মামড়ি মেঘ

শিবু মণ্ডল


রাতের বাসি ছাই তার ধিকিধিকি আগুন নিয়ে বসে আছে
তাকে উসকানি দিয়ে নেশার মতো বয়ে যায় তামস নদী
কানের ভেতর ঢুকে পড়ে অনন্ত ঝিঁঝিঁর শব্দ
ট্যানিনের ধোঁয়ার সাথে উড়ে যেতে থাকে মগজের কোষ-
ব্যালকনি থেকে নেমে গাছ-লতা-পাতা হয়ে নদীটি পেরিয়ে গেল, দেখি
ওপারের পাহাড়ের বরাতে ঝুলে আছে গোনাগুনতি ঘর
সেখানে ক্ষীণদৃশ্যমান কিছু মানুষের অলস নড়াচড়া
হয়তো উদাসীন রোদের অপেক্ষায়

গতসন্ধ্যের ক্যাম্প-ফায়ার ঘিরে থাকা সমস্ত মিথ্‌ ফিরে গেছে কুজ্ঝটিকায়
রোদ কিন্তু একটু একটু করে এগিয়ে চলেছে কঠোর শীতের দিকে
চলনে তার প্রাগৈতিহাসিক মন্থরতা বলনে তার ঝুলন্ত সেতুর দুলুনি
যেন এই পড়ে যায় যায়...

পাহাড়টি কিন্তু, বিপরীত পাহাড়ের দীর্ঘ-ছায়ার করালগ্রাস থেকে
ক্রমশ মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে...


কোষা-কুষি হতে নিখাদ অন্ধকার ঢেলে দিচ্ছ তুমি, আকাশ!
একে আশীর্বাদ বলে মেনে নিতে পারিনা কেন?
কেন জ্বেলে দিতে হয় নদীকে বন্দী করে বের করে আনা আলো!
পাহাড়ের ফন্দিতে আটক ঝিঁঝিঁ-শব্দে কেন আসে চোখে জল?
কেন চাঁদ আলো ফেলে পুরনো ঘায়ে একাকী দাঁড়িয়ে থাকা এ পোড়া পিঠে?

প্রশ্ন জাগে
প্রশ্ন জাগে
তারপর
প্রশ্নের পুঁজ শুঁকিয়ে গেলে মেঘের মামড়ি জমে
ফাঁকি দিতে পারি না আলোকে হৃদয়ের কূপ কাঁপে নীলকণ্ঠ হয়ে


একলা ভ্রমণ শিখিয়েছে আমায় কীভাবে ক্ষোভ প্রশমনে
চন্দ্রাহতের অভিনয়ে যেতে হয়
শোনো, তুমি নেই মানে নেই এমন তো নয়? তুমি ছিলে পাহাড় ভ্রমণে
তুমি আছো কল্পনাপ্রসূত চাষাবাদে!
যেখানে আমি একা একা বিষণ্ণতার সাথে নিজস্বী তুলি তুমি আছো পাশে নিগূঢ় রহস্য হয়ে
যেখানে আমি একা একা অন্ধ এক পাহাড় দেখি
মনে কোরো তুমি আছো চাঁদের আলোক হয়ে


আমার পায়ের আঙুল জড়িয়ে ধরে হেমন্ত বিষাদ

হেম বর্ণের তোরণ নির্মাণ করেছেন মহারাজ
সীতারাম তার বাইরে বাজায় বসে ঢাক একহাতে
অন্যহাতে, অদৃষ্ট বাজাতে বাজাতে ঈশ্বর একসময় তালে ভুল করেছিলেন
সেই প্লুতচিহ্ন এখনও বয়ে চলেছে সীতারাম
হুম হুম হুম শব্দ আমাকে আহ্বান করে
যেন বলে দেখ তাকিয়ে কেমন
শীত ফণা মেলে মন্দিরের গর্ভগৃহে!


জাগ্রত পাথর খেলা রূপে আছে পড়ে
কালো মেঘের টুকরো ভেবে আমি তুলে নিতে গেছি তাকে কাঁধে
ভীষণ জটিল এক খেলা
গুঁড়ো গুঁড়ো অক্ষমতা সহ বৃষ্টির ফোঁটা গড়িয়ে পড়ে শিরদাঁড়া বেয়ে

সীতারাম ও অনেকেই মেনে নিয়েছে আত্মসম্মান রাখতে নেই
সরলতা বাজিয়ে যাওয়াই প্রকৃত ঈশ্বর দর্শন!
এমন দার্শনিক দৃষ্টি নিয়ে তো আমি জন্মাতে পারিনি
আমি পারিনি বিশ্বাস করতে যে পাহাড়ের জটিল ভাঁজে ভাঁজে
শুধু জীবিত গ্রহের জল ও সরলতাই আবাদ হয়ে ওঠে


সরলবর্গীয় বৃক্ষের বোঁটা অভিকর্ষের খুব নিকটের কেউ নয়
তবুও অমোঘ টানে গ্রহের বুকে ঝরে পড়ে শুকনো ফল
সেই ফল কুড়াতে সকালের স্কুলবালক থেকে ছুটি নিয়েছে সুজন
ক্ষুধা তাকে শিখিয়েছে কখন, কীভাবে নিজের থেকে নিজেকে ছুটি দিতে হয়
ফলস্বরূপ তার চটের বস্তাগুলো ভরে ওঠে ফলের কঙ্কালে
বয়সের ভারে চাঁদ থেকে পিছলে পড়ে যাওয়া এক খুনখুনে বুড়ি
বস্তার মুখগুলো সেলাই করে দিচ্ছে তার পড়ে থাকা
নিপাট ভাঁজ খুলে এলোমেলো হয়ে যাওয়া চরকার সুতো দিয়ে
সুতোর অনতিদূরে এক চাঁদের বুড়ো তার গর্ভবতী গাভীনের শরীর থেকে
পরম মমতায় বেছে বেছে ফেলে দিচ্ছে ধূসর রঙের হৃষ্টপুষ্ঠ আঁটালিগুলি

এদের সবার অন্ত্রে রেসিন দিয়ে আজন্ম একটা আগুন ফিট করা আছে


নদীখাত খুব বেশি হলে হাজার ফিট। কোণ করে নেমে যাওয়া পাইনের বন ঢেলে দেয় নেশা। তার চিরল চিরল পাতায় ঝরে পড়ে মদ। নীচে তাকাতেই তদগত মনে ইচ্ছে জাগে- আত্মহত্যা করতে যাওয়া হাজারো কাঠ গোলাপের সাথে আমিও সহমরণে যাই। আমার নেশা ধরে যায়!
আমার পথ ফোঁটা ফোঁটা শুষে নেয় সেইসব নেশা


নত হয়ে যায় দ্রুতগতি বনের কারসাজিতে
কোথাও চির দৃঢ়চিত্তে দাঁড়িয়ে, তারপর দেবদারু
অথবা রডোডেনড্রন
যেখানে বন নেই সেখানে সিঁড়ি পেতে পেতে নীতির আবাদ
সেখানে দয়ানন্দ শর্মার সাজানো বাগান
সেখানে একটি গোপন আপেল দেখেছি আমি
কার্ত্তিক পূর্ণিমায় খেলে তার ফুল
এত পাহাড় তার হেফাজতে?
এমন প্রশ্নে হিমালয় নিশ্চুপ!

চূড়া ও চটিজোড়া আলাদা
প্রকৃতই আলাদা
আমি অবুঝ। শুধুশুধু সিঁড়ি বেয়ে উঠতে চাই


দূর থেকে দেখতে দেখতে দৃশ্য ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে
দেখছি সুজন নামের বালকটি একটি মশাল নিয়ে দৌড়চ্ছে
শুনছি সীতারাম তার ডানহাত দিয়েই ঢাক বাজিয়ে যাচ্ছে
এদেশে মহারাজ এখনও তার প্রজাদের বেছে বেছে ডাকে
কখনো পোশাকে কখনো নামে বা পদবীতে কখনো লিঙ্গভেদে
সে মন্দিরেই হোক বা প্রাসাদে!