মুকুর বৃত্তান্ত

নিবেদিতা আইচ

এক।।


সমাজ কল্যাণের দেয়ালের শরীরে ছ্যাড়ছ্যাড় করে হলদে রঙের তরলটা ছিটকে পড়ছে। সোডিয়াম বাতির আলোয় রঙটা অবশ্য আলাদা করে বোঝা যায় না৷ কিন্তু জ্বালাপোড়া হয় বলে কবির জানে রঙটা লালচে হলুদ। সেদিন মঈনুল পাশ থেকে দেখে বলছিল ওস্তাদ আপনের জন্ডিস পরীক্ষা করা লাগব মনে হয়, এমন কড়া দেখা যায় ক্যান?


মঈনুলের স্বভাবটা এমন। অতিরিক্ত সতর্ক সে। সারাক্ষণ এটা ওটা নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকে। মাঝেমাঝে বিরক্ত হয়ে যায় কবির। জন্ডিস ফন্ডিস কিচ্ছু নয়। ও ভালো করেই জানে দশ বারো গ্লাস পানি খেলে সেরে যাবে এসব জ্বালা পোড়া।


নিশানা বরাবর পেচ্ছাব করতে পেরে আনন্দ লাগে ওর। জিপারটা টেনে তুলে সশব্দে হেসে ওঠে।
নিষেধ শব্দটাই এমন উসকানিমূলক! তাছাড়া এত বানান ভুল করলে চলে? একটা বাক্যে যদি চৌদ্দটা বানান ভুল থাকে তাহলে পেচ্ছাব করাও ভুল নয়৷


নিজের যুক্তিতে নিজেই হেসে ওঠে কবির। ফলে বুকের ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা বজ্জাত কাশিটা আরেকবার খাঁচার গায়ে গোত্তা খেয়ে সজোরে নিজের অস্তিত্ব জানান দিয়ে যায়। আটকে থাকা হাওয়ার দমকে প্রতিবারই যেন বুকের রিবসগুলো ভেঙ্গে চুরচুর হবার দশা হয়। আশেপাশে কেউ থাকলে খুব সুবিধা, পিঠে খানিকটা মালিশ করে দিলে আটকে থাকা কফটা বেরিয়ে আসে।


দমটাকে ছাড়তে না পেরে বুকে হাত দিয়ে নোংরার মধ্যেই বসে পড়ে কবির। সারাবছর এই এক হুজ্জত। শালার কাশি!


ঝুঁকতে ঝুঁকতে যখন প্রায় মাটিতে পড়ে যাচ্ছিল ঠিক তখন ওর পিঠে সজোরে বেশ কয়েকটা থাবা দিল কেউ। আর প্রায় সাথে সাথেই মুখ থেকে ছিটকে বেরিয়ে এলো থকথকে কফের দলাটা।


হা করে বুক ভরে শ্বাস নিতে নিতে কবির দেখতে পেল দুই লিটারের মুখ খোলা বোতলটা ওর দিকে এগিয়ে দিয়েছে মঈনুল।


এই ছেলেটার টাইমিং বরাবরই ভালো। পেট ভরে পানি খেতে খেতে মনে মনে মঈনুলের প্রতি কৃতজ্ঞ হয় সে। ওকে দেখে রাজারবাগের কেসটার কথা মনে পড়ে তার। সেদিন লোকটা কিছুতেই গাড়ি থেকে নামছিল না। এমন ঘাড়ত্যাড়া বজ্জাত লোকের পাল্লায় পড়েছিল। সেদিন টাইমিংটা মিস হতে পারত মঈনুল ঠিক সময়ে অমন জবরদস্ত বুদ্ধিটা না দিলে৷


টাইমিংটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কবির সময়ের বাইরে কোন কাজ করে না। সেদিন যেমন ঠিক সোয়া এগারোটায় কাজটা করার প্ল্যান ছিল। শুধু লোকেশনটা মনমতো হচ্ছিল না বলে ঘুরতে হয়েছে বেশ কিছুক্ষণ।


আজ যথেষ্ট সময় হাতে নিয়ে বের হয়েছে। ফলে এখন পর্যন্ত কোনো রকম সমস্যাই হয়নি। মঈনুলও এসে গিয়েছে সময়মত।


একটু ধাতস্থ হয়ে দুশো ফুট দূরে ভবনটার মেইন গেটটার দিকে চোখ রাখে সে। মঈনুল খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে তিন চারবার চক্কর দিয়ে এসে গাছটার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে৷ অন্ধকারে ওর মুখাবয়ব বোঝার উপায় নেই। এখান থেকে শুধু ওর পা দুটো দেখা যাচ্ছে। শিসটা বাজতেই কবির স্বাভাবিক গতিতে হাঁটতে শুরু করলো।


আরো চার মিনিট হাতে আছে। এক মিনিট এদিক ওদিক হলেই কাজটা হবে না আজকে। কবির দেখতে পাচ্ছে অন্যদিনের মতই লোকটা চায়ের স্টল থেকে উঠে ২৫ নম্বর বাড়ির দিকে এগোচ্ছে। কমিউনিটি সেন্টার আর সুপারশপ এর মাঝামাঝি অন্ধকার জায়গাটায় এসে সিগারেট ধরাল, রোজ যেমন ধরায়। মঈনুল ততক্ষণে লোকটার ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলছে।


ঘুরে তাকাবার আগেই এবার দ্বিতীয় শিসটা বাজাল কবির। মঈনুল ক্ষিপ্র ভঙ্গিতে ক্যারোটিড আর্টারি বরাবর পোঁচটা দিয়েই জাদুর মত অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।


কবির উল্টোদিকের গলি দিয়ে বের হয়ে দ্রুত মেইন রোডে গিয়ে ওভারব্রিজে উঠে পড়ল। ব্রিজে উঠে একবার পেছনে ফিরে তাকাল। না, কেউ পিছু নেয়নি। হনহন করে ব্রিজ পেরিয়ে নিচে নেমে গেল সে। আজকে আর মঈনুলের সাথে দেখা হবে না। দেখা তো দূর কথাও হবে না আগামী কয়েকদিন। দুজনের মধ্যে এরকম কথা হয়ে আছে।


বাড়ি ফিরে লম্বা একটা ঘুম দেবার আগে ডায়েরিতে অন্যান্য দিনের মতো আজকেও নোট রাখল কবির। পুরো ঘটনাটার সময়সহ বিবরণ লিখল। তারপর গোটা গোটা হরফে শিরোনাম লিখল- বানান ভুলের মাশুল/ নম্বর ২।


নম্বর ৩ সম্পর্কে মঈনুলের সাথে আলাপ আরো আগেই করে রেখেছে। সবরকম প্রস্তুতিও নেয়া আছে। শুধু নির্দিষ্ট দিনে কোন রকম অঘটন ছাড়া কাজটা করতে হবে৷ আপাতত ঘুম আর খাওয়াদাওয়া ছাড়া আগামী দশদিন কবিরের আর অন্য কোন কাজ নেই।


দুই।।


মঈনুলকে খোঁড়াতে দেখলে মায়া লাগে কবিরের। কিন্তু জিজ্ঞেস করলেই মঈনুল বলে - খোঁড়া না হইলে আপনার সাথে দেখা হইত না ওস্তাদ!


প্রতিবারই ওর হাসিটা কান্নার মত শোনায়৷ তারপর কান্নাটাকে আড়াল করতে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়েই চা কিংবা সিগারেট আনতে চলে যায় সে। এই এখন যেমন গেল।


কবিরের মনে আছে মঈনুলের সাথে ওর প্রথম দেখা হয়েছিল হাসপাতালে। এর মাসখানেক আগে ওর বাবা মারা গেছে। নানা ঝামেলায় সময়মত চিকিৎসা করাতে পারেনি। ফলে সেবার ডাক্তার বলে দিল চিকিৎসায় দেরি হওয়ায় ওর জয়েন্ট জোড়া লাগেনি ঠিক মত। মারাত্মক ইনফেকশন হয়ে অবস্থা ততদিনে আরো সঙ্গিন। বেডে শুয়ে শুয়ে হাঁপুস নয়নে কাঁদছিল মঈনুল।


ওর সাথে সেদিন থেকেই কবিরের পরিচয়। পরিচিত হয়ে দুজনেই লাভবান হয়েছে। একে অন্যের কাজে আসছে।


চা সিগারেট খেতে খেতে মঈনুল মাঝে মাঝেই নিজের গল্প শোনায়। কবিরও আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করে প্রতিবারই ৷ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে অসংখ্য প্রশ্ন করে।


তোর নামে যে ফেসবুকে লিখছিল তারে তুই চিনতি আগে থেকে?


না! খুরশীদ আলম একই গ্রামের হইলেও আমি জীবনে তারে চোখে দেখিনাই। সে শহরে বড় হইছিল সম্ভবত।


শুধু শুধু লোকটা এত বড় ক্ষতিটা কেন করল!


পরে জানতে পারছি খুরশীদ আলমের বাপের সাথে একাত্তরে আব্বার ঝামেলা হইছিল। লোকটা গ্রামের ছেলেপেলেদের খবর পাচার করত পাকবাহিনীর কাছে৷


যেদিন ওরা তোকে মারল সেদিন অত রাতে বাইরে কী করতেছিলি?


শাহবাগের মিছিল থেকে হলে ফিরতেছিলাম। আমার বন্ধু ফোন দিয়া বলল ফেসবুকে আমার নামে, আব্বার নামে একজন জানি কীসব পোস্ট দিছে।


তুই দেখছিলি সে পোস্ট?


আমি দেখার সুযোগই পাই নাই। হলে ফিরে দেখব ভাবছিলাম। দুইজন আমারে ফলো করতে করতে ফুলার রোড পর্যন্ত আসছিল। আমি টের পাওয়ার আগেই অন্ধকারে নিয়া মাইর শুরু করল।


তোর বাপ খবরটা পাইল কবে?


আমার সেই বন্ধুটাই ফোন কইরা আব্বারে জানাইছিল।


তুই রাজাকারের পোলা হইলে শাহবাগে গিয়া রাজাকারের ফাঁসি চাস কেমনে! কারো মাথায় এই সহজ কথাটা আসল না?


সবাই ভাবছে বাপ রাজাকার ছিল বলে আমি ইচ্ছা কইরা সাধু সাজতে এসব আন্দোলনে গেছি।


কবির আর প্রশ্ন করে না ওকে। মঈনুলের আব্বা এমনিতেই রোগে ভুগে বিছানায় পড়েছিলেন বেশ কয়েক বছর ধরে। কিন্তু শেষ বয়সে গুরুতর অপবাদটা মেনে নিতে পারেননি। আর মঈনুল হাসপাতালে ভর্তি থাকায় বাড়ি ফিরে বাপকে শেষ দেখা দেখতে পায়নি।


ফেসবুকের পোস্টটা কবির পরবর্তীতে আর খুঁজে পায়নি। লোকটা নাকি নিজের ভুল স্বীকার করেছে পরে। অন্য একজনের সাথে মঈনুলের আব্বার নাম গুলিয়ে ফেলেছিল সে।


এসব স্বীকারোক্তিতে অবশ্য কিছু যায় আসেনি। মঈনুলের ক্ষতি যা হবার হয়ে গেছে ততদিনে। কবির খুব ভাল করে জানে সে ক্ষতি কতটা ভোগাচ্ছে ওকে।


তিন।।


কবিরের মাথাটা গরম। কাজটা শেষ করার পর অন্যান্য দিনের মতই সোজা মেসে ফেরা উচিত ছিল তার। তা না করে মঈনুলের আবদার রাখতে বিরিয়ানি খেতে এসেছে হোটেলে। খেতে বসে এখন গা গুলাচ্ছে তার। তার উপর খাবার দিতে এসে ছেলেটা খুব বজ্জাতি করল কিছুক্ষণ। কিছুতেই দুই বাটি ডিমের ঝোল সে দিল না। দুজন মানুষ দুটো আলাদা প্লেট দেবে তাও না। কবির যখন বলল দুজনের বিলই সে দেবে তখন ক্যাশে বসা লোকটার কাছে গিয়ে ফিসফিস করে কী সব বলল। এখনো ছেলেটা ওখানে দাঁড়িয়ে হা করে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। ক্ষিদে লাগায় কবির এখন আর সেদিকে লক্ষ করছে না।


এদিকে মঈনুলের পাতে খাবার যেমন দিয়েছিল তেমন পড়ে আছে। সে মুখে তুলছে না কিছু। অথচ আজকে ওদের সবচেয়ে স্বস্তির দিন, সফলভাবে 'ভুলের মাশুল:তিন নম্বর' মিশন কমপ্লিট হয়েছে। কিন্তু মঈনুলের চোখেমুখে কোন আনন্দ নেই যেন। কেন এমন করছে সে? জানার জন্য কবির ইচ্ছা করেই ওকে খোঁচা দেয় এবার।


কী রে বিলটা কি আমি দিমু? খুরশীদরে যে সাইজ কইরা দিলাম, আজকে তো তোর আমারে ট্রিট দেওনের কথা।


মঈনুল তবু কথা বলল না। এমনকি খাওয়া শেষ করে বিল দিয়ে ফিরে এসে দেখা গেল কিছু না বলেই মঈনুল চলে গেছে। কখনো এমন করে না ছেলেটা। কিন্তু ওর খামখেয়ালের স্বভাব তো জানা আছে কবিরের। তাই খুব একটা ভ্রুক্ষেপ না করে সেও বেরিয়ে পড়ল।


কেমন অস্বস্তি লাগছে আজ কবিরের। যেন কেউ পিছু নিয়েছে। সব মঈনুলের দোষ। কী দরকার ছিল এত রাতে আবার হোটেলে ঢোকার। যেদিন ওদের কাজ থাকে সেদিন আর কোথাও না গিয়ে সরাসরি যারযার বাসায় ফেরে। এই প্রথম নিয়মের ব্যত্যয় করল।


কেউ ফলো করছে কিনা নিশ্চিত হতে কবির কিছুক্ষণ এলোমেলোভাবে হাঁটল। হেঁটে হেঁটে সব ধরণের সাইন বোর্ড আর দেয়ালের লেখাগুলো পড়ল। এটা একটা খেলা। এসব লেখা পড়তে গিয়ে সে আবিস্কার করেছে প্রায় সবকটাতেই কিছু না কিছু বানান ভুল থাকবেই। বানান ভুল কেন করে লোকে? বানান ভুল এমনকি কারো মৃত্যুর কারণও হতে পারে!


অনেকক্ষণ হাঁটবার পর কবির ভাবল এবার সে সোজা মেসে ফিরবে। বিরিয়ানি খেয়ে শরীর ভারভার লাগছে। এদিকে রাস্তাঘাটও ফাঁকা হয়ে এসেছে। আশেপাশে কোনো রিকশা নেই। কাজেই জোরে হাঁটা দিল সে। হাঁটতে হাঁটতে চাপাস্বরে মঈনুলকে ডাক দিল একবার। আশেপাশেই কোথাও ছিল মঈনুল, সবসময় যেমন থাকে। ডাকতেই 'জি ওস্তাদ' বলে সাড়া দিল। তারপর কৃষ্ণচূড়ার ছায়ার আড়াল থেকে খোঁড়াতে খোঁড়াতে বেরিয়ে এলো। দুজনে হাঁটতে হাঁটতে মেসের গলি অব্দি গেল। এটুকু এসে মঈনুল বিদায় নেয় প্রতিদিন।


অতিরিক্ত হাঁটাহাঁটির ফলে পায়ের ব্যথাটা বাড়ছে কবিরের। বাকি পথটুকু সেও খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এলো। ক্লান্তিতে এখন শরীরটা ভেঙ্গে আসছে। প্রিয় বিছানায় শুয়ে একটা নিশ্চিন্ত ঘুমের অপেক্ষা তাকে অস্থির করে তুলছে।


মেসে পৌঁছে দেখল গেটে তালা দেয়া হয়ে গেছে। সাধারণত যত কাজই থাকুক না কেন রাত দশটার মধ্যে সে ফিরে আসে। আজ শুধু শুধু দেরি করে ফেলেছে।


কয়েকবার কড়া নেড়ে সাড়া না পেয়ে এবার সজোরে কলিংবেল চেপে ধরল কবির।


ভেতর থেকে কেউ একজন 'কে রে' বলে চেঁচাতেই এবার সে বলে উঠল-


খোল, আমি মঈনুল কবির।