লাশপাতাল

আব্দুল আজিজ

হঠাৎ- ই মারা গেলেন । ঠিক কুরবানি ঈদের পরের দিন, হাসপাতালের জরুরি বিভাগের বেডে তাকে শুইয়ে তার যে চেকআপ শুরু হয়েছিল এবং এই মর্মান্তিক ঘটনাটা ঘটে খুব দৌড়ঝাঁপের পর রিপোর্ট ডাক্তারের হাতে আসার আগেই।
হাসপাতালের বাইরে বুড়ো বটগাছটার নিচে সাইকেল গ্যারেজের পাশে অপেক্ষা করছিল এম্বুলেন্স যেটা প্রায়শই লাশবাহী গাড়ি হিসেবে ব্যবহার হয়ে থাকে।
সময়টা দুপুরের পরেই অনেকে বিকেল বলে অথবা ভাটি বেলা বলে চালিয়ে দেয়। আসলে সময়টা দুপুর ও না বিকেল ও না। মাঝামাঝি সূর্যের অবস্থান।
মরেই তো গেছে এখন বেলা চিহ্নিত করে কী কোন লাভ আছে?
হ্যাঁ এইটা নিয়েই ঝামেলা বাধতে পারে যখন মসজিদের মাইকে একটি মৃত্যু সংবাদ ( যেটা কিছুদিন আগে একটি শোক সংবাদ তিনবার বলার পর মরহুম অথবা মরহুমার পরিচয় এবং জানাজার সময় বলে দিত) বিকট শব্দে ধ্বনিত হবে। কিন্তু কখন মারা গেল? কোন সময়ে এটা যদি ঠিক না ধরা যায় ( যদি ঘড়ি না দেখে থাকে) তাহলে বেশ বিপদ।
তাহলে কী মাইকে মৃত্যু সংবাদটা প্রচারিত হবেনা, যেটা প্রত্যেক মৃতব্যক্তির মৃত্যুগত অধিকার।

তারপর তিনি বাড়িতে এলেন । অর্থাৎ লাশ। যে এতদিন কারো নিকট তুই, তুমি, আপনি সম্পর্কের কেউ ছিলেন। এখন শুধুই লাশ অথবা নিরপরাধ কেউ একজন যার জন্য সবার কাঁদতে ইচ্ছা করে বা করছে। কিন্তু সবাই কি কাঁদছে ? অথবা সবার কী ইচ্ছা করছে কাঁদতে?

যিনি মারা গেছেন উনি তার পরিবারের কাছে একজন দায়িত্ববান পুরুষের মতোই ছিলেন যদিও সে নারী। এযাবৎ একটি ছেলে ও একটি মেয়ে জন্ম দিয়েছেন।

যখন বেঁচে থাকার সময় ছিল তখন আলিফ লায়লার বিজ্ঞাপনের ফাঁকের সময়টুকুতে যে ভাবনা আসে তা থেকেই স্বামী স্ত্রী মিলে একটি দোকান শুরু করেন। অবশেষ হতাশাগ্রস্থ দিন ঠেলে সুখের মুখ দেখতে পেয়েও প্রকাশ্য একটি দুঃখ, বছর খানেক ধরে বয়ে বেরিয়ে এখন গোপন কেল্লা নামক স্থানে নির্বাসন দিয়েছে।

আমি হেঁটে গেলাম সেই দুঃখ কেল্লায় যেখানে তাদের বড় মেয়েটি স্বামী ছাড়া হয়ে দেয়ালের মুখোমুখি বসে থাকে আর অবসরে সুজনি সেলাই করে। এবং তার মধ্যখানে সুন্দরী ধাগা দিয়ে ফোড় তোলে- " প্রিয়তম ভালবাসা। "

তাদের ছেলেটা বড্ড সংগীত প্রিয়, আশপাশের কয়েক বাড়ির লোকজন নিয়মিত তার সংগীত পারফিউমের ঘ্রাণে বিরক্ত হয়ে ওঠে - কিন্তু ছেলেটির প্রতিদিন নিয়ম করে এমন সংগীতের কীর্তিতে প্রতিবেশীরা নিজেদের অঙ্গে আলাদা ব্যাকুলতা হারিয়ে ফেলেছে।

" যার মা নাই তার গাঁ নাই " - " মা মরলে বাপ তাহই "

এই গ্রাম্য প্রবাদ দু'টি ফ্যাকাশে থেকে গাঢ় হয়ে ওঠে মেয়েটির জীবনে, কুৎসিত কিছু ঢং যা বেরিয়ে আসতে থাকে আর যেহেতু সহানুভূতি পাওয়ার কথা ছিল কিন্তু তার বিপরীতে কী দাঁড়ালো? দেখাই যাক -
আমি দেখতে পাচ্ছি হ্যাঁ দেখতে পাচ্ছি তো, তোমরা বিশ্বাস করছনা তাই - সেই বন্ধনের দোহাই দিয়ে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছ। জানি সে চল্লিশ দিন ঘোরাফেরা করবে। দ্যাখো - দ্যাখো যেন তার আত্মাটি চলাফেরা করছে রান্নাঘর জুড়ে এবং প্রাগৈতিহাসিক স্মৃতিরা বরফ গলার মতো নতুন জগতের ভাষায় গলছে, যেখানে সব প্রাচীন ভাষার মানুষেরা একত্রিত হয়ে গান গাইছে - আর তারা ভৎসনা করছে পৃথিবীর জীবিত সব মানুষদের - তাদের কাছে জীবিতরা হল আলকাপের ছোকরা যাদের অঙ্গভঙ্গিমা ছাড়া কিছুই দেবার নেই।
যদিও বলা হয় " আজ মরলে কাল দুইদিন " - কিন্তু দুইদিন আগের নিজের সকল শারীরিক ইচ্ছার সাথে আজকের শারীরিক মানসিক কোন ইচ্ছারই মিল নেই। সে নিজের লুঙি চেড়ে দ্যাখে যে তার শিশ্ন আগের মতই আছে কিনা অথবা তার দুই হাত যা এত দিন তার স্ত্রীর স্তন মর্দন করে এসেছে, শেষ রাতে এসব মনে করতেই সে ভয় পায় এবং নিজের কামুকতা একজন মৃত মানুষ ও জেনে গেছে ভেবে শঙ্কিত হয়।

বাথরুমের দরজাটা খুলে গেল, যেমন ভাবে তার জীবিত স্ত্রী ধাক্কাতেন - সে ঘেমে উঠেছে, নাহ এভাবে এত বিব্রতকর কৌতুকে বাঁচা সম্ভব নয়।

স্ত্রীর মৃত্যুর তিন দিনের দিন বাড়িতে চালের আটার সাথে খেজুরের গুড় অথবা চিনি মিশ্রিত এক প্রকারের হালকা কড়া মিষ্টি হালুয়া আর সেদ্ধ রুটি বিলি করা হয় পাড়া জুড়ে।
তাদের সম্মিলিত ভাবনায় তৈরি যে দোকানে ইঁদুরেরা ইচ্ছামতো বিচরণ করতে থাকত, সেই ইঁদুরদের নিধন কলটি অকেজো রেল ইঞ্জিনের ন্যায় বাড়ির গৃহিণীটির অপেক্ষায় পড়ে রইল চালের বস্তার এক কোণে। যেটিতে প্রতিরাতে আলু গুঁজে নিশ্চিন্তে বিছানায় ঘুমাতে যেতেন আর পরদিন দেখতেন মৃত ঠাণ্ডা এক দেহ, যেমনটা সে কুরবানি ঈদের পরের দিন নিজেই এক ফ্রিজে থাকা বুদবুদহীন কোকাকোলা ঠাণ্ডায় পরিণত হয়েছিল।

নিজে ঘুমাতে যাওয়ার আগে পরিষ্কার ভাবে মনে করতে পারলেন না তারা দুজনে কি কখনো কোন পার্কে বেড়াতে গেছিল? মনে তো পড়লনা। প্রথম সন্তান অর্থাৎ বাড়িতে যে কন্যাটি অবস্থান করছে তার জন্ম হওয়ার আগেই কী কষ্টই টা না করেছিল তারা, টিনের ঘর, বিছানায় ময়লা চাদর তখন সেখানে শুয়েও তারা পার্কে যাওয়ার ভাবনা ভেবেছে। এখন যখন তারা সচ্ছল হয়ে উঠতে থাকল এবং কঠিন সময়ের রাস্তাটা পিচ্ছিল বাইম মাছের শরীরের মতো পিছলে নিয়ে গেল অনেকদূর তখন পার্কে যাওয়ার সকল পরিকল্পনা তারা ভুলেই গেল । এসব মনে না আনার চেষ্টায় সে তার স্ত্রীর ব্যবহার করা কাপড়চোপড় একটা জায়গায় করে পুঁটলি করতে থাকে যেন সেটা একটা দক্ষ ধোপার নদীর ঘাটে যাওয়ার প্রস্তুতি । তাতে মৃত্যুর গন্ধ লেগে আছে। সে ঘুমাতে পারেনা, তার ভেতরে মোচড় দিয়ে ওঠে যেবার প্রথম সে দ্যাখে নোরা ফাতেহিকে বলিউড সিনেমার থিম সংগুলিতে নৃত্যের নকশী অচেনা আগ্রাসন দিয়ে একাকার করে দিচ্ছে অন্তর । স্ত্রীহীন সময়টাতে এসব মনে আসার কোন মানে আছে!

অবিকল বাতাস খাওয়া নরম বিস্কুটের গুঁড়ার মতো তার ফিসফিসে কণ্ঠ শোনা যেতে থাকে নিজের ভেতর থেকে - একা যেখানে তিনি বিশাল ঘরটি দখল করে শুয়ে আছেন । তাকে কী নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া উচিত নয়! যে অন্ধকার সৃষ্টি করল। হ্যাঁ একজন বাঁজা মেয়ের লক্ষ্যেই আমার নিজের মুখে গজিয়ে ওঠা দাড়িগোঁফ কামিয়ে ফেলা - সত্যি একজন বাঁজা মেয়ের সন্ধান বড্ড জরুরি যার কোন ক্ষমতা নেই বাচ্চা জন্মদানের, সেরকমই একজন বাঁজা মেয়ে দরকার যার পেটে থাকবেনা কোন গর্ভদাগ একেবারে মসৃণ উপযুক্ত ব্যবহারযোগ্য - যেন পেট্রলিয়াম জেলি।

দিনদিন লোভী কসাই হয়ে উঠছিলেন তিনি, এই যেমন ধরেন - মাংস বেশি ফলন্ত হবে দেখে কসাইরা গোপনে বাঁজা পাঁঠি বকরি খুঁজে বেড়ায় আর জবাই শেষে, ছাল ছাড়িয়ে লোহার শিকে ঝুলিয়ে বলে খাসির গোশত। সেরকমই এক সুস্বাদু দৃশ্য বুঝলেন!

' নতুন বাড়ি অনেকের কপালে সহে না ' - এমনই এক কথা ছাদে কুমড়োর বড়ি দেওয়ার সময় আমার মা শুনেছিল প্রতিবেশীর মুখে - যে কুমড়ো দিয়াড়াদের কাছ থেকে কিনেছিল ফাল্গুন মাসের প্রথম সপ্তাহে। আমি এখন রজঃস্বলা। তাই আমি ছাদে গিয়ে কুমড়োর বড়ির আটা ফেণাতে পারবনা গতবছরে আমি সেই আটা ফেণিয়ে দড়ির খাটলায় মশারি বিছিয়ে বড়ি দিয়েছিলাম। আর সেই বড়ির মাথায় লাল শুকনো মরিচ পুঁতে দেয় যাতে নজর না লাগে। দিনে মানুষের আর রাতে জ্বিন কিংবা সেইসব ভূতের যারা মানুষের গুড়ি কাটতে পছন্দ করে। আমি এখন রজঃস্বলা, যদি বড়ির আটার কাছে যাই তাহলে সেটি নষ্ট হয়ে যাবে এটা প্রচলিত এক কঠিন বিশ্বাস আর যদি আমার ছায়াছাটা লাগে তবে সেটির রং হলুদ হয়ে যাবে, গন্ধ থাকবে রান্নার পরে এবং সেদ্ধ হবেনা। আমি এখন রজঃস্বলা সাথে সময়টাও।

তারপর আরো কিছুটা আসক্তিকর দিনকাল শব্দছাড়া বোমা ফাটার মতো এগিয়ে আসে। সে মিটিমিটি হাসতে থাকে দোকানের সকল ইঁদুর তাকেই মেরে সাফ করতে হবে, তারপর ইঁদুরের লাশগুলি পরপর সাজিয়ে আনন্দে চিৎকার দিয়ে উঠবে সৎকারের জন্য। কারণ জীবন্ত ইঁদুরগুলি তার অক্ষমতা প্রকাশ করে যাচ্ছে দিনদিন, দোকানের গ্রাহকগণের কাছ থেকে শুনতে হচ্ছে মৃত স্ত্রীর প্রশংসা, কীভাবে সে প্রতিদিন একটি করে মৃত ইঁদুর বের করেছে এই দোকানের সুরঙ্গ থেকে।
তার পরিকল্পনা হাটছে হিম শীতল কক্ষের ( এ যেন গ্রীষ্মের দিনে আরামদায়ক শীতকাল ) এক লাশপাতাল তৈরির পথে।

জানেন কী আপনারা আমার আব্বা এতদিন ধৈর্যের পরীক্ষা দিলেন, দেখলেন মেয়েটির বিয়ে না দিলে সে বিয়ে করতে পারবেনা - আমার মা হলে কী এমনটা করতে পারতেন ?

না জেনেশুনে হুটহাট আমার বিয়ে হয়ে গেল এক আস্ত নেশাখোরের সাথে - কিছুদিন থাকার পর ফিরে এলাম সেই দেয়ালের মুখোমুখি - আবার ধরলাম সুজনির জমিন।
বাঁজা মেয়েটি আব্বাকে বিয়ে করতে অস্বীকার করেছে আমি আবার অর্থাৎ তার হবু স্বামীর মেয়ে ঘরে ফিরে এসেছে দেখে , বাঁজা মেয়েটির শর্তে ছিল সংসারে তার কোন সতীনের মেয়ে থাকা চলবে না - গোপন ছিলনা একটি ছেলে রয়েছে সংসারে যে সংগীত নিয়েই পড়ে থাকে। যেহেতু সংগীতে বাঁজা মেয়েটির কোন আগ্রহ নেই তাই ছেলেটির প্রতিও আগ্রহ শূণ্য। কিন্তু আমি মেয়েটি যে আবার বাপের বাড়ি ফিরে এলাম !

হায় কপাল তার বিয়েটিও ভেঙে গেল সে খোঁজ নিয়ে দেখেছে বিয়ের বাজারে বাঁজা মেয়ের সংখ্যা খুবই অল্প - আসলেই কি অল্প?

ভেবে দেখলাম অবশ হয়ে থাকা সাময়িক খণ্ড খণ্ড প্রতিক্ষার একটি অবসান হওয়া দরকার ছিল।

মেয়েটি বলল আরে আমার আব্বা তো শেয়াল হয়ে গেছে, শুনেছি শেয়াল কবর থেকে মড়া তুলে খায় - হায় আল্লা মা যে আমার কবরে.......।