ইএসপি

অনির্বাণ ভট্টাচার্য

দুজন চরিত্র। পেশেন্ট অরিত্র স্যান্যাল। লেখক, সাধারণ সরকারি চাকুরে। অন্যজন গান্ধর্বী দত্ত। সাইকোলজিস্ট। চেম্বার। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকা। একটা সময়ে কথোপকথন।



ডাক্তার - সমস্যাটার শুরু কবে থেকে?
পেশেন্ট – জানি না ম্যাডাম। আমি নিজে ঘেঁটে দেখেছি এটা খুব ডিপলি রুটেড। বাবা মারা যাওয়ার দিন মা কাঁদেনি খুব একটা। আমি নিজে মায়ের কাছে যেতে চেয়েছিলাম, যেতে দেয়নি অনেকেই। বাবা অসম্ভব ভালো মানুষ ছিলেন। অন্তত আমাদের কাছে। উদার প্রাণখোলা মানুষ। সারাক্ষণ হাসছেন। সেরকম এক মানুষের হঠাৎ সুইসাইড। একবার মার কাছে গেলাম। লুকিয়ে। যাবার সঙ্গে সঙ্গেই মার গলা – ‘সোহিনী’। শুনলাম। মার ঠোঁট নড়েনি। অথচ, আমি শুনলাম।
ডাক্তার – সোহিনী কে?
পেশেন্ট – তখনো জানতাম না। পরে শুনেছিলাম, বাবার পরিচিতা। কলকাতার কোথায় একটা এঁদো গলিতে থাকতেন। বাবার সঙ্গে কিছু একটা ছিল, হয়ত কোনোভাবে প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন মহিলার। তারপর থেকে যোগাযোগ। ভালোবাসা। ঠিক আগের দিন বাস দুর্ঘটনায় মারা যান। পরের দিন বাবার ওই ডিসিশন।
ডাক্তার – বুঝলাম, কিন্তু এতে আশ্চর্য হওয়ার কী আছে? ধরে নিচ্ছেন কেন মা’র মনের কথা, যা মা আদৌ বলেননি? মা হয়ত জানতে পেরেছিলেন আগে। মাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন সত্যি সত্যি তিনি বলেছিলেন কিনা এই নামটা?
পেশেন্ট – মা বলেননি কিছু, জানি।
ডাক্তার – কেন?
পেশেন্ট – মা কথা বলতে পারতেন না। বাবা দুমকায় বেড়াতে গিয়ে এক স্কুলমাস্টারের বাড়িতে বহুদিন ছিলেন। কী একটা অফিসের কাজে। তারই মেয়ে আমার মা। কথা বলতে পারতেন না। আমার বাবার কাছে ওসব ম্যাটার করত না কোনদিনই ...

...

অন্য এক দিন। নেক্সট সিটিং। বাইরে কোথাও। গান্ধর্বীর ট্যাকটিক্স। পেশেন্টকে ফ্রি রাখতে চেম্বারের বাইরে বসেন। গল্প শোনেন।

ডাক্তার – তার পরের কোনও ইনসিডেন্স? যার জন্য আপনি সিওর হলেন আপনি অন্যের মনের কথা বুঝতে পারছেন...
পেশেন্ট – বেশিদিন না। কমে গেছিল জানেন। বলা ভাল, সেরেই গেছিল। গত মাসে। এক মহিলাকে সিট ছেড়ে দিতে গিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছি। কোলে এক্কেবারে বাচ্চা। ওঠার সময়ে ব্যালেন্স রাখতে পারলাম না। ধাক্কা লাগল। ভদ্রমহিলা আমার দিকে একটু দেখলেন, তারপর বসলেন। আমি গোটা রাস্তাটা পাথরের মত কাটালাম। কন্ডাক্টরের থেকে খুচরো নিলাম না। নেমে গেলাম।
ডাক্তার – কেন?
পেশেন্ট – ‘পুরুষ জাতটাই অসভ্য। এদের জন্য রাস্তাঘাটে যাওয়াই মুশকিল হয়ে পড়ছে। আবার সিট ছেড়ে দেওয়ার ন্যাকামো’। আমি স্পষ্ট শুনলাম। মহিলা ধাক্কা খেয়ে বসে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে। বলুন, হুঁশ থাকে একথা শোনার পর?

...

নেক্সট সিটিং, গান্ধর্বীর চেম্বার

ডাক্তার – দেখুন, মিস্টার স্যান্যাল, আপনার প্রবলেমটা খুব জটিল ধরনের ইএসপি। আমি আমার মতো করে সমাধানের রাস্তা খুঁজছি। তবে তার জন্য আপনাকে একটু কোঅপারেট করতে হবে।
পেশেন্ট – যেমন?
ডাক্তার – স্ট্রেস নিলে চলবে না। লাইট মিউজিক শুনতে হবে। স্মোক করবেন না। দেরিতে ঘুমোবেন না ...
পেশেন্ট – (একটু হেসে) ম্যাডাম, আমি এসব করেছি কিন্তু। আপনাকে একটা ঘটনা বলি। গত সপ্তায়। সারাদিন অফিসে তেমন কোনও কাজ ছিল না। ঘরে হালকা একটা জমায়েত। দুতিনজন বন্ধু। কেউ কেউ ড্রাঙ্ক। বিশ্বাস করুন, আমি নই। বহুদিন হল, মুখে রোচে না। তো যাই হোক, ওরা নিজের মত করে আছে। আমি একটা ঘরে বিজন বলে আরেক বন্ধু আছে, তার সঙ্গে। বেশ কয়েক বছর পর দেখা। ও লাইট মিউজিক শুনছে। নতুন প্রেমে পড়েছে। তারপর সেখান থেকে বিয়ের কথা। সেসব গল্পই করছিল। একটু থেমে থেমে। অনেক কথার পর নাম জানতে চাইলাম। বলল না। হাসল। উঠে চলে গেল। ওর ল্যাপটপেই মিউজিক চলছিল। পড়ে রইল।
ডাক্তার – ব্যাপারটা ঠিক ক্লিয়ার হল না মিস্টার স্যান্যাল, এর মধ্যে অস্বাভাবিকত্ব কোথায়?
পেশেন্ট – দাঁড়ান, গল্পের টুইস্টটা বলিনি। আমাকে মুখে নামটা বলেনি। কিন্তু আমি তো শুনেছি। আমি যেভাবে শুনতে পাই, সেভাবে। ‘রঞ্জা’। একটু দীর্ঘশ্বাস ছিল বিজনের কথাটার মধ্যে। কলেজ লাইফে চুটিয়ে কাটিয়েছিলাম রঞ্জার সঙ্গে। একটা সময়ে নিজে থেকেই যোগাযোগ বন্ধ করল। সবে প্রোপোজ করেছিলাম। হ্যাঁ বলেছিল। তারপর ফ্যামিলির দোহাই দিল। বলল মানবে না। আমি এত ন্যাগিং কোনওদিনই ছিলাম না। ঘাঁটাইনি বেশি। পাস্ট ভেবে সরে এসেছিলাম। বিজন, উৎপল, সৌহার্দ, রঞ্জা – আমরা সব এক ব্যাচের। একসঙ্গে আড্ডা মারতাম। সেই বিজন। রঞ্জা। বিজন ও ঘরে কথা বলছে। প্রচণ্ড ড্রাঙ্ক। এখন আসার চান্স নেই। ওর ল্যাপটপ খুললাম। ছবির পর ছবি। রঞ্জার ঠোঁটের বাঁদিকে ওই তিলটা এখনো কী অদ্ভুত স্পষ্ট ...

...

পরের সিটিং, আবার বাইরে কোথাও

ডাক্তার - শেষ কবে শুনেছেন, আই মিন, ফিল করেছেন এমন?
পেশেন্ট – কিছুক্ষণ আগে...
ডাক্তার – মানে?
পেশেন্ট – বাদামওলাকে দেখেছেন? ওই যে চলে গেল পাশ দিয়ে। ওকে ছোটবেলা থেকে চিনি। পাশের বাড়ির প্রায় স্পয়েল্ট একটা ছেলে। দূরসম্পর্কের মামাতো বোনের সঙ্গে প্রেম-টেম ছিল। মেয়েটার বিয়ে গেল। গলায় দড়ি দিতে গেল। নাটক টাটক আর কী ...। পরে লোহার শিক চুরি করে ধরা পড়েছিল। দুবার আরও কীসব কারণে জেল খাটা। শুনেছিলাম দাদাদের ধরে পার্টির ছোটখাটো কাজ করত। রিসেন্ট খবর জানতাম না। এখন দেখলাম। দেখল। হাসল। কিছু বলল না।
ডাক্তার – আর মনে মনে কী বলল?
পেশেন্ট – থাক ...
ডাক্তার – বলুন না, শুনি ...
পেশেন্ট – বলল, ‘দু’একটুকরো কলম পিটিয়ে ডাক্তারের সঙ্গে প্রেম করা হচ্ছে, অকাদ দেখো শালার’।
ডাক্তার – (হাসি) কাল আমার চেম্বারে আসবেন। আপনার সমস্যার সমাধান আমার কাছে আছে। তবে ওই আর কী, আপনার থেকে কিছু কোঅপারেশন ...
পেশেন্ট – (বিরক্ত হয়ে) জানি, লাইট মিউজিক, স্ট্রেস, স্মোক, ঘুম, এসব নিয়ে তো ...
ডাক্তার – (হেসে) না, আরও কিছু আছে, কাল বলি ...

...

নিজের বাড়িতে অরিত্র স্যান্যাল। কিছু একটা খুঁজছেন। রেস্টলেস। একটু বিরক্ত। অবাক। হঠাৎই কলিং বেল। পোস্টম্যান একটা চিঠি দিয়ে গেল। কোনও সম্পাদক মে বি। অনিচ্ছায় নিলেন অরিত্র। খামটা অন্যরকম। খুলে পড়তে থাকলেন অরিত্র ...

প্রিয় অরিত্রবাবু

আগামী সপ্তায় আমার চেম্বারে আসার কথা আছে, ভুলবেন না। আপনার সমস্যাটা খুব গভীর, স্যান্যালবাবু। এর জন্য ইএসপির চেয়েও বেশি প্রয়োজন কল্পনাশক্তি। আপনার মাথা আর কলমের জোর দুটোই সাংঘাতিক। বাসের ঘটনাটার একটা লজিক আছে। হয়েছিল, মেয়েটি মনে মনে বলেছিল হয়ত। কী আর করবে, আপনি নয় অমন করেননি, অনেকেই কিন্তু করে। মেয়েটি মনে মনেই বলেছিল, আর আপনি ওর তাকানো দেখে ধরে ফেলেছিলেন। তারপর ছোটবেলার ঘটনাটার একটা স্মৃতি আপনার রয়ে যাওয়ার কারণে আপনি ধরে নিলেন মেয়েটি সত্যিসত্যিই ওরম বলেছে। কী, ঠিক বলছি তো? ছোটবেলারটাও মিথ্যে বলেননি। সোহিনীদেবীর কথা আপনি জানতেন। আপনার মা খুব সামান্য কথা বলতে পারতেন। আলতো উচ্চারণ। ‘সো’ ব’লে বাকিটা বলেননি। আপনার কল্পনাশক্তি অরিত্র। আপনি বাকিটা ভেবে নিয়েছেন। কী ভাবছেন, কীকরে জানলাম এসব? কেন, ডায়েরি? একটু দেখুন তো? আপনার শোবার ঘরের খাট লাগোয়া টেবিলটার মাঝের ড্রয়ারে? ওটা নেই। কীকরে পেলাম? আপনার নতুন কেনা ফ্ল্যাটটার মালকিন আমার পরিচিত। পুরনো পেশেন্ট। আপনার সমস্যাগুলো শোনার পর আপনার ঠিকানা দেখে প্ল্যানটা মাথায় এল। ডুপ্লিকেট কোনও চাবি আছে কিনা জিজ্ঞেস করলাম। বলল নেই। বাধ্য হয়ে প্ল্যানটা বললাম। কিছুটা রেখেঢেকে। বলল, দাঁড়ান, মালতীকে ধরব। ওর কাছে একটা ডুপ্লিকেট থাকে বোধহয়। দাদাবাবু কখন বাড়ি ফিরবে তার তো কোনও ঠিক নেই, বিকেলের রান্না-ফেরত চাবিটা রেখে যায় মালকিনের কাছে। ঘরে ঢুকলাম একদিন। এটা ওটা খুঁজতে ডায়েরিটা পেলাম। মা-র কথা পড়লাম। বুঝলাম, একটা সামান্য গোঙানি ওঁর মুখ থেকে বেরোত, অস্পষ্ট হলেও। তা থেকে আর আপনার কিছু লেখা থেকে ঠাহর হল। বিজন বলে আপনার কোন বন্ধু আছে? খাট জুড়ে রাখা বিজনের রক্তমাংস। আপনার বিজন না। গল্পের বিজন। সন্দীপনের গল্পসমগ্র। ‘ইউজুয়াল সাসপেক্টস’ দেখেছেন অরিত্র? শেষটুকু? থানার ভেতর কেভিন স্পেসি? কিছুটা আপনিও নিয়েছেন। প্লটটুকু। সোহিনীদেবীর জন্য, রঞ্জার জন্য মেয়েদের উপর একটা অগোছালো রহস্যের মনোভাব, কিছুটা ঘৃণা আপনার মধ্যে তৈরি হয়েছে অরিত্র। এটা সরান। বিজন নেই, তবে রঞ্জা সত্যিই আছে। নামটাও বানানো না। ওর স্মৃতি আর বিট্রেয়ালটা আপনার মাথার মধ্যে ছিল। ধরে নিয়েছিলেন অন্য কোনও ব্যাচমেটের খপ্পরে পড়েছে। সন্দেহ করেন এখনও অনেককে। আমার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে হঠাৎ বিজন নামটা মাথায় আসে। ল্যাপটপ, ঘরে হালকা পার্টি সব বানানো। আর বাদামের গল্পটা ইন্সট্যান্ট। কী, তাই তো? আর হ্যাঁ, আপনার ঘরে আরও অনেক কিছু পেয়েছি। বালিশের নিচে। লেখার খাতায়। দেওয়ালে। আমার এত পেপার কাটিং পেলেন কোথায়? এত পসারও তো হয়নি। ইন্টারনেট? এত ছবি দেওয়া আছে নাকি? আমার নিজের কাছেও তো নেই?
আপনার ভাবনার, আপনার কলমের জোর আছে মশাই। ডায়েরির সঙ্গে লেখার একটা খাতাও নিয়েছি। আসবেন কিন্তু। নাহলে ফেরত দেব না।

ভালোবাসা নেবেন
ইতি ম্যাডাম না, গান্ধর্বী ডাকলে খুশি হব