আ...

সাদিয়া সুলতানা

মেয়েটি কাঁদে, আ...
মেয়েটি হাসে, আ...
মেয়েটি ডাকে, আ...
এই মেয়ের কোনো নাম নেই। নাম আর জৌলুশহীন জীবনের অধিকারী মেয়েটা শব্দহীনও। প্রশ্নে প্রশ্নে জর্জরিত করলে ওর ঠোঁট থেকে কেবল আ...আ...আ...শব্দপাত হয়। এই এক শব্দেই সে নিজের সকল অভিব্যক্তি প্রকাশ করে। ওদিকে জগতের মহাযজ্ঞে শব্দ সংযোগের কোনো বিরাম নেই। রাত নামলেও শহরের প্রান্তে প্রান্তে ঘুম তাড়ানিয়া ঠুকুরঠাকুর শব্দ বেজে চলে অবিরাম।
শব্দ থাকুক আর থামুক, মেয়ের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। স্যাঁতস্যাঁতে বিছানায় শরীর লেপ্টে সে দিব্যি ঘুমায়। মাটিতে কিংবা জলে যেখানেই বিছানা পেতে দেওয়া হোক না কেন সাচ্ছন্দ্যে শুয়ে পড়ে। শবদেহের মতো টান টান করে শরীর পেতে ঘুমিয়ে পড়ে নিমিষেই। সেই ঘুম পলকে রূপকথার দেশে নিয়ে যায় যেখানে কপালে জাদুর কাঠির ছোঁয়া লাগে আর পিলপিল করে স্বপ্নেরা উঠে আসে চোখে, ঠোঁটে, চিবুকে।
স্বপ্নেরও ভাষা আছে। মেয়ের মুখে ভাষা নেই। যাই বলো অনুক্ষণ ‘আ...আ...’ বলে নিজের অস্তিত্বের জানান দেয়। মেয়ের মুখে বোল শুনবে বলে কম তড়পায়নি মা। কবিরাজের কাছ থেকে বড়ি এনে দুগাল ঠেসে ধরে মুখে পুরেছে। দুকাঁধ ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে অনমনীয় ক্ষিপ্রতায় কচি শরীরটাকে আঘাত করেছে অহর্নিশ। কতক্ষণ সহ্য হয় এ আঘাত? মূক হোক, বধির হোক, তারও তো নিজস্ব ভাষা আছে। দাঁত আর হাতের ব্যবহার শেখার পর তাই সে ক্ষমা করেনি মাকে। আঁচড়ে কামড়ে নিজেকে ছাড়িয়ে মেয়ে দৌড়েছে পথে। ঐ পথে অনেক শব্দ। সেসব শব্দের বহুমাত্রিক ভাষা। কিছু ভাষা দুরধ্যয়। কিছু ভাষা পাঠ করা সহজ। যদিও বাকহীন মেয়ের সহজ পাঠ লেখা থাকে গাছের পাতায় পাতায়, সবুজে সবুজে; মাটিতে, পথের ধুলোয়।
হাতের কাজ সেরে মা মেয়ের গলায় হাত রাখে। শেষ চেষ্টা হিসেবে নুরানি পীরের দরগা থেকে মাটি পরা এনেছিল। রোজ ঘুমানোর পর মেয়ের ধলা বকের মতো গলায় মাটি আর মধু মিশ্রণ লেপে দেয় মা। ঘুমালে তো হুশ থাকে না মেয়ের। সটান দেহটা টেনে পুকুরে ফেলে এলেও জাগবে না এমন বেঘোর সে।
মেয়ে জাগবে না জেনেও ওর গলা জড়িয়ে আহ্লাদী স্বরে ডাকে মা। স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণের দ্যোতনায় বাতাস কাঁপে। শতবার শতনামে মেয়েকে ডাকে মা। আজ মেয়ের নাম ‘মা।’ গত তের বছর ধরে কত ভঙ্গিতে কত স্বরে যে মা মেয়ের সামনে এই শব্দ উচ্চারণ করেছে। এই রাত সাক্ষী, মা...এই একটা মাত্র শব্দ শোনার প্রতীক্ষায় মায়ের চোখের কত জল যে ঝরেছে।
আজ এত বছর পর মায়ের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। বুকে লুটেরা নদীর জলরাশি ঢোকে। হুড়পাড় করে ভেঙেচুরে দেয় প্রতীক্ষার সকল জোর। মা ‘মা’ ‘মা’ করে ডাকে, কাঁদে। বিপরীতে ঘুমন্ত মেয়ের মুখে কোনো ধ্বনি ফোটে না। মায়ের বেদনার প্রতিধ্বনি ঝুপড়ির ভেতরেই আটকে থাকে। বাইরে অন্ধকারে মুখ জাগিয়ে কুকুর ডাকে। অসর্তক মানুষের ঘুম পাতলা করার দায়িত্বে আছে চারপেয়েরা। সতর্ক কান পেতে রাখলেও মায়ের জলভরা ভারি চোখে বিনা ফিকিরেই ঘুম নামে। রাতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শ্বাস গাঢ় হয়। পরিশ্রমে ভাঙা শরীর নিথর হয় ক্রমে। মেয়ের মতো মায়ের দেহেরও কোনো নড়চড় হয় না। এ ঘুম যেন মেয়ের মতোই জলডোবা ঘুম।
ডুবে ডুবে স্বপ্ন দেখে মা। স্বপ্নে মেয়ে অনর্গল কথা বলে। কথা বলে বলে মাথা ধরায়।
‘ও মা তরকারিতে নুন হয় নাই।’
‘জ্বালাইস না, নুন নিয়া খা।’
‘মা, আর গোশত নাই? এক টুকরা গোশত দে। বুকের গোশত দিবি। লগে একটু আলু আর সুরাও দে।’
‘যা, ভাগ, আর নাই।’
‘ও মা চুল বাইন্দা দে। আলগা কইরা বেনি করবি। ব্যথা দিবি না।’
‘অত বড় ছেড়ি নিজে চুল বানতে পারস না? আয় এদিক। হায় রে কী দশা করছে চুলের! ত্যাল নাই, চিরুনি নাই!’
‘ও মা, বাবায় আহে না ক্যান? কবে আইব?’
‘ঐ শয়তানের নাম নিবি না...বাপের হাঙ্গা দেইখাও সাদ মিটে নাই তর। শয়তান ছেড়ি।’
‘ও মা, ডলি খালার বিয়াতে আমারে একটা নতুন জামা কিন্যা দিবি। কিলিপ দিবি। লাল চুড়িও দিবি। জুতা লাগব না। মনু চাচার কাছে গিয়া পুরানটাই পালিশ কইরা আনমু।’
ঘুমতাড়িত কণ্ঠে মা মেয়েকে শাসন করে।
‘কত কথা কয় রে...দিন নাই রাইত নাই খালি বকরবকর বকরবকর...এইবার চুপ কর তো।’
ঝুপড়ির বাইরে কথোপকথনের মৃদু স্বর ভাসে, ‘মুখ চাপ, মুখ চাপ...।’ চাপা গলায় কেউ নির্দেশ দিতেই একটা ছায়াশরীর ভেতরে শায়িত দুবলাপাতলা শরীরটা ছোঁ মেরে তুলে নেয়।
মেয়ে শব্দ করে না। আসমান শব্দ করে ওঠে। আলোর ধারালো একটা রেখা আসমান থেকে নেমে এসে নিচের সবকিছু স্পষ্ট করে দেয়। এ দিকটা সকলের চেনা। মেয়েরও আশৈশব চেনা পথ। কত দৌড়েছে, নেচে নেচে ছুটেছে এই পথে।
ওরাও ছোটে, শব্দহীন। মা-মেয়ের ঝুপড়ি থেকে বেরিয়ে নাক বরাবর চলতে চলতে একসময় গলি ফুরিয়ে যায়। এরপর বড় রাস্তা। এই রাস্তার ডানদিকেই শহীদ বেদী। মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো সাদা রঙের ফলকগুলোতে সময়ের ক্ষত। দেখে বোঝা যায়, সামনে উদযাপনের মতো কোনো জাতীয় দিবস নেই।
বিজলির মুহুর্মুহু চমকে স্নায়ুতে চমক জাগে। হঠাৎ আলোর ফুলকি হারিয়ে যায়। তারপর চারদিক শুনশান নিথর। দম চেপে আসা মেয়েটির ঘুম ভেঙেছে এবার। ঘুমভাঙা চোখের বিস্ময়ের ভাষা অনুবাদ করতে পারে এমন কেউ নেই আশেপাশে। বেদীর উল্টোপাশে মানুষের ছায়া নড়েচড়ে। অন্ধকার খেই হারায়। আসমান থই পায় না। এত মানুষ আসমানের নিচে ঘোরে। কতজনের খবর সে রাখে।
তারারা নিভে আসে। চাঁদও নেই। কোথায় লুকিয়েছে কে জানে। অন্ধকারে ভয় পায় মেয়ে। ইতর প্রাণীদের চমকে জীবনে প্রথমবারের মতো সে কণ্ঠভরে ডাকে, ‘মা...মা...।’ শব্দের আলোড়নে কালো রং করা শীতের আকাশ-বাতাস সামান্যতম প্রকম্পিতও হয় না। দূরে একলা ঘরে ঘুমের ঘোরে মায়ের কানও সজাগ হয়, কেউ কি ডাকে ‘আ...?’
মা ডাক ভুলে নগ্ন মেয়ে ফের ডাকে, ‘আ... ‘আ...।’ আসমান থেকে লাফিয়ে নামা অন্ধকার মেয়ের চোখ, নাক, ঠোঁট, চিবুক, গলা, স্তন, পেট, যোনী... ঢেকে দেয়। জীর্ণ ঘাসের ওপরে গড়ানো রক্ত অক্ষরের আকৃতি নিতে নিতে মাটিতে লীন হয়। দেখতে দেখতে অন্ধকারও আলোতে লুকায়। ভোর হয়। শহীদ বেদীর পেছনে দিনের প্রথম আলো পড়ে। রাতজাগা কুকুরেরা সন্তর্পণে উঁকি দেয়। নিষ্প্রাণ চোখে ওরা দেখে, বর্ণমালার মিছিলে এখন আর ‘আ’ বর্ণটা নেই।