তাবোল আবোল কি বোল কি বোল!!!

অনিন্দ্য বর্মন


(বাংলা অ্যাবসার্ড মহীরুহ সুকুমার রায় মহাশয়-কে…)


দৃশ্য ১ –
“বাডুর বালে অরে অ ভাই সাজারু / আচকে রাতরে দেকবে একটা মাজারু / আচকে হেটায় সামসিকে আর পাছারা / আসাবে সবাই, মরবে ইডুর বাটারা…”
!!!
দৃশ্য ২ –
- এটা বলো, শুনি…।
- বাট আঙ্কেল, আমি তো বেঙ্গলি পড়তে পারি না।
- সে কি? তোমার স্কুলে বাংলা পড়ায় না?
- আমার তো বেঙ্গলি নেই আঙ্কেল । আমার সেকেন্ড ল্যাঙ্গোয়েজ হিন্দি।
- বাংলা নাওনি কেন?
- হিন্দি ইস ইসি আঙ্কেল। প্লাস জবের জন্য আদার কোনও সিটিতে গেলে, হিন্দি ইস নেসেসারি।
!!!


বর্তমান আমাদের অবাক হতে শেখায় না। ফেসবুকে পরিচিত বেক্তির বিয়ের ছবি (আপনি আমন্ত্রিত ছিলেন না), ট্যুইটারে রাষ্ট্রীয় বিজ্ঞপ্তি, বাজারের দরদাম অথবা দুর্ঘটনা, অতিমারি – কোনও কিছুই অবাক করার মতো নয়। তবু মানুষ মাত্রেই ভুল হয়। আমরা অবাক হই। স্তম্ভিত হই। বাকরুদ্ধ… ইত্যাদি বিকার কাটিয়ে ওঠার চেষ্টাতেই নিজের কক্ষপথে ঘুরে চলে পৃথিবী। আলুর দাম চল্লিশে উঠলেই চক্ষু চড়কগাছ, শ্রমিক-কৃষকের করুণতায় ঝরে পড়া আহা-উহু দিয়ে দিব্যি মাছ-মাংসের ঝোল সহযোগে খাদ্যগ্রাস। নিবিড় হয়ে আসা সম্পর্ক অথবা কাছারির ব্যস্ততা লেপে পর-এর সন্ধান। পরকীয়া, পরনিন্দা, পরোপকার রাঙানো জীবন। যাপন।
অবশ্য অবাক হওয়াও সহজ নয়। দু’টোর সময় কাজ প্রায় শেষ, কিন্তু ঊর্ধ্বতন আদেশে বেক্তিগত পরিসর কমে আসে। কি করবেন? অবাক তো হওয়া যাবে না। এক্ষেত্রে বোল বলা যেতে পারে। বুকে গুনগুন, হাতে খুটখুট, পায়ে তাল, মনে ছন্দের একটা পাঁচমেশালি আপনাকে সেদ্ধ হওয়া থেকে বাঁচিয়ে দিতে পারে। তবে ওইটুকুই। বাকি অবাক, হতবাক, মন খারাপ ইত্যাদি গিলে নিয়েই এগিয়ে চলা। এক্ষেত্রে আপনার নাম নীলকণ্ঠ না হলে চলবে?
এতোর পরও, অবাক হই। স্বাভাবিক কারণেই। যেরকম অবাক হয়েছিলাম উপরের দু’টি দৃশ্যে। আমি যে স্কুলে পড়াই, সেখানে ঐচ্ছিক বিষয় শুধুই হিন্দি। তাই অবাক হলেও ধাতস্ত হতে সময় লাগেনি। একটা গল্পের উল্লেখ করা যাক। দ্য লাস্ট লেসন। লেখক আলফান্সো দদেত। ১৮৭০এর টালমাটাল সময়। বিসমার্কের নেতৃত্বে গড়ে উঠছে নতুন জার্মানি। আশেপাশের এলাকাগুলোর দখল নিচ্ছে জার্মান সেনা। এভাবেই ফ্রান্সের আলসেস এবং ল্যোরেন প্রদেশ দখল করে জার্মানি। ফরাসি ভাষার বদলে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয় জার্মান ভাষা। এটাই এই গল্পের মূল জায়গা। গল্পে দেখানো হচ্ছে এই অধিগ্রহণের ফলে এক ফরাসি শিক্ষক কর্মচ্যুত হন। হামেল ছিলেন ফরাসি ভাষার শিক্ষক। জার্মান অধিগ্রহণের ফলে তার চাকরি যায় কারণ শিশুদের শুধুই জার্মান ভাষা শেখানো হবে। কর্মজীবনের শেষ দিনে বোর্ডে হামেল লিখে যান ভিভা লা ফ্রান্স – অর্থাৎ ফ্রান্স দীর্ঘজীবি হোক।


কতক থমকালে চমকের সঙ্গে সন্ধি। পারাপার এড়িয়ে পথের সঙ্গে লুকোচুরি। কতকগুলি শিশু একটি অনুষ্ঠান উপলক্ষে সুকুমার রায়ের হজবরল-এর একটা নাট্যরূপ মঞ্চে উপস্থাপন করবে। সময়ের সঙ্গেই তাদের বাংলা বলায় পরিবর্তনও হচ্ছে। কিন্তু!!! সময়ের অলিখিত আদেশই হবে! বাঙালি শিশুরা আজ বাংলা জানে না। মজ্জায় ঢুকে পড়ছে ইংরেজি, হিন্দি অথবা অন্য কোনও ভাষা। অবাক হওয়ার কিছুই নেই। সমকালীন অর্থে ইটস প্রস্পেক্টাস। ডিসকার্ড এভরিথিং এলস। এটা এগিয়ে যাওয়ার সময়। ১০০-র গণ্ডি ছাড়িয়ে সিজিপিএ। সাইন্স নিতেই হবে। কমার্স অথবা আর্টস নিলে ইনকাম তলানিতে ঠেকার সম্ভাবনা। মা-বাবারা অতি অবশ্যই মঙ্গলে বিশ্বাসী।
ভুল করেই অবাক হওয়া যায়। আপনি চাইলেই যায়। এসবের মধ্যেই অবাকের একটা উদাহরণ দিই? আমার এক সহকর্মী আছেন। জন্ম বাংলাতে হলেও পিতার কর্মসূত্রে বিভিন্ন রাজ্যে কাটিয়েছেন ছেলেবেলা। বেড়ে ওঠা দুই দশকেরও বেশি সময়। ভাষায় পশ্চিমা টান। হিন্দিতে আমার থেকে অনেকই স্বচ্ছন্দ। ভালো করে বাংলা পড়তে অথবা লিখতে না পারলেও, বলতে পারেন, বোঝার চেষ্টা করেন। মাঝে মাঝেই আমাদের আলাপ হারিয়ে যায় ফুলডুংরি-র টিলায়, শান্তিনিকেতনে অথবা ইন্দ্রনাথের ডানপিটেমিতে। ইতোমধ্যে বেড়াতে যাওয়ার কারণে শরৎবাবুর ভিটে দেউলটি-তে যাওয়া হয়েছিল। শান্ত পরিবেশে মুগ্ধ হয়েছিলেন বইকি। মাঝে আমার তাড়নায় সামান্য কিছু আবোল তাবোল, পাগলা দাশু। তারপর ভাষা সমস্যায় ভাষ্যের শরণাপন্ন।
একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, সারা জীবন ভিনরাজ্যের পরিযায়ী এতো বাংলা জানল কি করে? আমার অবাক প্রশ্ন। উত্তর ছিল মা ছোটবেলায় কিছু শিখিয়েছিল। এখনও ভালো কিছু হলে মা পড়ে শোনায়, বুঝিয়ে দেয়। তিনি ফুটবল বোঝেন না, ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগানে রুচি নেই। বাঙাল কাঁটা এবং গন্ধের কারণে ইলিশ এড়িয়ে চলেন। তবে চিংড়ি ভীষণ প্রিয়। খেলার স্কোর মোহনবাগান – ১, ইস্টবেঙ্গল – ০। বিজয়ী বাঙলা, বাঙালি এবং বাংলা সংস্কৃতি।


আমার বাংলা এখন বিভাজিত বক্ষদ্বয়ে। এপার বঙ্গ, ওপার বঙ্গ। হিন্দু, মুসলমান। লাল, সবুজ, গেড়ুয়া। মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল। কাঁটাতার। তবু যেন আপন, নিজস্ব, বেক্তিগত, নিবিড়। ঢাকানিবাসী এক মহিলা আজও কলকাতা-র এই ভাইয়ের অপেক্ষায়। কবে আসবি? পাসপোর্টের আয়ু কমে আসে। দিদি এলে দেখা হয়, ভালবাসার আদানপ্রদান, রাখি অথবা ভাইফোঁটা-র রেওয়াজবিহীন অন্য ভাতৃত্ব। দিদিতৃত্ব। অবাক হবেন না, অভিধানে এই শব্দটি নেই। আমিই বললাম। ইউনিভার্সাল ব্রাদারহুড হলে ইউনিভার্সাল সিস্টারহুডে দোষ কই?
আসলে বাংলা এবং বাঙালি-র মতোই অন্যান্য সমস্ত ভাষা, ভাষ্য। বেক্তিগতভাবে সমস্ত ভাষাকেই সম্মান জানাই। ভাষাপ্রীতি থেকেই হয়ত পাগলামির জন্ম নেয়। লোরকা এবং সাঁত্রে পড়ার বাসনায় অন্তর্জাল মাধ্যমে স্প্যানিশ এবং ফ্রেঞ্চ শেখার চেষ্টা! পাগলামিই তো। অজানাকে জানানোর জন্য রাত-বিরেতে রবীন্দ্রনাথের গানের মানে ব্যাখ্যার স্পর্ধা আসলেই ভালবাসা। মানুষগুলোর প্রতি। যিনি লিখেছেন এবং যিনি শুনতে চান।
আমার এক পরম আত্মীয় আছেন। পাগল ছাগল মানুষ। ব্যবসায়ী, লেখক, খ্যাপা গায়ক। আমার জীবনের মৈত্রীয়ই-র কু-ঝিক-ঝিক। আমার আরেক পরম আত্মীয় বাঙাল হয়েও মোহনবাগান সমর্থক। ইলিশ-চিংড়িতে কব্জির ডুব। এই মানুষগুলি মুছে দিয়েছেন দেশ, কাল, সীমানার গণ্ডি। প্রত্যেকটি মানুষ। ভাষা এবং ভাষ্য নির্বিশেষে এদের ভালবাসি।
লেখাটি একান্তই বেক্তিগত। ধরে নিতেই পারেন, রেস্তোরায় খেতে বসে, ন্যাপকিন টেনে লিখে ফেলা কিছু পংক্তি। প্রশ্ন করতেই পারেন – সারা জীবন বর্ন এন্ড ব্রেড ইন আইসিএসসি ইংলিশ মিডিয়াম, ইংরেজির শিক্ষক; তুমি কোন হনু হে? বাংলা নিয়ে এতো জ্ঞান দাও? আপনাদের প্রশ্নের উত্তর আমার কাঙালপনা। আমি না ইংরেজি জানি, না বাংলা। অহমিয়া, নাগা, ওড়িয়া, পাঞ্জাবি, গুজরাতি, মারাঠি, মালয়ালাম, ফ্রেঞ্চ, স্প্যানিশ, লাতিন – বিশ্বাস করুন!! কিচ্ছু জানি না। শুধু জানি এই ভাষার জন্য বহু মানুষ প্রাণ দিয়েছেন। তা সে যে কোনও ভাষাই হতে পারে। কিছু মানুষ অঞ্চল, রাজ্য, দেশের গন্ডি পেরিয়ে সমস্ত ভাষ্যের মানুষ এবং তাদের সংস্কৃতিকে আপন করে নিতে চেষ্টা করেছেন। তাদের ভালবাসি, শ্রদ্ধা করি। কিছু মানুষ অন্যের ভাষ্য দমনের লক্ষ্যে নিজের ভাষ্যকে তাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন। পোশাকি নাম – লিঙ্গুইয়িস্টিক শভিনিসম। হ্যাঁ, তাদের ঘৃণা করি।
ইংরেজ বলবেন মাদার। ফরাসি বলবেন মিয়েদা। স্প্যানিশ বলবেন মেদ্রে। জাপানি বলবেন হাহা। গুজরাতি বলবেন আম্মা, মারাঠি বলবেন আই, বিহারি বলবেন মাম্মি। আমি বলব মা। পাসপোর্টের দিন গুনতে গুনতেই মনে রাখি ঢাকায় কেউ অপেক্ষায় আছে। পেনসিলভেনিয়ার এক গবেষক আমাকে দেখে খুশি হবেন। এককালে সহপাঠি ছিলাম। এখন অভিন্ন বন্ধু। আমার বন্ধুবর দেশের বহু খবরের কাগজে লিখে নাম করলেও তর্কে বন্ধুতা ঝড়ে পরে। মঞ্চের প্রতিবাদী বন্ধুর সঙ্গে তর্ক পেরিয়ে আমাদের সহাবস্থান। কেরলীয় বাঙ্গালোর এভাবেই বাংলায় বেড়ে ওঠে। হয়ত আমার থেকেও ভালো বাংলা বলে থাকেন। শুধু আমিই মিক্সড ব্যাগ হয়ে পেরিয়ে আসি একের পর এক লিপি।
তাদের সঙ্গে ভাষ্যের অমিল। মনের মিল। ভাষার মিল। কারণ জেমস কির্কাপ তার কবিতায় লিখেছেন – রিমেমবার, নো মেন আর স্ট্রেঞ্জ, নো কান্ট্রি ফরেন…।