কুরাণ পুরাণ

রুখসানা কাজল


পরাজিত সময়ঃ ওরা কারা

হ্যারে পুরাণ শরম লজ্জা কি এক্কেরে ধুয়ে খাইছিস ! তুই ত এমন বেহায়া ছিলিস না কহনো!
মসলা সিগারেটে ধোঁয়া তুলে চোখ টেরিয়ে ইউনিভার্সিটিতে আসা নতুন মেয়েগুলোকে দেখে নেয় পুরাণ । নাহ, কুরানের কথাগুলো ওরা শুনতে পায়নি। এবার চাপা গলায় খেঁকিয়ে ওঠে , তুই এহেনে মরতি আইছিস ক্যান কুরাণ ? শোন আগভাগে কয়ি থুচ্ছি, আমি কিন্তুক তোগের অই বালছাল মানববন্ধনে দাঁড়াতি পারব নানে। তুই দাঁড়াগে যা। আমার অত টাইম নাই।
এবার সত্যি সত্যি ক্ষেপে উঠে কুরাণ, হ, কি চ্যাটের কাজ করতিছিস তাতো দেখতিই পাতিছি। রক্ত ধুয়ে জামরুল হইছিস। শুয়োরেরবাচ্চা তুই না কবি, কবিতা লেহিস !
কোনো এক টিভি চ্যানেল থেকে ফাউ পাওয়া পাঞ্জাবীর হাতা গুটিয়ে পুরান দাঁত চিবিয়ে বলে, শোন কুরান, নিজি বাঁচলি বাপের নাম। আমি ত গুঁড়ো কিরমি মার্কা কবি। বড় বড় কবিরা কেউ আসিছে তোগের মানববন্ধনে ? আর দেশে কি হতিসে না হতি পারেনে আমাগের সরকার য্যান কিছু জানেনা ! এমনি এমনি কেউ সাহস পায় এতসব করতি ! তুই যা। কাজ আছে আমি চললাম--- দীর্ঘ পা ফেলে মেয়েদের দলের দিকে চলে যায় কুরাণ।
টিএসসির সামনের ইউক্যালিপ্টাস গাছের পাতাগুলো ঘুরে ঘুরে নেমে আসছে। কতগুলো মেয়ে ফু ফা মেরে তাড়াতাড়ি চা শেষ করছে। দেখে মনে হচ্ছে কোথাও যাবে ওরা। কড়া মেকাপের দুজন হিজাবি মেয়ে ছুটে এসে ওদের বলছে, এই শোন না শোন, আমরাও যাবো তোমাদের সাথে। অন্যায় ইজ অলওয়েজ অন্যায় দোস্তো। দেশটাকে ত আফগানিস্তান বানানো চলবে না।
চত্বর জুড়ে চায়ের কড়া গন্ধ। কয়েকজন টোকাই ছেলেমেয়ে কুড়ানো পতাকা মাটিতে পুঁতে মিটিং মিটিং খেলছে। বুড়ো মোতালেব ঠুকঠুক করে এক মেয়ের স্যান্ডেলে পেরেক ঠুকে গল্প শুনাচ্ছে, সেই যে লেজে এরশাদের গুলিতি ছাত্র মরি গেল। মিছিলে টিরাক উঠায়ে ছাত্র মারল। শেখ হাসিনা তহন এই রাস্তা দিয়ি ছাত্র জনতার সাথি মিছিল করিছিল। খালেদা জিয়াও আসিছেলো। সেকি মিছিল ! মাটি কাঁপি আকাশ ছুঁয়ি ফেলাইছেলো।
মোতালেবকে দেখা যাচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ছাত্রছাত্রীদের ভিড়ে কেবল শোনা যাচ্ছে ওর গলা, ছাত্ররা হতিসে আগুনের গোলা। ভয় পাতি জানে নাকি ওরা ? অই যে বঙ্গবন্ধু কয়িছে না , দরকার হলি রক্ত দেবো, আরো দেবো---
নতুন ছাত্রিদের সাথে ইঁচড়ামি করতে গিয়ে থেমে যায় পুরান। হৃৎপিণ্ডটা ঢঙ ঢঙ করে বেজে ওঠে।
মানববন্ধনে শক্ত করে কুরাণের হাত ধরে রাখে পুরাণ। আহত সুরে বলে ওঠে ছাত্রছাত্রিরা, এই কি আমাদের সরকার ! দেশপ্রেমের ময়ূরপুচ্ছ খুলে যাচ্ছে অনেকের। প্রতিবেশি দেশে ধর্মনিরপেক্ষতাকে শূলে বিঁধে ক্ষমতায় বসেছে ধর্মরাজ। ঐক্যমঞ্চে পড়ে আছে রাখিবন্ধনের ছেঁড়া সূতো। বাংলাদেশের ডান বামের কেউ কেউ উদাহরণ দেখাচ্ছে, ওরা মেনে নিলে আমাদের অসুবিধে কী ? চেঁচিয়ে গাল পাড়ে পুরান, ওরে ও চুতমারানি নেতারা, ওগের কি একুশ আছে ? ধম্মের ঘুঘু দেখাতিস আমাগের তাই না ? আচ্ছা আচ্ছা এবার ফাঁদ দেখাবিনি তোগের। আমাগের চিনিসনা তোরা? ভুলি গিছিস বাঙ্গালিগো?
শহিদ মিনার ছাড়িয়ে আরও দীর্ঘ হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষতার দাবিতে অটল মানববন্ধন ।
ডঃ মুহাম্মাদ শহিদুল্লাহ তার কালো আচকান খুলে দিচ্ছেন ছাত্রদের। ব্যাজ বানাতে হবে। শোক কর বাঙালি। আজ বড় শোকের দিন। ওরা আমাদের ছেলেদের হত্যা করে আমাদের ভাষা, আমাদের বাক স্বাধীনতা কেড়ে নিতে চাইছে। সংসদ ছেড়ে বেরিয়ে এসেছেন মওলানা তর্কবাগিশ। স্পিকারের মুখের উপর বলে এসেছেন, রাস্তায় আমাদের ছেলেরা গুলিতে মারা যাচ্ছে। এ সময় ফ্যানের নিচে বসে আমরা সংসদে থাকতে পারিনা। সমস্ত নিষেধাজ্ঞা উড়িয়ে দিয়ে রাজপথে নেমে এসেছে জনতা, ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়। সইবো না আর সইবো না----
স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পর ধর্ম নেত্য করে যাচ্ছে একদল বাঙালি। ওরা কারা ?
টুঙ্গিপাড়ার কাছে ছোট্ট এক গ্রাম। সে গ্রামের মৌলবি মাখদুম মাসুদ অর্জুন গাছে সাইকেল হেলানে রেখে এক তরুণকে বুঝাচ্ছে, ফালায়ো না মিয়ার বেটা। কে কি লিখিছে তাতি কি মহানবীর মহত্ব কিছু কম পড়িছে ! তোমরা যে ধর্মের ধোঁয়া তুলি নিজের ফায়দা তুলি নিতি চাতিছো বাঙালি কিন্তুক তা বুঝতি পারতিসে !