের মেজাজ

তোমার সমস্ত বৃত্তি ভিক্ষা থেকে আজ
ছুটি নিয়ে চলে যাক গোপন ডেরায়
যেখানে খোদাই করা সন্দেহের গা'য়
আদিম চিত্রকলা, শিকারির জ্বীন

আপাতত ভাগ নাও সন্ন্যাস তাহার
হে কাম - হননইচ্ছা - স্বাধীন, স্বাধীন...