নোস্টোস, অথবা এক দুর্বহ ভার

শৌভ চট্টোপাধ্যায়


আমাদের এই বেঁচে-থাকার কেন্দ্রে,
আপনি যদি খুব ভালো করে লক্ষ করেন
তাহলে দেখবেন, একটা রংচটা নীল শার্ট
হাওয়ায় দুলছে—স্রেফ একটা নীল শার্ট,
যার মধ্যে, কোনো শরীর নেই, কোনো
মানুষও নেই।

আর দেখুন, কী দ্রুত শুকিয়ে আসছে
সেই একলা শার্ট, বায়ুতাড়িত, তার জল
ক্রমশ উবে যাচ্ছে হাওয়ার টানে। দূরে
ওই যে মেঘ ডাকছে, নীল জামার
সমস্ত জল আর সজলতাটুকু, বৃষ্টি হয়ে
ওইখানে ঝরে পড়ছে, কাদের বাগানে...



কাদের বাগানে, মরশুমি ফুলের রঙ
ফিকে হতে না-হতেই, গজিয়ে উঠল
ফণিমনসার ঝোপ আর বিষাক্ত ফলের গাছ?
কোথায়, সমস্তদিন, শুধু ঝরে যায় পাতা
চিরহরিৎ গাছের, পাখির নখ থেকে খসে পড়ে
একটি সদ্যছিন্ন হাত, যার মুঠোয় আঁকড়ে ধরা
শিশুটি তখনও কাঁদছে?

তবু ফিরে এলাম। নিজের চিৎকারের পাশে,
নিজের ছিন্নশির দেহটির কাছেই, আমি এখন
হাঁটু মুড়ে বসে আছি। যখন সমস্ত টান
ক্রমশ শিথিল হয়ে আসছে, বেশ বুঝতে পারছি
কেন্দ্র বলে আসলে কিছু নেই, কখনও ছিল না—


“যদি মহাবিশ্ব সসীম হয়, আর যদি বস্তুপুঞ্জ তার মধ্যে সমানভাবে ছড়িয়ে থাকে, তাহলে, মহাকর্ষের কারণে, তা অনিবার্যভাবেই এই সসীম মহাবিশ্বের কেন্দ্রের দিকে ধাবিত হবে, এবং, শেষ অবধি, একটি বিপুল বর্তুলাকার পিণ্ড তৈরি করবে। অপরপক্ষে, যদি মহাবিশ্ব অসীম হয়, তাহলে তার এমন কোনো কেন্দ্র থাকা সম্ভব নয়, যার দিকে এই বস্তুপুঞ্জ ধাবিত হতে পারে। ফলে, একটিমাত্র অখণ্ড বস্তুপিণ্ডের বদলে, তারা তখন একে অপরের সঙ্গে মিশে অসংখ্য বিরাটকায় বস্তুপিণ্ডের জন্ম দেবে, যা সমস্ত ব্রহ্মাণ্ড জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকবে, অকল্পনীয় সব দূরত্বে।“

১৬৯২ খ্রীষ্টাব্দের ১০ই ডিসেম্বর, ধ্রুপদী সাহিত্যের অধ্যাপক রিচার্ড বেন্টলিকে পাঠানো একটি চিঠিতে, এই কথা লিখেছিলেন সার আইজ্যাক নিউটন।

অসীম ও কেন্দ্রহীন
অসীম, তাই কেন্দ্রহীন
এই মহাবিশ্ব
ক্রমশ ঠাণ্ডা হয়ে আসছে

ক্রমশ দূরত্ব বাড়ছে
যেকোনো দুটি বিন্দুর
যেকোনো দুটি বস্তুর

আপনার এবং আমার...