বিশ্বাসের জন্ম-মৃত্যু এবং

তমাল রায়



১৯৪৭এর সেপ্টেম্বর। বেলেঘাটার গান্ধী হাউসে এসে হিন্দু,মুসলিমরা অস্ত্র জমা দিলেন বাপুর পায়ের কাছে। প্রতিশ্রুতি আদায় করে ছাড়লেন আর দাঙ্গা নয়। আর হত্যা লুঠতরাজ নয়। সাময়িক শান্তি। ঠিক ততটা আশ্বস্ত নয়! দিল্লি ফিরে চললেন গান্ধী। দিল্লির অবস্থাও খুব খারাপ। করোলবাগ,সবজি মান্ডি সহ আরও মুসলিম অধ্যুষিত বহু জায়গা থেকে তারা আশ্রয় নিয়েছে মসজিদগুলোয়, হুমায়ুনের সমাধিতে। লাহোর থেকে অমৃতসর ফিরতি হিন্দু উদ্বাস্তু ট্রেনে আগুন লাগিয়ে জ্যান্ত পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে। এপারের মুসলমানদের অবস্থাও যথারীতি তথৈবচ। প্যাটেল ইতিমধ্যে জানিয়েছেন, গান্ধী সাধারণত দিল্লিতে যে বাড়িতে থাকেন, সেখানে এবার থাকা যাবেনা, নিরাপত্তার কারণেই। অগত্যা গান্ধী উঠলেন বিড়লা হাউসে,পাঞ্জাবের দাঙ্গা পরিস্থিতি যে খুব খারাপ তা ইতিমধ্যেই শুনেছেন। সেখানে যেতে চাইলেন। ট্রেনে উঠলেন অমৃতসরের উদ্দেশ্যে,মাঝপথে বুঝিয়ে নামিয়ে আনলেন প্যাটেল। এ সময়ে তার পাঞ্জাব যাওয়া ঠিক হবে না। অসহায় গান্ধী কি করে বাঁচাবেন এই পরস্পর হত্যায় উদ্যত ধর্মোন্মাদ জাতিকে? মাঝে আরও দু তিন মাস গেছে। এটা জানুয়ারি,১৯৪৮। অনশনে বসলেন। বিকেলে হাজির মাউন্টব্যাটেন। গান্ধীকে গ্রাস করেছে বিরক্তি। কথা বলতেও ক্লান্ত তিনি। কিছুই আর ভালো লাগে না। তাই প্রার্থনা শেষে লিখে কথা বলছেন দুদিন হল। ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া ৩৭৫কোটি টাকার মধ্য থেকে পাকিস্তানের প্রাপ্য ৫৫কোটি। সেটা ভারত না দেওয়ায় ইতিমধ্যেই রাষ্ট্রসংঘে অভিযোগ দায়ের করেছে তারা। মাউন্টব্যাটেনের অনুরোধ সে টাকা দিয়ে দেওয়া হোক পাকিস্তানকে। নইলে চুক্তিভঙ্গ হবে। এদিকে পাকিস্তান ইতিমধ্যে কাশ্মীর আক্রমণ করেছিল। ফলে অবিশ্বাস ও তিক্ততা চরমে। প্যাটেল চায়না পাকিস্তানকে আর টাকা ফেরত করা হোক। নেহরুও সহমত। বরং যে সব হিন্দু সে দেশ থেকে ভারতে আসছে,তাদের উন্নতিতে সেই টাকা ব্যয় করা হবে। গান্ধী ডেকে পাঠালেন নেহরু আর প্যাটেলকে। প্যাটেল নেহরু বিবাদও তখন সপ্তমে। নেহরুর ধারণা প্যাটেলকে ক্ষমতায় বসাতে চান গান্ধী,এবং নেহরুকে সরে দাঁড়াতে অনুরোধ করবেন। কারণ গান্ধীর প্রবল ভক্ত প্যাটেল। সে কারণেই তাকে ডেকেছেন গান্ধী! প্যাটেলেরও ধারণা,নেহরুর পথ নিষ্কণ্টক করতে তাকে সরে যেতে বলবেন গান্ধী। গান্ধীর দুই নিকট শিষ্য পরস্পর যুযুধান! এবং তারা কেউই গান্ধীকে আর ঠিক বুঝছেন না। অবিশ্বাস ভীড় করছে ক্রমশ। গান্ধী দুজনকেই বসিয়ে জানালেন পাকিস্তানকে তার প্রাপ্য ৫৫কোটি টাকা ফিরিয়ে দেওয়া হোক। লিখিত দিক প্যাটেল ও নেহরু। আর নেহরু প্যাটেলের পারস্পরিক যুদ্ধ নিয়ে তিনি পরে মত জানাবেন। সকালেই ডাক্তার দেখেছে। দু পাউন্ড ওজন কমেছে গান্ধীর। কিডনি ভালো কাজ করছেনা। নেহরু,প্যাটেল জানালেন অগত্যা তারা রাজি। কিন্তু তার আগে বাপুকে অনশন ভঙ্গ করতে হবে। গান্ধী বেঁকলেন না। জানালেন তিনি পাকিস্তান যেতে চান। দাঙ্গা প্রতিরোধে। তারাও তার ভাই-বোন-মা। তিনি তো আর শুধু ভারতের বাপু নন। অসহায় মানুষের এই হত্যালীলা বন্ধ করতে চান। জিন্নাহ কেন একশন নিচ্ছে না? স্থির হল ফেব্রুয়ারি ৮এ তিনি অমৃতসর হয়ে লাহোর ঢুকবেন। কিন্তু তার আগে নেহরু প্যাটেল সর্ব ধর্ম বৈঠক ডাকুক। সব রাজনৈতিক দলের ঐক্যমতের ভিত্তিতে একসাথে সকলে শান্তির আবেদন রাখুক। ডাক পড়ল কম্যুনিস্ট পার্টির নেতা পি সি যোশির। তিনিও অনশন তুলতে অনুরোধ করলেন। গান্ধী তার থেকে কথা আদায় করলেন, শান্তি প্রক্রিয়ায় সাথে থাকার। গান্ধী ডাক পাঠালেন গোলওয়ালকরকে। গোলগাঁওকর জানালেন জনসংঘ ও আর এস এস মুসলিম হত্যায় বিশ্বাসী নয়! যদি কিছু হয়ে থাকে তা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। গান্ধী অনশন প্রত্যাহার করুক। গান্ধী তাকে বিশ্বাস করেন না। জানালেন,শুধু মৌখিক প্রতিশ্রুতিতে হবে না,তাকে পাবলিক এড্রেস করে বলতে হবে,যে এই শান্তিপ্রক্রিয়ায় তিনিও আছেন। গোলগাঁওকর জানালেন এ তার পক্ষে সম্ভব নয়! তিনি কোথায় সই করতে হবে জানালে করে দেবেন। অবিশ্বাস বাড়ছে সকলের মধ্যেই! একা বৃদ্ধ গান্ধী চেষ্টা করছেন,জাতিকে অখণ্ড রাখার,দাঙ্গা প্রতিরোধের। অনশন কিন্তু তোলেন নি। ফের ডাক পড়ল প্যাটেল,নেহরুর। গান্ধীকে তারা লিখিত দিলেন পাকিস্তান কে প্রাপ্য ৫৫কোটি ফিরিয়ে দেবে যত দ্রুত সম্ভব। গান্ধী জানালেন দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে নেহরু,প্যাটেল দুজনেই থাকুক। এটা মান অভিমান ব্যক্তিগত লড়াইয়ের সময় নয়। ইতিমধ্যে পাঞ্জাব থেকে একদল বিক্ষুব্ধ আন্দোলনকারী হাজির। বিড়লা হাউসের বাইরে এসে বিক্ষোভ জানাচ্ছেন, স্লোগান উঠছে 'গদ্দার গান্ধীকে মারনে দো।' দেশ বাঁচানে কে লিয়ে গান্ধীকা মরনা জরুরত হায়! হায় দেশ!হায়,ভাতবাসী! গান্ধী ঘরে বসে শুনছেন সেই স্লোগান। ঠোঁটে মৃদু বিস্ময় ও অবিশ্বাসের হাসি। নেহরু আর প্যাটেল বাইরে এসে তেড়ে গেলেন আন্দোলনকারীদের দিকে। কৌন বোলা গান্ধীকো মারনে দো? সামনে আ যাও। পালাচ্ছে এবার আন্দোলনকারীরা... একে একে হাজির হচ্ছেন সব রাজনৈতিক দলের নেতারা। স্বয়ংসেবক সংঘের তরফে গণেশ দত্তও হাজির। সকলে মিলে লিখিত বিবৃতি পাঠ করলেন,পাকিস্তানের উদ্দেশ্যেও বলা হল,সেখানেও যেন এই হত্যালীলা বন্ধ হয়। শান্তি প্রক্রিয়া শুরু হোক। এরপর মিলিত ভাবে সকলে জানালেন দেশ এখন শান্ত। এবার বাপু অনশন প্রত্যাহার করুক। গান্ধী অনশন প্রত্যাহার করলেন সম্মিলিত অনুরোধে। মৌলানা আজাদের হাত থেকে ফলের রস খেয়ে অনশন প্রত্যাহার করার আগে বললেন,ঈশ্বরের নামে,আল্লাহর নামে খুন,ধর্ষণ,এই নারকীয় অত্যাচার যারা চালায় তারা ধার্মিক? আসলে মিথ্যে স্বান্তনা বাক্যের প্রেক্ষিতেই তুললেন অনশন! দেশে তখনও অবাধে চলছে হত্যালীলা। খাস দিল্লিতেও চলছে তাই। অথচ দিল্লি তো ইন্দ্রপ্রস্থের কাছেই,আর সে কবেই এখানে মোঘল শাসকরা এসে উপস্থিত হয়েছিলেন,এত শতক ধরে একসাথে বাস,তারপরও এত অবিশ্বাস,সন্দেহ,ঘৃণা! মসজিদ ভাঙছে,সেখানে স্থাপিত হচ্ছে হিন্দু দেবদেবী। মন্দির ও হয়ে যাচ্ছে মসজিদ। ব্যক্তিগত সোর্স কাজে লাগিয়ে গান্ধী কিছু পর জানছেন সে কথা! এত বড় বিশ্বাসঘাতকতা করলো এই রাজনৈতিক নেত্রীবৃন্দ! দেশকে কাদের ওপর তিনি ছেড়ে যাচ্ছেন! ছি! এরপরও বেঁচে থাকার মানেই কী!
কনট প্লেসের ম্যারিনা হোটেলে সেই রাতেই পুণে থেকে এসে উঠলেন এস.দেশপাণ্ডে। ফেব্রুয়ারির ৮তারিখ গান্ধীর যাওয়া হয়নি পাকিস্তান। ৩০ তারিখ দেশপাণ্ডে @ নাথুরামের হাতে ভবলীলা সাঙ্গ হয় বিশ্বাসী বাপুর।
এতক্ষণ পিসেমশাইয়ের কাছে বসে গল্প শুনছিলাম। সেটা ১৯৯০এর ৩০ মে। কিছু আগে বানতলায় ধর্ষিত হয়েছেন তিন সরকারি মহিলা আধিকারিক। মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু জানিয়েছেন,ছোট ঘটনা! এমনতো কতই হয়!
গত কয়েকদিন পিসির সাথে তার কথা বন্ধ। কারণ জানা নেই! পিসেমশাইয়ের আবার সেদিন জ্বর। তবু পিসেমশাই বলছিলেন বুঝলি, বিয়ের কুড়ি বছর পর স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কও ভারত পাকিস্তানের মতই! তা বলে ভেবো না ভেতরে লুকনো প্রেম নেই! অসুস্থ পিসেমশাইয়ের জন্য পিসি তখনই গরম বার্লি বানিয়ে ঢুকলেন। বাইরে তখন কী কারণে অসময়ে কোকিল ডাকছে। কে জানে কেন!

প্রকাশিত হল বিশ্বাসকাকু।