ইঁদুর সম্মন্ধে যে দু চার কথা সুমন বলে গেছে

তমাল রায়

সুমনের ফোন খুলতেই ঝিমলির চোখে পড়ল 28 missed calls। ২৬ টা একা তিতলিরই। ২টা office। অফিস মানে প্রাইভেট যে কোম্পানিতে সুমন চাকরি করে। তিতলি,সুমনের দ্বাদশ বর্ষীয়া কন্যা,ক্লাস সিক্স, সেন্ট মেরী স্কুল। আই সি এস সি। আর ঝিমলি,সুমনের অগ্নিসাক্ষী করা অদ্যাবধি স্ত্রী, তবে আগামী মাসে নাও থাকতে পারে। সবটাই জজ সাহেবের মর্জিমাফিক। কথায় বলে,কোর্টে ছুঁলে চব্বিশ ঘা! সুমনের কল লগ সরাতেই নোটস বেরিয়ে এলো।

হেডিংঃ ইঁদুর সম্মন্ধে যে দু চার কথা আমি জানি

- মানে কী! পড়তে শুরু করলো ঝিমলি।

* ইঁদুরদের পূর্বপুরুষ রডেন্টরা বহু বহু বছর আগেও ছিল। তবে এই যে এখনকার ইঁদুর যারা, মূলত দু ভাগেই বিভক্ত। ব্ল্যাক আর ব্রাউন ইঁদুর। খ্রিষ্ট পূর্বাব্দ ২০০ বা তার আগেও এদের স্কেলিটান পাওয়া গেছে। পম্পেই এর বিধ্বস্ত নগরেও এদের পাওয়া গেছে।
* এরা মূলত অঞ্চল ভেদে তিন প্রকার। নর্থ আমেরিকান, অস্ট্রেলিয়ান এবং এশিয়ান।
* মানুষের সাথে মানুষের সমাজে এদের ঠিক বসবাস কবে থেকে জানা যায় না।
* মানুষের সাথে শারীরবৃত্তীয় মিল থাকায়,মানুষ তার নিজের ওপর প্রয়োগের
আগে,তার নতুন নতুন পরীক্ষা চালিয়ে গেছে এদের ওপরেই।
* আবার এরাও মানুষের সমাজে থেকে,মানুষের ক্ষতি করে গেছে।
* এক সমাজে অবস্থান। কিন্তু সম্পর্কটা অবিশ্বাসের! কি অদ্ভুত!



অবিশ্বাসের দিন রাতেই অবশ্য সুমনের বাস! যেমন এখন সকাল,কিন্তু ঠিক সকাল নয়!তাই সুমনের সকাল নেই। সকালেরও সুমন নেই। সুমনেরও সকাল নেই। তবু পারস্পেক্টিভে সকাল হলে সুমন ছাদে দাঁড়ায়। আজও দাঁড়িয়েছিল। মাথার ওপর একটা বিষ কালো আকাশ,সুমনের দিকে তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে তাকিয়ে। আজ ফণী আসছে। মোবাইল স্ক্রিনে থেকে থেকেই আছড়ে পড়ছে সাবধান বাণী,মোবাইল কোম্পানির। এখন মানুষ একা। আত্মীয়-পরিজন নেই। আর থাকলেও তাদের উদ্বেগ নেই! মোবাইল ,ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডাররাই পরম আত্মীয়! আজকাল পাখি ওড়াও কমে এসেছে। আজ অবশ্য কোনো পাখিই নেই। হয়ত সম্ভাব্য বিপদ আঁচ করেই। ওরা তো আগেই টের পায়। দীর্ঘ-শ্বাস আর প্রশ্বাসের মাঝে খানিক নড়া চড়া করে নেমে আসার সময় চোখে পড়ে রঙ্গন ফুলের গাছটাও মরে গেছে। ক’মাস আগেও থোকা থোকা ফুল ফুটতো।
নীচে নেমে রান্নাঘরে ঢোকে সুমন। উফফ! আজ আবার! আলুগুলো আধ খাওয়া। ম্যাগির প্যাকেটটাও মাঝ বরাবর খোবলানো। এবার খাবে কী? ফণী আসুক না আসুক অফিস তো যেতেই হবে। আজ স্যালারি ডে। না গেলে হবে না। আবার মেসেজ। পাগল করে দেবে! ওহ না,এটা তিতলির। বাবাকে সকালে উঠেই ও একটা টেক্সট করে। বাবা রিপ্লাই টেক্সট করে। তিতলি আজ স্কুল যাবে না। কারণ ফণী আসছে। স্কুল অথোরিটি আগেই জানিয়েছে আজ স্কুল ক্লোজড।এ অঞ্চলে ভূমিকম্প,মেঘ-ভাঙা বৃষ্টি বা তুমুল ঝড়ের তেমন অতীত ইতিহাস নেই! তবু এত বড় সাইক্লোন আসছে,বার বার সাবধান বাণী আছড়ে পড়ছে, টিভিতে,মোবাইলে। সুমনের অবশ্য তেমন দায় নেই,সাবধান হবার! তিতলি আগে পনেরো দিনে একবার অন্তত দেখা করতে আসতো,মা'র সাথে। এখন সেও আর...অফিসে ফোন করে জানালে অবশ্য ভালো হতো শরীর ভালো নেই। লাভ কী! পরে ম্যানেজমেন্ট কথা শোনাবে! আর,সত্যি বলতে কি জীবন নিয়ে এই খেলাগুলো সুমনের বহুদিনের পছন্দ! এখন আলু কিনতে দোকান যেতে হলে,অফিস যেতে দেরী হয়ে যাবে। ম্যাগিও খেয়েছে হতচ্ছারারা। এর চেয়ে না খাওয়াই শ্রেয়! আজকাল ,না খেলেও দিব্যি চলে যায়। আসলে খাওয়াও তো এক অভ্যেস। যেমন না খাওয়াও! এরচেয়ে সুমন লিখতে বসে,ফোন নিয়ে। নোটস খুলে টাইপ করতে থাকে।

* ইঁদুর প্যাথোজেন কেরিয়ার। বীভৎস সব রোগ ইঁদুর দ্বারাই বাহিত হয়ে জনপদের পর জনপদ ধ্বংস করেছে সুদূর অতীতেও। ইঁদুর নিজে কিন্তু নিরীহ ও নিতান্ত অভাজন। অনেকটা আমার মত। মানুষের মত যুদ্ধবাজ, অসৎ বা প্রতারক নয়! মিলেমিশে থাকে। কমিউনিটি ফিলিং মারাত্মক। মানুষের মত আত্মকেন্দ্রিক, স্বার্থপর নয়! আত্মসুখের কথা ভাবতে গিয়ে অ-পরকে দুঃখে রাখে না। ভোর থেকে রাত সর্বগ্রাসী যে বিষণ্ণতায় ঘেরা এই ঘর,ঘরের বাহির,ছাদ,আকাশ,তা ইঁদুর নির্মিত নয়। ‘বিষাদ’ও কি অচেনা কোনো প্যাথোজেন? এই আমার আশপাশ জুড়ে এত বিষাদ,ইঁদুরই কি তারও কেরিয়ার? না বোধহয়। বিষাদ এক রোগ। সভ্যতার সাইড এফেক্ট! উন্নত ও উন্নয়নশীল পৃথিবীর অর্ধেক মানুষ,এ রোগের কম বেশি শিকার। আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর,ভার্চুয়াল দুনিয়ার বাড়াবাড়ি চারদিক ছাইলে, এ রোগ চূড়ান্ত মাত্রা নেয়। বিষাদ কি তাহলে শ্রেণী শত্রু? শোষক এই নীল বিষবৎ প্যাথোজেন ঢুকিয়ে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত আমার মত প্রলেতারিয়েতের শরীরে।

‘ছোট পাখি ছোট পাখি
সর্বনাশ হয়ে গ্যাছে
পৃথিবীর প’রে আর
তোমার আমার
ভালোবাসার কেউ নেই কিছু নেই’


সকাল থেকেই তিতলি আজ একা। মা স্কুল চলে গেছে। নর্মাল হলিডে নয়। তাতে মা’র ও ছুটি থাকে। আজ তো পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনার মত মজা। মা ফিরতে ফিরতে রাত। স্কুল শেষ হলে মলে যাবে গোপাল কাকুকে নিয়ে। তিতলি সাত সকালেই এসি চালিয়ে,টিভি অন করে দিয়েছে। আমি সিরাজের বেগম চলছে। লুৎফা’কে ওর খুব পছন্দ। বোরখা মাথায় দিয়ে সেজেছে তিতলিও। বাবাকে একটা কল করতে ইচ্ছে হল। ভিডিও কল। কেমন সেজেছে,বাবাকে দেখাবে। কল করলো। কই বাবা? তিন বার কল করল। নট এনসারিং,ধুর এখন তো বেরোয় না অফিস,ফোন কেন ধরে না! চিন্তা হয় তিতলির,বাবা যে কেন বোঝেনা?

ইঁদুরের স্মৃতিশক্তি ভালো। বেশ ভালো। এমন’কি মানুষের মুখও আলাদা করে চিনতে পারে তারা। লেজ হল তাদের কমিউনিকেটিং টুল। আবার শরীরের তাপমাত্রা নিরোধক ও ওই লেজ। অধিকতর উষ্ণতা বা অতি শীত থেকে রক্ষা করে ওই লেজই। মানে তাদের অটো টেম্পারেচার কন্ট্রোলার ডিভাইস ও লেজ। লেজের সাহায্যেই লাফায়।
আজ আর দাড়ি কাটার দরকার নেই। ফিল্টারের জল ভরতে গিয়ে,মনে হল না ভরলেও হয়। জীবনের মূল্যই যেখানে অনির্দিষ্ট,সেখানে ফিল্টারের জল খেয়ে কি হবে! এসব উন্নত জীবনের ঠাট বাট! দেশের কত মানুষতো পানীয় জলই পায় না। স্নান করে নিয়ে জামা প্যান্ট পরে। মোজা খুঁজতে গিয়ে এক পাটি পায়। খোঁজে তন্ন তন্ন করে। পায় না। বুঝতে পারে এও ওই হতচ্ছাড়া ইঁদুরদেরই কাজ! কিছুটা হতাশ, আবার বিষাদ ঘিরছে সুমনকে। সে আবার বসে মোবাইল খুলে। লিখতে থাকে,

ব্যথা কোনো রোগ নয়। রোগের লক্ষণবলতেন, ডাক্তার কাকু। মা তখন ব্যথায় কাতর। বার বাত কাকুতিমিনতি করত কাকুর কাছে। আর কাকু বলতেন ব্যথার ওষুধ খেয়ে আদতে কিস্যু হয় না। রোগ আর রোগের কারণ নির্ণয় করা জরুরী। এই বিষাদের কারণও নির্ণয় জরুরী। শ্রেণী শত্রু মানেই তো তাকে ফিউডাল হতে হবে,বা শাসক তা,না হতেও পারে। হয়ত ছদ্মবেশে,ছদ্মরূপে,এখা ে শ্রেণী শত্রু হয়ত অন্য কেউ। এই যে মোজা খুঁজে পাচ্ছিনা,জানি কে বা কারা নিয়েছে। কিন্তু তারা আমার শত্রু নয়। একই মেঝের ওপর দণ্ডায়মান ,এক ঘরের বাসিন্দা দুই নিরীহ শ্রেণীর মধ্যে,এ হল লড়াই লাগিয়ে দেবার চেষ্টা। সুমন কিন্তু লড়বে না তাদের সাথে। বৈজ্ঞানিক নাম আলাদা হলেও,আমি ও ওরা,আসলে আমরা,এক শ্রেণীকেই রিপ্রেজেন্ট করি।

রাতে খুলে রাখা স্লিপারটাও এক পাটি। আর একটা কই? এতক্ষণে খেয়াল পড়েছে সুমনের। এটাও নিয়ে গেল ওরা? এবার বিরক্ত লাগছে। এমনি’তে সুমন বন্ধুবৎসল! যদিও আজ আর বন্ধু টন্ধু তেমন নেই। অসময়ে বন্ধু দূরবীন দিয়ে খুঁজে পাওয়া যায় না। অসময় না দুঃসময়? দুঃসময়টা লিখেই হাসি পেল সুমনের। বুদ্ধ বাবু চলে ক্ষমতা হারানোর আগে শেষ লেখা নাটক দুঃসময়! সে সময়ে ‘দুঃসময়’ কথাটাকে আনন্দবাজার প্রায় খোরাক করে তুলেছিল। যতদূর মনে হয়,মানুষটা কিন্তু সৎ ছিলেন। এবং অচল রাজ্যকে ঘাড় ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে সচল করার চেষ্টা করেছিলেন। অন্তিম পরিণাম, তিনি নিঃসঙ্গ হলেন! সুমনও এখন তাই। অবশ্য সুমন কাউকে ঘাড় ঝাঁকুনি দিতে যায়নি। সুমনের যা কিছু নিজের সাথেই। আপাতত স্লিপার না পাওয়ায় অত্যন্ত বিরক্ত। এবার রুমাল খুঁজতে গিয়ে দেখে সেটাও নেই। অথচ সুমন শুতে যাবার আগে,মোজা,রুমাল,হাতঘড়ি, ার্ট ও প্যান্ট বিছানার এক কোণে গুছিয়ে রেখেই শোয়। যাতে পরদিন ঘুম থেকে উঠতে দেরী হলেও,অফিসে দেরী না হয়। স্লিপার না হয় পরে খোঁজা যাবে। রুমাল আর মোজা তো জরুরী! ভ্রু কুঁচকে সুমন ভাবছে কী করা উচিৎ? ছোটোবেলা থেকেই সে পেট-লাভার। খুব ছোটতে মাছ পুষতো,চৌবাচ্চায়। পরে প্রায় ১০টা বেড়ালের ঠিকানা ছিল তাদের সিঁড়ির নীচটা। মা তাদের জন্য ভাত আর মাছের মুড়োকে একসাথে সেদ্ধ করে দিত। পরে পুষলো নেড়ি কুকুর। তিতলির দৌলতে খরগোশ আর পাখি পোষাও হল অনেক। সঙ্গত কারণেই ইঁদুর আরশোলা টিকটিকি যা এ বাড়ির বাসিন্দা সুমনের মতই বহুদিন ধরে,তাদের নিয়ে সুমনের সমস্যা আছে আবার নেইও। সমস্যা থাকলেই তাদের ছেড়ে যেতে হয় তা সুমন বিশ্বাস করে না। ঝিমলি রাগ করত খুব! বলত তোমরা অশিক্ষিত,অশ্লীল,কি করে এদের নিয়ে একসাথে থাকো বছরের পর বছর? সুমন হেসে উত্তর করত,জীবে প্রেম করে যেই জন,সেই জন সেবিছে ঈশ্বর। ওরা তো তোমার কোনো ক্ষতি করে না। তবু ঝিমলি বিষ নিয়ে এসেছিলো,ইঁদুর মারতে। প্রবল কথা,কাটাকাটি তর্ক ঝগড়া। রেগেমেগে ঝিমলি বলেছিল,
- আমি মারবোই ওদের।
- ওদের মারার আগে আমায় মারতে হবে। এ বাড়িতে এসব চলবে না।
- দরকার হলে তোমাকেও মারবো। আমি এদের সাথে একসাথে থাকব না।
- সেই !আমিও তো তোমার শত্রুই!
ঝিমলি ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই সুমন লুকিয়ে ফেলেছিলো,ইঁদুর মারার বিষ।
ফিরে এসে কি প্রবল ঝামেলাটাই না করেছিল ঝিমলি। উফফ!
আজ কি মনে হওয়ায় সুমন বিষটা বার করে আনলো। রাখলো টেবিলের ওপর। তিনতলার ছাদ,আর নীচের উঠোনের গাছগুলোয় জল দিতে গেল।

‘ছোট পাখি ছোট পাখি
ভাঙচুর হয়ে গ্যাছে
শিশুদের খেলনা
আমাদের দোলনা
ডাকবাক্সের ঢাকনা
রাস্তায় ল্যাম্পপোষ্টে আলো নেই’


তিতলি একা। সাড়ে বারোশো স্কোয়ার ফিটের এই ফ্ল্যাটে কোনো গাছ নেই। তিতলির কোনো খেলনা নেই। গল্পের বই নেই। ছাদ নেই। ব্যালকনিতে গেলে,পাশের বাড়ির বাথরুম। কিচ্ছু নেই! তিতলির সব খেলনা ও বাড়িতে। স্টোরি বুকস ও বাড়িতে। তিতলির ভালোলাগাগুলো সব ও বাড়িতেই। মনে হয় এক ছুট্টে চলে যায় বাবার কাছে। বাবা কত পেট কিনে দিতো। তাদের সাথে,গাছেদের সাথে কথা বলেই কেটে যেত দিন। মা'তো কখনোই সময় দিত না তিতলিকে। বাবা আর মাসি। রেখা মাসি। রেখা মাসিকেও মিস করে তিতলি। খাইয়ে দিত। ঘুম পাড়াতো গান গেয়ে। গল্প বলত ভুতের। এমনকি জন্মদিনেও মা ফিরতো দেরি করে। মাসিই যা জোগাড় যন্ত্র করত। মা কেবল পরে এসে ডায়ালগ দিত। বাবাকে বলত,এত বড় মেয়ের জন্মদিন কর কেন? বাবা বলত,ওর ভালো লাগবে। তুমি তো ঝিমলি ভোগবাদের শিকার! তুমি এসব বুঝবে না ঠিক! মানুষের সুকুমার বৃত্তিগুলো লালন করতে জানতেও হয়। এখন আর তিতলির কিছুই ভালো লাগে না। খুব মরে যেতে ইচ্ছে করে। ও স্টার হয়ে যাবে। খুব শীগগির। অবশ্য তাতে মা’র কিছু আসবে যাবে না। বাবা কেবল কষ্ট পাবে। চোখের জল মুছে তিতলি বাবাকে আবার ফোন করল। ধরলো না বাবা। বাবাতো এমন করে না। অসুস্থ নয় তো? কেন জানিনা মনের মধ্যে ব্যাড ফিলিং! মা’কে একবার ফোন করতে গেল। করলো না। তার চেয়ে ঘুমনো ভালো।

গাছে জল দিয়ে,ফিরে সুমন খানিক পায়চারি করলো। আবার খুঁজলো মোজা,রুমাল, স্লিপার । পেল না। অফিসে ফোন করে বস কে জানালো একটু দেরী হবে ঢুকতে। তিতলির তিনটে মিসড কল দেখলো। বেরিয়ে বাসে উঠে কল ব্যাক করবে স্থির করল। ফোন নিয়ে আবার বসলো।
বামেদের চৌত্রিশ বছরের পর, এ রাজ্য হল জোড়া ফুলের। এখন আবার পদ্মের চাষ চলছে। আর এস এসের তত্ত্ব মেনে, পদ্মের লোকরা এ দেশ কে একচুয়ালি হিন্দি হিন্দু হিন্দুস্তানেই রূপান্তর করতে চায়। এর সাথে জুড়েছে বহিরাগত ও অনুপ্রবেশ তত্ত্ব। সুমনদের বাড়ির দেওয়ালে সহাস্য হাতজোড় করা প্রধানমন্ত্রীর পোস্টার। নীচে লেখা অনুপ্রবেশকারীদের বিতাড়িত করুন। দেশকে আরও শক্তিশালী করতে অমুক চিহ্নে ভোট দিন। হাসিও পায়! সেভাবে ভাবলে তো এ দেশে আর্যরাও বহিরাগত! আর এত বছর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পর,এ দেশ কি মুসলিম অধিবাসীদেরও নয়? বাবর কি ক’দিন আগে এসেছিলো এ দেশে? মুঘল সাম্রাজ্যের কয়েকশো বছরের যে ইতিহাস তা তো আমার ভারতবর্ষেরই ইতিহাস। তাহলে আজ এসব কথা উঠছে কেন? বিসিডি নিরানন্দ চ্যানেলে কদিন ধরে বার বার ওপিনিয়ন পোল দেখাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গেও পদ্মের এবার জোরদার চাষ! আসলে বদলে যাচ্ছে এলাকার মানুষী মানচিত্র। বদলে দিচ্ছে ভাবনা চিন্তার নিরন্তর আবহমানতা। আর সুকৌশলে তা বদলাতে, এরা যে পথ নিচ্ছে তা ঘৃণ্য! এলাকায় এলাকায় দাঙ্গা লাগাচ্ছে। সেই ‘৪৬এর আবার পোলারাইজড হচ্ছে মানুষ,ধর্মের ভিত্তিতে। সুফল নেবে ধর্ম বেওসায়িরা! আর,মানুষ কি অদ্ভুত সব জেনেও সেই ট্র‍্যাপে পা দিচ্ছে…
সুমন কলেজে পড়ার সময় থেকেই অতি বাম রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছিল। যদিচ অতি বামদেরও এত দল আর উপদল! এক হতেই পারত না। কলেজ ইলেকশনে ওরা দাঁড়াতো না। কারণ সংসদীয় রাজনীতিতে বিশ্বাস ছিল নেই। পরে যা হয়,দল,উপদল,উপদলের ও উপদল। ঘেন্নায় সুমন ছেড়েই দিলো রাজনীতি। কিন্তু পাঠকদার নেওয়া ক্লাসগুলো আজও জ্বলজ্বলে। দীপঙ্করদাও রাঁচি থেকে এসে একাধিক ক্লাস নিতো। মনে পড়ছে শ্রেণী সংগ্রাম নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে পাঠকদা বলেছিলো,শ্রেণী সংগ্রাম এক নিরন্তর প্রসেস। তা’কে চালিয়ে যেতে হয়। এ শুধুমাত্র ফিউডাল,আর বুর্জোয়া শ্রেণীর বিরুদ্ধে টয়েলিং ক্লাসের লড়াই নয়। প্রয়োজনে নিজের ক্লাসের মধ্যেই লড়তে হয়। এমনকি নিজ পার্টির মধ্যেও। শোষক যেন তেন প্রকারেণ তার এজেন্ট ঢুকিয়ে দেয় পার্টির ভেতরে। যাদের কাজ হল,লড়াই কে ডি-ফোকাশ করা,নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থা তৈরি। দলের সামগ্রিক ইমেজের ক্ষতি করা। এবং শেষ পর্যন্ত পার্টিকে কমজোরি করে বিপ্লবের অভিমুখ থেকে সরিয়ে দেওয়া। আমাদের কাজ এদের লক্ষণ চিনে সর্বাগ্রে চিহ্নিত করা। এবং প্রয়োজনে নিকেশ করে দেওয়া। সমষ্টির স্বার্থে স্খলিত ব্যক্তি,বা ব্যক্তিবর্গকে এই সরিয়ে দেওয়াও বিপ্লব।
মজার ব্যাপার হল,ইউনিভার্সিটিতে পৌঁছে এই ক্লাস নেওয়ার দায়িত্ব পড়ে,সুমনেরই ওপর। আর তেমনই এক ক্লাসে ঝিমলির সাথে সুমনের আলাপ। প্রেমের প্রস্তাব কমরেড সুমনকে দেয় ঝিমলিই। বিয়ে এক বিরক্তিকর প্রতিষ্ঠান। সুমন তেমনটাই বিশ্বাস করতো। তবু ঝিমলির জোরাজুরি আর কনস্ট্যান্ট লেগে থাকায় জয় হল ঝিমলির। ক’দিন পর সুমনকে যখন পার্টির লেভি দিতে বারণ করলো ঝিমলি,সুমন টের পেল,স্খলনের শুরু। তারপর তো সর্বগ্রাসী স্খলনের দিকে এগিয়েছে দিনের পর দিন ঝিমলি। ফাইনালি বছর তিন আগে যেদিন ছেড়ে গেল সুমনকে, সুমনের এই বাড়ি। আটকায়নি সে। বরং শান্তি পেয়েছিলো,আর তো স্খলন হবে না কেবল মেয়েটাকে না নিয়ে গেলে পারতো। একলা জীবন পুরুষের আনন্দদায়ক। কিন্তু মায়া,সন্তান মায়া যে বড় কষ্টের! সারাটাক্ষণ যে জড়িয়ে জড়িয়েই…
আজ কিছু একটা সে করতে চায়। ভেতরে ভেতরে অস্থির খুব আজ। আবার বসলো ফোন নিয়ে। বসার আগে,চোখে পড়ল বিস্কুটের সিল করা প্যাকটাও অর্ধেক খাওয়া। আর ক্রোধকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলো না। প্যাক থেকে বিস্কিটগুলো বার করে ঝিমলির সেই বিষ এর প্যাকেট খুলে ভালো করে মেশালো। খাটের নীচে ছড়িয়ে দিলো,ওরা ওদিক থেকেই বের হয়ে আসে,আস্তানাটা ওদিকেই। লিখতে শুরু করলো

এই বাসায় ইঁদুর আরশোলা টিকটিকিরা আমার থেকেও প্রাচীন বাসিন্দা। মানে একার্থে তারাও ভূমিপুত্র। মানুষের সাথে একসাথে বসবাসের অঘোষিত রীতিনীতি তাদেরও জানা। আর সেটা হল কেউ কারো ক্ষতি করব না। তাহলে কি শোষকের নির্দেশে তাদের এজেন্টরা ঢুকেছে এই ঘরেও। ক’দিন আগে কর্পোরেশন বুজিয়ে গেছে,সব বাড়ির সামনের সমস্ত ড্রেন,নতুন বহিরাগতরা ওই নর্দমাগুলোরই আদি বাসিন্দা। তারা শিক্ষিত নয়। আর তারাই এই বিপত্তির কারণ! যেমন ছিল ঝিমলি। মনে পড়ছে পাঠকদার কথাগুলো। ‘ আমাদের কাজ এদের লক্ষণ চিনে সর্বাগ্রে চিহ্নিত করা। এবং প্রয়োজনে নিকেশ করে দেওয়া। সমষ্টির স্বার্থে স্খলিত ব্যক্তি,বা ব্যক্তিবর্গকে এই সরিয়ে দেওয়াও বিপ্লব।’ আজ নিকেশ করার আগে চিহ্নিত করণ যে পথে:
● ম্যাগির প্যাকেট খুলে খাওয়া
● বিস্কিটের প্যাকেট।
● রুমাল সরানো
● নতুন জামা খুবলে খাওয়া
● মোজা নিয়ে পালানো
● স্লিপার নিয়ে পালানো
● আলু খুবলে খাওয়া
প্রতিদিন পায়ের ওপর,ঘুমন্ত শরীরের ওপর দিয়ে যাবার পরও সহ্য করেছে। কারণ শ্রেণী সংগ্রামে নামার আগে প্রস্তুতির সময় নেওয়াটাও বিপ্লবেরই অংশ বিশেষ। আজ সেই বহু প্রতীক্ষিত মুহুর্তের সামনে আমি, দেখা, যাক…


একপাটি মোজা খুঁজতে খাটের তলায় বুকে হেঁটে ঢুকলো সুমন। বাইরে কালো কুচকুচে আকাশটা থম মেরে ঝুলে! গাছপালা খুব দুলছে। ফণী আসছে। খাট মানে ঠিক খাট নয়। চৌকি বা তক্তপোষ। বাবা,মা,দিদি আর সুমন এক চৌকিতেই শুতো। ফলে এই চৌকিটা একেবারে ছোটোখাটো মঞ্চের মত। আর নীচ জুড়ে রয়েছে অজস্র বই! মা'র আমলের পেতলের হাঁড়ি কুড়ি,আরও কত কী! ধূলোর মধ্যে গেলেই,এই এক সমস্যা সুমনের হাঁচি শুরু হবেই! হলও তাই। এখন চলবে প্রায় টানা মিনিট বিশেক। তা হোক। মোজা তো চাই! নইলে বেরুবে কি করে! সুমন হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকে পড়ল,এই বেলা এগারোটার সকালে। যদিও এ সকাল ঠিক তেমন সকাল না। রাতের মতই অন্ধকার! হাত ভাঙা বেবি ডল,লাট্টু লেত্তি,ছেঁড়া বই টুকরো টুকরো করে কাটা। এসব পেরিয়ে সে পৌঁছলো চৌকির একেবারে কোণে। অবশ্য চাইলেই কী আর যাবার উপায় আছে! মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে গোদার খাসি হারমোনিয়াম,মা’র এক পাটের হারমোনিয়াম। আর একদিকে সেলাই মেশিন। উষা কোম্পানির। বসা সেলাই মেশিন। মা সেলাই জানতেন। সেগুলো সরিয়ে ও চললো মোজা খুঁজতে। হু মোজাই। আগে তো কত কি খুঁজতে ঢুকতে হত,খাটের নীচে। সেই সুমন,এই মাঝবয়সী সুমন নয়! শিশু বা কিশোর সুমন! এ বয়সে এই হামাগুড়ি দেওয়া পোষায়! প্লাস্টিকের বলটা কেমন থ্যাব মেরে বসে ওকে দেখছে! খানিক ভ্যাবচাক কাটতেই হাসি পেলো খুউব। হাসলে আবার সমস্যা, মনে মনে আউড়ালো, বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক।হোক। বাইরে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। ঝির ঝির বৃষ্টি বাড়ছে! পুরনো হাড়ি কুড়ি গুলো সরাতেই একটা বাক্স! মুখ খোলা! রাজ্যের ছেঁড়া কাপড় চোপর,ববিন,সুতো জড়ানোর রিল। এটা ছিলো মা'র সেলাই এর বাক্স! সরাতে যেতেই ভেতরে কি যেন নড়ছে! কারা যেন! মোবাইলের টর্চ মারতেই দেখে ওর মোজা,এক নয় দুই নয় প্রায় সাত খানা! সব কিন্তু এক পাটিই। হাত বাড়িয়ে নিতে যেতেই বিপত্তির শুরু। কার গায়ে হাত পড়ল। পড়ুক। এরা অনেক। হোক অনেক। বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক। এলোমেলো হাত চালাতে লাগলো সুমন। দিয়েছে কামড়ে! এবার! ইস! কী জোর দাঁতের! আরে শালা চোর ইঁদুর,তার আবার এত সাহস! এবার দুহাত চালানো শুরু করলো। আগে শত্রু শিবির ধ্বংস কর,তারপর অন্য ভাবনা…

আক্রমণ। উলটে দিলো বাক্সটা আর যায় কই! একসাথে ধারী নেংটি মিলিয়ে প্রায় জনা পাঁচ ছয় সুমনের গায়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো। সুমন প্রথম ঝেড়ে ফেলতে গেছিলো। কিন্তু খাটের নীচে তেমন জায়গা কই! সেলাই মেশিন আর হারমোনিয়ামের মাঝে আটকে গেছে সে ! তা হোক আজ সুমন ছাড়বে না। ইঁদুরের গ্যাং ও ইচ্ছে মত সুমনকে আক্রমণে... বাইরে তুমুল বৃষ্টি এলো। ঘটনার আকস্মিকতায় প্রথম সে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল! ধুলো,ঝুল,আর সারা শরীর জুড়ে তারা ঘুরে বেড়াচ্ছে সব মিলিয়ে কেমন অস্বস্তি শুরু হল। হাত পা ছুঁড়তে শুরু করলো সুমন। আজ এসপারওসপার। শত্রুর শেষ রাখতে নেই। বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক… কিছুক্ষণ বোধহয় জ্ঞানশূন্য হয়েও রইল সে। পরে জ্ঞান আসলে প্রথম যে অনুভূতিটা টের পেলো,সে যেন কানে বেশি শুনছে। গরমও লাগছে খুবই। গায়ে হাত দিতেই বুঝলো একটা কিছু সাংঘাতিক চেঞ্জ এসেছে শরীরে! সারা শরীর জুড়ে পুরু রোম। ইয়া বড় লেজ। আর চোখ ছোটো। মানে কী! তবে কী! পালাতে গিয়ে ফিল করলো,দু পায়ে সে আর পালাতে পারছে না। চার পেয়ে এখন। ধেড়ে বুড়ো ইঁদুরগুলো তখন হাসছে! মালা পরিয়ে বরণ করতে ছোটরা এলো । ওমা ইঁদুরদের কথাও তো সুমন দিব্যি বুঝতে পারছে। ইতিমধ্যে বাকি ইঁদুররাও তার চারপাশে। এটা কি তার ইঁদুর জগতে ব্যাপ্টাইজেশন এর সময়! পালাতে গেল সুমন। চেয়ার। ওই তো চেয়ার,যাতে বসেই ওর কাটতো ঘন্টার পর ঘন্টা! তাতে গিয়ে বসতেই ফিল করলো। যে চেয়ারের পিছনের অংশ,থাকতো ওর পিঠের নীচে,তার থেকেও অনেক অনেক ছোট সে! হায়! খানিকটা হাতলের ওপর দৌড়লো,একটু চুপ করে গন্ধ টন্ধ শুঁকলো। মন খারাপ হল খুব। আজ যে অফিসে কাজ ছিলো অনেক,এখন কী হবে! কেমন একটা ভয় পেয়ে বসলো ক্রমশ! ঘরের জানলা খোলা। তুমুল বৃষ্টি,ঘর ভিজছে বৃষ্টির ছাঁটে। জানলাটা দিতে পারলে ভালো হত। কিন্তু উপায় কী! বাইরে তুমুল দুলছে গাছ পালা। ভেঙে না পড়ে। পুরনো বাড়ি ঘর। তিতলি এখন কোথায়? একবার খোঁজ নিলে ভালো হত। ফোনটা চেয়ারের সামনে বিছানার ওপর রাখা। কিন্তু ও কি চালাতে পারবে এই এত্ত ছোটো শরীরে? একবার ডায়াল কি’ টার ওপর চেপে বসলো,তাতে আর কী হয়! আলো জ্বললো,তিতলির মিসড কল,ও দেখতে পাচ্ছে,কিন্তু কল ব্যকা করবে কী করে? এত হেল্পলেস লাগছে ওর...কান্না পেয়ে গেল! হায় বিপ্লব!
অবশ্য ওর পাশে এখন এসে দাঁড়িয়েছে ওরা। কেউ গায়ে গা ঘষছে,কেউ লেজে লেজে কাটাকুটি খেলছে। সুমন প্রথমে ভেবেছিলো ওরা আনন্দিত,সুমনের এই হাল দেখে। পরে বুঝলো না! ওকে বিষণ্ণ দেখে বাকিদের কষ্ট হচ্ছে! তাই ওকে চিয়ার আপ করতে বাকিদের এই প্রচেষ্টা! সুমন অবশ্য তথৈবচ! চোখ দিয়ে জল গড়িয়েই নামছে,নামতেই থাকছে…


‘ও পাখি ও পাখি
গানটা হেরে গ্যাছে
নদীটা ফিরে গ্যাছে
পাহাড়টা সরে গ্যাছে
সাগরটা মরে গ্যাছে
আদিবাসী শামুকের কোনো ঘর নেই’


তিতলি খেতে বসবে এবার,তার আগে বাবাকে একটা ফোন করলো। কাঁহাতক আর সিরিয়াল দেখবে। আজ বাবাকে খুব মিস করছে। বাবার সাথে থাকলে বাবা কত গল্প বলত। লেনিন,মার্ক্স,আর্কিমি িস,আইনস্টাইন,এডিসন। সব বাবার কাছেই শোনা। জিকে তে তিতলি অলওয়েজ ফার্স্ট,এন্ড দ্যাট ইজ ডিউ টু বাবা ওনলি। সে কথা অবশ্য ওর স্কুলমেটরা সবাই জানে। মা’ই কেবল মানেনা। না মানলে না মানলো। তিতলিও ওর মা’কে কিছুই বলে না। কেবল লেগে যায় যখন মা বলতে শুরু করে,তোর বাবা হল একজন আইডিয়ালিজমের তেলে ভাজা নিষ্কর্মা! বিষ নেই এক কণা,কেবল কুলোপানা চক্কর। এমন বোকা,মুর্খ,গর্দভকে বিয়ে করা আমার জীবনের মস্ত ভুল। তিতলির অবশ্য এসব শুনে শুনে কান পচে গেছে। আর পাত্তা দেয় না। আদর্শবাদী হওয়া খারাপ এ কেবল তার মা বলে। নিজের তো কোনো আদর্শ নেই! বাবা হাত পুড়িয়ে রাঁধে,মা গোপাল কাকুর সাথে প্রেম করে বেড়ায়। আর বাবা কি সুন্দর দেখতে! তাকে ছেড়ে কি করে কুৎসিত গোপালকে পছন্দ হল মা’র। সেটাই আশ্চর্যের। আর বাবা তো কখনও মা’র বিরুদ্ধে একটাও শব্দ বলে না। তিতলি কিছু বলতে গেলে,তাকে থামিয়ে দেয়। বলে,তিতলি মা হল মা। তাকে শ্রদ্ধা করবে। ভালোবাসবে। তবেই বড় হতে পারবে। তিতলি আবার বাবাকে ফোন করলো। না, এবারও নট এনসারিং।


ইঁদুররা মূলগত দলবদ্ধ জীব। অসুস্থ ইঁদুরের দেখভাল করে সুস্থ ইঁদুর। এক সাথে ঘোরে। এক সাথে খায়। যেমন মানুষ! একলা ইঁদুর বিষণ্ণ হয়ে পড়ে! একটু ধাতস্থ হয়ে সুমন বেরুলো ঘর ভ্রমণে। আরশোলার সাথে দেখা পথিমধ্যে! ও অবশ্য তেমন পাত্তা দেয়নি,এ ঘরের সব ওর হাতের তালুর মত চেনা জানা। বাকি সব তো পরে এসে ঢুকেছে। লাইটের ভোল্টেজ কমছে,বাড়ছে। ভিজছে সব। মায় বিছানাও। এমন ঝড় বহুদিন দেখেনি সে। কিছু আগেও সে যখন মানুষ সুমন ছিল,বারংবার মোবাইলে ফণী নিয়ে এলার্ট আসছিলো। ও অবশ্য এসবে পাত্তা দেয়নি। পাত্তা দিয়েই বা কী হয়! ঝিমলি যতদিন ওর সাথে ছিলো,সে'তো পাত্তা দিয়েছে,সাধ্যমত কম্প্রোমাইজও করেছে অনেক কিছুতেই। তবু ঝিমলি ঠিক বেরিয়ে গেছে,তিতলিকে নিয়েই। খেয়াল করেনি সুমন, সে এখন বাবা আর মা'র ছবির ঠিক মাঝামাঝি। দূরত্ব প্রায় আগে হলে বলত তিন হাত। এখন ওসব মাপের কোনো মানেই নেই। হাত ওর আছে। কিন্তু তা এত ক্ষুদ্র,যে মেপে লাভ নেই। তা ধরা যাক ৪ ফিট। বাবা আর মা'র এই দূরত্বটা অবশ্য বরাবরেরই। তবু একসাথেই তো কাটিয়ে দিয়েছিলো একটা গোটা জীবন! সুমন আর সুদীপের কথা ভেবে। সুদীপ সুমনের দাদা। সে যাই হোক কেবল বাবা মারা যাবার আগে একবার সে দেখেছিলো,বাবার হাত মা'র কাঁধে। যেন দুই নিবিড় বন্ধু। পিঠের পেছনে বালিশ! টিভির সিরিয়াল দেখছে একসাথে। সুমন দেখে ফেলেছে দেখে বাবা,মা’র কী লজ্জা! নর্মালি ইঁদুর সমাজে মানুষ নিয়ে ভীতি প্রবল! তাই বুঝে শুনেই শেল্টার থেকে বের হয় খাদ্যের সন্ধানে। কিম্বা মস্তি করতে। ফ্যাট ফ্যাট করে আলো জ্বলছে,তবু সুমন সাহস করেই বেরিয়ে পড়েছিলো। কারণ এই ঘরে যে আর কেউ নেই,তা সুমনের জানাই ছিলো। সুমনকে নজরে রাখছিলো,বাকিরা। সুমন প্রায় ১৭ ফিট ওপরে যাবার পর,এবার বাকিরাও বেরুলো লাইন দিয়ে। প্রথমে গ্রুপ কমান্ডার বড়দা। পরে মেজ,সেজ,ন,ফুল,রাঙা এভাবেই একেবারে ছোট অবধি। সুমন নামকরণ করেছে,চেহারা আর ভাবভঙ্গি দেখে। সব থেকে বড় যে জন,হাবেভাবে বিজ্ঞ। তাকে ও বড়দা নামেই ডাকছে। দীর্ঘদিন মানুষের সমাজের পাশে থেকে,বড়দা মেজদা নামগুলোর সাথে ইঁদুররাও পরিচিত। ফলে নাম পছন্দই হয়েছে ওদের। আকারে বড় এবং হাবেভাবে বিজ্ঞ যাকে সুমন ‘বড়দা’ ডাকছে,তিনি তো বলেই বসলেন। 'এই নামটার অপেক্ষায় আমি বহুদিন। আজ এতদিনে সাধ পূরণ হল। উফফ ছোড়দা আবার অতি উৎসাহী। বাবার গলার শুকনো মালাটা,কুচুর করে কাটতে গেছিল দাঁত দিয়ে। সুমন টের পেয়েই ধমক দিয়েছে। বলেছে,এই এটা আমার বাবার ছবি,তার মালা। খবরদার মুখ দেবে না। ছোড়দার তাতে রাগ হওয়ায় দাঁত কিড়মিড় করে এগিয়ে আসছিলো। বড়দা ম্যানেজ দিলো। এই নিজেদের মধ্যে এসব ঝামেলা ঝঞ্ঝাট করতে নেই,আমরা কী মানুষ এর মত নোংরা না'কি! সুমন শুনলো। কিছু বলেনি। এদিকে ঝড়ের তাণ্ডব বাড়ছে। জানলার ওপরের ফাইবারের শেডটা উড়ে গেল বোধহয়। খরচা করে সুমনই সব কটা জানলার মাথায় এমন শেড লাগিয়েছিল,ঝড় বৃষ্টি থেকে বাঁচতে। গায়ে লাগছে খুব! এ কেমন প্রকৃতির খেয়াল কে জানে। ভেঙে এত আনন্দ কিসের! দেওয়াল বেয়ে জানলার ধারে এসে উঁকি দিতে যাচ্ছিলো,সে,প্রবল হাওয়ায় মনে হল উড়েই যাবে। ভাগ্যিস বড়দা টান মেরে ঘরের মেঝেতে ফেললো। নইলে হয়েই গেছিল আর কী! এতক্ষণে সুমন উড়তো ঝড়ের মুখে। অবশ্য খারাপ কিছু হত না তাতে। যদি উড়তে উড়তে দেখা হয়ে যেত তিতলির সাথে। মন কেমন করছে। এমন ঝড়ের বিকেলে কেমন আছে কে জানে বেচারি মেয়েটা???

‘নেই নেই কিছু নেই
রাস্তার বাম নেই
শ্রমিকের ঘাম নেই
টাকাদের দাম নেই
চিঠিটার খাম নেই
আমাদের কারো কোনো নাম নেই’


ঝড় একটু কমেছে। বৃষ্টি অবশ্য আগের মতই। অথবা একটু বেশিই আগের থেকে। তিতলির মন খুব খারাপ। এমন ঝড় বৃষ্টির দিনে,বাবার সাথে থাকলে খুব মজা হত। ও বাবাকে অফিস যেতে বারণ করলেই বাবা শুনতো। আর ও বাবার সাথে বসে ক্যারম খেলতো। ক্যারামের ঘুঁটিগুলো খুব বাজে। বাবা মারলে দিব্যি পকেটে গিয়ে পড়ে। আর তিতলি মারলে কিছুতেই পকেটে যেতে চায়না। কিছুতেই না। বাবা অবশ্য শিখিয়ে দেয়। এইভাবে মার। এই সময় তিতলি বাবার গায়ের গন্ধ পায়। গন্ধটা খুব মিষ্টি। নবরত্ন পাউডারের মত। না পন্ডস ল্যাভেণ্ডারের মত। না,আসলে দুটোর মিক্সচার! গায়ে দিলেই গা ঠান্ডা হয়ে যায়। আজ এই মুহুর্তে বাবার জন্য খুব মন কেমন করছে। মা যে কেন মাসে একদিনের বেশি বাবার কাছে যেতে দেয় না,কে জানে। পুরনো বাড়িটাকে কেন জানিনা তিতলির নিজের বাড়ি মনে হয়। এদিকে ওদিক ফাটল ধরেছে। বৃষ্টি পড়লে জল পড়ে ছাদ থেকে। তখন বিছানা সরাও,বালিশ সরাও,সে এক বিদিকিচ্ছিরি ব্যাপার। তবু ভালো লাগে। ভালো লাগে বাবার খাটটা। খাটের নীচে কত কী পুরনো খেলনা। আর ইঁদুর। ইঁদুরগুলো খুব দুষ্টু। তবু ওর সাথে ভাব হয়ে গেছে। ওর পাশ দিয়েই ইঁদুরগুলো দৌড়য়,ঘোরে ফেরে। তবু ওকে তো কিছু করে না। মা যখন বাবার সাথে থাকততখনও বার বার এই পুরনো বাড়ি নিয়ে প্রায়ই বিরক্তি প্রকাশ করত। বলত,এটা কোনো বাড়ি। বাবা অবশ্য সে কথায় কান দিতো না। বলত,এ বাড়িতে বাইরে থেকে এসে ঢুকলেই মার গন্ধ পাই,বাবার গন্ধ। আমি যতদিন আছি,এ বাড়িতেই থাকব। সে গায়ে বৃষ্টির জল পড়ুক,ইঁদুর আরশোলা ঘুরুক বুকের ওপর। তিতলির ওই বাড়ির উঠোন,ছাদ,গাছ পালা,পাখি আসে সকাল হলেই সব ভালো লাগতো। ফ্ল্যাট তো ছোটো। অত জায়গা কই। কিন্তু মা যেহেতু কিনেছে। সে কথা শুনবে কেন? অবশ্য মা’তো কারও কথাতেই কান দিতো না। কিছু বলতে গেলেই ঝগড়া ঝাঁটি। বাবা শেষমেশ চুপচাপ হয়ে গেছিল। খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দিলো। মা অবশ্য পেছনে তাকায়নি। বাড়ি ছেড়ে চলে গেল। উঠলো এই দু কামরার ফ্ল্যাটে। তিতলি আসতে চায়নি,কিছুতেই আসবে না, শেষে জোর করেই নিয়ে আসে মা। আসার দিন ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়েছিল বাবা। তিতলির এত কষ্ট হচ্ছিলো। যেমন আজ হচ্ছে। এই প্রবল দুর্যোগের বিকেল,বাবা কি করছে,কে জানে? তিতলি আগে তিন বার ফোন করেছে। এখন আবার করল,রিং হয়ে যাচ্ছে...ধরছে না কেন বাবা?

ইঁদুরদের বুদ্ধি খুবই তীক্ষ্ণ। যে পথে একবার চলে,তা দিব্যি মনে রেখে দেয়,পুরো ছবির মত। আর দুঃখে যেমন বিষণ্ণ হয়! আনন্দে তেমন উজ্জ্বল। খুব আনন্দ হলে দাঁত কিড়মিড় করে। শুনতে পাওয়া যায় সেই শব্দ। আর তখন চোখ ও দ্রুত নড়তে থাকে।
সুমনের কানে আসছে ফোনের রিংটোনটা। বাবা আর মা'এর মাঝখানের দেওয়াল বেয়ে খাটে নামলো। এক দৌড়ে চলে এলো খাটের এক কোণে রাখা ফোনটা ধরতে। এ রিংটোন ওর চেনা। এটা শুধুই তিতলির ফোনের রিংটোন। জিংগল বেল জিংগল বেল জিংগল অল দ ওয়ে...না ধরতে পারলো না এমন'কি ফোনটার কল বাটনের ওপর দাঁড়িয়েও ধরা গেল না। আলোটাও নিভে গেল। তিতলির ফোন আসলেই ওর ছবিটাও ভেসে ওঠে। একবার অন্তত ছবিটাই দেখত। না ফোন আর বাজছে না। ইতিমধ্যে তার দেখা দেখি উপস্থিত বাকিরাও। বড়দা বললেন,তুমি তো বিপজ্জনক ভায়া। মানুষকে বিশ্বাস আছে? তুমি ওই যন্ত্রটার ওপর উঠে পড়লে,যদি কিছু হয়ে যেত? সুমন হাসলো। কিছু বললো না। বাকিরা চোখ নাচিয়ে,দাঁত কিড়মিড় করতে করতে বড়দার কথায় সায় দিচ্ছে,,ঠিকই ঠিক! বড়দা সকলকে নিয়ে এবার চলল খাটের নীচে। যেখানে ওদের আস্তানা। মেজটা দুম করে হারিয়ে গেল,মা'র সেলাই মেশিনের মধ্যে। বড়দা খুব বিরক্ত। চিৎকার করে ডাকলো 'মেজ,বাইরে দুর্যোগ চলছে,এটা মজা করার সময় নয়। বেরিয়ে এসো।' মেজ ভয়ে দৌড়ে বেরিয়ে আসতেই,সুমনের মুখ গোঁজ। মেজ’র চোখে পড়েছে। জিজ্ঞেস করতে সুমন বললো,এসব ছেলে মানুষী আমার পছন্দ না। এটা আমার মা’র সেলাই মেশিন। মা বাবু হয়ে বসে সেলাই করত এক মনে। বাবার লুঙ্গি,দিদির সুদীপ ,সুমনের ফতুয়া। কত কী করত! এই মেশিনেই মা ছিট কাপড় এনে সুমনের মাপ নিয়ে জামা বানিয়ে দিয়েছিলো জন্মদিনে। সুমনের সেই জামা পড়ে কী আনন্দ! বন্ধুদের দেখালে,অরূপ বলেছিল,কি'রে বুক পকেটটা,বাইরে না হয়ে ভেতরে কেন? সপ্রতিভ সুমন তো আর মায়ের ভুল ধরতে দেবে না। তাই বলেছিলো,আমিই মা'কে বলেছি,পকেট ভেতরে রাখবে। তাতে টাকা পয়সা রাখবো।
এদিকে ছোটটা ঢুকে পড়েছে,মার হারমোনিয়ামের বাক্সে। রিডগুলোর ওপর নাচছে। সুমন খুব পরিস্কার বুঝতে পারছে,কোনটা সাদা রিড,আর কোনটা কালো রিডের শব্দ। একাগ্রতা থাকলে আসলেই বোঝা যায়! হঠাৎই সুমনের মুড বিগড়োলো। সেও ঢুকে পড়ল,বাক্সে। এরা তো সব নষ্ট করে দেবে! কথাটা বলার সময় হঠাৎ মনে পড়ল সুমনের,ঝিমলিকে শেষ টেক্সটের লাইন। ‘নষ্ট জীবনের সাথে কি আর তোমার মত কেরিয়ারিস্টের পোষায়! ছেড়ে গিয়ে ভালোই করেছ। আমায় লিভ তোমায় করতেই হত। দু'দিন পর করতে,সেটা এখনই করলে। ভালো থেকো'। জীবনই যেখানে নষ্ট,হারমোনিয়াম নষ্ট হলেই আর কি'ই বা ক্ষতি! মেজ ইতিমধ্যে সুমনের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। 'কী ভায়া,তুমিও এখানে?' এটা হারমোনিয়মের ভেতরের অংশ। হুঁ,ঠিক মনে পড়েছে। ওই তো বইটা। ডেবোনেয়ার ম্যাগাজিন! তখন সুমন,সবে হস্তমৈথুন শিখেছে। ক্লাস নাইন। দেবাশিস দিয়েছিলো বইটা। রাত জেগে হাফ ইয়ারলি পরীক্ষার পড়া করতে করতে,দেখছিলো,ইতিহাস বই এর নীচে রেখে। মা অনেকক্ষণ লক্ষ্য করছিলো। কাছে আসতেই সুমন বুঝে ফেলে। বিশাল নগ্ন হলিউড নায়িকার ওই স্তন যুগল দেখলে,মা নির্ঘাত বাড়ি থেকে বার করে দিতো। ও ফেলে দিলো খাটের নীচে। পরে মা ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে,খাটের নীচে ঢুকে,সেটাকে রাখলো,হারমোনিয়ামের নীচের অংশে। সেখানে তো আর কেউ চট করে হাত দেবে না। আজও সেই মহিলা দুই স্তন হাত দিয়ে চেপে হাসছে। মেজ ইতিমধ্যে সেই মহিলার বুকের ওপরেই। কি হয়েছে জিজ্ঞেস করায়,সুমন কিছু বলল না। কেবল গম্ভীর গলায় বলে উঠলো,এটা মা’র হারমোনিয়াম। চল বাইরে বেরোও। মেজ'র গায়ে লেগেছে ব্যাপারটা। সে বলে উঠলো,মা'র হারমোনিয়াম মানে? সুমন তাকে নিয়ে বাক্স থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বললো,মা এটা কেনেন নি। এক অন্ধ ভিখিরি আসতেন গান গাইতে,আমাদের পাড়ায়। আমাদের বাড়িতেও আসতেন। তার খুব টাকার দরকার ছিলো। মা'কে বলায়,মা ৫০টাকা দিয়েছিল বাবাকে লুকিয়েই। ভিখিরি মা'র ওপর সন্তুষ্ট হয়ে,এই একপাটের হারমোনিয়ামটাই দিতে চান। মা কিছুতেই নেবে না। 'আমি এটা নিলে মেশোমশাই আপনি খাবেন কী?' তাতে সেই অন্ধ ভিখিরি বললেন, আমি তোমায় ভালোবেসে দিচ্ছি। তুমি এটা কাজে লাগিও। মা কাজে লাগিয়েই ছিলেন। প্রথমে দাদা,পরে আমি,এই এক পাটেই গান শিখেছিলাম। পরে দাদা সাত পাটের স্কেল চেঞ্জার কিনেছিলো। মেজ ঠিক কি বুঝলো কে জানে। বেরিয়ে গেল,সাথে সুমনও। বেরুনোর আগে একবার গন্ধ শুঁকলো,খুব ফিকে,কিন্তু এত বছর পেরিয়েও মা'র গায়ের গন্ধটা আছে।

‘শ্রমিকের ঘাম নেই
টাকাদের দাম নেই
চিঠিটার খাম নেই
আমাদের কারো কোনো নাম নেই’

তিতলি ফোন করেছে আরও কয়েকবার। বাবা ফোন ধরেনি। কিছু হয়নি তো? এমন তো ঘটেনা সচরাচর। মা গোপাল কাকুর সাথে সাউথ সিটি মলে গেছিল। কি সব কেনা কাটা করবে। গোপাল কাকুর বাইকেই নর্মালি মা যাতায়াত করে। তবে আজ তো অন্য রকম দিন। গোপাল কাকুর সাথে সকালেই মা'র একচোট ঝগড়া হয়েছিল। গোপাল কাকু বারণ করছিলো। আজ বেরিওনা। মা তাকে শুনিয়ে দিলো,’এমন তো সুমন করত। তাই তাকে ছেড়ে আসা। তুমিও এমন শুরু করলে? ধুর শালা পুরুষ জাতটাই এমন। আমায় টেকন ফর গ্র‍্যান্টেড ভেবো না,গোপাল। যেতে হবে না। একাই যাবো’। অগত্যা হয়ত গোপাল কাকু আজ আর হয়ত বাইক নিয়ে বেরোয়নি। মার স্কুল শেষে,দাঁড়িয়েছিলো স্কুলের কাছেই। সেও অনেকক্ষণ হবে। বেশ কবার মা ফোন করেছে,তিতলি,ম্যাগি করা আছে,মাইক্রোওভেনে গরম করে খেয়ে নিও। আমি সিরাজের বেগমটাই দেখ শুধু। আর কিছু না। স্যার আসলে পড়ে নিও। রেখা দি আসলে বাসন গুলো মেজে যেতে বল। এই সব। তিতলির বিরক্ত লাগে,এই একের পর এক হুকুমজারি। সব থেকে বিরক্তিকর হল,গোপাল কাকুকে নিয়ে আদিক্ষেতা! কাঁদবে,হাসবে,ঝগড়া করবে,যেন ছোট্টো খুকি। একদিন রাগের মাথায় তিতলি জিজ্ঞেস করে বসেছিলো,মা তুমি কি এই গোপাল কাকুকে বিয়ে করবে? মা পাল্টা জিজ্ঞেস করেছিলো,কেন করলে তোমার কোনো সমস্যা? তিতলি উত্তর করেনি। কেবল বলেছিলো,ভুলেও চুমু খেওনা। দাঁতগুলো হলুদ। আর কী বিশ্রি সেটিং দাঁতের। মা চোখ বড় করে কটমট করে তাকিয়ে বলেছিল, ‘তোমায় এত অসভ্যতামো করার জন্য বড় করছিনা তিতলি। বড়দের নিয়ে এভাবে কথা বলতে নেই। মনে রেখো। এসব সুমনের আস্কারার ফল’। তিতলি আর কথা বাড়ায়নি। কেবল ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার আগে বলেছিল,খবরদার,আমার বাবাকে নিয়ে একটাও নোংরা কথা বলবে না। বেরিয়ে যাবার সময় তিতলি শুনছিলো,মা গজগজ করছে,’যা যা তোর বাপের মুরোদ জানা আছে আমার। আমি ছিলাম,তাই বেঁচে বর্তে ছিলো,এখন দেখগে যা,খেতেও পায়না হয়ত...’
ইঁদুরের বহু স্বভাবই মানুষের মতই। কারণ মানুষের সমাজেই তো তার বসবাস। মানুষের ন্যায়ই তারা বন্ধু বা গ্রুপের অন্যদের দ্বারা প্রবল প্রভাবিত হয়। এমন কী যে খাবার তার পছন্দও নয়,বাকিরা খাচ্ছে দেখে,সেটিতেও মুখ দেয়। পাছে সে দল বহির্ভূত হয়ে পড়ে!

আপাতত সুমন মা'র সেগুন কাঠের আলমারির ভেতর। সাথে অন্যরাও আছে। সুমনের ক্লিয়ার নির্দেশ কেউ কোনো ক্ষতি করবে না,আলমারির কোনো জিনিশের। কিন্তু খিদে তো পায়। খুনসুটির ইচ্ছেও প্রবল। ফুল’দা একটা রোল করা কাগজে দাঁত বসাতেই রে রে করে উঠলো সুমন,'সাধে তোদের ইঁদুরের বাচ্চা বলি। আরে মূর্খ এটা আমার ঠিকুজি। সুমনকে দেখিয়েই মা বলেছিল,এই দেখ লেখা আছে,তোর বহু নারী সংযোগের কথা। সুমন তখন বড় জোর দশ। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়েছিল। 'এর মানে কী?' মা হেসে বলেছিলো,তোমার অনেক বউ হবে বাবা। এই বাজারে এত বউ নিয়ে চালাবি কী করে? সুমনের লজ্জা লেগেছিলো। নারী সুমনের জীবনে এসেছে অনেক! সেই কলেজে ঢোকা মাত্রই কুহেলী তাকে চিঠি দিলো। তারপর সুমনদের বাড়িতে আসা,ছাদের কোণে বুড়ো ক্যাকটাস গাছকে সাক্ষী রেখে,জীবনের প্রথম চুমুটা কুহেলী রেখেছিলো সুমনের ঠোঁটে। সুমনের ফর্সা কানগুলো লাল হয়ে গেছিলো। পরে একে একে এসেছে মনীষা,চৈতালি,মৈতেয়ী,সু মিতা,সঙ্ঘমিত্রা,শেষে ঝিমলি। কিছুদিন প্রেম শেষে,একে একে হারিয়ে গেছে সকলেই। সকলেই বুঝে নিয়েছিলো,সুমন কোনো কম্মের নয়। এই যে এতজন নারীর আসা এবং যাওয়া,সুমন কিন্তু কারও সাথে শোবার ইচ্ছেটুকুও প্রকাশ করেনি। সকলেই কম বেশি সুমনের সম বয়সী। বন্ধুই। তাদের কাছে বলপ্রয়োগ করে,জোর জারি করে শুতেই হবে,এর তো কোনো মানেও ছিল না। সুমন ওদের সাথে গান গেয়েছে,আবৃত্তি করেছে,নাটক রাজনীতি সবই। টুকটাক শরীরী ছুঁইমুই ছাড়া আর কিছুই তেমন করেনি। আগ্রহ ছিল না,তা নয়। ইচ্ছে হয়নি। কেবল সুমিতাই বলেছিল,তুমি ইমপোটেন্ট। সুমিতা শিক্ষিকা,তায় পরস্ত্রী। একলা বাড়িতে সুমিতা তাকে ডেকেছিলো,শরীরী সম্ভোগের জন্যই। ঘরের জানলা যখন লাগিয়ে দিলো সুমিতা,সুমন তখনও তেমন আঁচ করেনি। পরে যখন ঘরে পরার নাইটিটা সুমনের সামনেই খুলে ফেলতে লাগলো,ছিলে ছেঁড়া ধনুকের মতই,এক দৌড়ে পালিয়ে এসেছিলো সে। পেছন থেকে সুমিতা তখন হিসহিসিয়ে চিৎকার করছে,আরে তুমি যে এমন নিনকমপুফ জানতাম না'তো। সে রাতে সুমন তার পুরুষত্ব অবশ্য দেখিয়েছিল,মেরিলিন মনরোর এর ছবির ওপর! কথাগুলো মনে পড়ায় সুমনের হাসি পেলো আজ। যেমন ঝিমলিও তো সুমনের প্রেমে হাবুডুবু খেয়েই বিয়ে করেছিলো। দু বছর পর আর সুমনকে তার ভালো লাগেনি। কারণ সুমন তার থার্ড থিয়েটারেই মেতে থাকতো। দু একটা পুরস্কার টুরস্কার ও জুটে গেছে। স্তানিস্লাভস্কি থেকে বাদল সরকার তার ঠোঁটস্থ।

তা বলে সে ঝিমলিকে সময় দিতোনা তা কিন্তু নয়। হ্যাঁ মাথায় তুলে নাচতোও না। আর ঝিমলি ছিল,আউট এন্ড আউট কেরিয়ারিস্ট। সুমন চাকরিকেই কেরিয়ার ভাবেনি। ভাবত সেও একদিন বাদল সরকার হয়ে উঠবে। জীবন তো আসলে এক স্বপ্ন যাত্রা। সুমনের দোষ কই! তাতে হয়ত আর্থিক স্বচ্ছলতা নেই,কিন্তু বেঁচে থাকা তো অনেক আনন্দঘন। মা'ও তো সে কথাই বলতেন বার বার। এসেছিস যখন দাগ কেটে যেতে হবে আর্য। জীবন একটাই। আমি সেতারিস্ট হতে পারিনি। তোর মধ্য দিয়েই যেন আমার স্বপ্নপূরণ হয়!
সুমনের এই ভাবালুতার জন্যই মেজদা আর সেজদা সুমনের নাম দিয়েছে দার্শনিক। ওই যে সুমন কেবল ভাবে। বলে কম। দাঁত কিড়মিড় করে কম। আলমারি ভ্রমণ শেষে আলমারি থেকে বেরুবার সময় সুমনের চোখ পড়ল,মার জামদানি শাড়িটায়। এটা পরলে মা'কে,সাক্ষাৎ মা দুর্গার মত লাগত। অমরদা দিয়েছিলো। মা’র অমরদা। মা'র দূর সম্পর্কের আত্মীয়। কিন্তু মা'র আদি অকৃত্রিম প্রেমিক। রোজগার পাতি করত না। এখানে ওখানে সেতার বাজিয়ে যা অল্প স্বল্প রোজগার,তা দিয়েই মা'কে এই শাড়ীটা কিনে দেয় অমরদা। মা'র সেতার শেখার প্রথম পাঠ তার কাছেই। পরে মা'র বিয়ে হয়ে গেলে,মামা বাড়ির গলির সামনে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকত অমরদা। যদি মা আসে,একবার চোখের দেখা তো হবে। দু একটা পথ চলতি কথাও। মা'কে কিছুটা পথ এগিয়ে দিতেন। ব্যস ওটুকুই। মা বাসে ওঠার আগে অমরদা মামার হাতে,১০ বা ২০ টাকা গুঁজে দিয়ে ফিরতো। পরে অমরদা মামাও একদিন না হয়ে গেলেন। মা সেদিন খায়নি,ঘুমায়নি। কেবল বলছিলো,আর্য,মানুষটা কেবল দুঃখ পুষেই অসুস্থ হল। কে আর দেখবে তাকে বল। বাবা বোধহয় আন্দাজ করত। কিন্তু সেদিন বাবাও খুব শান্ত ছিলো। অনেক রাতে ঘুম ভাঙলে আর্য দেখেছিলো মা কাঁদছে। আর বাবা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন।
এদিকে ডাক পড়েছে বড়দার। এখন গল্পের ক্লাস। গল্প শোনাবেন তিনি। অগত্যা সুমনকেও উপস্থিত হতে হল বাধ্য ছাত্রের মত। বাইরে ঝড় আর নেই। বৃষ্টি আর বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। বড়দা গল্প শুরুর আগে নীতিমালাটা আগে শুনিয়ে দেন। তাই প্রথমেই বললেন,মানুষ খুব সাংঘাতিক জীব। এত ক্ষতিকর আর কোনো প্রাণীই নয়। তাই আমাদের আরও সতর্ক থাকতে হবে। সুমন বাধা দিলো। বললো,তোমরা তো মানুষের সমাজেই থাকো। তাদেরই ঝেড়েঝুরে বেঁচে বর্তে থাকো। আর মানুষেরই নিন্দে করছ?
বড়দা খুব গম্ভীর গলায় বলে উঠলো,আগে গল্পটা শোনো। তারপর না হয় যা বলার বল। সুমন চুপ করলো।।বড়দা শুরু করলো। আজ থেকে প্রায় সাতশো বছর আগের কথা। স্লাভরা থাকতো সেই প্রদেশে। সেই প্রদেশে হাতিশালে হাতি ছিলো,ঘোড়াশালে ঘোড়া। টাঁকশালে টাকা ছিলো অঢেল। সরি,মোহর। কিন্তু রাজার মনে খুব দুঃখু। সব প্রজারাই তার কাছে এসে,অভিযোগ করত,কেবল একটিই ব্যাপারে। বলতো কী?
ছোড়দা আর ন'দা চিৎকার করে বললো কী?
বড়দা হেসে বললো,সে দেশে আমাদের স্বজাতীয়দের তখন প্রবল পরাক্রম। তারা মানুষকে অতিষ্ঠ করে,সে রাজ্য দখলের পরিকল্পনা করেছিল। বাধ্য হয়ে রাজা মশায় ঘোষণা করলেন,যে এই ইঁদুরদের অত্যাচার থেকে রাজ্যকে মুক্ত করবে,তাকে রাজা পুরস্কৃত করবে। তো সে কথা শুনে কত রথি মহারথী এলো গেল,কেউ কিচ্ছুটি করতে পারলো না। শেষে পথে পথে বাঁশি বাজিয়ে বেড়াতো এক বাঁশিওয়ালা। সে বলল,আমি পারবো।
ফুলদা চোখ বড় বড় করে জিজ্ঞেস করলো,পারলো?
বড়দা বলে চললেন,সে বাঁশিওয়ালা জাদু জানতো। যেই সে বাঁশি বাজিয়ে চলতে শুরু করলো,অমনি সব গর্ত থেকে আমাদের জাত ভাইরা বেরিয়ে এলো। তার পেছন পেছন চলতে লাগলো। ভাবো কি বজ্জাত এই বাঁশিওয়ালা। প্রদেশের সীমান্তে যে রাইন নদী বইছে,সেই নদী পেরিয়ে সে হেঁটে গেল ওপারে। আর বেচারা ইঁদুরের দলের সলিল সমাধি হল।
ফুল'দা কেমন থতমত খেয়ে জিজ্ঞেস করলো তারপর? গল্প শেষ? আর ইঁদুররা কিছু করতে পারলো না?
বড়দা হেসে বললো,তাই আবার হয় না'কি! ইঁদুর বলে কী প্রাণ নয়! এত ইঁদুরের শহীদের বিনিময়ে কিছুই হবে না? আশপাশের দেশের ইঁদুররা গেল সেখানকার গানুবাবার কাছে।
- গানু বাবা কে? ছোড়দা জিজ্ঞেস করলো।
- আরে,আমাদের ইষ্টদেবতা,গণেশ বাবাজি।
-তারপর?
তারপর সেই বাঁশিওয়ালা ফিরে এলো একদিন আবার নদী পেরিয়ে,পুরস্কার তো তার নেওয়া হয়নি। রাজার কাছে গেল। বলল,আমার পুরস্কার দিন। রাজা ভুলেই গেছে এমন ভাব করলো। কী,কিসের পুরস্কার?
বাঁশিওয়ালা কিছু বলল না। পথে বেরিয়ে এসে,ঝোলা থেকে আর একটা বাঁশি বার করে,বাজাতে লাগলো। এবার আর ইঁদুর না,সব ঘর থেকে মানুষের বাচ্চারা বেরিয়ে পিছু নিলো,সেই বাঁশিওয়ালার।
- আর ওদের বাবা মা'রা আটকালো না? মেজদা জিজ্ঞেস করলো।
- আরে ছো! বাঁশিওয়ালার সুরে তো তারা ঘোরো ঘোরো স্ট্যাচু! আর বাঁশিওয়ালা আবার রাইন নদী পেরিয়ে গেল। এবার মরলো মানুষের বাচ্চাগুলো।
এবার বল কী বুঝলে এই গল্প থেকে?
- ইঁদুরদের সাথে লাগতে নেই। ন'দা বললো।
-কাউকে ঠকালে এই দশাই হয়! ছোটদা বললো।
বড়দা বললো ওই প্রদেশের নাম জানো?
এ ওর দিকে চাওয়া চায়ি করছিলো।
সুমন বললো,হ্যামলিন। এই গল্পের নাম হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালা। গ্রীম ভাইদের লেখা। উপকথা। সত্যি নয়!
বড়দা,খুব রেগে গিয়ে বললো,সুমন তুমি দেখি সবজান্তা। তুমি কি জানো,হ্যামলিনের মিউজিয়ামে এখনও সেই সব ছবি আঁকা আছে। সুমন উত্তর করলো,ছবি আঁকা আছে,আমিও জানি। সে'তো রামায়ণের গল্পেরও আছে। তার মানেই রাম সত্যি? রামায়ণ? সেটা সত্যি কে বললো তোমায় বড়দা?
বড়দা রেগে গেলো খুব। বললো এই বড় বেয়ারা। টাইট দাও তো। বাকি পাঁচ জন ঝাঁপিয়ে পড়ল সুমনের ওপর। সুমন তড়াক করে লাফ দিয়ে পড়লো খাটে। আর মোবাইলটা ঠিক তখনই বেজে উঠলো। সুমন দেখতে পাচ্ছে এবার,মোবাইলে তিতলির ছবি ভাসছে। গুটি গুটি পায়ে হেঁটে এসে,ফোনের ওপর উঠলো। বাকিরা তো অমন আলো জ্বলা যন্ত্র দেখে আর কাছে ঘেঁষেনি। ফোন জ্বললো,নিভেও গেল। এবারে সুমনের চোখে জল। মেয়েটার জন্য বড় মন কেমন করছে যে।

‘ছোট পাখি ছোট পাখি
সর্বনাশ হয়ে গ্যাছে’

একে চারদিকে ভোটের প্রচার শুরু হয়েছে। দিদি আর দাদার ছবিতে ছয়লাপ সারা শহর। কোথাও বড় ফুল,কোথাও ছোটো। সাথে বড় বড় কাট আউট। তেনারা হাত তুলে অভয়বাণী দিয়ে হাসছেন। ওদিকে ছিন্নমূল কাস্তে হাতুড়িও আছে। আজ কেবল ফণীর তাণ্ডবে,রাস্তাঘাট ফাঁকা। তাই বাঁচা গেছে। নইলে এতক্ষণে চিৎকারে মাথা ধরে যেত। সে যাই হোক,কোনোক্রমে একটা উবের ধরে,ওরা ফ্ল্যটে এসে পৌঁছলো। গোপাল আর নামেনি। বাড়ি চলে গেল ঝিমলিকে নামিয়ে। ঝিমলি দোতলার ফ্ল্যাটে এসে বেল বাজাতেই তিতলি মুহুর্তে খুললো দরজা। সে কাঁদছে। কী হয়েছে তিতলি মা আমার? বল আমায়। শপিং এর বিশাল ব্যাগটা নামিয়ে চেঞ্জ করতে যাচ্ছিলো ঝিমলি। তিতলি বললো মা,প্লিজ চেঞ্জ করোনা। বাবাকে ফোন করেই যাচ্ছি,১৮ বার ট্রাই করেছি। বাবা ফোন ধরেনি। কিছু হয়নি তো বাবার? একবার চল,দেখে আসি।
এসব আদিখ্যেতা দেখলেই ঝিমলির মাথা গরম হয়। এখনও মেয়েটা বাপ সোহাগিই রয়ে গেল। অথচ গোপাল ওকে কত ভালোবাসে। তাকে পাত্তাই দেয় না। অদ্ভুত! সে কথা তো আর এখন বলা যায় না। বললো,অত বড় ধাড়ি লোকের আর কি'ই বা হবে তিতলি? চেঞ্জ করতে পাশের ঘরে গেল ঝিমলি।
তিতলি ফোন করেই চললো বাপ কে। এদিকে বৃষ্টি কমার কোনো লক্ষণই নেই। যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে মাথায়। তিতলির ভেতরে এবার ভয় ঢুকেছে। পুরনো বাড়ি। ভেঙে পড়েনিতো ছাদ,বাবার মাথায়। বেচারা মানুষটা,হয়ত তিতলিকেই খুঁজছে। খানিক চুপ করে বসে,তিতলি নিজেই জামা কাপড় পড়লো। আলমারি খুলে দুশো টাকা পেল,নিজেরই জমানো। ফোনটা নিয়ে দরজা খুলে বেরুতে যাবার আগে কি মনে হওয়ায়,মা'কে বলতে গেল। মা,আমি বাড়ি যাচ্ছি,বাবার খোঁজে। মা ততক্ষণে ফেসবুক মেসেঞ্জারে গোপালের সাথে ভিডিও কলে...
- তিতলি,বেশি বেড়োনা। বারো বছর বয়সে এত সাহস কি করে পাও? রাত দশটার সময়ে ওই ধ্যারধ্যারে গোবিন্দপুর একা যাবার? এ'কি তোমার স্কুল যাওয়া? আর আজ রাস্তায় কোনো বাস টাস নেই। কিভাবে যাবে?
- তাহলে উবের করে দাও।
- উবের না হয় করেই দিলাম,ফিরবে কি করে?
- ফিরবো না।
- মানে কি,এই এত রাতে। এই তুমুল বৃষ্টি। ওই বাড়িতে থাকবে মানে? যদি মাথায় ছাদ ভেঙে পড়ে,কি করবে?
- বাবার মাথাতেও তো ভেঙে পড়তে পারে। পারে না? কই তার কথা তো বলছো না।
- তোর বাপের হয়ে আর মুখ নাড়িস না তিতলি। সে ক'বার খোঁজ নেয় আমাদের?
- আমার খোঁজ নেয়। আর তোমার খোঁজ নিলে তুমি বিরক্তই হও। আর মা তুমি তো সারাক্ষণ গোপাল কাকুকে নিয়েই ব্যস্ত। খোঁজ করলে,তোমার কী ভালো লাগবে?
- শাট আপ তিতলি। বেশি বাপ সোহাগ দেখিও না। তোমার বাপ তোমায় স্কুলের ফিজ,আর পুজোয় জামা দেওয়া ছাড়া আর কি করে,তোমার জন্য?
- আর কী করবে? ওবাড়িতে থাকতে তো করতোই। আর আমায় তো বাবা ছাড়তেও চায়নি। তুমি এনেছিলে কেন জোর করে?
- তিতলি তুমি যাবে না। আমি বারণ করছি। আর দেখ তোমার বাপ লোক সুবিধের না। আবগারি ওয়েদার পেয়ে মাল খেয়ে পোঁদ উল্টে শুয়ে আছে দেখ গিয়ে।
- শাট আপ মা। তোমার লজ্জা করে না,এসব বলতে। বাবা মদ খায় তোমার অত্যাচারের সাথে পেরে না উঠে।
- কী বললি? মা'কে শাট আপ বলছিস,তোর এত বড় সাহস!
ঝিমলি এবার তিতলির দু গালে দুটো ঠাস ঠাস করে চড় কষালো।
তিতলি বসে পড়ে কাঁদছে। জুতো যেখানে রাখা সেখানেই। অঝোর ধারায় কাঁদছে।
ঝিমলি একবার ভাবলো গোপালকে ফোন করবে। কী মনে হল,করলো না। ভেজা যে চুড়িদার পরে বাড়ি ফিরেছিলো,সেটাই গায়ে গলিয়ে নিলো। পায়ে পড়লো ঘরে পরার রাবারের স্লিপার। জল লাগলে চামড়ার জুতো নষ্ট হবে। ব্যাগে হাজার দু'য়েক টাকা নিলো। কি জানি কি অবস্থা। বিড়বিড় করে,সুমনকে গালি দিতে দিতেই মেয়েকে নিয়ে রওয়ানা হল,পুরনো ছেড়ে আসা বাড়ির দিকে। বৃষ্টি তখনও খেল দেখাচ্ছে। হাঁটু অবধি জল। ফাঁক তালে উবের ও রেট বাড়িয়েছে,পথে নেমে অনেক কষ্টে একটা হলুদ ট্যাক্সি নিলো। পাঞ্জাবি ড্রাইভার। একশো টাকা বেশি দিতে হবে। গাড়ি চললো ধীর লয়ে টইটুম্বুর নদী বেয়ে,রাস্তার গাছ উপড়ে পড়েছে,সাইনবোর্ড ভাঙা,দিদির বিশাল কাট আউট কিছুটা ভেঙে ঝুলছে,মুখের জায়গাটা গেছে ছিঁড়ে। তাহলে কি টিভির ওপিনিয়ন পোল'ই ঠিক? নিয়তি তেমন ইঙ্গিতই করছে?
ঝিমলি ফোন লাগালো গোপালকে। সব জানানো দরকার। তিতলি বাবাকে ফোনে ফোন আর টেক্সট করেই চলেছে। নো রিপ্লাই। গাড়ি বাইপাসে উঠে একটু গতি পেল…

ইঁদুর খুব কৌতুহলী প্রাণী,মানুষের মতই। যেখানেই দেখিবে ছাই,উড়াইয়া দেখ তাই...উঁকিঝুঁকিতে তাদের জুড়ি মেলা ভার,আবার একই সাথে ভীষণ লাজুকও! পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতায় তারা লেটার মার্কস ডিজার্ভ করে। আর নিজেদের গ্রুম করে ঘন্টার পর ঘন্টা। তবে ভীতু ও খুব। সামনে বিপদ দেখলে,সম্মুখীন না হয়ে পলায়নই তাদের একমাত্র বেছে নেওয়া পথ।
বড়দা অনেকটা আমাদের রাজনৈতিক নেতা নেত্রীর মত। যখন বলা শুরু করে বলতেই থাকে। থামেনা। এখন বিষয় ইঁদুর অস্মিতা । এই পৃথিবীর বাইরে,মহাকাশে যে প্রাণী প্রথম পা রাখে,তারা ৪২টি ইঁদুর। বুঝলে হে আমরা হলাম গিয়ে ওয়েদার সিজনড। যেখানেই পাঠাও ঠিক বেঁচে ফিরবো। তোমরা হয়ত জানোনা আমরা এক গৌরবময় জাতি। নিউ ইয়র্ক সিটির একসময় নাম দেওয়া হয়েছিল নিউ র‍্যাট সিটি। আলাস্কার উপকূলবর্তী অঞ্চলে,একটা আইল্যান্ডের নাম র‍্যাট আইল্যান্ড। পৃথিবী বিখ্যাত সব মানুষ লেখকরা ইঁদুর নিয়েই একের পর এক গল্প উপন্যাস লিখে গেছে। যেমন আলবেয়ার কামুর দ প্লেগ। দুনিয়ার বহু উপজাতি ইঁদুরকে আজও পুজো করে...

উফফ! সুমনের আবার এত ডায়ালগ ভালো লাগে না। সে একটু আসছি বলে কেটে পড়ে। দাদুর লেখা বই,ইন্ডিয়ান ফিলোজফির ব্রিটল হওয়া পাতায় বেশ খানিকটা গড়াগড়ি খায়,যদি গন্ধ পাওয়া যায়। খুব ফেডেড। দাদু মারাই তো যায় সেই ১৯৪৬ এ। সেটা গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংসের সময়। আমহার্স্ট স্ট্রিট এর বাড়ি ছেড়ে,কাশীপুরের গঙ্গার ধারে চলে আসে দাদু,সপরিবার। সাথে দুই পুত্র। জেঠু বড়,তখন প্রায় আঠারো। বাবা তখন নিতান্ত ছোট। বছর আট। কন্যা ষোড়শী ও সরযুর বিয়ে আগেই দিয়েছেন। অত দাঙ্গা, রক্তক্ষয়, ঘেন্নার রাজনীতি, ভীতু মধ্যবিত্ত দাদুর সহ্য হয়নি। বাড়ি বদলের ক'দিন পরই তিনি চলে যান। যাবার আগের শেষ ক’দিন কেবল বলতেন,এত ঘেন্না, বিদ্বেষ প্রতিবেশীর মধ্যে দেখতে হবে ভাবিনি। ঠাকুরমা চলে যান আর বছর দুই পরই। কাশীপুরের এই বাড়িতে তখন একজন ২০ বছরের বাস,আর একজন ১০। বড় দিদিরা তাদের একটু আধটু সাহায্য করত। নইলে তাদেরও তো ভেসে যাবার কথাই। জেঠু পড়াশুনা ছেড়ে কাজে যোগ দিলো,বাবা পড়াশুনায়। সেই থেকে এই বাড়িরও নিঃসঙ্গতাই একমাত্র সঙ্গী। মাঝে জেঠিমা এসেছিলেন। বছর পাঁচের অতিথি। দুই সন্তানের জন্ম দিয়ে চলে যান। জেঠুরা অবশ্য এ বাড়ি ছেড়ে কোননগরে চলে যায় বহু আগেই। আর সুমনরা দুজন। বাবা আর মায়েও তেমন কথাবার্তা হতে সুমন দেখেনি। বাবা চুপচাপ বই পড়তেন,চাকরি থেকে ফেরার পর। মা সেতার। দাদা গান। সুমন তবলা। মাঝের ওই তেরো চোদ্দো বছর কিছুটা সুখ,কিছু গান,কবিতা,হাবিজাবি বাদ দিয়ে এই বাড়ি,আগাগোড়াই বাতিল ফার্নিচারের মত। মায়াটুকু লেগে থাকে। কিন্তু তেমন ব্যবহার নেই। বছর কুড়ি আগে সুমনের দাদাসুদীপও চলে গেছে। একদিন গঙ্গায় স্নান করতে গিয়ে অলিয়ে যায়। আর তিন বছর আগে চলে গেল ঝিমলি। তিতলিকে নিয়ে গেল সাথে করে নিজের বানানো ফ্ল্যাটে। সুমন আবার একা। বাড়িটার মতই। এখন খাটের নীচে ছমাস থেকে এক বছরের তিতলির জামা কাপড় ডাঁই করে রাখা একটা বালতি ব্যাগে। একটা বমি লাগা জামাও। সুমন সেই জামাটার ওপর খানিক শুয়ে থাকে। বমির গন্ধটা এখন আর অত তীব্র নয়। ফিকে হয়ে এসেছে। সুমনের কেন জানিনা অমৃত লাগে,নেশার মত। আরও আরও নেশা চাই...কে দেবে নেশা,ব্যাগের ওপরেই রাখা নিঃসঙ্গতার একশো বছর। হঠাৎই মনে আসে সুমনের,নিঃসঙ্গতাও বোধহয় এক নেশাই। নইলে এই একলা জীবন,অতীত আঁকড়ে পড়ে থাকা,এর তো আদতেই কোনো মানেই নেই,অন্তত শহুরে মানুষের কাছে। সুমন অবশ্য অতটা শহুরে না। আড্ডাবাজ ও না। আগে অনেক বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিত। তারপর একে একে যেভাবে জীবন একলার হয়। একদিকে ভালোই হয়েছে। খুব কষ্ট। চোখে জল টল টল। তবু তো ঝগড়া ঝাঁটি নেই,কথা কাটাকাটি, চিৎকার! খেলে খাও,ঘুমালে ঘুমাও,অফিস গেলে যাও। না গেলে যেওনা। নিজের প্রতি তো আর দায় দায়িত্ব নেই। কেটে পড়লেই হয়। তিতলি কী দুঃখ পাবে? কে জানে!
আপাতত খাবার খাওয়ার কথায় হঠাৎ সুমনের মনে হল,খিদে লাগছে। সকাল থেকে কিছুই খায়নি। কিন্তু খাবে কি করে সব তো হতচ্ছারাদের জন্য বাক্সবন্দী! সে’তো আর খোলবার সামর্থ্য ইঁদুর সুমনের নেই। ওহ ওই তো বিস্কিট রাখা খাটের নীচে। অনেকগুলো বিস্কিট! একটু তেঁতো। তা হোক ভুখা মানুষতো আলু পুড়িয়েও খায়! ভ্যানগখের পোটেটো ইটারের কথা মনে পড়ে গেল। সুমন কামড় দিলো বিস্কিটে। একে একে সব কটা খেল...বাজ পড়াটা কমেছে। বৃষ্টি আগের থেকে একটু ধরে এসেছে। ক্ষুব্ধ পৃথিবী এবার শান্ত হয়ে আসছে ক্রমশ...এবার নতুন দিনের সূর্য উঠবে নিশ্চিত। সুমনের যেন নেশার ঘোর লেগেছে,গুণ গুণ করে গান ধরেছে,আলু বেচো,ছোলা বেচ,বেচ বাখরখানি/ বেচোনা বেচোনা বন্ধু তোমার চোখের মণি/ঘরদোর বেচ ইচ্ছে হলে,করবো না’কো মানা/বন্ধু তোমার লাল টুকটুকে স্বপ্ন বেচোনা….
বাড়ির নীচে বেল বাজছে,তোমার হল শুরু,আমার হল সারা...আবার বেল,সুমনের এবার একটু তন্দ্রা লাগছে। যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে। আবার বেল...

‘পৃথিবীর প’রে আর
তোমার আমার
ভালোবাসার কেউ নেই কিছু নেই’

তিতলি বেল বাজিয়েই চলেছে। চোখে জল। চিৎকার করছে,বাবা দরজা খোলো ও ও ও...
ঝিমলি ফিসফিসিয়ে বলছেন,আরে তিতলি,রাত হয়েছে অনেক। এত চিৎকার করছ কেন। খুলবে। আশপাশের বাড়ি থেকে উৎসুক মুখ উঁকি মারতো,অন্য দিন হলে। আজ বিপর্যয়ের দিন। জানলা দরজা বন্ধ। কেউ তেমন শুনতেই পায়নি হয়ত! কড়া নাড়ছে,বাবা আ আ আ...
ঝিমলির কি খেয়াল হতে,দরজাটা একবার ধরে টানলো। খুলে গেল ছিটকিনি। সোজা করে রাখা। এ বাড়িতেও তো প্রায় দশ বছর কাটিয়ে গেছে ঝিমলি। এখনও ভোলেনি,কায়দা বা কসরৎগুলো। তিতলি দৌড়ে ওপরে উঠলো,দরজা জানলা হাট করে খোলা,এক দৌড়ে বাবার ঘরে। কই বাবা? পাশের ঘরে গেল,বাবা নেই তো! কোথায়? দুম করে পাশের ঘরের খাটে বসে পড়ল! দু গাল বেয়ে কান্না নামছে,অঝোর ধারায়...সব ঝাপসা...এ ঘরেই তিতলি আর ঝিমলি থাকতো। বাবা পাশের ঘরে। খাটের ওপর বালিশে হেলান দিয়ে রাখা তিতলির বার্বিগুলো। ছোটো,বড়,মাঝারি...তিতলির স্কুল ব্যাগ,টেম্পেস্ট,পঞ্চত ্ত্র,বিক্রম বেতাল বইগুলো। তিতলি এখন কি করবে? টিভিটা মিউট কিন্তু চলছে,চোখে পড়ল তিতলির। নিউজ চলছে। ফণীর প্রভাবে উড়িষ্যার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষয় ক্ষতি,ব্রেকিং নিউজ, বার বার দেখাচ্ছে...কিন্তু বাবা কই?
ঝিমলি ঢোকেনি সে ঘরে। ফেলে যাওয়া জিনিশে ফিরে তাকাতে নেই। গুরুদেব তাই শিখিয়েছিলেন। ঝিমলি সুমনের ঘরেই ঢুকলো একেবারে। খাটের ওপর রাখা মোবাইলটা। সুমনের এই এক বদভ্যাস। প্যাটার্ন পাসওয়ার্ড কিছুই দেয় না। ঝিমলি অনেক সড়গড়। অবশ্য না হলে মুশকিল! একবার তো ধরা পড়েই গেছিল প্রায়,স্তনের ছবি পাঠিয়েছিল গোপালকে। সেটা তিতলি দেখে ফেলেছিল মোবাইল ঘাঁটতে গিয়ে! আর! তিতলির যা স্বভাব,বাপকে সব দেখাতে হবে,বলতে হবে। সুমন দেখলেই বুঝতো,যে সে ছবি ঝিমলিরই। শেষ মুহুর্তে ফোন এসে যাওয়ায় ঝিমলি দৌড়ে এসে ধরলো। আর কেড়ে নিলো ফোন।
- কেন হাত দিয়েছ ফোনে?
- মা নোংরা ছবি,তোমার ফোনে!
- ইন্টারনেট থাকলেই এসব এসে পড়ে। তুমি তো জানোই।
সুমন অবশ্য প্রাইভেসিতে হস্তক্ষেপ করার লোক নয়। সেটাই বাঁচোয়া।
ফোন খুলতেই চোখে পড়ল 28 missed calls। ২৬ টা একা তিতলিরই। দুটোতে লেখা অফিস। লগ সরাতেই নোটসে চোখ গেল, ওপরে বড় করে হেডিংঃ ইঁদুর সম্মন্ধে যে দু চার কথা আমি জানি।
- মানে কী! পড়তে শুরু করলো ঝিমলি।
* ইঁদুরদের পূর্বপুরুষ রডেন্টরা বহু বহু বছর আগেও ছিল। তবে এই যে এখনকার ইঁদুর যারা,মূলত দু ভাগেই বিভক্ত। ব্ল্যাক আর ব্রাউন ইঁদুর। খ্রিষ্ট পূর্বাব্দ ২০০ বা তার আগেও এদের স্কেলিটান পাওয়া গেছে। পম্পেই এর বিধ্বস্ত নগরেও এদের পাওয়া গেছে।
* এরা মূলত তিন অঞ্চলের। নর্থ আমেরিকান, অস্ট্রেলিয়ান এবং এশিয়ান।
*মানুষের সাথে মানুষের সমাজে এদের ঠিক বসবাস কবে থেকে জানা যায় না।
*মানুষের সাথে শারীরবৃত্তীয় মিল থাকায়,মানুষ তার নিজের ওপর প্রয়োগের আগে,তার নতুন নতুন পরীক্ষা চালিয়ে গেছে এদের ওপরেই।
*আবার এরাও মানুষের সমাজে থেকে,মানুষের ক্ষতি করে গেছে।
* এক সমাজে অবস্থান। কিন্তু সম্পর্কটা অবিশ্বাসের।


ইঁদুর নিয়ে এত্ত সব লেখার কারণ কী? বুঝছে না ঠিক ঝিমলি। আবার পড়ছে ঝিমলি,
* প্রয়োজনে নিজের ক্লাসের মধ্যেই লড়তে হয়। এমনকি নিজ পার্টির মধ্যেও। শোষক যেন তেন প্রকারেণ তার এজেন্ট ঢুকিয়ে দেয় পার্টির ভেতরে। যাদের কাজ হল,লড়াই কে ডি-ফোকাশ করা,নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থা তৈরি। দলের সামগ্রিক ইমেজের ক্ষতি করা। এবং শেষ পর্যন্ত পার্টিকে কমজোরি করে বিপ্লবের অভিমুখ থেকে সরিয়ে দেওয়া। আমাদের কাজ এদের লক্ষণ চিনে সর্বাগ্রে চিহ্নিত করা। এবং প্রয়োজনে নিকেশ করে দেওয়া। সমষ্টির স্বার্থে স্খলিত ব্যক্তি,বা ব্যক্তিবর্গকে এই সরিয়ে দেওয়াও বিপ্লব।
কি ঠিক বলতে চাইছে সুমন? কিছু বুঝছে,কিছু বুঝছেনা।
সামনের সমস্ত ড্রেন,নতুন বহিরাগতরা ওই নর্দমাগুলোরই বাসিন্দা। তারা শিক্ষিত নয়। আর তারাই এই বিপত্তির কারণ! যেমন ছিল ঝিমলি। মনে পড়ছে পাঠকদার কথাগুলো। ‘ আমাদের কাজ এদের লক্ষণ চিনে সর্বাগ্রে চিহ্নিত করা। এবং প্রয়োজনে নিকেশ করে দেওয়া। সমষ্টির স্বার্থে স্খলিত ব্যক্তি,বা ব্যক্তিবর্গকে এই সরিয়ে দেওয়াও বিপ্লব।’ আজ নিকেশ করার আগে চিহ্নিত করণ…

বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক...
এর মধ্যে ‘ঝিমলি’ও রয়েছে! পড়ে ঝিমলির মাথা বোঁ বোঁ করে ঘুরছে...
চোখ পড়ল পায়ের দিকে,অনেকগুলো ইঁদুর একসাথে তাকিয়ে ঝিমলির দিকে,কী ভয়ঙ্কর দৃষ্টি! ওরা কি ঝিমলিকে কামড়ে ছিঁড়ে খেয়ে নেবে? দ্রুত এগিয়ে আসছে দলবদ্ধ ভাবেই...
উঠে দাঁড়াতে গেল, পা অবশ! ঝিমলি পড়ে গেছে চেয়ারটা থেকে,এবার গায়ে উঠবে? ঝিমলি শেষে ওদের খাদ্য ? জোরে চিৎকার করতে গেল। গলা দিয়ে স্বর বেরুচ্ছে না,ভয়ে থর থর করে কাঁপছে। কখন তিতলি এসে উপস্থিত হয়েছে,মা কী হয়েছে তোমার? মা? কথা বলছ না কেন মা? নীচু হয়ে বসতে গেল তিতলি। মায়ের চোখ অনুসরণ করে চোখ গেল
খাটের তলায় ,এগিয়ে গেল স্থির পায়ে। সুমন পড়ে রয়েছে খাটের নীচে,সেলাই মেশিন আর হারমোনিয়ামের মাঝে। চোখ স্থির। মুখ দিয়ে গেঁজলা বেরিয়ে শুকিয়ে গেছে। বাবার হাতটা নিজের হাতে,তুলতেই,পড়ে গেল হাতটা। ডুকরে কেঁদে উঠলো তিতলি। চিৎকার করে উঠলো,বা..বা...

একটু পাশেই দাঁড়িয়ে ইঁদুরের দল, বড়দা, মেজদা, ন'দা, ফুলদারা।
সুমনের এই ঘরটিই কি আজকের ভারত? একপাশে আঙুল ফুলে কলাগাছ সুবিধেবাদী শ্রেণী আর একপাশে আপমর অসহায় রাগে গজরাতে থাকা সুবিধে বঞ্চিত আদিম অধিবাসীবৃন্দ! একপাশে ঝিমলি একপাশে তিতলি। মাঝে সুমনের দেহ। আর ওপাশে যুদ্ধংদেহী ইঁদুররা। প্যাথোজেন সময় কেবল খানিকটা দুর্গন্ধ নিয়ে,জানলার বাইরে মিশছে। দুর্যোগ আসলে যেমন হয় আর কী!
ছোট পাখি ছোট পাখি
সর্বনাশ হয়ে গ্যাছে
পৃথিবীর প’রে আর
তোমার আমার
ভালোবাসার কেউ নেই কিছু নেই


তবু বিপ্লব দীর্ঘজীবী...

ঋণঃ *কবিতা অংশগুলি বাংলাদেশের সহজিয়া ব্যাণ্ডের একটি গান।
*ইঁদুর সম্মন্ধীয় তথ্য ডিসকভার ম্যাগাজিন,ব্রিটানিকা ও লাইভসায়েন্স.কম থেকে সংগৃহীত।