সেতুর ভাঙা-গড়া

তমাল রায়



Genocide, the physical extinction of a people is universally condemned, but ethnocide, the destruction of peoples' way of life is not only condemned, it's universally - in many quarters - celebrated as part of a development strategy."-Cultural anthropologist Wade Davis
মায়ের ভাষা। সিঁড়ি দিয়ে আলো উঠে যায়। সিঁড়ি দিয়েই নেমে আসে নিভু নিভু আলো। মা ভালো,মায়ের ভাষাও ভালো। সিঁড়ি না'কি সেতু? ভাষা প্রকৃতপক্ষে এক চলমান সেতু। সেতু গ্রাম জোড়ে, নগর জোড়ে,দেশ এমনকি গোটা বিশ্বই এক অদৃশ্য সেতুতে জোড়া। ভাষা। দীর্ঘ অব্যবহার,অবহেলা,জীর্ণ ায় তা ভেঙেও পড়ে, অথবা অন্য কত শত কারণে।
যেমন, রাঙাপিসির সাথে ঘটনা কি ঘটেছিল জানা নেই। মানে,বড়রা হয়ত জানতেন। কখনও তা শেয়ার করেননি আমাদের সাথে। তাই জন্ম ইস্তক দেখে এসেছি রাঙাপিসি মূক। তমাল তখন ক্লাস ফোর। সুভাষ স্যার হোম ওয়ার্ক দিলেন,প্রবন্ধ রচনা লিখতে হবে। আ মরি বাংলা ভাষা। সেই তখনই তমাল জানে,মাতৃভাষা বলে একটা জিনিস আছে। এবং সেটা খায় না মাথায় দেয় বুঝে ওঠার আগেই যা বুঝে ফেলে,তার মায়েরও একটা ভাষা আছে। যেমন এই নিখিল বিশ্বচরাচরের সকলেরই আছে। এবং তা গর্ব করার জিনিস বটেই। কিন্তু রাঙাপিসির মাতৃভাষা কী? তার কি কণ্ঠরোধ করা হয়েছিল?
মা বলেছিলেন বাবার মুখে শোনা, রাঙাদি ওরফে ছোট্ট সুভাষিণী না'কি খুব সুন্দর সুললিত কন্ঠে আওড়াতো,
 কোন দেশেতে তরুলতা— সকল দেশের চাইতে শ্যামল ? কোন দেশেতে চ'ল্‌তে গেলেই— দ'লতে হয় রে দুৰ্ব্বা কোমল ? কোথায় ফলে সোনার ফসল,— সোনার কমল ফোটে রে? সে আমাদের বাংলা দেশ, আমাদেরই বাংলা রে! কোথায় ডাকে দোয়েল শ্যামা- ফিঙে গাছে গাছে নাচে ? কোথায় জলে মরাল চলে— মরালী তার পাছে পাছে ? বাবুই কোথা বাসা বোনে— চাতক বারি যাচে রে? সে আমাদের বাংলা দেশ, আমাদেরই বাংলা রে!
তারপর? তারপর তো আর জানা নেই! রাঙা পিসেমশায় মারা যান মাত্র ২৬ বছর বয়সে। বিয়ের বছর ঘুরতে না ঘুরতেই বিধবা হন রাঙাপিসি। তারপর ওই শ্বশুরবাড়িতে ঠিক কি ঘটেছিল আর কেউ জানে না! অনুমান শোক-তাপ,অথবা প্রবল ভয়ে তার বাকরুদ্ধ হয়ে যায়! ছোট্ট তমাল মা'র দিকে তাকিয়ে সবিস্ময় জিজ্ঞেস করে ফেলেছিলো, তাহলে রাঙাপিসির মাতৃভাষা...?
মাঝবয়সী তমাল এখন অবশ্য জানে,প্রতি চোদ্দ দিনে একটি ভাষার মৃত্যু হয়। মানে মূক হয় আরও কিছু রাঙাপিসিদের দল। হয়ত এক সমগ্র জাতিই। যারা আকারে আয়তনে ক্ষুদ্র,অনগ্রসর। বৃহতের অত্যাচারে,ক্ষুদ্রের যা হয়। ক্ষমতাশালীর ধর্ম,ভাষা বিস্তার পায়,ক্ষমতার হাত ধরেই। আর দুর্বলের ধর্ম বা ভাষা হালে পানি না পেয়ে রুদ্ধ হয় তার গতি! বড় ভাষার আগ্রাসন ও বিস্তারে ছোট ভাষা হারিয়ে যায় মহাকালের গর্ভে। বিশ্বের ভাষার উপর গবেষণা করা সংস্থা Ethnologue-এর রিপোর্ট অনুযায়ী বিশ্বের মোট ভাষাগুলির সংখ্যা ৬ হাজারের বেশি হলেও মাত্র ৫টি ভাষাতেই মূলত কথা বলে অধিকাংশ মানুষ। সেই ৫টি ভাষা হল- ইংরেজি, চিনা, স্প্যানিশ, আরবি এবং অবশ্যই হিন্দি। হিন্দি এবং তথাকথিত হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির ধ্বজাধারীদের 'হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস ্থান' এই স্লোগানকে কার্যকর করার মরিয়া রাষ্ট্রায়ত্ত প্রয়াস এই বিষয়ে সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। এমন কি আমাদের বাংলা ভাষাও গলাধঃকরণ করেছে একাধিক ছোট আঞ্চলিক ভাষাকে। যেমন উত্তরবঙ্গের হারিয়ে যাওয়া ভাষাগুলি।
ইউনেসকোর হিসাব অনুসারে, গত একশ বছরে মৃত্যু হয়েছে এমন ভাষার সংখ্যা ২০০-এরও বেশি। বর্তমানে যে হাজার ছয়েক ভাষায় পৃথিবীর মানুষ কথা বলে, তার মধ্যে প্রায় ২ হাজার ভাষা হয় আশুমৃত্যুর সম্মুখীন অথবা মৃত্যুর হুমকির মুখে রয়েছে। জাতিসংঘের এই সংস্থার প্রস্তুত ভাষার বিশ্ব মানচিত্র অনুসারে, প্রায় ২০০টি ভাষা রয়েছে, যাতে কথা বলে এমন মানুষের সংখ্যা ১০ জনের কম। আরও শ দুয়েক ভাষা রয়েছে, যাতে কথা বলে এমন মানুষের সংখ্যা ৫০ জনের বেশি নয়।

পেরুর আমাজন জঙ্গলে তাউশিরো সম্প্রদায়ের একই নামের ভাষায় কথা বলে এমন মানুষের সংখ্যা এখন মাত্র একজন। সভ্যতার সংক্রমণ থেকে নিজেদের বাঁচাতে তারা আশ্রয় নিয়েছিল এই জঙ্গলে, কিন্তু রোগ-শোক-জন্তুর আক্রমণে তাদের সবাই এক এক করে মারা গেছে। বেঁচে আছে শুধু একজন, সেও মারা যাবে, মৃত্যু হবে আরেকটি ভাষার।

এবার আসা যাক বাংলা ভাষার কথায়। বাংলা ভাষার অস্তিত্বের সঙ্কট নিয়ে বলতে গিয়ে অর্থনীতিবিদ ও বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক অশোক মিত্র তাঁর সহজাত উচ্চারণে আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন, এখন শুধুমাত্র বাংলা ভাষা শিক্ষা আর ইংরেজি ভাষা শিক্ষার দ্বন্দ্ব নয়। বাংলা ভাষাকে শুধু হিন্দি বা ইংরেজির সঙ্গে সমানভাবে লড়াই নয়,লড়তে হচ্ছে আরও এক প্রযুক্তির ভাষার সঙ্গেও। তা হল ‘‌কম্পিউটার ভাষা’‌,অ্যাপসের ভাষা! ফেসবুকে বা হোয়াটসঅ্যাপে ব্যবহৃত ‘‌বাংরেজি’‌ অশুদ্ধ লিপি বিনিময়ের ভাষা আমাদের তাৎক্ষণিক কর্মে সাফল্যের স্বাদ আনছে ঠিকই কিন্তু তাতে মাটির ভাষার বারোটা বাজছে সন্দেহ নেই। আমি এখন বক্তৃতা করছি। কেউ আমাকে ডিসটার্ব করবে না। অথবা টিভিতে হামেশাই কেউ যাবেন না, সঙ্গে থাকুন। একটা ব্রেক নিয়ে আসছি। অথবা মেসি কাল খেলছে কিনা, দ্যাট ইজ দ্য কোয়েশ্চেন। তাছাড়া আরে না, কাকা, বিন্দাস, ফাটাফাটি, ওটা কোনও ম্যাটারই না জাতীয় মিশ্র শব্দের বাকচাতুর্যে বাংলা বলার ধরনটাই বদলে যাচ্ছে। এখন আবার ইন্টারনেটের দৌলতে কথা বলা মানুষের সংখ্যাই দিন দিন কমে যাচ্ছে। ট্রামে–বাসে সর্বত্র সবাই শুধু আয়তক্ষেত্রে আঙুল ছুঁইয়ে যাচ্ছে। অদূর ভবিষ্যতে মান্য বাংলা বা প্রমিত বাংলা বলা মানুষের জন্য মিউজিয়াম বানাতে হবে কি না— সেটাই দেখার ও ভাবার। শুনতে পাই, বই বিক্রি বাড়ছে। কিন্তু পড়ছে কতজন?‌ বই কেনার মধ্যেও একপ্রকার জাতে ওঠার ফ্যাশন এক শ্রেণির মানুষকে পেয়ে বসেছে। আর সে কারণেই মাতৃভাষার স্বাধিকার অর্জনের মিছিলে কপট কান্নাই শোনা যায় বেশি। ভাবের ঘরে চোরের উৎপাত বাংলা ভাষাকে দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর করে তুলছে। এ বিষয়ে এখনই উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে অরণ্যে রোদন ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না। ভাষাকে সচল রাখতে অন্য ভাষার শব্দ গ্রহণের উদারতাও যেমন জরুরি তেমন জরুরি তাকে কাজের ভাষাতেও পরিগণিত করা। ইংরেজি অভিধান যেমন আমাদের বহুল প্রচলিত ঘেরাও,বনধ,লাঠিচার্জকে আপন করে নিয়েছে,তেমনই তা কিন্তু কাজের ভাষাও। তাই সে ভাষার সুদূর ভবিষ্যতেও সংকটাপন্ন হবার কোনো সম্ভাবনাই নেই।

কাজের ভাষায় পরিগণিত করা ছাড়াও কোনও ভাষা ‘মৃতপ্রায়’ চিহ্নিত হওয়া মাত্র, চেষ্টা শুরু করা উচিত। সেই ভাষার সংরক্ষণযোগ্য লিপি তৈরি করে ফেলতে হবে। তার পরে অভিধান, ব্যাকরণ। সঙ্গে অবশ্যই, সেই ভাষায় কথা বলা মানুষের কথা রেকর্ড করে রাখতে হবে। পাঠ, সাহিত্য, নাটক, সিনেমা— নানা মাধ্যমে সেই ভাষাকে ব্যবহারে উৎসাহিত করা। এ ধরনের চেষ্টার একটি সফল উদাহরণ, নাইজেরিয়ার প্রাচীন এনজেরেপ ভাষা। ২০১২ সাল নাগাদ দেখা গেল, মাত্র চার জন এই ভাষা জানেন। তাঁদের সবার বয়স ষাটের উপরে। যুদ্ধকালীন তৎপরতায় এই ভাষাটিকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব হয়েছে। এমনকি, সেই ডলি পেনট্রিথের কর্নিশ ভাষাকেও পুনরুদ্ধারের কাজ চলছে।

এভাবেই বাঁচাতে হবে আমাদের বহুবর্ণিল ভাষা সংস্কৃতিকে। নইলে,ভাষা বৈচিত্র্যের রামধনু রং মুছে গেলে পৃথিবীটা যে বড্ড ফ্যাকাশে...
চেতনায় থাকুক বাহান্নর ভাষা আন্দোলন। শতফুল বিকশিত হোক।
সাঁওতাল তার ভাষায় বলুক রাষ্ট্রপুঞ্জে
তমালের রাঙাপিসি আজ নেই,কিন্তু আজকের লক্ষ রাঙাপিসির রুদ্ধ বাকের আগল খুলুক।
জয় হোক অমর একুশের...
অক্ষয় থাকুক সহস্র ভাষার সেতুসঞ্চার।