বিশ্বাসকাকু মরুক না মরুক বিভীষণের মৃত্যু নেই

প্রসূন মজুমদার



পোস্টট্রুথের পশ্চিমবঙ্গে সহসা নির্বাচনী জগঝম্প বেজে উঠল। মিথ্যের উত্তরে মিথ্যে গল্পগুলোকে মানুষের মাথার মধ্যে চালান করে দিতে পারার অসামান্য দক্ষতা দেখা গেল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের জবানিতে। কারা কী বিশ্বাস করল সেসব ছেনে দেখতে দেখতে বিশ্বাসকাকু এই বসন্তসন্ধ্যায় চোখের আড়ালে তলিয়ে গেলেন। নিশীথপক্ষীরা শুধু দেখতে পাচ্ছিল পশ্চিমবঙ্গ থেকে 'হাউস ফর মিস্টার বিশ্বাস ' ন্যায়পালদের হাতেই ধ্বসে ধুলোয় লুটোচ্ছে।

কিন্তু এমনটা কি হওয়ার কথা ছিল?'আজ যদি আমাকে জিগ্যেস করো' আমি বলব, এই ভবিতব্যের কাহিনী ইতিহাসেই লেখা ছিল। ফ্যাসিবাদ যখন রাজত্বে আসে গোয়েবলস তার সঙ্গী হয়। কী বলছেন? গণতান্ত্রিক কাঠামোয় ফ্যাসিবাদ আসতে পারে না! না মশাই, আপনার জন্যে একরাশ কৌতুক সাজিয়ে দেওয়া ছাড়া আমার কোনও ভিন্ন উদ্দেশ্য নেই। হিটলার মশায়ের উত্থানের ইতিবৃত্তটা ঢুঁড়ে দেখলেই এসব স্পষ্ট হয়ে যাবে।

আমি অবশ্য নন্দীগ্রামে গুলিচালনার পর হলদি নদীর জলে শতশত লাশের খবর নিয়ে কিংবা নেতাই-এর উগি - ট্র‍্যাপের ঘটনা নিয়ে একটা কথাও বলব না। আমি বলব বিশ্বাসঘাতক শব্দটার ধারণাগত সমস্যা নিয়ে।

কে বিশ্বাসঘাতক? সহজ উত্তর : যে বিশ্বাসকে হত্যা করে সে। তাহলে ভাবুন এখানে একদিকে বিশ্বাসকারী আর একদিকে বিশ্বাসভঙ্গকারী এই দুই-এর মধ্যে চলে একধরনের আন্তস্ক্রিয়া। আর ইন্টার‍্যাকশান যেখানে আছে বিজ্ঞান সেখানে থাকবেই। অতএব যে এই আন্তর্সম্পর্ককে ছুলে দেখতে চায় সে যুক্তিবুদ্ধি খাটাবেই। এখন সহজ যুক্তির ক্রম ধরে এগোলে দেখা যাবে যে, বিশ্বাস একটা অনুভূতি। সেই অনুভূতি- সাঁকোর দুইপ্রান্তে বসে আছে দুই ব্যক্তি। এদের একজন বিশ্বাস নামের অনুভূতিটা টের পাচ্ছে আর সেই সূত্রে অন্যপারের লোকটাকে স্পর্শ করছে। অন্যপার যতক্ষণ সুতোটা ধরে থাকে ততক্ষণ কোনও সমস্যা থাকে না, কিন্তু যে মুহূর্তে ওপ্রান্ত থেকে সুতো কেটে দেওয়া হয় তখনই নাকি বিশ্বাসের হত্যালীলা সম্পন্ন হয়। এই যে সুতো কেটে গেল অথবা দেওয়া হল তাতে সে-ই আঘাত পায় বেশি যে এই দুয়ের সম্পর্ক থেকে আশা করেছিল অধিক। সে আসলে টের পেয়েছিল বিশ্বাস নামের একটা ধারণা। কিন্তু সমস্যা হল ধারনা আর বাস্তবতা মিলতেও পারে আর নাও পারে। আন্তঃস্ক্রিয়া যখন দুয়ের মধ্যে তখন একজনের দিক থেকে বিবেচনা করলে বিচারে ভুল হয়ে যায়। কেবল এইপার বিশ্বাস করেছে বলে ওইপার চিরকাল সুতো ধরে থাকবে এমত দাবি আদর্শ গ্যাসের মতোই অবাস্তব। প্রশ্ন হল, এপারে বিশ্বাস নামের অনুভূতি জন্মালো কখন? ওপারের কোনও প্রতিশ্রুতি অথবা কোনও আচরণ ওই বিশ্বাসকাকুর জন্ম দিয়েছিল এপারের মনে? যদি এপারের দিক থেকে ব্যাপার যাচাই করি তবে বিশ্বাসভঙ্গ হলে কষ্ট পাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু ওপার থেকে দেখলে নানারকমের প্রশ্ন বিচারসভায় উঠবেই। প্রথম প্রশ্ন হল --- ' এপারকে বিশ্বাস করতে কেউ কি বাধ্য করেছিল? তা করতে পারে না, কারণ গানপয়েন্টে দাঁড় করিয়ে অনেক কিছুই করা যায় কিন্তু মনের ভেতর বিশ্বাসফুল গজানো যায় না। তাহলে? তাহলে এপারের লোকটা হয় বোকামি করেছে অথবা বিশ্বাসের সুতোয় অযত্নলালিত অভ্যাসে নিজেই এত জোরে টান দিয়ে বসে আছে যে অন্যপার আর সুতো ধরে রাখার প্রয়োজন বোধ করেনি। তাহলে ওপার থেকে বিচার করলে বোঝা যায় যে বিশ্বাসঘাতক বলে কাউকে দাগিয়ে দিলে তার যথার্থ বিচার করা হয় না,কারণ দুদিকের ধরে থাকা সুতোয় চিড় ধরলে দুদিকের কেউই দায় এড়াতে পারে না।

এখন প্রশ্ন হল তাহলে আমরা বিভীষণ, মিরজাফর এইসব বলে লাফাই আর অপছন্দের ব্যক্তিকে ডিফেম করি কেন? কারণ,আমরা বিচার করি না। আমরা আসলেই সুবিধাবাদ ছাড়া অন্য কিচ্ছুতে বিশ্বাস করি না। আমরা সেই খবরকেই সত্য বলে মনে করি যে খবরটা সত্যি বলে ভাবতে চাই অথবা মেনে নিলে আমাদের সুবিধা হয়। তাই বিশ্বাসকাকুকে কেউ হত্যা করেছে ভেবে কেঁদে ভাসাই কিন্তু বিশ্বাসকাকুর মৃতদেহটা মর্গে পাঠিয়ে ময়নাতদন্ত করার ঝুঁকি নিই না।

ঝুঁকি নেওয়ার প্রয়োজনই বা কী? আমরা যদি প্রকৃতপক্ষেই বিজ্ঞানসম্মত যুক্তির জগৎকে মেনে নিই, তাহলে কে কাকে কী অঙ্গীকার করেছিল আর সেই অঙ্গীকার কে ভাঙল এসব ফালতু চিন্তায় সময় নষ্ট করার অর্থই খুঁজে পাব না। বরং আমরা জানব যে, সময় নিয়ত পরিবর্তনশীল। যে বিশ্বাস করেছিল আর যে সেটা ভেঙেছে চারদিন পরে দুজনের কেউই থাকবে না, তখন কে বিশ্বাস করল আর কে ভাঙল তার হিসাব টেনে চিত্রগুপ্ত মাথাখারাপ করতে পারে কিন্তু বাস্তবের গুপ্তচিত্রে এই ঘটনার গুরুত্ব নেই। গুরুত্ব এটুকুই যে নতুন অবস্থানে দুইপারের দুই ব্যক্তি সমাজের সঙ্গে কীভাবে ইন্টের‍্যাক্ট করছে। বিশ্বাসঘাতক বলে যাকে দেগে দিলে আমার সুবিধা হয় তাকে হয়তো আমি গালমন্দ করব কিন্তু ঘটনা এটাই যে, সময় এগোতে থাকবে আর তার নতুন অবস্থানগত সম্পর্কগুলো থেকে যার যেভাবে তাকে ব্যবহার করা দরকার সেভাবেই ব্যবহার করতে থাকবে।
সুবিধাবাদের উচ্চাসনে যারা আসীন তারা আবার ব্যবহারও করবে এবং নিন্দাও করবে। ব্যবহার করার পরে কাউকে বিশ্বাসঘাতক বলে দাগানোটাই বিশ্বাসঘাতকতা কিনা সে প্রশ্ন তুলে লাভ নেই, কারণ বিচার সেই একইভাবে চক্রাকারে ঘুরতেই থাকবে। সুতরাং আমাদের আত্মলালিত সুবিধাবাদের মৃত্যু যতদিন না ঘটছে ততদিন বিশ্বাসঘাতক নামের অনুমাননির্ভর অনুভূতিসঞ্জাত বায়বীয় প্রাণীটির মৃত্যু নেই।