প্রবহমান ভাষা, পলি ও রুদ্ধপথ

প্রবুদ্ধ ঘোষ


আজ পর্যন্ত শুধুমাত্র বাংলা ভাষাতেই কত শব্দ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে? ফারসি-আরবি-ইংরেজি-পর্ত ুগীজ-হিন্দি সহ অনেক ভাষার শব্দ বাংলা শব্দভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে। ইংরেজ-পূর্ববর্তী যুগে ফারসি ছিল রাজভাষা, অর্থাৎ রাজদরবারের কাজকর্ম তথা প্রশাসনিক কাজকর্ম যে ভাষায় হতো, তারপরে সেই প্রশাসনিক ভাষা বদলে গেল ইংরাজিতে। আর, রাজভাষার অভিমুখে বদলাতে থাকে জনগণের শব্দভাণ্ডার ও ভাষাপ্রয়োগ। স্বেচ্ছায় অনেকে বদলে নিতে চান বা শিখে নিতে চান রাজভাষা, যাতে রাজভাষায় সাহিত্য-শিল্প বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজ ক’রে উপার্জন করা যায়, শাসকানুবর্তী হওয়া যায়। অনেককেই অনিচ্ছাবশত মেনে নিতে হয় রাজভাষার ব্যবহার, করতে হয়। কিন্তু, এও তো সেই ক্ষমতার ভাষার কাছে শাসনের ভাষার কাছে নতি। সরকারি ভাষার বাধ্যতা থাকে, কিন্তু, সে ভাষা তো সকল শাসিতের মাতৃভাষা নয়। কখনও সেই ভাষার বহু কথ্যরূপ, অন্যোচ্চারণ থাকে- কিন্তু, সরকারি মান্যভাষার দরুণ সেই সবকিছুকে ‘উপভাষা’ বলে ঠেলে দেওয়া হয়। অন্য কথ্যরূপও তো কারোর মাতৃভাষা, অন্য উচ্চারণও তো কারোর মায়ের মুখের গানে জেগে থাকে, রাতে ঘুম পাড়ায়। অথচ, ক্ষমতার ভাষা সেই সবকিছুর ওপরে চাপিয়ে দেয় দমবন্ধ ভার। শাসক চায় তার ভাষাই সেরা হোক; উচ্চবর্গ চায় তাদের ভাষাই শুধু মান্যতা পাক। এক মাতৃভাষার ভাষাভাষীরা চায়, তাদের ভাষাই শ্রেষ্ঠ বিবেচিত হোক। অন্য ভাষার স্বীকৃতি মেলে না, অথচ, সেই ভাষাও তো কারোর মাতৃভাষা। এর সঙ্গেই ক্ষমতাকাঠামোর যোগ যখন সরকারি অ-সরকারি ভাষার পার্থক্য গড়ে নেওয়া হয়। ১৯৬১ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী ভারতে প্রায় ১৬৫২টি ভাষা ছিল আর ২০১০ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৭৮০তে। এই ৭৮০টি ভাষার মধ্যে মাত্র ২২টি ভাষা ‘সরকারি ভাষা’র স্বীকৃতি পেয়েছে; যদিও সর্বভারতীয় বেতার সংস্থা প্রায় ১০০টি ভাষায় অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে। আর, সেই ২২টি সরকারি ভাষার মধ্যে ইংরাজি (বহু দশকের প্রশাসনিক ভাষা) ও হিন্দি (ক্ষমতা হস্তান্তরোত্তর ভারতে হিন্দি বলয়ের আধিপত্যে) শাসকের প্রিয়তম দুই ভাষা। বিশেষতঃ হিন্দিকে ভারতের ভিত্তিভাষা ও সর্বজনগ্রাহ্য ক’রে তুলতে সরকারি চেষ্টার অন্ত নেই। ১৯৪৭-র পরের ভারতে হিন্দিকে সর্বজনকথ্য ভাষা ক’রে তোলার একটা নমুনা দেখা যায়, প্রায় ৪০% মানুষ হিন্দিভাষী, ৮% বাংলাভাষী ও ৭% তেলুগুভাষী। ‘ভারতের কোনও রাষ্ট্রভাষা নেই’- এই বাক্য সংবিধানস্বীকৃত। কিন্তু, ভারতের বহু মানুষ এখনও জানেন বা তাঁদের ভুল বোঝানো হয় যে, ‘ভারতের রাষ্ট্রভাষা হিন্দি’। আমরা শাসকের মতাদর্শে ভাবতে ভাবতে বিস্মৃত হই তালামুথু ও নটরাজনের নাম, ১৯৩৯ সালের ভাষাশহীদ তাঁরা। হিন্দি বনাম দ্রাবিড় প্রতর্ক বহু দশকের, হিন্দি- হিন্দু- হিন্দুস্তান বয়ানকে ভারতের সমাজমাথারা চাপিয়ে দিতে চেয়েছেন বারবার। নিজেদের ভাষা ও জাতিসত্তার অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে প্রাণ দেন তালামুথু ও নটরাজন। বরাক উপত্যকা। তেঙ্গানার জাতিসত্তার আন্দোলন। কাশ্মীরের জাতিসত্তার লড়াই। কোঙ্কনি ভাষার স্বীকৃতির সংগ্রাম। ভারত, যা বিভিন্ন ভাষা-জাতিসত্তার সম্মিলিত এক ধারণা, তা বারবার জাতিসত্তা-ভাষার অধিকারের লড়াই প্রত্যক্ষ করেছে। শাসক তার শাসনের সুবিধার্থে দমনমূলক আধিপত্যের বিস্তারে যখনই অখণ্ড-অভিন্ন ভারতরাষ্ট্রের মোহে বেঁধে ফেলতে চেয়েছে, তখনই জাতিসত্তার আত্মনিয়ন্ত্রণের লড়াই তীব্র হয়েছে। আর, মাতৃভাষা সেই লড়াইতে অবশ্যম্ভাবী ও মূল অনুঘটক।

#
ভাষার প্রাণ নেই। ভাষা তবু জীবন্ত। কীভাবে প্রাণ পায় ভাষা? কীভাবে প্রবহমান থাকে? ব্যবহার বদলায়। ভাষা যে শব্দভাণ্ডার নিয়ে তৈরি, তাতে মেশে অন্য ভাষার শব্দভাণ্ডার। প্রথমে মুখে মুখে ফেরে, মুখের ভাষার ব্যবহার বদলায়। জনভাষায় গ্রাহ্য হয়। তারপর কবে যেন সাহিত্যেও মিশে যায়। তখন সেই মিশে যাওয়া বদলে যাওয়া ভাষাই স্বীকৃতি পেয়ে যায়। শব্দও নিষ্প্রাণ, তার নিজস্ব কোনও ইচ্ছে-অনিচ্ছে নেই। ভাষা বারেবারে বদলায়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শব্দের ব্যবহার বাড়ে কমে। নতুন অর্থসঞ্চার হয় তাতে। শব্দের না আছে শ্রেণিবোধ, না আছে উচ্চ-নিচ মান। চেনা বর্ণ বা অক্ষর জুড়েবেঁধে শব্দ তৈরি হয়। তবু, কোনোটা খিস্তির শব্দ আর কোনোটা ভালবাসার। কোনো শব্দ ভাঙার নির্দেশের, কোনো শব্দ গড়ার অনুরোধের। শব্দ বা ভাষার ‘প্রাণ’ নাইই থাক, তার ব্যবহারকারীর আছে। তাই ব্যবহারকারী সেই শব্দ আর ভাষার ব্যবহারেই প্রেমের মুহূর্ত নির্মাণ করতে পারে কিংবা ধ্বংসের ক্ষণ নামিয়ে আনতে পারে। শব্দের ব্যবহারে সামাজিক অজুহাতে সমস্বরকে তাতিয়ে দেওয়া যায়, আবার ব্যক্তিগত ক্ষতের সযত্নপ্রশমন ক’রে তোলা যায়। ক্ষমতাকাঠামোর ওপরে যারা থাকে, তারা সন্তর্পণে এইসব ব্যবহার প্রয়োগ ক’রে নেয় ঠিক! ভাষাকে নিজস্ব মতাদর্শের ছাঁচে ফেলে শীলিত, মার্জিত, রুচিশীল ক’রে তুলতে চায়। যে শ্লীলতা, রুচিবোধ ক্ষমতা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত থাকে। তাই, ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের কবিতার বই থেকে ছেঁটেকেটে প্রকাশ করা হয়, যাতে ‘অশ্লীলতা’, ‘অমার্জিত’ শব্দাবলী বাদ দেওয়া যায়। ঊনিশ শতকব্যাপী মান্য বাংলাভাষা গড়ে নিতে ‘অপর’এর ভাষা বাদ দেওয়ার কী নবজাগরিত প্রচেষ্টা! তবু, সবসময় কি আর নিয়ন্ত্রণ করা যায়? ‘আমি কলকাতার তলায় থাকি’ বলে কেউ কেউ তো ক্ষমতার ভাষা-কাব্যকে বিদ্রূপ ছুঁড়ে দেয়; দু’একটা ফ্যাতাড়ু ভাষা দিয়েই প্রত্যাখ্যানের জগৎ তৈরি ক’রে ফেলে। বাঘারুর ভাষাই থাকে না তেমন কোনও, তবু তার শরীরী ভাষার অপরিশীলিত প্রায়-নগ্ন প্রকাশে শাসক-ক্ষমতা বিমূঢ় হয়ে পড়ে। শাসক সেসব শত চেষ্টাতেও আঁটতে পারে না। বরং এইসব ভাষা যে দ্রোহমুহূর্ত নির্মাণ ক’রে নেয়, তারা ভাষাকে সচল রাখে, ভাষার প্রবহমানতা এগিয়ে নিয়ে চলে।
বিশ্বায়নের যুগে ভাষা মিশ্রভাষার বহুল ব্যবহার গড়ে নিয়েছে। বেড়েছে শব্দের সংক্ষিপ্তকরণ (abbreviation)। প্রজন্মান্তরের দূরত্বে বা জেনারেশন গ্যাপে সেই শব্দগুলি বা সেইসব শব্দ দিয়ে গড়া ভাষার প্রয়োগ অচেনা ঠেকে অনেকসময়। শব্দের তো কোনও দোষ নেই, কোনও ফতোয়া দিয়েই ভাষা ও শব্দের ব্যবহার রোধ করা যায় না। ভাষার ‘বিশুদ্ধতা’ রক্ষা করতে চেয়ে খড়্গহস্ত হয়ে ওঠেন অনেকে, ভাষায় অন্য ভাষার ছোঁয়া লাগলেই ‘গ্যালো রে, গ্যালো’ বলে তেড়েমেড়ে ওঠেন অনেকে। কিন্তু, বিশ্বায়নের যুগে ভাষার শুদ্ধতা রক্ষা কি অতই সহজ? বার্তা আদানপ্রদানের অনেক মাধ্যম ও ‘অ্যাপ’ এখন, ক্রমসংক্ষিপ্ত বাক্যে শব্দে কথনটুকু ভরে দেওয়া। মূল ভাষাটি লাতিন বর্ণসংস্থাপনে লেখার ফলে, বার্তার ভাষা তথা যোগাযোগের ভাষা এক নতুন রূপ পাচ্ছে। হরফ লাতিন, কিন্তু উচ্চারণ ও বাক্যগঠন বাংলা। এখন আন্তর্জালের ভাষা সফটওয়ার নিয়ন্ত্রিত, বানানের ভুল ঠিক মাপা যায় সফটওয়ার প্রদর্শিত অপশনের দ্বারা। এমনকি, ভুল শব্দ বা ভুল বানানের অজুহাত, ‘টাইপো’! এও কি ক্ষমতার সাথে ভাষার মিশে যাওয়া নয়? বিশ্বায়নের ভাষাক্ষেত্রে কোনও ভাষাই কি তার স্বাতন্ত্র্য ও শুদ্ধমান বজায় রেখে চলতে পারে? প্রথমে কয়েকদিন খুব শোরগোল হয়, প্রথম কয়েক মাস অস্বস্তিতে দু-চারটে প্রবন্ধ লিখে ফেলার চেষ্টা হয় ভাষার ঐতিহ্য ও সম্ভ্রম রক্ষার্থে। তারপর? সেই মিশ্রভাষাতেই যোগাযোগের সেতু বেঁধে নিতে হয়। ক্রমে ক্রমে সাহিত্যেও সেই ভাষাই জুড়ে বসতে থাকে।
“Basarkari hola Parisaba Bhala Haba”- এই এক বাক্যবন্ধ বেশ কয়েকমাস ধরে সামাজিক মাধ্যমে চলছে। ভারতের শাসক জবরদস্তি সরকারি কর্ম- প্রতিষ্ঠানগুলিকে বেসরকারি করার পরিকল্পনা করছে ও ক’রে চলেছে। শাসকের সমর্থনে যারা, তারা এই বাক্যবন্ধের প্রয়োগে অন্যদের বোঝানোর দায়িত্ব নিয়েছিল। তথাকথিত ‘আইটি সেল’-এ নিযুক্তরা এই বাক্যবন্ধ ও তার অন্তর্নিহিত অর্থ প্রচার করছিল দায়িত্ব নিয়ে। অর্থাৎ, ‘বেসরকারি হলে পরিষেবা ভাল হবে’। অচিরেই এটা হয়ে ওঠে খিল্লির বাক্যবন্ধ। কারণ, এই বাক্যবন্ধে শাসকের নির্দেশ মিশে আছে, বিরোধী-চেতনা সেই নির্দেশকে চিহ্নিত ক’রে ফেলে। যারা এই বাক্যের গঠন ও লাতিন হরফে বাংলা শব্দ-সংস্থাপনার পদ্ধতিটি রপ্ত ক’রে এই ভাষায় ব্যঙ্গ ছুঁড়ে দিচ্ছে। ব্যঙ্গাত্মক বাক্য গঠন ক’রে ক্ষমতার পুনরুৎপাদিত বাক্যকে চ্যালেঞ্জ করছে।

#
কবে থেকে মধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারে ‘খোকা’ ডাক ‘বেটা’ হয়ে গেল? কবে থেকে রোহণকে ‘রোহান’ আর ‘অঙ্কিতা’কে ‘আঙ্কিতা’ ডাকতে শুরু করলুম আমরা? কবে থেকে অক্ষয় কুমারকে ‘অকশয়’ উচ্চারণে আর সুস্মিতা সেনের ‘শেন’ বাংলা উচ্চারণকে দন্ত্য-স দিয়ে ‘Sএন’ উচ্চারণে ডাকা শুরু করলুম আমরা? ঠিক কবে থেকে সাধের নুচি আর সাদা আলুর তরকারি হয়ে গেল ‘পুরি-সবজি’ এবং ডালডায় ভাজা ঘটিবাড়ির পরোটা হয়ে গেল ‘পারাঠা’? ঠিক কবে আমাদের বাক্যগঠনে ‘যদি’-র বদলে ‘কাশ’ বসে যেতে লাগল, আর, ‘জিজ্ঞাসা’র বদলে ‘ask kora’? আমরা গুলিয়ে ফেললুম ‘তো’ আর ‘কি’-এর ব্যবহার এবং গুবলেট হয়ে গেল বাক্যগুলো। ‘যুগের সঙ্গে তাল মেলানো’ নিশ্চয়ই খারাপ নয়, কিন্তু সেই মেলাতে যাওয়ার সময় নিজস্বভিত দুর্বল হয়ে গেলে তাল কেটে যাবেই। রবীন্দ্রনাথের পদবী ‘ঠাকুর’ না বলে ‘ট্যাগোর’ বলার নির্দেশ দেওয়া যে ক্ষমতার ভাষায় সম্ভব হয়েছে, সেই ক্ষমতার ভাষাই বিশ্বভারতীকে পাঁচিল দিয়ে ঘিরতে চাইছে। আর, সেই ক্ষমতার ভাষাই রবীন্দ্রনাথের প্রাণাধিক প্রিয় বিশ্বভারতীতে হিন্দি- হিন্দু- হিন্দুস্তানের আধিপত্যবাদকে জবরদস্তি স্থাপন করতে চাইছে। সব প্রতিষ্ঠানই কালক্রমে নষ্টদের অধিকারে যায় তা যেমন সত্যি, তেমনই কোনও ভাষাবাসী মানুষদের চেতনাকে দখল ক’রে নিতে পারলে, ভাষাকে কেড়ে নিতে পারলে জনমানসে প্রভাব বিস্তার করা যায়। হিন্দি- হিন্দু- হিন্দুস্তানের জবরদখল এবং সচেতন অবচেতনে নিজেদের ‘বিশ্বায়িত’ বা ‘ঝিনচ্যাক’ করতে চাওয়ার চেষ্টায় বাংলা ভাষার সংকট বেড়েছে। এই সংকটের আরেক দিক থাকে, স্মৃতিকামুক (nostalgic) বিষাদচারণে। সোনার দিন, হলুদ পাখি ইত্যাদি শব্দবন্ধে হাহুতাশ দিয়ে আবেগের মদ খেয়ে মাতাল হওয়া যেতে পারে, কিন্তু মনে রাখা দরকার যে, অতীত সংস্কৃতি, অতীত সাহিত্যভাষার প্রতি আকুলিবিকুলি সত্ত্বেও, তার পুনরুজ্জীবন সম্ভব নয়। স্মৃতিকামুকতার অনায়াস চর্চায় ভাষা ও সাহিত্যে কিছু আবেগার্দ্র প্যাচপ্যাচে কৃত্রিমতা ইনজেক্ট করা যায় মাত্র, বাঁচানো যায় না। মাতৃভাষার নামে জবরদস্তি ফতোয়া জারি করে কিংবা অন্যভাষী শ্রমজীবীদের পিটিয়ে তো আরোই বাঁচানো যায় না। বরং, শব্দের নতুন অর্থসঞ্চার ও ভাষার প্রবহমানতাকে স্বীকার করে সচেতন প্রয়োগের মধ্যে দিয়ে মাতৃভাষার স্বাতন্ত্র্য রক্ষার জন্যে উদ্যোগী হওয়া যায়। মাতৃভাষায় প্রকাশের হীনম্মন্যতা নয়, বরং তাকে সগর্বে ধারণ ও প্রকাশ করা। কিছুদিন আগেই সোশ্যাল মিডিয়া বিক্ষোভে উত্তাল হয়েছিল মেট্রো স্টেশনের নাম হিন্দিতে লেখা নিয়ে এবং অনেকগুলি স্টেশনের নাম হিন্দিতে বড় করে (তুলনায় ছোট বাংলা ও ইংরাজি) লেখার বিরুদ্ধে। এই বিক্ষোভ ন্যায্য, সংগত। কিন্তু, মাতৃভাষাকে রক্ষা করার অর্থ অন্য ভাষাকে অপমান নয় কিংবা অন্য ভাষাভাষী মানুষকে অপমান করা নয়, নিম্নবর্গের হিন্দিভাষীকে বা ভোজপুরীভাষীকে আক্রমণ করা নয়। ভাষাকে তথা ক্ষমতার ভাষাকে নিয়ন্ত্রণ করে যে শাসনকাঠামো, যে মতাদর্শ, তাকে আক্রমণ করা জরুরি। ‘এক রাষ্ট্র, এক ভাষা, এক শাসক’- এই চিন্তাকে জনমানসে প্রতিষ্ঠিত করার মধ্যে যে উদগ্র হিংস্রতা আছে, তাকে প্রতিহত করা প্রয়োজন। যে মতাদর্শ বাংলার বুকে সাহিত্যিকদের ‘নকু-সেকু-মাকু দেশদ্রোহী’ বলে দাগিয়ে দিয়ে চূড়ান্ত অপমান করছে, সেই মতাদর্শকে প্রতিরোধ করা প্রয়োজন। ভাষার প্রাণ নেই, নিজস্ব ইচ্ছে-অনিচ্ছে নেই; কিন্তু, প্রতিটি শব্দের ও ভাষার রাজনীতি আছে, তাকে খোঁজা প্রয়োজন। রাষ্ট্র তার উদ্দেশ্যসফলতায় পাথরের ভাষা বসিয়ে দিতে চায় আমাদের মুখে, কিন্তু রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য বিফল ক’রে সেই পাথর দিয়েই সেতুবন্ধন হতে পারে, ভাষা দিয়েই রাষ্ট্রকে প্রত্যাখ্যান ক’রে হৃদয়ান্তরে আদান-প্রদানের দ্রোহপথ... ‘না’ একটা জবরদস্ত শব্দই শুধু নয়, দৃঢ় ভাষাও বটে! যা অনেক রুদ্ধপথ খুলে দিতে পারে। ভাষাই হয়ে উঠতে পারে হাতিয়ার। ভাষা অস্তিত্বের স্বাধীনতাকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।