অস্তাচলের দীর্ঘশ্বাস

সৌর শাইন

মহাসড়কের দু’পাশে চোখ ধাঁধানো ঘন অরণ্য সাম্রাজ্য! সবুজপাতার দিগন্ত বিস্তৃত ও মনোহর রূপের জাদুতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে লাবণ্যসুধার পরিমণ্ডল! আলপনা আঁকা রঙিন মাটির অপরূপ গালিচা পাতানো মাইলের পর মাইল সুদূর বনভূমি। মায়ের আঁচলের মতো মায়া ভরা এই ছায়াশীতল আবহ! লোকের কাছে এই বনাঞ্চলের পরিচিতি ভাওয়ালগড় নামে। এই বনভূমি ভেদ করে বিশাল অজগরের মতো শরীর মোচড়াতে মোচড়াতে দূরে মিলিয়েছে মহাসড়ক! কালোপিচ ঢালা রূপে রৌদ্রজ্জ্বল মরীচিকা ভঙ্গ করে রোজ ছুটে চলে দানব প্রজাতির আন্তঃজেলা দূরপাল্লার কোচ! জানালার পাশে বসা চোখগুলোর কাছে বন্যসবুজের মিছিল টপকে হঠাৎ হঠাৎ বেমানান দেখা মেলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে বিষাক্ত সাপের ফণার মতো জেগে উঠা কলকারখানা! রাজধানীগামী হাইওয়ে রোডের দু’ধারে অরণ্যের বুকে ক্ষত এঁকে এখানে গড়ে উঠেছে পোশাক ও সিরামিক শিল্পের রাজ্য! রাজপ্রাসাদ সুলভ সাজানো শিল্পপতিদের অফিসার কলোনি। রপ্তানি বাণিজ্যের কোটি কোটি ডলারের অঙ্ক তদারকি করা বাঘা মাথাগুলো এখানেই বসবাস করে। তাদেরই একজন ছিলেন সৌরাংশু চৌধুরীর পিতা সোহরাব চৌধুরী। দুইযুগ পেরিয়েছে সৌরাংশুর বয়স! পৃথিবীর গতিসূত্র ও চোখের সামনে বহু শোষক-শোষিতের সূচক চিত্র প্রভাব ফেলেছে ওর স্মৃতিফলকে! নিয়তির যোগ-বিয়োগে সৌরাংশুর কাছে মনে হতো, চকচকে ঝকঝকে এই কলোনির রূপ যেনো ইতিহাসের গহ্বরে ডুবে যাওয়া সেই নীলকুঠি কিংবা জমিদার-ভূস্বামীদের মহল। কি দুর্দান্ত মিল!

স্মৃতিরা ঘুমিয়ে গেলে বাঁচা যায়, ঘুমন্ত স্মৃতি জেগে উঠলে নির্ঘুম হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। এ যেনো বাঁচা ও মৃত্যুর মাঝখানে গড়ে উঠা সুদীর্ঘ উপত্যকা, যে পথ পাড়ি দেয়া বড়ো দুষ্কর! একটা মৃত্যু সংবাদ যখন আরেকটা মৃত্যুস্মৃতির মমিকে নাড়া দেয়, তখন দণ্ডভোগের দহন চলে উভয় দিক থেকে। একশো এগারো বছর বয়সী বৃদ্ধ চলেশ রিছিল আর পৃথিবীতে নেই। যিনি ছিলেন ভাওয়ালগড়ের এক অরণ্যপ্রেমী শতবর্ষী মানব!

তখন বিকেল, সৌরাংশু চৌধুরী অফিসের কাজ গুছিয়ে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিল! ওর স্কুল সহপাঠী গারো বন্ধু হ্যান্ডিক মারাকের কাছ থেকে ফোনকলটি আসে। দুঃসংবাদটা শোনার পর সৌরাংশুর শরীর শীতল ও স্থির হয়ে যায়, বুকের ভেতর পাঁজরের খাঁচায় মোচড় অনুভূত হয়। মৃত্যুকে সৌরাংশু খুব সহজভাবে বিবেচনা করে থাকে, স্বাভাবিক বা অস্বাভাবিক যাই হোক না কেন! মৃত্যুই জীবনের যত কষ্ট-দুর্দশা সবকিছুকে ছুটি দিয়ে, ঘণ্টা বাজিয়ে খুলে দেয় মুক্তির দ্বার! তবু আজ এই মৃত্যু সংবাদ সৌরাংশুকে আঘাত করেছে! অস্পষ্ট স্বরে সে বলতে থাকে,‘দাদু.. তোমাকে চলেই যেতে হলো?’।
আত্মীয় নয়, রক্তের সম্পর্কেরও কেউ নয় তবু সৌরাংশুর মনের ভেতর এক পরম জায়গায় ঠাঁই নিয়েছিল এই মানুষটি! মৃত্যুর কথা শোনা মাত্র ওর মনে যে ঝড় জেগেছিল তা বাইরে প্রকাশ হলে বড্ড আহাজারি হয়ে উঠত! নিজেকে প্রবোধ দিয়ে সৌরাংশু বলে,‘লোকটার অনেক বয়স হয়েছিল বটে, কিন্তু তাঁর সেই কথাটা..!’

সৌরাংশু বাসায় ফিরে আসে দ্রুত! বাষ্পভরা চোখ ও স্মৃতির ভিড় ঠেলে রাতের খাবারটুকু খেতে কষ্ট হয়। চোখের সামনে অজস্র ভাঁজ ভরা সেই মুখটা ভেসে বেড়ায়, ভেসে বেড়ায় শত শত আক্ষেপ! থেকে থেকে জাগে ছানি জড়ানো চোখজোড়া, চকচকে জল! থুবড়ে যাওয়া শুষ্ক চামড়ার সেই হাতটি মনে পড়ে, কতশতবার আশির্বাদের আলোকধারায় সৌরাংশুর মাথায় পরশ বুলিয়েছিল। কি মধুর সেই স্নেহ! এখনো ওর মনে পড়ে, শতবর্ষী চলেশ রিছিল বলেছিল,‘এই ভাওয়াল গড়ের আমিই সর্বশেষ সাংসারেক! বাকিরা সবাই হারিয়ে গেছে! বাকিরা সবাই নিরুদ্দেশ হয়েছে, বাকিরা বিলীন হয়েছে খ্রিষ্টান মিশনারিদের হাতে, সমাজপ্রভু বাঙালিদের হাতে!’

একটা মুখের পাশে আরেকটা মুখের ছবি উঁকি দিতে থাকে। সৌরাংশুর বুকের ভেতর উচ্চারিত হয় ‘পাথুরি’ নামটি। রাত বাড়তে থাকলেও ওর চোখে ঘুম নামেনি, স্মৃতির স্বরলিপিরা শালপাতার বর্ম ভেদ করে শীতের ভীরু রোদের মতো একটু একটু ঝিলিক দেয়, যতই বেলা গড়ায় ততই তীক্ষ্ন হয় স্মৃতিরশ্মির ছায়া। এক সময় ওরা স্পষ্ট হয়ে উঠে, সৌরাংশু কিছুতেই থামাতে পারে না স্মৃতির মিছিল, ঘুমাতে পারে না ক্লান্তি নিরসনে। নির্ঘুম স্মৃতির ঘোড়া তীক্ষ্ন খুরের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত করে চলে নিঝুম রাতের নিরবতা! সৌরাংশু ফিরে যায় পুরনো ক্যালেন্ডারের পাতায়, যেখানে কৈশোরকাল জ্বলজ্বল করছে স্মৃতির পরতে পরতে। ভেসে আসে গারো কন্যা পাথুরি রেমার মুখ! বুকের পাঁজর তীব্র দহনে পুড়তে থাকে! স্মৃতির লেলিহান শিখা ধিকিধিকি জ্বলে! পাথুরির মুখের পাশে মনে পড়ে আনন্দময়ী প্রকৃতিকন্যা রিংমি মঙসাংয়ের কথা! বসন্তদিনের নতুন শালপাতার মতো সুন্দর ছিলো ওর মুখের হাসি! মান্দি ভাষার বুলি, মুখস্থ ছড়াগুলো এখনো কানে বাজে! শালবনের ভেতর বর্ষাদিনে জমা বাইদ জমির কালো জলদর্পণে যেনো সেই শত শত চেনা মুখ জেগে ওঠে। রিহি, বুনো, লিয়া ও মেবুল আরো কত নাম! ওরা আছে? নাকি ওরা নেই! প্রশ্নটা জেগে উঠে কাঁটা ঘায়ের মতো! সৌরাংশু ঘুমুতে পারে না।

সৌরাংশুর পিতা সোহরাব চৌধুরী এক সময় ভাওয়াল বনাঞ্চলে গড়ে উঠা বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় প্রকৌশলী হিশেবে কর্মরত ছিলেন। তবে সর্বাধিক সময় তিনি আমেরিকান কোম্পানি ‘দ্য সুপার ড্রিম লিমিটেড’-এ কর্মরত ছিলেন। সাধারণ কর্মকর্তা পদে থেকেই দু-এক পার্সেন্ট শেয়ার ক্রয় করতে থাকেন এবং এক সময় দীর্ঘদিনের স্বপ্ন শতভাগ মালিকানাও তার কপালে জুটে। পিতার কর্মসূত্রে সৌরাংশুর বেড়ে উঠা শিল্প অফিসার কলোনিতে। আর এই কলোনির পাশেই ছিলো গারোপল্লী ও গভীর অরণ্যের প্রবেশদ্বার, যা সৌরাংশুর শৈশব-কৈশোরের সাথে মিশে আছে অবিচ্ছিন্নভাবে। পার্শ্ববর্তী একটি স্কুলে ওর বর্ণপরিচয় হাতেখড়ি, সেই সাথে পরিচয় ঘটে বহু সহপাঠি বন্ধুদের সাথে। এদের মধ্যে অধিকাংশই বাঙালি মুসলিম, তবে কিছু সংখ্যক গারো বালক-বালিকাও ছিলো। এসব গারোদের মধ্যে বেশির ভাগই ক্যাথলিক খ্রিষ্টান। কেউ ব্যাপটিস্ট খ্রিষ্টান, দুয়েকজন মুসলিম ও হিন্দু গারো। গারো কিশোরী পাথুরি ও শতবর্ষী চলেশ রিছিলের সাথে ওর এক নিবিড় প্রেম-আত্মীয়তা গড়ে উঠে!

সৌরাংশুর মনে পড়ে ঐ দিনটির কথা যেদিন প্রথম পাথুরির মাধ্যমে শতবর্ষী বনপুরুষ চলেশ রিছিল নামটির পরিচয় ঘটে। তখনো সে জানতো না এক বিস্ময়কর মানবের সাথে ওর মেলবন্ধন হতে চলেছে। চলেশ রিছিল নামের মানুষটি অন্য গারোদের চেয়ে একেবারে আলাদা! জীবনচিত্রই স্বনিয়ন্ত্রণাধীন! ঠিক স্রোতের উল্টো রথ! তখন সৌরাংশু স্কুলে ক্লাস নাইনে পড়ে। হেমন্তের এক দুপুরে সাইকেল নিয়ে ও উড়ালপঙ্খির মতো ছুটতে থাকে। ওর পায়ের চাপে অসহ্য প্যাডেল হয়ে উঠে দুর্বার, সাইকেলের চাকা নিরুদ্দেশ গতিতে ছুটে অরণ্যে। দু’পাশে ঘন গভীর বন, শালগাছের সাম্রাজ্য, তারই মাঝখানে রঙিন মাটির আলপনা আঁকা লকলকে বুনোলতার মতো কাঁচা মাটির সরু পথ। ঘাসগুল্মের ঝালর সাজানো মোহময় বাসর সৌন্দর্য পথিকের মন ও চোখকে অবাক করে দেয়। ভাবনার দোলাচালে ডুবতে থাকে কিশোর সৌরাংশু! চারদিকে স্বপ্ন ও বৃক্ষরাজির বিন্যাস সমাবেশ! দুচোখ লেপ্টে মিহি পরশ টোকা দেয় এই রাজ্যে। পাতার ফাঁক গলে ছুটে আসে রোদের চিড়ল হাসি। বনের নিজস্ব একটা ঘ্রাণ আছে, লম্বা নিশ্বাস টেনে সৌরাংশু সেই ঘ্রাণ উপভোগ করে। ওর কিশোর মন ভাবে মাটির কুঠুরিতে সঞ্চিত জল ও বৃক্ষদের জীবন সঙ্গমে এই ঘ্রাণের জন্ম! যে সঙ্গমের চিরসাক্ষী পাথুরি ও সৌরাংশু! স্বর্গীয় সুধা বহন করে এই সঙ্গম সুঘ্রাণ! অরণ্যে পাতাদের ভাষা কত নিভিড়! আচমকা হাওয়া এসে জাপটে ধরে, শিহরণ জাগায় শরীরে! হাওয়া তো নয়, যেনো চুমু, দু’গালে প্রেয়সীর মতো কোমল মায়া ছুঁয়ে দেয়! শোঁ শোঁ বাতাসের ছন্দে জাগে ঝিরিঝিরি পাতার বাদ্য! সৌরাংশু মুগ্ধতায় বিলীন হয় বার বার! অনেকটা পথ পেরিয়ে গেলে বাতাসের ছন্দে ভাটা পড়ে! তখন পাতার আড়ালে ঝিঁঝিদের সঙ্গীত চলছে, কান পেতে রাখা দুষ্কর! সেসব পাতার ভেতর থেকে হঠাৎ এক অরণ্যকন্যার চিৎকার ভেসে আসে, সৌরাংশু যাচ্ছিস কোথায়?
ব্রেক কষে থমকে দাঁড়ায় সৌরাংশু। গলার স্বর চিরচেনা, ওর দু’চোখ পাতাদের সংসারে খুঁজতে থাকে পাথুরিকে।
আবার শোনা যায়, ওই হ্যাবলা.. এই দিকে দ্যাখ!
সৌরাংশুর অনুসন্ধানী চোখে ক্লান্তি ও অস্বস্তি জমে, তবু সে পাথুরিকে খুঁজে পায় না। এক টুকরো শুকনো ডাল এসে পড়ে ওর সাইকেলের সামনে। খিলখিল হাসির শব্দে চমকে উঠে গোটা বন। সৌরাংশু দেখতে পায় শালগাছের মগডালে দু’হাত জড়িয়ে শাখা ডালে পা রেখে দণ্ডায়মান পাথুরি। সৌরাংশুর মনে জিদ চাপে। বলে, ঐ গাছের বাঁদর ওখানে কী করছিস? আর আমাকেইবা কেন থামালি?
হাস্যময়ী পাথুরি তরতর করে নামে। এলো চুলগুলো খোঁপা বেঁধে বলে, বললি না তো কই যাচ্চিস?
সেটা তোকে বলতে হবে কেন? এই ভরদুপুরে তুই এখানে কেনো পাথুরি?
ওরে শয়তান তুই শুনিস নাই, আইজ ভরদুপুরে পাথুরির বর মরেছে, তাই দুঃখে-কষ্টে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াই! আমার দুঃখে পাতারা কাঁন্দে, পাতাদের দুঃখে আমিও কান্দি! কানতে কানতে জঙ্গলে কান্নাকাটির মজবা জমাই.., জীবনে বরের বড় অভাব রে.. হা হা হা
কথাগুলো বলতে বলতে হাসির জোয়ারে নুঁয়ে পড়ে পাথুরি। সৌরাংশু কোনো প্রতিউত্তর করে না। সে পাথুরির এসব পরিচিত দুষ্টুমির ফাঁদ এড়িয়ে যেতে চায়। প্যাডেলে পা চালালেও সৌরাংশুর সাইকেল নড়ে না, পাথুরির শক্ত হাত ব্রেক চেপে রেখেছে। নিরুপায় সৌরাংশু নিশ্চুপ হয়ে পাথুরির দিকে তাকিয়ে থাকে। ওর ফর্সা মুখ, চ্যাপ্টা নাক ও কোঁকড়া চুলের বাহারে প্রকাশ পায় অদ্বিতীয় রূপ! এই গারো কন্যার ছোটো আকৃতির চোখ দুটি যেনো পৃথিবীর সকল সৌন্দর্যের আঁধার! সর্বক্ষণ মিষ্টি হাসি লেপ্টে থাকে ঠোঁট কোণে, রেগে গেলেও সে হাসি নিঃশেষ হয় না। ক্রোধ প্রকাশের আপ্রাণ প্রচেষ্টা করে সৌরাংশু, পারে না। অবশেষে আত্মসমর্পণকারী অপরাধীর মতো বলে, কি আমাকে যেতে দিবি না?
কে বারণ করেছে? যা না। তবে একটা কাজ করে দিতে হবে।
কী কাজ?
ঐ দেখ মাথার উপর শুকনো ডাল কটা পেড়ে দিতে হবে।
ওরে বাপুসরে এসব আমি পারবো না।
না পারলে সাইকেল নিয়ে যেতে পারবি না ব্যস!
ওই ডালগুলো তো তুই নিজেই ভেঙে নিতে পারিস, তবে আমাকে কেন জ্বালাচ্ছিস?
সেটা পরে বুঝবি। এখন গাছে উঠ।
ওদের তর্ক চলতে থাকে অনেকক্ষণ। পাথুরির জিদ সৌরাংশুর কাছে পরিচিত, সে আর কথা বাড়ায় না। সোজা গাছে উঠতে থাকে হার মানা সৈনিকের মতো। সৌরাংশু গাছে উঠার কায়দা কৌশল সবই শিখেছে পাথুরির কাছ থেকে। সেই ছোটোবেলা থেকে দেখে আসছে পাথুরি যতসব অভিনব চিন্তা ও কাজের অধিকারী। অন্য গারো মেয়েরাও বুদ্ধিমান ও চঞ্চল বটে, তবে এতটা নয়, যতটা পাথুরি। সৌরাংশু গাছে চড়ার চেষ্টায় পা ও হাতের বিদ্যেটুকু যতটা সম্ভব চালাচ্ছিল। তখন পাথুরি বনের ভেতর থেকে শুকনো পাতা ভর্তি বিশাল বস্তাটা টেনে নিয়ে আসে। যখন সৌরাংশু শুকনো ডালদুটো ভেঙে নিচে তাকালো তখন দেখেতে পায় পাথুরি পাতার বস্তাটা সাইকেলে চাপিয়ে ছুটছে।
সৌরাংশু চেঁচিয়ে বলে, ঐ পাথুরি আমার সাইকেল নিয়ে কই যাচ্চিস?
পাথুরি উত্তর দেয়, যাচ্ছি নারে। এখনই আসছি, তুই থাক। পাতাগুলো চলেশ ঠাকুর্দাকে দিয়ে চটজলদি আসবো।

বোকা সৌরাংশু সেদিন কিছুক্ষণের জন্য রাগে নির্বাক হয়ে যায়। দ্রুত গাছ থেকে নেমে আসে। একরাশ বিরক্তি ও রাগ নিয়ে গাছের গুঁড়িতে হতভম্ব হয়ে বসে থাকে। একটা সময় অপরাগ হয়ে সে পায়ে হেঁটে, টমটমে চড়ে কলোনিতে ফিরে যায়। ভাবে, পাথুরির ঐ ঠাকুর্দাটা কে? এতগুলো বছর ধরে পাথুরি ও তার পরিবারের সাথে সৌরাংশুদের পরিচয়। অথচ, এই ধরনের কাউকে তো সে চেনে না। এই প্রশ্ন ও কৌতূহলই সৌরাংশুকে পরে চলেশ রিছিলের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়।

পাথুরি বয়সে সৌরাংশুর চেয়ে তিন বছরের বড়ো। সৌরাংশু যখন ক্লাস ওয়ানে স্কুলে ভর্তি হয়, তখন পাথুরি ক্লাস ফোরের ছাত্রী। সৌরাংশুর মা সুরবানু বেগম পাথুরিকে অতি স্নেহ করতেন। পাথুরির গানের গলা চমৎকার, অন্যদিকে সুরবানুও ভীষণ গান ভালোবাসতেন, নিজেও গাইতেন। পাথুরিকে বাসায় ডেকে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান করতেন। বার বার চেষ্টা করতেন সৌরাংশুও যেনো গানে মন দেয়। কিন্তু তা পরে আর হয়নি। সুরবানু স্কুল শেষে সৌরাংশুকে বাসায় পৌঁছে দেবার দায়িত্বটা পাথুরিকে দেন। এছাড়া গাঁ থেকে ফুলের চারা, তাজা ফল ও সবজি কিনে আনার ভারটাও পাথুরির উপর। তাই ওর জন্য বরাদ্দ থাকত টাকা ও বিভিন্ন উপহার। সৌরাংশু পাথুরিকে নাম ধরে ডাকত বলে সুরবানু ভীষণ রাগ করতেন, কিন্তু ছেলের মুখ দিয়ে দিদি সম্বোধন কখনোই বের হতো না। প্রাইমারি স্কুলের গণ্ডি পেরোবার পর পাথুরির পড়াশোনা আর এগোয়নি। কিন্তু সুরবানু ও সৌরাংশুর সাথে তার গড়ে উঠা সখ্য রয়ে যায়। বড়দিন ও অন্যান্য উৎসবে সৌরাংশু ও সুরবানু অনেকবার পাথুরিদের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছে। পাথুরিদের প্রাণঢালা আপ্যায়নে মুগ্ধ হতো ওরা। পুঁটি মাছের শুটকি দিয়ে রান্না করা ‘নাখাম কারি’ নামক খাবারের স্বাদ সৌরাংশু ভুলতে পারে না। এছাড়া কচি বাঁশে গুঁড়ি দিয়ে রান্না করা ‘মেওয়া’ নামের অমৃত যেনো ভুলতে না দেবার প্রত্যয় নিয়েই তৈরি হয়। পাথুরিদের ছন্নছাড়া জীবন, অভাব-অনটনের চালচিত্র, স্যাঁতস্যাঁতে ঘর-সংসার দেখে সৌরাংশুর ভীষণ দুঃখ হতো। দুঃখ হতো সুরবানুরও। তিনি একবার নিজেই উদ্যোগ নিয়ে কিছু টাকা ব্যাংক ঋণ তুলে পাথুরির মা আন্না রেমাকে অফিসার কলোনির শেষ প্রান্তে ক্যাথলিক চার্চের পাশে একটা টঙ দোকান কিনে দেন। সেখানে শাক-সবজি, ফল-মূল বিক্রি করত ওরা। সৌরাংশু প্রতিদিন স্কুলে যাবার পথে দেখতে পেত পাথুরির বাবা পীরেন সাঙমা দোকানে বসে ঢুলছে। বাবার বিরুদ্ধে পাথুরির একগাদা অভিযোগ ছিলো। বিশেষ করে, মদ খেয়ে মাতলামি করা ও আলসেমিতে ডুবে থাকা। গোটা সংসারের দায় পড়ত পাথুরির মা আন্না রেমার উপর।

সৌরাংশুর মধুর স্মৃতিময় শৈশব ও কৈশোরে সবচে প্রভাব বিস্তার করেছে পাথুরি। মেঘ-বৃষ্টি-জলের মতো বিচিত্রময় সে গল্প। পাথুরি শুধু একটি নাম নয়, অজস্র বিকেল-দুপুরের গুচ্ছ গুচ্ছ হাসি-আনন্দ নিশ্বাস! এই মনোহর বন-বৃক্ষরাজির সাথে সৌরাংশুর পরিচয় এই গারো বালিকার হাত ধরে। সারি সারি শালগাছের আনাচে-কানাচে নানা নামের লতা-গুল্মের বাস! সেসবের নাম একটা একটা করে পাথুরি সৌরাংশুকে বলেছিল, চিনিয়েছিল, শিখিয়েছিল। বলত, শালগাছ জড়িয়ে থাকা আসামলতা, হিংলো লতা, বেত, অনন্তমূল ও বনবরইদের মাঝে গড়ে উঠেছে প্রেম প্রেম খেলা! এই খেলার মাঝে যে লাজুকতা লুকিয়ে আছে, তা সৌরাংশু স্পষ্ট বুঝতে পারত, তাই তো সে নিশ্চুপ থাকত। কেবল, মনের ভেতর পুষে রাখত মিটিমিটি হাসি। আর বালকত্বের চাদর ঠেলে সদ্য উঁকি দেয়া কৈশোরের ভাবলেশ লুকানোর চেষ্টা করত। তবু মাটি ফুঁড়ে বের হওয়া অঙ্কুরের মতো কৌতূহল দমে থাকতে চাইত না। অজানা আকর্ষণের খেলা হাতছানি দিয়ে ডাকত। পাথুরির চিরচেনা হাসি মুখ বুনো ঐশ্বর্যের অচেনা রূপকে সৌরাংশুর কাছে যখন পরিচিত করে তুলতো, তখন সে নিজেকে ভাবত ভিনদেশি পর্যটক। আর অচেনা পর্যটকের নিষ্ঠাবান নিরাপত্তা প্রহরী যেন পাথুরি!

একবর্ষায় পাথুরি সৌরাংশুকে পরিচয় করিয়ে দেয় বনহলদি ফুলের সাথে! সুন্দর আলপনা আঁকা বিচিত্র রঙের মিশেল সেখানে। পাথুরি বলে,‘জানিস আমার দাদার বিয়ের সময় আমরা এইফুল দিয়ে মুকুট সাজিয়ে ছিলাম। সে মুকুট দাদা মাথায় পরে। বউদিকে আমরা আমরা কত যত্নে বরণ করেছি! তারপর কী হলো জানিস?’
কী করে জানব? বল না।
দাদাকে নিয়ে যখন বউদিরা চলে যাচ্ছিল তখন শীতলক্ষ্যায় ওদের নৌকা ডুবে যায়! আর সবাই জলে ডুবে, কেউ বাঁচতে পারে না।
কথাগুলো বলতে বলতে পাথুরি চোখ মুছে। সেদিন সৌরাংশু বুঝতে পারে না, কীভাবে পাথুরির মন ভালো করবে। খুঁজতে থাকে আনন্দ প্রাপ্তির কোনো উপায়। সৌরাংশু বলে, চল পাথুরি, বনহলদি ফুল দিয়ে তোকে বউ সাজিয়ে দেই।
পাথুরি নিশ্চুপ তাকিয়ে থাকে। সৌরাংশু একগুচ্ছ ফুল তোলে এনে বলে, এগুলো দিয়ে তুই সাজবি, কান্নাকাটি একদম ভালো না।
পাথুরি বলে, আরে বোকা বনহলদি দিয়ে বরের মুকুট সাজানো হয়। কনেরা কাঞ্চনফুল দিয়ে সাজে। আয় তোকে বর সাজিয়ে দেই।
সৌরাংশু পাথুরির মন ভালো করতে পেরে আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে বলে, ঠিক আছে তাই হবে। সাজিয়ে দে..

বুনোলতায় বনহলদি ফুলের ডাঁটা বেঁধে সৌরাংশুকে পরিয়ে দেয় পাথুরি। অন্যদিকে পাথুরি থোকা থোকা কাঞ্চনফুল চুলের ভাঁজে গুঁজে নেয়। সৌরাংশু হাসতে থাকে অপরিণত কৈশোরের তীব্র আনন্দে। বাইদ জমির অদূরে একটি ভাঙা নৌকা স্থলে পড়ে থাকতে দেখে পাথুরি বলে, এই হ্যাবলা ঐ নৌকায় চল, ওখানে আমরা বর-বধূ খেলি!
তারপর কি ডুবে নৌকা মরবো?
মরবো কেন? ওখানে তো পানিই নেই।

এক অজানা ইচ্ছা সৌরাংশু ঠেলে দিচ্ছিল, অন্যদিকে ভীতি আশঙ্কা ওকে নিষেধ করছিল, মনের ভেতর যেনো চলছিলো দু’পক্ষের চরম লড়াই। এক সময় অজানা ইচ্ছাই জয়ী হয়! পাথুরিকে সৌরাংশু নতুন রহস্যে আবিষ্কার করে। চুমু ও স্পর্শের সিক্ততা যে বীজগণিতের সূত্রকে মিথ্যে প্রমাণ করতে পারে তা সে জানত না। তপ্ত নিশ্বাসের তীব্রতা যখন পুড়িয়ে দিচ্ছিল বন, তখন সৌরাংশ ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে ছিটকে পড়ে অদূরে ঘাসের বিছানায়। না! এ এক ভয়ানক খেলা! শ্বাসরুদ্ধকর খেলা! জড়াজড়িতে কাঁচাপ্রাণ কচলে নিষ্পেষিত হবার ভয়সুখ। সৌরাংশু নিজেকে বাঁচাতে উঁচু লয়ে নিশ্বাস নেয়। কেটে যায় অনেকক্ষণ! কামার্ত পাথুরির ভেজা চোখে আকুতি! বার বার বলে, আয় না আর একবার.. খেলি!
সৌরাংশু অনড়, না সে আর এই বর-বধূ খেলার ফাঁদে পা দেবে না। লজ্জ্বায় দু’চোখ জ্বলে যায়। বুকের ভেতর প্রশ্বাস রোধ হয়ে আসে, যেভাবেই এই খেলায় ভঙ্গ দিতে হবে! পাথুরির নিরীহ চোখের দিকে সৌরাংশু তাকিয়ে বলে, তুই তো সেদিন জারুলফুলের কথা বলেছিলি, সেগুলো আজ দেখাবি না?
চোখের সামনে হেলে পড়া এলোচুল সরিয়ে পাথুরি বলে, দেখাবো তো, আয় আর একবার করবো আমরা!

সৌরাংশু আর কথা বলে না। সটান দাঁড়িয়ে এগোতে থাকে। পেছন থেকে পাথুরি ছুটে এসে সৌরাংশুকে জড়িয়ে ধরে বলে, আজ তোকে কাঞ্চনফুলের দরবারে নিয়ে যাবো। দক্ষিণের শেষে অনেক ফুল...! আরো আছে মেটেআলু.. সেগুলো তুলবো। এই মেটেআলুর ভর্তা ভীষণ স্বাদের জানিস তো? কেবল আর একটিবার..

অজানা আকর্ষণ-বিকর্ষণের খেলার সূত্র ধরে ওদের দস্যি দুপুরগুলো আজো উঁকি দেয় সৌরাংশুর মর্মে! বনভূমিতে শুকনো পাতার মর্মর ধ্বনি তোলে পা ফেলতো ওরা, পরিচয়ে একজন বাঙালি অন্যজন গারো। মর্মর ধ্বনি শুনতে পেত না, ভাওয়াল রাজত্বের আদি পুরুষেরা, তারা ঘুমিয়ে আছে মাটির গহ্বরে! স্রোত পাল্টে ভিন্ন বিকাশে প্রস্ফুটিত সবকিছু। সময়ের ব্যবধানে সংকুচিত আজ গারো সম্প্রদায়, অথচ একদিন ওরাই এই বন্য পরিবেশের ধারক ও বাহক ছিলো।

বনের কোন প্রান্তে জারুলফুল, কাশফুল, ভাঁটফুল, কাঞ্চনফুল ফুটে সেসব কেবল পাথুরিই ভালো জানত। ওরা একবার গহীন বনের অচেনা পথ ধরে খুঁজে পায় তেতোজাম ও চুটকিফলের বাগান। এই বাগান দেখিয়ে পাথুরি সৌরাংশুকে বলে,‘এই বাগানের আসল মালিক এই জঙ্গলের পাখিগুলো। ওরা দূর-দূরান্ত থেকে ফলের বিচি এনে এই জমিতে ছড়িয়ে দিয়েছে, তাতেই এমনি এমনি চাষ হয়ে গেল।’ অরণ্য ঐশ্বর্যের আরেক রাজ্য হলো জলের নিচে। বর্ষায় কোন কোন বাইদ জলাভূমিতে শিং-ট্যাংরা মাছ কিংবা কচ্ছপের ঝাঁক খেলা করে তা পাথুরির মতো খোঁজ কেউ-ই রাখতো না। ওর দুরন্তপনা ও চঞ্চলমতি মনের বিচিত্র রূপ-রহস্যের খেলা যতই দেখত ততই ভালো লাগত সৌরাংশুর। ওর কাছে পাথুরি ছিলো এক বিস্ময়কর মহাজ্ঞানী মানুষ। প্রকাশ্যে পাথুরির প্রতি কম-বেশি জিদ, বর-বধূ খেলায় আপত্তি দেখালেও সৌরাংশুর মন ওর প্রতি ছিলো বরাবরই অনুরাগী।

পাথুরি ও সৌরাংশুর অবাধ দস্যিপনায় সুরবানু কখনো বাধা দেয়নি। কিন্তু সোহরাব চৌধুরী গারো মেয়ের সাথে ছেলের ঘোরাফেরা পছন্দ করতেন না। সুরবানুকে বলতেন, তুমি ছেলেটার ফিউচার নিয়ে ভাবো না! কতবার বলেছি ওকে ঢাকায় পাঠিয়ে দেই হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করুক, শুনলে না। ভর্তি করারে থার্ড ক্লাসে একটা স্কুলে, ছেলেকে নিজের কাছে রাখবে! অতি স্নেহ আদরে আজ সে বাঁদর হতে চলল!
সুরবান প্রতিউত্তর করতেন, এখানে বুঝি পড়াশোনা হচ্ছে না?
হচ্ছে, তবে সেটা খুবই নিচু মানের। পড়াশোনাটা ইংলিশ মিডিয়ামে হলে বিজনেসটা ধরতে পারতো, সবধরনের সিরিয়াস ড্রিল তো বিদেশিদের সাথেই করতে হবে।
সুরবান বলেছিল, ছেলেটা কি তোমার মতো ইঞ্জিয়ার আর বিজনেসম্যান হতে চায়?
তখন সোহরাব চৌধুরী ক্রোধে জ্বলতে জ্বলতে বলে, তুমি কি ওকে কুয়োর ব্যাঙ বানাতে চাও?
সুরবান শুধু একটা কথাটাই বলে, ওকে আমি কোনো কিছু চাপিয়ে দেবো না। ওর যা ভালো লাগবে তাই নিয়ে সে বড়ো হবে।

রাতারাতি ধনী বনে যাওয়া সোহরাব চৌধুরীর মধ্যে নব আভিজাত্যের অহংকার বরাবরই দেখা যেত। তিনি চাইতেন ছেলে তার চাইতেও বড় হবে, টাকার কুমিরের মতো জীবন গড়বে। সোহরাব চৌধুরীর বুদ্ধি, পরিশ্রম ও আয়ের জোরে কর্মজীবনের তিন বছরের মধ্যে ‘দ্য সুপার ড্রিম লিমিটেড’ কোম্পানির পঁচিশভাগ মালিকানা ক্রয় করে নিয়েছিল। পরবর্তী পাঁচ বছরে তিনি শতভাগ মালিকানা লাভ করেন। আর এই মালিকানা অর্জনের সাথে জড়িয়ে যায়, গারোপল্লীর মানুষের ভাগ্য ও নির্মমতা! এসবের কিছুই বুঝতো না জানতো না সৌরাংশু। সে কেবল স্কুলের রুটিন পেরিয়ে ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসত।

ছুটির দিনে এক সকালে পাথুরি বনের ভেতর হেঁটে গাছগুলোর নানা নাম সৌরাংশুকে শুনাতে থাকে। বলে, শোন হ্যাবলা, মানুষকে যেমন নাম ধরে ডাকলে সাড়া দেয়, ঠিক তেমনি গাছকেও নাম ধরে আদর করে ডাকলে সাড়া দেয়।
সৌরাংশু হাসে। বলে, গাছ কখনো ডাকলে সাড়া দেয় নাকি?
পাথুরি বলে, হ্যাঁ নিশ্চয়ই দেয়। ঐ গাছটার নাম কুম্ভি..। ওরে কুম্ভি.. কেমন আছিস?
প্রশ্নটা করে পাথুরি একটু থেমে থাকে। তারপর বলে, ঐ যে গাছটা বলছে, ভালা নেই। এইবার বৃষ্টি না হলে আর ভালা থাকা হবে না।
সৌরাংশু কিছুই বলে না। ধ্যানমগ্নের মতো পাথুরির দিকে তাকিয়ে থাকে।
সৌরাংশুর নিরবতা ভেঙে পাথুরি বলে,‘এই দ্যাখ এটার নাম সোনালু, ওটা নেওড়, ওপাশেরটা কানাইডাঙ্গা। ভেতরে গজারি গাছের সাথে হিজল, জলপাই, কদম আর জামগাছ বেশি! আর এখানে কম আছে নাগেশ্বর, খাড়াজোড়া, গামার। এই গাছগুলা ঘুরতে ফিরতে দু’চারটে দেখা যায়।’
পাথুরির কথা শুনতে শুনতে সৌরাংশু হাঁটতে থাকে। হঠাৎ ওরা বনের ভেতর অনেকগুলো বানরের চেঁচামেচি শুনতে পায়। ওরা বানরের আস্তানার দিকে এগোয়। দেখতে পায়, অগণিত লটকন গাছ ঘিরে ওদের মেলা বসেছে। মনের সুখে কাঁচা-পাকা লটকন খাচ্ছে, ডাল নেড়ে ফেলছে। পাথুরি বলে, দাঁড়া, ওদের তাড়িয়ে কটা লটকন নিয়ে আসি।
সৌরাংশু ভয়ে সন্ত্রস্ত! বানরগুলোর দাঁত খিঁচানো দেখে ওর বুক ধড়ফড় করে।
পাথুরির চিৎকার করে এক ধরনের শব্দ ছড়িয়ে দেয় বনে। তখন বানরগুলো নিস্তব্ধ হয়ে যায়। এক এক করে ওরা পিছু হটতে থাকে। দুরন্ত কাঠবেড়ালির মতো তরতর করে গাছে চড়ে পাথুরি, ডাল নেড়ে বৃষ্টির মতো লটকন ফেলতে থাকে। সেগুলো কুড়াতে ক্লান্ত হয়ে যায় সৌরাংশু!

পাথুরির মুখে এতগুলো গাছের নাম শুনে ও বানর তাড়ানো কৌশল দেখে সৌরাংশু অবাক হয়। বলে, আচ্ছা, তুই এতো কিছু জানিস কী করে? তোদের গারো পাড়ার অন্যরা তো এতো কিছু জানে না, বলতেও দেখি না। ওদের হাবভাব তো সাধারণ বাঙালিদের মতোই, তুই কেবল আলাদা!
সৌরাংশুর কথা শুনে পাথুরি হাসিতে ঢলে পড়ে বাঁধহীন স্রোতের মতো। বলে, সবই শিখেছি চলেশ ঠাকুর্দার কাছে।
সেটা আবার কে?
সেদিন তোর সাইকেল বাগিয়ে চলেশ ঠাকুর্দার ঢেরায় গেছিলাম। মা আদেশ করছে, জঙলার পাতা-লাকড়ি দিয়া আইতে হইবো। একশো দুই বছর বয়স চলেশদার। তাও কত্ত বল শরীরে। একলা থাকে একলা খায়! সাথে কেবল ছোট্ট রিংমি..
অবুঝ বালকের মতো সৌরাংশু অবাক হয়ে শুনে। ওর মনে হয় কোনো এক সন্ন্যাসীর গল্প শুনছে।
ঐ লোকটা তোর ঠাকুর্দা?
না।
কে তবে?
কেউ না। কিন্তু মা চলেশ ঠাকুর্দাকে অনেক মান্যি করে। আমার মাকে ঠাকুর্দা একবার অসুখের হাত থেকে বাঁচিয়েছে। তারপর মা ঠাকুর্দাকে বাপের মতো পুজা করে।
আমাকে নিয়ে যাবি ঐ লোকটার কাছে? দেখব উনাকে।
পাথুরি মুচকি হেসে বলে, চল না একদিন। তবে চলেশদা বাইরের মানুষদের সাথে কম কথা বলে। উনি গারো বলিস আর বাঙালি বলিস কাউকে পাত্তা দেয় না। এক্কেবারে কতা কইতে চায় না। একা চুপচাপ থাকে।
কথা বলবে না আমার সাথে?
তোর কথা আমি বুঝিয়ে বলব। তখন ঠিক বলবে। আর যদি একেবারে নাই বলে, তবে চুপটি করে থাকবি। আজকেই চল না ঠাকুর্দাকে কটা লটকন দিয়ে আসবো।

পাথুরির সম্মতি পেয়ে সৌরাংশু প্রজাপতির মতো ছুটে যায় কলোনিতে, প্রিয় সাইকেলটি নিয়ে আসে। পাথুরি ড্রাইবিং সিটে চেপে বসে, পেছনে বসে চির পর্যটক সৌরাংশু। কিশোরীর মাথার চুলের সিঁথির মতো আঁকাবাকা পথ পেরিয়ে গভীর বনে যায় ওরা। দেখতে পায় একটি একটি চিকন খাল কোমর দুলিয়ে নাচতে নাচতে মিশেছে ছোটো হ্রদে! টলমলে পানি! পাথুরি বলে, এটাকে আমরা বড়পুষ্কুনি বলি! চলেশ ঠাকুর্দা বলেছে, এত্ত বড় পুষ্কুনি জগতে আর নেই! এটা এই গড়ে দেবতারা কেটে দিয়েছে মান্দিদের পানির অভাব দূর করার জন্য!
সৌরাংশু একবার চারদিক অবলোকন করে নেয়। হ্রদের ঠিক এর পাশে একটি জীর্ণ-শীর্ণ কুটির ও অপর প্রান্তে কিছুটা খালি মাঠ, তারপাশে আখখেত! কুটিরের পাশে এক বৃদ্ধ সবজি খেতে খুপরি নিয়ে কাজে ব্যস্ত! পাশেই এক পাল শুয়োর কাঁদাজলে মাছি তাড়াচ্ছে। রোদের আঁচ ঠেকাতে চোখ ও কপালে উপর হাতের ছায়া রেখে ওদের দিকে তাকায় চলেশ রিছিল। এক মুহূর্ত অবলোকন করে তিনি হেসে মান্দি ভাষায় বলেন, পাথুরি.. কেবল আছিস লো? এই খোকা কে?
পাথুরি বাংলায় বলে, দাদু ওর নাম সৌরাংশু। অফিসার কলোনিতে থাকে। ওর বাবা এখানকার বড়ো মিলের এঞ্জিনিয়ার!
কথাটা শুনে চলেশ রিছিল বুঝতে পারার ইঙ্গিত দিয়ে মাথা নাড়েন। বাংলাতে বলেন, এই জঙ্গলে কেন এলি বাপ?
সৌরাংশু হেসে বলে, পাথুরি আপনার কথা বলেছে, তাই আপনাকে দেখতে এলাম। আমিও পাথুরির মতো গাছের নাম শিখবো দাদু।
চলেশ রিছিল হেসে বলেন, বাহ্ ভালো কথারে। কতশত নামের গাছ আছিন, সব তো আর নাই। কত জীব-জন্তু আছিন, সব বিলীন! কত রঙের মানুষ আছিন, সব ফুরায়া যাইতেছে রে বাপ!

পাথুরি চলেশ রিছিলের বারান্দায় থাকা একটা ঝুড়িতে লটকনগুলো রেখে বলে,‘দাদু এগুলো তোমার জন্য!’ চলেশ রিছিল ঘর চাটাই এনে বারান্দায় ওদের বসতে দেন। কিছু ফল সামনে দিয়ে চলেশ হুক্কায় তামাক টানতে টানতে বলেন,‘এইগুলা খা তোরা! আমার কাছে খাওয়ানির মতন আর কিছু নাই রে।’
কিছু সময় পর চুলা থেকে পোড়া মেটেআলু তুলে এনে বলেন,‘এই পোড়া চিজ, নুন লাগায়া খাইতে বহুত স্বাদ লাগেরে।’ চলেশ মেটেআলু খেতে খেতে আরো বলেন,‘বহুদিন যাবৎ সুখ-শান্তির অভাবে আছি। এই জংলাতে আমরা খাদংআনি মান্দিরাং (আশা ভরা মানুষের পাল) নিয়া বাঁচতাম। ঐ মান্দিরাং (মানুষেরা) এখন আর নাই। কথাটা বলেই বৃদ্ধ কান্নাভেজা কণ্ঠে গান গাইতে শুরু করেন,‘দিন ফুরাইলো, শান্তি গেলো ফুরাইয়া, কই ফুরাইলো খাদংআনি মান্দিরাং উইড়া,
......কত্ত মান্দি বিদায় নিলো, বুরুং বহুত কষ্টে কান্দে বছর বছর ধইরা!’
পাথুরিও সাথে গলা মেলাতে থাকে। প্রথম গানটা শেষ করে চলেশ রিছিল নতুন গান ধরেন,
‘চন্দ্র-সুরুজ নিয়া বুকে.. বেশ তো আছিস মনের সুখে...’
গানের সাথে যোগ হয় শালপাতার বাঁশি! সৌরাংশু মুগ্ধতায় হারিয়ে যায়। যেখানে পাথুরি ভয়ের আঁচ দিয়েছিল সেখানে এক চমৎকার শতবর্ষী মানুষের সাক্ষাত পেল সে। কৌতূহল জড়ানো শত প্রশ্ন মনের ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছিল। এক এক করে নানা কিছু জানতে চায় সে। চলেশ রিছিল মনের ভেতর মমি করে রাখা স্মৃতি, পূর্বপুরুষ ও সাংসারেক জীবনের বর্ণনা দিতে থাকেন। বলেন, ‘প্রকৃতিই শান্তি!’
প্রকৃতি পূজারী চলেশ রিছিল জানাতে থাকেন অপরিসীম দুঃখবোধের কথাগুলো। ভাওয়ালগড়ের গারোরা লোভে পড়ে স্বধর্ম ও সংস্কৃতি ত্যাগ করে বিদেশি খ্রিষ্টানদের ফাঁদে পা দিয়েছে। আজ সাংসারেক বলতে এই বনে কেবল চলেশ রিছিল-ই একমাত্র বেঁচে আছেন। আর আছে তার এক কুড়িয়ে পাওয়া শিশুকন্যা!
সৌরাংশু চলেশ রিছিলের বাংলা ও মান্দি ভাষায় মিশ্রিত কথা কষ্ট হলেও বুঝতে পারছিল। কখনো কখনো পাথুরি পুনরায় বুঝিয়ে বলে। ধর্মান্তরিত খ্রিষ্টান গারোদের প্রতি যে চলেশ রিছিলের ভীষণ অভিমান তা স্পষ্ট প্রকাশ পায়। আর এই অভিমান থেকেই একাকি বসবাস! চলেশ রিছিল বলেন,‘আমার মায়ের মা আছিন লবণলং পাড়ের সর্দারনি। ছোটোবেলায় কত দেখছি, বেবাকতে মিল্লা জংলি শুয়োর মারতাম। আর বড়ো বড়ো বাঘ খেদাইতাম!’
চলেশ রিছিলের মুখ থেকে বাঘ শব্দটি শুনতেই সৌরাংশু চমকে যায়, ভাবতেই ভয় হয় এই বনে বাঘ আছে। কিন্তু কখনো তো চোখে পড়েনি। ঠিক তখনই বাঘের গর্জন শোনা যায়। শব্দটা আসছিল, চলেশ রিছিলের ঘর থেকে। সৌরাংশুর মুখ শুকিয়ে যায়। পাথুরি বলে, ভয় নাই। এই বাঘ কামড় দেয় না রে, চলেশদার পোষ মেনেছে।
চলেশ রিছিল হেসে বলেন, ডরাও কেন? আগের সেই বড়জাতের বাঘ এখন পুরা ভাওয়ালগড়ে একটাও নাই। মানুষে সব খতম করে দিছে। সোনা রঙের বান্দরগুলাও নাই হইয়া গেছে।
বেড়ার দরোজা ঠেলে বন্যপ্রাণিটিকে দেখিয়ে বলেন, এই বেচারা মেছোয়াবাঘ। মাছ খাইয়া, খরগোশ, ছাগল-মুরগি খাইয়া বাঁচে। মাইষ্যেরে কামড়াইতে সাহস করে না। এই হতভাগারাও কমতে কমতে শেষ হইয়া যাইতেছে। কয়েক বছর আগে, জঙ্গলে পথের ধারে পইড়াছিল। বুনবিলাইয়ের বাচ্চা মনে হইছিল, তাই ঘরে আনি। বড়ো হওয়ার পর আসল জাতের পরিচয় মিলছে। শইল্যে দাগ-রেখা জন্মলিছে।
সৌরাংশু ও পাথুরিকে নিয়ে চলেশ রিছিল ঘরে প্রবেশ করেন। বলেন,‘এই অবলা প্রাণিগুলা বড়ই ভালা কিসিমের। মানুষের লাহান কাউরে খেতি করে না।’ মেছোবাঘটি অচেনা আগুন্তক পাথুরি ও সৌরাংশুর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে ঘর থেকে দৌড়ে বেরিয়ে যায়। এবার চলেশ রিছিল লাঠিতে ভর দিয়ে ঘর ছেড়ে বের হোন। তিনি ওদের হ্রদের পাশে হাঁটতে নিয়ে যান। আর প্রকাশ করতে থাকে জমানো কথার ফুলঝুরি। হাতের আঙুল উঁচিয়ে বলেন,‘ঐ যে উখখেত দেখতি পারছিস, ওইগুলো গাছ বিনাশ কইরা তৈয়ার করছে। এই লবলং খালটারে চিপে মারতেছে।’
সৌরাংশু সাইনবোর্ডের লেখা দেখে বুঝতে পারে এটা কৃষি গবেষণার একটি এক্সপেরিমেন্ট প্রজেক্ট! কিন্তু প্রজেক্ট করতে গিয়ে খালের দশা করুণ করে তুলেছে। পাশেই একটি বিশাল খালি মাঠ, এই মাঠ যে বৃক্ষনিধনের মধ্য দিয়েই তৈরি হয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
চলেশ রিছিল জানায়, কীভাবে খ্রিষ্টান মিশনারিরা এসে গারোদের সরলতাকে পুঁজি করে ওদের ধর্মান্তরিত করেছে। ঋণদান সংস্থার ফাঁদে পড়ে কতজন বাড়ি-ঘর হারিয়েছে। এক সময় চলেশ কাঁদো কাঁদো হয়ে বলেন কীভাবে দেশি-বিদেশিরা ওদের পূর্বপুরুষদের ভিটে থেকে গারোদের নানা কৌশলে তাড়িয়ে সেখানে কলকারখানা তৈরি করেছে। বসত হারানোদের অন্যপ্রান্তে কিছু বাড়ি-ঘর তৈরি করে দিয়েছে বটে, কিন্তু সর্বনাশের যে সূত্রপাত হয়েছে তা আর থেমে নেই। এইসব কারখানার কেমিকেল, ময়লা-আবর্জনা ছড়িয়ে পড়ছে সবখানে। দুর্গন্ধ সবখানে। নদী, খাল, বিল, বন ও ধানী জমি কোনো কিছুই রক্ষা পাচ্ছে না এই বিষাক্ত ছোবল থেকে। চলেশ রিছিল একটা শালগাছকে জড়িয়ে দূরের বনের দিকে আঙুল উঁচিয়ে বলেন,‘আবিমা! (মান্দি শব্দ) এই জংলা এই ভাওয়ালগড় আমগোর আবিমা, মাটির মা। এই মা যদি মরে যায় সন্তান কি বাঁচবে? আমগোর গ্রিমসিসি বুরুং (গভীর বন) জান-গতর খাওন-দাওন সব রক্ষা করে। এইসব বুরুং সেক্রেড (বন পবিত্রভূমি)! এই বনে শালগাছের সাথে কত ধরনের ছোটো-বড়ো গাছ পাওয়া যাইত আজ সব বিনাশের পথে!
চলেশ রিছিল হাতের আঙুলের দাগ গুনে গুনে বলেন, টেন্ডু, বহেরা, আয়েন, হেতাল, কুর্চি, হরগোজা, তিতরাজ, নীল নিশিন্দা, লক্ষ্মী আম, খামু, বৈলাম এইসব গাছ এখন আর চক্ষে দেখি না!
সৌরাংশু কথাগুলো নিশ্চুপ শোনে। পাথুরি বলে,‘ভোঁদড়ের কথা বলো না কেন? ভোঁদর তো নাই।’
চলেশ রিছিল শুষ্ক হাসি টেনে বলে,‘ভোঁদড়ের পাল দিয়া লবলং গাঙে-খালে মাছ ধরতো জেলেরা। এহন ভোঁদড় নাই, নদী নাই, জল নাই, মাছ নাই, কিচ্ছু নাই! যা আছে তাও থাকবো না।’
সৌরাংশুকে চলেশ রিছিলর হাত উঁচিয়ে দেখিয়ে বলে ঐ দূরের মাঠে কোন সীমারেখায় নদী প্রবাহিত হতো, যা এখন অলীক স্বপ্ন হয়ে মরে আছে। হারিয়ে যাওয়া আরো বহু গাছের নাম, পশু-পাখির নাম তিনি দুঃখ মাখা নিশ্বাসে বলেন।
সৌরাংশু জানতে চেয়ে বলে, দাদু, তোমার বাবা-মা ভাই-বোন কেউ নেই কেন?
শতবর্ষী হেসে বলেন, ছিলোরে বাপ, সবই ছিলো! সবই মরলো একটা একটা কইরা! জাপানি বোমায় ঠাকুর্দা মরলো। ঠাকুর্দা বাড়ি আছিন নেত্রকোনার হাওর পাড়ে। তারপরে চার ভাই মরলো, কালাজ্বরে। আমার সর্দারনি মা মরলো শিকারে গিয়া, বাঘের কামড়ে। আমাগোর গারো জাতে মা সবার প্রধান। এই জন্যি, মা সর্দানি হইছিন। আগে আমাগোর জাতে খামাল (ধর্ম পুরোহিত) আছিলো। আমার বাপের ঠাকুর্দা খামালি করত। পুজা-পার্বণে অনেক নিয়ম মান্য করে চলত। পুজাতে ভুল হইলে বহুত মাশুল দিতে হইতো। এহন কেহই তো কেউ খামাল হয় না, কিছুই নাই! আমরা সাংসারেকরা প্রকৃতির প্রেমে মশগুল হইতাম। জানিস বাপ, সহনশীল হইয়াই মূল কথা! আত্মশুদ্ধির লাগি প্রত্যেক বছর খামালের সামনে নিজেদের দোষ-পাপ স্বীকার করতো সবাই, তারপরে স্নান কইরা পবিত্র হইতো। বেবাকতের প্রতি ক্ষমা করা আর ঘৃণা না করাই শুদ্ধির পথ!

চলেশ রিছিল আরো বলেন,‘বুঝলি বাপ, আদিতে গারো মান্দি গোষ্ঠীর পাঁচটি দল আছিন। সাংমা, মারাক, মোমিন, শিরা আর আরেং। অনেক রকম বংশ পদবি আছিন রেমা, মৃ, ম্রং, নকরেক, দারু, দারিং, সিমসাং, মানখিন, কুবি, দালবৎ আরো কতশত..! এত সব এহন আর মুনে নাই। বাপ-দাদারা ভালো জানে। হেরা তো মইরা গেছে।’

শতবর্ষীর কথা কেবল বাড়তেই থাকে, তবু ফুরাতে চায় না। এদিকে দুপুর ফুরিয়ে বিকেল গড়ালো। সৌরাংশু বলে, দাদু, আজকে বিদায় নিবো আবার আসবো।
চলেশ রিছিল শেষে বলেন,‘ঠিক আছে বেটা। আমি এই ভাওয়াল গড়ের শেষ সাংসারেক মান্দি (সাংসারেক মানুষ)। বাকি গারোরা পরিচয় খুইয়েছে। এবার ওরা জীবনও খুঁইয়ে দেবে। এই জংলা বুরুং ধ্বংস হইলে মান্দিরা সবাই ধ্বংস হইবে। এই দুখ নিয়া আমার দিন যায় রাইত পোহায়।’

বৃদ্ধার ঢেরা থেকে ফেরার সময় ওরা একটি ছোট্ট মেয়েকে দেখতে পায়। শুকনো শালপাতা, পেঁপে ও মেটেআলু নিয়ে ফিরেছে। মেয়েটির বয়স সাত-আট বছর দেখতে গারোদের মতো নয়, একদম বাঙালি চেহারা, গায়ের রঙ শ্যামলা, উঁচু নাক, ভাসা ভাসা চোখ। মেয়েটিকে দেখেই পাথুরি মান্দি ভাষায় বলে, রিংমি.. কত বেলা হলো এলাম তোর খোঁজ নেই একদম।
রিংমি শালপাতার বোজা নামিয়ে মান্দিতে বলে, আজ ভীষণ কাজ করে এলাম দিদি।
পাথুরি মুচকি হেসে বলে, অনেক বেলা হলোরে। এখন ফিরব। আরেকদিন এলে গল্প হবে।

পাথুরি ও রিংমির মান্দি ভাষার কথোপকথন সৌরাংশু বুঝতে পারেনি। ফেরার পথে পাথুরি জানায়, এই মেয়েটাকে কবে কোথায় চলেশ রিছিল কুড়িয়ে পেয়েছিল সে ঘটনা। তখন ওর বয়স মাস দুয়েক হবে। দুষ্ট মানসিকতার কেউ শিশুটিকে বস্তায় ভরে হাইওয়ে রোড থেকে বনের কিছুটা ভেতরে রেখে যায়। উদ্দেশ্য যে শিশুটিকে মেরে ফেলার সেটা স্পষ্ট। বনের বাঘ-শেয়ালে খাওয়ার আগেই সৌভাগ্য ক্রমে কান্নার আওয়াজ শুনতে পান চলেশ রিছিল। তারপর তিনি নিজেই শিশুটিকে নিয়ে আসেন। ছাগলের দুধ পান করিয়ে বাঁচান। একটু একটু আদরে বড় হতে থাকে বাচ্চাটি। নাম রাখেন চলেশ রিছিলের পিতার মায়ের নামে, রিংমি মংসাঙ। বাঙালির সন্তান হলেও ও বাংলায় কথা বলতে জানে না। চলেশের কাছ থেকে বন্য জীবন যাপন ও মান্দি ভাষা শিখেছে কেবল।

এরপর বহুবার পাথুরির সাথে সৌরাংশু সাংসারেক বনপুরুষ চলেশ রিছিলের সাথে দেখা করেছিলো। রিংমি নামের মেয়েটি ওদের পেলে ভীষণ খুশি হতো। বাধভাঙা হাসিতে লুটিয়ে পড়ত। সৌরাংশু অনেক চেষ্টা করেও রিংমির মুখে বাংলা শব্দ তুলে দিতে পারেনি। কেবল, ভাইয়া শব্দটিই শিখেছিল। রিংমি চলেশ রিছিলের কাছ থেকে শেখা মান্দি ভাষায় নানা ছড়া ও গান শুনাতো। তা যেন অমৃত রসদ, সৌরাংশুকে মুগ্ধ করত। চলেশ রিছিলের কথা-গল্পে সৌরাংশু বরাবরই বুঝতে চেয়েছে ভাওয়ালগড়ে সাংসারেক গারো আদিবাসী জনগোষ্ঠীর পরিচয় ও অতঃপর নিঃশেষ হবার দুঃখগাঁথা। যা শুনে সৌরাংশু মায়া অনুভব করতো।

চলেশ রিছিল কান্নাভরা কণ্ঠে বলত, এতো কিছু যে জিজ্ঞেস করো বাপ, তহন ছোট্ট আছিলাম, এই গড়ে জংলার ভেতর আশ্বিন মাসে ‘ওয়ানগালা’ উৎসব হইত, কত মজা হইত তহন। নাচিতাম, গান করিতাম। আমার মা খামাল ডাকিয়ে, আয়োজন কইরে দেবতা ‘মিসি’ আর ‘সালজং’য়ের পুজা দিতো। বাপে নাচত। নতুন ফসল দেবতারে খুশি হইবার জন্যি দিতাম। তারপরে সব্বাই নতুন ধানেরে পিঠা বানায়া খাইতাম, শুয়োর মাইরা খাইতাম’। এহন এইসব কিছু আর নাই। লোভে জগৎ ধ্বংস হইছে! আগের দিনে ক্ষুধা মেটাইবার উদ্দেশ্য লইয়া সবাই শিকার করত, চাষ করত। সবাই মিলে খাইত। এহন একলা একলা খায়, জমায় ফসল, ধন-সম্পদ অপরের খাওয়ার খোঁজ লয় না।’
কথা বলতে বলতে চলেশ রিছিল হঠাৎ হঠাৎ থমকে যেত। দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে আবার শুরু করত। বলত, দ্যাখ বাপ, জংলার একটা বাঘে পেটের ভুখে একটা হরিণ ধরে, মাইরা খায়। তারপরে এঁটো মরা হরিণটাতে শেয়ালে-কুকুরে খায়, তাতে বাঘের কিচ্ছু যায় আসে না, একবারও কয় না আমার শিকার করা জিনিস খাস কেন? বাঘের ক্ষুধা মিটলে, হাজার হরিণ বাঘের সামনে আইলেও আর শিকারও করে না, খায় না। কিন্তু বজ্জাত মানুষের খাওন-দাওনে পেট ভরলেও আরো চায়। ধন-দৌলতেও মন ভরে না। আরো চাই, আরো চাই.. এই চাওয়ার শেষ নেই, এখানেই অশান্তির জন্ম!’
কিছু সময় থেমে বলে এই গড়ে বনরুই, বনহরিণ, বাগডাস, মুখপোড়া হনুমান, গন্ধগোকুল, সজারু, ধলাকোমর শ্যামা, সবুজঠোঁট মালকোয়া, তিলা নাগঈগল আরো কত জাতের পইখ-পশু আছিন। এহন আর নাই! বড় কষ্ট লাগে!

বনের প্রায় হারিয়ে যাওয়া প্রাণির জন্য চলেশ রিছিলের মন কতটা কাঁদত তা বলে বোঝানো সম্ভব না। গারোপল্লীতে ঘুরে সৌরাংশুর কিশোর-তরুণ মন বুঝতে পেরেছে খ্রিষ্টান মিশনারিদের প্রচেষ্টা কতটা সফল। যদিও ব্যক্তি বা মানুষের ধর্ম পরিবর্তনে তেমন কিছুই যায় আসে না, যদি মানবিক বোধ জিইয়ে থাকে তবেই জগতে শান্তি বিরাজ করে। যিশু চিরকালই তো মানুষের জয়গান গেয়েছেন। আর গারো জনগোষ্ঠী সবসময়ই সহজ-সরল শান্তিমনা ছিলো। সৌরাংশু ব্যথিত হয়েছে ক্যাথলিক ও ব্যাপটিস্টদের আলাদা পরিচয় ও আলাদা সমাজ চর্চা দেখে! গারোপল্লীর দুই প্রান্তে দুটি চার্চ! রয়েছে দুইজন ভিন্ন ধর্মগুরু। তাদের মধ্যকার দূরত্ব ও সাদৃশ্য দুটোই চোখে পড়ার মতো। চলেশ রিছিলের বলেছিল, ভিটে-মাটির বিষয়ে দলিল-দস্তাবেজের চর্চা কখনোই গারোদের মধ্যে ছিলো না। ওরা বলত, এই মাটি ওদের মা! মাকে কি কখনো দলিল করা যায়? কিন্তু এখন সময়ের প্রয়োজনে তা জরুরি হয়ে পড়ছে। স্থানীয়দের মধ্যে কুচক্রী ক্ষমতাবান কিছু বাঙালিরা কালো হাত বাড়াতে মোটেও দ্বিধা করে না। টাকা ঋণ দেয়া কিংবা নানা কৌশলে গারো মেয়ে বিবাহের মধ্যদিয়ে লোভী মতলব হাসিল করে নিচ্ছে অনায়াসে। গোটা গারোপল্লীতে ক্যাথলিক ও ব্যাপটিস্টদের মধ্যে সবচে বড় ঐক্যের পরিচয় ছিলো ওরা গারো। ওদের ভাষা অভিন্ন! কিন্তু সৌরাংশুর চোখে খুব সীমিতই ধরা পড়েছে মান্দি ভাষার চর্চা। ঘরে ওরা মাতৃভাষা চর্চা করলেও স্থানীয় ও বাইরের মানুষদের সাথে যোগাযোগ রাখতে দিনে বেশিরভাগ সময় বাংলা বলতে হয়। একটু স্বচ্ছল গারো পরিবারে বাংলা ভাষার চর্চাটাই বেশি। টিভি চ্যানেলে প্রচলিত বাংলা-হিন্দী নাটক-সিনেমাও ওদের সর্বক্ষণের সঙ্গী! তাছাড়া বিভিন্ন সময়ে ভিনদেশ থেকে আগত ধর্মীয়গুরু পাদ্রি-বিশপদের সাথে যোগাযোগের জন্য ইংরেজিটাও প্রয়োজনের ভেতরে চলে এসেছে। সৌরাংশুর মনে চলেশ রিছিলের মতো দুঃখ ছুঁয়ে যেত খানিকটা! ইশ্, প্রতিকূল পরিস্থিতির শিকার হয়ে ওরা নিজেদের পরিচয় ও ভাষা থেকে কতটা দূরে চলে এসেছে। কিন্তু এছাড়া উপায় কী? মান্দি ভাষায় তো আর স্কুল-কলেজ নেই যে ওরা নিজেদের ভাষায় পড়বে। এই ভাষাতে তো কোনো টিভি চ্যানেলও নেই যে দেশ-বিদেশের খবর বা চিত্ত বিনোদনটুকু মাতৃভাষায় পাবে। এখানে সাংসারেক পরিচয় ও উৎসব সম্পূর্ণ বিলুপ্ত! কেউ মনেও রাখে না সুসমি, গয়ড়া, তাতারা রাবুগা নামক দেবতাদের, উৎসবে ওদের আর ঠাঁই নেই। তবে ইউরোপ থেকে আগত খ্রিষ্টান ধর্মীয় উৎসব ও আদিপুরুষদের উৎসবের মিশ্রণে এক নতুন ভাবধারায় পালিত হয় বিভিন্ন পালা-পার্বণ!

সৌরাংশুর চোখে ঘুমের ভাবলেশটুকু নেই। রাত ঘন হতে হতে স্মৃতির অন্তর্জালে সে গোঙাতে থাকে বিছানায়। মনে পড়ে উচ্চমাধ্যমিক শেষে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি প্রতিযোগিতার জন্য দৌড়-ঝাঁপের পর সে ভীষণ জ্বরে ভুগছিল। দিনরাত শুয়ে কাতরাতো। দীর্ঘদিন হাসপাতালে কাটিয়ে অবনতি অবস্থা নিয়েই বাসায় ফেরে। নামি-দামি প্রাইভেট ক্লিনিকে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হলো, কিন্তু রিপোর্টে কোনো রোগ ধরা পড়েনি। অন্যদিকে জ্বরের যাঁতাকলে শরীর ক্রমেই দুর্বল হতে থাকে। সৌরাংশুর বাবা-মা দু’জনই ভীষণ দুশ্চিন্তায় পড়েন। হঠাৎ একদিন পাথুরি চলেশ রিছিলকে সাথে নিয়ে হাজির হয় সৌরাংশুদের বাসায়। জ্বরে আক্রান্ত শুকনো মুখে হাত বুলায় শতবর্ষী। স্নেহ ভরা স্বরে বলেন,‘ভয় নেই আয়ু ফুরাবার সময় হয়নি এখনো। ঠিক ভালো হয়ে যাবি বেটা! আবার সাইকেল চড়ে আমার ঢেরায় যাবি।’
সুরবানু পুত্রের প্রতি এই অচেনা মানুষটির মমতা দেখে অবাক হোন। সাধ্যমত আপ্যায়ন করেন, দোয়া কামনা করেন।
দু’দিন পর শতবর্ষী আবার হাজির হয় অসুস্থ সৌরাংশুর কাছে। কতগুলো লতা-মূলের ভেষজ ওষুধ তুলে দেন সুরবানুর হাতে। বলেন, এই মূলের রস বড়ই উপকারি। গহীন জংলার চিজ এইগুলো! কিন্তু অসুখ-বিসুখে বহুত কামের পথ্য!’
চলেশ রিছিল সুরবানুকে শিখিয়ে দেন কীভাবে লতা ও মূলের রস সেবন করতে হবে। আরো বলেন, ‘রোজ গরম দুধ খেতে পান করা চাই।’ কুঁচকে যাওয়া হাতে বুলিয়ে বার বার তিনি সৌরাংশুকে আশির্বাদ করে বিদায় নেন। সৌরাংশুর পিতা এই বৃদ্ধের আগমন মোটেও পছন্দ করেননি। ভীষণ রকম আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, কোথাকার কোন পাগল এসে লতা-পাতা দিয়ে গেল তাই ওষুধ হিশেবে খেতে হবে?
সুরবান বলেন, লোকটাকে তোমার পাগল মনে হলো কোন দিক দিয়ে?
কেউ পাগল না হলে কি পাড়া-প্রতিবেশী, ঘর-বাড়ি ছেড়ে বনে থাকে?
সুরবানু নিরুত্তর থাকেন। পাশের কক্ষ থেকে কথাগুলো শুনতে পেয়ে, সৌরাংশুর চোখ ভরে জল আসে।
পাথুরি সুরবানুকে গোপনে জানান এই জংলি লতা-মূলের রস খুবই গুণের। পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে শেখা এইসব ভেষজগুণে চলেশ রিছিল অনেক রোগীকে সুস্থ করেছেন।

সোহরাব চৌধুরীকে না জানিয়েই সুরবানু ভেষজ ওষুধগুলো সৌরাংশুকে খাওয়াতে থাকেন। রোজ পাথুরি এসে সৌরাংশুকে সেবা করে মমতাময়ী হৃদয় ঢেলে। ভেজা কাপড়ে শরীর ও কপাল মুছে দেয়া, মাথায় হাত বুলানো, প্রতিটি পরশে সৌরাংশু একটু একটু সুস্থতার সন্ধান পায়। কখনো কখনো সুরবানুর অগোচরে পাথুরি ঘুমন্ত সৌরাংশুর কপালে-ঠোঁটে চুমু বসিয়ে দেয়! ঘুমের ভান করা সৌরাংশু এই স্পর্শগুলোতে ভীষণ মায়া খুঁজে পেত। জ্বরে কাঁপতে থাকলে সৌরাংশুকে অভয় দিয়ে পাথুরি রহস্যময় হাসিতে ফিসফিসিয়ে বলত,‘তোকে এবার এক গোপন আস্তানায় নিয়ে যাবো। সুস্থ হলেই এটা তোর উপহার।’ সৌরাংশু পাথুরির প্রতিটি আদেশ, অনুরোধ, আবদারে, হেসে সায় দিতো। এভাবে সে ধীরে ধীরে অনুভব করতে শিখে, বুঝতে শিখে এক প্রেম পিপাসু নারীর আবেগকে।
এটাও বুঝতে পারতো পাথুরিদের ভালো বাড়ি-ঘর নেই বলে ও এখনো স্বামী পায়নি। সুরবানু প্রায়ই আফসোস প্রকাশ করে বলতো,‘পাথুরিটার বিয়ে হচ্ছে না ওদের দুর্দশার জন্য, ওদের মায়ের উপর পুরো সংসারের ভার! পীরেন বজ্জাতটা মদ ছাড়া কিছুই বুঝে না!’ ওদের রীতিতে বিয়ের পর বর কনের বাড়িতে এসে বাস করে। বর পক্ষের ঘর-বাড়ি পছন্দ না হলে এমনই ঘটে, বিয়েই হয় না গারো মেয়েদের। ওরা ধর্মান্তরিত হলেও এই প্রথাটা এখনো জিইয়ে রেখেছে। কিশোরী-তরুণী নারীদের জন্য যেনো এক মহাকষ্টের বহর! পাথুরির বুকে সেই কষ্ট ও বেঁচে থাকার তেষ্টা জমাট বেঁধে আছে। তাই তো সৌরাংশুর প্রতি ওর এত আবেগ! শুধু কি আবেগ নয়, প্রেমের অস্তিত্বও সেখানে বিরাজমান।

দু’চার দিনেই সৌরাংশুর মধ্যে উন্নতি দেখা যায়। সপ্তাহ যেতেই পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠে। ওর সুস্থতাতে সবচে বেশি আনন্দিত হয় পাথুরি। সৌরাংশুর বাবা-মা দুশ্চিন্তার গ্রাস থেকে মুক্তি পান। যেনো নতুন জীবনের সন্ধান পেলেন!

সৌরাংশুর জ্বরমুক্তির বেশ কিছুদিন পরে আসে ফাগুনের পলাশ রাঙা দিন একুশে ফেব্রুয়ারি। তখনো সে ভার্সিটিতে ভর্তি হয়নি, প্রথমবারের পরাজয় মাথায় নিয়ে গোটা একটা বছরই কেটেছে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে। সকালে পাথুরি এসে সৌরাংশুকে নিয়ে যায় ওদের পাড়ায়। সেখানে চার্চের পাশে নতুন শহীদ মিনার গড়া হয়েছে। এলাকার রাজনৈতিক ব্যক্তিরা এসে সংখ্যালঘুদের প্রতি উপচে পড়া প্রেম নিবেদন করে চড়া বক্তৃতা ও স্মার্টফোনে ছবি তোলে নিয়ে গেল। তারপর চলল, সাউণ্ডবক্সে গান-বাজনা। সেখানে গারোদের চেয়ে স্থানীয়দের সংখ্যাই বেশি।
সৌরাংশু সেই ছোটো বেলা থেকে দেখে আসছে গারোপল্লীতেও একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করা হতো। কলাগাছ কেটে, সেগুলোকে রঙিন কাগজে সাজিয়ে বানানো হতো শহীদ মিনার। পুষ্পস্তবক অর্পণ ও মাতৃভাষা তথা বাংলা ভাষার জন্য অধিকারের লড়াই নিয়ে বিচিত্র আলোচনা হতো। চার্চের ভিনদেশি বিশপ নিজের ভাষা কতশত কথা বলত। মানুষজন কেবল ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকত।
কিন্তু সৌরাংশু যখন কিছুটা বড়ো হলো, তখন প্রশ্ন জাগতে শুরু করে এই মানুষগুলো কি সত্যিই মাতৃভাষার অধিকার বুঝে? কালের বিবর্তনে ওরা ক্ষয়িষ্ণু হয়ে যাত্রা করছে মিশে যাবার। অনটনের হাত থেকে বেঁচে থাকার তাগিদে ওরা ধর্মান্তরিত হয়েছে। সরলতা কতটা বিভোর হলে এমন হতে পারে। মাতৃভাষা ও স্বজাতিসত্তার এই বিনষ্টধারা কি ওরা টের পাচ্ছে? প্রশ্নটা সৌরাংশুকে খুব ভাবাতো।
শহীদ মিনারে ফুল নিবেদন শেষে পাথুরি বলে, চল সৌরাংশু আজ তোকে সেই গোপন আস্তানা দেখাবো।
সৌরাংশু একগাল হেসে বলে, ভালো দিনে মনে করিয়েছিস, চল।

ওরা সাইকেলে চড়ে ছুটে অরণ্যের ভেতর। শোঁ শোঁ তরঙ্গে বয় প্রশান্তির প্রবাহ! বিদেশি কোম্পানির ইজারা নেয়া তুলাখেত ডিঙিয়ে পথে দেখা মেলে পুরনো রেল স্টেশন! শত-সহস্র পদচারণার স্মৃতি ভুলে স্টেশনটা এখন লতা-গুল্ম ও বানরদের দখলে। মাটিতে ঝিমিয়ে পড়া ব্রিটিশযুগের রেললাইন পেরিয়ে গেলে একটা সরু পথের দেখা। ওরা চলতে থাকে সে পথ ধরে। এদিকে লোকালয়ের অস্তিত্ব নেই। কেবল বৃক্ষ-গুল্মে ভরপুর! হঠাৎ কাঞ্চনফুলের গাছ দেখে ওরা সাইকেল থামায়। পাথুরির প্রিয় এই ফুলটা সৌরাংশুও পছন্দ করে, তাই সে কটা ফুল হাতে নিয়ে সাইকেলের পেছনে বসা পাথুরির খোপায় গুঁজে দিয়ে গতি বাড়িয়ে বলে, কিছুদিন পরে আমি ভার্সিটিতে ভর্তি হবো। তখন আর তোর সাথে দেখা হবে না।
কথাটা পাথুরি জানত, তবু বিষণ্নতা মেখে বলে, একবারেই দেখা হবে না?
জানি না। কারণ, বাবা-মা ঢাকায় চলে যাবে তখন। শুনেছি আমাদের কোম্পানিটা বিক্রি করে বাবা নতুন বিজনেস শুরু করবেন।
পাথুরি দুঃখ ঘুচানোর জন্য চেষ্টা করে হেসে বলে, এই হ্যাবলা শোন।
শুনতে পাচ্ছি তো, বল।
মনে আছে আমরা আগে বর-বধূ খেলতাম।
সৌরাংশু মুচকি হাসে। বলে, হুম মনে আছে। ভয়ংকর একটা খেলা! আমার তো একবার শ্বাস নিতেই কষ্ট হচ্ছিল!
এবার পাথুরি বলে, আমাকে বিয়ে করবি সৌরাংশু?
কথাটা বলা মাত্র ঝাঁকে ঝাঁকে নিরবতা প্রবাহিত হতে থাকে। বনের কোলাহল যেন থমকে যায়। নিশ্চুপ সৌরাংশু!
পাথুরি আবারো বলে, কী রে কথা বলছিস না কেন? বিয়ে করবি আমাকে?
এবারো নিরবতা ভঙ্গ হয় না। তখন পাথুরি রেগে বলে, ভীরু বদমাশ কোথাকার!

এক সময় ওরা থামে ইট-পাথরে গড়া এক পুরনো ভগ্নস্তুপের সামনে। সাইকেলটা রেখে পাথুরি বলে,‘ভেতরে একটু অন্ধকার লাগবে ভয় পাসনে!’
ভাঙ্গা ইটের স্তুপ পেরিয়ে একটা গুহা দেখা যায়, যেনো গোটা জগৎ সেখানে অন্ধকার। ওরা সেই পথে ধীরে ধীরে অগ্রসর হয়। দু’পাশে ঘাস-শৈবালে আচ্ছাদিত প্রাচীন দেয়াল, মাঝপথে ওরা হেঁটে এগোচ্ছে। সৌরাংশুর নাকে পুরনো ধাঁচের একটা গন্ধ স্পর্শ করে। যেনো ওরা হাজার বছর আগের কোনো স্থাপত্যে প্রবেশ করেছে। ভেতরে রোদের আলো আর দেখা যায় না। হঠাৎ একটা আলো জ্বলে উঠে। সৌরাংশু চমকায়! পাথুরি বলে,‘ভয়ের কিছু নেই..!’ আলোটা পাথুরির হাতে থাকা টর্চের। আরো খানিকটা এগোবার পর দেখা যায় একটা তাজা জবা ফুল পড়ে আছে। পাথুরি ফুলটা তুলে সৌরাংশুর হাতে দেয়। তারপর বলে,‘এখানে প্রতি সপ্তাহে চলেশ ঠাকুর্দা এসে ফুল রেখে পুজো দেয়। এটা নাকি তাতারা রাবুগা দেবতার আস্তানা, অনেক আগে মন্দির ছিলো। এখন তো ভেঙে মাটির নিচে চলে যাচ্ছে!’
টর্চের আলো ফেলতেই দেয়ালের শেষ প্রান্তে একটি দেবতার মূর্তি দেখা যায়! মূর্তিটা কারুকাজ ভরা দেয়ালে সংযুক্ত! সৌরাংশু ও পাথুরি দীর্ঘ সময় ওখানে দাঁড়িয়ে থাকে।

ফেরার সময় গুহার ভেতরে পা ফেলতে ফেলতে পাথুরি আবারো বলে, শোন, আমাকে বিয়ে করবি?
থমকে দাঁড়ায় সৌরাংশু। বলে, আমি তো তোদের মতো খ্রিষ্টান নই।
পাথুরির হাতে থাকা টর্চটা নিভে যায়। অন্ধকার গুহায় দু’জন মানব সন্তান মুখোমুখি দণ্ডায়মান! পাথুরি অভিমান ও কান্নাভেজা কণ্ঠে বলে, তাতে কী? আমি না হয় তোদের ধর্মে যাবো। আমাদের পাড়ার কত মেয়েই তো বিয়ে করে মুসলমান হয়েছে। কত মেয়ে ক্যাথলিক ছেড়ে ব্যাপটিস্ট হয়েছে।
এবার সৌরাংশু বলে, পাথুরি তুই তো আমার চেয়ে বয়সে অনেক বড়।
পাথুরি বলে, জানিস বাপ আমার মার চেয়ে পাঁচ-ছ বছরের ছোটো তবুও তো তারা বিয়ে করেছে। কিছুতে তো আটকায়নি!
নির্বাক লাজুক সৌরাংশু অন্ধকারের মতো নিশ্চুপ হয়ে থাকে! বোবা পাখির মতো যেনো সে! ভয়ের হাতছানি যেনো আবারো আশঙ্কা জন্ম দেয় ঐদিনের বর-বধূ খেলার মতো, যেখানে শ্বাস বন্ধ হবার যাতনা ছিলো।

নিস্তব্ধতার শরীর ভেদ করে সৌরাংশুর হাতঘড়ির কাঁটা টিক টিক ধ্বনিতে অস্তিত্ব জানান দেয়। পাথুরি আচমকা টর্চ জ্বালায়। পাথুরি দেখতে পায়, দেয়ালে একজোড়া রঙিন গেছোশামুক সঙ্গমের নেশায় পরস্পরকে নিয়ে কতটা মাতাল! পাথুরি সৌরাংশুকে দেখিয়ে বলে, ‘দ্যাখ, কি সুন্দর!’
দু’জোড়া দৃষ্টি একবিন্দুতে মিলে আদিমতার ইচ্ছে ছিটিয়ে দেয়! আচমকা পাথুরি সৌরাংশুকে জড়িয়ে ধরে, চুম্বনের তীব্র উষ্ণতায়। পুড়িয়ে দেয় সৌরাংশুর ঠোঁট! স্পর্শ ও মর্মের বাধভাঙা খেলা মাঠে গড়ায়! শালগাছগুলোকে যেমন করে হিংলোলতা-আসামলতা জড়িয়ে আছে আষ্ঠেপৃষ্ঠে, পাথুরিও সৌরাংশুকে জড়িয়ে নেয়। বোবা পাখিটাও তখন সরব হয়, শব্দহীনতার গভীর শব্দে! সেই শব্দে জেগে উঠে সৌরাংশু! ভয়ে অবশ হওয়া শরীরে হঠাৎ বিদ্যুৎ খেলে যায়!
পাথুরি কান্না ও কামার্ত কণ্ঠে বলে, তোকে ভীষণ ভালোবাসিরে.. তুই চলে গেলে কীভাবে বাঁচব?
সৌরাংশু আত্মশৃঙ্খল ভেঙে বলে, আমি তোকে বিয়ে করবো পাথুরি, আমার পড়াশোনাটা শেষ হোক! আমিও যে তোকে ভালোবাসি!
পাথুরি আনন্দে চোখের জলে ভিজিয়ে দেয় সৌরাংশুর শার্ট! স্পর্শে স্পর্শে জোড়া প্রাণের স্পন্দনে পৃথিবীর গতি ও আবর্তনের ইতিহাস নির্মিত হয়!

পাথুরির প্রতিটি স্মৃতি আজো সৌরাংশুর হৃদয়ে দাগ কাটে! ওর সর্বনাশের শেষটা যে এমন হবে তা কখনো ভাবতে পারেনি সে। কেন একটা প্রাণের উপর এতটা দহন? এই প্রশ্নের কোনো উত্তর আজো পায়নি সৌরাংশু। নিজেকে ভীরু তকমা দিতে গিয়েও থমকে যায় সে। আত্মধিক্কার ও ঘৃণার উদ্দেশ্যে কাপুরুষ, পাষণ্ড কিংবা এর চেয়েও নিকৃষ্ট শব্দ চয়ন করতে চায় সৌরাংশু! স্মৃতিরা এখনো বিষাক্ত সাপের মতো ছোবল দেয়, যেনো নিস্তার নেই এই যন্ত্রণা থেকে। সে তো ওকে ভালোবেসেছিলো। তবে কেন পাশে ঠাঁই দেয়নি? কেনো অপেক্ষার শৃঙ্খলে বন্দি রেখেছিলো?

সোহরাব চৌধুরী একসময় ‘দ্য সুপার ড্রিম লিমিটেড’ কোম্পানির শতভাগ মালিকানা কিনে নেয়। আরো ধনী হবার ইচ্ছা ও রাজধানী শহরে ব্যবসায় করার স্বপ্ন ছিলো তার বহুদিন ধরে। অতঃপর বছর পেরিয়ে কোম্পানিটা এক বিদেশি বিনিয়োগকারী গ্রুপের কাছে বিক্রি করে দেয়। সৌরাংশুর স্পষ্ট মনে আছে, এক শীতের সকালে দু’জন সাদা চামড়ার ভদ্রলোক আসে তাদের বাসায়। বিদেশিদের সাথে নিয়ে সোহরাব চৌধুরী কারখানার পুরো এরিয়া ঘুরিয়ে দেখান! মহাসড়কের পাশে হওয়াতে ওরা উঁচু দরে কারখানাটি কিনে নেন। বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান কেবল ‘দ্য সুপার ড্রিম লিমিটেড’এর জমি কিনেই কেবল থেমে থাকেনি, ওদের নজর আরো দীর্ঘ হয়! উপায় খোঁজে গারোপাড়াকে যুক্ত করে বিস্তৃত আকারে স্পেশাল প্ল্যান বাস্তবায়ন করা! বিনিয়োগকারীদের এই পরিকল্পনা শুনে সাহায্য করেছিলেন সোহরাব চৌধুরী নিজেই, এতে পকেটে ভালো অঙ্কের ডলার আসে। তিনি স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সাথে পরিচয় ও ওদের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার পথ দেখিয়ে দেন। লোভী নেতারা ঘুষ উপঢৌকন পেয়ে বোধহীন বাধ্যগত কুকুরের মতো গারোদের কাছে নানা প্রস্তাব নিয়ে আসে। ভিটে হারানোর পুরনো ক্ষতস্মৃতি ওরা ভুলতে পারে না। কিছুতেই ওরা ভিটে ছাড়বে না বলে রুখে দাঁড়ায়! কিন্তু ওদের মেরুদণ্ডের শক্তি খুবই সীমিত! নির্যাতন ও ভয়-ভীতি হুমকি আসতে থাকে রোজ! এতেও যখন গারোরা ভিটে ছাড়েনি, তখন ভিন্ন চিন্তার পথে হাটে শান্তির শত্রু পুঁজিবাদের প্রেতাত্মারা!

তখন ‘আদিবাসী কল্যাণ ভুবন’ নামক এনজিওর পরিচয়ে কিছু লোক আসে গারো পাড়ায়। জরিপের কাজে আসা এসব অফিসারদের কাছে গারোরা দুঃখের কথা খুলে বলে। অফিসারগণ আইনি সাহায্য নেবার পরামর্শ দেন, প্রয়োজনে সবধরনের সাহায্য করারও আশ্বাস প্রকাশ করেন। সরলমনে ওরা এনজিওর লেবাসে আসা লোকদের কথা মতো মামলা করার সিদ্ধান্তে সাড়া দেয়। সেই মামলার উদ্দেশ্যে ওরা স্বাক্ষর দেয় ভিটে-জমি বিক্রি করার দলিলে। এই ষড়যন্ত্রে অসহায় মানুষগুলো ভীষণ বিপাকে পড়ে। থানা-পুলিশও তখন নেতাদের ইঙ্গিতে উঠ-বস করছে, গারোদের নির্দেশ দেয় পুরনো রেলস্টেশনের জমিতে গিয়ে বসবাস করতে। বার বার বলার পরও যখন কেউ ভিটে ত্যাগ করছিলো না তখন আরো হিংস্র পথে হাটে কুচক্রীরা!

গারোদের কান্নায় কারোর মনে মায়ার উদ্রেক হয়নি। সস্তা শ্রমের এই দেশে স্বল্প বিনিয়োগে অধিক লাভের লোভে কত যে প্রতিষ্ঠান এসে আখড়া গেঁড়েছে, তার হিশেব কে রাখে? হিশেবের প্রয়োজনই বা কী দরকার? রাজস্বের লোভে রাষ্ট্রযন্ত্র আনন্দে গদগদ করে সবকিছু উজাড় করে দিয়েছে। ভিনদেশিদের ইচ্ছাকে সমর্থন দিতে কার্পণ্য করেনি গণতন্ত্রের লেবাস পরা দস্যুরা। অথচ, উন্নত দেশগুলোতে শিল্পাঞ্চল, আবাসন ও বনাঞ্চলের জন্য রয়েছে পরিকল্পিত ব্যবস্থা! আর এখানে সবকিছু মিশ্রিত ও একাকার হয়ে নিশ্চিহ্নতার উল্লাসে মাতাল। মাত্র কয়েক দশকে সবকিছু পাল্টে যাওয়াতে স্থানীয় বাঙালিরা যেনো সোনার চামচ হাতে পেয়েছে। বন নিধন করে জমি সৃষ্টি ও শত শত কারখানা নির্মাণের ফলে দূর-দূরান্ত থেকে আগত শ্রমিকদের আনাগোনা বেড়ে যায়। বাড়তে থাকে ঘর ভাড়ার চাহিদা। আসতে থাকে টাকা-পয়সার পসরা! জমির দাম বাড়ছে হু-হু করে! আলাদীনের চেরাগের মতো জীবনযাত্রা রাতারাতি পাল্টে যাচ্ছে, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আসতে লাগল টাকা ছড়ানোর দোলা। বিচিত্র মানুষের ভিড়ে এই অঞ্চল ও পরিবেশ পরিবর্তিত হচ্ছে প্রতিকূলতাকে ইঙ্গিত করে! তবে পেশি শক্তির অভাবে গারোদের নিষ্পেষিত হতে হচ্ছে ক্ষমতার হাতে। শুধু গারো বললে ভুল হবে, দরিদ্র বাঙালিরাও এর শিকার হচ্ছে! পুঁজিতন্ত্র চিনে না আপন-পর, আদিবাসি বা বাঙালি, সবাইকে গলাটিপে শোষণই করাই এর ধর্ম!

রাত গভীর হলেও চলেশ রিছিলের মৃত্যু সংবাদ ভুলতে পারে না সৌরাংশু চৌধুরী। মনের ভেতরে এক প্রতিকূল ঝড় বয়ে যায়। বার বার মনে পড়ে, কিছু ধূসর স্মৃতি! পরিস্থিতি আজ কত বিপন্ন! এর জন্য কারা দায়ী? প্রশ্নটা ঘুরপাক খায় উড়তে না জানা দিক বিভ্রান্ত ঘুড়ির মতো। যখন বুঝতে পারে তার পিতার উৎসাহ ও ভাবনাতেই গারোপল্লীতে এই বিপর্যয়ের উত্থান তখন থেকে ওর মধ্যে পিতার প্রতি প্রচণ্ড ঘৃণা বাড়তে থাকে। কিন্তু প্রকাশ সম্ভব হয়নি। ওর হৃদয়ে স্বপ্ন বসত করতে থাকে পাথুরিকে ঘিরে। ভাবে, পিতা বিরোধ সৃষ্টি করলেও সৌরাংশু পরাজয় মানবে না, যে করেই হোক পাথুরির দুঃখ সে মুছে দিবে। সৌরাংশুর পিতা ‘দ্য সুপার ড্রিম লিমিটেড’ কোম্পানি বিক্রি করে ঢাকা একটি ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান চালু করেছেন। দেশ ছাড়িয়ে বিদেশে ব্যবসায় বিস্তৃত করা তার স্বপ্ন। এদিকে ভর্তি যুদ্ধ পেরিয়ে ঢাকা ভার্সিটিতে বাংলা সাহিত্যে ভর্তি হয় সৌরাংশু। পড়াশোনা ও নতুন ঠিকানা হিসেবে ঢাকাই এখন হতে চলেছে ওর গন্তব্য! কিন্তু ভাওয়ালগড় ও অফিসার কলোনি ছেড়ে আসার আগে সৌরাংশুর জন্য অপেক্ষা করছিল, এক চরম দুঃসংবাদ!

চলে যাবার কিছুদিন আগে এক সকালে সৌরাংশু জানতে পারে মহাসড়কের পাশে পাথুরির লাশ পাওয়া গেছে। ওর গোটা পৃথিবী ঘিরে তখন অন্ধকার নামে! কান্নায় ভেঙে পড়ে! ছুটে যায় পাথুরির কাছে। লাশের প্রাথমিক হাল দেখে বুঝতে বাকি থাকে না, ওকে একদল পশু ধর্ষণ ও পাশবিক নির্যাতন করে হত্যা করেছে!

পুলিশি তদন্তেও ধর্ষণের প্রসঙ্গ প্রকাশ পায়। আর এই ধর্ষণের একমাত্র সাক্ষী রিংমি। রিংমির কথা প্রথমদিকে কেউ বুঝতে পারেনি। যখন গারোপাড়ার লোকজন ছুটে এলো তখন বুঝতে পারলো। রিংমি জানায়, সে খুনি ধর্ষকদের দেখেছে। গত বিকেলে পাথুরি ও রিংমি বনে গিয়েছিল মেটে আলুর সন্ধানে! একদল হায়েনা পাথুরি ও রিংমির উপর আক্রমণ করে। রিংমি পালাতে সক্ষম হয়। মানুষের সাহায্যে জন্য ছুটে যায় মহাসড়কের পাশে আন্তঃজেলা বাসস্ট্যান্ডে! রিংমি সবাইকে বার বার বলতে চেয়েছে পাথুরি বিপদে পড়েছে, কিন্তু কেউ ওর কথায় পাত্তা দেয়নি, কিংবা বুঝতে পারেনি! ব্যর্থ হয়ে রিংমি ছুটে যায় পাশের একটি বাজারে! ওর মান্দি ভাষার কথা শুনে উল্টো চায়ের দোকানে সিনেমা-আড্ডারত কাস্টমারেরা হাসাহাসিতে মেতে উঠে, ওদের কাছে রিংমির চোখের জল, আকুতি-মিনতি কিছুই মূল্য পায়নি। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নামে, নিঃশেষ হয়ে যায় পাথুরি!

বুকের ভেতর কষ্ট নিয়ে সৌরাংশু ছুটে যায় চলেশ রিছিলের কাছে। রিংমির কথাগুলোই চলেশ ওকে খুলে বলে। সবশুনে সৌরাংশু নিজেকে দমিয়ে রাখতে পারে না! ক্ষোভে-দুঃখে আর্তনাদ করতে থাকে। চলেশ রিছিল বলেন, পাথুরি তোকে ভীষণ ভালোবাসত। তোর সাথে ঘর বাঁধবে বলছিল। আমি নিষেধ করিনি। সাংসারেক ছেড়ে খ্রিষ্টান হলো, এখন মুসলমান হলে দোষ কি? জগতের সব অবতারই শান্তির জন্য আসছেন। কিন্তু প্রকৃতির ধর্ম পালনে ব্যর্থ হলে অশান্তি নামবেই।

কদিন পরেই গারো পাড়ার আরো কয়েকজন মেয়ে ধর্ষিত হয়। ওদের লাশ পাওয়া যায় বনের ভেতর, রেললাইনে, সড়কের পাশে আরো নানা স্থানে। গারোদের বুঝতে আর বাকি থাকে না প্রকৃত পরিস্থিতি কী ঘটছে। ওরা নিজেদের বাঁচাতে ছেড়ে দেয় ঘর-বাড়ি অস্তিত্বের শেষ ঠিকানাটুকু। সৌরাংশু বুকের ভেতর পুষে রাখা রাগ-অভিমানে জ্বলতে থাকে! সোহরাব চৌধুরীর প্রতি প্রচণ্ড ঘৃণা তৈরি হয়! আর সেই ঘৃণা এতোটাই শক্তিশালী ছিলো, পিতা-পুত্রের বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দিতে পরোয়া করেনি। সুরবানু পুত্রের অন্তর্দহন ও সংসারের অশান্তি সইতে না পেরে ব্রেইন স্ট্রোকে আক্রান্ত হোন, যা পরে পক্ষাঘাতে পরিণত করে! দীর্ঘদিন ধরে তিনি শয্যাশায়ী অবস্থায়! সৌরাংশু স্নাতক সম্পন্ন করার পর চাকুরিতে যোগ দিয়েছে। সেই সাথে স্নাতকোত্তর চলমান।

কখনো কখনো সৌরাংশুর মনে প্রশ্ন জাগত, সোহরাব চৌধুরী যদি বিনিয়োগকারীদের সাহায্য না করতো, তাহলে ওরা কি গারোপাড়া দখল করতে পারত না? টাকার লোভে তো স্থানীয়রা প্রথমবার ওদের তাড়িয়েছে, দ্বিতীয়বারও তো তাই করতো! এসবের জন্য কে দায়ী? ক্ষমতা ও পুঁজিবাদের কুৎসিত থাবা মানুষকে কত সহজে অমানুষে পরিণত করতে পারে। কত সহজে শান্তি কেড়ে নিতে পারে, কত সহজে ধ্বংস করে দিতে পারে একটা জাতিকে, ভাষাকে, পরিচয়কে। তাছাড়া অর্থ ও ক্ষমতা লোভীরা যখন রাষ্ট্রযন্ত্রের মাথা থেকে পা অবধি ঘিরে থাকে, তখন রাষ্ট্র একটি ব্যর্থ সংগঠন ব্যতীত ভিন্ন কিছু নয়।

স্মৃতি দংশনে সৌরাংশুর নির্ঘুম রাত পোহাতে চায় না! পরদিন ভোরে সৌরাংশু ছুটে যায় ভাওয়ালগড়ে। অফিসার কলোনির পাশে থাকা গারোপাড়ার স্থানটাতে বিশাল কলকারখানা দম্ভ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দৃশ্য পাল্টে এতোটাই পরিবর্তিত হয়েছে, পুরনো স্মৃতির সাথে মেলাতে কষ্ট হয়। কারখানার প্রবেশদ্বারে বাগানের পাশে একটি চার্চ চোখে পড়ে! সেখানে একজন বাঙালি বিশপ সকালের রোদে গাউন ও ক্রুশ পরে দাঁড়িয়ে আছে। সৌরাংশু এগিয়ে যায় বিশপের কাছে, গারো চলেশ রিছিলকে কোথায় সমাহিত করা হয়েছে জানেন?
বিশপ নিরস ভঙ্গিতে বলেন, তার আস্তানাতেই।

সৌরাংশু ছুটে যায় অরণ্যে। ঘন বন এখন অনেকাংশে নির্জীব! বনের ভেতরে পাকা রোড তৈরি হয়েছে। সে রোড ধরে কারখানার ট্রাক যাতায়াত করছে প্রতিনিয়ত। সেই ছোট হ্রদের পাড়ে যাবার পর চোখে পড়ে একটি নতুন কবর! কবরের পাশে দণ্ডায়মান কাঠে নির্মিত ক্রুশ! ধাক্কা খায় সৌরাংশু, চলেশ রিছিল তো খ্রিষ্টান ছিলো না। তিনি যে ভাওয়াল গড়ের সর্বশেষ সাংসারেক তাও কি পৃথিবীর মানুষ জানতে পারবে না? সাংসারেক গারোদের কীভাবে কবরস্থ করা হয় তা কি এখানে কেউ জানে না? সৌরাংশু খুঁজতে থাকে রিংমিকে। কিন্তু রিংমির সন্ধান দিতে পারে এমন কেউ সেখানে নেই। চোখে পড়ে হ্রদটার করুণ রূপ! পাশেই গড়ে উঠা কারখানার বর্জ্য এসে নির্বিঘ্নে মিশছে পানিতে! দক্ষিণদিকের বন উজাড় হয়ে এখন আরো বিস্তীর্ণ খোলা মাঠ! খাল চিরতরে ভরাট হয়ে দীর্ঘ কবরের মতো মিইয়ে রয়েছে। চলেশ রিছিলের ভগ্ন কুটির মালিকহীন দুখী কুকুরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। এ দৃশ্য দেখে সৌরাংশুর চোখ ফেটে জল নামে! অদূরে ধানখেত দেখা যায়, কাঁদামাটিকে চিনতেও বিভ্রান্তি লাগে, যেনো তেল জাতীয় পদার্থের জলাশয়। দুর্গন্ধে নাক চেপে ধরতে হয়!

সৌরাংশু ছুটে যায় পুরনো রেলস্টেশনে যেখানে গারোদের নতুন ঠাঁই। অচেনা আগুন্তুককে দেখে চার্চের ভেতর থেকে এগিয়ে আসে, লিয়া ও মেবুল! ওদের দুঃখভরা মুখ! সৌরাংশু ওদের চিনতে পারলেও, ওরা তাকে মোটেও চিনতে পারেনি। আগের তুলনায় গারোদের সংখ্যা অর্ধেকের চেয়েও কম এখন। মেয়েদের বাঙালি কারোর হাতে বিয়ে দিতে পারলেই ওরা সুখী, যেনো নিরাপদ ঠাঁই মিললো। পরবর্তী প্রজন্ম বাঙালি হয়েই জন্মাচ্ছে। অনেক গারো পুরুষ নবীন মুসলিম হয়ে আর্থিক সাহায্যের জন্য করুণার পাত্র সেজে মিলতে চাচ্ছে সমাজের মূল প্রবাহে, এতে দরিদ্রতা ঘুচে কেউ কেউ সুফলও পাচ্ছে। চলেশ রিছিলের পালিতকন্যা রিংমির সন্ধান কারোর কাছে পায়নি সৌরাংশু। অতঃপর সে বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশনের অনেকের কাছে প্রশ্ন করে রিংমিকে চেনে কি না! কেউ কিছুই বলতে পারলো না। যেন ওরা ভিনদেশি! প্রকৃতপক্ষে সবাই বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত, বেশিরভাগই শ্রমিক, কেউ অন্য কোনো সেক্টরে চাকুরিরত। দুপুরের লাঞ্চ ব্রেকে শ্রমিকের ঢলে নামে মহাসড়কে, লোকারণ্য চারদিক!
সৌরাংশুর মনে আশঙ্কা ও প্রশ্ন জাগে রিংমিও কি পাথুরির মতো নিঃশেষ হয়ে গেছে?

সন্ধ্যা নেমে এসেছে। ঢাকায় ফিরে যাবার উদ্দেশ্যে হাইওয়ে রোডের গাড়িতে উঠে সৌরাংশু! লাল থালা সূর্যটা তখন অস্ত যাচ্ছে..! ক্ষয়িষ্ণু সূর্যটা যেনো বলছে,‘অস্তাচলই আজকের শেষ বিদায়!’
সৌরাংশু দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবে, চলেশ রিছিলের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ভাওয়ালগড়ের সর্বশেষ সাংসারেক মান্দি পুরুষের ইতি ঘটলো। এভাবে একদিন মান্দি ভাষাও চিরদিনের জন্য হারিয়ে যাবে। গারোরা ধীরে ধীরে বাঙালি হয়ে উঠছে। ইতিহাসে লেখা হবে ভাওয়ালগড়ের এক বিলুপ্ত ভাষার নাম মান্দি ভাষা।
সৌরাংশুর হাহাকার ধ্বনিতে, বাতাস বয়ে বেড়ায় অস্তাচলের দীর্ঘশ্বাস!