রামধনু ও মরিচিকা

ভিক্টর ভৌমিক

(১)
নরকের পথ আয়নার ভেতর দিয়ে যায়। সব প্রতিফলনই মিথ্যে. প্রতিটা প্রতিবিম্ব সত্য ঘটনা অবলম্বনে কল্পকথা। সেখানে ডান চোখ বাঁ চোখ হয়ে যায়। তবু মিলগুলো বিভ্রান্তি জাগানো স্বপ্নের মত মনোরম। পৃথিবীতে আয়না না থাকলে অনেক সমস্যা কমে যেত। মানুষ ঘুরিয়েফিরিয়ে নিজেকে দেখতে দেখতে ফুলে ওঠে, তারপর আয়না তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে। এইসব হাবিজাবি দার্শনিক ভাবনা বা ভক্কিবাজির মধ্যে পূর্বপুরুষরা যে কী পেয়েছিলেন বলা মুশকিল। কবীর অন্তত জানে না। সে শুধু জানে তাদের বাড়িতে কোনও আয়না নেই,কখনও ছিল না, সুদূর ভবিষ্যতে আসার সম্ভাবনাও নেই। কারণ, তাদের বংশে কোনও একসময় কোনও মিনি যুগপুরুষের আবির্ভাব ঘটেছিল, এবং, তিনি জানান আয়না থেকে দূরে থাকতে হবে। বস্তুটা স্বপ্ন ও অবচেতনসহ মানুষের আত্মার প্রতীক হলেও তা আসলে সর্বনেশে। ইহকাল ও পরকালের সব খবর পারা মাখানো কাচের মধ্যে স্থায়ীভাবে ধরা থাকে। আত্মপ্রেমের পাগলামিতে মানুষ অন্ধ হয়ে যায়। মুচকি হেসে চেয়ে দেখে আয়না। তার স্মৃতি আছে। নিজের আর্কাইভে সব জমিয়ে রাখে, সময় বুঝে ঝুলির বেড়াল ছেড়ে দেয় প্রতিবিম্বের ওপর। একবার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়েছ বা ফেস পাউডার মেখেছ তো কেলোর কীর্তি। সব রয়ে গেল পার্মানেন্টলি। ভেঙে ফেললেও নিস্তার নেই। বালবের দানায় দানায়, ঘুড়ির মাঞ্জা বা বীয়ারের বোতলে থেকে যাবে পৃথিবীর ধ্বংস অবধি। যেহেতু স্মৃতি আছে তাই মনও সচল। অনেকসময় আয়নারা কর্কশ সত্যের চেযে সুন্দর মিথ্যে দেখায়। তাই দূরে থাকো। এ নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলেনি। বংশাণুক্রমে হুজ্জোতটা প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায় নৈতিক প্রতিরোধ হিসেবে—নো আয়না, নো জটিলতা। তাতে কারও অসুবিধাও হয়নি। যতদিন বাড়ির বাইরে পা পরেনি কবীররা জানত না তাদের কেমন দেখতে। নিজের চোখে নিজেকে কেউ দেখেনি। যা দেখেছে সবই অন্যের চোখে। যদিও বাড়িতে কাঁচের খামতি ছিল না। জানালাগুলো ছিল আপাদমস্তক সার্শিতে মোড়া। মার্কারির পরিকল্পিত অভাবে সেগুলোর রূপান্তর ঘটেনি। অনেকদিন পর কেউ আচম্বিতে কোনও আয়নার মুখোমুখি হলে বা অফিসপাড়ায় ব্যাঙ্কের স্যুইংডোরে ভিড়ের মাঝে নিজেকে দেখলে চিনতে পারত না। ষোল বছর বয়সে কবীরের ছোটপিসি জ্ঞান হারিয়ে ফেলে নিজেকে দেখে। যদিও তাকে দেখতে ছিল সুন্দর। রূপকথায় সে পড়েছিল নিষ্ঠুর রাক্ষসীরা নিজেকে পরমাসুন্দরী রাজকন্যা করে তোলে জাদু আয়নায়।। হয়ত সে কারণেই বেহুঁশ হওয়া।
কবীরের জন্মের তিন বছরের মাথায় বাড়িতে ভয়াবহ আগুন লাগে। অনেক কিছুর সঙ্গে তিন পুরুষের মলিন সিপিয়া ও ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট ছবিগুলো পুড়ে যায়। এমনকি বাবা-মা-র বিয়ের রঙ করা ছবিগুলোও বাঁচানো যায়নি। দেওয়ালে ঝুলত পিতামহ, প্রপিতামহদের জেনারেশনের কিছু অয়েল পেইন্টিং। নামেই তা পেইন্টিং,আসলে সেগুলো অপটু কোনও শিল্পীর হাতেখড়ি। সবগুলো একরকমের বৈচিত্রহীন মিলে ভারাক্রান্ত— দ্বারকানাথ ঠাকুর, ওয়ারেন হেস্টিং আর রাণী রাসমণির কম্বিনেশন। কবীর সে-সব দেখেনি।। বড়দের মুখে বিবরণ শুনে মনে হয়েছে ঠাকুর্দাকে টুনি বাল্ব লাগানো খ্রিসমাস ট্রী আর ঠাকুমাকে চশমা পরা অতিকায় সবুজ মাছির মত দেখতে। তাতেও সমস্যা হয়নি। নাতিকে কোলে নেওয়ার জন্য তাদের কেউ টিঁকে ছিল না। তাছাড়া সব মানুষই অন্য কারও মত বা অনেক কিছুর যোগফল। ইউনিক নয় কেউ। অন্যদের সঙ্গে এরকম কিছু দেখায় অমিল থাকলেও কবীরদের বাড়ি ছিল বেশ স্বাভাবিক। পাগলামির লক্ষ্ণণ ছিল না। তাদের পরিবারের বিচার স্বাভাবিকতার গর্বে অনড় স্থুল বাড়িগুলোর মত নয়, এই যা। দূর থেকে বিচ্ছিন্ন ও নিস্পৃহ হযে দেখলে সব বাড়ি পাগলের, সব মানুষ খানিকটা পাগল।
খ্রিসমাস ট্রী আর সবুজ মাছির নাতির সঙ্গে আমার আলাপ ফার্স্ট ইয়ারে। ছেলেটা একলা, কল্পনাপ্রবণ এবং কিছুটা অন্যমনস্কও। মানে, আকর্ষণীয়। তার বেশি বন্ধু ছিল না। দূর্বোধ্য এক অনতিক্রম্য দূরত্ব বজায় রাখত। পরে বুঝতে পারি কাউকে ভাল লাগলে তার জন্য সে সম্মোহনকারী বক্তা। ও পাবলিকের নয়, পার্সোনাল। আমাকে কেন বেছেছিল নিজের কক্ষপথের স্যাটেলাইট হিসেবে জানি না। উস্কোখুস্কো চুলের জন্য পকেট চিরুণী কিনে দিয়েছিলাম। কবীর বলল, তাহলে এক মিনিট স্থির হয়ে দাঁড়া, নড়িস না। তারপর আমার চোখের দিকে তাকিয়ে সে চুল আঁচড়ায়। বললাম, ক্যান্টিনে বেসিনের সামনে বড় আয়না আছে, সেখানে গেলেই তো হত। কবীর বলে, অসম্ভব, ওসব আমাদের সিস্টেমে নেই। তাছাড়া, এই যে তোর চোখের ভেতর দিয়ে মগজের ঘিলুতে ঠুকে গেলাম এর মজাই আলাদা। আর পালাতে পারবি না। সত্যিই পালানোর পথ ছিল না। ঘনিষ্টতা বেড়ে চলল এবং একসময় কবীর তার পারিবারিক কুসংস্কার বা পাগলামির কথা ফলাও করে জানায়। আমি বিশ্বাস করিনি। তবে আয়না না থাকলে, মানুষ নিজের পার্শ্ব প্রতিফলনে মুগ্ধ না হলে বা তা দেখার বন্দোবস্ত না থাকলে পৃথিবীটা অন্যরকম হত বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়েছে। মাখামাখি যত বেড়েছে বিস্ময়ের আরও আরও ঢেউ আমার ওপর আছড়ে পড়েছে। অসম্ভবকে স্বাভাবিক বলে মানতে শুরু করেছি। মে-জুনের দুপুরের রোদে ঠান্ডা লাগে,টোপর মাথার সফেদ কবুতরগুলোর পাশে পাশে রাধাচূড়া গাছের দিকে উড়ে যায় উড়ুক্কু মাছের দল। আমার কোনও অসুখ হয়েছে, ভয়ানক ছোঁয়াচে রোগ বাসা বেঁধেছে আমার মনে— এসব ঘটছে কেন। কবীর পীরের চামরের হাত বুলিয়ে বলেছিল,মানুষ চাইলে সব হয়। তুই দেখতে চেয়েছিলি তাই দেখেছিস। চাইলেই হয়।
আমি ছিলাম কবীরের চলমান আয়না। পিঠে লেগেছিল পারদের মি্শ্রণের কমলা রঙের অদৃশ্য প্রলেপ। সেলুনে ঝোলানো আয়নার মত সরু হয়ে পড়ছিলাম যেন। পথেঘাটে আমায় থামিয়ে কবীর চুল আঁচড়ে নিত, ঘেমো মুখ মুছে নিত রুমাল দিয়ে। আমি মেনে নিয়েছিলাম। উপায় ছিল না। কলেজে একমাত্র আমিই ছিলাম ওর বন্ধু। তাছাড়া বাইরে থেকে আসা নতুন একটা ছেলের পক্ষে এত বড় শহরে আয়না ছাড়া চালানো কঠিন। একমাত্র বন্ধুর চোখে কেউ যদি তার নিঃসঙ্গ প্রতিবিম্ব দেখতে পায় সেটুকু আবদার মানা উচিত। এভাবে প্রতিদিন কবীরের না-জানা গল্পগুলো আমার ভেতরে ঢুকে যেতে থাকে, ওর অতীত আর ভবিষ্যত জমা হতে থাকে মগজের কোণে কোণে। আমার কাছে সেটা ছিল এজ অফ উইসডম ও এজ অফ ডার্কনেস. আমার সামনে ছিল জ্ঞানের সেরা সময়,অবিশ্বাসেরও অবস্থা। আমার সামনে ছিল সব কিছু, আমার সামনে কিছুই ছিল না। বইয়ে পড়া লাইনগুলো এলোমোলোভাবে মনে পড়ত মাঝে মাঝে। হচ্ছেটা কী। ভাল লাগছে, না খারাপ বুঝতে পারছি না। অন্যরকম কিছু ঘটছে বলতে পারি। কিছুতে বেশি আপ্লুত হয়ে পড়লে হয়ত এমন রসায়নিক পরিবর্তন হয়। মাথার টেকটোনিক প্লেট অন্য প্লেটের ওপর উঠে আমার আকৃতিটাই বদলে দিচ্ছিল প্রতিদিন। বিশ্বাস হত আয়নার সত্যিই স্মৃতি থাকে, দূরদৃষ্টিও থাকে ডেফিনেটলি। না হলে আমার মধ্যে এত কিছু জমছে কেন। আমি না থাকলেও এসব ডেটা অন্য কোথাও ট্রান্সফার হয়ে যাবে,মুছে যাবে না। এর সঙ্গে বাড়ছিল দুশ্চিন্তাও। কলেজ পেরিয়ে যাওয়ার পর কবীরের কী হবে। সারাজীবন আমার পক্ষে এই দায়িত্ব পালন করা সম্ভব না। কবীর বলে, ভাবিস না,সময় কত কিছু বদলে দেয়। তুই যেমন বদলে গেলি, আমিও তো বদলে যেতে পারি সেভাবে। কারও অভাবে কিছু থেমে থাকে না। তুই আমার ব্যাঙ্ক, সব জমাচ্ছি তোর কাছে। দরকার মত এটিএম থেকে বের করে নেব। কবীর কথাগুলো বলত স্বগতোক্তির মত। যেভাবে আমার সামনে বসে আমাকে ভুলে যেত তা অবাক করার মত। মফস্বলের নির্জন গির্জার পাদ্রী লাগত নিজেকে। কাঠের জাফরি দেওয়া ঘরের ওপার থেকে যেন কনফেশন করে চলত কবীর। তবে তাতে না ছিল অপরাধ, না ছিল অনুতাপ। ছিল উদাস আনন্দ। বলত নিজের ছেলেবেলার আর বড়বেলার কথা। সেখানে মানুষজন নেই। ছিল কয়লার ইঞ্জিনের রেলগাড়ি, নিচু প্ল্যাটফর্মের স্টেশন, শাল কাঠের স্লিপারের ফাঁকে পাতালজোড়া ধেড়ে ইঁদুরদের টানেলের সাম্রাজ্য, ছুটে চলা ট্রেনগুলোর ধুলো মাখা দমকা বাতাস, গাড়ির উড়ন্ত কয়লার গুঁড়ো আর গরম স্টিমের ফোঁস ফোঁস। ছিল কেবিনম্যানের সতর্কতা, ওয়াগানের নিরন্তর গমগমে শব্দ, শান্টিংয়ের কর্মকান্ডের আলস্য, স্টেশন মাস্টারের দূর্ভাবনা, গার্ডের লন্ঠন আর রেললাইনের বাঁকা ধনুকের কুয়াশায় হারিয়ে যাওয়া। আর ছিল ছোট ছোট বাংলোর রেল কলোনীর পর খরায় বিমর্ষ ধূসর রুক্ষ প্রান্তরের শেষে বেলে পাথরের বোল্ডারের ফাঁকে বয়ে যাওয়া রুগ্ন একটা নদীর কথা। সবার ওপর জেগে থাকত লাল-সবুজ-হলুদ আলোর সিগন্যালগুলো। আরও কত কী। সব কিছু কবীরের দেখা নয়। যা যা দেখেছে, যা যা দেখতে চেয়েছে, সব মিশে থাকত আস্টেপৃষ্ঠে। যা কখনও দেখা হবে না তার বিবরণও জমছিল আমার মাথায়। কবীর বলত ভাবা মানেই দেখা। তুই যা ভাববি তা-ও আমার দেখা হয়ে যাবে। আমি সব মানতাম আয়নার ওপারে অ্যালিস হয়ে। মানুষজনের কথা কবীর না বললেও বসিয়ে নিতাম নির্ভূলভাবে। কবীরের পূর্বপুরুষদের মতে আয়নারা সেটা পারে। আমি তখন আয়না ও মানুষের মাঝপথে। কিছু কাঁচ, কিছু পারা ও কিছু রক্তমাংসের একজন। ততদিনে জেনে গেছি কিছুই অপার্থিব নয়। জড় পদার্থ বলে কিছু নেই। প্রত্যেকের প্রাণবন্ত হওয়ার ক্ষমতা আছে। পাথরও ছোট হয়, পাহাড়ও বড় হয়। সবাই বড় হয়, চাইলে ছোটও হতে পারে। অবলুপ্ত প্রাণীরা কোনও জড় পদার্থে লুকিয়ে আছে জেগে ওঠার জন্য। মানুষ এমন কিছু আহামরি কেস নয়।
একদিন পিচ গলা রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে কবীর বলে, লাইনের খোয়াগুলো বড্ড ছুঁচোলো, সাবধানে পা ফেলিস, এবার কিন্তু তাড়াতাড়ি প্ল্যাটফর্মে উঠতে হবে। ট্রেন আসছে। খোয়াগুলো ফুটছিল ম্যানগ্রোভ ফরেস্টের শ্বাসমূলের তীক্ষ্ণতায়। আমার অবাক হওয়ার সুযোগ ছিল না, সময়ও না। লাফ মেরে সবে প্ল্যাটফর্মে উঠেছি, পাশ দিয়ে দমকা বাতাস ছড়িয়ে চলে গেল এক্সপ্রেস ট্রেন। আমি দেখতে পাইনি। কিন্তু কামরাগুলোর দ্রুতগামী জানালা-দরজার আলোছায়া আমার ওপর ঠিকরে পড়ছিল। ভরদুপুরে হঠাৎ রাত নেমে এসেছে। ডার্কনেস অ্যাট নুন। দূরে কুয়াশায় সিগন্যালের সবুজ আলো ঝাপসা লন্ঠনের মত শূন্যে জেগে ছিল, পেছনে দুলছিল গার্ডের হাতের আলো। তারপর প্ল্যাটফর্ম হয়ে গেল ফুটপাথ, রেললাইন হল আলকাতরার রাস্তা। মনে হল কবীরের সঙ্গে কারও বন্ধুতা হওয়ার কথা নয়।আমি ওর বন্ধু নই,ওর শরীরের অংশ। দুজনের ঘিলু কেউ আলুভাতের মত চটকে দিয়েছে। এবং, যেখানেই থাকি না কেন, কবীরের সব খবর আমি পাব। যত দূরেই যাই না কেন, প্রতিটা স্টেপ, প্রতিটা ঘটনা ও বাক্য বিশেষ টাওয়ারের সংকেতে আমার কাছে আসবে। কখনও লোকোমোটিভ ইঞ্জিন চলে যাবে আমার ছায়া মাড়িয়ে, কখনও ন্যাড়া পাহাড় ঘুরে গাড়ির কয়লার গুড়ো পড়বে অসতর্ক চোখে। ওর কল্পনাপ্রবণ অঘটনগুলো সত্যি করে তোলার দায়িত্ব আমার। জলে ভরা লাল চোখ নিয়ে দেখব কবীর সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছে। কখনওবা রামধনুর তোরণের তলা দিয়ে ছুটছে মরিচিকার পেছনে। কবীরের গোটা জীবন আমার ওপর লেখা হয়ে গেছে। আমার আয়নায় ছাপা হয়ে চলেছে বিনা হরফে, বিনা ইলাসট্রেশনে। আমার মুক্তি নেই, কবীরেরও নেই। আমরা দুজনে প্রদীপের দৈত্য, দুজনেই আলাদীন। বিনা ঘষায় হাজির হই একে অপরের সামনে, বিনা আমন্ত্রণে ঢুকে পড়ি গল্পে। আমরা দুজনে মিলে বলি গল্প। কে কখন বলি নিজেরা বুঝতে পারি না। তারপর উবে যাই। তখন কথা বলতে থাকে অন্য কেউ।

(২)
বাড়ি শর্ট সার্কিটে পুড়ে যাওয়ার পর কিছুদিন শোক ছিল। তখন ছাঁইয়ের গাদা থেকে মাঝে মাঝে ফুঁপিয়ে উঠছিল বিরহ জাগানো হালকা ধোঁয়া। তারপর শুরু হয় স্মৃতিচারণের পর্ব। ঠান্ডা ধোঁয়ায় আর জান ছিল না, কাsচের ওপার থেকে মৃতদের আলতা পায়ের ছবিগুলো তাকিয়ে দেখত অপসৃয়মান আত্মীয়দের। এর মাঝে এল বদলীর চিঠি। সরকার বেশ বিবেচক। বাবার বদলী হল আগুনের দেশে। সাময়িক অগ্নিকান্ড থেকে চিরস্থায়ী বয়লারে। সবুজের শেষ রেখা থেকে কাঁটা ঝোঁপের ধুলোবালির জ্বলন্ত প্রান্তরে। ছোট ছোট টিলা, গা-পোড়ানো হাওয়ার মাঝে নিচু অনেক অবসন্ন বাড়ি।— এই সর্বনেশে রুখুশুখু জায়গায় জীবন কাটাতে হবে জানলে কে বিয়ে করত এমন মানুষকে, মা রোজ গজগজ করত।অভ্যেস হয়ে গেলেও তার অভিযোগ থামেনি। সেটা ছিল শস্যশ্যামলে ফিরে আসার আশা জাগানো একমাত্র প্রতিরোধ। তিন বাটির টিফিনকৌটোয় খাবার ভরার সময় অভিমান হয় সবচেয়ে বেশি। তখন ট্রেনের ড্রাইভার অধৈর্য সিটি বাজায় তিনবার। মা বলে,যাচ্ছে বাবা যাচ্ছে, তর সয়না এতটুকু,আমি মানুষ নাকি তোমার স্টিমের যন্ত্র। তারপর টিফিনকৌটো ঝুলিয়ে কবীর ছোটে ফাস্ট প্যাসেঞ্জারের মাথার দিকে। একটু দেরি হলে অবশ্য ক্ষতি নেই। মায়ের কৌটো ভরা না হলে ট্রেন ছাড়বে না। কী করে যে বাবা বোঝে রান্না কখন শেষ হল্। কবীর পৌঁছনো অবধি রাক্ষুসে ইঞ্জিন রেসের ঘোড়ার মত ফোঁস ফোঁস করে। গরম বাস্প ছড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। ছেলেকে দেখলে এক গাল হাসি ছড়িয়ে যায় বাবার আগুনে তাতা মুখে। গামছা দিয়ে মুখ মুছে ছেলেকে দেয় তিলের খাজা। এত বড় একটা গাড়ি বাবা চালায় ভেবে কবীরের বুক ফুলে ওঠে। প্রতিদিন দূরের কোনও স্টেশন থেকে ছেলের জন্য কিছু নিয়ে আসে ড্রাইভারসাহেব। গুড়কাঠি,বাদামচাকতি,চি ির দানা লাগানো গজা—লোভণীয় কিছু একটা থাকেই।— বাবা বলে, আহারে একদম ন্যাড়াপোড়ার রাঙা আলুটি হয়ে গেছিস যে, স্টেশন মাস্টারের ঘরে একটু জিরিয়ে ঘরে যাস। কবীর যায় না, দাঁড়িয়ে থাকে ট্রেন ছাড়া অবধি। এই গাড়ি নিয়েই বাবা ফিরবে কাল দুপুরে। একটাই ভাল ব্যাপার, বাবার গাড়িগুলো ছেলের স্টেশনে থামে।

স্টেশনের সবাই কবীরকে চেনে। প্রধানসাহেব, পরমকাকু, তুলসী মিশ্র, মুরুগন আন্না, চাওলাজী— সব্বাই।সবাই ভাঙা বাংলা জানে। সবাই তাদের কলোনীর বাসিন্দা। প্ল্যাটফর্মের গা ছুঁয়ে ঠ্যাঙা ঝিলের পর পাথুরে জমির ওপর কালো-হলুদ লোহার রেলিং দেওয়া তাদের কলোনী। দূরে ছোট ছোট টিলা। ঢেউ ওঠে, ঢেউ পড়ো পড়ো। সব বাড়ি একরকম। গরীবদের মলিন একতলা বাংলো। প্রথম আস্তানাটাই কবীরদের। মর্জিনার খড়ির ঢ্যাঁড়াচিহ্ন দিয়ে রেখেছে কবীর। কতই বা দূর হবে, বড়জোর তিনশো মিটার টিকিট কাউন্টার থেকে। শর্টকাটে দুশো। বাঁধের মত উঁচু রেললাইনের পাশে ঘোড়া ছোটানোর রাস্তা আছে। তাতার দস্যুরা এলেই হয়। এখানে ঘাম নেই, তাপ আছে। স্টেশন থেকে এটুকু যেতেই কবীরের দফারফা হয়ে যায়। ট্রেন যেদিন দু-নম্বরে দেয় ঘাড়ের কেশরে আগুন লাগা ওভারব্রিজ দেখলে কবীরের ভয় লাগে। দৃশ্যগুলো গরম হাওয়ায় কেঁপেকেঁপে আঁকাবাকা দোলে। সেদিনগুলো কবীর বুকপকেটে পেতলের প্লেটে নাম লেখা মাস্টারমশাইয়ের ঘরে বসে খাজা বা লাল পেয়ারা খায়। গুড়কাঠি হলে মায়ের জন্য বাঁচিয়ে রাখতে হয়। খাটে পা দুলিয়ে খেতে খেতে মা বলে, এমন পোড়ার দেশ জন্মেও দেখিনি, হাওয়া কাঁটার মত,ছায়াও ঘেমে যায়,স্বস্তির লেশমাত্র নেই, এই ঘুষ দিয়ে তোর বাবা আমায় ভোলাবে ভেবেছে। এত মানত করলাম,তবু বদলী ধানের দেশে হল না। সবুজের আশে হলুদ দেখে দেখে অন্ধ হয়ে গেলাম।
গরমই একমাত্র সমস্যা নয়। শব্দ হয়েছে দোসর। সারাক্ষণ গাড়ি ছুটে চলেছে গা ঘেঁষে। নিস্তব্ধতা শব্দের চেয়ে ভয়াবহ, তারচেয়ে ভাল শব্দের অবিরাম অত্যাচার। অর্ধচন্দ্রাকার পথে ট্রেন যাতায়াতের খবর ছুঁড়ে দেয় খাটে। জানালার শার্সিতে বগিগুলোর আলো ঠিকরে পড়ে, চার নম্বর লাইনে ঘটাং ঘটাং করে আগুপিছু করে চলে জং ধরা ওয়াগান। টাইমটেবিল বিশ্রাম নিলে দূরের স্টেশন থেকে পুরনো গান শোনা যায় চাকার আওয়াজে। এর মাঝে রাতভর অপলক সিগন্যালের সার্চলাইট শোবার ঘরের মেঝেয় চেয়ে থাকে। সেই আলোয় কবীর দেখতে পায় ধেড়ে ইঁদুর ছুটে চলেছে বারান্দার এপ্রান্ত থেকে ও কিনারায়। রান্নাঘরের কাঠের দরজা চিবিয়ে তারা খাবারের লাইসেন্স করে নিয়েছে। মাঝে মাঝে তারা পায়ের ওপর দিয়েও ছুটে যায়।‌— দেখো কান্ড, এত বিষ দিলাম, তবু কাজ হল না। অনামুখোর দলের উৎপাত বেড়েই চলেছে, মা আঁচলে গা এলিয়ে চোখ বুজে আক্ষেপ করে। বাবা নিজের ঘোরে থাকে। মাথায় ব্রড, মিটার আর ন্যারো গেজ শাখাপ্রশাখা ছড়িয়ে দিয়েছে রেলওয়ে অ্যাটলাস মেনে। ঘুমের ঘোরেও রেলের ম্যানুয়ালের কথা বিড়বিড় করে। ইঁদুর নিয়ে অভিযোগ করলে বলে, ওরাও রেলের স্টাফ। মায়ের জোরাজুরিতে একবার ইঁদুর ধরার কল কিনে আনে। নির্দেশ ছিল ভেতরে যেন ভাল খাবার দেওয়া হয়। ফাঁসির আসামীকেও শেষ খাবারটা ভাল দেওয়া হয়। ওদের আঠার গুলি খাইয়ে যেন মারা না হয়। দেওয়া হয়েছিল মাছের পেটি। কাঠবেড়ালীর সাইজের একটা ধরাও পড়ে। তখনও তার মাছ খাওয়া শেষ হয়নি। পাশের কোয়ার্টারের মণিরামকাকা বলেছিল পুকুরে খাঁচাটা ডুবিয়ে রাখতে, তাহলে রক্তারক্তির ঝামেলা থাকবে না। ইঁদুরটা মায়ের দিকে তাকিয়েছিল বাধ্য ছাত্র সেজে।—বদমাশের বাচ্চা,প্যাটপ্যাট করে চেয়ে আবার মায়া বাড়ানো হচ্ছে, তারপর হেসে ফেলে মা বলে,ব্যাটা বইয়ের কার্টূনের মত মিষ্টি,তাই নারে। রেলিংয়ের ওপারে সেটাকে ছেড়ে দেওয়া হয়, আর যেন আমার চৌহদ্দিতে তোকে না দেখি জানিয়ে। কার্টূনটা বই থেকে ছুটে পালায় উঁচু ঢালে বুনোফুলের ঝোঁপ পেরিয়ে লাইনের দিকে।— ওদিকে কোথায় চললি গাধা, সিগন্যাল হয়ে গেছে, কাটা পড়বি যে, মা চেঁচায় হাতের খাঁচাটা ছুঁড়ে ফেলে। কোথায় চলল কবীর জানে। রেললাইন জুড়ে ওদের রাজ্য। স্লিপারগুলোর তলায় ওরা সুড়ঙ্গ কেটে চলেছে জটিল মানচিত্রর মত। হাজারদুয়ারির চেয়েও বেশি দরজা সেখানে। বিকেলে পকেট ভর্তি মুড়ি নিয়ে খাও্য়াতে যায় কবীর। রুটি বাঁচিয়ে রাখে রাতের থালা থেকে। কেবিনম্যান জীবন তলাপাত্র বলে,লাই দিয়ে ওদের মাথায় তুলো না, তোমার দাঁত নিয়ে চলে যাবে একদিন।

জায়গাটা নিয়ে মা-র যতই অভিযোগ থাকুক, কবীরের খারাপ লাগে না। সবুজের দেশ কেমন সে জানে না, বছরভর নদীভরা জল কেমন হয় সে জানে না। শুধু শুনেছে। ঝমঝমে বৃষ্টিও সে বড় একটা দেখেনি। বছরে মাস খানেকের চড়া শীত ছাড়া পেয়েছে খালি তাপপ্রবাহ। লু আর লু। ঝলসে হলুদ হয়ে যাওয়া খামচা-খামচা কিছু লম্বা গাছ। তাদের বাসার এক কিলোমিটার পর থেকে যে দিকে যতদূর চোখ যায় বালি মেশানো নির্জন ন্যাড়া মাঠ। মাঝে ঘাড় গুঁজে জেগে থাকে বেঁটে বেঁটে ঝোঁপ। বৈচিত্র বলতে কিছু দূর অন্তর ঢিবির ফাঁকে শুকনো নালা। বাবার সঙ্গে মোটরসাইকেলে চড়ে সে দূরে দূরে বেড়াতে গেছে। মা যেতে চায় না, বলে,ঘরের গরমে প্রাণ ওষ্ঠাগত, বাইরে চলল বাইরের শয়তানের সাথে দোস্তি পাতাতে। যবে চার চাকা কিনবে যাব। বাবা বলে, চার চাকায় পোষাবে না, আমার হাজার হাজার চাকা। তারপর বাড়ির খাবার নিয়ে বাপব্যাটায় যায় পিকনিকে। রেললাইনের উঁচু বাঁধের ধারের সমান্তরাল রাস্তা দিয়ে তাদের রয়্যাল-এন-ফিল্ড গড়ায়। তেলের ট্যাঙ্কের ওপর তোয়ালে বিছিয়ে গ্যাট হয়ে বসে কবীর। পাশ দিয়ে যায় আপ-ডাউনের ট্রেন। সতীনাথবাবু হাত নেড়ে বিড়বিড় করে, ছুটি নিয়েও শান্তি নেই। স্টেশন এসে গেল বলে, এখনও হর্ন নেই, ড্রাইভার গার্ড দুটোই ঝিম মেরে আছে। কী করে যে গাড়ি চালায় আজকালকার ছেলেগুলো বুঝি না। রেল থেকে আমার মুক্তি নেই। কবীর বোঝে না কতগুলো গাড়ি বাবা একসঙ্গে চালাবে। সে বলে,বাবা রেস লড়ো। একটা প্যাসেঞ্জার ট্রেন পেরিয়ে মোটরসাইকেল থমকায়। বাবা বলে, ওটা সেভেন্টি নাইন আপ, বরুণ চালাচ্ছে। সাইকেলের সঙ্গেই পারে না, আমাদের কী করবে। তবে, রেল হল আমাদের মাইবাপ, ওকে হারালে নিজেরাই হেরে যাব। মিলিয়ে যাওয়া অবধি চাকার শব্দ শুনতে শুনতে ফাস্ট প্যাসেঞ্জারের অভিজ্ঞ ড্রাইভার অন্যমনস্ক গলায় বলে, বড় হয়ে তুই রাজধানী চালাবি, এত গরমে থাকা ভাল নয়।
পঞ্চাশ মিনিট পর ওরা পৌঁছয় হলুদ পাথরের দেশে। বড় বড় বোল্ডারে ভরা নদীর বুকে। বাঁদিকের খাঁড়া চড়াই বেয়ে নেমেছে নদীটা। হুমড়ি খেয়ে পড়া জলপ্রপাতের জন্য সব আয়োজন রেডি। জলটাই যা নিরুদ্দেশ সফরে গেছে। পাথরের ফাঁকফোকর দিয়ে তিরতির করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে জলের শিরা-উপশিরা। মাঝে বালির চর চিরে কোনক্রমে জেগে আছে একটা মোটা ধারা। কত জায়গায় জমে আছে জল। ছোট ছোট গামলার মত। তাতে শ্যাওলায় সবুজ জলের ওপর তরঙ্গ তুলে ঘোরে অজানা পোকার দল। বাবা বড় বেডশিট টাঙায় মশারির মত। হাঁটুজলে চান করে ব্যাগের পোলাও-মাংস খেতে খেতে দেখে বালিতে আটকে যাওয়া মাছদের অসহায় সাঁতারের চেষ্টা।পরে একবার কয়েকদিনের অপ্রত্যাশিত বৃষ্টির পর রোদ উঠতে মাকে রাজি করানো যায়। সেদিন নদীটা নদী-নদী লাগছিল। সশব্দে ফেনা উঠাছিল জলে। কিনারায় পাথরে আটকে থাকা জলেরই যা হেলদোল ছিল না। খাওয়ার পর কৌটো ধুতে গিয়ে সেখানে নিজের মুখ দেখে অবাক ও আতঙ্কিত মা চেঁচায়, এটা কে, কে এটা, আমি এরকম হয়ে গেছি নাকি। আট বছর আয়না না দেখে পরিবর্তিত রূপে নিজেকে চিনতে পারেনি মৃদুলা মিত্র। তখন রোদ গরম হয়ে এসেছে। পাথরের খোঁচা দেওয়ালগুলোয় ধাক্কা খেয়ে ঘুরপাক খেতে থাকে,এটা কে-এটা কে।দূরে গিয়ে দূর থেকে ভেসে আসে, এটা কে।—উফ, কী কান্ড, সেই কবে থেকে বলছি বাড়িতে আয়না রাখো, তা না,কবে কোন মহাপুরুষ কী বলে গিয়েছিল,সেই ভ্যানতাড়াই চলছে। সামান্য একটা কথাও তুমি রাখলে না। মা কথা বলছিল এত জোরে যে স্থির জলের পোকাগুলো ছোটাছুটি শুরু করে বেমক্কা। তরঙ্গের বৃত্তে আরশির টুকরোর মত ভেঙে খানখান হয়ে যেতে থাকে ঝুঁকে থাকা মায়ের প্রতিবিম্ব। বাবা বলে, দেখলে তো নিজেকে দেখলে কী সর্বনাশ হয়। তারপর সবাই চুপচাপ হয়ে যায়। ভরা নদী, হাওয়ার সোঁ-সোঁ, চড়াইয়ের লম্বা পর্ণমোচী গাছদের পাতা ঝরানো— সব কিছু। ওরা ফিরতে থাকে। ততক্ষণে মাটির জল আকাশে ফিরে গেছে। সব আবার খটখটে।ছন্দ কেটে যাওয়ায় গরম বাতাস গায়ে লাগছিল না। কয়েক কিলোমিটার চলার পর দেখা যায় রাস্তায় খানাখন্দ হয়ে শুয়ে আছে টুকরো টুকরো আয়না। কবীর চেঁচায়, পাশ কাটিয়ে চল বাবা,জলে পড়ে যাব। বাবা বলে কিছু হবে না, ওরা ছুটতে পারে। মা পেছন থেকে ঘাড়ের পাশ দিয়ে চোখ মেলে দেয়। গাড়ি যত ছোটে আয়নারাও ছোটে। মা বলে,ওটা মরিচিকা। বাবা জানায়, আভ্যন্তরীণ পূর্ণ প্রতিফলন। সব আয়নাই মরিচিকা, সব প্রতিফলন মিথ্যে। কবীর কথাগুলো বুঝতে পারেনি। চায়ওনি। সেই তার প্রথম মরিচিকার মুখোমুখি হওয়া। মায়েরও।
হাঁফিয়ে গিয়ে একসময় মরিচিকা হাল ছেড়ে দিল। ফিরে গেল নাইনের বিজ্ঞান বইয়ে। বাড়ি তখনও আঠাশ কিলোমিটার। পৃথিবীর দীর্ঘতম অলস ওয়াগানটা চলছিল সঙ্গে। দূরে, দু-ধূধূ দূরে দেখা যায় অনেক তাঁবু আর ছোট মানুষদের ব্যস্ততা। মন খারাপ থেকে জেগে মা খুকির মত বলে, মেলা দেখব মেলা। জিলিপি খাব, রসবড়া খাব, জোকার দেখব, ঘোড়ায় চড়ব। বহু বছরের মধ্যে ল্যান্ডস্কেপের একঘেয়েমি ও ম্যাড়মেড়ে নির্জনতা কাটিয়ে হঠাৎই তার আনন্দ ফিরে এসেছে। প্রৌঢত্বের খন্ড খন্ড ছবি জলে ভেসে যাওয়ার পর মনে হয়েছে আক্ষেপের মানে হয় না। জীবন বেশ ছোট, নিজেকে সুখী নিজেকেই করতে হবে। যে কোনও অবস্থায় খুশি হওয়ার খোঁজ পেয়ে গেছে যেন মা। মনে হচ্ছে পোড়ার দেশেও আনন্দে থাকা যায়, থাকা উচিত।
মেলার সেটা প্রথম দিন। তখনও শুরু হয়নি। বাঁশ পোঁতা, শামিয়ানা টাঙানো চলছে। অব্যবস্থার ব্যস্ততার মাঝে একটা গোল তাঁবু রেডি ছিল সেজেগুঁজে। টিকিটঘরের ক্লাউনদের ছবির মাঝে হিন্দিতে লেখা ছিল— ধামাকা-ধামাকা-ধামাকা। হসিকা তান্ডব। খুদকো দেখিয়ে, পহচানিয়ে অউর মুস্কুরাহত রোকনে কি প্রয়াস কিজিয়ে। খুশিকা দো পল, খোল দেগা জিন্দেগীকা আক্কল। ভেতরে বিচিত্র এক ভাঙাচোরা ভেংচি কাটা জগৎ। আঁকাবাঁকা আয়নায় মোড়া সমস্ত দেওয়াল। প্রতিবিম্বগুলো মূহুর্মূহু বদলে যায় সামান্য নড়াচড়ায়। লম্বা, বেঁটে, রোগা, মোটা, বিস্ফারিত পেটের প্রতিবিম্বগুলো বাঁধাকপি কলাগাছ গোল্ডফিশ হয়ে ঢুকে পড়তে থাকে পাশের শরীরে। মায়ের দাঁত ছিল হাঙরের মত তীক্ষ্ণ, কবীরের এক চোখ তার ঠোঁট ছুঁয়ে ফেলেছিল। তার হাফ প্যান্টের পাগুলো মায়ের সায়ার মত ফুলে উঠেছিল। বাবার চশমা পুরনো গাড়ির হেডলাইটের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে। মানুষ ছাড়া প্রকৃতির অনেক কিছুর সঙ্গে নিজেদের মিল খুঁজে পেয়ে তারা হেসে গড়িয়ে পড়ে। মা বলে এত বছর পর নিজেকে দেখে দারুণ লাগছে। কতরকম দেখতে আমাদের। আমরা কত তাড়াতাড়ি বদলাই।
বাবা বলে, এত বদলাতে নেই।
— তুমি সব কাজে বাগড়া দাও। আচ্ছা সত্যি সত্যি এরকম দেখতে হত আমাদের, থলথলে সিলমাছ বলে। গাল ফোলা জলদস্যু বলে, তাহলে আমার চাকরি থাকত না।
— তবু বিজ্ঞাপনের শেষ লাইনটা কিন্তু দারুণ।
— কোনটা?
— ঐ খুশিকা দো পল, বদল দেগা জিন্দেগীকা আক্কল।
— বেড়ে লিখেছে বটে। জানা কথা, তবু জানতে কত সময় লাগে।
— বুঝলে, আর আফশোস করব না আমরা।
— আমি তো করি না মৃদুলা। শুধু আশঙ্কা হয় রিটায়ারমেন্টের পর রেলগাড়ি ছাড়া বাঁচব কী করে ভাবলে। মনে হয় সরকার আমাকে রেখে দেবে। ফ্রিতেই না হয় রাখুক।
— ও নিয়ে ভেবো না। যা হবে ভালই হবে। আপাতত খুশিকা কুছ পল আমরা একটু করে জমাই। সুদেআসলে অনেক হবে। তখন আমরা ট্রেনে ট্রেনে ঘুরব ফ্রি পাশে।
দুই বড়র মাঝে কবীর বিজ্ঞ জাজ হয়ে নীরব ছিল। তার মনে ধরেছিল মস্তি শব্দটা। তা-ও মাত্র দু-টাকায়।

সেদিনের পর মা কখনও খড়ের রঙের চরাচরের জন্য আক্ষেপ করেনি। অভিযোগ তো নয়ই। যেখানেই থাকো আনন্দে থাকো। আনন্দে শীত কমে, গরমও কমে। কালেভদ্রে দক্ষিণে ফেরার বাসনা ভোরের স্বপ্নে উপদ্রব করলেও তার ঝাঁজ ছিল না। বরং,অবসরের পর রেলবিহীন বর কী করবে ভাবলে দিশেহারা লাগত। তার কাছে পৃথিবীর ইতিহাস রেলের জন্ম থেকে শুরু। ভূগোল মানে লাইন দিয়ে সেলাই করা পৃথিবী। বন্ধুরা রেলকর্মী। সঙ্গীত বলতেএ ঝতুবৈচিত্রে দূরত্বভেদে ট্রেনের শব্দ। সরকার যদি এটুকুও না বোঝে চলবে কী করে।সরকার বুঝল না। রূক্ষ থেকে রুক্ষতর এলাকায় বদলী হতে হতে একদিন রিটায়ারমেন্ট এসে গেল। বেশি বয়সের সন্তান কবীর তখন কলেজে ঢুকব ঢুকব। ফেয়ারওয়েলের দিনও বাবার ধারণা ছিল শেষ মূহুর্তে ঘোড়া ছুটিয়ে কোনও মেসেঞ্জার আসবে ফাঁসির সিদ্ধান্ত রদ করার পরোয়ানা নিয়ে। তেমন কিছুও ঘটল না। সংক্ষিপ্ত অশ্রুসজল ফেয়ারওয়েলের পর কর্মজীবন ফুরিয়ে গেল। খুব অভিমান হয়েছিল তার। মা-রও।—ছিঃ, এভাবে একটা মানুষকে কেউ মেরে ফেলে। সরকারের কান্ডজ্ঞান নেই,এবার দেখব রেল কীভাবে চলে।এত বছরে তাকেও গ্রাস করে ফেলেছিল রেল। মানববর্জিত জায়গায়ও কানে ভোঁ ভোঁ করত স্টিমের শ্বাস। চোখে জ্বলত সিগন্যালের আলো। বাবা বলল, আর ট্রেন নয়, এমন জায়গায় থাকব যার যোজনের মধ্যে রেললাইন নেই। ছোট্ট একটা বাড়িতে গাছপালা আর নিরীহ জীবজন্তু নিয়ে কাটাব। পাখিদের জন্য বাগানে থাকবে মাটির জলের পাত্র। মা বলল, এবার কিন্তু আয়নাটা কিনতেই হবে। যা ক্ষতি সরকার করল, এরচেয়ে খারাপ কী আর হবে। মেলার ঐ ট্যারাখোঁড়া আয়না হলেও আমার একটা চাই। বাবা বলেছিল, দূর পাগলী এমনিতেই তোমাকে সুন্দর দেখতে, আরও সুন্দর হয়ে কাজ নেই।

(৩)
তারপর চলল বিহ্বলতার অবিরাম পুনরাবৃত্তি। প্রথম স্মৃতির পর থেকে কবীরের সামনে শুরু হয়ে যায় অস্তিত্বহীন জলরাশির উজ্বল উপস্থিতি। যেখানেসেখানে বুক চিতিয়ে শুয়ে থাকত ঝকঝকে আয়না।পুকুরের মাপের, হ্রদের সাইজের মরিচিকা ডাক দিয়ে ছুটে চলত সামনে। সেগুলো এতই বিশ্বাসযোগ্য যে আবির্ভাবের সহজ বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ভ্রান্ত মনে হত। সেইসব জলে লালচে সারসের দল ঘুরে বেড়াত পা ডুবিয়ে।পরিযায়ী পাখিরা ঠোঁটে মাছ নিয়ে উড়ে যেত। কবীর চাইলেই হাজির হয় তারা। খুঁটিতে উট বেঁধে তাঁবু খাটাত বেদুইনরা।এইসব কঠিন জিনিস সহজে দেথলেও কবীর কখনও রামধনু দেখেনি। তার অঞ্চলে জিনিসটার টানাটানি ছিল বটে, তবে তা দূর্ভিক্ষের মত নয়। রামধনু চাষের জন্য আকাশ ততটা অনুর্বর নয়। তার চেনা সবাই দেখেছে। বারবার দেখেছে। তার সঙ্গে দুশমনি ছিল বিশ্লিষ্ট রঙের। একদিন নারাণদার ক্যান্টিনের অখাদ্য ভেজিটেবিল চপ খাওয়ার সময় জিজ্ঞেস করে, অর্ক, তুই কখনও রামধনু দেখেছিস? কলেজে তখন ইউনিয়নবাজি চরমে। জরুরী অবস্থার অবসানে মুক্ত বাম, অতিবাম, মূল স্রোতে ফিরতে চাওয়া বামরা বিপ্লবের কথা বলছে ওপেনলি। ক্ষমতায় আসা পতনোন্মুখ পার্টির বিপ্লবীরা দক্ষিণপন্থীদের চেয়ে বিপজ্জনক ভাবছিল লেখাপড়া করা ছেলেদের। স্লোগানে ভরে গেছে করিডোরগুলো। সুজিত-সজল-প্রদীপরা,মান স-নিরঞ্জন-তন্ময়রা ছোট ছোট মিছিল আর গ্রুপ মিটিংয়ে ব্যস্ত। আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব না সর্বহারার শাসন, পুঁজিবাদের পোস্টমর্টেম আর সংশোধনবাদের বিপদের মধ্যিপথে কবীরের সঙ্গে মরিচিকা নিয়ে ঘুরপাক খাচ্ছি আয়নার স্মৃতির আর্কাইভে। এর মাঝে নতুন বিপদ। কবীর আবার বলে,কখনও রামধনু দেখেছিস?
— এটা আবার কোনও কথা হল।মর্জিমত দেখা যায়। কেন তুই দেখিসনি?
— বিশ্বাস কর, একবারও না।
— ঢপ মারিস না।
— নারে সত্যি বলছি। আসলে সবার মর্জি বা ডাক তো সমান নয়। যতবার শুনেছি রামধনু ফুটেছে, ছুটে গেছি, গিয়ে দেখি সব গায়েব, কোরা আকাশে শকুনের গুয়ের গন্ধ। অন্যরা বলে, এই তো ছিল, তোমায় দেখে পালিয়ে গেল। বাবা বলত, কতবার রামধনুর তোরণের নিচ দিয়ে ট্রেন চালিয়ে গেছে।কয়েকবার কেবিনে বসে আমিও গেছি, দেখতে পাইনি। সাদার মধ্যে সব রঙ লুকিয়ে থাকে ভেবে স্বান্তনা পেয়েছি।
— বিশ্বাস হয় না রামধনুর কথাটা। আমার কথায় গা-জোয়ারি ছিল।
— কেন? এই স্লোগান, এই পোস্টারগুলো বিশ্বাস হয়? মনে করিস কটা বছর পর এরাও বিশ্বাস করবে?
— সবাই না হলেও কেউ কেউ করবে।
— তাহলে আমার ছোট কথাটা বিশ্বাস করছিস না কেন? মনমরা শোনায় কবীরকে।
— তবু ব্যাপারটা চিন্তার। চিলেকোঠার ঘরে, ব্রিজের টংয়ে, টেলিগ্রাফের পোস্টে লটকে থাকতে আমিই কতবার দেখেছি, আর তুই কিনা এত কিছু দেখেও এটা দেখিসনি? অদ্ভুত। এত সোজা কোশ্চেনপেপার সলভ না করে কলেজে ঢুকলি কী করে? মস্করা করি আমি।
বিমর্ষ কবীর জানায়, তুই কোথাও দেখতে পেলে জানাস। আচ্ছা, তুই কখনও মরিচিকা দেখেছিস?
আমরা ক্যানটিন থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম হট্টগোল এড়াতে। সামনের বাড়ির সিমেন্ট-অক্সাইডের লাল রকের দিকে তাকাই, দেওয়াল ফাটিয়ে গজিয়ে ওঠা বটের চারার দিকে চাই। শোনপাপড়ির কারখানা থেকে উড়ে আসা ঘিয়ের গন্ধে ম-ম করছিল পাড়া।— বলছিস এখানে মরিচিকা দেখা যায়? দেখা সম্ভব এই পরিবেশে?
— আমি তো হামেশাই দেখি। ফুলের জঙ্গলের মত ফুটে থাকে। ওদের পেছনে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি চলে যাই।
জানতাম কবীরকে অবিশ্বাস করার কারণ নেই। ও মিথ্যে বলতে পারে না। মিথ্যে দেখতে পারে, তবে তা সত্যি জেনেই দেখে,— তেমন বুঝলে আমাকে দেখাস।
— দেখা যাক। তোকে দেখলে যদি পালিয়ে যায়। সবার কাছে সব জিনিস খোলে না। রামধনু যেমন আমার জন্য নয়।
— পালালে আর কী করা যাবে। মরিচিকার কাজই তো পালানো।

আমি কবীরকে রামধনু দেখাতে পারিনি। কবীরের নাম শুনলে অমন জলজ্যান্ত একটা জিনিস হাপিস হয়ে যেত। কবীরও আমাকে মরিচিকা দেখায়নি। তবে,একদিন উট দেখিয়েছিল। ঈদের মরসুমে দোতলা বাসের পাশ দিয়ে হাঁটছিল রুগ্ন উটটা। বেদুইনদের বাতিল জোব্বা চাপানো বেঁটে একটা লোকের দড়ির টানে— দেখ-দেখ উট, এবার মরুভূমিও দেখবি, তারপর দেখবি বালির টিলাগুলোর সামনে শুযে আছে চকচকে বিচ্ছুটা। খেজুরগাছে ঘেরা জায়গা দেখলে থেমে যাস, নাহলে নিশ্চিত মৃত্যু।
আমি অবশ্য তেমন কিছু দেখিনি। কবীর মরুদ্যানে পৌঁছে শরবতের দোকানে লেবুসোডার অর্ডার দেয়। বরফের টুকরেগলো থেকে মুখ তুলে বলেশহর তোদের সর্বনাশ করে দিয়েছে। দেখার মন মরে গেছে। তবে, এভাবে চললে একদিন দেখতে পাবি, সঙ্গে থাক।
— যা নেই তা দেখব কী করে। দেখেই বা কী হবে।
— যা নেই তাই-ই তো আমরা দেখি। মরে যাওয়া নক্ষত্র দেখি হাজার বছর পর। তখন কিন্তু জায়গাটা শূন্য।
— ঢ্যামনামো ছাড় কবীর, আপাতত বিএসসি লেভেলেই থাক, স্পেসে যাস না।
কবীর থেমে গিয়েছিল। তারপর যত সময় গেছে কবীর শহুরে হয়েছে, শহর তার কৌতুহলী কল্পনাকে খাটো করে ফেলছিল। আমার হয় উল্টো। কবীরের কমে যাওয়া জিনিসগুলো চোখের তারা ভেদ করে, আমার আয়নাকে বিদ্ধ করে অজানা সংকেত পাঠাতে শুরু করেছিল। বহু দূর থেকে সম্ভাব্য ঘটনাগুলোর, বহু অতীত থেকে অবলুপ্ত প্রাণীদের স্বর শুনতে পাচ্ছিলাম। রেকারিং ডিপোজিট বেড়ে চলছিল।ফলে কবীরকে আর দরকার ছিল না। কলেজ ছাড়ার পর ওর সঙ্গে চাক্ষুস যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। ছাড়াছাড়ি হল না। বরং টান বেড়ে গেল। দূরে গেলে টান বাড়ে। ওকে আমি দেখতাম লাইভ ব্রেকিং নিউজের মত। কবীরের সব জানতাম আমি। যেভাবে টাওয়ার জানে টেলিফোনকে, যেভাবে স্কাইপ জানে প্রবাসী বন্ধুকে।


১২৩৮২ ডাউনে উঠলে কবীরের মন ভাল হয়ে যায়। গাড়িটা রাজধানীর মত অভিজাত না হলেও স্বাধীনতা বেশি। বিশেষত স্লিপার ক্লাসের মজাই আলাদা। লোয়ার বার্থ পেলে তো কেল্লা ফতে। এটা তেমন দিন। ৯ নম্বর বার্থে এলিয়ে কবীর উল্টোদিকে ১২ নম্বরের দিকে তাকায়। কমবয়সী ফুরফুরে একটা মেয়ে। কত বয়স হবে? কুড়ি-একুশ, বড়জোর বাইশ। তার থেকে বছর পাঁচেকের ছোট। ঝিরঝিরে বৃষ্টিকে পাত্তা না দিয়ে কাঁচ তুলে মাথা হেলিয়ে দিয়েছে জানালার শিকে। দেখতে কেমন মেয়েটা? কবীরের মনে হয় জানুয়ারির আকাশের মত। নির্মেঘ, ছিমছাম। যদিও আকাশে ছিল অপ্রত্যাশিত জলের ভিড়। ঝুরো বৃষ্টির দানাগুলো কচুপাতায় পিছলে গড়িয়ে যাচ্ছিল এয়ারহোস্টেস ব্লাউজের ভেতর। কবীর আগ বাড়িয়ে বলে, কাঁচ নামিয়ে দিন, ঠান্ডা লেগে যাবে।
— আমার লাগে না।
— তাহলে আমিও খুলি।
— আপনার ব্যাপার, আমায় না বললেও চলত।
— তা নয়, জানালার বাইরেটা দেখা না গেলে স্লিপার ক্লাসে চড়ব কেন।
— আমারও তাই মনে হয়।
— যাক, একটা জিনিস আমাদের মিলল। কবীর ঠিক মেয়ে পটানো ছেলে নয়, কে জানে কেন গায়ে পড়ে অপমান ডেকে আনছিল।
— না মিললেও ক্ষতি ছিল না। ওভাবে দেখলে সবার সঙ্গে কিছু না কিছু মেলে।
— মেলে না যে আমার। সেটাই মুশকিল।
— সবাই নিজেকে স্পেশাল ভাবে। আপনার আর দোষ কী। এতক্ষণেও জানালা থেকে মুখ ফেরায়নি মেয়েটা।
— সামান্য কারণে কেউ কি স্পেশাল হয়, স্পেশাল হওয়াটা খুব একটা ভালও নয়, বরং ঝামেলার। যেমন ধরুন আমাদের বাড়িতে কোনও আয়না নেই, কখনও ছিল না। আমরা কেমন দেখতে নিজেরা জানতাম না বহু বছর। এখনও জানি বলা যাবে না। যদি বলি এই যে এত বড় হয়ে গেলাম এখনও আমি রামধনু দেখিনি, কে বিশ্বাস করবে। দেখেছি ক্যামলিনের রঙের বাক্সের কভারে। কবীরের কথা কর্পোরেশনের ভাঙা কল যেন, থামার লক্ষণ নেই।
এবার মেয়েটা মুখ ফেরায়। বড় চোখ আরও বড় করে বলে, আপনার কেসটা তো গোলমেলে। সব কথা সবাইকে বলতে নেই। সব জায়গায় তো একেবারেই না।
— তাহলে কোন জায়গায় বলব?
— বলার দরকার কী। বড়রা বলেছে গোলমেলে লোকদের এড়িয়ে চলতে।
কবীর হাসে। সে জানে ওসব কথার কথা। শুরুতে কেউ কেউ অমন হয়। সে কম মানুষ বাছে, যাকে বাছে সে পালায় না। ঠিক মেয়েই বেছেছে। কবীর ভুল ভাবেনি। অর্থনীতির মেয়ে ও অঙ্কের গবেষকের প্রেম হয়ে যায় গাড়ি ডেস্টিনেশনে পৌঁছনোর আগে। তার ঠিক তিন বছর দুমাস তেরো ঘন্টা প্রেমপর্বের পর কলেজে চাকরি পায় বর্ষা। খরা ও বর্ষার মাখামাখি আর কি। প্রথম মাইনে পেয়ে বর্ষা দেখা করে ড্রিম মার্কেটের সামনে। খিলান ও স্তম্ভনির্ভর বৃটিশ স্থাপত্যের পুরনো বাজারের সামনে সেদিন উৎসবের ভিড়। হালকা বৃষ্টির পর মিঠে রোদের সার্চলাইট বেরিয়ে এসেছে। ফ্রক-ইজের পরা কিশোরী হয়ে হাততালি দিয়ে ওঠে বর্ষা, এইবার পেয়েছি ব্যাটাকে, ওপরদিকে তাকাও। অনিচ্ছা নিয়ে ওপরে তাকিয়ে কবীর দেখে ঝকঝকে রামধনু। সেটা আর লুকিয়ে পড়েনি। মোটা ব্রাশ রঙে চুবিয়ে পুরু করে আঁকা হয়েছে। আশ্চর্য, এবার থেকে সে কি বদলে যাবে? এবার থেকে তার মাথা থেকে কি শুস্ক হলুদের সৌন্দর্য মুছে যেতে থাকবে? মার্কেটের পিচ-চট বিছানো ছাদের দু-কিনারায় ধনুকটা থমকে আছে। ইঁদুর কবীরের পিছু ছাড়ে না। ছাদে বড় ইঁদুরের দল রঙ মুখে মেখে ছোটাছুটি করে সুড়ঙ্গের দিকে। ওরা সব জায়গায় গর্ত বানায়। রামধনুতেও। মুখ না ফিরিয়ে কবীর বলে, বর্ষা বিয়ে করবে আমায়?
— না মশাই, এতদিন তো এম্নি এম্নি ঘু্রছি আপনার পেছনে।
— যদি কালই করি।
— বাড়ির একমাত্র মেয়ে বলে কথা, অত হুটপাট করে হয় নাকি।
— তাহলে পরের সপ্তাহে কর।
— সাতদিনে কী এমন বদলাবে।
— আমরা আর একটু ম্যাচিওর হব।
— কিন্তু এখনও যে তোমাদের বাড়িতে আয়না এলনা।
— তাতে কী, আমাদের তো কিছু আটকায়নি। রামধনু দেখলাম, এবার হয়ত ফাঁড়া কেটে যাবে।
— তাহলে শীত আসুক, তারপর। আমার গুটিসুটি মেরে থাকতে খুব ভাল লাগে।
— আমি আবার শীতটা বুঝতে পারি না। কটা দিনের জন্য হুট করে এসে তীর্থে চলে যায়।
দুজনে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে নিজেদের দিকে না তাকিয়ে ফিসফিস করে কথা বলছিল। গাঢ় স্বরে, বেতার নাটকের মত। বর্ষা বলে, সবার ছোটবেলা থাকে, ফেলে আসা দিন নিয়ে আর থেকো না।
— তাহলে কী নিয়ে থাকব বর্ষা?
বর্ষা স্মিত হাসে, শুধু আমায় নিয়ে থাকো।

(৪)
এই দেখো, এই ছিল ওপরচালাক শহর আর এই হয়ে যাবে গেঁয়ো ভূত। এই ছিল সর্বনাশ, এবার পেরলাম শহরের মায়া। কর্পোরেশন পেরিয়ে পঞ্চাযেতে ঢোকার পথে ক্যানেলের ওপরের রেইনবো ব্রিজের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে কবীর নিজেকে বলে। প্রতিদিন বলে। অফিস থেকে ফেরার পথে অশরীরি আততায়ীর মত চাঁদের আলোয় মিশে। মার্কেটের মাথায় রামধনু দেখার আগে তক এই রেইনবো ব্রিজ ছিল তার প্রধান আশ্রয়। নিচের কালো জলে জেগে থাকা অক্সিজেন গাছের জটে বুদবুদ তোলে ছোট ছোট মাছ। বড় মাছ কোনও শাখা নদী থেকে বিপথে এসে লাফালাফি করে ছিপ নৌকো এলে। কলেজ থেকে ফেরার পথে প্রায়ই বর্ষার সঙ্গে দেখা হয়ে যায় এখানে। দুজনে দেখা করে বলাই ভাল। কিছু সময় দুটিতে কাঠের রঙীন রেলিংয়ে হেলান দিয়ে গল্প করে। পাড়ার লোক অবাক হয়ে ভাবে বিয়ের এত বছর পরও আলোআঁধারিতে মানুষের কি-ই বা বলার থাকে। পশ্চিমে অনেকটা দূরে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ফার্নেসের মত আকাশ আগুন করে ছেয়ে থাকে শহরের হাতছানি। বর্ষা বলে, মন্দ না,এ-ই আমাদের সুয়েজ ক্যানেল। একদিন এখান দিয়ে আমরা ইউরোপে ঢুকে পড়ব।— ইয়ার্কি মেরো না, এখান দিয়ে একসময় রীতিমত বোট চলত। চাইলে ভাসা যেত বঙ্গোপসাগরে। তারপরের রাস্তা তো সোজা। নিচে নেমে শ্রীলঙ্কার মাথা দিয়ে রাইট টার্ন নিয়ে আরবসাগর, নর্থ-ওয়েস্ট ধরে রেড-সি হয়ে ভূমধ্যসাগর —রুট ম্যাপ তো জলে আঁকা আছে, আবিস্কারের কিছু নেই, কবীরের চোখে গ্লোব ঘুরতে থাকে। বর্ষা তখন ব্যাগ থেকে বের করে পেয়ারা। বর্ষার এই এক বিটকেল নেশা। ভাল পেয়ারা দেখলেই ব্যাগ বোঝাই করে ফেলে।কবীর বলে,মিসেস পেয়ারাবাই। বাথরুম থেকে বুকে সায়া বেঁধে ঘরে এলে বা শাওয়ারের নিচে পিঠে সাবান ঘষতে বললে কবীর বলে, এ মা তুমি ন্যাটাপুটো, ফ্রকটা নেবে,জামাদুটো? বর্ষা গায়ে মাখে না, জানো একটা পেয়ারা চারটে আপেলের সমান।— কিন্তু পেয়ারার যে ইজ্জত নেই। — সে ইজ্জত তো আমাদের জায়গারও নেই। সেসব পিনকোডে থাকে। বড় জামরুল গাছের ফাঁকে পঞ্চায়েত প্রধানের গ্রিলে মোড়া বাড়ির দিকে তাকিয়ে বলে বর্ষা।

আধো অন্ধকার এই জায়গাটা সময় পেলেই তারিয়ে তারিয়ে খায় দুটিতে। পেট না ভরা অবধি নড়ে না। রিটায়ারমেন্টের পর বাবা আত্মীয়-সহকর্মীদের বলেছিল বাড়ি খুঁজতে। ছিল আগের মতই অভিমানে অনড় শর্তগুলো। অর্থাৎ,বাড়ি যেন রেলের ত্রিসীমানায় না হয়, যেন ট্রেনের হুইসলও না শোনা যায়। বেশ গাছপালা থাকতে হবে। ধূলোধোঁয়ার উপদ্রব কম হলেই মঙ্গল। নদীর ধারে হলে চমৎকার। বাড়িটা হোক ভিড় থেকে দূরে, বসতির একদম শেষে। ক্রিমিনালবর্জিত সংস্কৃতিমনস্ক মধ্যবিত্ত মানুষের জায়গা হোক। অ্যাম্বুলেন্স ঢোকার জায়গাও চাই। আরও কী কী যেন ছিল ফর্দতে। মাসতুতো দাদা অবিনাশ উঠতি দালাল। বলেছিল,আপনি নিজের মানুষ, আপনার থেকে তো লাভ করতে পারি না। তবে আপনাকেও একটু মানিয়েগুছিয়ে নিতে হবে। সিক্সটি পার্সেন্ট মিলবে, বাকি ফর্টি পার্সেন্ট নিয়ে রিজিড থাকলে চলবে না।
— কোন ফর্টি পার্সেন্ট?
— এই ধরুন নদীর জায়গায় খাল হল। কলকারখানার সঙ্গে মানুষের রোজগার জড়িয়ে, ধুলোধোঁয়ার ওপর আমার হাত নেই, ব্যাঙ্কের লকারেও তো ধুলো জমে। আজকাল কে ক্রিমিনাল বোঝার উপায় নেই, সংস্কৃতিবানরাও হতে পারে।—এইরকম সামান্য কয়েকটা কমপ্রোমাইজ করতে হবে। নয়তো আপনার বাজেটে আসবে না। পাক্কা সেলসম্যানের মত বুঝিয়েছিল অবিনাশ।
কবীর জানে অবিনাশ ভালই কামাবে। চেনা লোক বেশি মারে। শালীরা কিছু কিনতে দিলেও শালা কমিশন কেটে রাখে। বছরে দু-বার ব্যাঙ্কক যায় ম্যাসাজ করাতে। আরও অনেক কিছু করে, সেগুলো বলে না। তবে, পারিবারিক আড্ডায় ছোটদের সামনেও গুটকা খাওয়া দাঁত বের করে বলে, থাইল্যান্ড ইজ মাইল্যান্ড। যেমন মাই তেমন থাই। এই ছোটরা এসব শুনো না,বড় হলে সব পাবে। কবীরের হিসেব বলে দালাল দাদা বাবার টাকায় দুটো ট্রিপ আরামসে মারবে মাই-থাই ল্যাল্ডে।
— সে ঠিক আছে। তবে ট্রেনের ব্যাপারটা যেন মাথায় থাকে। ভাড়াবাড়িতে পেনশনের টাকা গুনছি, একটু তাড়াতাড়ি করো বাপু।
— ও নিয়ে ভাববেন না, রেলমন্ত্রককে আপনার কনস্টিটিউয়েন্সিতে নাক গলাতে দেব না।

অবিনাশ মোটামুটি কথা রেখেছিল। কলোনির শেষ বিন্দুতে, বিচ্ছিন্ন চমৎকার একটা দোতলা বাড়ি জুটিয়েছিল। মাত্র বারশ স্কোয়ার ফুটের কভার্ড এরিয়ার পেছনে অনেক ভিড়, সামনে নিশ্চিত একাকীত্ব। কলোনির তিনশ সাতাত্তরটা বাড়ি পশ্চিমে তাকিয়ে, ইনি পেছন ফিরে পূর্বদিকে একলা । নীড় ছোট ক্ষতি নেই মার্কা। আকাশ সেখানে সত্যিই বড়। বাড়িটা ছাড়া সব কিছুই বড়। পাঁচিল ঘেরা জমি ছিল অনেকটা। পঁচিশ হাত বাড়িতে ওভাল শেপের তেরো হাতের একটা ঝুল বারান্দা ছিল। ফলন্ত দুটো আন্দামানী নারকেল গাছ ছাড়া বোনাস হিসেবে পাওয়া গিয়েছিল পেঁপে-সুপারির লাইন, লাউয়ের মাচা। মাটিতে যত্রতত্র খোঁচা মেরে জেগে ছিল ঘৃতকুমারীর ঝাড়। মা বলে, আগের লোকটা বাঙাল, ঐ জঙ্গল পেরিয়ে এসেছিল। যেটাকে জঙ্গল বলে দেখিয়েছিল মা সেটা নির্দ্বিধায় বেড়ে ছড়িয়ে থাকা অনন্ত ঘাসের জমি। কী বলা যায় একে? স্তেপভূমি নাকি সাভানার চরাচর? শুখা মরসুমে গ্রেট মাইগ্রেশন শুরু হতে পারে, মাসাই নদীর দিকে ছুটে যেতে পারে লাখো ওয়াইল্ড বিস্ট। বাবা অবিনাশের পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলে, বাঃ, বেড়ে হয়েছে। মা বলে, কয়েকদিন না কাটলে গলতিগুলো বোঝা যাবে না।— ছাড়ো তো, অত পিটিরপিটির করতে নেই, আমাদের বছরগুলো কেটে গেলেই হল। এমন বারান্দা পাবে কোথায়, পোকামাকড়, সাপখোপে ভরা এত সুন্দর মাঠ কোথায় পাবে। কত পাখি আসবে ভাবো। সত্যিই পছন্দ হওয়ার মত সব কিছু। বিশেষত বারান্দাটা। বড় জংশনের কেবিনের মত মেল-এক্সপ্রেস নিয়ন্ত্রণ করার ভঙ্গী ছিল তার মধ্যে। তার সামনের মাঠের শেষে পৃথিবী নেই। পৃথিবীর শেষ স্থলভূমি। আর এগোলে মাধ্যাকর্ষণের কার্নিশ মটকে মহাশূন্যে পিছলে যাবে।

রেলের দুনিয়া থেকে দূরে যেতে চাইলেও হতচ্ছাড়া ট্রেনগুলো বাবাকে ছাড়ল না। মাকেও না। তলে তলে সুদূরপ্রসারী কোনও ষড়যন্ত্র চলছিল। বারান্দায় রকিং চেয়ারে দুলে দুলে বাবা বলত, কানের ভেতর দিয়ে সারাক্ষণ গাড়ি ছুটে চলছে। ড্রাইভারটা সিটি বাজিয়েই চলেছে। সিগন্যাল চাইছে, এইবার স্টেশন ছাড়বে বোধহয়।
— আমারটা সবে ঢুকল প্ল্যাটফর্মে, মা জানায়।
— বুঝলে মৃদুলা, বহুদিন ধরে, এই বাড়িতে পা দেওয়ার প্রথমদিন থেকে মনে হচ্ছে কিছু একটা আমাদের জন্য পেকে উঠছে। কেউ আমাদের প্ল্যান করে টেনে এনেছে এখানে। কিছু যেন আমাদের অপেক্ষায় বাসা বাঁধছে।
— আশ্চর্য, আমারও তেমন লাগছে। আগে যেন কখনও ছিলাম এখানে। পৃথিবীর শেষ সীমানার দিকে তাকিয়ে থাকে মা।
— আলবাৎ ছিলাম। আগে ছিলাম, পরেও ছিলাম।
— দূর, পরে আবার থাকা যায় নাকি?
— যায়রে বাবা যায়।
— তা যায় বটে। কতদিন আয়নার ভেতরে রইলাম, জিনিসটা না দেখেই কত জবাকুসুম, কত বসন্তমালতী মাখলাম।
— তোমারটা ছেড়েছে?
গাইয়েদের মত কানে আঙুল দিয়ে মা উত্তর দেয়, এই সবে প্ল্যাটফর্মে ঢুকল।
— আমারটা লাইন চেঞ্জ করছে, এবার ঢুকবে।
— এবার একটা আয়না নিয়েই এসো, দেওয়ালজোড়া বিশাল একটা।
— দেখি।
— আর দেখো না, দেখার বয়স আমাদের নেই। এখনও না হলে মরার আগে হবে না। বংশধররা শাপ দেবে। ফাঁড়া তো কেটে গেছে।
— কিসের ফাঁড়া?
— সে জানি না। কিছু একটা ছিল নিশ্চই, নাহলে মানলাম কেন।
— আমারও মনে হচ্ছে ফাঁড়া কেটেছে, এবার সত্যিকারের কিছু হবে।
— এতদিনও সব সত্যি হয়েছে। তার সঙ্গে মিল না থাকলে বুঝতে পারব না যে।

কিছুদিন পর বোঝা গেল বুঝতে অসুবিধা হবে না, যা গেছিল তা ফিরে আসছে। লন্ড্রি থেকে ডাই করিয়ে একটু রঙীন হয়ে। খবর এল বারান্দার সামনের সেরঙ্গেটি ও মাসাইমারার গ্রেট মাইগ্রেশন বন্ধ হতে যাচ্ছে, রেল জমি অধিগ্রহণ করেছে। হবে বড় জংশন, রীতিমত ওরিজিনেটিং স্টেশন, দেশের নানাদিকে দূরপাল্লার গাড়ি ছাড়বে এখান থেকে। বারান্দা থেকে আর নির্জনতা নয়, এবার দেখো নিরন্তর ব্যস্ততা। বাবা-মা-র বয়স কমতে থাকল। আবার চনমনে হয়ে উঠল বাবা-মা। ঘাসের জলাভূমি সাফ করে বসল মজুরদের তাঁবু, ভারী গাড়ি, সুপারলোডার, টেলিস্কোপিক হ্যান্ডলার, নানা ধরণের জ্যাক আর ক্রেনে ভরে উঠল জায়গাটা। দুশো মিটার দূরে বাইরে থেকে আসা মাটিতে দিগন্তরেখায় আঁকা হল হাতির পিঠের মত পাহাড়। কেউ বলেনি, তবু বাবা প্রতিদিন সুপারভাইজারদের সঙ্গে কাজের তদ্বির করে যাচ্ছিল। স্টেশন চালু না হলে মরবে না জেনেও ব্যস্ততার অবধি ছিল না। সরকার না জানলেও বাবা কাজ করে যাচ্ছিল। অনেকদিনের রোপন করা মায়াবীজ থেকে চারা বেরিয়েছে যেন। এবার শুশ্রুষার পালা। এখানে আসার পর বেশ কয়েকটা বছর পেরিয়ে গেছে ততদিনে। এতদিন এমন কিছুরই অপেক্ষায় ছিল বাবা। এরপর ট্রেন নিয়ে আবার রওনা দেবে। তর সয় না তার। এক রাতে অফিস থেকে ফিরে কবীর বারান্দায় গিয়ে দেখে বাবা সোডিয়াম লাইটের টাওয়ারগুলোর দিকে উদাসভাবে তাকিয়ে আছে। কবীর চেয়ারে গা এলিয়ে বলে, তাহলে অবিনাশদা তোমাকে ঠকাল, রেল তোমার এলাকায় আবার নাক গলাল।
— তা হবে কেন, ছেলেটাকে দূরদর্শী বলতে হবে। কতদিন আগে ও স্টেশনের খবর পেয়েছিল ভাব। ওর স্পেশাল পাওয়ার আছে।
— তার মানে তোমাদের মধ্যে কিছু একটা ঘটছিল এই জন্য? তুমিই ঘটালে দেখছি।
বাবা লজ্জা পায়— মনের কথা আর মুখের কথা কি এক হয় বাবা? যে যা চায়, বলতে পারে সবসময়? তুই খুশি হসনি?
কবীর থমকে যায়। সে খুশি হয়েছিল। সিনেমার পুরনো রিলে দেখতে পায় আবার টিফিনকৌটো নিয়ে সে ছুটছে রেলিংয়ের ফাঁক গলে।বাবা তিলের খাজা নিয়ে ঝুঁকে আছে ইঞ্জিন থেকে, রেলিংয়ে ধারে ইঁদুরের খাঁচা হাতে দাঁড়িয়ে আছে মা, দেখে মরা নদীর বুকে শামিয়ানা খাটিয়ে তারা পোলাও-মাংস খুলে বসেছে। তার চোখ কড়কড় করে।— দেখো এবার আর কত বছর লাগে, তার গলা ধরা-ধরা লাগে।
— ও ঠিক হয়ে যাবে, আমাদের সময়ের মত ঢিলেঢালা নেই রেল।
— তবু না আঁচালে বিশ্বাস নেই।
— চিন্তা করিস না, আমি যখন আছি ঠিক হয়ে যাবে।
— আমাকে আবার রোজ টিফিন নিয়ে যেতে হবে বলছ?
— অত সুখ ঠাকুর কি দেবে? কিছুক্ষণ থেমে বাবা বলে, কবীর কফি খাবি?
— এত রাতে?
— এ আর এমন কি রাত। পরীক্ষার সময় তো কত রাত জেগে পড়তি, কম কফি বানিয়েছি? দুজনে কফির মগে চুমুক দিতে দিতে গল্প করব একটু। আমার তো এমনিতেই ঘুম আসে না। তোর মা নাক ডাকছে।
— আমার বৌ-ও মাঝ ঘুমে।
তারপর দুজনে মিলে কফি খায়। একবারের পর আবার। আর ভাবে কম্পিউটারাইজড টিকিট কাউন্টার কোথায় হবে, ওভারব্রিজ দুটো কতটা দূরে থাকবে, অ্যাডমিনেসট্রেটিভ বিল্ডিংটা কোথায় হলে সুবিধা হবে। দুটো সাবওয়েও চাই। স্টেশনের কিছু আগে উঁচু বাঁধের পেট ফুঁড়ে বেরনো খালটার সংস্কার করা দরকার। তারপর গন্ডোলা ভাসাতে হবে ট্যুরিস্ট টানতে। কিনারে সুন্দর অ্যামিউজমেন্ট পার্ক করলে মন্দ হয় না। প্ল্যাটফর্মের ওপার থেকে সূর্য উঠে যেতে বাবা বলে, অদ্ভুত ব্যাপার, কানের ভেতর দিয়ে যে ট্রেনগুলো ছুটছিল সেগুলো আর নেই। ভোরের পাখির ডাক আবার ভেসে আসছে। কলোনীর মোরগদেরও শোনা যাচ্ছে— বুঝলি, আমার কানটা সাফ হয়ে গেছে। ইএনটির কাছে যেতে হবে না আর।
— বাঃ, সুখবর, এবার মায়েরটা সারলেই বাঁচি।
— ওরটাও চলে গেছে।
— কী করে জানলে?
— এবার আসল ট্রেন এসে যাচ্ছে, ওগুলোর আর কাজ কী, আধাখ্যাঁচড়া প্ল্যাটফর্মের দিকে হাত উঁচিয়ে বাবা বলে, এবার আমাদের মুক্তি।
— তোমরা সত্যিই কি মুক্তি চেয়েছিলে?
— তা চাইনি বটে। সরকার কিন্তু আমাদের ঠকায়নি, আমাদের মনে রেখেছিল প্রমাণ হয়ে তো গেল। একটু দেরী হয়ে গেছে এই যা। অভিমান করে কী হবে। তার তর্জনী তখনও তোলা ছিল নেতাজির মত, তোমরা আমাকে স্বাধীনতা দাও, আমি তোমাদের ট্রেন দেব ভঙ্গীতে।

সেই দিকে হাত তুলে কবীর বলে,একটু দেরী হলেও স্টেশনটা শেষপর্যন্ত হয়েই গেল।সাঁকোর রেলিংয়ে ঠেস দিয়ে দুজনে মুগ্ধ হয় প্রতিদিন। আগে উজ্বল হয়ে ছিল পশ্চিম, এবার পূবের আকাশও আলোকিত। মালভূমির পাহাড়ের বাঁধ জেগে আছে অই দিকে। একমাত্র তাদের বাড়িটা এর মালিক, আর সবাই পেছন ফিরে পুড়ছে ঈর্ষায়। কল্পনামত টিকিট কাউন্টার আর সাবওয়ে হয়েছে বারান্দার সামনে। সেখান থেকে দেখা যায় প্ল্যাটফর্মের মানুষজন। নীল টিনের চাল মাথায় চওড়া সিঁড়িও বাড়ির দিকে মুখ করে থাকে। কবীর বলে,জানো বর্ষা, আমাদের বাড়ি ছোটবেলায় ছিল স্টেশনের এতটাই পাশে, ঠিক এতটাই। প্ল্যাটফর্ম ছাড়িয়ে একটু এগিয়ে পাহাড়টা উত্তরে বাঁক নিয়েছে আচমকা। মনে হয় টানেলের ভেতর হারিয়ে গেছে। ওপারে এলিয়ে আছে ঘাসের জঙ্গল। বারান্দা থেকে ঝুঁকেও দেখা যায় না। বর্ষা বলে, উপত্যকা থেকে দেখা রাতের হিল স্টেশন মনে হচ্ছে। ওয়েল্ডারদের স্টিক থেকে ফুলঝুরির আলো ঠিকরে পড়ছিল ধূমকেতু হয়ে। প্ল্যাটফর্মের আলো খালের ঢেউয়ে ভেসে এগিয়ে আসছিল তাদের দিকে। পা ভিজে যায় আলোয়।— আঃ, কী সুন্দর হয়ে পড়েছে জায়গাটা, কী ছিল আর কী হল, মানুষ পারেও বটে, দুজনে এক সঙ্গে বলে ওঠে। বিহ্বল কবীর বলে, বাড়ি চলো, সব তো আমাদের, ফ্যামিলি প্রপার্টি, আমাদেরই থাকবে। বাবা লিখে দিয়েছে।


(৫)
থম মারা সংক্ষিপ্ত নীরবতার পর বেলা দেড়টা নাগাদ আচমকা মেঘে ছেয়ে গেল পেতলের নেমপ্লেট সাঁটা বাড়িগুলো। ক্ষয়ে যাওয়া গাড়ি বারান্দাগুলো থেকে অদ্ভূত তীব্র নোনা গন্ধ ভেসে আসছিল। বিপজ্জনক বাড়ি-র নোটিশের নিচের কাউন্টার থেকে মিক্সড ফ্রুট জুস হাতে কবীর বোঝার চেষ্টা করছিল ঝড় কোনদিক থেকে আসবে, জলের ছাঁটই বা কোনদিকে ছুটবে। আগাম পালানোর বা লুকোনোর রাস্তা জানা ভাল। মনসুন শেষ হওয়ার আগে কিছু জরুরি স্মৃতি রেখে যেতে চায়। জোরদার কিছু হবে। কয়েকটা বাড়ি না ধসিয়ে কি সে যাবে? কানের পাশে ফু দেওয়া হাসিতে ফিরে দেখল সায়ন।— তোমার কথাই ভাবতে যাচ্ছিলাম।— জানি, শয়তানের কথা ভাবলেই সে হাজির হয়, সায়ন এক গাল হাসে, কিন্তু শরীরেই যদি রস না থাকে ফ্রুট জুস খেয়ে কী হবে। রসেবসে থাকুন, এত করে বলি, একবারও শুনলেন না। কবীর হেসে ফিসফিস করে, একটু চুপ করে লক্ষ্য করো।— কী আর আছে দেখার, রোজই তো এই বালের রাধাবল্লভী আর বাটার টোস্টের নরক দেখি। ভাতের হোটেলের ডবকা বউগলোই যা অ্যাট্রাকটিভ।
কবীর বলে, আহা,ওয়েদারের কথা বলছি। শুধু হাওয়ার লাট খাওয়া দেখ।
— উফ, পারেনও বটে আপনি। এমন একটা ধাসু আবগারি ওয়েদার ঈশ্বর আপনাকে মেল করল, আর আপনি কিনা হাবার মত হাওয়াবাতাস দেখে টাইমপাস করছেন। থিঙ্ক বিগ, ইমাজিন আনথিঙ্কেবেল। এই মনসুনে তো আমার মন সুনসুন করছে। মন আমার কেমন কেমন করে, আহা মন আমার কেমন কেমন করে। রসিকতার তৃপ্তিতে বিজয়ীর ভঙ্গীতে মুসুম্বী জুস অর্ডার দেয় সায়ন, নাঃ,ওয়াদারটা খাসা, এটা ইউটিলাইজ না করলে ঠাকুর পেছনে হুড়কো দিয়ে দেবে।আজ আর কাজ করব না,অ্যাসেসিদের গুয়া মেরেছি।তা হঠাৎ আমাদের পাড়ায় কী মনে করে।
— অন্য কাজে এসেছিলাম, ভাবলাম পুরনো দিনের কথা ভেবে একটু ঘুরে যাই। নিত্যর দোকানে একটা চিকেন স্টু খেয়ে তোমাকে ফোন করব ভাবছিলাম।
— করলেই পারতেন। আমি অকাজের বান্দা, যখন খুশি বেরতে পারি।
কবীর জানে সায়ন বেশ কাজের ছেলে। আয়করের অফিসার হয়েও ঘুষ নেয় না। মানে, সেরকমটাই মনে হয়। কিছু সুয়োগলসুবিধা নেয়, সেগুলো চাকরির বাইপ্রোডাক্ট। আজকাল ওগুলো কেউ ধরে না। সরকারের রেভেনিউ লস হয় এমন কিছু করে না। একটু বেশি আমুদে তাই লোকে ভুল বোঝে। সে আর কী করার, মানুষের কাজই তো ভুল বোঝা। সে জানে কোনও ধারণা স্থায়ী নয়, মানুষ চমকে দিতে ওস্তাদ। সময়ের হেরফেরে শয়তানকে ঈশ্বর ও ঈশ্বরকে গাধা হতে সে দেখেছে। কোথায় আলাপ হয়েছিল সায়নের সঙ্গে? কবীরের মনে পড়ে সেহবাগের কভারের ওপর দিয়ে ওভারবাউন্ডারি মারার দৃশ্য। ভিআইপি গ্যালারিতে লাফিয়ে লাফিয়ে হাততালি দিচ্ছিল ছোকরা। পাশের সিটের কবীরের গায়েও দু-একটা চাপড় মেরেছে উচ্ছ্বাসে।— দাদা কি ব্রিটিশদের শেষ বংশধর? অমন নেভিল কার্ডাস হয়ে বসে থাকবেন নাতো। খেলা নিজের চোখে দেখুন, কলোনিয়াল হ্যাং-আপস ছাড়ুন। কিছু বলতে গিয়েও কবীর ভাবে কথাটা অস্বীকার করা যাবে না। ক্রিকেটটা ব্রিটিশদের আদবকায়দা মেনে দেখছে কেন। তারপর সে ভেতরের ঘাপটি মারা ইংরেজকে ছুঁড়ে ফেলেছিল উইজডেনের ম্যানুয়ালসমেত। লাঞ্চ-বক্স এগিয়ে বলেছিল, নিন,আমার নাম…..। কথা শেষ করতে দেয়নি ছেলেটা, জানি, ডক্টর কবীর মিত্র, প্রাইভেট কলেজের প্রিন্সিপাল, রাত সাড়ে সাতটা থেকে আটটা বউয়ের সঙ্গে কাঠের রেইনবো ব্রিজে হেলান দিয়ে সাত-পাঁচ ভাবেন, আহা ফ্যাবুলাস স্কোয়ার কাট, হাত ঠেকাতে হবে না বাবা, আরে অমন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন কেন, এনজয় করুন, না,বীরুটা টেস্ট ক্রিকেট চেঞ্জ করে দিল, ওয়ানস ইন এ জেনারেশন ক্রিকেটার গুরু। তারপর হাত বাড়ায় সে, আমার নাম সায়ন, আমারও ম্যাথস ছিল।
কবীর সেহবাগকে হাততালি না দিয়ে সায়নকে দেয়—কিন্তু কী করে?
— অবাক হবেন না,আমিও মিত্র, সায়ন মিত্র, ইনকাম ট্যাক্সে আছি।
— তাতে চেনা যায় নাকি?
— রকেট সায়েন্স নয়, মিস্ট্রিও নেই, কাকতালীয় কেলেঙ্কারি। গত জন্মের ফল হবে হয়ত।
— বাকিটা?
— কিছুই না, আমি আপনার পাড়ায় থাকি। ১৮২ নম্বর বাড়ি। আপনি চোখ তুলে দেখেননি কখনও। আমি আবার যে পোছে না তার খবরাখবর নিই। ব্যাড হ্যাবিট, অ্যাসেস করতে করতে মানুষের পার্সোনাল লাইফে ঢুকে পড়ার অভ্যেস হয়েছে। বেরিয়ে পালাবেন না যেন, একসঙ্গে ফিরব।
পালানোর উপায় ছিল না। দুজনে বসেছিল ভিড় একটা বারে। আনাড়ির মত ফেনা ভর্তি বীয়ার খেয়েছিল কবীর। হুইস্কি তার বিস্বাদ লাগে। তাছাড়া নেশা করতে ভালও লাগে না। এমনিতেই সে ঘোরে থাকে। সায়ন পঞ্চম পেগ শেষ করে বলে বলে, আপনাকে অনেক কিছু শেখাতে হবে, মানুষ করতে হবে, একটু বুরবাক আছেন। বহুত ব্যাকলগ আছে। মানুষ না হওয়া ছেলের চিন্তিত বাবার মত দেখায় সায়নকে।
— থাক না, এতেই তো চলছে, এগিয়ে কোথায় যাব, কবীর হেসেছিল। গ্যালারিতে প্রিন্সিপাল পরিচয়টা শুনে তার একটু মন খারাপ হয়েছিল।অস্থিরতায় ভুলভাল সিদ্ধান্তে পড়াশুনা থেকে কত দূরেই না সরে গেছে সে।অ্যাডমিসেট্রেশন আর ম্যান ম্যানেজমেন্ট নিয়ে দিন কাটছে। হিউম্যান রিসোর্সের নামে ম্যানেজমেন্টের দালালি করে ছেলেদের সর্বনাশ করা, বিক্ষোভ সামলানোর জন্য অঙ্ক ভালবেসে ছিল নাকি? সত্যিই যদি পড়াতে পারত স্বপ্নালু ছেলেদের, যদি সে ঘোরের মধ্যে নতুন থিয়োরির বিকাশের সঙ্গে থাকতে পারত কী ভালই না হত। মাঝে মাঝে আক্ষেপের পুরনো ক্ষত ফেটে পূঁজ বেরিয়ে আসে, তারপর আবার সে ভুলে যায়। আর কোনও বিকল্পও নেই। সায়ন কিছু বুঝতে পারেনি তো, সংকোচে অন্য কথা শুরু করে কবীর।
কথা হয়েছিল মূলত ক্রিকেটের স্ট্যাটিসটিক্স নিয়ে। ব্ল্যাক-হোয়াইট জমানার ঝোলা প্যান্ট থেকে এখনকার কাল্পনিক একাদশ পর্যন্ত। ফেরার সময় হাই রোডে ট্যাক্সি থেকে নেমে যায় সায়ন।—পাড়ায় আমরা কেউ কাউকে চিনি না, আপনার নিঃসঙ্গতা আগের মতই থাকুক। কবীর খুশি হয়। মনে মনে সে-ও এমন কিছুই চাইছিল।
তারপর গত পাঁচ বছর দুজনে এটা মেনটেন করে চলেছে। সায়ন কবীরকে মানুষ করার চেষ্টায় ক্ষান্তি দেয়নি। ন্যাড়া মাথায় দু-শিংওয়ালা শয়তান হয়ে শহরের নিত্যনতুন চকচকে পতনের গাথা জানায়।— বুঝলেন আমরা বাইরে থেকে এসে জুড়ে বসেছি, এ শালাদের দেখিয়ে দিতে হবে তোরা বাল। ঘোড়ায় চড়ে কঙ্কার করে নেব তোদের সংসার।
কবীর বলে দেখানোর কিছু নেই, সংসার আমাদেরও। তুমি ইনফিরিয়রিটি কমপ্লেক্স ছাড়ো।
সায়ন কথা ঘোরায়, শুনুন বস, আজ একটা কেলো হয়েছে। আমার এক কলিগ বিদেশ থেকে ব্যাগে করে একটা মেয়ে নিয়ে এসেছে।
— ব্যাগে মেয়ে? কী যে বলো।
— আরে সিনথেটিক। তুলোর মত হালকা, ফোলালে পুরো পাঁচ দুই। সব ওরিজিনালের মত। এমনকি সিক্রিয়েশনও হয়। ট্যুরে নিয়ে যায় সঙ্গে,তারপর ব্যাগ খুললেই রাতভর স্ফূর্তি। ভাল পারলে ভাল, না দাঁড়ালেও লজ্জা নেই। অপমান করবে কে। বললাম হোটেলকে চিটিং করা হচ্ছে। সিঙ্গল বেডের ভাড়ায় ডাবল বেডের মস্তি অন্যায়। ব্যাটা বলে মৌজা হি মৌজা।
মস্তি শব্দটায় কান আটকায় কবীরের। সেই কবেকার ভাল লাগা কথা। চোখের সামনে দুলে ওঠে শূন্য মাঠের মধ্যে মেলার শামিয়ানা। তাঁবুর গায়ে ক্লাউনদের ছবির মাঝে লে্খা ছিল মস্তি। সায়নের মুখ আয়নাঘরে বেঁকেচুরে যেতে থাকে।
— ঘাবড়ে চিৎ হয়ে গেলেন তো।দুনিয়াতে কত কী ঘটছে দিসেবনিকেশ নেই। মানুষ যত ওপরে উঠছে তত পাতালে ঢুকছে। আমার আবার পাতালটাই পছন্দ। হাতের কাছে আছে, খুঁড়ে ঢুকে পড়লেই হল। কতদিন সাধছি, চলুন না একদিন আমার সঙ্গে। গিয়েই দেখুন না ক্যারেকটার টসকায় কিনা।
বোকার মত কবীর অস্ফূটে বলে, কোথায়?
— এত ন্যাকা বনো না গুরু।
কবীর লজ্জা পায়। সায়ন সেদিন লুজ ফুল তোলা কটন শার্ট পরেছিল। ট্যান কালারের ছুঁচোলো বুটে দেখাচ্ছিল সুন্দর।— আপনার জন্য কত স্যাক্রিফাইস করি জানেন। কত প্রোগ্রাম মিস করি বলে বোঝাতে পারব না। একসঙ্গে গিরিজাদেবীর গান আর রোশনকুমারীর নাচ দেখেছেন কখনও? কবীরকে গভীর ষড়যন্ত্রের ইশারা দেয় সে।
— না। এমন আবার হয় নাকি? তুমি সময় গুলিয়ে ফেলছো। টাইমমেশিনেও হয় না।
— হয় দাদা হয়, উহ ভি ইন ক্রিমসন রেড।
— আচ্ছা সে না হয় হবে একদিন।
ঐ একদিনের জন্য সায়ন পেছনে লেগে আছে। কবীরের নথ সে ভাঙবেই। এক সন্ধ্যেয় ফোন করে দেখা করে বলল, ফোন করতাম না, তবে আজ যা ঘটল না জানালে পেট ফুলছিল।
— প্রমোশান?
— না মশাই, না। একটা বাড়িতে গেছিলাম রেইডে। সব ফোন বন্ধ করে সবাইকে এক ঘরে আটকে সার্চ চলছিল। বাড়ির বড় মেয়ের ঘরে আলমারি থেকে বেরলো এক বাক্স পেনিস।কত ভ্যারাইটির। ভাইব্রেটার লাগানো, নন টক্সিক মেটিরিয়ালের, স্পাইরাল, স্ট্রেট— আরও কত ব্যাটারিচালিত সেক্স টয়। একগাদা কালারফুল বাঁড়া। এক ছাগল ইনসপেক্টার দু-হাতে দুটো নিয়ে বাবা-মাকে বলে এগুলো কী। তারা লজ্জায় মুখ তুলতে পারে না। ভাগ্যিস, ইউজ করে দেখান বলেনি। বুঝলেন ওগুলোকে ডিলডো বলে। আমিও জানতাম না। তারপর থেকে গাইছি, ডিলডো পাগল হ্যায়।

এরকম কিছু না কিছু দেখা হলেই ঝুলি থেকে বের করে সায়ন। না হলে পেট ফুলে ওঠে। কিন্তু তাকে বলে কেন। সাড়া না পেয়েও তাকে খোঁজে কেন। এতটাই নিঃসঙ্গ নাকি ছেলেটা।‌ ইমেজ মেরামত করতে দেশের লেটেস্ট খবরাখবর নিয়েও আলোচনা করে। মেইন স্ট্রিম মিডিয়া সরকারের দালাল হয়ে পড়েছে, গোটা দেশ থেকে নিউজ হারিয়ে ওয়ান পার্টি ওয়ান আইডিয়া হয়ে পড়ায় কী ক্ষতিটাই না হচ্ছে জানায়। দেশের জন্য চিন্তা ব্যক্ত করে সায়ন বোঝাতে চায় সমাজের প্রতি কর্তব্যবোধ ভুলে যায়নি, সবদিকে নজর আছে।—এখন ভরসা শুধু ওয়েব ম্যাগাজিনগুলো, যেটুকু কাজ ওরাই করছে।পূণ্যপ্রসূন,অভি ার,রবিসকুমারদের প্রাইমটাইমে কী দেখাল তা নিয়েও কথা চলে। বলে,মেইনস্ট্রিম মিডিয়া সরকারের দালালি করে দেশকে মানুষের পুটকি জ্যাম করে দিচ্ছে, যেটুকু সাংবাদিকতা বেঁচে আছে নিউজ ওয়েবসাইটগুলোয়। কী চমৎকার কাজ করছে, যেটুকু লড়াই ওরাই করছে বুঝলেন। সব শেষে ফিরে আসে একটাই কথা, তাহলে এবার একদিন যাওয়া যাক।
— আমাকে তোমার এত বোকা মনে হয়? বাইজি কালচার খোদ লক্ষ্ণৌতেই নেই, এখানে কিনা তুমি ক্ল্যাসিকাল মুজরো দেখাবে। সত্যি হলেও খুশি হতাম না। ভাল শিল্পীরা এমন পেশায় থাকবে কেন। বিনোদিনী-আঙুরবালাদের যুগ নেই আর।
—আহা, থাকবে কেন, ও তো লোভ দেখানোর জন্য কথার কথা। থাকলে তো সোসাইটি ভোগে যেত। তবে,গরীবের সংসারে পেট ভরে মাল খেলে সময়টা মাঝে মাঝে ফিরেও আসে। সবাইকে মোহময়ী লাগে। আমি গাঁয়ের ছেলে, ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দেখি, হুমড়ি খেয়ে চেটেপুটে খাই। খারাপ জিনিসও তেমন খারাপ নয়।
—খারাপ তো বলিনি। সব কাজে সবার নাক গলানোর দরকার কী।
— নাক কেন, অন্য কিছু গলাবেন, কুতকুতে বেড়ালের চোখে তাকায় সায়ন, তাহলে ফাইনাল তো?
— আমি যে সেমিফাইনালেই উঠতে পারিনা। কবীর এড়িয়ে যায়।— অজিদের সঙ্গে টেস্ট সিরিজ কবে শুরু হচ্ছে? ওয়ান ডে দেখব না, টেস্টগুলো কিন্তু ছাড়ছি না।
— সে ঠিক আছে। টিকিট আমার, খাবার আপনার। ক্লাবহাউসে বসেই দেখব। ও হ্যাঁ,আপনাকে কনগ্র্যাচুলেট করা হয়নি, রোজ ভুলে যাই।
— আমার আবার কি হল?
— আরে ভগবান আপনাদের বাড়িতে সোনার ঘড়া নিয়ে ছপ্পর ফেঁড়ে ঢুকে পড়েছে তো। স্টেশনের খবর জানেন না?
— ও তাই বলো।
— তাই বলো মানে, গোটা পাড়া হিংসেয় জ্বলছে। কটাই বাড়ির দাম রকেট হয়ে ছুটবে এবার। কপাল বটে আপনার। কয়লা হিরে হয়ে গেল। আপনাদের জন্যই স্টেশনটা হচ্ছে যে। এই খুশিতে একদিন চলুন।
কবীর ঘাড় নাড়ে, জবাব দেয় না। সত্যিই তো তাদের জন্য হচ্ছে স্টেশন। বাড়ির দাম নিয়ে ভাবে কে, তার কত গুণ ফিরে আসছে ছাগলটা বুঝবে না।

এভাবেই চলছে। বারে যাওয়া হয় বারেবারে। তার বেশি কিছু না। প্রায় বছর পনেরোর ছোট সায়ন কেন এত অনুরক্ত তার প্রতি? ছেলেটারও ম্যাথস ছিল এবং তার মতই সে অঙ্কের থেকে দূরে সরে গেছে এই জন্য? কবীর জানে না। বোঝে যতটা খারাপ দেখায় সায়ন তারচেয়ে ভাল। প্রতি মাসে মাইনের কিছু টাকা কিছু এনজিওকে দেয়, থ্যালাসেমিয়া রুগীদের খবর পেলে অফিস কামাই করে দল বেঁধে রক্ত দিতে যায়। দূর্যোগের সময় ছুটি নিয়ে ত্রাণশিবিরে পড়ে থাকে। কিছু অন্ধকার সবার থাকে, সায়নেরও আছে। কবীর কেন পছন্দ করে সায়নকে সে নিজে বোঝে না। নিজের বয়সীদের চেয়ে তারুণ্য বেসামাল হলেও ভাল, এটা একটা কারণ। তার বাইরে আরও কিছু আছে হয়ত। তা বোঝা, যায়নি। সব কিছু বোঝার দরকারই বা কী। লাভ নেই।

বাতাসের বেগ বাড়ছিল। মাঝ রাস্তায় শাড়ির আঁচল উড়ে যেতে থাকে বিসদৃশভাবে, ছাতাগুলো নিরাপত্তাহীনতায় ঠুনকো শিক বাঁকিয়ে কুঁকড়ে ছিল ট্রাফিক সিগনালের কাছে। আবহাওয়ার খবরে অল্পবিস্তর ঝড়ের সম্ভাবনা থাকলেও জলের কথা ছিল না। নাকের সামনে রুমাল ধরে ধূলো সামলানোর চেষ্টা করার সময় কবীর দেখে হাতের গ্লাস কাঁকড়ে ভরে গেছে। একমাত্র তার দিকেই নোনা ধরা অ্যামোনিয়ার গন্ধটা তেড়ে আসছে।গ লা দিয়ে বমি উঠে আসতে চাইছে। পিলারের গায়ের ফাটা পাইপগুলো দিয়ে অফিসগুলোর পুরনো বাথরুমের জমে থাকা নোংরা ভলকে ভলকে বেরিয়ে আসছিল ফুটপাতে।— শুয়োরের বাচ্চাদের কোটি কোটি টাকার টার্নওভার, কটা পাইপ বদলাতে পেছন ফেটে যায়। সায়নের বিরক্তির মাঝে দূর থেকে সুখবরের মত উড়ে আসে হিমেল হাওয়া। কোথাও বৃষ্টি শুরু হয়েছে। সায়ন জুসসমেত আকাশের দিকে হাত ছড়ায়, আঃ কী ওয়েদার, এটাই এবারের শেষ মনসুন, আবার একবছর পর, আজ রাতে সায়োনারা। ধূলো ভরা গ্লাসে চুমুক দিয়ে চোখ টেপে সায়ন। কবীরের মনে হয় অঘোরের অলীক ইশারা। কী হচ্ছিল তার মনে সে জানে না, সায়নকে চমকে দিয়ে বলে, চলো দেখি আজ আমায় কতটা মানুষ করতে পার। সায়নের চোয়াল মাটিতে খুলেও পড়ে যায় আর কি— সিরিয়াসলি? মাজাকি নয় তো?
— সিরিয়াসলি।
— সিরিয়াসলি সিরিয়াসলি?
— বললাম তো।
ঠাকুর মুখ তুলে চেয়েছেন বলে গাড়িবারান্দার বাইরে ওপরদিকে মুখ তোলে সায়ন।আর,তাকে দেখে মেঘ ভেঙে পড়ে।শুরু হল ঝমঝম করে বৃষ্টি।—দেখলে তো রাজি হতেই কেমন দূর্যোগ শুরু হল, কবীর ব্যাক ফুটে যেতে চায়।
— তাতে কিছু আটকাবে না স্যার আপনার মেঘ কেটে গেছে। আকাশ আমাদের এক গাছাও ছিঁড়তে পারবে না। দাঁড়ান এবার অ্যারেঞ্জমেন্টটা করে নিই। ক্যালানের মত ল্যাতোরপ্যাতোর ঘুরে লাভ নেই। শুধু এন্ট্রি নয়, এক্সিট রুটটাও ঠিক রাখতে হবে। আধঘন্টা ওয়েট করলেই হবে।
— আধঘন্টায় জল থামবে বলছ?
— না, গাড়ি আসবে। বৃষ্টি যত জোরে হয় তত ভাল। জন্মাষ্ঠমী দূর্যোগপূর্ণ না হলে কেষ্টঠাকুর কারাগার থেকে পালাবে কী করে।
— তুমি যে রূপকে কথা শুরু করলে।
গায়ে না মেখে সায়ন ফোন করে বলে, আগামী এক ঘন্টা প্রশ্ন করবেন না। কবীর করেনি। এলোমেলো জলের ঝাপটায় হেঁটে কাছের একটা বারে ঢোকে সায়নকে অনুসরণ করে।
দুটো করে পাতিয়ালা পেগ ব্লেন্ডার্স অর্ডার দিয়ে সায়ন টিস্যু পেপারে মুখ মোছে, একটু মন তৈরি করে নিই, নরকের টিকিট এটা, আপনিও অ্যাডভেঞ্চারার্স হোন। আমার এক ন্যাওটা ইনসপেক্টার আছে, সেয়ানা ছেলে, ঘাৎঘোঁত জানে, গাড়িও আছে। সঙ্গে থাকলে অ্যাডভান্টেজ অনেক।
বসার জায়গা ছিল না, বার কাউন্টারে দাঁড়িয়েছিল ওরা। খুব চেনাজানা না হলে এভাবে অ্যালাও করে না।অতিরথ পেটোয়া ওয়েটার। ভিড় সামলে যথাসম্ভব যত্ন করছিল। ভেজা মানুষের চুইয়ে পড়া জলে পিছল মেঝে শুকনো করার ব্যর্থ চেষ্টায় ঝুঁকে ছিল দুটো ছেলে। চেষ্টাই সার, বাতিল ট্রেনের প্ল্যাটফর্মের হালত হয়ে আছে। যা মোছে নতুন মানুষ এসে কাজ বাড়িয়ে তোলে। তাদের অসহায়তার পাশে দাঁড়িয়ে কবীর বোঝে ঘন্টাখানেকের নীরবতার শর্তে ভালই হয়েছে। অনেক কিছু ভাবার অবকাশ দিয়েছে।এতদিন সময়ের অভাব ছিল না, ভাবার মনও ছিল না। অজানা জড়তায় আচ্ছন্ন ছিল সে। কে যে ফু দিয়ে মগজের বাতি নিভিয়ে দিয়েছিল অজান্তে কে জানে। যত সময় যাচ্ছিল পাইথনের বাঁধন চেপে বসছিল। মোটিভেশন ছিল না। সময় নিজে এগিয়ে না এলে বোধহয় হয় না। চাকরিতে ঢোকার পর থেকে বেবাক বেওফুকের মত সে দেখছিল অনুভূতিগুলো ক্রমশ ভোঁতা হয়ে আসছে। তার প্রিয় অতীত বহুদূরের বিদেশের মত নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। বাঁধ সাধছে কাঁটাতারের বেড়া, পাশপোর্ট-ভিসার নখরা। মনও তেমন করে কিছু চাইছে না, যা চলছে, চলছে। সে আর শূন্যে প্রতিবিম্ব বানাতে পারছে না, আঙুলের টানে আর সাড়া দিচ্ছে না নিস্প্রাণ বস্তুরা। সুপারসনিক ইশারা জানার টাওয়ারও ম্রিয়মান হতে হতে মিলিয়ে এল। কে জানে সংসারে তৃপ্ত হয়ে মন ঘুমিয়ে পড়লে বোধহয় এমন হয়। কলেজলাইফ হলে স্টেশনের খবর পেত সরকারী সিলমোহরের আগে। বাড়ির সামনের স্টেশনও আজ ফাঁকি দিয়ে যায়। এভাবে খুইয়ে ফেলেছে কত কিছু। অদেখা আযনায় সুপ্ত থাকা সবই। মরিচিকা, কাঁচের গম্বুজ, স্বপ্নে সাঁতরে চলা রঙীন মাছ, উটের কুঁজ আঁকড়ে বালিয়াড়িতে খেজুরগাছ খোঁজার বাসনা আর পাথরের ফাঁকে বয়ে চলা নদীর কনসার্ট। সে চাইলেও তারা সাড়া দেয় না আর। অর্কর সঙ্গে যোগাযোগ না থাকলেও বেশ যোগাযোগ ছিল। কান ফুঁড়ে ঘিলুর দু-ইঞ্চি ভেতরে বিপ-বিপ করত অর্কর গতিবিধি। কবে থেকে যে তা মিলিয়ে গেল মনে পড়ে না। আমুল বদলের জন্য ৯রিখটার স্কেলের ব্যক্তিগত একটা ভূমিকম্প দরকার ভেতরে। ফিরে আসুক সবাই। বন্ধুদের মৃত্যুর চেয়েও ভারী লাগে তাদের নিস্পৃহ থাকা। ফিরে আসুক মোটরসাইকেলের সামনের মরিচিকা, মায়ের হাতের ইঁদুরের খাঁচা, বর্ষার খোঁপার পেছনে ময়ূরের পেখম। সায়নের গলা আসে, প্রশ্ন না করতে বলেছিলাম, কথা থামাতে বলিনি তো। প্রশ্ন ছাড়াও তো কথা বলা যায়।
প্রসন্ন হাসি ছড়ায় কবীরের মুখে, ভাবছিলাম অন্য কথা, মেডিটেশনও বলতে পার। আগে হলে কী কী ঘটতে যাচ্ছে তুমি ভাবার আগেই জানতে পারতাম, আজকাল পারি না।
— দূর, ভাবলে মেডিটেশন হয় নাকি? ওটা নো-মাইন্ডের ব্যাপার। ঘড়িতে অস্থির নজর বোলায় সায়ন, চুদির ভাইটা আধঘন্টা বলে ঘন্টা কাবার করে দিল, আর একটা রাউন্ড মারা যাক।
কবীর উত্তর দেয় না। মদ তার কাজে লাগে না জেনেও সায়ন দুজনের অর্ডার দিয়ে যাচ্ছে। তারপর জোরাজুরি না করে একাই গিলতে থাকে ঝুরি ভাজা দিয়ে। কাঁচের দরজা দিয়ে দেখা যায় পানশালার বাইরের একটা সিঁড়ি ডুবে গেছে। কবীর ঘুরে বলে, তাহলে আজ তুমি আমার বাসুদেব।কারাগার থেকে পালাচ্ছি তোমায় মাথায় চেপে। সায়ন দাঁত বের করে,ঠাকুর সুযোগ দিল সেজন্য কৃতজ্ঞ, চলুন মেসেজ এসেছে, নোটন এসে গেছে।

নোটন সব ঠিক করে রেখেছিল। সে জানে এমন দিনে মার্কেট শুনসান থাকে নয়তো ,সিঁড়ি থেকে লাইন দিয়ে অপেক্ষা করে কামার্ত কাস্টমার।— আজ কিন্তু ড্যান্সের খুব দিকদারি। পিক আওয়ারে উমরাও জানের ছল্লিবল্লি দেখানোর সময় কোথায়। শটে শটে পকেট ফাঁক। ফাক-ফাক পকেট ফাঁক। পা ছড়িয়ে কেলিয়ে থাকলেই হল। বাঙালীর দম তো জানেন দাদা, ম্যাটার অফ টেন-ফিফটিন মিনিটস, নতুন টিচার শিক্ষিত করার চেষ্টা করে ফেল মারা ছাত্রকে। গাড়ি এগতে চায় না, আধঘন্টায় হামা দিয়ে পাঁচশো মিটার যেতে কবীর বোঝে সায়ন ঘুমোতে শুরু করেছে। মুখ টিপে নোটন জানালার কাঁচ নামিয়ে থেকে বলে, দাদার এই নেচার, ভাববেন না, ওখানে গিয়েই চাঙ্গা হয়ে যাবে। ফার্স্ট রিল থেকে শুরু করবে সেকেন্ড শো।
— আমি কিন্তু নাচগানের জন্য যাচ্ছি। শব্দগুলো নিজের কানে বেমানান শোনায় কবীরের। তেমন ভরসা বা প্রত্যয় ছিল না। সে কি জানে না ওখানে রেওয়াজ করা মহিলা তানপুরা কোলে বসে থাকে না, ঝাড়লন্ঠনের নিচে বেজে ওঠে না ঘুঙুর? জানে, তবু কোন দুরাশায় সে অন্য কোনও টানে যাচ্ছে। হয়ত ব্যক্তিগত ভূমিকম্পের লোভে। যাচ্ছে না, তাকে কলার ধরে নিয়ে যাচ্ছে নিয়তি।
ভানুমাসীর ফ্ল্যাটে পৌঁছতে বেশ সময় লাগল। সাড়ে তিনটে ছুঁই-ছুঁই। মাঝে দু-বার ফোন এসেছিল ওদিক থেকে।— আর কতদূর? এসে গেছি এসে গেছি করো না আর। ঠিক করে বলো, সেই বুঝে কাস্টমার নেব। সেদিনের মত বাইরে থেকে মাল কিনে এনো না, মানইজ্জত থাকে না, দালালদেরও তো দু-পয়সা লাগে। মুক্ত উন্মাদনার জন্য মুখিয়ে থাকলেও নোটনের মধ্যে রাজকীয় উদারতা ছিল, ওক্কে,একটাকে বসাতে পার, কিন্তু বেডশিট বদলী করে দিও ডিয়ার, সঙ্গে স্পেশাল গেস্ট আছে। দ্বিতীয় ফোন আসে কুড়ি মিনিট পর।—আর কত দূর? আর কত চাদর বদলাব? এরপর কিন্তু অয়েল ক্লথে বসতে হবে। নোটন উত্তর দেয়, কেন কনডোম ছাড়াই চলছে নাকি, তোমাকে আর ভরসা করা যাবে না, মহামারী ছড়াবে। ওপাশের গলা বলে, কয়েকটা নিয়ে এসো, ডট-ডট লজেন্সের গন্ধ দেওয়া গোলাপী রঙের। কামানোর দিনে আর ঠুমকা মারিও না।
কবীর বুঝতে পারে নোটন বাস্তবিকভাবে উচ্ছন্নে যাওয়া দেবদূত। না হলে স্পিকার অন করে কথা বলবে কেন।— বুঝলেন কারবার? কবীর না বুঝে ঘাড় নাড়ে। বুঝতে পারে না জেল ব্রেক করতে যাচ্ছে নাকি বড় জেলে ট্রান্সফার হচ্ছে।

নোটন ঠিক বলেছিল। ভানুমাসীর ফ্ল্যাটের একশো মিটার আগে সায়ন চনমনে হয়ে উঠল। হিপ পকেটের চিরুণী দিয়ে চুল আঁচড়ে বলল, যাক,একটা সিয়েস্তা হয়ে গেল, থ্যাঙ্কস টু আওয়ার ট্রাফিক এন্ড সুয়ারেজ সিস্টেম। এবার কাজে লাগা যাক। একটাই অসুবিধা, আজ বিস্যুতবার, আজ আমরা নিরামিষাশী, সেক্সটা মাংস ছাড়া জমে না। যাকগে, আপনি সামনের সিগারেটের দোকানে দাঁড়ান, ড্রাইভারকে বুঝিয়ে দু-মিনিটে আসছি। কেউ কিছু বললে আমায় দেখিয়ে দেবেন।
অভিজ্ঞ শিক্ষকদের পেছনে নীরবে হাঁটে কবীর। বধ্যভূমিতে যাওয়ার সময় তেরপল আর প্লাস্টিকে ঘেরা বারান্দাগুলো থেকে ভেসে আসছিল উৎকট গানের আওয়াজ। শ্যাওলা ধরা বাড়িগুলোর যা দশা ধসিয়ে দেওয়ার পক্ষে এই মিউজিকই যথেষ্ট। তার ওপর একশো মেয়ের নাচ বা কোরাসে সঙ্গমরত একশো পুরুষের লিঙ্গের ধাক্কায় ফ্লোরগুলো তলিয়ে যেতে পারে যে কোনও মূহুর্তে। কুকুরদের মত যোনিতে আটকে থাকা পুরুষদের কাঠামো ভাঙা প্রতিমার মত রেসকিউ করতে হবে ধ্বংসস্তুপ থেকে।
কোলাপসিবল গেটের ওপারে থৈ থৈ নোংরা জলে পা ডুবিয়ে পঁয়ষট্টি পয়সার ফ্রন্ট রোয়ের জন্য লম্বা ভিড়। মেঝেতে নিজের পা খুঁজতে থাকা কবীরকে টানে সায়ন, সিঁড়ি এইদিকে। কবীর সিঁড়িতে ঠেস দিয়ে অপেক্ষায় থাকা মেয়েদের হাত সরিয়ে এগতে থাকে। চড়া মেকআপ আর ওলির গন্ধে মিশে দীর্ঘশ্বাসের মত কিছু আটকে ছিল ল্যান্ডিংয়ে। কম বয়সে বার্ধক্যে পৌঁছে যাওয়া মেয়েগুলোর সঙ্গে ফস্টিনস্টি করতে করতে উঠছিল সায়নরা। তিনতলায় গিয়ে তাদের হৃদয় থেকে উৎসারিত উচ্ছলতা থেমে গেল। ডানদিকে ফিরে বলল, এসে গেছি, যুদ্ধ জিতলাম যেন। অপরিসর টানা বারান্দা দেখে কবীরের ইউনিভার্সিটির হস্টেলের কথা মনে পড়ে। সেইরকম সারি দেওয়া ঘর,ঝুঁকে খেলা দেখার মত একরকম রেলিং। লুঙি পরা একটা পাকানো চেহারার ল্যাংড়া তড়িঘড়ি আসতে তিনটে পাঁচশোর নোট এগিয়ে নোটন বলে, ফুল বিপি, দুটো মিনারেল, দুটো সোডা, ঠান্ডা হয় যেন। তোরটা পরে দেখছি। চিলড না হলে লাথ খাবি।

দরজার এপারে অপেক্ষা করার সময় কবীরের চোখ পিটপিট শুরু হয়। অচেনা বন্ধ দরজার সামনে তার এমন হয়। আইল্যাশগুলো গিঁট পাকিয়ে চোখ বুজিয়ে দিতে চায়। অধীর আশঙ্কায় থাকে ভেতরটা কি নিয়ে হাজির হবে ভেবে। অচেনা প্রাণী থাকতে পারে, নির্বিকারভাবে চার দেওয়ালের মাথায় ফুটো চাল নিয়ে থাকতে পারে ফাঁকা ঘর। দ্বিতীয়টা বেশি ভয়ের। বিশেষত দেওয়ালগুলো যদি ম্রিয়মান সাদা হয়। দরজা খুলতে কবীর অবশ্য চমকে গেল। বেশ্যাবাড়ির নামগন্ধ নেই। অন্তত ব্রথেল বলতে সে যা জানত তা নয়। এতক্ষণ যা পেরিয়ে এসেছে এ তা নয়। পুরনো মঠের চন্দনের সুবাস নিয়ে উল্টোদিকের দরজা দিয়ে পর্দা উড়িয়ে ছুটে আসছে মেরুপ্রদেশের বাতাস। গম্ভীর একটা ঘন্টা বাজলেই হয়। সামনে অভাবিত পবিত্র একটা আয়তক্ষেত্র। কালচে কাঠের কিং সাইজ খাটটা মঠের আসনের মত সাদা কাপড়ে মোড়া। নতুন ওয়াড় পরানো দুটো বালিশের পাশে ছোট বাচ্চার মত শোয়ানো ছিল পাশবালিশ। কবীর এরকম খাট আগেও দেখেছে। সেগুলোয় লেখা থাকত, ছোঁবেন না, গুরমার ব্যবহৃত শয্যা। কবীর ভেতরের চমক যথাসম্ভব চেপে রাখতে চাইছিল। এতটা সে আশা করেনি। সায়নদের সে সম্পূর্ণ ভুলে যায়। এখানে নাচগান কেন, কিছু না হলেই ভাল। তবু সে বোঝে এটা অল্প সময়ের ক্যামোফ্লেজ। এখানে এটুকুও আশা করেনি সে।—এই বাঁদরগুলো পরিবেশের যে কী শ্রাদ্ধ করবে ভেবে সে শঙ্কিত হয়। ছোঁয়ার দূরত্বে দুটো মেয়ে দরজায় হেলান দিয়ে তাকে দেখছিল। সম্বিৎ ফিরতে তাকায় কবীর। ক্লান্তির কারণে একটু অমার্জিত দেখালেও আকর্ষণীয় হাসি ধরে রাখার চেষ্টা করছে।— দরজায় দাঁড়িয়ে যে সময় গেল, ঢোকো, ঢোকো,বাইরে মানুষরা হাপিত্যেশ করে বসে আছে। কবীরের চমক আজ থামার নয়। মেয়ে দুটো অবিকল একরকম দেখতে। সে পেছন ফিরে দেখে আর খাটের দিকে পা-পা হাঁটে। একদম একরকম। এতটাই যে একজন থাকলেও ক্ষতি হত না। আয়নায় প্রতিবিম্ব হয়ে দুটিতে দুপাশে দাঁড়িয়ে আছে। সালোয়ার-কামিজের রঙ এক হলে বাপ-মাও ধরতে পারত না। প্রতিবিম্বের কথা মনে আসতে দেওয়ালে তাকায়, দু-দেওয়াল জোড়া আয়না। খাটের পেছন ছাপিয়ে অনেকটা, সামনে, উল্টোদিকেও এক কেস। ভিরমি খেয়ে ভর হয় আর কি। সে কখনও এভাবে আয়না দেখেনি। সুযোগ এলেও চেষ্টা করেনি। আর,মুখোনুখি দুটো আয়নার সুযোগ চেনাজানার মধ্যে ছিল না। কবীর সায়ন-নোটনের হুররের দিকে না তাকিয়ে, তাদের আতিথেয়তায় কান না দিয়ে খাটের কোণে সন্তর্পনে বসে। মাথা নিচু করে ভাবে কত বড় আয়নাগুলো। আন্দাজ হয় পাঁচ-তিনের তিনটে করে কাঁচ রিপিট দিয়ে পাশাপাশি ফিট করা হয়েছে। মমতাজের গড়নের নাক বোঁচা আকর্ষণীয় মেয়েদুটো আয়নাগুলোয় ধাক্কা খেতে খেতে অসংখ্য হয়ে লম্বা সুড়ঙ্গের গোলোকধাঁধা বানিয়ে হারিয়ে গেছে। কবীর ভাবছিল এরা সব খুলে ফেললে স্তনে স্তনে ভরে যাবে ঘর, গোঁফওয়ালা বেড়ালের মত চড়ে বেড়াবে অজস্র যোনি। সেসব না হলেই ভাল। সংকুচিত কবীরকে দেখে চ্যাংড়ামি ঝিলিক দেয় সায়নের চোখে— ইনি আমাদের স্যার, অসুবিধা যেন না হয়। আলাপ করিয়ে দেয় সে। লাল সালোয়ার-মেরুণ লিপস্টিক(লীনা) বলে, মাসীর সঙ্গে কথা বলে নাও। ডবল কাজ নাকি শুধু ড্যান্স ফাইনাল তো করো আগে, আজ বাজার গরম,রেট নিয়ে ঝামেলা হতে পারে। নীল সালোয়ার-গোলাপী রুজ(রীনা)বলে, আজ বাবা ড্যান্স করিও না, আগের লোকটা পা মুচড়ে দিয়েছে। মেয়েটা সত্যিই খোঁড়াচ্ছিল। কবীর তখনও আয়না নিয়ে কিছু বিব্রত, কিছু কৌতুহলী হয়ে আছে। পৃথুলা ভানুমতী এসে টাকা ও সময়ের হিসেব বুঝে ফিরে যাওয়ার পর ঘরটা বদলে গেল দ্রুত। জ্বলে উঠল চড়া লাল আলো, তারস্বরে বেজে উঠল মিউজিক সিস্টেম, কোণের নির্বিষ কাচের টুকরো বসানো গোলক থেকে ঘরময় চড়ে বেড়াতে লাগল চোখ ধাঁধানো নানা আকারের অজস্র তারার আলো, সার্কাসে ট্রাপিজের খেলার সময় যেমন দেখা যায়। সুন্দর ফাঁকা সিলিং, দেওয়াল ভরে গেল পেট মোটা টিকটিকিতে। এতক্ষণ যেন কোথাও ঘাপটি মেরে ছিল। ঘুরে চলা আলোর টুকরোগুলো ধরতে সেগুলো এলোমেলো ছুটছিল। এর মাঝে ল্যাংড়া লোকটার দিয়ে যাওয়া মদের অর্ধেক সাবড়ে নাচ শুরু করে সায়ন। কবীর ছাড়া সবাই জামাকাপড় ছাড়তে শুরু করে ভেতরের শেষ টুকরোগুলোয় থমকে কবীরকে টানাটানি শুরু করে। নোটন আটকায়, আস্তে আস্তে লজ্জা কাটবে, জোর করো না। স্টুডিওর ডার্করুমের মত লাল পরিবেশে নেগেটিভ প্রসেসিং শুরু হয়ে গেছে মূল পর্বের। ঘুরে চলা আলোর টুকরোগুলোয় প্রাথমিক পবিত্রতার ভান কাটিয়ে নরকের মত মোহময় হয়ে উঠেছে ঘরটা। কবীরকে কেউ গ্রাহ্য করে না। সে দেখে লাল মেয়েটার নীল প্যান্টি আর চিকনের কাজ করা সাদা ব্রা। নীল মেয়েটার এমব্রয়ডারি করা সাদা প্যান্টি আর স্বচ্ছ কালো ব্রা। ওরা এতটাই একরকম যে ব্রা-প্যান্টি খুলে ফেললে আলাদা করা যাবে না। সীতা আউর গীতা হয়ে পাশাপাশি বসে কাজুবাদাম খাচ্ছিল দুজনে।—ইস, দুই বোন একসঙ্গে?কবীরের নিজেকে বলা কথাটা ওরা শুনতে পায়।— নাগো, নিজের মায়ের পেটের নয়, এক পাড়ার মেয়ে তাই অমন। এক জায়গায় এক বিছানায় অনেকদিন শুলে সবাই একরকম হয়ে যায়, নীল প্যান্টি শুধরে দেয়। দুজনের গভীর ক্লিভেজ ভেদ করে ঢুকে পড়তে গিয়ে পিছলে যাচ্ছিল রঙীন আলোর ছুটন্ত কীটের দল। কবীর হাসে। বর্ষা এখনও তার মত দেখতে হয়নি ভাগ্যিস। ওদিকে হাঘরের মত বোতল শেষ করে জাঙিয়া খুলে খাটের সামনে সায়নরা লাফিয়ে লাফিয়ে বলতে থাকে নাচ ঘোড়ী নাচ, নাচ মাগী নাচ, নেমে এসো নূরজাহানরা, দাদাকে উল্টেপাল্টে খা, এনজয় করো গুরু, মনে খেদ রেখো না, পাপ ধুয়েমুছে সাফ করে ফেলো, পাপ নেই, বাপ নেই, ঠাপ আছে, ধাপে ধাপে ঠাপ থাকে, বসিয়ে নাও দেখি খাপে খাপ।স্বচ্ছ কালো ব্রা কবীরকে চোখ টেপে, এবার শুরু হল ভদ্দরলোকদের ছোটলোকমি, আরও কত নাটক হবে। তুমিও মদ গিললে ভাল করতে, বসতে সাহস পেতে।— না-না আমি সঙ্গমের জন্য আসিনি।কবীরের কথায় সায়ন হেসে গড়িয়ে পড়ে, ওস্তাদ এখানে কেউ সঙ্গম করে না, চোদে। মদ টেস্টফুল হলে কবীর খুশি হত, খেয়েই ফেলত খানিকটা। হুশ না থাকলে সত্যিই ভাল হত। মেয়েরা তাদের প্যান্টি খুলে ছুঁড়ে দেয় কর্ণারের ড্রেসিং টেবিলের দিকে। কবীর দেখে টুপি মাথায় দম দেওয়া ফারের একটা বাঁদর গিটার নিয়ে কৌতুকের চোখে তাকিয়ে আছে। আঁটোসাটো যমজ স্তনের দিকে চোখ পড়ে তার। টাইপটা আদি ভারতবর্ষের, ছেনি দিয়ে কেটে বসানো। ভাল করে দেখে বোঝে দুজনের ফারাক চেনার উপায় আছে। ভেতরটা দুজনের আলাদা। আরও গভীরে আরও অনেক অমিল থাকবে। ততদূর সে যাবে না, যারা যাবে তাদের বোঝারে দরকারও নেই। তাদের কাছে সব এক। বড় নিপলের মেয়েটাকে বলে কাজের সময় বাচ্চাকে কোথায় রাখো লীনা? শান্ত স্বভাবের মেয়েটা ঝাঁঝিয়ে ওঠে, আমার বাচ্চাফাচ্চা নেই, কাজের কাজ করতে পারে না, ফালতু মারাতে আসে। তারপর আচমকা থেমে বলে, সরি, এসব বলতে নেই, কোথাও বলো না, বাজার খারাপ হয়ে যাবে। কটা বছর তো কামানোর, কিছু মনে করো না।— মনে করিনি, গানটা একটু কমিয়ে দেবে? কবীর মৃদু গলায় অনুনয় করে। ভল্যুম কমিয়ে নাচ শুরু করে দুই বোন। দুজনে চালু নাচ ভালই নাচে, মুখে প্রফেশনাল হাসি ঝুলিয়ে বাইজিদের কিছু আদাকারী আর এলভিস প্রেসলির আদি রসের পেলভিক মুভমেন্টে উছলে ওঠা চর্বিমাংসের দুলুনিতে পাগল হয়ে পড়ে সায়ন। নেতিয়ে পড়া লিঙ্গ নিয়ে পেছন থেকে রীনাকে জাপটে উপুড় করে পেড়ে ফেলে লাল সিমেন্টের মেঝেয় আর আবৃত্তি করতে থাকে, একের পিঠে দুই, মেঝের ওপর শুই, শান বাঁধানো ভুঁই, হাসিস কেন তুই। প্যারোডি শুনে কবীরও হেসে ফেলে। রীনা সায়নকে ছিটকে ফেলে উঠে পড়ে, বলেছিলাম না কত কিছু দেখতে হবে। এই তো শুরু, যতক্ষণ না ঘুমোবে শান্তি নেই। কবীরের কিছু খারাপ লাগছিল না। সে বুঝতে পেরেছে সেক্সের সঙ্গে এই আসরের সম্পর্ক নেই, অন্যরকম একটা আড্ডা বলেই ধরতে হবে,অ্যাডাল্ট আড্ডা। মহল এমন যে কিছুই বেমানান বা অসম্ভব লাগছে না। এমনকি নিজেকেও না। এই মহলে সবই মানায়। দূরে গেলে, বিচ্ছিন্ন হলে মালুম হবে। দুটো মেয়ে না থেকে একজন থাকলে হয়ত কবীর জড়িয়ে পড়ত, চোখ মেলে দেখত তাকে, তার সাথে একা থাকলে হয়ত কিছুটা আদরও করত অপরাধবোধ নিয়ে। কিন্তু এভাবে হয় নাকি? বড় নিপল মনের কথা বুঝতে পারে বোধহয়, গা ঘেঁষে গাঢ় গলায় বলে, তুমি এভাবে পারবে না।ক বীর দেবদাসমার্কা দুঃখী হাসি দেয়, আমি কোনভাবেই পারব না। মানে, আমার হাতে নেই। লীনা মুখোমুখি ঘুরে থুতনির কাছে স্তন তুলে ধরে দুহাতে অঞ্জলি দেওয়ার ভঙ্গীতে। কবীর বিস্ফারিত চোখে দেখে ফর্সা বুক জোড়া নানা বর্ণের তিল। আকাশের তারার মত ঘেঁষঘেঁষ, কিছু উজ্বল, কিছু ম্রিয়মান। একদিন এগুলোও ব্ল্যাক হোলে ঢুকে যাবে। মুখ তুলে দেখে ঠোঁটেও অজস্র তিল। নিচে, পিউবিক হেয়ারের আড়ালে, ক্লিটোরিসের ওপরেও নিশ্চিত তিল আছে। সে টের পায় একা না এসে ভালই করেছে। পরে আসার প্রশ্নই নেই আর। এলে তিলে তিলে মারা পড়বে। বহুদিন ধরে।

পরের একটা ঘন্টা যেমন দীর্ঘ তেমন অভিনবরকমের বিরক্তিকর। মেয়েরা সায়নদের কাছে জানতে চায় নেক্সট স্টেপ—বসতে হলে বসো, নাহলে আরও মাল গিলে ঘুমোও। সায়ন বলে,দাঁড়ালে তো বসব। নোটন কেষ্ট মুখার্জির গলায় বলে, বসলে দাঁড়াবে। দাঁড়ায়নি, সেই দুঃখে ওরা মদ আনায়, প্রেম জানায়, আবদার করে পার্মানেন্টলি কাছে রেখে দেওয়ার। আমাদের লন্ডা বানিয়ে রেখে দাও, আমরা কাস্টমার ধরে আনব, আমরা খাটের তলায় চোখ বুজে শুয়ে থাকব, ফুল ফ্রিডমে ব্যবসা করবে। আমাদের রক্ষিতা করে রাখো। টাইটেল পাল্টে সায়ন রক্ষিত হয়ে যাব। ওরা চুপ করে থাকে। বহুচর্চিত এই দাবীর সেঞ্চুরি হয়ে গেছে অনেক আগে। বঞ্চিত দুই অফিসার কাঁদে ঠোঁট ফুলিয়ে। কেঁদে নতুন খেলা শুরু করে। বলে, বিদেশে বেশ্যারা যোনি দিয়ে কোকাকোলার বোতল খুলে দেখায়, তোমরাও করো, না হলে এগোবে কী করে? মেয়েরা বলে,আমাদের চুৎ-য়ে দাঁত নেই, আমরা তেমন ফ্যামিলির মেয়ে নই। লিঙ্গের ডগায় কযেন রেখে টস করার প্রতিযোগিতাটা স্থগিত রাখতে হয় ন্যাতানো জিনিস দুটো নন কো-অপারেটিভ মোডে থাকায়। ইস,ভায়াগ্রা বা টাডালাফিল মেরে এলে বেইজ্জত হতে হত না, সিলিংয়ে তুলে দিতামে কয়েন, ফাটিয়ে দিতাম পাপড়ি, আফশোস করে সায়ন। মুরোদ জানা আছে বলে দুই মহিলা আম্পায়ার ম্যাচ পরিত্যক্ত ঘোষণা করে। তখন সায়ন একটা জরুরি বেসিক প্রশ্ন তোলে, আচ্ছা ইমপোটেন্টরা কি প্রতিবন্ধী? উত্তর না দিয়ে লীনা ঘুরে কবীরকে বলে বলেছিলাম না এই দুটো মাল আসলে ভ্যাটের হারামি? ছোটটা বেশি বদমাশ, মিচকে শয়তান। নোটন নেশায় ডুবেও টনটনে ছিল। সে নীরবে ঘুরে ঘুরে চারটে স্তনে হাত বুলিয়ে মুচড়ে যাচ্ছিল সুযোগ মত। লীনার প্রশংসা শুনে সে টেবিল থেকে ডিওডোরেন্ট নিয়ে স্প্রে করে দুজনের ছড়িয়ে থাকা উরুর মাঝে,তারপর যোনির চুলে গাত বুলিয়ে দাঁত কেলিয়ে বলে, এইবার জায়গাটা ঠিক হল, রোজের গন্ধে রোজ সিরাপে ডুবে গোলাপের পাপড়ি হয়ে গেছে, দাদা লেগে পড়ুন, ফ্রেশ জিনিস পাবেন। উত্তরের অপেক্ষা না করে সে মেঝেতে গড়াতে থাকা সায়নের সঙ্গে যোগ দেয়। ঘরের কোণে নর্দমার মুখে প্লাস্টিকের বালতি ভরা জল ছিল টয়লেট ও ধোয়াধুয়ির জন্য। জল যাতে ছড়িয়ে না যায় বাগানের কলতলার মত একটা করে ইঁটের আড়াল ছিল। নেচেকুঁদে ঘেমে যাওয়া মেয়ে দুটো জানায়, ঠান্ডা স্প্রের ফুসফুসে হিসি পেয়েছে বহুত, পারছি না, পেট ফেটে যাচ্ছে। ঘরের কলতলায় সশব্দে পেচ্ছাপ করে তারা। সেসময় হামাগুড়ি দিয়ে ঝিঁঝিঁ পোকা ধরতে দুটো শব্দভেদী ধেড়ে ইগুয়ানা লকলকে লালা ঝরা জিভ নিয়ে মেঝেতে চক্কর কাটতে কাটতে বেসুরো গান গেয়ে এগতে থাকে উবু সাদা পাছার দিকে, খিক খিক করে দুজনে গায়, মুতু কুরি কাওয়ারি হারা। যদিও বক্সে বাজছিল, তুমতো ঠ্যায়রে পরদেশী। কবীর দেখে দুটো মেক্সিকান হার্বিভোরাস কার্নিভোরাস হয়ে ওঠার ব্যর্থ চেষ্টা করছে। উলঙ্গ দুই নূরজাহান বালিশেj ছোট তোয়ালে দিয়ে ভেজা যৌনাঙ্গ মুছে তাদের পেছনে আলতো লাথি মেরে বলে,খুব হয়েছে, এবার ঘুমোতে যাও।কবীরকে আশ্চর্য করে সুড়সুড় করে ওরা খাটে শুয়ে পড়ে। মেয়েরা প্যান্টি পরে বলে, আমরাও একটু গড়িয়ে নিই, তোমার যা খুশি করো। কবীর কিংকর্তব্যবিমূঢ হয়ে বসে থাকে পালা শেষের পরিত্যক্ত মঞ্চে। তার সামনে ও পেছনে ছিল দুটো আয়না,যা জীবনে প্রথমবার এত গভীরভাবে সরাসরি দেখছে সে। তারাও কয়েক প্রজন্মের পর এই দেখছে কবীরদের পরিবারের কাউকে। পুরীর পান্ডাদের মত তারা খুলে ফেলছে না দেখা পরিবারের ইতিকথা। লাল আলোর সমুদ্রে সংকেতের মত ঘুরে চলা গ্লোবের আলোয় বসে থাকার সময় কবীর টের পায় মাথায় দপ করে উঠল সলতেয় জ্বলা তেলের বাতি। জঙ্গলের ভেতর পোড়ো মন্দিরের জেগে থাকা নিঃসঙ্গ প্রদীপের প্রতিবিম্বয় আলোকিত হয়ে ওঠে আয়নার ফিজিক্যাল ম্যাপ। বাকি আলো ফেড হয়ে নিভে গেছে সেখানে। গানের আওয়াজ নিভে গিয়ে শুনতে পায় আয়নার ভেতর দূরের ট্রেনের বাঁশি বাজছে, চাকার এগিয়ে আসার শব্দও শোনা যায়। অনবরত সুপার ইমপোজ হয়ে চলতে থাকে তাদের কলোনির দিন থেকে এদিনের ধারাবাহিক ফ্ল্যাশ ব্যাক। যা সে কখনও দেখেনি সেসব বৃষ্টিতে ব্যাঙের মত লাফিয়ে উঁকি মেরে মিলিয়ে যেতে থাকে পাঁক ছিটিয়ে। ক্রনোলজি মেনে নিজের কম বয়সের না-দেখা রূপও দেখতে পায়। এসবের ব্যাকগ্রাউন্ডে অর্কর চোখের তারা জ্বলজ্বল করে হরর মুভির পোস্টার হয়ে । চলমান দৃশ্যগুলো অন্যের ওপর ওভারল্যাপ করে ডিজলভ হতে থাকে। কোথা থেকে কোন কাচের টুকরো থেকে স্মৃতি সংগ্রহ করে জমিয়ে রেখেছে আয়নারা। সমষ্টিগত চেতনা ওদেরও থাকে? বুনো কুকুরদের মত ওরা দল বেঁধে শিকার করে। না,আয়নার অনুপস্থিতি ক্ষতি করেনি যেমন,থাকলেও ক্ষতি হত না। হয়ত বাড়তি কিছু নজরে পড়ত। বর্ষার ছোটবেলা পেরনোর পর সে দেখতে পায় রিফিউজি ক্যাম্পের সামনে ছেঁড়া ফ্রক পরা দুই যমজ বালিকা চু-কিৎ কিৎ খেলছে। বিছানার ছবিতে দেখা যায় প্যান্টি পরলেও আদুল গায়ে ঘুমিয়ে পড়েছে মেয়েরা। দুজনের নাভির দিকে চোখ যায়। হাতের রেখার মত নাভিও একরকম হয় না। লীনারটা অদ্ভূত সুন্দর। নাভিমন্ডল লাবণ্য-সরিতের আবর্ত্তের ন্যায় শোভা পাইতেছে, কোথায় যে বর্ণনাটা পেয়েছিল মনে পড়ল না। তাকিয়ে থাকলে ঘোর লেগে যায়। তখন কবীরের মাথায় সহৃদয় এলিয়েনের সিগন্যাল বাজে। মনে হয় এবার ওঠা দরকার। হাতের কাজ আর ফেলে রাখা ঠিক নয়। একসময় করতেই হয়। আজ সেই দিন। কবীর উঠে দরজা খুলে বারান্দা দিয়ে উঁকি দেয়। জি এস অ্যাভেনিউ একভাবে থমকে আছে ত্রাণের অপেক্ষায়। ফিরে দেখে মেয়েরা পা ছড়িযে বসে হাই তুলছে। চলে যাবে? লীনা জানতে চায়। দ্বিধাগ্রস্ত কবীর সায়নদের দিকে চায়।—চিন্তা করতে হবে না, ওরা সাতটার আগে উঠবে না। চাইলে আমার সঙ্গে পাশের ঘরে আলাদা থাকতে পার, আমার খারাপ রোগ নেই। লীনা সাহায্য করতে চায়। কী করে জানলে? কবীর হেলথের গ্রাউন্ড লেভেল রিয়্যালিটি বুঝতে চায়।—ফ্রিতে টেস্ট করার ক্যাম্প হয় তো, কত পোচার হয়, আমার তো জ্বালা করে না, ঘা হলে জ্বলত না? সেন্টারের একটা ডাক্তার প্রতিমাসে আসে,ক্যাপ ছাড়া ফোকটে ডবল কাজ করে যায়, কিছু বলি না, একটা ডাক্তার হাতে থাকুক, আপদেবিপদে কাজে লাগবে। দরকারে চিঠি লিখে দেয়, ব্যাঙ্কে বই করে দিয়েছে। অসুখ থাকলে করত থোড়ি। ওতেই যা বোঝার বুঝে যাই। তাহলে চলো, হাতে চাবি নেয় লীনা। ডবল কাজের কৌতুহলে পা না বাড়িয়ে কবীর থামায়, আজ থাক। ভাল লাগাটা নষ্ট করব না। চারটে পাঁচশো টাকার নোট এগিয়ে দেয় সে, সায়নদের বলার দরকার নেই, এটা রাখো, বাচ্চার গিফট কিনো। টাকা প্যান্টির ইলাস্টিকে গুঁজে বলে, আমি দান নিইনা, তাহলে সেকিং করে দিই তোমারটা? ফুল করি না, হাফ করতে পারি।— সেটা কী জিনিস?— ন্যাকা। তোমার বউ মুখে করে না? তুমি কর না? — ওহো, সাকিং, ওর‍্যাল সেক্স, না, আজ থাক। এমন ফয়দার অফারেও সাড়া না পেয়ে লীনার মধ্যে দুষ্টুমি চারা দেয়। গায়ে ওড়না জড়িয়ে দরজার কাছে পৌঁছে বলে, আমার ছেলে তিন মাসে পড়ল। সত্যি কিনা দেখবে? বুক থেকে ওড়না সরিয়ে দু-আঙুল দিয়ে নিপলে চাপ দেয় সে, তিলের ফাঁক গলে ফিনকি দিয়ে ঘন দুধ ছিটকে লাগে কবীরের মুখে। কবীর টলে না, রুমাল দিয়ে মুখ মোছার সময় ল্যাকটোজেনের গন্ধ পায়। বেবি ফুড ফ্যাক্টরি থেকে বিছানায় মুখ ফিরিয়ে আবার বলে, ওদের কী হবে?— সেয়ানা মাতাল, টাকা উশুল করে যাবে, জেগে উঠে একবার না করে নড়বে না। টাকাপয়সা, ঘড়ি আংটি ড্রাইভারের কাছে রেখে এসেছে, তুমি চিন্তা করো না। একদিন একা এসো, কবীরের বুকপকেটের ওপর জোরে চুমু খায় লীনা, কিছু স্মৃতি তো নিয়ে যাও,সব ভুলতে নেই, এক শট উধার রইল। বর্ষার বাচ্চা হলে লীনার থেকে দু-এক বছরের ছোট হত হয়ত, তুমি সম্ভাষণটা কানে ঢুকে পড়া পোকা হয়ে ফড়ফড় করছিল। যেখানের যা দস্তুর, বলে লাভ নেই। ফুল আর হাফ সাকিংটা জানা হল না শুধু। জিজ্ঞেস করবে? না থাক, সব জেনে লাভ নেই। পেছন ফিরে ছিটকিনি খুলে বেরনোর সময় কবীর বলে, ভাল স্মৃতি নিয়েই যাচ্ছি, ভোলার সুযোগ নেই, যা পে্য়েছি তুমি বুঝবে না।

উপচে পরা ভ্যাটের নোংরা জলে ভেসে জায়গাটা দূর্গন্ধের আড়ত হয়ে উঠেছে। খোলা ম্যানহোলের হেঁচকি তোলার শব্দে কবীর বুঝতে পারে গাড়ি ধরার মানে হয় না। ঘড়ি ছটার কাছে চলে এসেছে। ল্যাংড়াটা সেলাম করে এগিয়ে এলেও কবীর পাত্তা না দিয়ে পাশ কাটিয়ে যায়। এখন পুরোটা হাঁটতে হবে। তার মনে অপারাধবোধ বা অনুতাপের লেশমাত্র ছিল না। গত দু-ঘন্টায় খারাপ কিছু হয়নি, হলেও মন থেকে ইরেজ হয়ে গেছে। নিষিদ্ধ যৌনতা, বিচিত্র খেলাধূলা, অশালীন কথাবার্তা, কুরুচিকর ইঙ্গিত বা সার্বিক অবনতির কিছু মনে নেই। পরিশ্রমসাধ্য সফল ভ্রমণের শেষের তৃপ্ত ক্লান্তি ছিল খানিকটা। হাঁটতে হাঁটতে সেটাও খসে পড়তে থাকে জীর্ণ বসনের মত। জলকাদা তার পায়ে লাগছিল না। তার চাকা মাটির কিছু ওপর দিয়ে ঘুরছিল। ঠিক বলেছিল সায়ন, আজ দূর্যোগ পেরিয়ে কারা থেকে মুক্তির দিন।


শেষপর্যন্ত একটা আয়না কিনেই ফেলল কবীর। ভানুমতীর বাড়ির মত পাঁচ-তিনের একটা বড় থান। ভেবেছিল দু-পাশে মুখোমুখি বসার জন্য দুটো কিনবে। ব্রথেলের মত লাগবে ভেবে বাতিল করে। তাছাড়া এত বড় আয়না লাগাবে কোথায়। বাড়ির একটা ঘরও ফাঁকা নয়। প্রতিটা দেওয়াল একহাত অন্তর পেরেক বা হুকে আক্রান্ত। মধ্যবিত্তরা টাকা হলেও স্বভাবে একরকম থাকে। খাট উঁচু করে ইঁট দিয়ে, দেওয়াল ভরে ফেলে ক্যালেন্ডার, ব্র্যাকেট বা মশারি টাঙানোর পেরেকে। যে কোনও অজুহাতে পরিচ্ছন্ন কোরা দেওয়াল দখল করে পেরেকরা। তাছাড়া এটা এমন জায়গায় রাখতে হবে যাতে সবাই এতদিন না-দেখার তেষ্টা মেটাতে পারে। যাকগে ও বর্ষার ডিপার্টমেন্ট।

আরশিনগরের সামনে দাঁড়িয়ে কবীর তারিফ করে নামকরণকর্তার। কাচ ও আয়নার দোকানের এর থেকে ভাল নাম হতে পারে না। বর্ষা আর মা প্রায়ই আয়নার বদলে আরশি বলে জিনিসটার ভালমানুষি বোঝাতে। শব্দটা ডাকনামের মত আন্তরিক। কবীর বুঝতে পারে ঠিক জায়গায় কেউ তাকে কান ধরে নিয়ে এসেছে। আগে কখনও এখানে না এসেও না থেমে সোজা পৌঁছেছে। এতদিন ঘটেনি কেন? সময় হয়নি বলে। সায়ন-লীনা-নোটন-রীনারা আয়না নিয়ে ডাক দেয়নি বলে হয়ত। সবাই বড় ষড়যন্ত্রের পুতুল। টিকটিকিদের নিচে সবাই ডালা সাজিয়ে বসেছিল ভুলে যাওয়া সব কিছু ফিরিয়ে দিতে। দোকানদারকে কবীর বলেছিল, এমন একটা আয়না দিন যাতে সিঁথি থেকে সায়ার দড়ি দেখা যায়। বন্ধের ব্যস্ততায় বিব্রত দোকানদার বলে, তার থেকে বেশিই দেখা যাবে। সবাই বন্ধ হয়ে গেছে, আপনার জন্য আমি শুধু বসে আছি। যেটা লাগবে সাইড করা আছে। ফোন এসেছিল, স্পেসিফিকেশান অনুযায়ী রেখেছি। হেঁয়ালি করবেন না।
— হেঁয়ালি নয়, ফিগার কারেকশান করার মত একটা পেলেও মন্দ হয় না।
— ঝেড়ে কাশুন, গম্ভীর স্বর আসে।
— মেলায় যেগুলোর সামনে মানুষ সরু-মোটা, ট্যারাব্যাঁকা হয়ে যায় ওরকম কিছু।
— আপনাকে এমনিতেই ওরকম দেখতে হয়েছে, কারেকশানের প্রয়োজন নেই। এবার কথা এসেছিল হাসির সঙ্গে। তারপর কাগজ খুলে আয়না দেখে কবীর থ হয়ে যায়। এ যে ঐ ঘর থেকে খুলে আনা একটা। চারপাশে কাঁচের কল্কা, রিপিটের ফুটো, হয়ত লাল আলোর ছটা এখনও লেগে আছে। মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে, জানলেন কী করে? আপনিও কি ……।— সেটা বড় কথা নয়,সমস্যা হল নেবেন কী করে? খড়, প্লাস্টিক দিয়ে উডেন ক্রেটে ভরে দেব না হয়, কিন্তু এই ওয়াদারে গাড়ি পাব কোথায়। অথচ আজ না নিলে আবার কবে হবে ঠিক নেই,হয়ত হবেই না আর।
— একটা ছোট হাতি হলেই তো ম্যানেজ হযে যাবে। খালাসিকে দিয়ে নামিয়ে নেব।
— ছোট হাতি তো পাব, তার মাহুত পাব কোথায়। লোকটা প্রশ্ন করছিল না, উত্তর দিচ্ছিল।—দেখি কী করা যায়।

লোকটা দেখেছিল ঠিক। রোশনলাল নামের শক্তপোক্ত মুটিয়া দিয়ে বলে, আপনি হাঁটবেন, ও পেছন পেছন চলবে মাথায় নিয়ে। দূরের একটা করে লাইটপোস্ট টার্গেট করে হাঁটলে পথ হালকা লাগবে। আর, পথে দোকান পেলে একটা শার্ট বা টী-শার্ট কিনে নেবেন। এটা গায়ে না হাঁটাই ভাল।

সব কিছু এত দ্রুত ঘটছিল যে কবীরের প্রশ্ন করার সুযোগ ছিল না। মাথাতেও আসেনি। কে ফোন করেছিল, ঠিক এই আয়নাটা নিয়েই দোকান খুলে তার জন্য বসেছিল কেন দোকানী, আজই নিতে হবে কেন, না নিলে আর হবে না কেন। কবীর জানে যা ঘটার ঘটছে। মনে পলি পড়লে এত প্রশ্ন জাগে। সেসব চুকেবুকে গেছে। শার্টের সাবধানবাণীটা অবশ্য ঠিক মনে হয়। পকেটের দিকে তাকায় সে। সিল্ক স্ক্রিনে ছাপা বিয়ের কার্ড যেন, কোম্পানীর লোগো হয়ে আছে ঠোঁট ছড়ানো তাজা মেরুন চুমু । কবীরের মনে হয় কিছু তিলও লেগে আছে নির্ঘাৎ। আবার ল্যাকটোজেনের গন্ধ পায় সে। লীনার না-দেখা বাচ্চাটার কথায় মনে হয়। বরাদ্দ একটু দুধ তার সঙ্গে যাচ্ছে। তার টাকায় বাঁদরটার মত আর একটা খেলনা কি লীনা কিনবে না? মনে হয় কিনবে। ড্রেসিংটেবিল থেকে গিটারিস্ট দাদার সঙ্গে সে ফচকের মত চেয়ে থাকবে মায়ের বিছানার দিকে। থাক,জামা বদলানোর দরকার নেই।দোকানের বাইরে পা দিয়ে কবীর দেখে এইটুকু সময়ে পৃথিবী বদলে গেছে। যা যেভাবে ছিল সেভাবে নেই। হাঁটা রাস্তা ফাঁকা হয়ে গেছে আচমকা, লাস্ট বাস চলে গেলে যেমন হয়। মানুষ না পেয়ে জল সরে গিয়ে রাস্তাকে রাস্তা করে দিয়েছে। ঝুলঝাড়ু দিয়ে মেঘ সরিয়ে বেরিয়ে পড়েছে চাঁদ। সাইজ আর আলো দেখে কবীর বোঝে আজ পূর্ণিমা। সে হাঁটা শুরু করে। রোশনলালকে নিয়ে তার পেছনে হাঁটে ভানুমতীর আয়না।


(৬)
বাগানের ভাল গাছগুলো ক্রমশ ঝিমিয়ে পড়ছিল। শঙ্কর মাসে একবার সাইকেলে চড়ে নাম না জানা বাহারী গাছের চারা দিয়ে যেত। টেরাকোটার টব আনত ভ্যানে চাপিয়ে। একদিন বলল, আপনাদের ভালবাসা কমে গেছে, যে দুর্দশা হয়েছে ছেলেমেয়েগুলোর, চোখে দেখা যায় না, নতুন গাছের আর দরকার নেই। তখন সবার নজর পড়ে বাগানের দিকে। সুন্দরবনের স্টিমারের সাইজের উর্বর জমিটার সাড়ে সাতির দশা। এ যেন হাজার টাকার বাগান খাইল সাত সিকার ছাগলে। একেবারে উচ্ছন্নে গেছে যত্নের অভাবে। আগাছায় ছেয়ে গেছে পুরোটা। গোটা বর্ষা জুড়ে অবাঞ্ছিত বীজ পাখি-পোকাদের ঠোঁট থেকে ছড়িয়ে খিলখিল করে বেড়ে উঠেছে বুনো গাছ। বেওয়ারিশ লতানে গাছগুলো সামনে যাকে পেরেছে পাক খেয়ে জাপটে ধরে ফণা দোলাচ্ছিল পাঁচিলের ওপারে। প্রতিটা পাতা পুরু ধূলোয় ত্বকের মসৃণতা হারিয়ে অকাল বার্ধক্যে ভুগছে। বাধ্য হযে একটা মালী রাখতে হয়েছে। কিন্তু সে ব্যাটাও ওভারব্রিজের নিচে খাবারের গুমটি লাগাতে ঘুরঘুর করে ইউনিয়ন নেতাদের পেছনে। আগে বাবা ভোরের গোড়ায় খুরপি, নিড়ানি, দা নিয়ে বেরিয়ে পড়ত। বেশ কিছুদিন হল সে পাট চুকে গেছে। স্টেশনের কাজে বিনা আমন্ত্রণে জয়েন করার পর মশগুল হয়ে পড়ায় কিছু বলার উপায় ছিল না। সূর্য ফোটার আগে হাতির পিঠ বেয়ে চলে যায় বাঁধের ওপরের কর্মকান্ড দেখতে। সিমেন্টের স্লিপার আর সিগন্যালের কাছে নীরবে ঘুরপাক থায়। কাহিল লাগলে জিরিয়ে নেয় এক নম্বর প্ল্যাটফর্মের দ্বিতীয় বেঞ্চে বসে। বেঞ্চটা ছাদের ঘরের নাক বরাবর। দুপুরে হালকা লাঞ্চের পর উঠে যেত চিলেকোঠার ঘরে। ততদিনে সেটা রেলের বাতিল ও অ্যান্টিক জিনিসে একটা মিনি মিউজিয়ামে পরিণত হয়েছে। দেওয়াল জুড়ে ছিল ভারতীয় রেলের নানান যুগের বড় বড় ম্যাপ। ১১৫০০০ কিলোমিটার রেললাইন আঁকাবাকা রেখায় জাল বিছিয়ে ছিল দেওয়ালে। টেবিলের ওপর প্রথম যুগের চারটে ইঞ্জিনের রেপ্লিকা রওনা দেবার জন্য ফোঁস ফোঁস করত। সিগন্যালের লাইট, গার্ডের পতাকা, ভ্যাকুয়াম ব্রেকের ভাঙা হ্যান্ডেল, স্টেশন মাস্টারের ঘরের সামনের ডাবল ফেসেড ঘড়ি, নষ্ট স্প্রিং আর জং ধরা নাটবল্টুতে ভরে উঠেছিল ঘর। পুরনো ব্র্যাডশ, আর ট্রেনস অ্যাট এ গ্ল্যানস জাতীয় টাইমটেবিলের অভাব ছিল না। কিছু আসছিল রবিবাসরীয় নিলামঘর ও ইন্টারনেট থেকে, কিছু পাওয়া যেত পুরনো বন্ধুদের বদান্যতায়। সেগুলো ঝেড়েমুছে নামতে নামতে সেকেন্ড শিফটের ডাক পড়ত। কে ডাকত জানা যায় না, তবে, বাবা গিয়ে বসত বসত ফাইবার গ্লাসের ছাতার নিচের বেঞ্চে। কিছু পরে ফ্লাস্ক নিয়ে মা খুট খুট করে চা নিয়ে যোগ দিত। দুটিতে কয়েক দফা চা খেয়ে অচেনা মানুষদের সঙ্গে গালগল্প করে ফিরে আসত বাড়িতে। এক-একদিন বাইরে থেকে আসা মজুরদের অস্থায়ী তাঁবুর বস্তিতে টহল মেরে বাবা বাড়ি ফিরত একা। রাত আটটা নাগাদ। খাবার খেয়ে উঠে যেত বারান্দায়। স্টেশনের আলো-আওয়াজ গিলে ঘুম এসে গেলে বিছানায় যাওয়ার আগে বলত, উফ, কাল আবার সাতসকাল থেকে কাজ। তবে, ঐ উফ-য়ের মধ্যে বিরক্তি ছিল না, ছিল তৃপ্তি।
এর ফাঁকে ভাড়া বেঁধে রেলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়িতে রঙ করা হয়। রেলের কন্ট্রাক্টারকে দিয়েই করিয়ে নিল বাবা। ব্রিক রেড আর সাদায় রেলের ডিআরএমের কোয়ার্টারের মত বাড়িটা দেখে লোকে রেলের অংশ বলে ভুল করত। বাবা বলত, ভুল নয়, আমরা তো রেলেরই অংশ।

নতুন উৎপাত হয়েছিল ধুলো। ট্যাক্সি স্ট্যান্ড, অ্যাপ্রোচ রোড ও প্রয়োজনীয় ইনফ্রাস্ট্রাকচারের ঠেলায় বাড়ির প্রতিটা ইঞ্চি ভরে যায় ধুলোয়। গোটা বাড়ি শ্বাসকষ্ট ও অ্যালার্জিতে ভুগতে শুরু করে। এতে কিছু ওষুধ চারজনের কমন হয়ে যায়। বাবা বলত, বড় কিছু পেতে গেলে স্যাক্রিফাইস করতে হয়। মা তখন অ্যাজমার জন্য স্টেরয়েড নিচ্ছে। মুখ থেকে স্প্রে বের করে বলেছিল, যাক মানুষটা শেষ পর্যন্ত রেলে কাজ ফিরে পেয়েছে যখন এটুকু মানতে হবে, আস্তে আস্তে সব সয়ে যাবে। সরকার এতটা করল, আমরা এটুকু পারব না?
সব সয়ে গিয়েছিল। রেলের অফিসাররা আন্অফিশিয়ালি পুরনো পেনসনারটিকে মডেল কর্মী ভাবত। আরপিএফ কথা শুনত। জিআরপি প্রশ্রয়ভরে অর্ডার মানত। ঠিকাদাররা অ্যাপ্রুভাল নিত ইনসপেকশনের আগে। আবার টিফিনকৌটোর প্রথা ফিরে এসেছিল বাড়িতে। আগে কড়মড়ে পাউরুটি আর গ্রিন টি দিয়ে শুরু হত দিন। ব্রেকফাস্ট ছিল রুটি-আলুভাজা। খাবারটা অফিসার ও জংশনসুলভ না হওয়ায় কিছু রদবদল হল। ওটস, স্যান্ডুইচ, স্ক্রিমড মিল্ক আর হানি-লেমন টি জায়গা নিল। পালিশ করা কালো বুট, বেল্টে সাদা জামা-প্যান্ট বেঁধে প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চে বসে প্রাতঃরাশ করত বাবা। কনভেন্টের মা-দের মত খাবার এগিয়ে দিত মা। যাতায়াতের পথে তরুণ রেলকর্মীরা বলত, আর কত চাপ নেবেন স্যার, আমরা হলে এতদিনে টেঁশে যেতাম। বাবা বলত, প্রতিটা সফল ও সৌভাগ্যশালী পুরুষের একটা স্টেশন লাগে। তোমরাও পাবে একদিন। ওটা কথার কথা। পৌরুষের চেয়ে প্রকৃতি ও ভাগ্যের ওপর বাড়ির ভরসা ছিল বেশি। নজর টানত দৈব দূর্বিপাক। সাদাসিধে ঘটনাগুলো মহিমান্বিত করতে গিয়ে বাবা-মা বাতিল কৌশলের মাধ্যমে আনন্দময় হঠকারিতা করে চলছিল যেন। হানি-লেমন টি খেয়ে দুজনে হাঁটত প্ল্যাটফর্ম শেষের গড়ান অবধি। ইঞ্জিন ছাড়া ছাব্বিশ বগির মাপে হয়েছিল চারটে প্ল্যাটফর্ম। পুর্বদিকে যেতে যেতে মাঝখান থেকে আচমকা গোৎ খেয়ে দক্ষিণে বাঁক নিয়ে নিচে নেমে সেকেন্ড ব্র্যাকেটের মত কোমর দুলিয়ে উত্তরে এগিয়েছে রেললাইন। বেশ কিছুটা আগে গিয়ে এপিসেন্টার থেকে ছড়ানো ভূমিকম্প হয়ে ছড়িয়ে গেছে দেশের নানাদিকে। জলাভূমি সংরক্ষণ, পরিবেশকর্মীদের আন্দোলনের কেসে হেরে পথটা জটিল জ্যামিতিতে বদলায়। বাকিটা মানবাধিকার হননের জটিলতা এড়াতে। সব মিলিয়ে সেকেন্ড ব্র্যাকেটটির উৎপত্তি। লাইনের দুদিকে লাগানো হয়েছিল সোজা উঠবে, ডালপালা ছড়াবে না এমন প্রচুর গাছ। যা মধ্যে ইউক্যালিপটাসই বেশি। সেগুলো ৬-৭ বছরে বেশ লম্বা হয়েছে। বুড়োবুড়ি গাছগুলোর ভেতরে ঢুকে উঁকি মেরে দেখত বাড়ির কতটা দেখা যায়। ওখান থেকে অল্পই দেখা যেত। ঝুল বারান্দার বড় দেওয়াল ছাড়া খুব কিছু না। বাঁ হাতের তলা দিয়ে ব্লাউজ আর শাড়ির ফাঁকে যেটুকু পেটের দেখা যায় সেটুকু, তার বেশি নয়। ট্রেনের শেষ হাত নাড়াটা দেখতে বারান্দা থেকে বিপজ্জনকভাবে ঝুলে পড়তে হবে। তাতেও হবে কিনা জানা নেই। কোথাও একটু ফাঁক রয়ে গেল যেন।

বাবার ধারণা ছিল সরকার যখন এতটাই করল গাড়ি ছাড়ার অনুষ্ঠানে তাকে চিঠি দিয়ে নেমন্তন্ন করবে। চাইকি তরুণদের প্রেরণা জাগানো ছোট ভাষণও দিতে হতে পারে। বাড়ি ও মনের অবস্থানগত নৈকট্যের কারণে বাবার দাবী ক্রমশ বেড়ে চলছিল। রোজ পোস্টবক্স খুলে দেখছিল আকাঙ্খিত চিঠির না-আসা। কবীর হাসত আর বলত, কর্নেলকেই কেউ চিঠি লেখে না, তুমি তো তা-ও পেনশন পাও। মা স্বান্তনা দিত, ঘরের মানুষকে কেউ নেমন্তন্ন করে নাকি।
নানা অভাবিত কারণে বারবার পিছিয়ে যাচ্ছিল কাজ। আইনী জটিলতা, পলিটিক্যাল বিক্ষোভ, আর্থিক ঘোটালার এনকোয়ারি, নিয়োগ নিয়ে আপত্তি এবং অনেক কারণে প্রস্তাবিত টার্গেট পিছিয়েই যাচ্ছিল। একদিন হাজির হল অবিনাশ। একটু কাঁচুমাচু মুখে। বাড়ি বেঁচার পর থেকে তার টিকিটি দেখা যায়নি, আত্মীয়দের বিয়ে বা শ্রাদ্ধে দেখা হলে মুখ লুকিয়ে পালিয়েছে। কেন কে জানে। হয়ত ঘাসের জঙ্গলের কিনারে বাড়িটা গছানোর পর চেনাজানারা দুষেছে মন খুলে। কিন্তু হঠাৎ আজ কেন? মাথা চুলকে অপরাধীর স্বরে বলে—ইস, শেষপর্যন্ত রেল জ্বালাতে চলে এল। আমার হিসেবে ভুল হয়ে গেছে, এরকম কেস আগে ঘটেনি, আপনার ক্ষেত্রে ফার্স্ট ঘটল। তা, ভুল যখন আমার খেসারত আমাকেই দিতে হবে।নিজের লোকের কাছে কথার খেলাপ করে মরতেও পারব না। অবিনাশ কী বলছে বোঝা যায়নি। ততদিনে ওর সামনের গুটকাশোভিত দাঁত দুটো আর নেই। বাঁশি বাজানোর গর্ত দেখা যাচ্ছে। সুগারে চামড়া ঝুলে গেছে। বয়স ধৈর্য কমিয়েছে, তড়বড় করে দলা পাকিয়ে যাচ্ছিল কথাগুলো। সেদিন সবাই বাড়িতে ছিল।
— কী বলছো অবি? কিছুই তো বুঝতে পারছি না। কিসের ভুল?
— সেই যে বলেছিলেন রেল থেকে দূরে খাকবেন, এত চেষ্টা করলাম, তবু কথাটা রাখতে পারলাম না। ভাবিনি সরকার এতটা বেইমানি করবে। একটা এরকম প্রোজেক্ট মানে প্রকৃতির সর্বনাশ, মানুষেরও বাঁশ। ইকোলজিক্যাল ব্যালান্স নিয়ে এত কথা হয়, কারও কি মাথাব্যথা আছে আদৌ? এই একটা রুট ওপেন করতে গিয়ে তিনটে ডিস্ট্রিক্টের ২৩০০০ বড় গাছ কাটা পড়েছে। অথচ চাইলেই অ্যাভয়েড করা যেত। কার্বন এমিশন সামলাবে কে। ঘোর পাপ হচ্ছে, পরের প্রজন্মকে এর মাশুল দিতে হবে।
— এখনও বুঝতে পারিনি কী বলছো। খোলসা করে বলো, আমায় তিন নম্বরে যেতে হবে। আজ শেডে লাইট লাগবে, না থাকলে পরে প্যাসেঞ্জারদের প্রবলেম হবে।
অবিনাশের বুক ধড়াস করে ওঠে, আপনি আবার জয়েন করেছেন নাকি? এই বয়সে?
— তা একপ্রকার বলতে পার। আন্অফিশি্য়ালি অবশ্য। জয়েন করার আবার বয়স হয় নাকি। বয়স হয় মাইনে পাওয়ার।
— আসলে, আমি পুরনো ভুলটা শোধরাতে চাই। আপনার জন্য চমৎকার একটা বাড়ি দেখেছি। এরচেয়ে বড় আর ভাল। বাস্তুর দোষ নেই, একদম টিপটপ, ওয়েল ফার্নিশড। ভদ্দরলোকদের এরিয়া। আর আপনাকে এই বাড়ির যন্ত্রণা পেতে হবে না। ট্যাক্সি আর ট্রেনের শব্দে কান ঝালাপালা হয়ে যাবে। এই বয়সে সিনিয়রারা একটু শান্তি না পেলে অপরাধ আমাদের। শিফট করার হুজ্জোত না হয় আমিই সামলাব।
— সে কী আর করা যাবে। তুমি তো ভাল ভেবেই দেখেছিলে বাড়ি। আমরাও অভিযোগ করিনি। তুমি মন ভার করে থেকো না বাবা।
— তবু, আমার একটা কর্তব্য তো আছে। আপনাকে বাড়তি টাকা দিতে হবে না, এই বাড়ির বদলে অনেক ভাল জায়গায় আপনার বন্দোবস্ত করতে পারছি ভেবে ভাল লাগছে। টাকার ডিফারেন্সটা আমি পকেট দেব, নিজের লোকের বেলায় সবসময় ব্যবসা করা যায় না।
মঞ্চে প্রবেশ করে বর্ষা, না অবিনাশদা, তোমার ক্ষতি আমরা চাই না। যেমন চলছে চলুক।
— আমি যে বাড়িটা ফাইনাল করে ফেললাম।
— তা হোক, এখানে মন বসে গেছে, ভাল বাড়ির আর দরকার নেই। দুপুরে খেয়ে যেও। অবেলায় খালি মুখে গেলে মা দুঃখ পাবে।
বাবা কৃতজ্ঞ চোখে তাকায় বর্ষার দিকে।—হ্যাঁ, কত ছোটাছুটি করব, মন বসে গেছে। একদিন বৌমাকে নিয়ে এসো।
অবিনাশ লসের হিসেব কষে নীরবে, শুড্ডাদের মন বোঝা দায়, সলিড সওদাটা ফস্কে গেল। বলে, অম্বল হয়েছে, আজ খাব না।
এরপর সুপ্রস্তাবের বান এল। বাড়িটা আট গুণ দামে কিনতে এক হোটেল ব্যবসায়ী আসে বিএমডব্লু নিয়ে। সামনের বাগানে এসি গার্ডেন কাফে করতে চায় জয়েন্ট ভেনচারে। আর একজন আসে কাউন্সিলারকে নিয়ে, সে বার, অফ শপ আর ফাস্ট ফুড সেন্টার করতে আগ্রহী যে কোনও শর্তে। বাড়িকে ডিসটার্ব না করে মেডিটারিনিয়ান স্থাপত্যে রিসর্ট হবে। চেকে, ক্যাশে যেভাবে বলবেন। রুফ টপ গার্ডেনের সিঁড়ি পেছন দিয়ে করা হবে। লোকটার হতাশ ফিরে যাওয়ার রাস্তায় তাকিয়ে মা বলেছিল, বেচারা অবিনাশ সেদিন না খেয়ে চলে গেল, এখন খারাপ লাগছে।

ঘটনাপ্রবাহের মাঝে আসে আয়নাটা। রোশনলালের সঙ্গে পুরনো পরিত্যক্ত গিরিপথ দিয়ে জ্যোৎস্না মাথায় কলিং বেলের কাছে পৌঁছতে এগারটা বেজে গিয়েছিল। দরজা খোলাই ছিল। কবীর তখন টলছে। মদ না খেয়ে এতটা নেশা কী করে হল বুঝতে পারছিল না। দরজার সামনে দাঁড়িয়েছিল বর্ষা। উৎকন্ঠা নিয়ে কিছু দূরে ছিল বাকি দুজন। ঢোকার মুখে মা ঠাকুরঘর থেকে শাঁখ নিয়ে আসে। তিনবার বাজার পর রোশনলালকে বলা হয় দোতলার বারান্দায় তুলে দিতে।—এত রাতে তুমি আর কোথায় যাবে, গাড়িঘোড়া পাবে না, এখানেই থেকে যাও। বাড়িতে যা আছে দুটি খেয়ে নিও। তারপর রোশনলালকে শোয়ার ব্যবস্থা করে দিয়ে বা-মা সারা রাত জেগে ছিল কাঠে মোড়া অতিথির সামনে। কতদিন পরে এলে ঘরে, অবশেষে দেখা দিলে বাপু, ঘাবড়ে দিও না যেন, মা বিড়বিড় করছিল মন্ত্রের মত। বাবার ও নিয়ে মাথা ব্যথা ছিল না। আয়না বই কিছু নয়। পরিবারের কুসংস্কার তখনও পিছু ছাড়েনি তার। তবে ঘটনাচক্রে জিনিসটা সুসংবাদ নিয়ে এসেছে, হয়ত সুসময় ফিরিয়ে এনেছে। ছেলের মত আয়না তার ওপর বিশেষ ক্ষমতা আরোপ করেনি, গোপন খবর বা সমাধানে তার আগ্রহও নেই।



সে রাতে পালকের বিছানায় খরগোশের মত ঘুমোলো কবীর। ঠিক ঘুমোলো না, ডিলিরিয়ামে জেগে রইল, মাঝে দুটো ফোন পায়, বিকারের মধ্যে কথা বলে রোবটের মত। প্রথম ফোনটা সওয়া একটায়, সায়নের। অপরাধে নিমজ্জিত গলা।— স্যরি দাদা।
—কেন?
—যা ঘটল তার জন্য।
—থ্যাঙ্ক ইউ।
—কেন?
—যা ঘটল তার জন্য।
—বিদ্রুপ করছেন?
—না।
—খারাপ পাননি তো?
—না।
—পরেরবার এরকম হবে না,হুশে থাকব।
—উঁহু।
—তার মানে খারাপ লেগেছে।
—না।
—তাহলে আর একদিন ..... লীনা বলছিল.....
—না। ফোন রেখে বর্ষার বুকে মুখ গুঁজে দেয় কবীর।

দ্বিতীয় ফোনটা করেছিলাম আমি। তিনটে নাগাদ।মনে হল বিকারে ফিরেছে যখন কথা বোঝাতে সুবিধা হবে। বললাম, ওয়েলকাম কবীর। আবার আমাদের দেখা হল, এবার থেকে হবে।
— থ্যাঙ্ক ইউ অর্ক।
—আয়নাটা পছন্দ হয়েছে?
—ঠিকঠাক। তুই তো দেখেই বেছেছিস।
—লাল আলোয় ধারের কল্কাগুলো আন্দাজ করতে অসুবিধা হচ্ছিল একটু।
—যাক, এতদিন পর কাজে লাগলাম তাহলে।
—ঠিক ছেলেকেই বেছেছিলাম রে।
—আমার প্রতিদ্বন্দ্বী তো ঘরে এসে গেল। আবার নিজেই সব দেখতে পাবি, করতে পারবি, আমাকে আর দরকার হবে না।
—কে জানে হতেও পারে।
—বাড়ির পাশে স্টেশন হল, বাড়িতে আযনা এল, মেসোমশাই কাজ করছে, আর কী চাই।
—মানুষের চাওয়া কি শেষ হয় অর্ক। ঘুমোই, দেখা হবে। কবীরের মনে হয় খুব তাড়াতাড়ি দেখা হবে দুজনের। বর্ষা মুখ গুঁজে দেয় বুকে। দুধের গন্ধটা এখনও লেগে আছে। স্টেশনের আলো জানালা ভেদ করে ছড়িয়ে ছিল মশারির চালে। কবীর লক্ষ্য করে তার ইসোফেগাস বেয়ে উঠে আসছে বর্ষা। —বাচ্চাটাকে নিয়ে আসলে পারতে।
—কী করতাম এনে?
—অ্যাডাপ্ট করতাম।
—সামলানো যেত? জেনেটিক প্রবলেম মেটে?
—কনজারভেটিভ ফিউডালদের মত বলো না।
—ওর মা রাজি হত না।
—হত, বাচ্চার ভাল সব মা বোঝে।
—এরা বোঝে না, একসঙ্গে আগুনে পোড়ে।
—চেষ্টা করতে দোষ কী?
—দুধ ছাড়াবে বেচারাকে?
—সে ভাবনা আমার, জুটিয়ে ফেলব।
—এই তো সবে জাগলাম, ডোবার কথা আর বলো না। ওটা ওযান ওয়ে।
বর্ষা পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়ে। সব কিছু ঘটছিল আধো ঘুম আধো জাগরণে। কবীরের ভেতর দুজন মানুষ সক্রিয় ছিল। একজন ঘোরে সমস্তটা রি-ক্যাপ করছিল, অন্যজন বাস্তব সামলাচ্ছিল। কবীর জানে, রাতবিরেতে এমন ইমোশনাল চাপে বর্ষা ভোগে। এটা ত্রৈমাসিক প্রবলেম। তখন বিবেচনাবোধ হারিয়ে বসে। দুটো মিসক্যারেজের পর রাতে কোনও অদৃশ্য বাচ্চার কাছে অপারাধবোধে ভোগে। এত পড়াশুনা করেও মানুষ ছোট গাঁটে কেন যে আটকে যায়। একটু সময় পেলে অবশ্য বর্ষা গুছিয়ে নেয় নিজেকে। নিজেই বলবে, এই বয়সে একটা বাচ্চার জন্য যতটা সময় লাগে কে দেবে। নিজেদের হাতেই আর তত সময় কোথায়?

ঘুম ভাঙতে বিকেল পেরিয়ে গেল। ছোটবেলায় ডিপথেরিয়া বা স্মল পক্সের সময়ও এত লম্বা ঘুম হয়নি। জাগার পর ঘন্টাখানেক তালজ্ঞান ছিল না। আগের দিনটা জীবন থেকে হারিয়ে গিয়েছিল। সাতাশ থেকে ঊনত্রিশ আগস্টের শেষ বিকেলে পৌঁছে দেখে বাড়িতে কেউ নেই। দরজা হাট করে সবাই বেরিয়ে গেছে। বাবা-মাকে নিয়ে চিন্তা নেই, ওরা রেলের ছলনায় নতুন প্রেমে পরেছে। বর্ষার কিসের একটা ছুটি ছিল কলেজের, গেল কোথায়। এমন দিনে কবীরের চিন্তা হয়। বর্ষার মন ব্ল্যাক আউট হয়ে যায়, বাস-ট্রেন থেকে ঠিক জায়গায় নামতে পারে না, কেউ পার্স নিয়ে গেলেও বুঝতে পারে না। কবীর তেমন দিনগুলো আঁচ করতে পারে, অফিস না গিয়ে সে থেকে যায় বৌয়ের কাছে। এই মুহুর্তে বর্ষাকে তার খুবই দরকার। ও ছাড়া কালকের দিনটা খুঁজে দেবে কে। মাইক্রোওভেনে চা বানিয়ে বারান্দার চেয়ারে হেলান দিয়ে সামনে তাকায় কবীর। চোখ সোজা যায় এক নম্বরের দ্বিতীয় বেঞ্চে। যথারীতি বাবা-মা বসে আছে গা ঘেঁষাঘেষি করে। বেঞ্চিটায় মাননীয় সতীনাথ মিত্রর জন্য সংরক্ষিত লিখে রাখা উচিত। বাবা হাত চার নম্বরের দিকে হাত তুলে কিছু বোঝাচ্ছে বান্ধবীকে। কবীরের দারুণ লাগে। দূর, কিছু দিন সে অফিস(যে কাজ করতে হয় তাতে কলেজ বলার ঠুনকো গর্বটা বিদায় নিয়েছে)যাবে না, যা হয় হোক। মেডিকেল দিয়ে দেবে। বারান্দায় বসে এই দুজনকে দেখবে শুধু। কবে তারা চলে যাবে কে জানে, পরে ছবি টাঙিয়ে আক্ষেপ করে কী হবে, যতটা আস্টেপৃষ্টে থাকা যায় থাকবে। কত রঙের নিয়নের বিজ্ঞাপনে ভরে গেছে স্টেশন। লাল- নীল- বেগুনি- হলুদ- সবুজ- লেমন গ্রিন- স্ট্রবেরির ফিউশানে ছেয়ে গেছে দেড় বর্গ কিলোমিটারের কেক। পুরনো গ্রাসল্যান্ডের গায়ে ব্র্যান্ডেড জামাপ্যান্ট উঠেছে। সরু পাইপের উজ্বল আলোর বিজ্ঞাপন ঝুলে আছে প্ল্যাটফর্ম ও ট্যাক্সিস্ট্যান্ডের দুধারে। দুটো লসে চলা ব্যাঙ্কের এটিএম ফ্লেক্সে এফডি-র লোভ দেখাচ্ছে। পিজা-বার্গার-ধোসা-রোল আর ভাতের হোটেলের হুল্লোড় লেগে গেছে। সিঁড়ি থেকে ওভারব্রিজ জুড়ে জ্বলছে ফ্যাশনদস্তুর জিনস আর রূপসজ্জার ক্যাম্পেন, তিরিশ ফুট ওপর থেকে ম্যালের থেকে ভিউ দেখছে অন ইওর মার্ক শোনার জন্য রেডি স্টেশন। ভিউয়ের মধ্যে কবীরদের বাড়িটাও আছে। এড়ানোর উপায় নেই। পূজোর প্রসেশানের নকশা বদলানো আলোর চাকা ঘুরে চলেছে অবিরাম। মাত্রাছাড়া চাকচিক্য পুড়িয়ে দিতে থাকে কবীরকে। চেয়ার ঘুরে দেওয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে বসে কবীর। দেওয়ালে নিঁখুতভাবে টাঙানো রয়েছে আয়নাটা। ঘুরন্ত আলোর পোকা নিয়ে চেয়ে আছে তার দিকে। হারিয়ে যাওয়া দিনটা মন খুঁড়ে বেরিয়ে আসে। লীনার ঘর অ্যাম্পিথিয়েটারের মত খুলে গেছে যেন। ছবিতে দেখা সিন-সিটিতে বসে আছে। ক্যাসিনো আর ন্যূড ক্লাব খুললে ষোল কলা পূর্ণ হবে। বর্ষার জবাব নেই, এত চমৎকার জায়গায় ঠিকঠাক অ্যাঙ্গেলে সে-ও লাগাতে পারত না। ঘোর লাগা চেখে কবীর বুঝতে পারে ছেলেবেলার সেই স্টেশন আর পাওয়া সম্ভব নয়। সবাই বদলায়, সে নিজে কম বদলায়নি। এর সঙ্গেই মানিয়ে নিতে হবে। বারান্দা দিয়ে ঝুঁকে দেখে বর্ষা বার্গারের দোকান থেকে পার্সেল নিচ্ছে। চওড়া সিঁড়ি দিয়ে রঙীন আলোয় হাত ধরাধরি নামছে বাবা-মা। ঘোর লাগা চোখে কবীরের মনে হয় সিন-সিটিতে শুধু পাপ নয়, কিছু পূণ্যও থাকবে।

আয়নাটা আসার পর যত আইনী জটিলতা ছিল, সংগঠনগুলোর বিক্ষোভ জট পাকিয়ে ছিল কীভাবে মিটে গেল। খালি চিঠিটাই এল না। খারাপ লাগলেও বাবা প্রকাশ করেনি। বলেছিল, সব আশা পূরণ হয় না, যা পেয়েছি তা কম নয়। তবে কী জানিস ট্রেনের ইঞ্জিন হল প্রিয় ঘোড়ার মত অচেনা সওয়ারিকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়।
— এগুলো তো নতুন ইঞ্জিন, তোমার মত কয়লায় চলে না।
— তাতে কী, ওদের সবাইকে আমি চিনি।
— কিন্তু সরকার যে তোমায় চিনল না।
— ভুল কথা বলিস না, এই বয়সে কাউকে কাজে রাখে নাকি।
— সে কিগো, তুমি যে যুক্তিতে বিশ্বাস করতে শুরু করলে বাবা।
— তা নয়, অবুঝ হয়ে থাকলে আর চলবে? এবার যাবার সময় এসে গেল যে।
— কার? তোমার না ট্রেনের?
— আহা দুজনেরই। তোর জন্য চিরকাল থাকব নাকি?
— থাকো থাকো, আর কটা বছর থাকো। একসঙ্গে এখান থেকে ট্রেনে চনে বেড়াতে যাব, এখানেই ফিরব। আমরা অন্য স্টেশনের ট্রেনে আর উঠব না।
— এটা ভাল বলেছিস। যেখানে এরা যাবে না সেখানে বেড়ানোর দরকার নেই। অত ঝক্কি পোষাবে না।


খালের ধার থেকে ফিরে বর্ষা জানাল পিরিয়ড পার্মানেন্টলি বন্ধ হয়ে গেছে। তার পঁচিশ মিনিট আগে ইউক্যালিপটাসের ঢাল থেকে গড়িয়ে কবীরের ডানপায়ের ভুস্টিনাশ হয়ে গেছে। চেটোটা ফুলে আছে সেভেনের ফোঁড়ার মত। শিকড়ে আটকে রেললাইনের ঢাল থেকে গড়িয়ে যাওয়ার সময় ছোট ঠোঙা ফাটার আওয়াজ পায় ভেতরে। মিনিট পাঁচেক হল রিক্সাওয়ালা আর ক্লাবের ছোকরা সেক্রেটারির কাঁধে ভর দিয়ে বাড়ি ফিরেছে। কবীরের ধারণা ছোটখাটো ফ্র্যাকচার হযেছে। সেক্রেটারি অবশ্য বারান্দায় চেয়ারে সেট করার সময় জানায়, ভাঙলে কাটা পাঁঠার মত ছটফট করতেন, টুইস্টেড অ্যাঙ্কেল মনে হচ্ছে, চূণ-হলুদ লাগালে দুদিনে ছুটবেন। কবীরের ধারণা ফ্র্যাকচার হযেছে। দোতলায় উঠতে ভয় করছে। ছুটিটায় ছোটনাগপুরের এদিক-ওদিক ঘুরবে ভেবেছিল, তা হওয়ার নয়, গেলে পাথরে ফেঁসে যাবে, চেয়ারে বসেই কাটবে মনে হচ্ছে। ভয় লাগছে খবরটা বর্ষাকে জানাতে। এটা অবশ্য লুকোনোর ব্যাপার নয়, উপায়ও নেই। তারটা অবশ্য তত বড় সমস্যা নয়, বর্ষার একগাদা কাজ বাড়বে, সে আরামসে শুশ্রুষায় থাকবে পা তুলে বসে। আসল সমস্যা বর্ষার। কতদিন ধরে ভাবছে এইচআরটি করাবে, মেনোপজের ধাক্কা সামলানোর ওষুধ চালু করলে ইস্ট্রোজেন ডেফিসিয়েন্সি সামলে ফেলা যেত। তার কিছুই ঠিক সময়ে করা হয় না। অথচ সিগন্যাল বেশ কিছুদিন হল দিচ্ছিল শরীর। ইরেগুলার আগেই হয়েছিল, দু-এক মাস অন্তর কখনো হত সামান্য, পাঁচদিন থেকে কমে একদিনে এসে থেমে ছিল। গত চার মাসে আর দেখা হয়নি। বছর দেড়েক হল করাকরি নেই। আলেকালে যখন হত, তাতে জোশ বা আদিখ্যেতার লেশ মাত্র ছিল না। ফলে, বর্ষার কাছে সুখবরও হতে পারে। অনিয়মিত হতে হতে শেষপর্যন্ত বিরক্তির পাকাপোক্ত সমাধানে বর্ষা খুশিই হবে। আর, করার সঙ্গে মেনোপজের তেমন সম্পর্কও নেই। ড্রাই ভ্যাজাইনা ম্যানেজ করার অনেক কিছু বেরিয়ে গেছে। নয়তো রেখা, হেমা মালিনীদের চলছে কী করে, জানিয়ে ডাক্তার বলেছিল, বরং আপনি একটু অ্যাকটিভ হোন, টিআরটি করলেই ঠিক হয়ে যাবে। তার আগে টেস্টোটেরন লেভেলটা দেখে নিতে হবে। লিবিডো ফিরে আসবে। নয়তো অন্য মেয়ে ট্রাই করুন। ডাক্তার শালার কান্ডজ্ঞান নেই, বলবি তো বল, বর্ষার সামনেই বললি। বয়স বাড়লে মেয়েরা কি মেয়ে থাকে না? কবীরের মুরোদ জেনেই হয়ত বলা।

ইদানীং ভোরে উঠে বর্ষা হাঁটতে বেরিয়ে পড়ে তার সুয়েজ ক্যানেলের দিকে। লোকদেখানো তাপ্পি মারা সংস্কার হয়েছে খালের। দু-কিলোমিটার মত জল পাঁক ও পানা সরিয়ে ঝকঝকে হয়েছে। জলে স্রোত এসেছে, ছোট ছোট ঢেউ দেখা যাচ্ছে। আচমকা ঘাবড়ে দিয়ে মোটর লাগানো নৌকো চলে যাচ্ছে পশ্চিমে নদীর দিকে। দুধারে বসেছে বাতাবিলেবুর সাইজের গোল আলো। পাশের বাঁধানো রাস্তায় দু-চক্কর মেরে বর্ষা চলে যায় বাঁধের ওপর সুড়ঙ্গ বানানো ইউক্যাপিটাসগুলোর দিকে। ফেরে কিছু সরু লম্বা পাতা কুড়িয়ে। সারাবছর অ্যালার্জিতে ভোগে বর্ষা। ওয়াদার একটু বদলালেই হল। চাদরে মাথা ঢেকে পায়ে মোজা পরে মেরা সায়ার সাধনার মত ঘোরে নিঃশব্দে। ব্যাগে ভিক্সের ইনহেলার রাখে, তাতে অসুখ না কমলেও আরাম হয়। ইউক্যালিপটাসের জঙ্গলে যাওয়া খানিকটা সে কারণে। চড়া ভিক্সের গন্ধে ভুরভুর করে ওখানের বাতাস। ফেরার সময় কিছু পাতা কুড়িয়ে আসে বর্ষা। পাতা দলে হাত শোঁকে ঘনঘন। মাঝেমধ্যে চায়ের সঙ্গে ফুটিয়ে কবীরকে ফুটিয়ে খাইয়ে নিজের আবিস্কারের তারিফ করেছে। কবীর বলেছে, এতে ক্ষতি বই লাভ নেই, তবে গন্ধটা ভাল। গড়িয়ে পড়ার আগে কিছু পাতা পকেটে ভরেছিল কবীর। সেগুলো পকেট থেকে বের করে বৌয়ের দিকে এগি্য়ে দিয়ে বলে তাহলে তো অকেশানটা সেলিব্রেট করতে হয় অথবা শোকপ্রস্তাব নিতে হয়। চিনেপাড়ায় একটা লার্জ চিমনি সূপ চাই ডিনারে। — শুরুর সময় কেউ সেলিব্রেট করেনি, শেষের দিনে করে কী লাভ। তাছাড়া এত রক্তপাত তো আমার কাজে লাগল না, বর্ষার চোখ কবীরের পায়ের দিকে ঘোরে, আমার আনন্দে পা ভাঙোনি নিশ্চয়ই। কবীর বোঝে যে কোনও সময় সামান্য কথা বিপজ্জনক মোড় নিতে পারে। — আরে, তোমার জন্য পাতা কুড়োতে গিয়েই তো পড়লাম, কোন বুড়ো জান হাতে নিয়ে তার বউয়ের জন্য আজকাল পাতা কুড়ো্য় বলো। যার জন্য কুড়োয় সে আর বউ থাকে না, প্রেমিকা হয়ে যায়। পা নাড়াতে গিয়ে ফোলা জায়গায় চাপ লাগতে কবীরের মুখ ব্যথায় কুঁকড়ে যায়। মোচড়ানো পাতা নাকের কাছে ধরে লম্বা শ্বাস নেয় বর্ষা, আর ওভারস্মার্ট হয়ে কাজ নেই, দশটা বাজলে এক্স-রে করিয়ে অর্থোপেডিক দেখাতে হবে। এখনও অনেকদিন বাঁচতে হবে, শুধু কথায় হবে না। কবীরও জানে কথা দিয়ে হয় না, যখন সে কথা বলে না সব ঠিকঠাক হয়, কথা বললেই সব বিগড়ে যেতে থাকে। ঝামেলাটা পায়ে না হয়ে হাতে হলে ভাল হত। চলাফেরাটা আটকাত না। এখন দোকান-বাজার, ইলেকট্রিকের বিল, ডাক্তার, খাজনা বর্ষাকে সামলাতে হবে।— মিথ্যেটা কাজে লাগল না। ঢপ মেরে মেডিকেল নিলাম, সেটা সত্যি হয়ে গেল। এইজন্যই মিথ্যে বলি না, বললে তা সত্যি হয়ে যায়। এটা বর্ষাও জানে, সে দেখেছে অজানা কোনও কারণে কবীরের মুখের কথা ফলে যায়। কে জানে কেন হয়। বর পজেজড কিনা এত বছরেও সে কিনারা করতে পারেনি। হতে পারে আজকের দূর্ঘটনা বিশেষ কোনও কারণে ঘটেছে। — চেনা ডাক্তারের অপেক্ষা না করে হাতের কাছে যাকে পাওয়া যায় দেখিয়ে নাও।
— নড়ার অবস্থা নেই ম্যাডাম, তোমাকে দেখালাম, এরপর তুমি বোঝো। তোমার হরমোন থেরাপিটাও এই ফাঁকে শুরু করে দাও।
— ও আমি একা পারব না, তুমি সারলে দেখা যাবে। বর্ষা বরের পাশের চেয়ারে বসে।
সকালবেলার রোদ্দুর প্ল্যাটফর্মের শেড গলে সরাসরি মুখে পড়ছিল মুখে। সেপ্টেম্বরের এই সময়টা আবহাওয়া দ্বিধাগ্রস্ত থাকে। বুঝতে পারে না ঠান্ডা দেবে না গরম ধরে রাখবে। আগের শরতের আরাম নেই তেমন। বর্ষা শাড়ির আঁচল কলা বউয়ের মত ঝুলিয়ে দেয়। গেটের বাইরের নতুন ফুটপাতে শিউলি ছড়িয়ে আছে, গাছের গুঁড়িতে শুঁয়াপোকা কার্পেটের মত জমে আছে। একটা সময় গাছটা বাবাই লাঘিয়েছিল। তখন কেউ ছিল না। তবে ফুলের দাবী মা ছাড়েনি। কাউকে ফুল নিতে দেয় না। সকালে পেতলের সাজি ভরে ফেলার পর অন্যরা চান্স পায়। আজ কারও দেখা নেই। গেল কোথায় মা? সকাল থেকে গলা নেই, চা নেই, মালতীর জন্য আজকের মেনু নেই। ফুল অবহেলায় গড়াচ্ছে। ফুলের ওপর ফুল জমছে। বর্ষা বলে, মায়ের এখন অনেক বাচ্চাকাচ্চা বন্ধু, ফাইভ-সিক্সের মেয়েদের নিয়ে হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালা হয়ে ঘোরে। পাড়ার কোথায় গেছে কে জানে। — আর বাবা? —আজকাল ঘুম থেকে উঠছে দেরী করে, কী হল বুঝছি না। রেল থেকে মুক্তি পেয়েছে। হয় মান হয়েছে, নয়তো মন চলে গেছে মনে হয়। সারা বছর পড়ে পরীক্ষার আগে অনেকের পড়া থেকে মন চলে যায়। তেমন কিছু হয়েছে মনে হয়। কবীর বলে, না, মন যায়নি, ওরম মনে হয়।

কবীর ভালভাবেই জানে মুক্তিফুক্তি ঘটেনি। এই নিস্পৃহতা বরং আরও বেশি করে জড়িয়ে পড়ার লক্ষ্ণণ। ফাইনাল ল্যাপটা তারিয়ে খাওয়ার স্ট্র্যাটেজি। এবার হাত-পা ছোঁড়া বন্ধ করে গভীরে ডুব দেবে সতীনাথবাবু। আড়চোখে নজর রাখবে একলা। কন্ট্রাকটারদের ছেলেছোকরারা শেষ বিকেলে মাঝে মাঝে খোঁজ নেয় স্যারের শরীর ঠিক আছে কিনা, দেখা যাচ্ছে না কেন। বাবা তখন বাগানে আগাছাবিনাশে ব্যস্ত থাকে খুরপি, নিড়ানি, দা আর বড় কাঁচি নিয়ে। আবার মন ফিরে এসেছে বাগানে। কেঁচো সার, গোবর সার এসেছে বস্তা ভরে। পিঁপড়ে মারার ওষুধ এসেছে স্যাচেতে। হ্যাঙ্গিংগুলোর জন্য এসেছে কোকো ডাস্ট। এতাটাই মন গুটিয়ে রেখেছে যে ছেলের পা দেখে বলেছে, জীবনে একবার হাড় ভাঙা ভাল, এতে বোঝা যায় হাড়ের ক্ষয় কতটা হল। তার মানে? ছেলের জন্য দুশ্চিন্তা দেখায় মা— এই বয়সে হাড় ভাঙলে সহজে জোড়া লাগে নাকি। ভাঙলে আগে ভাঙা উচিত ছিল। তুই আর বদলালি না, সব ব্যাপারে দেরী করিস। বর্ষা হেসে গড়িয়ে পড়ে, ঠিক বলেছেন মা, ও সব ব্যাপারে দেরী করে। আসলে হাতের কাছের প্রিয় কর্মকান্ড আর পরিবর্তনে হতভম্ব মা নিজের কথার মানে হারিয়ে ফেলছিল। তারও তাল সামলাতে দেরী হয়ে যাচ্ছিল। তবে, বাড়ির একমাত্র সক্রিয় প্রতিনিধি হিসেবে রেলের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলছিল আগের মতই।

অপ্রত্যাশিত কিছু হল না। এক্স-রে প্লেট দেখে ডাক্তার জানাল দুটো হাড় ভেঙেছে। আপাতত আট সপ্তাহ প্লাস্টার নিয়ে থাকুন। সঙ্গে একটা করে ভাল ক্যালসিয়াম খাবেন। আগের মত ভারী প্লাস্টার অবশ্য করতে হয়নি। সাউথ কোরিয়া আর চিন থেকে নীল রঙের লাইটওয়েট প্লাস্টারে ছেয়ে গেছে অর্থোপেডিকদের ডিসপেনসারি। কেন যে এত সামান্য একটা জিনিস দেশে ঠিক দামে পাওয়া যায় না কবীর বোঝে না। দেশটা ম্যানুফ্যাচারের না হয়ে দালালের হয়ে গেছে। তবে জিনিসটা বেশ কেতাদুরস্ত হয়েছে। দোতলার বারান্দায় ইজিচেয়ারে ঠেস দিয়ে টুলে কুশন লাগিয়ে পা তুলে আয়েস করে সে। ভেবেছিল ছুটিতে না-পড়া বইগুলো ওল্টাবে। কত বই পড়া বাকি। সেলফজোড়া বই ঝাড়ার সময় ইচ্ছেটা হারিয়ে গেল। বাছারা তাকে ফিরে যাও, আমার সর্বনাশের জন্য আমিই যথেষ্ট। তারপর আলস্যে ডুবে গেছে হারিয়ে যাওয়া গুণ অর্জনের চেষ্টায়। নীল পায়ের দিকে তাকিয়ে তার মনে হয় এই দূর্ঘটনাও এক ধরণের সু-ষড়যন্ত্রের অংশ। দীর্ঘ অনুপস্থিতির বোঝাপড়া করতে আয়নাটাই তাকে বারান্দায় বসিয়ে রেখেছে। সে নিজেও চাইছিল নিজের খামতিগুলো পুরিয়ে নিতে। চায়ে চুমুক দিয়ে সে দেখে বাবার ছেড়ে আসা কাজগুলো। টিকিট কাউন্টারের দেওয়ালের বড় ম্যূরাল থেকে সরলবর্গীয় গাছের সারির ফাঁক দিয়ে পুরনো কয়লার ইঞ্জিনের একটা রেলগাড়ি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। হাওয়ায়, জমিতে কোলাজে চড়ে বেড়ায় রঙীন ছেলেমেয়ে, গ্যাসবাতি, চাকা লাগানো স্যূটকেস, টিটি ও কিছু পাখি। চাঁদ ও তারার নিচে পাহাড় কেটে সুড়ঙ্গে ঢোকার মুখে গভীর খাদের ওপর ছিল সেতু। মেঘ আটকে ছিল নিচে পাহাড়ের খাঁজে। ভ্রমণের প্ররোচনা জাগানো দৃশ্যর ওপর শঙ্খ থেকে জলপ্রপাতের মত জ্যোৎস্না ঝরছিল। কবীর কী ভেবে ফিলহারমনিক অর্কেস্ট্রার কন্ডাকটার হয়ে ওঠে। তার হাতের টানে ম্যূরাল থেকে সবাই ছড়িয়ে পড়ে রাস্তায়। কবীর বলে, স্ট্যাচু—— সিঁড়ির মানুষজন কোরাসে বিঁধে যায় দু-ধাপের মাঝে, ওয়েল্ডারের ঠিকরে আসা স্ফুলিঙ্গগুলো ধূমকেতুর লেজ হয়ে আটকে থাকে ওভারব্রিজের চালে। কবীর বোঝে পা কেন ভেঙেছে। সে ঘুরে আয়নাকে বলে থ্যাঙ্ক ইউ।

বেলা করে ঘুম ভাঙতে দেখে ঝিরঝিরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। কবীরের কপালে চিপকে ছিল বর্ষার টিপ। এলাকা আমলা, রেলের কর্মচারী, মিডিয়া, পার্টির লোক আর সিকিউরিটিতে ভর্তি। ট্রেনটা দাঁড়িয়েছিল ভোর থেকে। রজনীগন্ধা আর গাঁদাফুলের শিকলে আপাদমস্তক সেজে বিয়েবাড়ির মত। এটা তো শুধু নতুন ট্রেন নয়, নতুন জংশনের প্রথম গাড়ি বলে কথা। ফলে, পরিবারের প্রথম বিয়ের মত সযত্নে অব্যবস্থার ছাপ ছিল প্ল্যাটফর্ম জুড়ে। ওয়েদারটা এত চমৎকার যে রেনকোট চাপিয়ে বেরিয়ে পরলেই হয়। কবীর-বর্ষা নিচে নামেনি। বাবার আপাত বিষাদময় নির্লিপ্ততায় পরিবর্তন ঘটেনি। মায়ের উৎসাহের অত্যাচার এড়ানোর উপায় না থাকায় অনুসরণ করে গেছে প্ল্যাটফর্মে। তার আগে মা রুটিনমাফিক বিরোধ স্মরণ করে বলেছিল, চিরকাল শুনি মেয়েদের নাকি দেরী হয়, তোমার জন্য না ট্রেন মিস হয়। সুন্দর তসরের শাড়ি চড়িয়ে দক্ষিণের মেয়েদের মত খোঁপায় জু্ঁইয়ের মালা জড়িয়েছিল মা। কপালে ছিল সবুজ টিপ। বাবা সাদার ওপর কালো ব্লেজার চাপালেও অন্যমনস্ক লাগছিল। বলল, মৃদুলা, আজ ছোটাছুটি নয়, চুপ করে বসে থাকব। মায়ের পায়ে ছিল কিশোরীর চঞ্চলতা, বাবার পা ক্লান্তিতে ভারী। রহস্যময় কারণে বাবার বেঞ্চিতে কেউ বসেনি। মা বলেছিল, সামনে ইঞ্জিনের কাছে চলো, দুজনে হেলান দিয়ে চা খায়। বাবা কথা বলেনি। মা বকরবকর করে গেছে।— শীতের ছুটিতে আমরা সাউথে যাব। ওদিকে কত ভাল ভাল মন্দির আছে, পুরনো রাজ্য আছে, অনেক সমুদ্র আছে, বারবার পাহাড়ে যেতে ভাল লাগে না। জ্যোতির ছেলেটা নেশাভাং করে না, ওকে চাবি দিয়ে গেলে ভাবতে হবে না, বৌ নিয়ে থেকে যাবে। খাবারদাবার কেনার টাকা দিয়ে গেলেই চলবে। মালতীকে ঐ কটা দিন এক বেলা আসতে বলব, ওর জন্য ভাল কিছু নিয়ে আসতে হবে। আর আমরা কিন্তু এবার গিয়ে আলাদা থাকব। আমাদের তো হানিমুনই হল না এখনও। বৌমাকে বলব, আলাদা হোটেলে থাকতে, নাহলে পার্সোনাল সময় পাওয়া যাবে না। বুঝলে, অসময়ে জল এসে ভালই হয়েছে। যাত্রা শুভ হয়। — বৃষ্টি কোথায়, দেখো রোদ উঠে গেছে, বাবার দু-হাতের বুড়ো আঙুল করগুলোর ওপর জপের মালা হয়ে ঘুরছিল অস্থিরভাবে। উচ্চারিত কোলাহলের মাঝে মূহুর্তটা যথাসম্ভব ব্যক্তিগত করার চেষ্টায় ব্যস্ত ছিল। আবেগকে নিজের মধ্যে স্বাধীনভাবে চলাফেরার সুযোগ দিচ্ছিল। চেষ্টা করছিল কোনও লকারের দূর্বোধ্য পাসওয়ার্ড ডি-কোড করার। গার্ড পতাকা নাড়তে মা ঠেলা দেয়, গাড়ি ছাড়ছে যে, তুমি কোথায় হারিয়ে আছো? অত ভেবো না, সেই কথাটা মনে নেই? সেই যে খুশিকা দো পল,…… স্বপ্নে ডোবা পথ হারানো পথিকের মত অচেনা ঝাপসা চোখে তাকায় বাবা। ঘুমকাতুরে বাচ্চার মত দেখাচ্ছে তাকে। গার্ড বাঁশি বাজায়, পতাকা নাড়ে। চাকা গড়াতে থাকে।

কবীর আর বর্ষা বারান্দা থেকে চোখে চোখে রাখছিল বুড়োবুড়িকে। গ্যালারিতে পাশাপাশি বসে। ভিড়ের জ্বালায় প্রায়ই হারিয়ে যাচ্ছিল তারা। ভোঁ দিয়ে গাড়ি ছাড়তে কবীর দেখে মা একা বসে। জিজ্ঞেস করতে বর্ষা বলে, ঐ তো মা-র পাশেই তো বসে আছে। কবীর কাউকে দেখতে পায় না। জায়গাটা ফাঁকা। কল্পনা করলে বড়জোর হাওয়ায় আঁকা বাবার একটা আউটলাইন পাওয়া যেতে পারে। তাতে বাবার মাত্র পাঁচ পার্সেন্ট থাকতেও পারে, নাইন্টি ফাইভ পার্সেন্ট অনাবিস্কৃত ডার্ক ম্যাটারের মত। সে মুখ ঘোরায় ইঞ্জিনের দিকে। ট্রেন তখন হাতির পিঠ বেয়ে ইউক্যালিপটাসের সারিতে বুকে হাঁটছে। কিছু পর বিচিত্র বাঁকের কাছে হারিয়ে যাবে। কিছু সময় পাতার নড়াচড়ায় বোঝা যাবে, চোখের দেখা হবে না। কবীর বারান্দা থেকে ভাঙা পা উঁচিয়ে বিপজ্জনকভাবে ঝুঁকে মুখ বাড়ায়, গাছের ফাঁক দিয়ে ড্রাইভারকে দেখা গেলে হাত নাড়বে সে। ছোটবেলা থেকে ট্রেন দেখলে সে শুভেচ্ছা জানিয়ে টা-টা করেছে। বর্ষা চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দেয়। কবীর বেঞ্চে তাকিয়ে দেখে মা ওঠেনি এখনও। কোথাও কিছু একটা অপূর্ণ রয়ে গেল যেন। বাবা বলেছিল ট্রেনের মত তারও সময় এসে ছাড়ার সময় এসে গেছে। কবীরের বুক ধক করে করে ওঠে। সে ডানদিক ফিরে আয়নায় তাকায়। তার মুখে ফুটে ওঠে হাসি। বাঃ, সব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। লম্বা গাছগুলো দুহাত দিয়ে সরিয়ে সাফ করে দিয়েছে রেললাইন। আকাশ জুড়ে রামধনু ফুটে আছে অজানা গন্তব্যের চেক পোস্ট হয়ে। লাইনের এপার থেকে ওপার জুড়ে। বাঁধের ওপর দিয়ে হেলেদুলে এগোয় গাড়ি। ইঞ্জিন থেকে লেজ পর্যন্ত একটা ধনুক আয়না জুড়ে বুকে হাঁটছে। কবীর দেখে পুরনো সেই কয়লার ইঞ্জিন থেকে বাবা ঝুঁকে হাত নাড়ছে। কবীর হাত নাড়ে। তিনবার সিটি বাজায় বাবা, ভক ভক করে ধোঁয়া উঠে যায় মেঘে। বর্ষাকে বলে, এদিকে দেখো। বর্ষা তাকায়, নিজেদের ছাড়া কিছু দেখতে পায় না। কী দেখব?
—কিছু পেলে না?
—তুমি আর আমি।
—আর কিছু না?
—না, তবে কেমন কয়লার ধোঁয়ার গন্ধ পাচ্ছি। বাঁ চোখটা কড়কড় করছে, আশ্চর্য, মাথার ভেতর কী ধুলো.......গুঁড়ো কয়লার মত লাগছে, চুলে আঙুল চালায় বর্ষা, হাত কালো হয়ে গেল যে? কবীর হাসে। সব কথা না বলাই ভাল, বললে হারিয়ে যেতে পারে, যে জানার সে জানবে, যে জানে না, সে-ও একদিন জানতে পারে। না জানলে কিছু করার নেই, তার শুভ সংক্রমণ সবার জন্য নয়। বর্ষা জানে না আজ অন্য কাউকে চালাতে দেবে না বাবা। সে কু-ঝিক-ঝিক শুনতে পায়। দেখে রামধনুর তোরণের নিচে ছুটে যাচ্ছে বাবার ট্রেন। এরপর মিলি্যে যাবে। বাবা শুনলে বলবে, ওটা মরিচিকা, আমি নই। কবীর জানে বাবার অভ্যন্তরে পূর্ণ প্রতিফলন হচ্ছে। হাওয়া কাঁপছে, চকচক করছে।। আয়নায় তাকালেই দেখতে পাবে গোটা জার্ণি। তার চোখ জলে ভরে আসে। সে আয়নাকে বলে স্ট্যাচু। ছবি থমকে যায়। ঘড়ি বিশ্রাম নেয়। বাবার হাত আটকে যায় পৃথিবীর কিছু ওপরে, ধোঁয়া থমকে থাকে মেঘের কিছু নিচে। সেই বালির প্রান্তর, সেই বুনো ঝোঁপ, ইঁদুরে খাওয়া সেই রেললাইন সেরকমই আছে। বাবা ফেরেনি, মা একা ফেরে স্টেশন থেকে। একটা জলজ্যান্ত মানুষ উবে গেল নাকি? বর্ষার উদ্বেগ দেখে কবীরের দিকে ফিরে মা বলেছিল, জানিসই তো তোর বাবা যে ট্রেন নিয়ে যায় সেটাতেই ফেরে। চিন্তা করিস না। চিন্তা করার কারণ নেই। কবীর জানে বাবা চিরকাল ডাউনের ট্রেনে ফেরে। সেটুকু অপেক্ষা করতে হবে। তার পিঠ শিরশির করে, অ্দ্ভূত ভাল লাগায় ছেয়ে যায় মন। আর মনে হয়, কিছু কিছু পথ আয়নার ভেতর দিয়ে স্বর্গের দিকেও যায়।


পুনশ্চঃ অপ্রত্যাশিত আমন্ত্রণের চিঠিটা আসে একদিন পর। চিঠি না বলে বলে গ্রিটিংস কার্ড বলাই ঠিক। টয় ট্রেনের ছবি দেওয়া কার্ডে সংবর্ধনা জানানোর আর্জি ছিল বিনীতভাবে। তা রেল তো প্রায়ই চব্বিশ ঘন্টা লেট করে। চিঠির আর কী দোষ। তবে তাতে কোনও স্ট্যাম্প ছিল না। কে পাঠিয়েছে বা কোথায় যেতে হবে লেখা ছিল না। বর্ষা সেটা দেখে মুচকি হাসে। কেন কে জানে।
রাতে আমি ফোন করি কবীরকে। — বুঝলি, আজ অবশেষে মরিচিকা দেখেছি। কবীর বলে, জানি। আমি একসঙ্গে দুটোই দেখেছি—— রামধনুর তলা দিয়ে মরিচিকার ছুটে যাওয়া।