ডক্টর ভার্দির উড়ো মার্জার

মাহরীন ফেরদৌস

কালো রঙের বিড়ালটি স্ক্রিনটা কিছুটা বাম দিকে ঘুরিয়ে বলল, এবার ঠিকমতো দেখতে পাচ্ছ?
অন্য বিড়ালটি বলল, আরেকটু নিচে নামাও। হ্যাঁ, এবার একদম ঠিক আছে।

অল্পসময়ের মাঝেই স্ক্রিনে একটু ঘরের দৃশ্য ভেসে উঠল। গল্পকথক বলে উঠল,

দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধের এনসাইক্লোপিডিয়া আর্কাইভে রাখার কাজ করতে হচ্ছে। প্রতিদিন এগার, বারো ঘন্টার শ্রম দিয়েও কুলানো যাচ্ছে না। একেক পর এক বিভিন্ন বিষয় যুক্ত হয়ে যাচ্ছে যা ধৈর্য্য সহকারে নানা অধ্যায়ে, রচনায় আমি জুড়ে যাচ্ছিলাম। তবে বার বার প্রতিটি তথ্য, রচনা নিয়ে খুঁটিনাটি কাজ করে যাওয়া আমাকে যেন কোন অনন্ত টানেলের ভেতর গড়িয়ে পড়ার মতোই অনুভূতি এনে দিচ্ছিল, যেখানে একবার গেলে তা থেকে আর কেউ কোনদিন বেরোতে পারবে না। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসা এই সময়ে বাইরে প্রায় অন্ধকার। আমি বিচ্ছিন্ন না হবার চেষ্টা করে কাজে পূর্ণ মনোযোগ ঢেলে দেওয়ার চেষ্টা করছি। এমন সময় দরজার কাছে হালকা সরসর করে শব্দ হলো। আমি পাত্তা না দেওয়ার চেষ্টা চালালাম। হাতের কাজটুকু শেষ করতে হবে। এখন যেই এনসাইক্লোপিডিয়াটি নিয়ে কাজ করছি এটার কাজ গতবারেরটির চেয়েও পরিশ্রমের। এই শতকের যুদ্ধ নিয়ে প্রাথমিকভাবে কাজ করতে হচ্ছে। গত আড়াই বছর ধরে লেবানন যুদ্ধ, ইরাক যুদ্ধ, লিবিয়া, সিরিয়া, আফগানিস্থান, ফিলিস্থিন, চীন, কাশ্মীর, মেক্সিকো, মিয়ানমারের কাজ শেষ করে এখন অস্ট্রেলিয়ার কাজে প্রাথমিকভাবে হাত দিতে হবে। সরসর শব্দটি আর দরজার বাইরে থেকে হচ্ছে না বরং এখন বারান্দা থেকে আসছে। বারান্দার পেছনে বেশ বড় আকারের একটা জেনারেল শারমান গাছ। সেটার গুড়ির কাছ থেকেই একটু পরপর আসছে শব্দটা। এই বিষাদগ্রস্ত অর্ধসমাপ্ত শহরের সবচেয়ে বড় গাছ এটি। গাছের গায়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অজস্র গর্ত। সেখানে গরমকালে বিদেশি পাখি ও কাঠবিড়ালিদের বসবাস বেড়ে যায়। তাই সারাদিন খুটখাট শব্দ হতেই থাকে। তবে এবারের শব্দটি একটু ভিন্ন। যা কিছুটা কৌতূহল জাগাচ্ছে। তারপরেও শব্দটিকে উপেক্ষা করে আমি নিজের কাজে মনোযোগ দিতে চেষ্টা করে গেলাম। আজকের মতো হাতের কাজটি শেষ করে একটি অনুষ্ঠানের বর্ণাঢ্য বর্ণনার মসৃণ চিঠি লিখতে হবে। সাদামাটা সেই অনুষ্ঠানকে এমন রূপ দিতে হবে যেন সেখানে উপস্থিত থাকা মানেই উঁচু জাতে এবং প্রাপ্তির চূড়ান্তে পৌঁছে যাওয়া।

হঠাৎ দূরে কোথাও বাজ পড়ল আর সাথে সাথে বেশ কিছু বিড়াল ক্ষণে ক্ষণে ডেকে উঠল শারমান গাছটি থেকে। আর বারান্দার কোণ থেকে বল গড়ানোর মতো মৃদু শব্দ হতে থাকল।

'বেয়াদব বিড়ালের দল।’ মনে মনে এটুকু বলে চিৎকার করতে ইচ্ছে হলো আমার।

কিছু মাস হলো আমার বাসার পাশের পরিত্যক্ত বাড়িটিতে একজন বিজ্ঞানী থাকতে শুরু করেছে। তার বাড়ির বাগান এবং আমার বাড়ির বাগান পাশাপাশি। লোকটি অবশ্য অল্প কয়েকদিনের মাঝেই নিজের বাগানটিকে নতুন চেহারা দিতে সফল হয়েছে। এক কোণে বানিয়েছে একটি কৃত্রিম পুল। ফেলেনোলজি নিয়ে গবেষণা করা এই বিজ্ঞানীর কাছে বর্তমানে আছে ডানাওয়ালা আটটি বিড়াল। দিনের বেলা প্রচণ্ড গরম পড়লে এরা পুলে ভাসা ভাসা ভাব দেখিয়ে সাঁতার কাটে এবং সন্ধ্যা হলেই পাশাপাশি থাকা দুটি বাগানের মধ্যে অল্প উচ্চতায় উড়ে বেড়ায় ও পাখিদের সাথে পাল্লা দেওয়ার চেষ্টা করে। তবে পাখিদের চেয়ে শরীর ভারী বলে এরা খুব বেশি উঁচুতে উড়তে পারে না। ফলে, সবজি বাজারে গলাবাজি করা গ্রাহকের মতো একইসাথে করুণ এবং রাগত স্বর তুলতে থাকে। প্রায়শই বিকেলে শারমান গাছের চারপাশে পাখি ও বিড়ালের ডাকে একটা পর্যায়ে বিচ্ছিরি ক্যাওস তৈরি হলে আমি অধৈর্য্য হয়ে যখন গালাগালি শুরু করি, তখন সেই বিজ্ঞানী মুখ দিয়ে বিচিত্র এক বাঁশি বাজিয়ে বিড়ালগুলিকে ঘরে নিয়ে যায়। নিজের গবেষণার বাইরে সে প্রচলিত জীবন চালায়। তবে আপাদমস্তক আমার তাকে একজন ভণ্ড বলেই মনে হয়। মনে হয়, অন্য কোন গবেষণায় বিশেষ লাভ করতে পারেনি বলেই সে বিড়াল জাতীয় প্রাণী নিয়ে গভীর-বুদ্ধিগত প্রোপাগান্ডা ছড়াতে চাইছে। এই শহরের অবস্থা ভালো না। দর্শক উপচে পড়া বারোয়ারি প্রেক্ষাগৃহ থেকে শুরু করে লাল পাতার জনপ্রিয় পার্ক পর্যন্ত সবই আজকাল বেশিরভাগ সময় থাকে জনশূন্য। শুধু মাঝে মাঝে বিক্ষিপ্তভাবে ঘুরে বেড়ায় কিছু মানুষ। যাদেরকে কেউ ঠিক ঘাঁটাতে চায় না। আক্রমণাত্মক লুটপাট, ধ্বংসক্রিয়া, দারিদ্র ও নানান রকমের পতন সামাল দিতে দিতে শহর এখন করুণ ও নিঃস্ব। রাত নামলে গা-ছমছমে জনপদ। আকাশটা শুধু স্তুপীকৃত মেঘের মোড়ক নিয়ে খাদের মতো গভীরে চলে যায়। নক্ষত্র দেখা যায় না বহুদিন। সুতরাং এমন পরিস্থিতি আর সময়ে, শহরে বিড়াল নিয়ে গবেষণাকে নিশ্চিত মিথ্যা রটনা মনে হবারই কথা।

আমি লেখায় মন দেবার চেষ্টা করার কিছুক্ষণের মাঝেই আবার বারান্দার সরসর শব্দটা ফিরে এলো। প্রচণ্ড বিরক্ত হয়ে ঘাড় ঘুরালাম। বারান্দা দেখা যাবার দরজাটা বন্ধ। আর জানালার কাচটাও টানা। হালকা অন্ধকারের কাচের অন্যপাশ থেকে শুধু দেখা গেলো একটা প্রাণীর মুখ। প্রথমে ভাবলাম কাঠবিড়ালি, পরে বুঝলাম সেটা বিড়াল। ডান থাবা দিয়ে সে কাচের ওপর একটু পরপর ধীরে আঁচড় কাটছে। আমি ভ্রুকুটি করে তাকাতেই সে মাথা নাড়ল। যেন কিছু বলতে চাইছে। দ্রুতপায়ে জানালার কাছে গিয়ে একটানে সেটা খুলে দিলাম। পরিকল্পনা ছিল বিড়ালটাকে ধমক দিয়ে তাড়াব, কিন্তু সম্ভব হলো না। জানালা খোলার সাথে সাথে বিড়ালটি হালকা উড়ে অনায়াসে ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ল। তারপর সদ্য বেড়াতে আসা অতিথির ভঙ্গিতে ডাঁটের সাথে পুরো ঘরে চোখ বুলিয়ে লেখার টেবিলের পাশের আরাম কেদারায় বসল। আমি ভুল করতে পারি, কিন্তু বিড়ালটি বসার পরেই আমার মনে হলো চারিদিকে একটা রহস্যময় নৈঃশব্দ্য সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি বাইরে থেকেও আর কোন শব্দ আসছে না। এদিকে আমার মাথার ভেতর জমে থাকা ক্রোধ চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। ইচ্ছে করল ওর দুঃসাহস দেখে ওর মালিক অর্থাৎ সেই অসভ্য বিজ্ঞানীটির বাড়ি যেয়ে ভাঙচুর করে আসি।

‘একটা বিয়ার খেলে কেমন হয় কিংবা এক বাটি দুধ?’ আরাম কেদারায় বসে বিড়ালটি আলতো করে তার ডানা দুটি মেলে, পেছনের লেজ ঘুরিয়ে হঠাৎ গম্ভীর স্বরে বলে উঠল।

‘বাড়িতে আধ বোতল বিয়ার আছে শুধু। তবে সেটা কাউকে দেওয়ার জন্য না।’ গম্ভীরভাবে উত্তর দিলাম আমি। এমনভাবে বললাম যেন শব্দগুলো দিয়ে ওকে কিছুটা আঘাত করতে পারি।

‘ঠিক আছে। যদি কোন শুকনো মাছ বা টুনা বিস্কুট থাকে, তাও দিতে পারো। খেতে খেতে কথা বলব।’

‘আমি তোমাকে কিছুই দেব না। কারণ আমার বিশ্বাস তুমি আসলে কোন উদ্দেশ্য নিয়ে এখানে হাজির হয়েছ। তোমাকে আর তোমার মালিককেও আমি দেখে নেব।’

‘হ্যাঁ ঠিক ধরেছ। উদ্দেশ্য নিয়েই এসেছি।’ অকপটে স্বীকার করে নিল বিড়ালটি।

কথাটা শুনে আমি একটু চমকালাম। এমন সরাসরি উত্তর আমি একদমই আশা করিনি। আর একইসাথে লক্ষ্য করলাম বিড়ালটির লেজ বেশ ছোট আর শীর্ণকায়। আকাশে উড়তে পারার সুবিধার জন্যই এমন নাকি কে জানে! আমি লেখার টেবিলের চেয়ারটি সরিয়ে আরাম কেদারার কাছে এগিয়ে গেলাম ধীর পায়ে। ভেবেছিলাম আমাকে অগ্রসর হতে দেখলেই বিড়ালটি ঘাবড়ে যাবে। কিন্তু এমন কিছুই হল না, সে মৃদু ও নীরস একটা হাই তুলল। তারপর আবার বলল,

‘আমার মালিকের নাম তো ভার্দি। তাকে নাম ধরে ডাকো না কেন? আর হ্যাঁ, তাকে আমার কথা জানালে তুমিই বিপদেই পড়বে। ইতিমধ্যেই আমাকে নিয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু হয়ে যাবার কথা।’

‘মানে?’

‘মানে আমি অল্প সময়ের জন্য পালিয়েছি।’

‘পালিয়েছ মানে কি? তুমি ওর কয় নম্বর বিড়াল?’

‘আট দশমিক সাত নয় শূন্য পাঁচ।’

‘এমন নম্বর কেন? আমার জানামতে তার তো শুধুই আটটি বিড়াল। আমি তাই ধরেই নিয়েছিলাম এদের মধ্যে চারটি ছেলে আর চারটি মেয়ে। যাদের যুগলববন্দী ঘটিয়ে সে এই শহরটাকে নরক বানানোর পাঁয়তারা করছে। কিংবা হয়তো তোমাদের সামনে রেখে আঁধারে লুকিয়ে এরচেয়েও ভয়ানক কোন পরিকল্পনা করছে এই নগর ধ্বসিয়ে দেওয়ার জন্য।’

‘বলো কি! আমাদের তো বরং তোমাকে নিয়ে এরকম ধারণা। দিনের পর দিন নিজের প্রশস্ত কক্ষের চেয়ার-টেবিলে বসে কাজ করে করে তুমি এই শহরকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছ।’

‘কী বলছ এসব? আমার বাসায় এসে আমাকেই আজগুবি কথা শোনাচ্ছ? এখনই বের হও এখান থেকে। এইসব বাজে কথা শোনার সময় নেই আমার। আরও কিছু কাজ বাকি। প্রায় এগার ঘণ্টা ধরে টানা কাজ করছি আমি। আর অল্প কিছুক্ষন কাজ করে এরপর আজকের মতো বিশ্রাম নেব।’

‘তুমি গত তিনদিন ধরে জেগে আছ আর টানা কাজ করছ। নিজেও বুঝতে পারছ না। কারণ তোমার ঘরের ঘড়িটি বন্ধ আর বাইরে তাকালে আবহাওয়া নিয়ে সম্ভবত তুমি মাথা ঘামাও না।’

‘কী আশ্চর্য! এসব তথ্য কোথা থেকে বলছ তুমি? আর তুমিই বা কীভাবে জানো? কথাগুলো শুনে কিছুটা দ্বিধা করলেও জ্বলন্ত দৃষ্টি দিয়ে বললাম আমি।’

‘ভার্দি তোমার ওপর নিয়মিত নজর রাখে। এক থেকে আট নম্বরের বিড়ালরাও রাখে। তবে ওরা শুধুই তোমাকে লুকিয়ে দেখে। আর তারপর ভার্দি ওদের মস্তিষ্ক থেকে স্মৃতি পড়ে জেনে নেয় তোমার তথ্য। আমার বেলায় অবশ্য কষ্ট কম। আমি নিজেই বলে দেই। কিন্তু আমার অন্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে বলে আমাকে এসব কাজে ডাকে না। আজ আমি অবশ্য নিজেই এসেছি তোমার কাছে।’

‘তোমার কোন কথাই বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না আমার। আর সম্ভবত আমার সাথে তুমি কথাও বলছ না। আমি বিড়ালের ভাষা জানি না, আর তোমারও মানুষের ভাষা জানার কথা না। সত্যি যদি আমি টানা তিন দিন ধরে কাজ করে থাকি তারমানে এসব কিছুই আসলে আমার কল্পনা। হ্যালোসিনেশন। তাই ভালোয় ভালোয় দূর হয়ে যাও।’

‘এই বুঝলে তুমি এতক্ষণ আমার সাথে আলাপ করে? কী করা তাহলে? চলে যাচ্ছি আমি।’

বেশ দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ফেলে হতাশ কণ্ঠে বলল বিড়ালটি। তারপর ডান দিকের ডানা অল্প নাচিয়ে জানালো,

‘এনসাইক্লোপিডিয়াটার কাজটা করে অনেক বড় বিপদ ডেকে আনছ তুমি। যা নিজেও বুঝতে পারছ না।’

আমি এই কথা শুনে কোন উত্তর দিলাম না। আসলে উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনেও করলাম না। বারান্দার জানালাটা খোলাই ছিল। বিড়ালটা হালকা একটা লাফ মেরে আরাম কেদারা থেকে মেঝেতে নেমে খোলা জানালা দিয়ে উড়ে বের হয়ে গেল। প্রাণীটি চলে যাবার পর আমি অনুভব করতে পারলাম আমার প্রচণ্ড ক্লান্ত লাগছে, মনে হচ্ছে আসলেই যেন বহুদিন ঘুমাই না। কিংবা হয়তো সবই এতক্ষণ স্বপ্নে দেখছিলাম। আমি আরাম কেদারায় গা এলিয়ে দিলাম। আমার দু চোখ টনটন করতে থাকল। শহরে শেষ যে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড হয়েছিল, সেই আগুনের লেলিহান শিখা, দমকল বাহিনীর ঘনঘন সাইরেন সবকিছু আমার চোখের সামনে আর মাথার মধ্যে বাজতে লাগল। আট দশমিক সাত নয় শূন্য পাঁচ নম্বর বিড়ালটি কেন আমাকে বলল, এনসাইক্লোপিডিয়ার কাজ করে আমি মস্ত বড় ভুল করছি আমি সেটা নিয়ে একটু ভাবতে চাইলাম। কিন্তু পারলাম না। আধবোতল বিয়ারটুকুও খাওয়া হল না। কানের ভেতর দমকল বাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি কোলাহল নিয়ে আমি আধো ঘুম- আধো জাগরণের এক অন্য মাত্রায় প্রবেশ করলাম।

পরদিন দুপুর নাগাদ আমার ঘুম ভাঙল। দরজার নিচ দিয়ে পোস্টম্যানের দিয়ে যাওয়া দুটা খাম পেলাম। শহরে এখন একটাই পোস্টম্যান, কেউ তেমন চিঠিপত্র লিখেও না। তাই ধারণা করতে পারলাম খুব ভোরেই হয়তো খামগুলো দিয়ে গিয়েছে। একটা খাম থেকে এনসাইক্লোপিডিয়ার কাজের অগ্রগতি জিজ্ঞেস করা হয়েছে। আর অন্যটি থেকে সেই গোপনীয় অনুষ্ঠানের বিষয়টি নিয়ে আজকের মাঝে লেখা চাওয়া হয়েছে। সেই সাথে কিছু সাংকেতিক সতর্কবাণীও আছে। আমার হঠাৎ করেই গতকাল সন্ধ্যার কথা মনে পড়ে গেল। এবং বিশ্বাস করতে শুরু করলাম নিজেকে ক্লান্তিকর কাজ থেকে ছুটি দেওয়ার জন্য আমি নিজেই সবকিছু কল্পনা করেছিলাম। তারপরেও কেন যেন সন্ধ্যার সব ঘটনা মনে করে আমি একটা লম্বা নিঃশ্বাস ফেললাম। এরপর খাবারঘরে গিয়ে নিজের জন্য অল্পকিছু শুকনা খাবার ও বাদবাকি বিয়ারটুকু নিয়ে আমি জানালার কাছে চলে গেলাম। দিনের ঝকঝকে রোদে শারমান গাছটা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে। আর চারপাশে তার কিছু ডালপালা নৃত্যরত মদ্যপায়ীদের ভঙ্গিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। দূরে কোথাও আমুদে ডাক ডাকছে অল্প কিছু পাখি। এইটুকু দৃশ্য দেখে কে বুঝবে কেমন বিষণ্ণতা আর পশ্চাদ্গামিতায় আক্রান্ত হয়েছে এই নগরী। বিজ্ঞানী ভার্দির বাগান থেকে থেমে থেমে জলের মৃদু শব্দ ভেসে আসছিল আর সেই সাথে বিড়ালের ডাক। অপদার্থ বিড়ালগুলো নিশ্চয়ই পুলের পানিতে সাঁতার কাটছে! আমি প্লেটের খাবারটুকু শেষ করে, বিয়ারের বোতল হাতে, আমার বাড়ির বাগানের ভেতর দিয়ে ভার্দির বাগানের দিকে আগালাম। একটা পলকা বেতের বেড়া দিয়ে পাশাপাশি থাকা বাগানদুটিকে আলাদা করা হয়েছে। বেড়ার অন্যপাশ দিয়ে দেখা যাচ্ছে পুলের ওপর বিড়ালগুলোর হুটোপুটি করা আর সাঁতার। আমি মনে মনে গুণে গেলাম। সাতটা বিড়াল পানির মধ্যে। আট নম্বরটি পুলের পাশে বসে ডানায় রোদ পোহাচ্ছে। কিন্তু আট দশমিক সাত নয় শূন্য পাঁচকে কোথাও খুঁজে পেলাম না। ভার্দির বাড়ির জানালাগুলো ভারী পর্দায় টানা। ভেতরে দেখার উপায় নেই। এছাড়াও আমার মনে হলো অযথাই এখানে সময় নষ্ট করছি। গোটা ব্যাপারটাই আমার অতিকল্পনা। আমার এখন উচিৎ দ্রুত কাজে ফিরে যাওয়া। ইতিমধ্যেই দেরি হয়ে গেছে। আজকের এগার ঘন্টার কোটা পূর্ণ করতে করতে অনেক রাত হয়ে যাবে।

আসলে মহাবিশ্বের ইতিহাস সত্যিই খুব আশ্চর্যজনক। ধরতে গেলে মানুষ অনেক কম দিন ধরেই এ নিয়ে মাথা ঘামানো শুরু করেছে। শতক থেকে শতকে বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর শুরুর যে ইতিহাস ধারণ করতে চেয়েছে তা নিয়েও আছে বেশ দ্বিমত। এরইমাঝে এ শতকের মানুষগুলো এতই ধ্বংসাত্মক ও প্রতিপত্তিশালী হয়ে পড়েছিল যা ধীরে ধীরে গোটা পৃথিবীতেই নিয়ে এসেছে শ্মশানের স্তব্ধতা। খুব অল্প কিছু শহরই অবশিষ্ট আছে এখন। তারমাঝে এই শহরটাই মুখ্য। অতীতকে ধরে রাখতে তাই যা কিছু আছে তা থেকে আলাদা আলাদা করে বিবিধ বিষয় নিয়ে ছোট ছোট ভাগে এনসাইক্লোপিডিয়ার কাজ শুরু হয়েছে কয়েক বছর ধরে। সেই দিনটি আমার এখনও স্পষ্ট মনে আছে, কোমরে আগ্নেয়াস্ত্র ঝোলানো এক সামরিক কর্মকর্তা আমাকে তার গোপন কক্ষে ডেকে নিয়ে বেশ কিছু কাজ ধরিয়ে দিলেন। আর নিচু অথচ ভারী কণ্ঠে নিশ্চিত করলেন আমার নানা রকম স্বাচ্ছদ্য। আমি ভেতরে ভেতরে প্রচণ্ড আড়ষ্ট হয়ে থাকলেও মেনে নিয়েছিলাম সব। আর বাড়ি ফিরে এসে চ্যালেঞ্জ হিসেবেই নিয়েছিলাম কাজটিকে। আমার সাথে অন্য কারা কাজ করে আমার তা জানা নেই। আমার পর্যন্ত শুধু তথ্য ও উপাত্তগুলো আসে। আমিও এ নিয়ে কোন প্রশ্ন তুলি না। বড় মানুষদের আড়ালে সুরক্ষিত দল নিয়ে আমার মাথা ব্যথা নেই। আমাকে বলাও হয়েছে চিন্তা না করতে, কারণ এ কাজটি শেষ হলে আমি নাকি হবো নগরের সবচেয়ে সুপরিচিত ইতিহাসবিদ। আমিও তাই কথা বাড়াইনি, নিজেকে নিয়ে থাকতে পারলেই আনন্দিত।

দুপুরের রোদ কিছুটা হেলে পড়তে শুরু করলেই আমি পরের পর্বের কাজ শুরু করলাম। কোনই বিরতি নিলাম না। একঘেয়ে লাগলেও টানা কাজ করে গেলাম। তবে সন্ধ্যা হতেই উৎকর্ণ হয়ে উঠল আমার ইন্দ্রিয়। একটানা লেখা ও বর্ণনাগুলো নিয়ে কাজ করে যাবার পরেও একবিন্দু ক্লান্তি অনুভব না করে ক্ষণে ক্ষণে আরও সচেতন, আরও তাজা হতে শুরু করলাম। আজ বারান্দার দিকের জানালাটা খোলাই ছিল। বিড়ালটি অবশ্য খোলা দেখেই ঘরে চলে এলো না। আগের দিনের মতো মৃদু শব্দ তুলল ও ভদ্রলোকের মতো গলা খাঁকারি দিলো। তারপর আমি তাকাতেই মাথা নাড়ল এবং তীর্যক ভঙ্গিতে ডানা ছড়িয়ে ঘরে প্রবেশ করল। আগের দিনের মতো আরাম কেদারার দিকে আগিয়েও গেল থেমে। তারপর নিজের মোলায়েম শরীর টানটান করে দাঁড়িয়ে অকারণেই ডানা ঝাপটে গম্ভীর স্বরে বলল,

‘তোমার হাতে সময় বেশি নেই। সামনে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।’

একটা কাঠের বাটিতে আমি অল্প কিছু টুনা বিস্কুট রেখেছিলাম। কোন বাক্য ব্যয় না করে সেটি ঠেলে বিড়ালটির দিকে আগিয়ে দিয়ে উত্তর দিলাম,

‘তুমি আমার কাজের ব্যাঘাত ঘটাচ্ছ। আজকের দিনের কিছু ঘণ্টার কাজ করা বাকি আমার এখনও।’

বিস্কুটের বাটিটা অল্প শুঁকে রেখে দিল বিড়ালটি। এরপর আগের চেয়েও গম্ভীর স্বরে বলল,
‘ধরো একটা সুনসান, নির্জন বনের মধ্যে হঠাৎ কোন গাছ ভেঙ্গে পড়ল। কি মনে হয় তোমার, তাহলে কি কোন শব্দ হবে?’

‘অবশ্যই হবে। কেন হবে না?’

‘কিন্তু তুমি তো জানো না শব্দ হলো কিনা। সেখানে তো কেউ নেই। তুমি নেই, আমি নেই, আর কেউ নেই। তারমানে আমরা ধারণা করে ও যুক্তি দিয়ে বলতে পারি এমনটা হবে। তারমানে কিন্তু এই না যে সেটাই হচ্ছে। একইভাবে তুমি সমস্ত সংগ্রহশালা, অবশিষ্ট খবরের অংশ থেকে যে তথ্যগুলো পাচ্ছ, তা দিয়ে আসলেই তুমি কিন্তু অতীতকে সংরক্ষণ করতে পারবে এমন কোন নিশ্চয়তা নেই। অন্যকিছুও হতে পারে।’

‘শোনো, আমি যুদ্ধের এই ইতিহাসকে এমনভাবে উপস্থাপন করতে চাচ্ছি যা আগামীর জন্য সহজবোধ্য ও গ্রহণযোগ্য হয়। সবকিছুই ঠিকভাবে সমন্বয় করার চেষ্টা করছি। প্রচুর খাটনি যাচ্ছে। আরও বেশ অনেকদিন লেগে যাবে এই কাজ সম্পূর্ণ করতে।’

‘দুঃখের বিষয় তুমি বুঝতে পারছ না কত বড় বোকামি করছ। তোমার পর্যন্ত আনার পর আগের সব কাগুজে তথ্য মুছে ফেলা হচ্ছে। সবকিছু গুছিয়ে নিলে তোমাকে আর তোমার সাথে আলাদাভাবে কাজ করে যাওয়া বাকিদেরকেও নিশ্চিহ্ন করা হবে।’

‘এখন আবার আমার মনে হচ্ছে তুমি আমার মস্তিষ্কের কল্পনা। আমার আসলেই অল্প অল্প বিশ্রাম নিয়ে কাজ করে যাওয়া উচিৎ। তুমি চলে যাও। এখনই যাও।’

এ কথা শুনে বিড়ালটি কাঠের বাটি থেকে দু'টা টুনা বিস্কুট শব্দ করে চাবাতে শুরু করল। এবং মাথা ঝাঁকিয়ে বলল,

‘আমার খাওয়ার শব্দ শুনতে পাচ্ছ?’
‘হুঁ।’

‘তাহলে বুঝতেই তো পারছ আমি সত্য। আর হ্যাঁ এমনিতেও আমি দীর্ঘ সময় থাকতে পারব না। যে কোন সময় ভার্দি বুঝে যেতে পারে। তবে আমার মনে হয় তুমি ভার্দির সাথে বিস্তারিত আলাপ করে তার সাহায্য চাইতে পারো। তোমার সাথে কথা বলে যা বুঝলাম তুমি একজন পরিশ্রমী ও বোকাসোকা ইতিহাসবিদ। আর কিছু না।’

আমি ভেবেছিলাম বিড়ালটির এ ধরণের কথা শুনে আমার প্রচণ্ড রাগ কাজ করবে। কিন্তু তা না করে আমি কেমন যেন বিভ্রান্ত হয়ে গেলাম। বিড়ালটি বাটির টুনা বিস্কুট একে একে শেষ করতে লাগলো। আমি কান পেতে সেই শব্দ শুনতে শুনতে ঘরে পায়চারী করতে লাগলাম। যতই পায়চারী করলাম ততই অস্থির হয়ে থাকলাম। নানা চিন্তা আর প্রশ্ন ঘুরতে থাকল মনের মাঝে। একসময় অসহিষ্ণু স্বরে বললাম,

‘আমি এখনও বাস্তব অবাস্তবের মধ্যে কোন ফারাক করতে পারছি না। আমার দৈনন্দিন রুটিনে সব ঠিক ছিল, তুমি এসে হাজির হবার পর থেকেই সব প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।’

বিড়ালটি সহানুভূতির স্বরে বলল,

‘বুঝতে পারছি। কিন্তু আমি তা তোমার ভালোর জন্যই বলছি। তোমার পর আপাতত আর কোন যোগ্য ইতিহাসবিদ নেই এই বিষয়ে। তুমি শুধু এনসাইক্লোপিডিয়ার কাজই করছ না, নিজেও একজন জীবন্ত এনসাইক্লোপিডিয়া হয়ে উঠছ। এ দুটা একত্রে মুছে দিলে বা গুম করে দিলে এরপর যা থাকবে সব বিচ্ছিন্নভাবে ছড়ানো। বিভিন্ন প্রগাগান্ডা ও কৃত্রিম গল্প দিয়ে সেগুলো ঢেকে দেওয়া হবে। নতুন করে সব লেখা হবে। পৃথিবী এখন নতুন করে উঠে দাঁড়াতে ইতিহাস ও সংস্কৃতি সংরক্ষণের চেষ্টা করছে। এই চেষ্টার সময়টুকু বেশ নাজুক। এ সময়ে কোন গড়মিল করতে পারলে তা পূর্ববর্তী অবস্থার চেয়েও কম ঝামেলাতে সফল হবে।’

‘তাহলে আগেই কেন সব মুছে দিচ্ছে না? আগেই কেন আমাকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে না? একটা কিছু তৈরি করে এরপর সেটাকে ধ্বংস করা তো হাস্যকর প্রক্রিয়া। আরোপিত কিছু করতে চাইলে আগেই করা উচিৎ না?’

‘হ্যাঁ। কিন্তু তখন এ নিয়ে প্রশ্ন থেকে যেত। মানুষের সামনে বিশ্বাসযোগ্য ভাবে তুলে ধরা কঠিন হতো। ধরো, তুমি সাঁতার কাটতে পারো না ও চাও না। কিন্তু কোন কারণে তা তোমাকে করতে হবে, এখন পানিতে না নেমে সাঁতার কাঁটার অভিজ্ঞতার কথা বলার চেয়ে, পানিতে নেমে সাঁতার কাঁটার চেষ্টা করে এরপর বলা ভালো। এতে করে ব্যাপারটা বেশ গ্রহণযোগ্য হবে। আর যারা চেষ্টা করেছে তাদেরকেও সাহসী বা বীর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা যাবে। আবার ভাবো, তুমি মানুষের হত্যা বা মৃত্যু নিয়ে শুনে আসছ বা জেনে আসছ কিন্তু যে মুহূর্তে একজন মানুষ তোমার চোখের সামনে ঢুকে ঢুকে মারা যাবে সেই দৃশ্যটি দেখে তোমার মধ্যে বিচিত্র সব অনুভূতি খেলা করবে, একটা ধাক্কা, শঙ্কা, মানসিক পীড়ন ও একটা অপরাধবোধ সব কিছুই টের পাবে তুমি। 'সায়গন এক্সিকিউশন'-এর কথা মনে আছে? একটা মুহূর্ত কীভাবে সবকিছু বদলে দিতে পারে। ভাবো! ওরকম কিছুর মুখোমুখি করা যাবে না। বরং এমন আকস্মিকতা সৃষ্টি করবে ওরা যেন কেউ কোন সন্দেহ না করে। তবে এসব ছাড়াও নিশ্চয় ওদের আরও কোন মাস্টার প্ল্যান আছে। আমি সব জানি না। যাই হোক, তুমি সম্ভব হলে তোমার কাজের কপি গোপন করে রেখো।’

আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললাম, ‘আমাকে কিছুদিন ভাবতে দাও।’

‘ভাবো। আর হ্যাঁ, তুমি ভার্দির কথা ভেবে দেখতে পারো। আমি তোমার বিষয়ে হালকা ধারণা দিয়ে রাখব। তবে তাকে এ বাসায় ডেকো না। তুমি গিয়ে দেখা করো। তোমার বাসায় তুমি বাদে অন্য কোন মানুষের কণ্ঠ শোনা গেলেই ওরা টের পেয়ে যাবে। তোমার পোস্টম্যান পর্যন্ত ওদের গুপ্তচর।’

‘তাহলে তুমি আমার সাথে আমার ভাষায় কথা বলছ কীভাবে? এটা ওরা টের পাচ্ছে না?’

‘আমি বলছি অন্য উপায়ে, বিস্ময়কর হলেও সত্য হলো মানুষ মুখের যে ভাষা তা প্রাথমিকভাবে বিড়ালদের ভাষা ছিল। বিড়ালদের থেকেই মানুষ সর্বপ্রথম এই ভাষা গ্রহণ করে। বেশ কিছুদিন এ নিয়ে ভাব বিনিময় পর্যন্ত চলেছিল। শুধু ভাষা না, বুদ্ধিমত্তার দিক থেকেও ছিল কাছাকাছি অবস্থান। এরপর বিবর্তনের ধারায়, প্রকৃতির কোন এক রহস্যময় বিরোধিতায় বিড়ালজাতি পিছিয়ে যায়, আর মানুষ যায় এগিয়ে। সেই ভাষাই সময়ে সময়ে পরিবর্তিত হয়ে বর্তমান পর্যন্ত এসেছে।’

‘বলো কি!’

‘হ্যাঁ।’

‘কিন্তু, তোমার তাহলে এই ভাষা নিয়ে দক্ষতা এলো কীভাবে? বাকিরা পিছিয়ে থাকলে তুমি কীভাবে আগালে?’

‘শুধু আমিই পেরেছি। ভার্দির সাহায্যে সম্ভব হয়েছে। আরও অনেকেই ছিল আমার সাথে এই এক্সপেরিমেন্টে। কিন্তু বাঁচতে পারেনি।’

একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে ডানা দিয়ে নিজের গোঁফ আর গাল ঘষল বিড়ালটি। এরপর শরীরটিকে কিছুটা সরু করে আমার দিকে তাকিয়ে বলল,

‘আমি আবার মাসখানেক পর আসব। তুমি তোমার দিক থেকে সবকিছু ঠিক করে রেখো। যতটা সম্ভব।’

আমার সম্ভবত আরও অনেক কিছুই জানার ছিল কিন্তু সেগুলোর সদুত্তর পাবার নিশ্চয়তা নেই বলেই আমি আর কথা বাড়ালাম না। বিড়ালটির বিদায় নেওয়া ক্ষণটুকু কেন যেন আগেরদিনের চেয়ে কিছুটা দীর্ঘ মনে হলো। সে চলে যাবার পরেও তাই আমি বারান্দার দিকের জানালাটা খোলাই রাখলাম।

আমার বাসার ঘড়িটা সত্যি অকেজো হয়ে ছিল। আমি একদিন সকালে সেটিকে বেশ সময় নিয়ে ঠিক করলাম। সংগ্রহশালা থেকে পাওয়া সব তথ্য নিয়ে, প্রচুর পড়ে, দিনরাত খেটে আমি কাজ চালিয়ে যেতে থাকলাম। প্রতিটি কাজের খুঁটিনাটি কপি রাখতে না পারলেও এনসাইক্লোপিডিয়াকে মোট আটটি ভাগে ভাগ করে সেটার মূল উপাত্তগুলো আলাদা করে সংরক্ষণের কাজ চালিয়ে গেলাম। ফলে আমার পরিশ্রম করতে হচ্ছিল প্রায় দ্বিগুণের চেয়েও বেশি। তবে নিজের প্রতি নূন্যতম সহানুভূতিশীল হবার মতো অবকাশও আমার ছিল না। এক চুমুক জলের মতো আমি নিজের ক্লান্তি নিজেই পান করে নিতাম। বারান্দার জানালাটা সেদিনের পর থেকে নিয়মিত খোলাই থাকত। সন্ধ্যা হলে পাখি, কাঠবিড়ালি কিংবা উড়ন্ত বিড়ালগুলোর কুৎসিত কোলাহলগুলোও ছিল। ভার্দির বাসায় পর্দাও আগের মতোই নামানো থাকত কিন্তু আট দশমিক সাত নয় শূন্য পাঁচয়ের কোন নিশানা ছিল না।

প্রায় ভয় ধরানো, ভাঙ্গুর ও অবহেলিত শহরটা দিন দিন আরও দরিদ্র হচ্ছিল নাকি উঠে দাঁড়াচ্ছিল আমি তা পুরোপুরি টের পাচ্ছিলাম না। সিনেমার পর্দায় যেমন একটা পর্যায়ে কাহিনী দ্রুত গতিতে আগাতে থাকে, আমার দিনগুলো হয়ে উঠল সেরকম। মাঝে মাঝে কাজ করতে করতে এতই ক্লান্ত লাগতো যে মনে হতো কারা যেন আমার মগজের ভেতরে গুরুগম্ভীর ট্যাঙ্গো নেচে যাচ্ছে। যাদেরকে বের করার জন্য মাথার খুলি দু ফাঁক করে সেখানে বাতাস ভরে রাখতে হবে। যুদ্ধ করে যাওয়া সৈনিকের মতোই আমি একটানা লিখে চলেছিলাম। এভাবে লিখতে লিখতে আমার আঙুলের একটা পাশ বাঁকা হয়ে গিয়েছিল। তবুও থেমে যাওয়ার কোন তাড়না আমার মধ্যে কাজ করেনি। মনের কোথাও একটা বিশ্বাস ছিল, আমার কাজ শেষের দিকে আগালেই আট দশমিক সাত নয় শূন্য পাঁচ কোন না কোনভাবে টের পেয়ে আমার সাথে দেখা করতে আসবে। যুদ্ধের ইতিহাসের কাগজে সংস্করণ গুম করে দিলেও উল্লেখযোগ্য সবকিছুর কপি থাকবে। আর বাস্তব কথা, একেকটা যুদ্ধ শুধু অক্ষরে বা কাগজে নয়, বেঁচে থাকে মানুষের স্মৃতিতেও। যুদ্ধের নিষ্ঠুরতা ও নৈরাজ্য ধারণ করার জন্য অনেক সময় একটা ক্ষণই যথেষ্ট। তাই ধারণা করা যায়, একদিকে ইতিহাস নষ্ট করার চেষ্টা চালালেও অন্যদিকে তা সংরক্ষণের উদ্যোগও নেওয়া হবে। আশা করছি, ভার্দির সাথে মুখোমুখি হলে এ নিয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা করা যাবে। ওর দলেও নিশ্চয় ওর মতো অনেকেই আছে। এতগুলো সচেতন মানুষকে একমাত্র স্মৃতিহীন করে দেওয়া বাদে ইতিহাস ধ্বংস করার আর কোন উপায় নেই। থাকবে না। পাশাপাশি আমার করা আরেকটি কপি তো আছেই।

কাজের প্রথম খসড়া চূড়ান্ত হবার আগে আগেই বেশকিছু ঘটনা পরপর ঘটে গেল। পোস্টম্যান খবর আনল, টিকে থাকা অন্য শহরগুলো থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আইন প্রণয়ন করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এই শহরটিকে আর কেন্দ্রবিন্দু করে রাখা হবে না। এসব নিয়েই অপরাধ জগত নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। নানাবিধ দাঙ্গা ও আহাজারি শুরু হয়। অসুখে জর্জরিত রোগীর মতো ধুঁকতে থাকে নগরের আনাচ কানাচ। বিশৃঙ্খলা ও নৃশংসতা আরও বাড়তে থাকে। কোথা থেকে কিছু আততায়ী এসে বুলেট এবং ছোরার অতর্কিত হামলা চালায়। হাতে গুলি, পায়ে গুলি, পেটে চাকুর গভীর ক্ষত, বর্শা, সিসেভরা লাঠির আঘাত থেকে শুরু করে একের পর এক মৃতদেহ ও আহত শরীরের স্তূপ জমা হতে থাকে রাজপথে। পৈশাচিক খুনেদের প্রতাপ আরও ছড়িয়ে পড়ে। ভয়ে, আতংকে বাড়ি থেকে মানুষজন বের হওয়া বন্ধ করে দেয়। সে কারণে দুর্বৃত্তরা এরপর বাড়ি বাড়ি গিয়ে হত্যাকাণ্ড চালাতে থাকে। অল্প কিছুদিন বাদে ভার্দির বাসা থেকেও পরপর অনেকগুলো গুলির শব্দ ছুটে আসে। আমি টের পাই সময়ের সাথে স্তিমিত না হয়ে বরং আরও প্রবল লড়াই চলছে। আরও হত্যাকাণ্ড হয়ে যাচ্ছে। মৃত্যুর কালো পোশাকে ঢাকা পড়েছে সবাই। এতকিছু হয়ে যাবার পরেও বিশেষ মহল থেকে আমার জন্য কোন সহায়তা আসে না। পোস্টম্যান আসা থামিয়েছে আরও আগেই। অতীত নিয়ে করা কাজগুলো বার বার দেখা আর বাড়ির একটি মাত্র নিরাপদ জায়গায় সেগুলো সংরক্ষণের চেষ্টা করা বাদে লড়াইয়ে উন্মত্ত হয়ে থাকা হিংস্র সময়ের জন্য আমার আর কিছুই করার থাকে না। শারমানে গাছের দীর্ঘ ছায়াটুকু শুধু প্রতিদিন প্রায় মৃত নগরীর স্তম্ভের মতো মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকে। আর বাতাসে থেকে থেকে এত গুলি উড়তে থাকে যেন বৃষ্টি হচ্ছে।

পরের সপ্তাহের এক সকালে দূর থেকে ভেসে আসা শ'খানেক গুলির কানফাটানো শব্দ দিয়ে দিনের শুরু হয়। এরপর সাদার মধ্যে রক্তের কালচে ছোপ পড়া একটি মোটর গাড়ি এসে সারা শহরের পাশাপাশি আমার পুরো বাড়ি চারপাশ গুলি করে ঝাঁঝরা করে দেয়। শেষ পর্যন্ত আমার সাথে আর কী হয়েছিল আমি তা মনে করতে পারি না। এ নিয়ে কাউকে কিছু বলতে গেলেই তারা বলে, নাহ কাহিনীটা ঠিক জমছে না। স্ক্রিনটা আরেকটু বাম দিকে ঘুরিয়ে, নিচে নামিয়ে আবার শুরু করো। এতে করে আমি আবার একটি ঘরে ফিরে যাই এবং স্ক্রিনের সামনে দাঁড়িয়ে একঘেয়ে কণ্ঠে, গলা খাঁকড়ে বলতে শুরু করি,

"দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধের এনসাইক্লোপিডিয়া আর্কাইভে রাখার কাজ করতে হচ্ছে..."