ভাষাচাষ

শৌভিক দত্ত



এক
মাথার পোঁটলাটা নামিয়ে রেখে বাজারে বসে একটু জিরিয়ে নেয় লোকটা। কমদূর থেকে তো আসছে না,সে প্রায় দুকোশ পথ।সুয্যি ওঠার আগে বাড়ী থেকে বেরিয়েছিল,এখন সূয্যিঠাকুর মাথার উপর।জলতেষ্টা পাচ্ছে তার,সামনের টিউকল থেকে জল খেয়ে এলে শরীলটা একটু বল পায়।আসার আগে বউ যত্ন করে মুড়ির পোঁটলা আর বাতাসা দিয়ে দিয়েছে,এখন চাট্টি মুড়ি মুখে দেওয়া জায়।অল্প খিদে পাচ্ছে এখন,ফিরতে ফিরতে সেই বিহানবেলা।
খেতে খেতে লোকটা লক্ষ্য করে বাজার যেন আজ একটু অন্যরকম।লোকজনের চহলপহল তেমন চোখে পড়ছে না। মোড়ের মাথায় এক পেল্লায় নোটিশ কখন টাঙিয়ে গেছে সরকারী বাবুরা,লোকজন হাঁকপাক করে ছুটছে সেদিকে।গোল হয়ে নোটিশ ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে।সবার চোখেমুখেই যেন কি একটা চাপাভাব,আতঙ্ক আর কষ্টের মিশেলে এরকম চেহারা হয়। যেন প্রত্যেক শরীরে উত্তেজনা ঠিকরে পড়ছে।

দুই
একটু থিতিয়ে বসে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করে লোকটা।চোখে পড়ল পূর্ব গ্রামের হরিপদ বাউরী এদিকেই আসছে। ওর থেকে বিষয়টা জেনে নিলেই হয়।তাকে দেখে হরিপদ দাঁড়িয়ে পড়ে।নিচু স্বরে বলে, “শুনছস নি কিছু?”বিমূঢ় লোকটা দুদিকে মাথা নাড়তেই হরিপদ আবার তেমনই নিচু স্বরে বলে “কাইল থাইক্যা ভাষাচাষ বন্ধ।সরকারী বাবুরা আইছিল,নোটিশ টাঙাইয়া গ্যাছে”
“কস কি?হইতেই পারে না!!” “হইছে, নোটিশ দ্যাখ গিয়া,তবে ইটাও কইয়া গ্যাছে,চাষ না কইরা মরবি না, কাইল থাকিয়া সরকারের ভাষায় চাষ করন লাগবো।সামসুল চাচা,আব্দুল,নিতাই মণ্ডল সব খাড়াইয়া আছে দ্যাখ,হরেন মাস্টরও আইসইন,তাইন মনে হয় পুরাটা কইতে পারবা”।
লোকটার বুকে ছ্যাঁকা লাগে।ই সব কি অলুক্ষনে কথা! তার বাপ,ঠাকুদ্দা,মায় চৌদ্দপুরুষ এই ভাষাচাষ ছাড়া কিচ্ছু জানে না।এ ছাড়া অন্য কিছু করেনি কোনওদিন।মায়ের পেট থেকে বেড়িয়েই এই ভাষাচাষের হাতেখড়ি হয় তাদের।আহা,নতুন ধানের মতন বর্ণমালা দেখলেও আরামে শরীর শীতল হয়ে আসতে চায়।চোখে পানি আনচান করে।মনে পড়ে, কতোদিনের এই মাইলের পর মাইল জুড়ে ভাষামাঠ,ভাষাগাছে ভাষাফুল,কেমন যেন মায়ের আঁচলের মত নির্ভার হয়ে ফুটে আছে।সব ছাড়ি দিতে লাগবো?ছাড়ি দিলে বাচঁমু ক্যামনে?
তিন
আউলা ঝাউলা মাথায় লোকটা পায়ে পায়ে নোটিশ বোর্ডের দিকে এগোয়৷নোটিশ বোর্ড ঘিরে বেশ একটা বড়সড় জমায়েত হয়েছে।হরেন মাস্টর বইসা আছেন।মাস্টরের চউখ মুখ শুকনা,রাইতকালে না ঘুমাইলে যেমন হয়।খুব নিচুস্বরে মাস্টর কইতে থাকেন, “বও অইখানে ভাইসব,কথা কওনের আছে।সবই তো শুনছ তুমরা। অখন কও, কিতা করা যায়?”ভীড়ের মধ্য থেকে একজন জানতে চায়, “ওরকম সব্বোনাশা নোটিশ আইল ক্যামনে? আমরা তো আগে কিছুই জানতি পারলাম না?”
মাস্টর তেমনেই মাটির দিকে চেয়ে থাকেন।তারপর ধীরে ধীরে কইতে থাকেন, “একদিনে কিছু হয় নাই।টিভি আর সিনেমা দিয়া সরকার অনেকদিন ধরিয়াই মাইনসের মধ্যে নিজের ভাষার চাষ করতাছিল।মানুষ ধরতে পারে নাই।অখন সরকার বদলি গ্যেছে।নতুন সরকার নিজের ভাষা দিয়া দ্যাশের অন্য সব ভাষারেই গিলি লাইতে চায়।অখন কথা হইল,আমরা এই নোটিশ মানতাম কি মানতাম না। যে জল, আলবাতাস,আর মাটিতে আমরা জন্ম নিছি, যে ভাষার চাষ করছি অতোদিন,সব ছাইড়া ছুইড়া নতুন ভাষার চাষে হাত দিতাম,না......মাস্টর দম নেওয়ার জন্য থামেন।তারপর আবার শুরু করেন, “একজুট হইয়া ভাষার লাগিয়া রুখিয়া দাঁড়াইতাম”।
লোকটার মনে ভয় হয়,সরকারের লগে অশান্তি?সরকার তো অনেক বড়ো মানুষ, সরকারের সঙ্গে তো সেপাই,পেয়াদা,মেলা লোকলশকর আছে।মাষ্টররে জিগায় “তা, আমরা যদি সরকারের হুকুম না মানি,তাইলে সরকারের লগে লড়াইয়ে পারমু ক্যামনে?ভীড়ের অনেকেই সমর্থন করে তাকে।মাষ্টারের মুখ উজ্জ্বল হয় এই প্রথম।উচুঁ গলায় বলে ওঠেন, “তুমরা মনে হয় জানো না,বর্ডারের অইপারে একটা দেশ আছে।অইদেশে অনেক বছর আগে,ভাষার অধিকার লইয়া অই দেশের মানুষ সরকারের সামনে রুখিয়া দাঁড়াইছিল,অনেক লোক মারা গেছে পুলিশের গুলি খাইয়া,অনেক লোক জেলে গেছে,কিন্তু তারা ভাষার অধিকার ছাড়ছে না।পরে সরকাররে হটাইয়া স্বাধীন হয় তারা।তারা পারলে আমরা পারতাম না কেনে?ইংরেজিতে একটা কথা আছে, when a people are enslaved as long as they holdfast to their language it is as if they had the key to their prison অর্থ হইল, যখন কোনও জাতি অন্যের গুলাম হইতে বাধ্য হয়,তখন যদি তারা তাদের ভাষা আঁকড়াইয়া ধরিয়া রাখে,জেলখানার চাবির মতো সেই ভাষাই তাদের মুক্তির উপায় হয় ভবিষ্যতে”।
চার
ফিরে যাচ্ছে লোকটা।আরও দেড়কোশ পথ।কিন্তু ক্লান্তি অনুভব করছে না লোকটা।নিশ্চয় করেই নিয়েছে, প্রাণ থাকতে ভাষার অধিকার ছাড়বে না।তাতে যা হোক হবে।বাঁচিয়ে রাখতেই হবে ভাষাচাষ।পথের দুপাশে ভাষামাঠ,ভাষাফুল অল্প হাওয়ায় দুলছে।সেদিকে চেয়ে,বুক ভরে শ্বাস নেয় সে।আঃ, কী আরাম!ঠিক যেন মায়ের আদরের মতো।

#প্রখ্যাত ফরাসী লেখক আলফান্সো ডডেট এর গল্পের ছায়ানুসরনে#