স্প্যানিশ ভাষার পাঁচ কবির কবিতা

জুয়েল মাজহার


রুবেন দারিও

রুজভেল্টের প্রতি



শিকারী, তোমার কাছে যে-স্বর পৌঁছাবে সেটি কথা বলবে
বাইবেলের সুরে, কিংবা ওয়াল্ট হুইটম্যানের কবিতার ভাষায়।


আদিম আর আধুনিক, সরল আর জটিল তুমি;
তুমি একভাগ জর্জ ওয়াশিংটনের আর একভাগ নমরুদের ।


তুমি যুক্তরাষ্ট্র,
আমাদের ভারতীয় রক্তবাহী আলাভোলা সরল আমেরিকার ভবিষ্য-হানাদার তুমি;
যে আমেরিকা আজো খ্রিস্টের কাছে প্রার্থনায় প্রণত আর কথা বলে হিস্পানি ভাষায়।


তোমার জাতির শক্তিমান, গর্বিত এক প্রতীক তুমি;
সুকৌশলী, বিচক্ষণ-আর সুসংস্কৃত তুমি;
তুমি বিরোধিতা করো তলস্তয়ের।
এক আলেকজান্ডার- নেবুশাদনেজার তুমি,
ঘোড়াকে পোষ মানাচ্ছ আর হত্যা করে চলেছো বাঘেদের।
(তুমি নাকি শৌর্য ও বীর্যের প্রবক্তা,
একালের উন্মাদেরা এরকমই বলাবলি করে।)


ভাবো তুমি, জীবন এক আগুন;
অগ্রগমন, যার মানে হচ্ছে আচমকা দুদ্দার প্রবেশ ;
তুমি যেখানেই তোমার বুলেট ছোড়ো
সেটি গিয়ে লাগে ভবিষ্যতের গায়ে।
না-আ-আ-আ।


আমেরিকা, প্রকাণ্ড , শক্তিমদমত্ত আর বলবান তুমি।
যখনই নড়েচড়ে ওঠো , আন্দিসের অতিকায় শিরদাঁড়া বেয়ে
এক বিপুল কাঁপুনি জাগে;
যখন শোরগোল তোলো, যখন চেঁচাও
তখন তা মনে হয় সিংহের গর্জনের মতো।

আর হুগো তো গ্র্যান্টকে বলেইছিলেন:
এই যে নক্ষত্রমালা সকলই তোমার।”


(আর্হেন্তিনার ঊষার সূর্য নামমাত্র কিরণ ঢালে;
চিলির নক্ষত্র ওই জাগিতেছে দ্যাখো...
ধনের কুবের তুমি, ঐশ্বর্যের অধিপতি তুমি
ম্যাম্মনের কাল্ট থেকে হারকিউলিসের কাল্টে লেখাচ্ছো নিজের নাম;

সহজ জয়ের পথে আলো ফেলছো, ইত্যবসরে
নিউইয়র্কে ‘লিবার্টি' উঁচিয়ে ধরেছে তার নিজের মশাল।


কিন্তু আমাদের নিজেদের আমেরিকা, নেসাহুয়াল্ কুইতোলের সুপ্রাচীন কাল থেকে,
অগণন কবি ছিল যার; মহান বাক্কাসের পদাঙ্ক যে ভালোবেসে আগলে রেখেছিল,
এবং একদা যে তৃণ-বর্ণমালা শিখে নিয়ে রপ্ত করেছিল,আর,
তারাদের সঙ্গে যার হয়েছিল কথোপকথন; যার সঙ্গে আতলান্তিসেরও
ছিল জানাশোনা (প্লাতোর সুবাদে যার নাম --ধ্বনি আর প্রতিধ্বনি তুলে-- আমাদের কাছে এসেছিল)

এবং সে বেঁচেছিল---তার নিজ জীবনের আদিতম মুহূর্তের থেকে---
বেঁচেছিল আগুনে, আলোয় আর প্রেম-সুরভিতে—


মোকতেজুমার আর আতাহুয়ালপার আমেরিকা,
কলম্বাসের সৌগন্ধবিধুর আমেরিকা,
ক্যাথলিক আমেরিকা, হিস্পানিক আমেরিকা,

যে-আমেরিকায় কথা বলে গেছেন মহান কাহ্তেমোক :
''আমি তো থাকিনে কোনো ফুলেল শয্যায়”

----আমাদের আমেরিকা কম্প্র থরোথরো;
আমি থাকি প্রবল ঝঞ্ঝায়, থাকি প্রেমে:
ওহে, স্যাক্সন-চোখ আর বর্বর আত্মাধারী মরদেরা,

জেনে রাখো, আমাদের আমেরিকা প্রাণদ-উজ্জ্বল হয়ে বাঁচে
স্বপ্ন দেখে যায় আর ভালোবেসে যায়

আর সেই সূর্যের দুহিতা। সাবধান!
হিস্পানিক আমেরিকা দীর্ঘজীবী হোক!

করিতেছে বিচরণ স্প্যানিশ সিংহের মুক্ত সহস্র শাবক!
রুজভেল্ট, আমাদেরকে তোমার লৌহ-নখরবন্দি করবার আগে,
ঈশ্বরের আপন ইচ্ছায়, তুমি হবে
সংহারক বন্দুকচালক, এক ভয়ানক ব্যাধ।


এবং যদিও আজ সবকিছু তোমার হয়েছে,
তবু জেনো তোমার ঈশ্বর নেই কোনো!

(To Roosevelt নামে করা Bonnie Frederick ও Lysander Kemp এর দুটি কবিতা অবলম্বনে)

------------------------------------------------------------ ---------

হোসে হুয়ান তাবাল্দা

বিকল্প নিশিদৃশ্য


সোনায় মোড়া নিউইয়র্কের রাত;
ম্যুরিশ চুনাপাথরের ঠাণ্ডা দেয়াল,

আর্ল ফুলারজ্ রেক্টর নভেলটি অর্কেস্ট্রায়
যাজকের শ্যাম্পেনতাড়িত নৃত্যগীত,
সুমসাম-মূক ঘরবাড়ি আর হুড়কো-লাগানো জানালাগুলো,

শব্দহীন গৃহছাদের উপর দিয়ে নেচে চলেছে
পাথরের আত্মা,

চাঁদের পটভূমিতে লুতের পত্নীর মতো
শাদা-শাদা বেড়ালের প্রতিচ্ছায়া।

এতোকিছুর পরও
নিউইয়র্কে
আর বোগোতায়
একইরকম,
আর,
একটাই চাঁদ...!

[ An Alternative Nocturne by Jose Juan Tabalda; Eng. Trans. By John Howard Reid]

------------------------------------------------------------ ---------

আন্তোনিও মাচাদো

উচ্চভূমির গান



সোরিয়া,

নীলরঙ সব পাহাড়ে পাহাড়ে,
বেগুনি-বেগুনি মাঠে-প্রান্তরে,
ওই সমতল ফুলেদের দেশে
কতো যে তোমায় দেখেছি স্বপ্নে,


যেখানে সোনালি কমলাগাছের
পাশ দিয়ে নদী গগুয়াদাল্কিভির
বয়ে চলে আর সমুদ্রে গিয়ে মেশে।

[The Wind, One Brilliant Day by Antonio Machado]


------------------------------------------------------------ ---------

ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা

সেরেনাদ


রাত্রি ভেজায় তনুখানি তার
নদীটির তীর ধরে

আর লোলিতার বুকে
প্রণয়কাতর উচাটন ডালপালা।

প্রণয়কাতর উচাটন ডালপালা।

এলো বসন্ত! সাঁকো ও সেতুর ’পরে
বিবসনা এই রাত্রি গাইছে গান।

লবণজলে ও রজনীগন্ধা ফুলে
লোলিতা ভেজায় নধর তনুখানি।

প্রেম উচাটন মরে যায় ডালপালা।

মৌরির ফুল এবং রুপোর রাত
করে ঝিকমিক বাড়িগুলোর ছাদে ।

আয়না এবং ছোট নদীদের রুপো
তোমার সফেদ ঊরুর মৌরি-মদ।

প্রেমে উচাটন মরে যায় ডালপালা।

[SERENADE by Federico García Lorca]


------------------------------------------------------------ ---------

পাবলো নেরুদা
জলপরি ও মাতালদের কাহিনি


ঘরটিতে মরদেরা জুটেছে সবাই, তখুনি ভেতরে এসে
ঢুকলো সে পুরো বিবসনা

মদ খেতে খেতে ওরা ছিটাতে লাগলো ওর সারা গায়ে থু-থু;
নদী থেকে সবে-উঠে-আসা, ও ছিল সরল আলাভোলা।
ও তো এক জলপরী পথ ভুলে এসেছে এখানে।

ঝলোমলো অঙ্গে ওর বিদ্রূপের তুবড়ি গেল বয়ে।
খিস্তিতে-খিস্তিতে ওর হেমস্তন হয়ে গেল নোংরা আবিল।

কান্না কাকে বলে ওর জানা নেই; চোখে তাই অশ্রু গড়ালো না ।
পরিধেয় কাকে বলে জানতো না, তাই সে তো ছিল বিবসনা।

সিগারেটে-ছ্যাঁকা দিয়ে, বোতলের পোড়া ছিপি দিয়ে ওকে খুঁচিয়ে-খুঁচিয়ে
সরাইয়ের মেঝেজুড়ে ইতর হাসিতে ওরা গড়াগড়ি খেলো

সুদূর প্রেমের রঙে সেজেছিল ওর দু'নয়ন;
যেনবা যুগল বাহু দুধশাদা পোখরাজে গড়া।

শব্দহীন জোড়া ঠোঁট কেঁপে উঠল প্রবালের গোলাপি আভায়;
আর সে-দরজাপথে হঠাৎই সে বাইরে হারাল।

নামলো নদীতে যেই, ধুয়ে গেল আবিলতা চোখের পলকে।
দেহ তার তুললো ঝিলিক ফের; বৃষ্টিঘোরে যেন কোনো শ্বেত মর্মর।

একবারও পিছু ফিরে তাকালো না; —দিলো সে সাঁতার
ভেসে গেল শূন্যতার পানে শুধু, ভেসে গেল নিজেরই মৃত্যুতে।

[Fable of the Mermaid and the Drunks; by Pablo Neruda]

------------------------------------------------------------ -------
স্প্যানিশ ভাষার পাঁচ কবির কবিতা
ভাষ্য ও ভাষান্তর:জুয়েল মাজহার