একটি না-লেখা কাব্যের নান্দীমুখ

গৌতম চৌধুরী



প্রথমে বন্দনা করি ভুঞের ঢেলার
যে-ভুঞি পিত্থিমি হৈআ ঘেরে চতুর্ধার
যে-ভুঞের গবভে বীজ বাড়য় ফন ফন
ভাটির আগুনে যার গোসলের রঙ
নেহারি জুড়ায় আঁখি, পোড়য় পুত্তলি
পোলাপানগুলা হাসে সারা অঙ্গে ধূলি
সে-ধূলি শিরেতে স্পর্শি জনম ধন্যিল
এ-দেহের কারসাজি যতনে বর্ণিল
সেই ভুঞি মাটি, তারে শয়ানে বিছাই
তারে যে বিস্মরে তার সগ্গল মিছাই

এবারে বন্দনা করি উপর আসমান
যার পানে বৃক্ষ ছাড়ে ডানার আজান
বামনের খর্বকায় কম্পে থরথর
চক্ষের সীমানা ধায় আন্ধার বাসর
সে-বাসরে সূর্য চান্দ কোটি তারা ঝলে
বেবাক ঘূর্ণনে তার পলে অনুপলে
চুলের ফিতার মতো বৈহা যায় কাল
এক সুর লুপ্ত হৈআ বাজে অন্য তাল
কর্তা নাই কর্ম আছে, এ বড় বিস্ময়
অনন্ত শূন্যের বক্ষে সৃষ্টি স্থিতি লয়

বন্দিব এবারে পানি লবণাশ্রুধারা
জলের হলন্ত প্রেমে কে লভে কিনারা
পুঁথির অক্ষর ভেদি কুলুকুলু স্বরে
যে-নদী ঘূর্ণির বাঁকে বান্ধে অজগরে
শাঙনের রাত্রি ব্যেপে তার অভিরূপ
ভাঙে পাড়, গ্রামগুলা পরাণে কুলুপ
তবু ধাএ সপ্তডিঙা মোহনা উজাএ
বদর বদর বলি পৌঁছে দরিয়াএ
জোয়ারে ভাটায় নাচে অথই জীয়ন
যে চাহে সে থির চক্ষে দেখএ দর্পণ

অতঃপর বন্দি সব প্রাণের দোসরে
কে কোথায় ভাই বন্ধু গ্রামে গ্রামান্তরে
শবর পুলিন্দ ব্যাধ নিষাদ চণ্ডাল
কেহ মাঠে ধান বোনে কেহ ফেলে জাল
কেহ বা ফিটার মিস্ত্রি কেহ করণিক
যন্ত্রগণকিনী কেহ রান্ধুনী নাবিক
চাটিগাঁ পুরুল্যা হতে ত্রিপুরা কাছাড়
কাকদ্বীপ সন্দীপ হতে কোথা কোচবিহার
মুখচ্ছিরি নাই তবু জ্বলন্ত নয়ান
তোহ্মাদের কৃপা ভিন্ন কীটদষ্ট গান

কিন্তু কিসে মিলে কৃপা, কিসে বা বন্দিবে
যদি না ভাষাই রহে কে সেতু বান্ধিবে
স্বরবর্ণে ডানা মেলি ওড়ে পক্ষীকুল
ধ্বনির কটাহে ফোটে ব্যঞ্জনের ফুল
আখরে আখর জুড়ি ধায় শব্দরাশি
পাবকের ঘোর বর্ণে অর্থ যায় ভাসি
কোথা সে অগ্নির জিব্ভা সৈন্ধব তুফান
টুটাফাটা মনচ্ছবি জুড়িবার রাঙ
চক্ষের গভীরে তার কণামাত্র নাম
জন্মমৃত্যুমাতৃভাষা, তোহ্মারে প্রণাম