তিনটি কবিতা

আল ইমরান সিদ্দিকী

গাজিবোর পাশে
কত কিছুই কল্পনা করি কালে-কালে
পরে দেখি অনেক কিছুই আছে তারা আমার পায়ের তলে
আমার দৃষ্টিসীমায়।—
দূরের বাংলায়, কোন সে হেমন্তে, হায়,
কল্পনা করেছি আমি কমলা-হলুদ
লাখ লাখ অযুত-নিযুত
পাতা-ভরা গাছেদের প্রতিবিম্ব শাখা নদীর পানিতে
যেনবা গলিত রংধনু, আশ্চর্য রঙিন ঋতুতে! —
তেমন কয়েকটি গাছে
দুই প্রান্ত ঢাকা পড়ে আছে
এমন একটি ব্রিজ পেরিয়ে দেখেছি শাখা নদীটির তীরে
হৈমন্তী গাছের ভিড়ে
জলটুঙির মতন এক ছোট্ট গাজিবো! —
ভাবিনি কখনো পাবো
এ জীবনে তাকে
ধূমল ভাগ্যের কোনো এক বাঁকে!
এ পাওয়ার সাথে বাড়তি যে পাওয়া
সে এক দৃশ্য, বনবিড়ালের কঠিন থাবার নিচে একটি পাখির নিস্তেজ হয়ে যাওয়া
গাজিবোর পাশে!
কতক্ষণ আর শান্ত থাকা যায় শুধু নিজেকেই ভালোবেসে!
দিকে দিকে কী করুণ অবলুপ্তি!
মানুষের মুক্তিই কি জগতের মুক্তি?
সীমাহীন যন্ত্রণাভোগের সম্ভাবনা নিয়ে জন্ম নেয় সব প্রাণী
কী জানি
কী তার মানে!
হৈমন্তী গাছের ভিড়ে এইখানে
অনেক আনন্দ নিয়ে হাসে আমার অবুঝ ছেলে।—
নিজ সন্তানের মুখ আর নিজ মমতার দিকে একাগ্রতায় তাকালে
বুঝি আমি
থাকুক বা না-থাকুক অন্তর্যামী
জীবনের সুস্থির-গভীর এক মানে আছে।—

কোনো একদিন নিজ অস্তিত্বের ভিতর হয়তো সে মানে আমি পাবো
যেন সে গাজিবো;
চারপাশ ছেয়ে যাবে জীর্ণতার মৌনী উৎসারণে
মৃত্যুপূর্ব কোনো ক্ষণে।



হাওয়াকল
বাসন্তী এই পপির ক্ষেতে তুমিই সঙ্গী
থেকে থেকে হাওয়ায় দোলা পর্দা-সমান দেহভঙ্গি
দেখতে থাকি অবিরত
ঘাড় উঁচিয়ে, দু’এন্টেনা খাড়া করা ঘাসফড়িংয়ের মতো।

প্রথম কবে দেখেছিলাম
ফিলিতে হায় বৃষ্টি হলো কত!
ঝরলো পানি ছাতার চতুর্দিকে
বাদলা দিনে ছাতার তলে তুমি উপদ্রুত।—

তাই কি আজকে দেখতে হচ্ছে ক্ষেতের থেকে ওই অগুণতি পপি
তোমার শরীর ছুঁয়ে কেবল শূন্যে উঠে যায়
সূর্য ডোবার আগে অন্য রঙের মহড়ায়?

ভাবি, একটি হাওয়াকল কী করে তার নিজস্ব খেলায়
পেকে আসা সূর্যটাকে পাখায় পাখায় ঘোরায়!


মেঘমেদুর
অনেক সুন্দর স্মৃতি আছে, এমন একটি খাবারের দোকান উঠে যেতে দেখার সমান
বিষণ্নতায় ডুবে আছি—রাস্তায় দেখি জেব্রাক্রসিং দিয়ে পার হওয়া সাইকেল,
সুবিশাল পানির-ট্যাঙ্কির উপর বিদ্যুৎ-চমক। রাস্তায় জমে থাকা পানি চলমান
মানুষের প্রতিবিম্ব ধরে শুধু। একজন পরিপার্শ্বের ছবি তুললো; নারী কী পুরুষ,
সব ক্যামেরাওলা একই রকম; সমান বিরক্তিকর; দিনকে দিন আরও বিরক্তিকর
হয়ে ওঠে। ক্রমে আমি এসেছি বিজনে। যেন চেনা নয়—যেন সবই অন্যরকম।
যেন দেয়াল দেয়ালের, গাছ গাছের এবং আকাশ আকাশের আত্মপ্রতিকৃতির মতো,
এই অমোঘ মেঘলা দিনে।